হিন্দুদের কোনো পূজায় যদি কোনো মুসলিম শুভেচ্ছা জানায়, তাহলে কি তার ঈমান থাকবে? সম্প্রতি পূজা চলাকালে কিছু মুসলিম নেতা এতে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ইসলাম এই ব্যাপারে কী হুকুম প্রদান করে?
আশা করছি, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করবেন।
হিন্দুদের কোনো পূজায় যদি কোনো মুসলিম শুভেচ্ছা জানায়, তাহলে কি তার ঈমান থাকবে? সম্প্রতি পূজা চলাকালে কিছু মুসলিম নেতা এতে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ইসলাম এই ব্যাপারে কী হুকুম প্রদান করে?
আশা করছি, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করবেন।
ঈমান অতি সংবেদনশীল বিষয়। কুফর-শিরকের প্রতি অনুরাগ, উদারতা প্রদর্শন, বিধর্মীদের ধর্মীয় পর্ব-উৎসবে অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা-শুভকামনা জানানো– সবই ঈমান পরিপন্থি কাজ।
ঈমানের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হল, কুফর-শিরক থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি ও সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেওয়া এবং অমুসলিমদের সকল ধর্মীয় পর্ব-উৎসব থেকে দূরে থাকা এবং তাদের ধর্মীয় নিদর্শনের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা।
পূজায় শুভকামনা জানানো মানে শিরকের বিষয়ে শুভকামনা জানানো। এটি যে কত ভয়াবহ ব্যাপার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং কোনো মুমিনের জন্য পূজা ইত্যাদিতে শুভেচ্ছা-শুভকামনা জানানোর সুযোগ নেই।
আর বিধর্মীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে শিরকী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত থেকেও অংশগ্রহণ করা নাজায়েয।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন–
اجْتَنِبُوا أَعْدَاءَ اللهِ فِي عِيدِهِمْ.
আল্লাহ্র দুশমন (কাফের-মুশরিক)-দের ধর্মীয় উৎসব থেকে দূরে থাক। (সুনানে কুবরা, বায়হাকী, বর্ণনা ১৮৮৬২)
তিনি আরও বলেন–
وَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِمْ فِي كَنَائِسِهِمْ يَوْمَ عِيْدِهِمْ، فَإِنَّ السَّخْطَةَ تَنْزِلُ عَلَيْهِمْ.
তোমরা মুশরিকদের ধর্মীয় উৎসবে তাদের উপাসনালয়ে যাবে না। কেননা (সে সময়) তাদের ওপর আল্লাহ্র ক্রোধ ও গযব নাযিল হতে থাকে। (মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ১৬০৯)
তাই প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানের ওপর আবশ্যক, এ ধরনের কাজ থেকে বেঁচে থাকা।
উল্লেখ্য, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তারা সে দায়িত্ব আদায় করবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য হোক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে– তাদের কুফর-শিরক ও পূজা-উৎসবের প্রতি শুভকামনা, শুভেচ্ছা প্রকাশ এবং তাদের ধর্মীয় আয়োজন ও উৎসবে অংশগ্রহণ করা কিছুতেই বৈধ হতে পারে না। মুসলমানদেরকে এসব থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা সকলকে হেদায়েত দান করুন।
শেয়ার লিংক* >المحيط البرهاني< ৭/৪২৯ : اجتمع المجوس يوم النيروز، فقال مسلم: خوب رسم نهاده اند أو قال: نيک اثر نهاده اند، يخاف عليه الكفر.
–খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩৮৭; আয্যাখীরাতুল বুরহানিয়া ৭/১৪০; আহকামু আহলিয যিম্মা ১/১৫৪; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৭/৩৪৮; ফাতাওয়া বায্যাযিয়া ৬/৩৩৩; মাজমূউ রাসায়িলিল মোল্লা আলী আলকারী ৭/১৭৪
আমার গর্ভধারণের দুই মাস পূর্ণ হতে চলেছে। একাধিক মেডিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে আমি বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। গত কিছুদিন থেকে আমার বিরতি দিয়ে রক্ত আসা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ডাক্তার বলেছেন, গর্ভাবস্থায় বিশেষ কারণে কারও কারও এমন হয়ে থাকে। কিন্তু আমার সংশয় হল, গর্ভাবস্থায় দেখা যাওয়া এ রক্তের কারণে নামায, রোযা, কুরআন তিলাওয়াতের কী বিধান হবে? আমি কি এগুলো চালিয়ে যেতে পারব?
গর্ভাবস্থা শুরু হওয়ার পর রক্ত দেখা গেলে তা হয়েয হিসেবে গণ্য হয় না; বরং তা ইস্তেহাযার হুকুমে। সুতরাং প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী আপনার যেহেতু গর্ভাবস্থা শুরু হয়ে গেছে, তাই এখন রক্ত দেখা গেলেও ওযু করে নামায, রোযা, কুরআন তিলাওয়াত– সবই আদায় করবেন। অন্য সময়ের ইস্তেহাযার মতো এক্ষেত্রেও নামায পড়া এবং রমযান মাস হলে রোযা রাখা ফরয।
গর্ভাবস্থায় দেখা যাওয়া রক্ত সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেছেন–
لاَ يَمْنَعُهَا ذٰلِكَ مِنَ الصَّلاَة.
এ রক্ত তাকে নামায আদায় থেকে বাধা প্রদান করে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৬০৯৯)
শেয়ার লিংক* العناية شرح الهداية ১/১৬৪ : قال: (والدم الذي تراه الحامل ابتداء) أي حال الحبل (أو حال ولادتها قبل خروج الولد استحاضة، وإن كان ممتدا) أي بالغا نصاب الحيض.
–মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ১২১৩; কিতাবুল আছল ১/২৯৫; আলমাবসূত, সারাখসী ২/২০, ১৩৯, ১৪৯; আলমুহীতুল বুরহানী ১/৩৯৫; আলবাহরুর রায়েক ১/২১৮
কয়েকদিন আগে আমি ফরয গোসলে নাকে পানি পৌঁছাতে ভুলে যাই। কিছুক্ষণ পর স্মরণ হলে মাসআলা জানা না থাকার কারণে পুনরায় গোসল করে নামায আদায় করি।
এখন জানার বিষয় হল, ওই দিন কি আমার ওপর পুনরায় গোসল করা জরুরি ছিল, নাকি শুধু নাকে পানি পৌঁছানোই যথেষ্ট ছিল?
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে স্মরণ হওয়ার পর শুধু নাকে পানি পৌঁছানোই যথেষ্ট ছিল; পুনরায় গোসল করা জরুরি ছিল না। কেননা ফরয গোসলে নাকে পানি পৌঁছানো বা কুলি করা না হলে কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশ শুকনো থেকে গেলে স্মরণ হওয়ার পর শুধু ওই বাদ পড়া অংশ পানি দ্বারা ধুয়ে নিলেই ফরয গোসল সম্পন্ন হয়ে যায়; নতুন করে গোসল করতে হবে না।
আয়েশা বিনতে আজরাদ রা. থেকে বর্ণিত–
عَنْ عَائِشَةَ بِنْتِ عَجْرَدٍ فِي جُنُبٍ نَسِيَ الْمَضْمَضَةَ وَالِاسْتِنْشَاقَ، قَالَتْ: قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: يُمَضْمِضُ وَيَسْتَنْشِقُ وَيُعِيدُ الصَّلَاةَ.
গোসল ফরয হয়েছে এমন ব্যক্তি গোসলের সময় কুলি করতে এবং নাকে পানি পৌঁছাতে ভুলে গেলে তার ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, সে শুধু কুলি করবে এবং নাকে পানি পৌঁছাবে আর (কুলি করা ও নাকে পানি পৌঁছানোর আগে) যে নামায পড়েছে তা পুনরায় পড়ে নেবে। (সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ৪১৪)
শেয়ার লিংক* كتاب >الأصل< للشيباني ১/৩২: قلت: أرأيت امرأة حائضا طهرت فاغتسلت فبقي من غسلها أقل من موضع الدرهم كيف تصنع؟ قال: تغسل ذلك المكان، وإن كانت صلت قبل أن تغسله فعليها أن تعيد الصلاة. قلت: وكذلك الجنب؟ قال: نعم.
–খিযানাতুল আকমাল ১/৩১; শরহুল মুনইয়া, পৃ. ৫০; আদ্দুররুল মুখতার ১/১৫৫; আসসিআয়া ১/২৮০
মুহতারাম মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাচ্ছি, বিতির নামায কি এক রাকাত পড়া যাবে? জানিয়ে বাধিত করবেন।
বিতির নামায তিন রাকাত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতির তিন রাকাত পড়তেন। এটি বহু হাদীস ও আছার দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে শুধু এক রাকাত বিতির পড়া নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত তাহাজ্জুদের পর বিতির পড়তেন। বয়স ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন অবস্থার কারণে তাহাজ্জুদের রাকাত-সংখ্যা কমবেশি হলেও বিতির সর্বদা তিন রাকাতই পড়তেন।
বিতির নামায তিন রাকাত হওয়ার বিষয়টি সুপ্রমাণিত। এ বিষয়ে বহু হাদীস ও আছার বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হল–
১.
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمূنِ، أَنَّه أَخْبَرَه: أَنَّه سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا، كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ؟ فَقَالَتْ: مَا كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّيْ أَرْبَعًا، فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّيْ أَرْبَعًا، فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّيْ ثَلاَثًا.
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত?
তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তুমি জানতে চেয়ো না। অতঃপর চার রাকাত পড়তেন। এরও দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চেয়ো না। এরপর তিন রাকাত (বিতির) পড়তেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৩৮)
২. আবদুল্লাহ ইবনে আবী কায়েস রাহ. বলেন–
قُلْتُ لِعَائِشَةَ: بِكَمْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْتِرُ؟ قَالَتْ: كَانَ يُوْتِرُ بِأَرْبَعٍ وَثَلَاثٍ، وَسِتٍّ وَثَلَاثٍ، وَثَمَانٍ وَثَلَاثٍ، وَعشْرٍ وَثَلَاثٍ، وَلَمْ يَكُنْ يُوْتِرُ بِأَنْقَصَ مِنْ سَبْعٍ، وَلَا بِأَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَ عَشَرَةَ.
আমি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবীজী বিতির কত রাকাত পড়তেন?
উত্তরে তিনি বলেন, চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতিরে সাত রাকাতের কম এবং তেরো রাকাতের বেশি পড়তেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫১৫৯; শরহু মাআনিল আছার, হাদীস ১৬৫৬)
৩.
عَنْ سَعْدِ بْنِ هِشَامٍ، أَنَّ عَائِشَةَ حَدَّثَتْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لَا يُسَلِّمُ فِيْ رَكْعَتَيِ الْوِتْرِ.
সা‘দ ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়েশা রা. তাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতিরের (শেষ) দুই রাকাতে মাঝে সালাম ফেরাতেন না। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৬৯৭; মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, হাদীস ২৬৬)
উক্ত হাদীসসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সালামে তিন রাকাত বিতির পড়তেন। বিতিরের দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহ্হুদের জন্য বসতেন; কিন্তু সালাম ফেরাতেন না। সালাম ফেরাতেন সবশেষে তৃতীয় রাকাতের পর।
৪. বিতিরের তিন রাকাতে তিনি কোন্ কোন্ সূরা পড়তেন, তাও বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনে জুবায়ের রাহ. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন–
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْتِرُ بِثَلَاثٍ، يَقْرَأُ فِي الْأُوْلَى بِسَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلىূ، وَفِي الثَّانِيَةِ بِقُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، وَفِي الثَّالِثَةِ بِقُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন রাকাত বিতির পড়তেন। প্রথম রাকাতে সূরা আ‘লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়তেন। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৭০২; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৬৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১১৭২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৭২০)
এছাড়াও আয়েশা রা., উবাই ইবনে কা‘ব রা., আবদুর রহমার ইবনে আবযা রা.-সহ আরও অনেক সাহাবী থেকে বিতিরের তিন রাকাতে উপরিউক্ত তিন সূরা পড়া সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর প্রত্যেকটি হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে, বিতির নামায তিন রাকাত।
৫. সাহাবায়ে কেরামও তিন রাকাত বিতির পড়তেন; শুধু এক রাকাত বিতির পড়তেন না।
বিশিষ্ট তাবেয়ী আবুল আলিয়া রাহ. যিনি খুলাফায়ে রাশেদীনসহ অনেক মুহাজির ও আনসার সাহাবীর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাকে বিতির নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন–
عَلَّمَنَا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْ عَلَّمُوْنَا أَنَّ الْوِتْرَ مِثْلُ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ، غَيْرَ أَنَّا نَقْرَأُ فِي الثَّالِثَةِ، فَهَذَا وِتْرُ اللَّيْلِ وَهَذَا وِتْرُ النَّهَارِ.
সাহাবায়ে কেরাম আমাদের শিখিয়েছেন, বিতির নামায মাগরিবের নামাযের মতো। পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, (মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে কেরাত পড়তে হয় না; কিন্তু) বিতিরের তৃতীয় রাকাতে আমরা কেরাত পড়ি। এটা হল রাতের বিতির। আর ওটা হল দিনের বিতির। (শরহু মাআনিল আছার, বর্ণনা ১৭০১)
মোটকথা, বিতির নামায তিন রাকাত পড়াই সুন্নাহসম্মত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ তিন রাকাত বিতির পড়তেন। পক্ষান্তরে শুধু এক রাকাত বিতির পড়া নবীজী থেকে প্রমাণিত নয়।
বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুস সালাহ রাহ. বলেন–
لا نعلم في روايات الوتر مع كثرتها أنه عليه السلام أوتر بواحدة فحسب.
বিতির সম্পর্কে বিপুল হাদীস থাকা সত্ত্বেও আমরা এটা পাইনি যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এক রাকাত বিতির পড়েছেন। (আলবাদরুল মুনীর ৪/৩০৩; আততালখীসুল হাবীর ২/৩৯)
উল্লেখ্য, কোনো কোনো বর্ণনায়
أوتر بركعة-এর কথা পাওয়া যায়। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, এর অর্থ বিতির নামায শুধু এক রাকাত পড়া নয়; বরং ওই বর্ণনাটি এ সম্পর্কিত অন্য বিশদ বর্ণনার সংক্ষিপ্ত রূপ। যার কয়েকটি এখানেও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সকল হাদীসের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেখা হলে বিষয়টি একদমই স্পষ্ট যে, ওই এক রাকাতের সঙ্গে এর পূর্বে তিনি আরও অনেক রাকাত নামায পড়েছেন। এর মধ্যে শেষের তিন রাকাত বিতির আর বাকিগুলো তাহাজ্জুদ। এ কথাটি দ্বারা রাবীর মূলত উদ্দেশ্য হল, দুই দুই রাকাত করে নামায পড়ে শেষ দুই রাকাতের সঙ্গে এক রাকাত যোগ করে তিনি আগের রাকাতগুলোকে বেজোড় করেছেন।
কিন্তু এর সঙ্গে পূর্বে দুই/চার রাকাত নামায না পড়ে কখনও তিনি শুধু এক রাকাত বিতির পড়েছেন– এটি প্রমাণিত নয়।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ. বলেন–
الأحاديث التي جاءت أن النبي صلى الله عليه وسلم أوتر بركعة، كان قبلها صلاة متقدمة.
যেসব হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাকাত বিতির পড়েছেন, সেখানে এক রাকাতের আগে আরও নামাযের কথা আছে। (মাসায়িলুল ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ১/৬৫; আলজামে‘ লিউলূমিল ইমাম ইমাম আহমদ ৬/৪০০)
সুতরাং বিতির নামায তিন রাকাতই পড়তে হবে; শুধু এক রাকাত পড়া যাবে না।
শেয়ার লিংক–কিতাবুল হুজ্জাহ, ইমাম মুহাম্মাদ ১/১৩১-১৩৯; শরহু মাআনিল আছার ১/১৬৯-২০৭; নুখাবুল আফকার ৩/১৯৮-২৯২; আছারুস সুনান, নীমাবী ১৯৪-২০৭
আমরা যেখানে জুমার নামায আদায় করি, সে মসজিদটি এলাকার এবং সেখানে আমাদের একটি মাদরাসাও রয়েছে। সকল ছাত্র-উস্তায তাতে জুমাসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেন। সম্প্রতি একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে জুমার নামায সহীহ হওয়া না হওয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ঘটনাটি হল–
এলাকার একজন দাগি চোর, যে এলাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বিভিন্ন সময় চুরি করে থাকে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ও বিভিন্ন সময় হাতেনাতেও তাকে ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মাদরাসার মোটর চুরি ও অন্যের ছাগল চুরি করে এনে মাদরাসায় বিক্রি করা এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে অন্যের স্ত্রীকে এনে ব্যভিচারসহ নানা রকমের নিন্দিত ও নিষিদ্ধ কাজের সাথে জড়িত রয়েছে।
তাই এলাকাবাসী সবাই মিলে চোরের পরিবার ও বাবার কাছে বিচার দিলে বাবা বলে, আমি এই ছেলেকে ত্যাজ্য করে দিয়েছি। অতএব তার কোনো সমাধান আমার কাছে নেই। তোমরা যা পার তা কর।
এরপর এলাকাবাসী ধরে তাকে ভালোভাবে মেরে হাসপাতালে ভর্তি করে। (এবং তার চিকিৎসা বাবদ যাবতীয় খরচ এলাকাবাসী বহন করে) কিছুদিন পরে চোর এবং চোরের বাবা মিলে এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে থানায় চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করে। এতে এলাকার যুবসমাজ চোর ও চোরের বাবার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে কোনো এক জুমার দিন সকলের উপস্থিতে এক যুবক ঘোষণা করে, চোর ও চোরের বাবা যদি মসজিদে আসে, তাহলে আমরা আর মসজিদে আসব না। সুতরাং তারা আর আমাদের মসজিদে আসতে পারবে না।
তারপর থেকে চোর ও চোরের বাবা আর মসজিদে আসে না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসাতিযায়ে কেরামের মধ্যে উক্ত মসজিদে জুমার নামায সহীহ হওয়া ও না হওয়া নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, ‘ইযনে আম’ বাতিল হয়ে গেছে; তাই তাতে জুমা সহীহ হবে না। কেউ কেউ বলেন, না, বাতিল হয়নি; তাতে জুমা সহীহ হবে।
এক্ষেত্রে সঠিক সমাধান জানতে চাই।
প্রশ্নের বর্ণনামতে যেসব কারণে ওই দুই ব্যক্তিকে মসজিদে জুমায় আসতে বারণ করা হয়েছে, সে কারণে ওই মসজিদের ‘ইযনে আম’ বাতিল হয়নি। কারণ প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী তাদেরকে বাধা দেওয়া হয়েছে ভিন্ন কারণে; নামায সংশ্লিষ্ট কারণে নয়। তাই সেখানে জুমা সহীহ হতে কোনো অসুবিধা নেই।
আর বাস্তবেই যদি এ উদ্দেশ্যে তাদেরকে এ মসজিদে আসতে বারণ করা হয় যে, এ কারণে অন্যরা ভয় পাবে এবং তা একটি দৃষ্টান্ত হবে, তাহলে এই উদ্যোগটি শরীয়ত পরিপন্থিও নয়। তবে তারা যদি তওবা করে এহেন কাজ ভবিষ্যতে না করার অঙ্গীকার করে এবং বাস্তবেই নিজেদের শুধরে নেয়, তাহলে তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত।
শেয়ার লিংক* >عمدة القاري< ৬/১৪৬ : وألحق بالحديث: كل من آذى الناس بلسانه في المسجد، وبه أفتى ابن عمر رضي الله تعالى عنهما، وهو أصل في نفي كل ما يتأذى به.
* >منحة الخالق< ২/১৫১ : لا يضر غلق باب القلعة لعدو أو لعادة قديمة؛ لأن الإذن العام مقرر لأهله.
–মাজমাউল আনহুর ১/২৪৬; মারাকিল ফালাহ, পৃ. ২৭৮; আদ্দুররুল মুখতার ১/৬৬১; রদ্দুল মুহতার ২/১৫২
স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তাকে এবং স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তাকে গোসল দিতে পারবে কি না?
স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্য তাকে গোসল করানো জায়েয আছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. বলেন–
أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ عُمَيْسٍ امْرَأَةَ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ غَسَّلَتْ أَبَا بَكْرٍ حِينَ تُوُفِّيَ.
আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা. তাকে গোসল দিয়েছেন। (মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, বর্ণনা ৩০৩)
সুফিয়ান ছাওরী রাহ. বলেন–
تُغَسِّلُ الْمَرْأَةُ زَوْجَهَا؛ لِأَنَّهَا فِيْ عِدَّةٍ مِنْهُ.
স্বামী ইন্তেকালের পর স্ত্রী তাকে গোসল দিতে পারবে। কেননা সে এখনও স্বামীর ইদ্দতের মধ্যে আছে। (মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ৬১১৯)
তবে স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তাকে গোসল দিবে না। ইমাম শা‘বী রাহ. ও সুফিয়ান ছাওরী রাহ. বলেন–
لاَ يُغَسِّلُ الرَّجُلُ امْرَأَتَه.
(স্ত্রী মারা গেলে) স্বামী তাকে গোসল দেবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১১০৯২)
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত আছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১১০৯৪)
শেয়ার লিংক–কিতাবুল আছার, ইমাম আবু ইউসুফ, বর্ণনা ৩৮৩; কিতাবুল আছল ১/৩৫৫, ৩৫৭; শরহু মুখতাসারিত তাহাবী, জাস্সাস ২/২০৫; মুখতারাতুন নাওয়াযিল ১/৪০২; আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬০
যে নারীর সঙ্গে যিনা করা হয়েছে, এমন নারীর দুধবোনকে কি বিবাহ করা যাবে? এই বিষয়ে জানতে চাই।
হাঁ, ওই নারীর দুধবোনকে বিয়ে করা জায়েয হবে। শারীরিক সম্পর্কের দ্বারা ব্যভিচারীর জন্য ওই নারীর দুধবোন হারাম হয়ে যাবে না। তবে ওই মেয়ের ঊর্ধ্বতন (মা, দাদি, নানি) ও অধস্তন (মেয়ে, নাতনী) নারীদের কাউকে বিবাহ করা তার জন্য হারাম গণ্য হবে।
শেয়ার লিংক* >الحاوي القدسي< ১/৩৭০ : والمحرمات للصهرية أربع فرق: الفرقة الأولى: أمهات الزوجات وجداتهن من قبل الأب والأم وإن علون، بمجرد عقد النكاح الصحيح دون الفاسد، أو بالوطء، حلالا كان أو حراما.
–মি‘রাজুদ দিরায়া ৩/৫৩৫; আলজাওহারাতুন নায়্যিরা ২/৫; মাজমাউল আনহুর ১/৪৮১; আলবাহরুর রায়েক ৩/১০১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭৪; রদ্দুল মুহতার ৩/৩২
আমার বড় ভাই বিবাহ করেছেন। তার স্ত্রীর পূর্বে একটি বিবাহ হয়েছিল। সেই পূর্বের স্বামীর ঔরসে তার একটি মেয়ে আছে।
এখন আমার প্রশ্ন হল, এই মেয়েটি কি আমার মাহরাম হবে, নাকি তার সাথে আমার পর্দা করতে হবে? তদ্রূপ সে আমার বাবার জন্যও মাহরাম হবে কি না? আমার বংশের পুরুষদের মধ্যে তার মাহরামদের তালিকা দিলে অনেক উপকার হবে।
ওই মেয়েটি কেবল আপনার ভাইয়ের মাহরাম। কিন্তু আপনি, আপনার বাবা– কেউই তার মাহরাম নন। কেননা সে আপনার ভাইয়ের সন্তান নয়; বরং তার স্ত্রীর আগের স্বামীর ঔরসজাত সন্তান। তাই মেয়েটির সাথে আপনাদের পর্দা করা জরুরি। শুধু নিজ স্ত্রীর সন্তান হিসেবে আপনার ভাই তার সাথে দেখা দিতে পারবে।
শেয়ার লিংক–সূরা নিসা (৪) : ২৩; কিতাবুল আছল ১০/১৮২, ১৮৫; শরহু মুখতাসারিল কারখী, কদূরী ৩/৩৮৫; আলগায়াহ, সারুজী ১০/১৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪৬২; আদ্দুররুল মুখতার ৩/৩১
আমি একজনের সাথে একটি শেয়ার ব্যবসার চুক্তি করেছি। যেখানে আমি কম্পিউটার, কাগজ, কালি, দোকান ভাড়া– এসবের ব্যবস্থা করব। কম্পিউটার নষ্ট হলে সেটার দায়ভারও আমার। আর সে সারাদিন কম্পিউটার দিয়ে উপার্জন করবে। (লেমিনেটিং, কম্পোজ, ফটোকপি ইত্যাদি)। দিন শেষে যা লাভ আসবে, সেটা উভয়ের মাঝে সমান সমান ভাগ হবে। তো আমার ছেলে বলছে, এটা নাজায়েয।
তাই জানার ইচ্ছা, এই চুক্তিটি ঠিক আছে কি না? অন্যথায় ভিন্ন কোনো পন্থা আছে কি না?
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে দোকানটি পরিচালনা করতে গিয়ে যদি ওই লোকের সাথে আপনি কোনো কাজ না করার চুক্তি করে থাকেন, তাহলে এভাবে আপনার পক্ষ থেকে দোকানের সকল খরচ এবং এককভাবে ওই লোকের পক্ষ থেকে শ্রম দিয়ে শেয়ারে ব্যবসা করা এবং এর লভ্যাংশ উভয়ে বণ্টন করে নেওয়া সহীহ হবে না।
হাঁ, এক্ষেত্রে লোকটির সাথে আপনার নিজেরও যদি দোকানে কোনো ধরনের কাজে অংশগ্রহণের চুক্তি থাকে, তাহলে উক্ত পদ্ধতিতে চুক্তি করা এবং চুক্তি অনুযায়ী আনুপাতিকহারে লভ্যাংশ বণ্টন করা সহীহ হবে। তখন চুক্তিটি ফিকহের পরিভাষায় ‘শিরকাতুল আ‘মাল/তাকাব্বুল’ বলে বিবেচিত হবে। শিরকাতুল আ‘মালে আনুপাতিক হারে লভ্যাংশ বণ্টন করা সহীহ আছে।
কিন্তু আপনি যদি লোকটির সাথে দোকানে কোনো কাজই না করার চুক্তি করতে চান, তাহলে সেক্ষেত্রে সঠিকভাবে চুক্তি করার পদ্ধতি হল, আপনি দোকানের যাবতীয় খরচ বহন করে ওই লোককে আপনার দোকানের একজন কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেবেন এবং তার পারিশ্রমিক দোকানের অর্জিত আয়ের সাথে শর্তযুক্ত না করে নির্দিষ্টভাবে টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে নির্ধারণ করবেন। (যেমন ১০,০০০ টাকা অথবা আপনারা পরস্পর আলোচনা করে যত টাকা নির্ধারণে সম্মত হন)। তখন দোকানের লাভ-ক্ষতি যাই হবে, তা এককভাবে আপনার হবে। আর ওই লোক সর্বাবস্থায় তার নির্ধারিত পারিশ্রমিক পাবে। এভাবে চুক্তি করতে কোনো সমস্যা নেই।
শেয়ার লিংক* كتاب >الأصل< للشيباني ৪/১১৭ : وقال أبو حنيفة: لو أن رجلا دفع دابته إلى رجل يؤاجرها، على أن ما آجرها به من شيء فهو بينهما نصفين، كانت هذه الشركة فاسدة، والأجر كله لرب الدابة، وللرجل الذي آجر الدابة أجر مثله. وكذلك البيت والسفينة والبعير.
–আলমাবসূত, সারাখসী ১১/২১৯; খিযানাতুল আকমাল ৩/১৫৮; ফাতাওয়া সিরাজিয়া, পৃ. ৮৫; ফাতহুল কাদীর ৫/৪১১
আমি একজন গাড়ি চালক। আমার মালিক গাড়ি বিক্রি করার জন্য আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। তাই এর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করি। গাড়িটি এক লোকের পছন্দ হয় এবং সে আমাকে বলে, আমাকে ১০ হাজার টাকা দেবে এবং আমি যার মাধ্যমে ক্রয়কারী ব্যক্তিকে পেয়েছি তাকেও ১০ হাজার টাকা দেবে। তবে এসবের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। এবং সে বাস্তবেই যে টাকা দেবে তাও আমি বিশ্বাস করিনি।
ওই ভদ্রলোক গাড়ির দাম জিজ্ঞেস করলে আমি ২৫ লাখ টাকা চেয়েছিলাম। যদিও গাড়ির মালিক আমাকে আগেই বলেছিল ২৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিতে। তারপরও আমি ২৪ লাখের বেশিতে বিক্রি করার চেষ্টা করি। ভদ্রলোক ২৪ লাখ টাকা বলছিল। তখনও মালিক বলেছিল, দিয়ে দাও। আমি ভাবলাম, দেখি আরও কিছু বেশিতে বিক্রি করে দেওয়া যায় কি না। আমি নিজ থেকে উনাকে বললাম, ৩০ হাজার টাকা দেবেন। উনি রাজি হয়ে গেলেন।
আমি যে ৩০ হাজার টাকা বেশি চেয়েছি, এটা গাড়ির মালিককে বললে তিনি বলেন, তাহলে তোমারও লাভ হবে। মানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি আমাকে কোনো টাকা দেবেন।
পরে ওই ভদ্রলোক ২৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আমাকে ১০ হাজার টাকা দিল এবং যেই লোকের মাধ্যমে তাদেরকে পেয়েছিলাম সেই লোককেও ১০ হাজার টাকা দিল।
সম্মানিত মুফতী সাহেবের নিকট আমার জানার বিষয় হল–
১. আমার মালিক ২৪ লাখে গাড়ি বিক্রি করে দিত। তারপরও যে আমি ২৪ লাখের বেশিতে বিক্রি করার চেষ্টা করেছি, এতে কি আমি গাড়ি ক্রয়কারীর ওপর কোনো জুলুম করেছি?
২. গাড়ি ক্রয়কারী ব্যক্তি যে আমাকে ১০ হাজার টাকা দিলেন, তা গ্রহণ করার দ্বারা আমি গাড়ির মালিক অথবা গাড়ি ক্রয়কারী ব্যক্তির ওপর কি কোনো জুলুম করেছি?
৩. আমার গাড়ির মালিক গাড়ি বিক্রি শেষে আমাকে খুশি হয়ে কিছু টাকা দিয়েছে। এই টাকা গ্রহণ করা আমার জন্য কি বৈধ? এবং গাড়ির মালিক যে আমাকে টাকা দিয়েছে এই টাকা গ্রহণ করার দ্বারা গাড়ি ক্রয়কারী ব্যক্তির সাথে কি আমি কোনো প্রতারণা করেছি?
বিষয়গুলো জানানোর অনুরোধ রইল।
১. প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মালিক ২৪ লাখে গাড়িটি বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলার পর তা বেশি দামে বিক্রি করা দূষণীয় হয়নি। মালিকের বলে দেওয়া ২৪ লাখ আসলে সর্বনিম্ন মূল্য বোঝাচ্ছিল। এর চেয়ে বেশিতে বিক্রি করায় তার পক্ষ থেকে নিষেধ ছিল না।
আর আপনি গাড়িটি ২৪ লাখের বেশিতে বিক্রি করে ক্রেতার ওপর কোনো জুলুমও করেননি। কেননা ক্রেতা তো নিজে বুঝেশুনেই গাড়িটি ওই মূল্যে কিনে নিয়েছে। আপনি বেশি মূল্যে বিক্রির জন্য তার সাথে মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নেননি এবং এটি গাড়ির স্বাভাবিক মূল্য থেকে অনেক বেশিও নয়।
তাছাড়া অতিরিক্ত টাকা নিজে আত্মসাৎ করার জন্যও আপনি তা বিক্রি করে দেননি; বরং পূর্ণ মূল্য মালিককে দেওয়ার জন্যই করেছেন, তাই এতে অন্যায় কিছু হয়নি। আপনার জন্য এমনটি করা জায়েয হয়েছে।
২. যেহেতু আপনি নিজে গাড়ির মালিকের পক্ষেই কাজ করেছেন, ক্রেতাকে সুবিধা বা বাড়তি কোনো ছাড় দেননি, তাই গাড়ি ক্রয় শেষে ক্রেতা আপনাকে যে অর্থ প্রদান করেছে, তা-ও আপনার জন্য ভোগ করা জায়েয হবে।
৩. আপনি গাড়িটি বিক্রি করার পর গাড়ির মালিক খুশি হয়ে যে অর্থ আপনাকে দিয়েছেন সেটি গ্রহণ করা আপনার জন্য জায়েয। এতে সমস্যা নেই।
* >الفتاوى الخانية< ২/৩৬৩ : وإن طلب منه أن يسوي أمره، ولم يذكر له الرشوة، ثم أعطاه بعد ما سوى، اختلفوا فيه، قال بعضهم: لا يحل له أن يأخذه، وقال بعضهم: يحل، وهو الصحيح؛ لأنه بر ومجازاة الإحسان، فيحل.
–বাদায়েউস সানায়ে ৫/২৬; ফাতাওয়া বায্যাযিয়া ২/৪৭৭; ফাতহুল কাদীর ৬/৩৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ৫/৫২১; রদ্দুল মুহতার ৫/৩৬২
শেয়ার লিংক
আমি কুরবানীর উদ্দেশ্যে গ্রামের এক ব্যক্তি থেকে একটি গরু এবং একটি ছাগল কিনি। কিন্তু কুরবানীর আগের দিন ছাগলটি মারা যায়। তাই আমি শুধু গরু দ্বারাই কুরবানী করি।
মুফতী সাহেবের কাছে জানতে চাই, আমি তো ছাগলটি কুরবানীর উদ্দেশ্যেই কিনেছিলাম। কিন্তু মারা যাওয়ার কারণে তা দ্বারা কুরবানী করতে পারিনি। এতে কি কোনো অসুবিধা হয়েছে? আমার কি মারা যাওয়া ছাগলটির পরিবর্তে আরেকটি ছাগল কুরবানী করা জরুরি?
না, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মরে যাওয়া ছাগলটির পরিবর্তে আপনাকে আরেকটি কুরবানী করতে হবে না। কেননা একজনের ওপর কুরবানী কেবল একটিই ওয়াজিব। কেউ একাধিক পশু কুরবানী করলে একটি দ্বারা ওয়াজিব কুরবানী আদায় হয়, বাকিগুলো নফল হিসেবে গণ্য হয়।
অতএব প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ক্রয়কৃত ছাগলটি মারা গেলেও গরুটির কুরবানী দ্বারাই আপনার ওয়াজিব কুরবানী আদায় হয়ে গেছে। ছাগলের পরিবর্তে আরেকটি কুরবানী করা আবশ্যক নয়।
শেয়ার লিংক* >المحيط البرهاني< ৮/৪৮১ : اشترى شاتين للأضحية، فضاعت إحداهما، فضحى بالثانية، ثم وجدها في أيام النحر، أو بعد أيام النحر، فلا شيء عليه، سواء كانت هي أرفع من التي ضحى بها أو أدون منها.
–আলমুহীতুর রাযাবী ৬/৫৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৩
আমার জানার বিষয় হল, কুঁচে এবং ক্যাঙারু কি খাওয়া যাবে?
কুঁচে/কুঁচিয়া মাছের অন্তর্ভুক্ত। তাই তা খাওয়া নাজায়েয হবে না।
আর ক্যাঙারু হালাল প্রাণী। কেননা ক্যাঙারু তৃণভোজী একটি বন্য প্রাণী; গোশতভোজী বা হিংস্র নয়। নোংরা প্রাণীও নয়। ক্যাঙারুর পরিচিতি সম্পর্কে আধুনিক আরবী অভিধান معجم اللغة العربية المعاصرة-এ বলা হয়েছে–
حيوان نباتي يتغذى على الحشائش وأوراق الشجر، ينتشر في سهول أستراليا.
অর্থাৎ উদ্ভিদভোজী প্রাণী বিশেষ। যা তৃণলতা ও গাছের পাতা খায় এবং অস্ট্রেলিয়ার সমভূমিতে বিচরণ করে। (মু‘জামুল লুগাতিল আরাবিয়্যা আলমুআসিরা ৩/১৯৬৩)
এছাড়াও ‘ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা’, ‘আলমাওসূআতুল আরাবিয়্যা আলআলামিয়্যা’ এবং প্রসিদ্ধ আরবী অভিধান ‘আলমুনজিদ’-এর মধ্যে ক্যাঙারুর পরিচিতিতে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই হারাম বা নাজায়েয হওয়ার কোনো কারণ এই প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায়নি। সুতরাং তা খেতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো অসুবিধা নেই।
শেয়ার লিংক* كتاب >الأصل< للشيباني ৫/৩৯৪ : قلت: أرأيت المارماهيج وما أشبهه من السمك والجري، هل ترى بأكله بأسا؟ قال: لا بأس بأكله.
* >البناية شرح الهداية< ১৪/৩৩৭: الجريث: السمك السود، والمارماهي: السمكة التي تكون في صورة الحية.
–আলমাবসূত, সারাখসী ১১/২২০; আলমুহীতুর রাযাবী ৬/২৭-৩১; বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৪৪, ১৫১, ১৫১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৮৯; মাজমাউল আনহুর ৪/১৬৩; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩০৭
আমাদের দেশে হিন্দু বা অন্যান্য বিধর্মীদের পূজার মণ্ডপ বা উপাসনালয় পাহারা দেওয়া বৈধ, নাকি অবৈধ? শরীয়তের আলোকে সমাধান চাই।
মুসলিম দেশের সরকারের দায়িত্ব হল, দেশের নাগরিক হিসেবে বিধর্মীদের নিরাপত্তা প্রদান করা। তাই নিরাপত্তার প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো মুসলিম সদস্যের যদি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পূজামণ্ডপে কিংবা বিধর্মীদের কোনো অনুষ্ঠানে পাহারার ডিউটি পড়ে, তাহলে সেখানের লোকজনের নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে ডিউটি করা তার জন্য জায়েয হবে। অনুরূপভাবে যদি দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে, সে সময় দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এবং প্রাণহানি বা সংঘাতমূলক কাজকর্ম ঠেকানোর স্বার্থে প্রয়োজনে সাধারণ জনগণও স্বেচ্ছায় এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্তাবলির প্রতি পূর্ণ লক্ষ রাখা আবশ্যক।
ক. বিধর্মীদের ধর্মীয় কাজে সহযোগিতার নিয়ত করা যাবে না।
খ. তাদের ধর্মীয় কোনো কাজে অংশগ্রহণ করা যাবে না।
গ. পূজামণ্ডপে উৎসর্গিত খাবার খাওয়া যাবে না।
উপরিউক্ত সমস্যাগুলো ছাড়া শুধু উৎসাহী হয়ে অথবা স্বপ্রণোদিত সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিধর্মীদের উপাসনার অনুষ্ঠানে যাওয়া, তাদের উপাসনালয় পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া– কোনো কিছুই জায়েয নয়।
শেয়ার লিংক–কিতাবুল হুজ্জাহ, ইমাম মুহাম্মাদ ২/৪৯৪; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, বর্ণনা ১৮৮৬২; মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ১৬০৯; আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ৩/৮৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৪৬; কেফায়াতুল মুফতী ১৩/১৬৪