রবিউল আউয়াল ১৪৪৮   ||   সেপ্টেম্বর ২০২৬

রবিউল আউয়াল এলে...

মাওলানা মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব

রবিউল আউয়াল এলে পুরো পৃথিবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নতুন করে স্মরণ করে। নবীজীবনী চর্চা করে। নবীজীকে নিয়ে ভাবে। নববী আদর্শের কথা বলে। মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের জলসার আয়োজন হয়। পত্রিকাগুলো সুন্দর সুন্দর বাক্যে রঙিন হয়ে ওঠে। আলোচকদের মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথার ঢেউ খেলে যায়। আনন্দে-আবেগে সবার হৃদয়জগৎ হয়ে ওঠে টইটম্বুর।

এসবই হয় তাঁর প্রতি মহব্বত, গভীর ভালবাসা, সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও আকুল ভক্তিতে। তিনি যে সবার আবেগের কেন্দ্রভূমি— সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

কিন্তু তাঁর আলোচনা কেবল এই কয়েকটি জলসায়, উপলক্ষ্যের দু-চারটি আয়োজনে, আলো ঝলমল কয়েকটি মাহফিলে, ছোট-বড় কিছু রচনায় কিংবা কয়েকটি বয়ানেই সীমাবদ্ধ রাখলে হয়! এতেই কি তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রকাশ পায়! এইটুকু মহব্বতই কি যথেষ্ট মনে হয়! তাঁর প্রতি মহব্বতের দাবি তো আরও অনেক বেশি। তাঁর প্রতি সম্মান, আবেগ ও অনুরাগ প্রকাশের দিক তো প্রচুর।

তাঁর প্রতি সত্যিকার মহব্বত ও সম্মানের দাবি তো হল, সঠিক আকীদা, সহীহ ইলম ও পূর্ণ আনুগত্যে হৃদয়-গভীরে তাঁর আলোচনা জাগরূক রাখা। আমল ও ইবাদতে, আখলাক ও চরিত্রে, আচরণ ও উচ্চারণে, চিন্তা ও চেতনায় এবং ভাব ও ভাবনায় তাঁকে স্মরণ করা। জীবন ও জগতের সকল বিষয়ে একমাত্র তাঁকেই অনুসরণ করা। তাঁর অনুকরণই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া।

সেইসঙ্গে এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা ইসলামী আদর্শ, দ্বীনী শিক্ষা, ঈমানী জযবা, প্রকৃত সভ্যতা ও বিশুদ্ধ সংস্কৃতিতে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উত্তীর্ণ হবে। যারা পূর্বসূরিদের সেই ইলমের উত্তরাধিকার গ্রহণ করবে, যার সামনে পাশ্চাত্যের সকল জাতি-গোষ্ঠী নতি স্বীকার করেছে। সকল জ্ঞান ও যোগ্যতা, সকল প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য এবং উত্তরাধুনিক সকল সভ্যতা যার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছে।

মহব্বত প্রকাশের কয়েকটি দিক

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের মহব্বত প্রকাশের একটি দিক হল, আমরা কুরআন মাজীদকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরব। কুরআনের নূর ও আলো গ্রহণ করব। কুরআনের ইলম ও বরকত হাসিল করব। সেখান থেকে হেদায়েত ও নির্দেশনা নেব। কুরআনের মাধ্যমে দলীল ও প্রমাণ পেশ করব। কুরআনকে আমাদের সকল বিষয়ে ফয়সালাকারী এবং সকল অঙ্গনের শিক্ষক হিসেবে বরণ করব। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন— তথা ক্ষুদ্র-বৃহত্তর সর্বপরিসরে কুরআনের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেব। কুরআনের আদেশ পালন করব। তার নিষেধকৃত বিষয়সমূহ পরিহার করব। তার হুকুম পালনে ত্রুটি করব না। তার হুকুমকে কোনো ক্ষেত্রেই ডিঙিয়ে যাব না।

নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করব। সকাল-সন্ধ্যা কুরআন নিয়ে বসব। তার অন্তঃস্থ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা আহরণ করব। তাতে নিহিত উপদেশ ও শিক্ষামালা থেকে উপকৃত হব। নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু-বান্ধব ও অধীনদের কুরআন শেখাব কিংবা তাদের জন্য কুরআন শেখার ব্যবস্থা করব। অন্তত কুরআন শিখতে উৎসাহিত করব। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করব। কুরআন থেকে আহরিত বাণী তাদেরকে শোনাব। কুরআনের শিক্ষা তাদের সামনে পেশ করব। সর্বত্র কুরআনের আলো বিতরণ করব। কুরআনময় জীবন গড়তে সহায়ক হব।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রকৃত সম্মান ও মহব্বত প্রকাশের আরেকটি দিক হল, আমরা তাঁর সুন্নাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করব। তাঁর সুন্নাহ যে কুরআনেরই ব্যাখ্যা— সেই আকীদা পোষণ করব। নূর ও কল্যাণে ভরা তাঁর জীবনচিত্রকে হৃদয়পটে এঁকে যাব। আবেগ ও অনুরাগে, ভক্তি ও ভালবাসায়, আগ্রহ ও উৎসাহে তাঁর প্রতিটি বাণী ধারণ করব। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ও নির্দেশনা জানতে উন্মুখ হয়ে থাকব। অনুসরণের কোনো দিক এবং অনুকরণের কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা প্রকাশ করব না। তাঁর জীবন চরিত্রকে অনুধাবন ও গ্রহণ করার মানসে পাঠ করব। সেখান থেকে হেদায়েত ও নির্দেশনা, ইলম ও আমল, ত্যাগ ও অবিচলতার শিক্ষা গ্রহণ করব।

সেইসঙ্গে নিজের পরিবেশ ও  প্রতিবেশ, ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন, সমশ্রেণি ও সমকালীন— সকল পরিমণ্ডলে এবং সাধ্য ও সুযোগের সর্বোচ্চ সীমানাজুড়ে তাঁর সুন্নাহ বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। জীবন ও জগতের প্রকৃত সফলতা যে এতেই নিহিত— এ বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে দেব। হতাশা, দুর্দশা, দুর্ভোগ ও দুর্বিপাক থেকে মুক্তির যে এটিই পথ— সেকথা তুলে ধরব।

এরপর মহা সৌভাগ্যের অধিকারী তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিত ও তাঁদের ঘটনাবলি অধ্যয়ন করব। সেখান থেকে শিখব আনুগত্য কেমন হয়? অনুসরণ ও অনুকরণের প্রকৃত রূপ কী? শিখব দ্বীন পালনে ও প্রচারে কীভাবে কষ্ট সহ্য করতে হয়। কীভাবে কঠোর নির্যাতনকেও বরণ করে নিতে হয়। শিখব— কীভাবে আল্লাহর রাস্তায় তাঁর রাসূলকে সহায়তা করতে হয় এবং কীভাবে দ্বীন যিন্দা করার উদ্দেশ্যে জান-মাল বিলিয়ে দিতে হয়। কীভাবে আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে সফলতায় পৌঁছতে হয় এবং কীভাবে আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ করতে হয়। শিখব— কীভাবে দুনিয়ার ওপর আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে হয় এবং কীভাবে শরীয়তের বিধানাবলি শিরোধার্য করতে হয়।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিতে রয়েছে জীবনের সকল বিষয়ের সুষ্পষ্ট বিবরণ। আলোকদীপ্ত ধারা। রয়েছে জীবন গঠন ও পরিচালনার এবং উম্মতের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনা। রয়েছে দুনিয়াবী জীবনে আগত সকল বিপর্যয় ও সংকট নিরসনের ব্যবস্থা এবং সত্য উদ্ঘাটন ও সঠিক পথের সন্ধান লাভের পরিপূর্ণ সহায়তা।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রকৃত সম্মান ও মহব্বত প্রকাশের আরেকটি দিক হল, আমরা ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলোর সঙ্গে তার চিরস্থায়ী জীবনব্যবস্থাকেও মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরব। ইসলামের যৌক্তিক ও বোধগম্য বিষয়গুলোর সঙ্গে তার হেকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়সমূহকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জীবনব্যবস্থা পেশ করেছেন, তার পুরোটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে পেশ করেছেন। এ জীবনব্যবস্থা-ই আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবনব্যবস্থা। এ জীবনব্যবস্থা-ই পূর্ণাঙ্গ, নিখুঁত, নিপুণ ও সর্বব্যাপী কল্যাণময়। যুগ যুগের বাস্তবতা এ জীবনব্যবস্থারই কার্যকরিতা ও সফলতা স্বীকার করেছে। এ জীবনব্যবস্থা মেনেই পৃথিবীতে সর্বোচ্চ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ জীবনব্যবস্থা-ই মানুষকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। মানুষের মাঝে তৈরি করে সঠিক বোধ ও বিবেচনা, ন্যায়-নীতি ও নিষ্ঠা, পবিত্র মন ও মানসিকতা এবং উন্নত রুচি ও মনোভাব। এ জীবনব্যবস্থা-ই মানুষকে অব্যাহত সাধনা ও সুদৃঢ় বিশ্বাসে বলীয়ান করে তোলে। গড়ে তোলে অন্য সব মানুষের তুলনায় অনন্য করে। ফলে সেই ব্যক্তি কিছুতেই তার ঈমানী সত্তাকে হারায় না। প্রবৃত্তির চাপে কিংবা কোনো প্ররোচনায় সে কখনোই বিগলিত হয় না। লোভ-লিপ্সায় প্রভাবিত হয় না। রং বদলায় না কোনো দলীয়পনায়। জাতিগত কিংবা শ্রেণিগত কোনো উত্তেজনায় সে পরাভূত হয় না। কোনো শ্লোগান, মতবাদ আর চিন্তা-দর্শন তাকে বিশুদ্ধ আকীদা থেকে সরাতে পারে না। সে হকের সহায়তায় থাকে সদা ব্যাপৃত। এর সমর্থনে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। হক যিন্দা করা এবং তার মর্যাদা রক্ষার জন্য সে জীবন বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না। এক্ষেত্রে কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্মান ও মহব্বত প্রকাশের আরেকটি দিক হল, মুসলিম যুবক তার মর্যাদাপূর্ণ ইতিহাস জানবে; সে ইতিহাস নিয়ে গর্ব করবে। গর্ব করবে তার উত্তম পূর্বসূরিদের নিয়ে। নিজেকে সে নিয়োজিত করবে উম্মতের ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার সাধনায়। পৃথিবীর ইতিহাসে রচনা করবে সম্মান, মর্যাদা ও গৌরবের নতুন অধ্যায়। দ্বীনের মর্যাদায় সে তার মাথা উঁচু করবে, যে দ্বীন মানবতাকে উঁচু করেছে; সমুন্নত করেছে মূর্খতার নিম্নতা থেকে জ্ঞানের উচ্চতায়। এরপর তাকে দেখিয়েছে স্থায়ী সৌভাগ্যের পথ আর দিয়েছে অভিজাত সভ্যতার নির্দেশনা।

কুরআনের ভাষায়—

وَمَنْ اَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَاۤ اِلَي اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَّ قَالَ اِنَّنِيْ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ.

তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি আনুগত্য স্বীকারকারীদের একজন। —সূরা হা-মীম সাজদা (৪১) : ৩৩

আহ্বান ও মিনতি

অবশেষে উম্মতের সকল সদস্যের প্রতি আহ্বান, তারা যেন ইসলামকে আরও আপন করে নেন। ইসলামকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেন। ইসলামের সাথে আরও ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। ইসলামকে প্রকৃত অর্থেই ভালবাসেন এবং ইসলামের বিধিবিধান ও শিক্ষা-নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেন আরও গভীরভাবে অনুসরণ করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে মিনতির হাত প্রসারিত করছি, তিনি যেন এই উম্মতকে সেই তাওফীক নসীব করেন এবং তাদেরকে সর্বাবস্থায় তাঁর অভিমুখী রাখেন। তিনি যেন এই উম্মতকে এমন আমলের তাওফীক দান করেন, যা তাদের হারানো নেতৃত্বকে ফিরিয়ে আনবে এবং সেই নেতৃত্বকে করবে কল্যাণময়, বরকতময় ও স্থায়ী। যে আমলের মাধ্যমে এ উম্মত লাভ করবে তাদের রবের সন্তুষ্টি ও সাহায্য। নিশ্চয় আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়াদানকারী, দয়ালু প্রার্থনাস্থল।

[শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. ও শায়েখ আহমাদ ইযযুদ্দীন আলবায়ানূনী রাহ. কর্তৃক রচিত ‘কাবাসাত মিন নূরিন নুবুওয়াহ’ অবলম্বনে]

 

 

advertisement