‘তারপর কোনটা ছাড়বেন?’
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর একজন মুরীদ, যিনি মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। মাদরাসার ইজতেমায়ী পরিবেশে তার কিছু অসুবিধা হয়। এমতাবস্থায় তার চিন্তা এসেছে, তিনি আর মাদরাসায় পড়াবেন না, অন্য কোনো কাজ করবেন।
থানভী রাহ.-এর কাছে পুরো বিষয়টি জানিয়ে তিনি চিঠি লিখলেন। মনস্থির করলেন, থানভী রাহ. ইজাযত দিলে তিনি মাদরাসা ছেড়ে দেবেন।
কিন্তু থানভী রাহ. তার চিঠির উত্তরে লিখলেন, ফের ক্যায়া ছোড়ে গে?
যার মর্ম হল, মাদরাসা ছেড়ে দেওয়াটাই সমাধান না। আসল সমাধান যাতে, সেটা খুঁজে দেখতে হবে এবং তার ফিকির করতে হবে। মাদরাসা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো কাজে লেগে গেলেন, সেখানেও যখন একই অসুবিধা দেখা দেবে, তখন কী করবেন! কোথায় যাবেন!
হাকীমুল উম্মত সত্যিই উম্মতের ‘হাকীম’ ছিলেন। সমস্যার গোড়াটা তিনি ধরে ফেলতে পারতেন। এটি আমাদের একটি পুরোনো সমস্যা। কোথাও কোনো সমস্যা বা সংকট দেখা দিলে প্রথম চিন্তাটাই আসে, এ জায়গা ছেড়ে দিই। সমস্যার মূল সূত্রটি খুঁজে দেখার চেষ্টা করি না। শুরুতেই পরিবেশকে দুষতে থাকি।
একবারও ভাবি না যে, সমস্যার মূল তো আমিও হতে পারি, আমার কোনো স্বভাব ও চরিত্রও হতে পারে! আমার কোনো অযোগ্যতাও তো হতে পারে। যে-কোনো সাধারণ পরিবেশে স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা ধরে রাখতে না পারার দুর্বলতাও হতে পারে।
সুতরাং পরিবেশ আমি যতই পাল্টাই, স্বভাবটা যদি আমার অপরিবর্তিতই থেকে যায়, পৃথিবীর সকল ভালো পরিবেশেই আমি বাধার মুখে পড়ব। একেক জায়গার বাধা একেক শিরোনামে সামনে আসবে।
আব্বাজান হযরত মাওলানা আবদুল হাই পাহাড়পুরী রাহ.-এর একটি কথা মনে পড়ল। আব্বার একজন শাগরেদ, তালেবে ইলমির যামানায় তার একবার বিয়ে করার সাধ জেগেছিল, তিনি বিয়ে করবেন। এমনকি তার কথা হচ্ছে, এখন বিয়ে করতে না পারলে তিনি গোনাহে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে আছেন। এক প্রকার সিদ্ধান্তই নিয়ে নিলেন, বিয়েটা সেরেই ফেলবেন।
‘পড়াশোনা ফরয না, দ্বীন ঈমান বাঁচানো ফরয’ এমন একটি ‘পরম নেক চিন্তায়’(!) তিনি পুরোপুরি আক্রান্তও হয়ে গেলেন। আল্লাহর রক্ষা, শেষ পর্যন্ত তিনি পাহাড়পুরী হুজুরের কাছে গেলেন। হুজুর সব শুনে তাকে এককথায় নিষেধ করে দিলেন। বলে দিলেন, এখন বিয়ে-শাদির কোনো ফিকির করা যাবে না, সোজা গিয়ে পড়াশোনায় মন দাও।
এমনভাবে বললেন যে, সুখময় কল্পনার বিস্তীর্ণ জগৎ থেকে বিয়ের চিন্তা এমনভাবে উধাও হল, দাওরায়ে হাদীস শেষ করা পর্যন্ত এ চিন্তা আর কোনোদিন তাকে পেরেশান করেনি।
এ ঘটনা আজ থেকে কম করে হলেও চল্লিশ বছর আগের। সেই তালেবে ইলম এখন অনেক বড় আলেম। ইলমে দ্বীনের মেহনতের সাথে লেগে আছেন। তিনি সেদিন শোনাচ্ছিলেন তার গল্প।
শোনানোর সময় তিনি অনেক আবেগী ছিলেন। কণ্ঠে ছিল একজন বিচক্ষণ ও সুদূর দৃষ্টির অধিকারী মুরব্বী ও মুসলিহের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের গভীর সুর।
তখন যদি তিনি বিয়ে করতেন, তিনিই বললেন, পড়াশোনা তার হত না। আর হয়তো হত না সে উদ্দেশ্য পূরণও, যার জন্য তিনি বিয়ে করতে অমন উদ্গ্রীব ছিলেন।
এ কথা ঠিক যে, কখনও ছাড়তে হয় বস্তু, কখনও বদলাতে হয় পরিবেশ। কিন্তু সেটি কখন? যখন আর কোনো উপায় থাকে না। সত্যিই এ পরিবেশে নিজেকে ঠিক রাখা যাচ্ছে না। যে বস্তুটি অনুপযোগী মনে করে ছেড়ে দিতে চাচ্ছি, বাস্তবেই এটি কোনোভাবেই আমার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না কিংবা কোনোভাবেই পারছি না নিজেকে ঠিক রাখতে।
কিন্তু সিদ্ধান্তটি স্থির করবে কে? প্রয়োজন সমঝদার ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের। এমনই মানুষ ছিলেন হযরত হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.।
হযরত আমীনুত তালীম ছাহেব দা. বা.-এর যবানে যখন থানভী রাহ.-এর এ গল্পটি শুনলাম, সেই থেকে মাথায় ঘুরছে কথাগুলো। এরপরও একাধিকবার এসেছে এমন পরিস্থিতি। ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয়েছে কোনো কোনো পরিবেশ। পরক্ষণেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণের একটি গায়েবি শক্তি কোথাও থেকে পেয়ে গেছি। আলহামদু লিল্লাহ আল্লাহর মেহেরবানীতে রক্ষা পেয়েছি।
জীবনের বাস্তবতায় এটি একটি মহান দর্শন। যুগে যুগে আল্লাহর নেক বান্দাগণ এ দর্শন কাজে লাগিয়েছেন। চট করে কোনো বস্তু বা পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে তারা বরং নিজেকে পাল্টেছেন। নিজের স্বভাব ও চরিত্র শোধরানোর ফিকির করেছেন। এভাবে তাদের জীবনে অনেক সুফল এসেছে, সাফল্য এসেছে। সবচেয়ে বড় সুফল ও সাফল্যের নাম হল ‘ইস্তেকামাত’।
এতক্ষণ যা কিছু বলা হল, এ মূলত একটি মূলনীতি। এ মূলনীতি অনুসরণ করে চলতে পারলে ‘ছাম্মা খায়ের —কল্যাণ এখানে নয়, ওখানে’-এর ব্যাধি থেকে চিরমুক্তি মিলবে। জীবনের অগণিত অস্থিরতা থেকে নাজাত পাওয়া সম্ভব হবে।
আল্লাহ তাআলা বোঝার তাওফীক দান করুন― আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।