মডার্নিজম
দ্বীনবিচ্ছিন্ন ‘মডার্নিটি’র মৌলিক বিচ্যুতি
[২০১৬ সালে পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটিতে হযরত শাইখুল ইসলাম দামাত বারাকাতুহুম Islam and The Challenges of Modernity শিরোনামে ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করেন। সেই বক্তৃতার অনুবাদ পাঠকের জন্য পেশ করা হচ্ছে। এতে যেসব উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে, অনুবাদে সেগুলোর উৎসে উল্লিখিত মূলপাঠ সামনে রাখা হয়েছে। শেষে তথ্যসূত্র ও সূত্রসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় টীকা যুক্ত করা হয়েছে। –অনুবাদক]
আজ আমার আলোচনার বিষয়– Islam and the Challenges of Modernity তথা ‘ইসলামবিচ্ছিন্ন আধুনিকতার ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি’।
এটি অনেক বিস্তৃত বিষয়। এর সব দিক সংক্ষেপে বলা বেশ কঠিন। এখানে আমি মডার্নিটি সম্পর্কে ইসলামের বুনিয়াদি চিন্তাগুলো এবং ইসলামবিচ্ছিন্ন আধুনিকপন্থার বিচ্যুতি ও মারাত্মক হোঁচট খাওয়ার জায়গাগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
মডার্নিটি বলতে কী বোঝায়?
আভিধানিক অর্থে মডার্নিটি বা আধুনিকতা ইসলামের জন্য চ্যালেঞ্জ নয়। (সহজ ভাষায়) দৈনন্দিন জীবনে উন্নতি আনা এবং নতুন কিছু আবিষ্কার করার নাম আধুনিকতা।
আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মানুষকে নিজের জীবন উন্নত করার, সমাজের সংস্কার সাধনের এবং নাগরিক কল্যাণে প্রশাসন ও যুদ্ধ সরঞ্জাম উন্নত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
খলীফায়ে রাশেদ উমর রা. প্রায় অর্ধজাহান শাসন করেছিলেন। তিনি সমাজে বড় ধরনের সংস্কার এনেছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুসারে তিনি নাগরিক জীবন ও সামরিক কাঠামোতে নতুন নতুন পদ্ধতি চালু করেছিলেন।
ব্ল্যাকআউট কৌশল
শুনলে আশ্চর্য হবেন, আজও যেসব যুদ্ধকৌশল (War Tactics) প্রচলিত আছে, তার কিছু খোদ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেই চালু হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ‘ব্ল্যাকআউট’ (Blackout) বা শত্রুর নজরদারি এড়াতে আলো নিভিয়ে রাখা যুদ্ধের একটি কার্যকরী কৌশল হিসেবে শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি আসলে চালু করেছিলেন প্রখ্যাত (সমরবিদ) সাহাবী আমর ইবনুল আস রা.।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে একটি যুদ্ধাভিযানে পাঠান। তাঁর বাহিনী ছিল খুব ছোট। তিনি সবাইকে রাতে আগুন জ্বালাতে নিষেধ করে দেন। পরে তাঁর অধীনে থাকা কয়েকজন এই ব্যাপারে নবীজীর কাছে অভিযোগ করেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারণ জিজ্ঞেস করলে আমর ইবনুল আস রা. বলেন–
يَا نَبِيَّ اللهِ، كَانَ فِي أَصْحَابِي قِلَّةٌ، فَخَشِيتُ أَنْ يَرَى الْعَدُوُّ قِلَّتَهُمْ، وَنَهَيْتُهُمْ أَنْ يَتَّبِعُوا الْعَدُوَّ مَخَافَةَ أَنْ يَكُونَ لَهُمْ مِنْ وَرَاءِ الْجَبَلِ كَمِينٌ.
قَالَ: فَأَعْجَبَ ذَلِكَ رَسُولَ اللهِ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
হে আল্লাহর নবী, (আমি তাদের আগুন জ্বালাতে নিষেধ করেছিলাম, কারণ) আমার সঙ্গে সৈন্যসংখ্যা ছিল অল্প। তাই আশঙ্কা করেছিলাম, শত্রুরা যদি আমাদের সংখ্যা স্বল্পতা দেখে ফেলে, (তাহলে তারা সাহস পেয়ে যাবে)। আর শত্রুদের পিছু ধাওয়া করতেও বারণ করেছিলাম এই ভয়ে যে, পাহাড়ের আড়ালে তাদের কোনো ওত পেতে থাকা বাহিনী থাকতে পারে।
বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (এই বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতায়) সন্তুষ্ট হলেন।(১)
ইসলাম কেবল নতুন হওয়ার কারণে যে-কোনো নতুন পদ্ধতির বিপক্ষে নয়
আমার মূল কথা হল– উন্নতি বা পরিবর্তনের জন্য নতুন পদ্ধতি, প্রযুক্তি (Technology) বা আবিষ্কার (invention) গ্রহণ করতে ইসলাম কখনোই নিষেধ করেনি। ইসলাম বরং সময় ও স্থানের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে গঠন করার কথা বলেছে।
যতক্ষণ আপনি সেই সীমার মধ্যে থাকবেন, যা আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট করে গেছেন– ততক্ষণ আপনার জন্য স্বাধীনতা আছে। সময় ও স্থানের বাস্তব প্রয়োজনে যা করণীয় মনে করবেন, তা শরীয়তের সীমারেখার আওতায় করার সুযোগ আছে। এ ধরনের আধুনিকতা সমস্যা নয়, কোনো প্রতিবন্ধকতাও নয়।
এ ধরনের আধুনিকতা গ্রহণযোগ্য না হলে মানুষ নতুন প্রযুক্তি ও নতুন আবিষ্কার গ্রহণ করতে পারত না। একসময় মানুষ ঘোড়া ও উটে চড়ত। এখন আমরা আধুনিক বাহন বিমান, মহাকাশযানে চড়ি। এতে দোষের কিছু নেই।
মডার্নিটির দার্শনিক পরিভাষা
আসল সমস্যা দেখা দেয়, যখন আমরা আধুনিকতার দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে চিন্তা করি। আগেই বলেছি, আধুনিকতা আভিধানিক অর্থের দিক থেকে সমস্যাজনক নয়। কিন্তু দার্শনিক পরিভাষা (Philosophical Term) হিসেবে এর অর্থ কী?
মডার্নিটির সংজ্ঞায় বলা হয়–
As a historical category, modernity refers to a period marked by a questioning or rejection of tradition; the prioritization of individualism, freedom and formal equality; faith in inevitable social, scientific and technological progress and human perfectibility; rationalization and professionalization; a movement from feudalism (or agrarianism) toward capitalism and the market economy; industrialization, urbanization and secularization; the development of the nation-state and its constituent institutions (e.g. representative democracy, public education, modern bureaucracy) and forms of surveillance.
একটি ঐতিহাসিক ক্যাটাগরি হিসেবে আধুনিকতা বলতে বোঝায় এমন এক যুগ, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হল–
ক. ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা প্রত্যাখ্যান করা;
খ. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, স্বাধীনতা ও আনুষ্ঠানিক সাম্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া;
গ. সামাজিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অনিবার্যতায় বিশ্বাস এবং মানুষকে প্রায় নিখুঁত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব– এমন বিশ্বাস;
ঘ. যৌক্তিকীকরণ ও পেশাদারিকরণ;
ঙ. সামন্তবাদ (বা কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা) থেকে পুঁজিবাদ ও বাজার অর্থনীতির দিকে উত্তরণ;
চ. শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও ধর্মনিরপেক্ষকরণ;
ছ. জাতি-রাষ্ট্র ও তার অন্তর্গত প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, গণশিক্ষা, আধুনিক আমলাতন্ত্রের) বিকাশ এবং নজরদারির নানা রূপ।(২)
এটি আমাদের সময়ে প্রচলিত সংজ্ঞা। এই সংজ্ঞাটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
সংজ্ঞার বিশ্লেষণ
প্রথম উপাদান : বলা হয়েছে, একটি দার্শনিক পরিভাষা হিসেবে আধুনিকতা প্রথমেই ঐতিহ্যের ওপর প্রশ্ন তোলে বা তা প্রত্যাখ্যান করার কথা বলে।
কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া সব ধরনের ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এর মানে– নিরেট আধুনিকতা এবং ঐতিহ্য একসঙ্গে থাকতে পারে না। যদি আপনি আধুনিকতার সবটা গ্রহণ করেন, তাহলে ঐতিহ্য ছাড়তে হবে।
দ্বিতীয় উপাদান : ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রাধান্য দেওয়া। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতা অনুযায়ী কাজ করবে।(৩)
তৃতীয় উপাদান : স্বাধীনতা ও আনুষ্ঠানিক সমতা।(৪)
চতুর্থ উপাদান : মানুষের উৎকর্ষসাধনের অনিবার্যতায় বিশ্বাস।
এর মানে, মানুষের যুক্তি-বুদ্ধি স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারও কাছ থেকে নির্দেশনা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকে নিজ ধারণা ও চিন্তা অনুযায়ী কাজ করবে, নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মনে করবে। সামাজিক বিষয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ (authority) তাকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে না।
পঞ্চম উপাদান : যৌক্তিকীকরণ (rationalization)। অর্থাৎ যুক্তি ও বুদ্ধির ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখা।(৫)
ষষ্ঠ উপাদান : সামন্তবাদ(৬) থেকে পুঁজিবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষকরণের(৭) দিকে অগ্রসর হওয়া।
এর অর্থ হল, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নির্দেশনা অনুসরণ না করে প্রতিটি বিষয়ে শুধু জাগতিক স্বার্থ বিবেচনায় চিন্তা করা হবে।
সপ্তম উপাদান : জাতি-রাষ্ট্র ও তার উপাদানগুলোর বিকাশ।
এটি হল বর্তমানে প্রচলিত সংজ্ঞা।(৮) এখানে আমরা দ্বীনবিচ্ছিন্ন আধুনিকপন্থার কয়েকটি মারাত্মক বিচ্যুতি তুলে ধরছি।
‘ নৈতিক সত্যের কোনো স্থান নেই’
ম্যাকিয়াভেলি (Niccolo Machiavelli, 1469-1527)(৯) একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক । তার দর্শন সম্পর্কে ডেভিড লিভিংস্টোন লিখেন–
As author of The Prince, Machiavelli was the father of the cynicism of ÔrealpolitikÕ. He openly rejected the medieval and Aristotelian style of analyzing politics by comparison with ideas about how things should be, in favor- of ÔrealisticÕ analysis of how things Ôreally areÕ.
In other words, he denied the perfectibility of the individual and society, suggesting instead that the corruption of society was the natural order.
To Machiavelli, man is selfish and brutal and must be constrained through an authoritarian leader who is not afraid to use force and deceit to ensure the perpetuation of his rule and the ÔgoodÕ of the community.
There are no higher moral truths. The desired ends, whichever they may be, as Machiavelli famously noted, justify the means.
‘দ্যা প্রিন্স’ গ্রন্থের রচয়িতা ম্যাকিয়াভেলিকে ‘বাস্তববাদী রাজনীতির নৈরাশ্যবাদী ধারার জনক’ বলা হয়। তিনি মধ্যযুগীয় ও অ্যারিস্টটলীয় সেই রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেখানে রাজনীতিকে বিচার করা হত ‘কী হওয়া উচিত’– এই আদর্শিক ধারণার আলোকে। এর পরিবর্তে তিনি জোর দেন ‘বাস্তবে প্রতিটি বিষয় যেমন’– সেই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
অন্য ভাষায় বললে, ব্যক্তি ও সমাজ পরিপূর্ণ বা নৈতিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে তিনি অস্বীকার করেন। তার মতে, সমাজের দুর্নীতি ও অবক্ষয়ই হল স্বাভাবিক অবস্থা।
ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে মানুষ স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর; তাই সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এমন কর্তৃত্ববাদী শাসক প্রয়োজন, যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং সমাজের কথিত ‘মঙ্গল’ নিশ্চিত করতে বলপ্রয়োগ ও প্রতারণা করতেও দ্বিধা করবে না।
এখানে কোনো উচ্চতর নৈতিক সত্যের স্থান নেই। ম্যাকিয়াভেলির বহুল আলোচিত ধারণা অনুযায়ী, কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবহৃত উপায় –সেটি যেমনই হোক– তা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়।(১০)
‘আমাদের কর্মের অর্ধেক ভাগ্যের হাতে আর অর্ধেক আমাদের হাতে’!
ম্যাকিয়াভেলি নিজে বলেন–
...Nevertheless, not to extinguish our free will, I hold it to be true that Fortune is the arbiter of one-half of our actions, but that she still leaves us to direct the other half, or perhaps a little less.
...তবে আমি আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে সম্পূর্ণ নেভাতে চাই না বলেই মনে করি যে, সত্য কথা এটাই– ভাগ্য আমাদের কর্মের প্রায় অর্ধেকের নিয়ন্ত্রক, কিন্তু বাকি অর্ধেক বা তার কিছু কম ভাগ্য আমাদের নিজেদেরই পরিচালনা করতে দেয়।()
‘চিরসত্য বলে কিছু নেই’!
দার্শনিকরা স্বীকার করেছেন– মডার্নিটি বা আধুনিকতার অন্যতম পরিণতি হল চূড়ান্ত সত্যের অভাব। আসলে এটি আধুনিকতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
২০০৬ সালে দার্শনিক জেরার্ড ডেলান্টি (Gerard Delanty, 1960-present)(১২) বলেন–
The cosmopolitan imagination can arise in any kind of society and at any time but it is integral to modernity, in so far as this is a condition of self-problematization, incompleteness and the awareness that certainty can never be established once and for all.
কসমোপলিটান কল্পনা (বিশ্বনাগরিক চিন্তা)(১৩) যে-কোনো সমাজে এবং যে-কোনো যুগেই জেগে উঠতে পারে। কিন্তু এটি আধুনিকতার (মডার্নিটির) অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ আধুনিকতা আসলে এমন মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ বারবার নিজেকে প্রশ্নের মুখে ফেলে(১৪), নিজেকে সব সময় অসম্পূর্ণ মনে করে(১৫) এবং এই গভীর সচেতনতায় পৌঁছায়– কোনো সত্য বা নিশ্চয়তা চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।(১৬)
‘আধুনিকতা হল সেই অভিজ্ঞতার নাম, যেখানে মানুষ নিশ্চয়তার বোধ হারিয়ে ফেলে’!
তিনি আরও বলেন–
The term cosmopolitanism signals a condition of self-confrontation, incompleteness; modernity concerns the loss of certainty and the realization that certainty can never be established once and for all.
কসমোপলিটানিজম বা বিশ্বনাগরিকতাবাদ শব্দটি আসলে এমন অবস্থার সিগন্যাল দেয়, যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের ভাবনা, নিজের অবস্থানের মুখোমুখি হয়, নিজেকে অসম্পূর্ণ জেনে এগোয়। আর আধুনিকতা হল সেই অভিজ্ঞতার নাম– যেখানে মানুষ নিশ্চয়তার বোধ হারিয়ে ফেলে(১৭) এবং এই গভীর উপলব্ধিতে পৌঁছায়– কোনো কিছুই চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।(১৮)
এটাই আধুনিকতার সেই ধারণা, যা বর্তমান যুগের দার্শনিকরা পেশ করেছেন। এ ধরনের আধুনিকতা এর আভিধানিক অর্থ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন (এবং ইসলামের আদর্শ ও নির্দেশনার স্পষ্ট বিরোধী), যেমনটি আমি শুরুতেই ব্যাখ্যা করেছিলাম।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)
টীকা
১. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ ৫/৫৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩৫৯১৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯৭০।
২. এগুলো যে আধুনিকতার প্রধান সব বৈশিষ্ট্য ও প্রকাশ, তা বাস্তব কথা। তবে অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তার ১৯৯৫ সালের প্রকাশিত রচনায় আধুনিকতার এই সংজ্ঞা দিয়েছেন। মূল উর্দু সংস্করণেও তাই ছিল।
কিন্তু এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়–
ক. মিশেল ফুকো মারা গিয়েছেন ১৯৮৪ সালে। ১৯৯৫ সালের মে মাসে ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন এ্যান্ড পানিশ: দ্যা বার্থ অফ দ্যা প্রিজন’ বইটির ইংরেজি অনুবাদের দ্বিতীয় সংষ্করণ বের হয়। মূল বই প্রকাশিত হয়েছিল ফুকোর জীবদ্দশায় ১৯৭৫ সালে। ইংরেজি অনুবাদের প্রথম সংষ্করণ বের হয় ১৯৭৭ সালে।
খ. আসলে এই উদ্ধৃতিটি এভাবে বহুল প্রচলিত– Foucault 1995, 170–77। অর্থাৎ, ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন এ্যান্ড পানিশ’ বইয়ের ১৭০-১৭৭ পৃষ্ঠায় আধুনিকতার এই সংজ্ঞা আছে। কিন্তু বইয়ের উল্লিখিত সংস্করণের উক্ত পৃষ্ঠাগুলোতে এমন কোনো কথা নেই।
গ. এখানে স্পষ্ট অসংগতি দৃশ্যমান। পাঠক দেখেছেন, সংজ্ঞাটি মাত্র কয়েক লাইনের। কিন্তু উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে ১৭০-১৭৭ মোট ৮ পৃষ্ঠার।
তাই প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, হয়তো উক্ত আট পৃষ্ঠার বিভিন্ন অংশ জুড়ে দিয়ে সংজ্ঞাটি তৈরি করা হয়েছে অথবা এই আট পৃষ্ঠার মর্মার্থ ও উদ্দেশ্য কেউ নিজের ভাষায় সাজিয়ে ফুকোর এই বইয়ের নামে যুক্ত করে দিয়েছে।
ঘ. কিন্তু এই দুটি সম্ভাবনার কোনোটিই এখানে বাস্তব নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, ফুকো এই সংজ্ঞা তৈরি করেননি, তার লেখা বইয়ের বিভিন্ন অংশ মিলিয়েও এটি প্রস্তুত করা হয়নি; বরং পরবর্তী কেউ নানানজনের লেখা ও দর্শনের আলোকে সংজ্ঞাটি প্রস্তুত করেছে।
তবে প্রস্তুতকারী তার সংজ্ঞায় মডার্নিটির অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার পর ‘ফর্মস অব সার্ভেইল্যান্স’ বা ‘নজরদারির নানা রূপ’-এর
কথাও বলেছে। আর এই শেষ পয়েন্টের জন্য ফুকোর বইটির উক্ত পৃষ্ঠাগুলোর উদ্ধৃতি যথাযথ, কারণ উক্ত পৃষ্ঠাগুলোতে ‘সার্ভেইল্যান্স’ সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনা আছে।
ফুকো মডার্নিটির বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় সহজেই তার নামে এই সংজ্ঞা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন আর্টিকেল ও ব্লগে দ্বিধাহীনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ঙ. সচেতন গবেষকরা ফুকোর বদলে উইকিপিডিয়ার মতো উন্মুক্ত অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ২০১৪ সালে নাইজেরিয়ার ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যান্ড আদার রিলেটেড অফেন্সেস কমিশন’-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার অ্যাট-ল একপো এনটা নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক উদ্বোধনী জনসভায় Governance and the Public Policy Process: Transforming Nigeria into a Truly Modern Society শিরোনামে বক্তৃতা করেন। পরবর্তীতে বক্তৃতাটি নাইজেরিয়ান সরকারের ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ ও প্রচার করা হয়।
সেখানে দেখা যায়, উক্ত সংজ্ঞাটি সরাসরি উইকিপিডিয়ার দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে–
Wikipedia, the world’s leading online dictionary, defines modernity as a historical category...
টীকায় উইকিপিডিয়ার ‘মডার্ন’ শব্দবন্ধের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয়, উইকিপিডিয়ার লেখা প্রতিনিয়ত আপডেট হতে থাকে। হয়তো উপযুক্ত প্রমাণ না পাওয়ায় বর্তমান সংস্করণে এই শব্দের অধীনে সংজ্ঞাটি আর রাখা হয়নি।
চ. সংজ্ঞার শব্দগুলো লক্ষ করলেও দেখা যায়– এটি ফুকোর সংজ্ঞা হওয়া সম্ভব নয়। দুটি উদাহরণ দেখুন–
* সংজ্ঞার প্রথম শব্দগুচ্ছই হল, as a historical category, modernity refers to a period ।
অর্থাৎ আধুনিকতাকে একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কাল বা পর্ব (বঢ়ড়পয) হিসেবে ধরা হয়েছে। অথচ ফুকো তার আধুনিকতা বিষয়ক স্বতন্ত্র রচনা What is Enlightenment? –এ এর ঠিক বিপরীত কথা বলেছেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আধুনিকতাকে প্রায়ই একটি যুগ বা একটি যুগের বৈশিষ্ট্যসমূহের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়, যেটা ক্যালেন্ডারে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো যায়। কিন্তু আধুনিকতাকে একটি attitude (মনোভঙ্গি) হিসেবে দেখা উচিত, ঐতিহাসিক পর্ব হিসেবে নয়। [Michel Foucault, ÔWhat Is Enlightenment?,Õ in Ethics: Subjectivity and Truth, vol. 1 of Essential Works of Foucault, ed. Paul Rabinow, trans. Robert Hurley et al. (New York: The New Press, 1997), 309.]
* নজরদারি, পুঁজিবাদ ও নগরায়ণ– এগুলোকে একসাথে প্রাতিষ্ঠানিক ডাইমেনশন হিসেবে আসলে এ্যান্থনি গিডেন্স হাজির করেছেন। গিডেন্স তার The Consequences of Modernity (1990) বইয়ে আধুনিকতার চারটি ডাইমেনশন নির্ধারণ করেন– পুঁজিবাদ, শিল্পায়ন, নজরদারি এবং সামরিক শক্তি।
গিডেন্স তৃতীয় ধারণাটির জন্য ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন এ্যান্ড পানিশ’ বইয়ের ধারণা ব্যবহার করেছেন ঠিকই, কিন্তু চার স্তরবিশিষ্ট গোটা কাঠামোটি তার নিজের বিশ্লেষণ। ফুকো আধুনিকতার সংজ্ঞা হিসেবে এমন তালিকা দেননি।
ছ. ফুকোর বই ও চিন্তা ব্যাখ্যা করে অনেকেই বিশদ বই লিখেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য কোনো লেখক সংজ্ঞাটি ফুকোর নামে উল্লেখ করেননি; বরং অনেক লেখক ও গবেষক ফুকোর বইয়ে থাকা এই প্রসঙ্গের ভিন্ন পাঠ উল্লেখ করেছেন। অথচ একই প্রসঙ্গে এত সাজানো-গোছানো কয়েক লাইনের সংজ্ঞা, যা বিষয়সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো পয়েন্টের সমষ্টি, তা স্পষ্টতই এড়িয়ে গেছেন।
কোনো কোনো লেখক এই সংজ্ঞার পর একই ধারায় মডার্নিটির পরিচয় ও ব্যাপ্তি নিয়ে আরও কিছু কথা উদ্ধৃত করেছেন, যার ভাষা ও টোন সম্পূর্ণ এক। এটিও ইঙ্গিত করে, আসলে এই পরিচিতিমূলক আলোচনা এনসাইক্লোপেডিক স্টাইলে লেখা কোনো সোর্স থেকে নেওয়া।
মূলে পুরো পাঠ দেওয়া হয়নি, বাংলায় সংশ্লিষ্ট পুরো অংশ দেওয়া হয়েছে এবং উক্ত অনুসন্ধান মোতাবেক সংজ্ঞাটি ফুকোর নামে উল্লেখ করা হয়নি।
৩. Individualism (ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ) : যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত অধিকারকে সামাজিক বা সমষ্টিগত স্বার্থের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রাচীন সমাজে যেখানে পরিবার, সম্প্রদায় বা জাতি গোষ্ঠীর প্রাধান্য ছিল, আধুনিকতায় ব্যক্তি সেইসবের ঊর্ধ্বে স্থান পায়। আধুনিকতা মনে করে, মানুষ ঐতিহ্যের অনুসরণের বদলে নিজস্ব ‘যুক্তি’ দিয়ে জীবন পরিচালনা করবে।
৪. Formal Equality (আনুষ্ঠানিক সাম্য) : এটি রাষ্ট্র ও আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান মর্যাদার ধারণা। এটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বিশেষাধিকার অস্বীকার করে।
এর অর্থ এই নয় যে, সবাই আর্থ-সামাজিকভাবে সমান; বরং এর অর্থ হল আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকবে না; ব্যক্তির পরিচয় নির্ভর করবে তার চরিত্র ও কর্মের ওপর, পূর্বনির্ধারিত সামাজিক স্তরবিন্যাসের ওপর নয়।
কিন্তু ‘আধুনিক’ বিশ্বে নানা স্তরের বৈষম্যকে জাস্টিফাই করার প্রবণতা বেড়েই চলছে এবং এই ‘সাম্যে’র সুযোগ নিয়ে বহু পথভ্রষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বৈষম্য করছে।
৫. Rationalization (যৌক্তিকীকরণ) : যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির প্রাধান্য। এতে ঐতিহ্য, ধর্ম ও আবেগের পরিবর্তে যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৬. Feudalism (সামন্তবাদ) : মধ্যযুগীয় ইউরোপের একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। এই ব্যবস্থায় ভূমিই ছিল ক্ষমতা ও সম্পদের মূল উৎস। সমাজ ছিল কঠোর স্তরবিন্যাসে বিভক্ত– রাজা, অভিজাত যোদ্ধা ও ভূমিদাস; যেখানে ভূমিদাসরা জমির মালিক প্রভুর প্রতি আনুগত্য ও কর্তব্যে আবদ্ধ থাকত।
আধুনিকতা এই বংশগত মর্যাদাভিত্তিক ও কৃষিনির্ভর কাঠামো ভেঙে বুর্জোয়া, গণতন্ত্র ও শিল্পায়নের জোয়ার নিয়ে আসে।
৭. Secularization (ধর্মনিরপেক্ষকরণ) : এটি সেই প্রক্রিয়া, যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় প্রতীকগুলো ব্যক্তি ও সমাজজীবনের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে সংকীর্ণ গণ্ডিতে অবস্থান নেয়।
আধুনিকতায় রাষ্ট্র ও আইন ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং যুক্তি ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কাজেই ব্যক্তির নৈতিকতা ও পরিচয় কেবল ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত না হয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হয়ে ওঠে, যা প্রতিটি মানুষের পাবলিক ও প্রাইভেট জীবনের স্পষ্ট বিভাজন তৈরি করে। ব্যক্তিজীবনে ধর্ম পালনে সচেষ্ট হলেও পাবলিক জীবন তথা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানুষ সেক্যুলার বা ধর্মবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৮. সংজ্ঞায় ব্যবহৃত বাকি পরিভাষাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হচ্ছে–
ক. Professionalization (পেশাদারিকরণ) : এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো কাজ বিশেষায়িত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংগঠিত ও পরিচালিত হয়।
খ. Industrialization (শিল্পায়ন) : এটি সেই রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া, যা কৃষি ও হস্তশিল্পভিত্তিক অর্থনীতি থেকে যন্ত্রচালিত কারখানা ও ব্যাপক উৎপাদনের অর্থনীতির উদ্ভব ঘটায়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন এর মূল বৈশিষ্ট্য।
গ. Urbanization (নগরায়ণ) : শিল্পায়নের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে গ্রাম থেকে শহরে ব্যাপক জনসংখ্যার স্থানান্তর এবং নগরকেন্দ্রিক জীবনধারার প্রসারই হল নগরায়ণ।
এটি কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; বরং এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা; যেখানে পূর্বের ঘনিষ্ঠ গ্রামীণ বন্ধন ভেঙে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলকারখানা, প্রশাসন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নগরই আধুনিক সভ্যতার প্রধান ক্ষেত্র।
ঘ. Modern Bureaucracy (আধুনিক আমলাতন্ত্র) : বৃহৎ সংগঠন, সরকার বা কোম্পানি পরিচালনার নিয়মভিত্তিক ও শ্রেণিবদ্ধ (hierarchical) প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ, লিখিত নিয়ম, দপ্তরভিত্তিক কাজ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়।
তবে আমাদের দেশে আমলাতন্ত্রের এই কেতাবি রূপ বহু বছর আগ থেকেই নষ্ট করা শুরু হয়েছে।
ঙ. Forms of Surveillance (নজরদারির নানা ধরন) : সংগঠন বা রাষ্ট্রের দ্বারা ব্যক্তি বা কর্মীর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে ংঁৎাবরষষধহপব বলা হয়।
এখন তো সরকার ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নজরদারির বহু ধরন ও উপকরণ প্রয়োগ করছে।
৯. মূলে ম্যাকিয়াভেলির নামে এই বক্তব্যটি উল্লেখ করা হয়েছে–
The aim of politics is to control one’s own chance and fortune and that relying upon providence actually leads to evil.
‘রাজনীতির লক্ষ্য হল নিজের সুযোগ ও ভাগ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আর খোদায়ী বিধানের ওপর নির্ভরশীলতা আসলে মানুষকে মন্দের দিকে ঠেলে দেয়।’
কিন্তু কোনো উদ্ধৃতি দেওয়া হয়নি। বাস্তবে ম্যাকিয়াভেলির কোনো বইয়ে এমন বক্তব্যের দেখা মেলে না। তিনি মারা গিয়েছেন ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে, লিখেছেন ইটালিয়ান ভাষায়। তার বিখ্যাত বই ‘দ্যা প্রিন্স’-এর একাধিক ইংরেজি অনুবাদ আছে। মূল ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে সেগুলোর মাঝে পার্থক্য থাকলেও উক্ত কথাটি কোনো অনুবাদ সংস্করণেই পাওয়া যায়নি।
গত শতকে লিও স্ট্রস (১৮৯৯-১৯৭৩) ‘থটস অন ম্যাকিয়াভেলি’ বইয়ে (১৯৫৩ সালে প্রকাশিত) ম্যাকিয়াভেলির চিন্তা ব্যক্ত করেছেন নিজ ভাষায়। ২০০৮ সালে সিমন ওয়েস্টার্ন তার ‘লিডারশিপ : অ্যা ক্রিটিক্যাল টেক্সট’ বইয়ে স্ট্রসের ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে নিজের ভাষায় বলেন–
Machiavelli believed an aim of politics was to control one’s own chance or fortune, and that relying upon providence actually would lead to evil (Strauss, 1987).
ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, রাজনীতির একটি লক্ষ্য হল নিজের ভাগ্য বা সুযোগ-সুবিধাকে নিয়ন্ত্রণ করা, আর খোদার বিধানের ওপর নির্ভর করলে আসলে অন্যায় বা মন্দের উৎপত্তি ঘটে (স্ট্রস, ১৯৮৭)। Western, Simon (2013), ‘The controller leadership discourse’, in Leadership: A Critical Text. Second edition. London: Sage Publications, p. 167. First published 2008, reprinted 2010.]
তাহলে ম্যাকিয়াভেলি অথবা স্ট্রস কেউই হুবহু এই কথা বলেননি; বরং এটি সিমন বা পরবর্তী কারও ভাষা। তবে ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্যা প্রিন্স’ বইয়ে ‘ভাগ্য, খোদার নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের যুক্তির সক্ষমতা’ বিষয়ক আলোচনা আছে। বাংলা অনুবাদে সেই আলোচনার সংশ্লিষ্ট অংশ অনুবাদ করা হয়েছে।
১০. Livingstone, David. Black Terror White Soldiers: Islam, Fascism & the New Age. Sabilillah Publications, 2013. Printed in the United States of America. 95, Chapter 6, Renaissance and Reformation.
১১. Machiavelli, Niccolò. The Prince. Translated by George Bull. London: Penguin Classics, 2003. First published 1532, chap. 25, What Fortune Can Effect in Human Affairs and How to Withstand Her.
১২. মূলে নাম ছিল ডি লাইট। সঠিক নাম জেরার্ড ডেলান্টি, তিনি এখনও জীবিত আছেন। যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৯৮ সাল থেকে European Journal of Social Theory -এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্ভবত ‘ডেলান্টি’ শব্দটি বিকৃত হয়ে ডি লাইট হয়ে গেছে। ডেলান্টির বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট পুরো প্যারা অনুবাদ করা হয়েছে, যাতে প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হয়।
মূলে ছিল, এটি ২০০৭ সালের বক্তব্য। কিন্তু The British Journal of Sociology -এ ডেলান্টির আর্টিকেলটি ২০০৬ সালে ছাপা হয়েছে। পরবর্তীতে এটি পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।
১৩. কসমোপলিটান শহর বলতে বোঝায় এমন স্থান, যেখানে নানা সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষ মিলেমিশে থাকে। কসমোপলিটানিজম বা বিশ্বনাগরিকতাবাদ বিশ্বাস করে, সব মানুষই একক বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদস্য।
বলা হয়, এটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা, সবশ্রেণির মানুষের অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্ব নাগরিকত্বের ধারণাকে উৎসাহিত করে।
অনেকে এই মতবাদের বাহ্যিক উপস্থাপনে বিভ্রান্ত হয়ে ইসলামের ‘উম্মাহ’ ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি পার্থক্য তুলে ধরা হল–
ক. কসমোপলিটানিজম মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এখানে মানবযুক্তি-নির্ভর আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অপরদিকে ইসলামে নৈতিকতা ও আইনের উৎস হল ওহী তথা কুরআন ও সুন্নাহ।
খ. কসমোপলিটানিজম দাবি করে, ব্যক্তির প্রথম এবং প্রধান আনুগত্য হওয়া উচিত ‘বিশ্ব নাগরিক’ হিসেবে। এটি ধর্মীয় পরিচয়কে গৌণ করে ফেলে। ইসলামে উম্মাহ বা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী। যদিও ইসলাম বিশ্বজনীনতা সমর্থন করে, তবে ঈমানী পরিচয় বা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ভুলে গিয়ে কেবল ‘বিশ্ব নাগরিকত্বকে’ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া ইসলামী আদর্শের সাথে মেলে না।
গ. কসমোপলিটানিজম ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখে এবং পাবলিক বা সামাজিক স্পেস থেকে দূরে রাখতে চায়। অন্য দিকে ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়। এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান; যা রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক রীতিনীতিসহ জীবনের প্রতিটি অঙ্গনকে অন্তর্ভুক্ত করে। কসমোপলিটানিজমের ‘সেক্যুলার হিউম্যানিজম’ ইসলামের এই সামগ্রিকতাকে অস্বীকার করে।
ঘ. কসমোপলিটানিজম ‘সংস্কৃতি বিনিময়ের’ নামে এমন সব রীতিনীতিকে উৎসাহিত করে, যা ইসলামের নৈতিক সীমানা (হালাল-হারাম) লঙ্ঘন করে। অথচ ইসলাম বৈচিত্র্যকে স্বীকার করলেও নৈতিক ক্ষেত্রে আপস করে না।
কসমোপলিটানিজমের সঙ্গে ইসলামের এত ফারাক থাকার পরও এটাকে ‘ইসলামাজেশন’ করার চেষ্টা করা হয়েছে–
ক. বলা হয়েছে, ‘ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে কসমোপলিটান ছিল! আব্বাসী যুগে বাগদাদ, আন্দালুসিয়ায় বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল।’
খ. ‘সকল মানুষ আদমের সন্তান’– এই ধারণা কসমোপলিটান চেতনার সাথে মেলে!’
গ. আধুনিকমনা কয়েকজন লেখক দাবি করেন, ইসলামের মূল চেতনা সার্বজনীন, কিন্তু তার ব্যাখ্যা ঐতিহাসিক ও পরিবর্তনশীল হতে পারে!
কিন্তু উপরিউক্ত পরিষ্কার পার্থক্যগুলো লক্ষ করার পর এই সংশয়গুলোর অসারতা স্পষ্ট।
১৪. সেলফ-প্রবলেমাটাইজেশন : নিজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা। অর্থাৎ, মানুষ যা কিছু স্বাভাবিক ও চিরন্তন বলে মনে করে, তা আসলে কতটা অস্বাভাবিক, কতটা অসংগতিপূর্ণ– আধুনিকতা সেটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে বলে, নিজের শেকড়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে বলে।
১৫. Incompleteness (অসম্পূর্ণতা): কোনো সংস্কৃতি, ধর্ম বা জ্ঞানই সম্পূর্ণ নয়– এই বিশ্বাস।
১৬. Delanty, G. (2006) ‘The cosmopolitan imagination: critical cosmopolitanism and social theory’, The British Journal of Sociology, Volume 57 Issue 1, p 25.
১৭. লস অফ সার্টেইনটি বা চূড়ান্ত সত্যের অনুপস্থিতি হল আধুনিকতার অন্যতম অনুষঙ্গ। যেখানে ইসলাম চূড়ান্ত নিশ্চয়তা ও সত্যের ভিত গড়ে, অপরদিকে আধুনিকতা বিজ্ঞান ও যুক্তির দোহাই দিয়ে বলে, কোনো কিছুই চিরকালের জন্য নিশ্চিত নয়, সবকিছু পরীক্ষণীয় ও পরিবর্তনযোগ্য!
এভাবে মানুষকে অনিশ্চয়তার দোলাচলে ফেলে দেয়। এই দোলাচলই কসমোপলিটান চেতনার জন্মভূমি, কারণ যখন নিজের চিন্তাই চূড়ান্ত নয়, তখন অন্যের ভাবনাও সমান গুরুত্ব পায়।
অথচ ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষকে ‘চূড়ান্ত সত্য’ দান করেছেন। তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, ঈমান-আকীদার প্রধান অংশ, ইবাদতের মৌলিক কাঠামো, লেনদেন, স্বভাব-চরিত্র, মানুষের হক, সমাজবদ্ধ জীবনে চলার আদাব– এই সব ক্ষেত্রে ইসলামী মূলনীতি ও জীবনব্যবস্থা এমন দলীল দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত, যা শাশ্বত ও চিরন্তন সত্য এবং সর্বপ্রকার সংশয়-সন্দেহের ঊর্ধ্বে।
১৮. Ibid, p 38