সফর ১৪৪৮   ||   আগস্ট ২০২৬

অন্যেরও ওযর থাকতে পারে

মাওলানা আবরারুয যামান

কিছু কিছু ভাবনা জীবনকে সুন্দর ও সহজ করে। মনের ভেতরটাকে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাখে। নতুন কোনো ভাবনা নয়; ভাবনার শুধু রোখটা পাল্টে দিলেই বিরাট কিছু হয়ে যায়। গত দু-দিন ধরে সারা দেহে ব্যথা। নামাযের রুকু-সিজদা ধীর-স্থির হচ্ছে না। সুন্নত তরীকার রুকু সম্ভব হচ্ছে না। হাঁটু ভাঁজ হয়ে থাকছে। নামাযের মধ্যে মনে হল, লোকে দেখলে কী ভাববে! সুন্নতের খেলাফ রুকু! অস্থির রুকু-সিজদা!

পরক্ষণেই ভাবনা এল, মানুষ ভাবে ভাবুক, আমি তো অসুস্থ। আমি তো মাযূর। আমার তো ওযর আছে!

কিন্তু কী আশ্চর্য, এই আমিই আরেকজনকে যখন দেখলাম, রুকু-সিজদায় অস্থিরতা, রুকুতে হাঁটুর ভাঁজ ঠিক হয়নি, অমনি তার বিষয়ে পড়ে গেলাম বদগুমানীর মধ্যে। এলোমেলো ভাবলাম। এমনকি কোনো সুযোগে সে ভাবনা উচ্চারণেও এসে গেল।

পথের ধারে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কোনো এক বে-আবরু নারী সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি কিছু একটা বলতে চাচ্ছেন আমাকে। আমি তাকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। দৃশ্যটা দূর থেকে কেমন? একটি আলাপচারিতার দৃশ্য।

দূর থেকে দেখে কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে। মন্দ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। এ চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য আমাকে বিচলিত করলেও পরক্ষণেই নিজেকে বুঝ দিলাম, আমি যেচে তো কোনো মহিলার সাথে কথা বলছি না। এটি একটি পরিস্থিতি। আমি পরিস্থিতিতে পড়ে আছি। আমার এ কথাবার্তার একটি যুক্তি আছে। একটি যৌক্তিক বৈধতা আছে। নানান ভাবনায় নিজেকে আশ্বস্ত করি। কিন্তু এই একই আমি যখন অন্য কাউকে এমন কোনো অবস্থায় দেখি, নির্দ্বিধায়-নির্ভাবনায় তার বিষয়ে মন্দ ধারণার শিকার হই। নানা কুচিন্তা ও কু-ধারণায় আক্রান্ত হই।

বাঁচার উপায় কী? অন্যের বিষয়ে অহেতুক মন্দ ধারণা থেকে পরিচ্ছন্ন থাকার রাস্তাটা কী? উপায় আছে। ভাবনার মোড়টা ঘুরিয়ে দিলেই উপায় বের হয়ে আসে। শুধু একটু ভাবি, আমার যেমন ওযর থাকে, তারও থাকতে পারে কোনো ওযর।

অন্যের বিষয়ে মন্দ ধারণা থেকে বাঁচার এটি একটি উপায়। একে বলে ‘তাবীল’। ভালো কোনো ব্যাখ্যা চিন্তা করে নেওয়া। নিজের জীবন ও জীবনের নানা সংকটকে কল্পনা করে পরিস্থিতির একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ব্যাখ্যা তালাশ করে নেওয়া।

মন্দ ধারণা থেকে বাঁচার এটি হল একেবারে শুরুর স্তর। আরও ধাপ আছে। আরও স্তর আছে। এরও আগের একটি স্তর আছে। তা হলঅন্যের বিষয়ে নাক গলানোর কী দরকার’, ‘অত কিছু দেখা আমার কী প্রয়োজন’ ইত্যাদি চিন্তা ও ভাবনাকে ঢাল বানিয়ে নিজেকে বাঁচানো।

এর পরের স্তরই হল পরিস্থিতির সম্ভাব্য সুন্দর ব্যাখ্যা।

এতেও যখন কাজ হচ্ছে না, অন্তর কিছুতেই পরিচ্ছন্ন হচ্ছে না, তখনও আছে উপায়। নিজেকে ধারণার অস্বচ্ছতা থেকে এবং ভাবনার অস্বস্তি থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে এবার আমি আরেকটু সামনে বাড়ি। নিজেকেই অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে তার সামনে বিষয়টি তুলে ধরি। তাকেই জিজ্ঞেস করি, ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে আছে কি না! তার দেওয়া ব্যাখ্যাটিকে ইতিবাচক গ্রহণ করি। এভাবেও মনটাকে রাখতে পারি পাক-সাফ, নির্মল ও পরিচ্ছন্ন।

এতেও যখন কাজ হচ্ছে না, তখন আরেকটা উপায়। নিজের জীবনের অগণিত গোনাহ ও নাফরমানীর কথা ভাবি। এ-ও ভাবি, আল্লাহ যদি আমার এসব অন্যায় প্রকাশ করে দেন, কী হবে এ জগতে আমার হাল! তার একটি ভুল কাজ দেখে আমি তাকে খাটো করছি, আমার জীবনেও যে এত এত অন্যায়!

এতেও হচ্ছে না কাজ। এতকিছুর পরও মনের গভীরে একটি খুঁতখুঁতে ভাব। খচখচ করে বিঁধতে থাকা একটি কাঁটা। দূর হয়েও দূর হতে চায় না। তখনও আছে উপায়। তখনও রাখতে হবে নিজেকে মন্দ ধারণার কলুষ ও নাপাকি থেকে পাক-সাফ। নিজেকে বড় ও অন্যকে ছোট ভাবার এ ভয়াবহ মরণ-ব্যাধি থেকে তখনও নিজেকে সুস্থ করার ও সুস্থ রাখার চিন্তা করতে হবে। উপায়টি আর কিছু না আল্লাহর দিকে মুতাওয়াজ্জু হওয়া। আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার ও কান্নাকাটি করা।

আল্লাহ তাআলাকে কাকুতিমিনতি করে বলা, আল্লাহ! এ অস্থিরতা থেকে আমাকে মুক্তি দিন। আমার হৃদয়টা সমস্ত মুমিন-মুমিনাতের বিষয়ে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করে দিন।

যত কিছুই হোক, যত চিন্তা-ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির বিনিময়েই হোক, আমাকে পরিচ্ছন্ন থাকতেই হবে। মনটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতেই হবে।

আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা।

 

 

advertisement