বিতর্ক : যুক্তি ও প্রমাণ
স্রষ্টার অস্তিত্ব
জুলফিকার আহমদ চীমা
[গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতীয় লেখক জাভেদ আখতার ও একজন নওজোয়ান আলেমেদ্বীন মুফতী শামায়েল নদভীর সাথে স্রষ্টার অস্তিত্ব বিষয়ে একটি টেলিভিশন বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্পষ্টতই ঐ মাওলানা সাহেব জাভেদ আখতারকে ধরাশায়ী করে ছাড়েন। বস্তুবাদী জগতের গুরুজনদের কাছে যা ছিল অনাকাক্সিক্ষত ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। জাভেদ আখতার এভাবে পরাস্ত হবেন তা তারা চিন্তাও করতে পারেনি। তাই তাদের অনেকেই এ ঘটনাটি যত তাড়াতাড়ি দৃশ্যপট থেকে সরে যায় সে অপেক্ষায় থেকেছেন। কিন্তু মুসলিম দুনিয়ায় এমন কিছু লোকজনও আছেন, যারা নিজেদেরকে অনেক শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ভেবে থাকেন। আবার অল্পস্বল্প ধর্মকর্মও করে থাকেন।
অন্যদিকে আলেম-উলামা ও ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের ঘৃণা লুকাতে পারেন না। এরা বর্তমানে লেবারেল শ্রেণি বলে পরিচিত। জাভেদ আখতার ও মুফতী শামায়েল বিতর্কের পর এদের অনেকের গা-জ্বলাটাই বেশি দেখা গেল। একজন আলেমের কাছে একজন বুদ্ধিজীবী কেন হেরে যাবে–এটা তাদের গায়ে সয় না।
যদিও মূল বিষয়ে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি। কারণ নিজেকে তো তারা নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দেন না। তাই ঐ শ্রেণির লোকেরা বলাবলি ও লেখালেখি শুরু করলেন, আসলে জাভেদ সাহেব সেদিন বিতর্কের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যাননি। তিনি শামায়েলের ঐ কথার এভাবে জবাব দিতে পারতেন। এমন এমন প্রশ্ন করে শামায়েলকে আটকে দিতে পারতেন। এভাবে বিভিন্ন দেশে লিবারেল শ্রেণির লোকেরা নিজেদের মুখ ঢাকার চেষ্টা করে থাকেন। তাদেরই জবাবে এক্সপ্রেস নিউজ পত্রিকার খ্যাতিম্যান কলামিস্ট জুলফিকার আহমদ চীমা কয়েকটি কলাম লেখেন। আলকাউসারের পাঠকদের জন্য সেগুলো কিস্তি আকারে পেশ করা হচ্ছে।
অনুবাদ করেছেন– মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ]
১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
নাস্তিকদের যুক্তিগুলোকে কেন অবান্তর ও অন্তঃসারশূন্য জেনে প্রত্যাখ্যান করি আর কেনই-বা আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলি হৃদয়ের গভীর থেকে মেনে নিই– শুরুতেই এর কারণটা বলে দেই। আমি একজন সচেতন ও শিক্ষিত মানুষ। আমার বাড়ির আঙিনায় সকালে সূর্যের আলো পড়ে। কিন্তু রাতের বেলা সূর্য যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আর আকাশে চাঁদ ও তারার দেখা মেলে।
এসব দেখে মনে বেশ কৌতূহল জাগে– সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র কীভাবে অস্তিত্ব লাভ করল? কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দুয়েকজন শিক্ষক পেয়েছিলাম, যারা ধর্ম নিয়ে উপহাস করতেন। সাক্ষাতের পূর্ব অনুমতি নিয়ে আমি কয়েকবার তাদের অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘স্যার! মেনে নিলাম যে, ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে হাজারো ত্রুটি আছে। কিন্তু এ সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হল– এর ব্যাখ্যা দিন।
তাদের একজন ডারউইনের বিবর্তনবাদের কথা বললেন। আমি তাকে দুয়েকটি প্রশ্ন করার পর জানালেন, তার এখনও পুরো তত্ত্বটি পড়া হয়নি। পুরোটা পড়ার পর উত্তর দেবেন।
আমি বললাম, বিজ্ঞানীরাই বলেন, এখনও নির্ভরযোগ্য এমন একটি প্রমাণও পাওয়া যায়নি, যা মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে ডারউইনের তত্ত্বটির প্রমাণ বা সমর্থন করে। এটি নিছক এক অনুমানমাত্র।
তিনি চুপ হয়ে গেলেন। এরপর মৌলভীদের সম্পর্কে কয়েকটি রসগল্প শুনিয়ে আলোচনা শেষ করলেন।
আরেক অধ্যাপকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, স্যার! সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী এবং মানুষ ও তার বিস্ময়কর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, তার চেতনা কে সৃষ্টি করেছে?
তিনি বললেন, দেখো, সবকিছুই অণু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আর কোষগুলো বিস্তৃত হয়ে এমন আকার ধারণ করেছে।
আমি প্রশ্ন করলাম, স্যার! অণু কিংবা কোষের মধ্যে প্রাণ বা জীবনের সৃষ্টি কীভাবে হল?
তিনি বললেন, বিজ্ঞানের কাছে এখনও এর কোনা উত্তর নেই।
প্রশ্ন করলাম, তাহলে আপনি কাকে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা বলে মনে করেন?
বললেন, আমি মনে করি, প্রকৃতির (Nature) প্রভাবে সবকিছু নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছে।
জিজ্ঞেস করলাম, পৃথিবীর কোথাও একটি সেতু কিংবা কোনো ভবনের একটি ঘরও কি নিজে নিজে সৃষ্টি হয়েছে বলে আপনার জানা আছে?
তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
আবার প্রশ্ন করলাম, স্যার! প্রকৃতির কি অনুভূতি আছে?
তিনি সততার সাথেই বললেন, না। প্রকৃতির কোনো অনুভূতি নেই।
আমি বললাম, স্যার! যে প্রকৃতির নিজেরই কোনো অনুভূতি নেই, সে কি মানুষকে অনুভূতি দিতে পারে?
এবার তিনি বলতে লাগলেন, আসলে তুমি ঠিকই বলেছ। সৃষ্টিজগৎ ও মানব সৃষ্টির কিছু রহস্য এখনও আবিষ্কার করা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা, যারা এটম বোমা, জাহাজ ও কম্পিউটার আবিষ্কার করেছে, তারা একদিন এই রহস্যও আবিষ্কার করে ফেলবে।
আমি বললাম, স্যার! আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মানুষের এক ফোঁটা রক্তও সৃষ্টি করতে পারেনি। বিজ্ঞানের যত অর্জন তার সবই গবেষক ও বিজ্ঞানীরা প্রকৃতি থেকেই আবিষ্কার করেছে। অর্থাৎ গবেষণার মাধ্যমে তারা প্রকৃতির কিছু স্বভাব ও যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এরপর সে আলোকে ভালো-মন্দ অনেক কিছু তৈরি করেছে। এসব আবিষ্কারও নিঃসন্দেহে বিরাট কীর্তি। কিন্তু আপনি কি বলতে পারবেন, প্রকৃতির এসব স্বভাব ও যোগ্যতা যেমন, মহাকর্ষের সূত্র কোনো বিজ্ঞানী সৃষ্টি করেছে?
তিনি বললেন, কোনো বিজ্ঞানী তা সৃষ্টি করেনি। তবে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে তা আবিষ্কার করেছে।
আমি আবারও প্রশ্ন করলাম, স্যার! মহাকর্ষের সূত্রের প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগতের অন্য সব স্বভাব ও যোগ্যতা কে সৃষ্টি করেছে?
বললেন, কোনো কোনো বিজ্ঞানী এখন বলেন যে, সৃষ্টিজগতে হয়তো কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি (Meta physical force) রয়েছে।
পরবর্তীতে আমি আরও কয়েকজন নাস্তিক প্রফেসরের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। কোনো কোনো বিজ্ঞানীর সাথেও আমার দেখা হয়েছে। যাদের আছে শুধু ধারণা ও অনুমাননির্ভর কিছু সূত্র, যার সঠিকতা ও যথার্থতার কোনো প্রমাণ নেই। অথবা আছে শুধু সংশয়। তবে তারা এখন অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি বা সত্তার সম্ভাবনাকে স্বীকার করছে। কেউ কেউ আবার অনুমান ও কল্পনার অন্ধকারেই ঢিল ছুঁড়ে যাচ্ছে। এই পৃথিবী ও গোটা সৃষ্টিজগৎ নিজে নিজেই সৃষ্টি লাভ করেছে কিংবা এর সবকিছুই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে– তাদের এ দাবিকে কোনো বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতিই সমর্থন করে না। আর বিবেকবান কোনো মানুষই সবকিছু নিজে নিজে সৃষ্টি হওয়ার যুক্তি মেনে নিতে পারে না।
সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী ও সৃষ্টিজগতের নীতি এবং মানবদেহের অভ্যন্তরীণ বিস্ময়কর কর্মযজ্ঞের সৃষ্টি সম্পর্কে নাস্তিক চিন্তাবিদ কিংবা বিজ্ঞানীদের কাছে আমি স্পষ্ট কোনো উত্তর পাইনি। নাস্তিক্যবাদী জীবনদর্শন এমন সব তত্ত্ব তুলে ধরে, যা যেমন প্রমাণযোগ্য নয়, তেমনি মানুষের বিবেক-বুদ্ধির কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়।
এসব নিয়ে গবেষণা ও সত্যানুসন্ধানের মধ্যেই হঠাৎ একটি ঘোষণা শুনতে পেলাম, এদিকে এসো! আমি বলে দিচ্ছি, এ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা কে। আর তা ছিল এক পবিত্র মানবসত্তার ঘোষণা। যিনি চল্লিশ বছরের জীবনে কখনও একটি মিথ্যা পর্যন্ত বলেননি।
নিজের বক্তব্য শুরু করার আগে জনপদবাসীদের প্রশ্ন করেছিলেন– যদি বলি, এই পাহাড়ের পাদদেশে শত্রু এসে পৌঁছেছে। তবে তোমরা তা বিশ্বাস করবে?
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, আপনি তো সত্যবাদী মানুষ। তাই আমাদের বিশ্বাস, আপনি সত্যই বলবেন। আর আপনার সব কথাই মেনে নেব।
এবার শতভাগ সত্যবাদী মানুষটি এমন কথা বলে বসলেন যে, সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। পবিত্র চরিত্রের মানুষটি কারও থেকে কখনও শিক্ষা লাভ করেননি। সিরিয়া ছাড়া আর কোনো দেশও তিনি ভ্রমণ করেননি। অথচ তিনিই এখন মানব মনে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় ও জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। আর শুধু কুরাইশ কিংবা মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যেই নয়; বরং গোটা বিশ্বের মানুষকেই সম্বোধন করছেন। সারা পৃথিবীর মানুষকে জীবনযাপনের পদ্ধতি ও বিধান বাতলে দিতে লাগলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এই মহাবিশ্ব ও মানবজাতির স্রষ্টা ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি। সুতরাং শুধু তাঁকেই সিজদা করো এবং শুধু তাঁর কাছেই প্রার্থনা করো। তিনি তোমাদের সকল কাজকর্মের হিসাব রাখেন। এই জীবনের পর সবাইকে তাঁর সামনে উপস্থিত হতে হবে। আর দুনিয়ায় আমাদের কাজকর্মের ভিত্তিতেই তিনি পরকালে পুরস্কার কিংবা শাস্তি দেবেন।
এসব শুনে গোত্রপতিরা নিজেদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে হুমকির সম্মুখীন মনে করল। ফলে সবাই তাঁর প্রাণের দুশমনে পরিণত হল।
নেতারা জানতে চাইল, তুমি এমন কথা কেন বলছ?
তিনি উত্তর করলেন, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মানবজাতির কাছে তাঁর পয়গাম ও নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। তাঁর একজন ফেরেশতা আমাকে সে বার্তা পৌঁছে দেন। তা-ই তোমাদেরকে বলছি।
পয়গাম শোনার পর সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। কারণ এ তো এক অভূতপূর্ব ও আশ্চর্য বাণী! আরবের বড় বড় ভাষাবিদ, যারা নিজেদের বাগ্মিতায় গর্বিত, তারাও এর ভাষাশৈলী ও সৌন্দর্য দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। এমন কথা যেন ইতিপূর্বে কেউ কখনও শোনেনি। পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুশমনে পরিণত হওয়া নেতারাও তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারি সম্পর্কে কোনো আপত্তি তোলেনি। তাদের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তারপরও খোঁজ করতে লাগল, এমন বাক্যমালা কারও থেকে লিখিয়ে আনা হতে পারে কি না। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চল্লিশ বছর এ বসতিতে ও তাদের সাথেই ছিলেন। তাঁর ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে তারা ভালোভাবেই অবগত। ফলে সবাই বুঝতে পারল, তার নিজের ভাষা ও ধরন ভিন্ন আর তার দাবিকৃত আল্লাহর বাণীর ভাষা, ধরন ও ভঙ্গিমা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এ বাণীতে আছে এক ধরনের মহিমা। এক নির্দেশমূলক আওয়াজ (Commanding voice)। এর ভঙ্গি কর্তৃত্বপূর্ণ (Authoritartive)। যার বাক্যমালার প্রতিটি অংশই জানান দেয় যে, এর শব্দপ্রয়োগকারী শ্রোতাকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলছেন, যেমনটি কোনো শাসক তার প্রজাকে বলে। যেমনটি কোনো মনিব তার ভৃত্যকে বলে। আর এই মহিমা ও নির্দেশসূচক সম্বোধন কথার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিতই থাকে।
তেইশ বছর যাবৎ আসমান থেকে পয়গাম অবতীর্ণ হতে লাগল। এ পূর্ণ সময়েই পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চরম জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হল। আর ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টও তাকে সহ্য করতে হল। তা সত্ত্বেও এ পয়গামের মহিমা ও দৃঢ়তা সামান্যও ব্যাহত হয়নি। মানবিক দুঃখ কিংবা ভাবাবেগের কোনো স্পর্শও এতে পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিটি শব্দ থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, পয়গাম প্রেরণকারীর স্তর ও মর্যাদা তার শ্রোতার স্তর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
উপস্থিত লোকেরা এ দুটি বিষয়ে একমত ছিল যে, প্রথমত, নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি দাবি করা ব্যক্তিটি বৃহৎ কোনো স্বার্থেও কখনও মিথ্যা বলেন না। আর দ্বিতীয়ত, যাকে সে আসমান থেকে অবতীর্ণ বাণী বলছে, তা তার নিজের নয়। এর ভঙ্গিমা ও ভাষাশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অতি উচ্চাঙ্গের। তাই তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, এটি শুধু পয়গম্বর নয়; বরং কোনো মানুষেরই বাণী হতে পারে না।