সফর ১৪৪৮   ||   আগস্ট ২০২৬

সাক্ষাৎকার
জুলাই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়নি, তবে কাঙ্ক্ষিত সফলতা এখনও অধরাই রয়ে গেছে’

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

প্রশ্ন : জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। আপনার দৃষ্টিতে অভ্যুত্থানের অর্জন ও ব্যর্থতা কী?

উত্তর : জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন তো খুবই স্পষ্ট এবং সেটা তাৎক্ষণিকই ঘটেছে। অগ্নিঝরা জুলাইয়ের ৩৬ দিন পর ৫ আগস্ট ২০২৪-এ যে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বাংলাদেশের নিপীড়িত জনতা প্রত্যক্ষ করেছে, আমি মনে করি, সেটিই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালেম ও একনায়কের ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পলায়ন অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে যারা দেশ সম্পর্কে জানে, খবর রাখে, যারা বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে এদেশে অবস্থান করেছে, চোখ-কান খোলা রেখেছে, তারা ভালোভাবেই অবগত আছে, কীভাবে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা এই দেশকে পারিবারিক সম্পদে পরিণত করেছিল; বরং অন্য দৃষ্টিতে পারিবারিক সম্পদ থেকেও দূরাচরণ এই দেশের সাথে তারা করেছিল।

মানুষ নিজের একান্ত সম্পদ হেফাজত করতে চায়, নষ্ট না হোক সেদিকে খেয়াল রাখে; কিন্তু তারা তো লুটপাট করেছে। দেশের মানুষকে গোলাম বানিয়ে রেখেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছে। দেশটিকে সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেনি। তাদের হয়তো চিন্তা ছিল, নিজেদের গোষ্ঠী লুটে মেরে খেয়ে যতদিন থাকতে পারে থাকবে। এতে মানুষের যা অবস্থা হয় হবে। দেশ যেখানে যাক, ওটা নিয়ে তাদের চিন্তা ছিল না।

দেশের বিভিন্ন শ্রেণির অনেকেই ধরে নিয়েছিল, আওয়ামী লীগ মনে হয় আর বিদায় হবে না। এদের ক্ষমতা স্থায়ী হয়ে গেছে। এজন্য দেশের ব্যবসায়ী সমাজ থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র, বিচারালয়, আইন-শৃঙ্খলা বিভাগসহ সকল গোষ্ঠীর মাথাতোলা অনেক লোক তাদের তাবেদার হয়ে গিয়েছিল, দোসর হয়ে উঠেছিল। বাদ যায়নি ধর্মীয় গোষ্ঠীর চিহ্নিত কিছু নেতাও। তারা নিজেদের মতলব এবং আখের গোছানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এমন একটা পরিস্থিতিতে স্বৈরাচারী সরকারের বিদায় এবং সেই সরকারের প্রধানসহ অধিকাংশ নেতার ভারতে পলায়ন অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। সুতরাং জুলাইয়ের অর্জনের কথা বললে প্রথম অর্জন তো সেটি ছিল। তার ধারাবাহিকতায় প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, পরবর্তীতে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনায় রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের প্রধান দাবিও স্বৈরাচারী হাসিনার পদত্যাগই ছিল।

জুলাইয়ের প্রাপ্তির কথা যদি বলা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকারের বিদায়ের সাথে সাথেই অনেক কিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। যেমন, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা আগে তামাশা হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে নির্বাচন ব্যবস্থা মোটামুটি কাজ করছে। সেই ব্যবস্থায় নতুন করে একটি সরকারও গঠিত হয়েছে। সেখানে বিরোধীদলের বড় কোনো অভিযোগ বা নির্বাচন বর্জনের মতো কোনো ব্যাপার ঘটেনি। অথচ ২০১৪ থেকে আরম্ভ করে তিন তিনটি নির্বাচন সম্পূর্ণ তামাশা ছিল। যদিও ২০০৮-এর নির্বাচনটিও ছিল অনেকের মতে চুক্তিভিত্তিক চালাকির নির্বাচন। কিন্তু পরের তিনটি নির্বাচন তো একেবারেই তামাশার ছিল। সেখান থেকে কিছুটা স্বাভাবিক নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ এগিয়েছে। এটিও কিন্তু একটি বড় অর্জন।

অন্য অনেক বিভাগের মতো দেশের বিচারব্যবস্থাও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। সেখানে দালাল গোছের কিছু লোক বিচারক হয়ে বসেছিলেন; বিশেষত উচ্চ আদালতে। কিন্তু স্বৈরাচারের পতন ঘটতেই দালাল বিচারপতিদের অনেকেই পালিয়ে গেলেন, অনেকে ইস্তফা দিয়ে দিলেন। দেশের প্রধান বিচারপতি থেকে আরম্ভ করে অনেকেই পদ ছাড়লেন। অথচ এই বিচারকরা পদ না ছাড়লে আইনগতভাবে সরাতে অনেক দেরি লাগত। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া, এরপরে তাদেরকে বরখাস্ত করা সম্ভব হত। কিন্তু দুর্নীতি এবং অবৈধভাবে বিচারালয়ের মতো জায়গা কলঙ্কিত করার কারণে তারা এতটাই ভীত ছিল যে, তাদেরকে সরাতে হয়নি; অনেকে নিজেরাই পালিয়েছে। কেউ কেউ তৎক্ষণাৎ ইস্তফাও দিয়ে দিয়েছে। ওদের বিদায়ের পর এখন আবার বিচারালয় কাজ করছে বলে শোনা যাচ্ছে। এটিও জুলাইয়েরই একটি প্রাপ্তি।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা যদি বলা হয়, এখন পর্যন্ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না হলেও তখনকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ-র‌্যাব থেকে শুরু করে সকল স্তরে যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী, বিশেষ জেলা, এমনকি বিশেষ ধর্মের লোকদের আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, গুম-খুনের যে কথাগুলো সে সময় শোনা যেত এসব থেকেও অনেকটা উত্তরণ ঘটেছে।

এ সবই জুলাই অভ্যুত্থানের প্রাপ্তি। জুলাইয়ে যারাই জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, সাহসী ভূমিকা রেখেছেন এ সবকিছুর জন্য তারা কৃতিত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

অন্যদিকে আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা দেখি, জুলাইয়ের স্পিরিট কিন্তু পরবর্তীতে এদেশের সরকার ও জনগণ কাজে লাগাতে পারেনি অথবা কাজে লাগায়নি। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল, বৈষম্য দূরীকরণ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। কোটাবিরোধী আন্দোলনের পেছনের কথাও এটাই। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি সেই বৈষম্য দূর হয়েছে? ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে কি দেশ অগ্রসর হচ্ছে? সম্ভবত না। বাংলাদেশে ইনসাফ এখনও গণমানুষের অধরাই থেকে গেছে।

গুড গভর্ননেন্সের কথা যদি বলা হয়, আমলাতন্ত্রের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সততার কিছুই অর্জিত হয়নি। আমলাতন্ত্র অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও দুর্নীতিতে পূর্ণ ছিল এবং বাহাদুরির সাথে পুরোনো চরিত্রকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। এখনও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঘুস-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি দেশের চান্দাবাজিও। আগে একদল চান্দাবাজি করত, এখন অন্য দলের লোকেরা করে। চান্দাবাজির অভিযোগ বন্ধই হচ্ছে না। পরিমাণ ও ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু চান্দাবাজির মূল সমস্যা থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায়নি। তো প্রশাসনের সকল স্তরের স্বচ্ছতা আনতে না পারা, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বন্ধ করতে বা হ্রাস করতে না পারা জুলাই অভ্যুত্থানের চাওয়া-পাওয়ার সাথে বড়ই বেমানান।

এগুলো দেখে অনেকেই হতাশ। দেশের অনেক মানুষই মনে করেন, ভবিষ্যতে আরেকটি অভ্যুত্থান অনেক কষ্টকর হবে। কারণ মানুষ যখন দেখে, আন্দোলন করে পাথরের মতো চেপে বসা একটি সরকারকে সরিয়েও বড় কিছু অর্জন হচ্ছে না, তখন আরেকটি সরকার সরানোর জন্য জানবাজি রেখে এগিয়ে আসতে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠবে না। যদিও এটি সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশে ওই সময়ের মতো আরেকটি স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে টিকে থাকতে পারবে কি না সেটাও সময়ই বলবে।

অনেকেই মনে করেন, সেদিন অতীত হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো কোনো স্বৈরাচার বাংলাদেশের জনগণকে টুঁটি চেপে ধরে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারবে না। কেউ একথা ভেবে থাকলে আগে থেকেই হয়তো পালানোর রাস্তাও করে রাখবে। তবুও দেশের প্রশাসনিক স্তরে এবং আইন-শৃঙ্খলা বিভাগে স্বচ্ছতা, সততা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান পরিপূর্ণ সফলতা পেয়েছে এ কথা বলার সুযোগ নেই।

প্রশ্ন : বিএনপি সরকার জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট কতটুকু ধারণ করে বলে মনে করেন? এ সরকার কি পারবে জুলাই আন্দোলন কেন্দ্রিক গণমানুষের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে?

উত্তর : কিছুটা যে ধারণ করে, বোঝা যায়। এখন পর্যন্ত সরকার আগ্রাসি বা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেনি। ওঠার সুযোগও নেই। কারণ সরকার দেশকে, দেশের জনগণকে সম্মান করে আইন অনুযায়ী পরিচালনা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেই হিসেবে বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগের সরকারের সাথে তুলনা করার সুযোগ নেই।

যারা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আগের সরকারগুলো দেখেছে এবং বিএনপির বর্তমান সরকারও প্রত্যক্ষ করছে, তারা বুঝতে পারবে, এই বিএনপি অনেকটা সংযত। ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছুটা হলেও সতর্ক। সুতরাং তারা যে জুলাইয়ের স্পিরিট কিছুটা ধারণ করছে, সেটা বলাই বাহুল্য। তবে পূর্বে যেমনটা বললাম, জুলাইয়ের স্পিরিট সত্যিকারার্থে ধারণ করা হবে এবং বাস্তবায়িত হবে, যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা ও নিষ্ঠার সাথে সাথে আমলাতন্ত্রকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়, তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত নেতা-কর্মীদেরকে সংযত রাখা যায়, মানুষের সাথে সদাচরণে বাধ্য করা যায়, সকল প্রকারের চান্দাবাজি থেকে বিরত রাখা যায়। এমনটা করতে পারলেই জুলাইয়ের চেতনায় তারা বিশ্বাসী বলে আমলীভাবে প্রমাণ দিতে পারবে। সেটি এখনও অধরা থেকে গেছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা এখনও পূরণ হয়নি। গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হলে বিএনপিকে আরও অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে এবং আরও অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন।

প্রশ্ন : জুলাই আন্দোলন বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান; নাকি বিপ্লবের সূচনা এ নিয়ে তর্ক চলে। আপনি কী মনে করেন?

উত্তর : জুলাই আন্দোলন আসলে একটি অভ্যুত্থান; বিপ্লব না। বিপ্লব যে না, তার বড় প্রমাণ জুলাই আন্দোলন শুরুতেই দিয়ে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তে ৫ আগস্ট ২০২৪ যখন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা করেন, আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাইব।

সেটাতে আন্দোলনকারীরাও সম্মত ছিলেন। পরবর্তীতে ডক্টর ইউনূসকে প্রধান করে সরকারও গঠন করা হয়। সে সরকার বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী স্বৈরাচার আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে পূর্বনির্ধারিত নিয়মে শপথ গ্রহণ করে।

অনেকেই মনে করেন, সেখানেই জুলাই আন্দোলন ‘বিপ্লব’ হয়ে ওঠার চিন্তার অবসান ঘটেছে। কারণ কোনো বিপ্লব হলে তো প্রচলিত সংবিধান, প্রচলিত আইনের অধীনে এবং প্রচলিত ক্ষমতাবানদের কাছে গিয়ে শপথ নেওয়ার মতো সুযোগ ছিল না। আন্দোলনকারীরা এবং বিপ্লবীরা নিজেদের মতো করেই রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিত। দেশে একটা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হত। একটা নতুন সংবিধান তৈরি হত। আগের যত কাঠামো আছে, সেগুলোর মধ্যে বড় পরিবর্তন আসত। তেমন কিছু হলে হয়তো আমলাতন্ত্রের দুষ্ট লোকেরাও বিদায় নিত। অন্যান্য সেক্টরেও ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেগুলোর অপমৃত্যু ঘটে গেছে প্রথম দিনই। তবে কথা হল, ওই আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে এসব কিছুর যোগ্যতা এবং মানসিকতা আদৌ ছিল কি না!

সুতরাং জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লব বলার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। জুলাই আন্দোলনে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতন তো হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুরোনো ধাঁচেই এবং পুরোনো খোলসের ভেতরে থেকেই অগ্রসর হচ্ছে। সুতরাং এটি আসলে একটি অভ্যুত্থান, বিপ্লব নয়।

প্রশ্ন : এত বড় একটা আন্দোলন হল। সরকার প্রধান সাঙ্গোপাঙ্গসহ পালিয়ে গেল। তারপরও সে আগের সিস্টেমই রয়ে গেল! আসলে দুর্নীতিগ্রস্ত পুরোনো সিস্টেম থেকে আমরা বের হব কীভাবে?

উত্তর : বের হওয়ার সুযোগ হয়তো আমাদের হাতে ছিল। একটু আগে যেটা বললাম। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন যে অবস্থা চলছে, তা এ দেশের অনেকটা নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য হয়তো আরও বিপ্লব, আরও আন্দোলনের দরকার হবে। অসম্ভব মনে হলেও তা কিন্তু ঘটতে পারে। সাধারণ জনগণ যদি সততা ও নিষ্ঠাকে পুঁজি করে জেগে ওঠে, তাহলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ২০২৪-এর জুলাই এর বড় প্রমাণ।

সাধারণ নিয়মে আসা সরকারগুলো এদেশে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায় না। বিশেষত বলা যেতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা। তাদের তো জনগণের ভোট পাওয়ার, কর্মীদেরকে খুশি রাখার ব্যাপার ছিল না। তারা কিন্তু অনেক কিছুই স্বচ্ছ করার জন্য সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত। বিশেষত আমলাতন্ত্রের দুষ্ট লোকদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারত, তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারত, রাষ্ট্রের দুর্নীতির সেক্টরগুলো বন্ধ করতে পারত, দেশে থেকে যাওয়া স্বৈরাচারের দোসরদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনে বিচার করতে পারত; কিন্তু কোনো কিছুই তারা করেনি।

কিছু কমিশন তারা বানিয়ে গেছে, যেগুলো তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এমন কিছু কাজে, যেগুলোর প্রয়োজন দেশ ও জনগণের চেয়ে বেশি ছিল হয়তো বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর। তারা আসল কাজটি করেনি। পরবর্তীতে যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের আপন মনে করেছে, সেই রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু দুর্নীতি, জুলুম-অবিচার বন্ধে কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি বা কিছু করতে সরকারকে চাপ দেয়নি। সুতরাং এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়নি। এটাই এখন বাস্তবতা। এ থেকে উত্তরণের জন্য হয়তো ভবিষ্যতের অভ্যুত্থান বা আন্দোলনের চিত্র ভিন্ন রকম হতে হবে।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন, ‘তারা এমন কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, যেগুলোর প্রয়োজন দেশ ও জনগণের চেয়ে বেশি ছিল হয়তো বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর এবং তাদের নিজেদের’ এখানে দুয়েকটি কাজের কথা কি বলবেন?

উত্তর : আসলে যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। তারা কোনোটাতে হয়তো সফল হয়েছে, কোনোটাতে হয়নি। কোনো কোনো দেশের সাথে কিছু চুক্তি যেমন, আমেরিকার সাথে কিছু চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ থেকে অন্যদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। কিছু বিতর্কে তারা জড়াতে চেয়েছেন, কিন্তু পেরে ওঠেননি। যেমন, মিয়ানমারকে করিডোর দেওয়া, আমেরিকার সাথে গভীর সমুদ্রবন্দর বিষয়ক চুক্তি করা।

ইউনূস সাহেবের আগেও এধরনের চিন্তা ছিল। অথচ এধরনের জিনিস অন্যান্য দেশের (যেমন, শ্রীলঙ্কা) জন্য গলার কাঁটা হয়েছে। সংবিধান সংস্কার থেকে আরম্ভ করে তারা যে জিনিসগুলো এখানে ঢোকাতে চেয়েছে, যেমন দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট। আমরা আগেও বলেছি, এই ধরনের ক্ষেত্রে কিছু মতলবি লোকের এবং বিদেশিদের স্বার্থে কাজ করে এমন লোকদেরকে পার্লামেন্টে বসানোর জন্যই এগুলো করা হয়ে থাকে।

আরেকটি হল, নারীদেরকে বেশি আসন দেওয়া। ইউনূস সাহেবের সরকার দেখলেই বোঝা যাবে, তিনি যে সরকার চালিয়েছেন, সেখানে কতজন নারী উপদেষ্টা ছিল! তিনি একদল নারীকে উপদেষ্টা পরিষদে রেখেছেন। তারা কোন্ যোগ্যতায় সেখানে বসেছিলেন এবং মন্ত্রণালয় ও দেশের জন্য তারা কী কী ভালো করে গেছেন সেটাও তো মানুষের জানা আছে। তারা কোন্ ঘরানার কর্মী ছিলেন! আপনি দেখবেন, তাদের প্রায় সকলেই ছিল বিভিন্ন এনজিওকর্মী। এধরনের সংরক্ষিত কিছু আসন, যেগুলো সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় না, এগুলো দিয়ে বিশেষ মহলের সুযোগ নেওয়ার একটা চিন্তা থাকে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়ে কিছু বিশেষ গোষ্ঠীকে পার্লামেন্টে বসানো এবং ভিনদেশিদের অপসংস্কৃতি ও তাদের ইসলাম-বিদ্বেষী চিন্তা এই দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ারও এজেন্ডা থাকে। বিভিন্ন মহলের বাধার মুখেও ইউনূস সাহেব জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর বসিয়ে গেছেন। তারা আরও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকলে হয়তো আরও অনেক কিছু করতে চাইতেন। যেগুলোতে তারা জড়াতে চেয়েছিলেন, কিছু তারা করেছেন, কিছু পারেননি। আমরা মূলত সেগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলাম।

তবে এসবই এখন অতীত। বাংলাদেশকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। এখন আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে ফেরত এসেছে। সেটিকেও আরও সুস্পষ্ট করতে হবে। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনে নির্বাচন তো করবে। কিন্তু তারা যেন কোনো নীতিগত বিষয়ে এই দেশ ও দেশের জনগণের চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধ পরিপন্থি কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে না পারে সেটাও সুস্পষ্টভাবে বিধানে থাকা দরকার।

প্রশ্ন : সংস্কার নিয়ে নানান বুলি শুনে, নানান কীর্তিকলাপ দেখে অনেকেই আর কার্যকর কোনো সংস্কার হবে বলে বিশ্বাস করে না। আপনার কী মনে হয়?

উত্তর : দেখতে তো ওরকমই মনে হচ্ছে। সংস্কার বিষয়ে এখন সবাই নিজ নিজ মতলবে হাঁটছে। কী সংস্কার হবে এবং সে সংস্কার জনগণের কতটুকু উপকারে আসবে, দেশের কতটুকু কাজে লাগবে, তার থেকে বড় ব্যাপার হয়ে গেছে, কার কত দলীয় ও ব্যক্তিগত কাজে লাগবে?

নারী আসন পঞ্চাশটা বৃদ্ধি পেলে কোন্ দল কয়টা বাগিয়ে নিতে পারবে, উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেখানে কে কত আসন পাবে, কার কয়জন পার্লামেন্ট মেম্বার বৃদ্ধি পাবে এগুলো এখন বড় ব্যাপার হয়ে গেছে। সংস্কারের প্রকৃত ব্যাপারগুলো পেছনে পড়ে গেছে।

আলী রীয়াজের নেতৃত্বে যে সংস্কার কমিশন হয়েছিল, সে সংস্কার কমিশন সংবিধান সংস্কারের যেসব প্রস্তাবনা এনেছিল, সেগুলোর মধ্যেও তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ এবং ভিনদেশি স্বার্থের প্রভাব রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন এবং বিষয়গুলো অনেকটা স্পষ্টও ছিল।

যদিও দেশের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের কাছেই সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে এবং অনেকে প্রস্তাবনা জমাও দিয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগই তাঁরা বিবেচনায় নেননি। তাদের মনমতো কিছু বিষয় তারা বিবেচনায় নিয়েছেন। সেজন্য এই সংস্কার প্রক্রিয়াটি গোড়া থেকেই বিতর্কিত ছিল এবং এখনও বিতর্কিতই আছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিরোধীদলসহ যারাই এগুলো নিয়ে কথা বলছে, সবাই নিজের স্বার্থ সামনে নিয়েই বলছে। নিজের চাওয়া-পাওয়া রেখেই অগ্রসর হতে চাচ্ছে। সুতরাং এ বিবেচনায় সংস্কার যাই হোক, সেটাতে দেশ ও জাতির কোনো লাভ আছে বলে অনেকেই মনে করেন না।

প্রশ্ন : বিএনপি মাঝে মাঝেই বলে ফেলছে, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য গণভোট ও সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে; অন্যথায় তারা এর সঙ্গে একমত না।’ এ ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

উত্তর : এটা দুঃখজনক। একটি বড় রাজনৈতিক দলের মুখে এমন কথা খুবই বেমানান। এ কথা ঠিক, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিএনপি চাপে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থনদাতা যে দলগুলো ছিল, তাদের প্রভাব বেশি ছিল। তখন বিএনপিকে চাপে ফেলেও অনেক কিছু করার চেষ্টায় ছিল সেই সরকার। সেখানে দেশি-বিদেশি চাপও ছিল বলে শোনা যায়। তারপরও বিএনপি দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাদের পক্ষে এটা খুবই বেমানান যে, তারা শুধু চাপে পড়ার কারণে একটা কথা স্বীকার করে ফেলবে, পরে সেটা থেকে বেরিয়ে যাবে। এগুলো দুঃখজনক বিষয়। সততা ও সৎসাহস থাকা জরুরি।

বিএনপি এই সংস্কারে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী না হলে তখন ভালো ভূমিকা রাখতে পারত। কিছু জায়গায় তারা রেখেছেও। যেমন, সংস্কার কমিশনের অনেক প্রস্তাবনাতেই বিএনপি নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছে; ভিন্নমত দিয়েছে। যদিও বিএনপির ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সংস্কার কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সেগুলো পাশ হয়ে গেছে; কিন্তু বিএনপি তার অবস্থান পরিষ্কার রেখেছে, ভিন্নমত দিয়েছে। এটি ভালো দিক।

এখানে একটি কথা বলে রাখা যেতে পারে। সেটা হল, সংস্কার কমিশনে যে ভোটাভুটির মাধ্যমে এবং কিছু লোকের মতের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব পাশ হয়েছে, তারা আসলে দেশের জনগণের কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করেছেন?

প্রশ্ন : জুলাই সনদ বা সংস্কার কমিশনে পাশ হওয়া বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

উত্তর : জুলাই সনদ নিয়ে আমরা মাসিক আলকাউসারের সেপ্টেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় লিখেছিলাম। সেখানে জুলাই সনদের ধারাগুলো নিয়ে কিছু বিশ্লেষণ পেশ করা হয়েছিল। সেখানেও আমরা এ বিষয়ে কিছু কথা আরজ করেছিলাম।

জুলাই সনদ বলুন বা সংবিধান সংস্কার বলুন, সেখানে যেসব বিষয় এসেছে, সেগুলোর কিছু কিছু তো প্রয়োজনীয় এবং ভালোই এতে সন্দেহ নেই। যে-ই সরকারে থাকুক, তার দায়িত্ব সেগুলো আইনে পরিণত করা, সংবিধান সংশোধন করা। কিন্তু এই কমিশন যা যা প্রস্তাব করেছে এবং যেসকল জিনিসকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে চেয়েছে, সেগুলো আসলে দেশের জনগণ চেয়েছে কি না? সেগুলো দেশের জনগণের সমস্যা কি না? সমস্যা হয়ে থাকলে প্রথম দিকের সমস্যা কি না? জনগণের সাথে এগুলোর সম্পর্ক আসলে কতটুকু? এগুলো কি ক্ষমতার বিষয়? রাজনৈতিক দলগুলোর ফায়দার বিষয়, নাকি জনগণের বিষয়? এগুলো দেখার ব্যাপার আছে।

অন্যভাবে বলতে গেলে, এই সংস্কার কমিশনে যারা ছিল, তারা কি দেশের জনগণের সত্যিকারার্থে প্রতিনিধি? তাদের কয়জন জনগণের কত পার্সেন্ট লোকের প্রতিনিধি? যে আলী রীয়াজ সাহেবের নেতৃত্বে সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে, তিনি থাকেন আমেরিকায়। হঠাৎ করেই দেশে এসেছেন। তাঁকে ধরে সংস্কার কমিশনের নেতা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি কাজ করেছেন। আবার আপন জায়গায় ফিরে গেছেন।

বাংলাদেশের জন্য তাদের দরদ কতটুকু? বাংলাদেশের জনগণকে, এদেশের মাটিকে, এদেশের পরিবেশ-পরিস্থিতিকে, এদেশের জনগণের মূল্যবোধকে কতটুকু ধারণ করেন সেটাও কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন ছিল, আছে এবং থাকবে। এই ধরনের লোক

কর্তৃক পাশ করা, চাপিয়ে দেওয়া একটা সংস্কার, একটা সনদ জনগণের আসল চাওয়া-পাওয়ার কতটুকু প্রতিফলন করতে পেরেছে নিজের মধ্যে এই প্রশ্ন আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। সুতরাং এই সনদকে, এই সংস্কারের সুপারিশগুলোকে জনপ্রতিনিধিত্বশীল বলা সুকঠিন। এগুলো ইতিহাসে একতরফা বলেই হয়তো বিবেচিত হবে। কিছু লোকের চাওয়া-পাওয়া বলেই বিবেচিত হবে।

প্রশ্ন : আপনি তো বলছেন এটা কিছু লোকের চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু দেশে তো এটা নিয়ে একটি গণভোটও হয়েছিল। সেখানে ‘হাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে।

উত্তর : আমরা একটু আগেও বলেছি, জুলাই সনদের সবকিছুই মন্দ নয়। তবে সেখানে বেশ কিছু মতলবি বিষয়ও আছে। আমরা সেগুলোর বিরুদ্ধে বলছি। ভালো জিনিসগুলোর পক্ষে আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি।

বর্তমান সরকার নিজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা বিরোধী দলকেও পাশে পাবে বলে আশা করা যায়। তারা তো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। কিন্তু ভালো জিনিসগুলো অবশ্যই বিএনপি সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাশ করিয়ে নেওয়া দরকার।

কিন্তু যদি গণভোটের কথা বলেন, তাহলে গণভোটের মধ্যে কী প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এটা নিয়ে আগেই অভিজ্ঞ মহল প্রশ্ন তুলেছিলেন। গণভোটে জনগণকে জুলাই সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। এদেশে সাক্ষরতার হার অনেক কম। শিক্ষার হার তো বলাই বাহুল্য। সেখানে যদি বলা হয়, জুলাই সনদে আপনার সমর্থন আছে কি না? জুলাই সনদটা তো আগে চিনতে হবে। তারপরই-না সমর্থন আছে কি না এ প্রশ্ন।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ওখানে যে সুনির্ধারিত প্রশ্নগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আলাদা আলাদা ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সবগুলো একত্র করে ‘হাঁ’ অথবা ‘না’ বলার কথা বলা হয়েছে। একজন ভোটার হয়তো একটি চায়, আরেকটি চায় না। কোনো ভোটার হয়তো মহিলাদের ১০০ আসন বৃদ্ধি হোক চায় না। যদি সুনির্ধারিতভাবে প্রশ্নটা দেওয়া হত, তাহলে জানা কথা যে, এ পয়েন্টে ১০% ভোটও তারা পেত না। কারণ জনগণ কেন অযথা রাষ্ট্র ও জনগণের টাকা খরচ করার জন্য কতগুলো লোককে এবং তাদের মধ্যে প্রভাবশালীদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে পার্লামেন্টে বসাবে! বাংলাদেশের ইতিহাসে যারা এ পর্যন্ত তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি।

সুতরাং সেখানে এরকম বিভিন্ন প্রশ্ন দিয়ে আলাদাভাবে জবাব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি; বরং সবগুলো একসাথে জিজ্ঞেস করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে, রাষ্ট্রের ওপর খরচের ভার চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় নির্বাচন কমিশন, টেলিভিশন, পত্রিকা, বিলবোর্ডে গণভোটের প্রচারণা চালানো হয়েছে।

সেই গণভোট কী? অধিকাংশ জনগণই সেটা জানেনি এবং বোঝেনি। সুতরাং সেখানে জনগণের ভোট অর্জিত হয়ে গেছে এবং জনগণ বিস্তারিতভাবে জুলাই সনদের সবকিছুরই পক্ষে মত দিয়েছে এই কথা বলা যে অবাস্তব এবং সত্যের অপলাপ তা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন : এ সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে কোনো কোনো ইসলামপন্থি দলের উঠেপড়ে লাগার কারণ কী বলে মনে করেন?

উত্তর : এর জবাব আসলে ওই দলের নেতারাই দিতে পারবেন। সাধারণ জনগণ যারা এ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন এবং বোঝেন, তারা বড় অবাক হন তাদের অবস্থান দেখে, তাদের হাঁকডাক দেখে এবং তাদের কথাবার্তা শুনে। এদেশে তাদের কয়টা ভোট আছে বা নিজেরা কয়টা আসন পেয়েছে সেসব ভুলে তারা এমনভাবে কথা বলে যে, ওই সনদের জন্য তারা জানবাজি রাখবে, সবকিছু করে ফেলবে। তারা যে এই সনদের জন্য নিজেদের জান দেবে বা তাদের অনুসারী ইসলামপন্থি লোকদের জান বিলীন করবে, এতে খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, সে সনদে ইসলামের কী কী আছে? ইসলামী শিক্ষার কী কী আছে? এটা কিন্তু তারা খোলাসা করে বলছেন না।

তারা এই সনদের বিরোধীদেরকে গালমন্দ করছেন, কিন্তু তারা নিজেরা এটাকে খোলাসা করছেন না। ইদানীং কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন, এর দ্বারা আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, উচ্চকক্ষ যখন হবে এবং নারী আসন বৃদ্ধি পাবে, তখন তাদেরও কয়েকটা আসন থাকবে। তাদের হেরে যাওয়া নেতারা অন্তত উচ্চকক্ষে জায়গা পেয়ে যাবেন।

আমরা আগেও একবার আলকাউসার (ডিসেম্বর ২০২৫)-এর এক নিবন্ধে বলেছিলাম, আমাদের উপমহাদেশীয় উচ্চকক্ষ আর আমেরিকার উচ্চকক্ষ এক রকম না। আমেরিকার উচ্চকক্ষ পাওয়ারফুল হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে উচ্চকক্ষ অনেকটা আলংকারিক হয়। পাকিস্তান-ইন্ডিয়ায় দেখা যায়, নিম্নকক্ষে সাধারণ জনগণের ভোটে অনেক নেতা হেরে যায়। পরে দলীয়ভাবে উচ্চকক্ষে তাকে মনোনীত করে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। একই অবস্থা সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতেও দেখা যায়।

অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, সংবিধান সংস্কারের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বৃদ্ধি হওয়া সংরক্ষিত নারী আসন সাধারণ নারীদের ভাগ্যে জোটে খুবই কম। মন্ত্রী, এমপিদের স্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্ত্রী, জোট শরীক নেতাদের স্ত্রী বা তাদের নিকটাত্মীয়রা এবং প্রভাবশালী ঘরানার নারীরা এসব আসনের ভাগীদার হয়ে থাকে।

অনেকে ভাবছেন, অনেকে আলোচনায়ও নিয়ে আসছেন, প্রস্তাবনা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হয়ে গেলে নবপ্রতিষ্ঠিত সংসদে উচ্চকক্ষে এবং বর্ধিত নারী আসনগুলোতে এই দলগুলোরও দু-চারটা ভাগ থাকবে বলে আশা করা যায়। সেজন্যই হয়তো তারা এত মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এত বড় বড় কথা বলছেন। তবে আসল কারণটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

প্রশ্ন : জুলাইয়ের মতো আন্দোলনগুলোতে উলামায়ে কেরাম ও মাদরাসার তালিবে ইলমদের সম্পৃক্ত হওয়া কেমন?

উত্তর : সেটা তো অতীত হয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলন শেষ পর্যায়ে একটি ঐতিহাসিক ক্ষণে পরিণত হয়েছিল এবং একটা জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নিয়ামক ক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এরকম একটা সময়ে দেশের সকল স্তরের মানুষেরই সাধ্যমতো ভূমিকা রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও দ্বীনদার শ্রেণি তো এ দেশেরই অংশ। সুতরাং এই ধরনের ক্ষেত্রে সার্বিক সমর্থন জোগানো এবং ঝাঁপিয়ে পড়া তো সময়ের দাবি ছিল বলে মনে হয়। সেই ভূমিকা তারা সামর্থ্য অনুযায়ী রেখেছেও।

প্রশ্ন : জুলাই অভ্যুত্থানকে ইসলামপন্থিরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারত?

উত্তর : দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী আমলে স্বৈরাচারী সরকার যেভাবে রাষ্ট্রের সকল স্তর এবং সকল স্তম্ভ একে একে ধ্বংস করেছিল, একইভাবে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনেও আঘাত হেনেছিল মারাত্মকভাবে। প্রথমে আক্রমণ করে, ভয় দেখিয়ে, নির্যাতন করে তারা দেশের মাদরাসাগুলোকে, আলেম-উলামাকে দমাতে চেয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় ঘটেছিল শাপলা ট্র্যাজেডি। এরপর পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও ধর্মীয় লোকদের দমনের কৌশল পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় সরকার ধর্মীয় অঙ্গনের কিছু লোককে বন্ধু বানানোর ভান করে। আলেম-উলামা ও ধর্মীয় লোকদের বন্ধু পরিচয় ধারণ করেছিল তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অথচ এ লোকগুলোই ধর্মীয় অঙ্গনে অরাজকতা ও বিভেদ সৃষ্টি করা এবং সেখানে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

যাইহোক, তখন সরকার সুকৌশলে মাদরাসাগুলোর বোর্ড, হেফাজতে ইসলাম-সহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠীকে বসিয়ে ধর্মীয় লোকদেরকে, ধর্মীয় অঙ্গনকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। (এখানে চিহ্নিত গোষ্ঠী বলতে আমরা কিন্তু শ্রদ্ধাভাজন বয়োবৃদ্ধ কোনো মুরব্বীকে ইঙ্গিত করছি না। ওরকম দুয়েকজনকে তো তারা সাইনবোর্ড হিসেবে রেখে নিজেদের মতলব আদায় করেছে।)

জানা কথা, উলামায়ে কেরামের এবং দ্বীনী মাদরাসাগুলোর অধিকাংশই এ ষড়যন্ত্র এবং এ ধরনের অসৎ প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ছিল না। তারা এগুলোকে অপছন্দ করেছে; কিন্তু তারা ছিল কোণঠাসা। সরকারের গোয়েন্দাদের চাপ, কিছু উচ্চাভিলাষী মতলবি লোকদের সরকারের সাথে পাঁয়তারা এসব মিলিয়ে ধর্মীয় অঙ্গনও তখন তাদের হাতের মুঠোয় চলে গিয়েছিল।

এরপর তো ফ্যাসিবাদের পতন ঘটল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে, সেই চিত্র বদলায়নি। যেসকল নেতা আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে সক্রিয় ছিল, তাদের ঘনিষ্ঠ ছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে স্বপদে বহাল থেকেছে, অনেকে পদের কাছাকাছি থেকে তৎপর থেকেছে; লোক তারাই। তারাই আবার ঘুরেফিরে এসেছে এবং তারাই এখনও বিভিন্ন জায়গায় আসীন হয়ে আছে। অনেকে পদধারী না হলেও কলকবজা নাড়াতে তারাই অগ্রগামী আছেন। সুতরাং দেশের কওমী অঙ্গন এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেম-উলামা জুলাই অভ্যুত্থান থেকে ভালো ফায়েদা পেয়েছেন এ কথা বলার এখনও সময় আসেনি।

বিগত দশকের শুরুতে হেফাজতে ইসলাম একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। সেটিকে বিগত সরকার প্রথমে জুলুম করে দমাতে চেষ্টা করেছিল। সেখানে সফল না হয়ে ভিনরাস্তা অবলম্বন করেছিল। যেটা একটু আগেই বলা হয়েছে। এরপর থেকে কিন্তু হেফাজতে ইসলামকে টিকিয়ে রেখেছে স্বার্থবাদী মতলবি গোষ্ঠী। সেটি আসলে কোনো কার্যকর ভূমিকায়, ইসলামের কোনো ভালো ভূমিকায়, দ্বীনের কোনো ভূমিকার জন্য টিকে আছে বা ভূমিকা রাখতে পারছে এমন নয়। মাঝে মাঝেই বিতর্কিত মন্তব্য হচ্ছে, বিতর্কিত কাজ হচ্ছে। এখন বিভিন্ন সরকার হয়তো এটাকে একটা বড় কিছু বলে টিকিয়ে রাখবে এবং সেটা দ্বারা সুবিধা নেবে কিছু মতলবি লোক।

দ্বীনদার শ্রেণি এবং ইসলামপন্থিদের ভাবার সময় এসেছে, যখন হেফাজতে ইসলামের কার্যকারিতা ছিল, উপকারিতা ছিল, দ্বীনদার শ্রেণির জন্য শক্তি ছিল, তখন তো সকলের এটার প্রতি সমর্থন অপরিহার্য ছিল। যখন এটা বিতর্কিত হয়ে গেছে, কিছু মতলবি নেতার গন্তব্য হয়ে উঠেছে এবং এর নেতৃত্ব কিছু লোকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন বোঝাই যাচ্ছে, এখানে জনস্বার্থ, ইসলামের স্বার্থ থেকে নেতাদের স্বার্থই বড়। তাই হেফাজতে ইসলামকে টিকিয়ে রাখা কার স্বার্থে সেটা ভাবনার বিষয়।

এর মানে এই নয়, এধরনের সংগঠনের বাংলাদেশে প্রয়োজন নেই। এদেশে ইসলামপন্থিদের একটি প্রেশার গ্রুপ তো অতি অবশ্যই থাকা দরকার। কিন্তু সেটার কাঠামো এমনভাবে ঠিক করা দরকার, যেন সেটি প্রকৃত ধর্মপ্রাণ আলেম-উলামার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, ক্ষমতালোভী, পদ-পদবির ভিখারি লোকেরা যেন তাতে কোনো পদ না পায়, এ সংস্থার লোকেরা যেন আক্ষরিক অর্থেই সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক কোনো টোপেই সাড়া না দেয়, সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎসাহস যেন তাদের থাকে, কঠিন চাপেও

وَلا يَخافُونَ فِيْ اللهِ لَوْمَةَ لائِمٍ

(আল্লাহর ব্যাপারে তারা কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করে না।)

এর বাস্তব উদাহরণ যেন তারা থাকেন। কোনো জালেম শাহী যেন এমন সংগঠনের বিষয়ে একথা উচ্চারণ করতে না পারে যে, এটি এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনদার শ্রেণির এমন একটি শক্তিশালী ফোরামের প্রয়োজন আগেও ছিল, এখনও আছে।

প্রশ্ন : জুলাই গণহত্যার বিচারের গতি দেখে কী মনে হয়?

উত্তর : বিচার তো চলছে, কিন্তু এখনও কোনো অপরাধীর সাজা কার্যকর হয়নি। কিছু সাজা ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি। মূল দোসরদের অনেকেই দেশের বাইরে। তাদেরকে কীভাবে দেশে আনা হবে, কীভাবে শাস্তি কার্যকর হবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে যারা দেশে আছে, দ্রুত আইনি কার্যক্রমগুলো পুরো করে অনতিবিলম্বে সাজা কার্যকর করাই গণমানুষের দাবি। সে প্রক্রিয়া শুরু হলে বোঝা যাবে, এটা যথাযথভাবে অগ্রসর হচ্ছে কি না। তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং চলমান আছে। এটাও কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

প্রশ্ন : হাসিনাকে মরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলা সত্ত্বেও হাসানুল হক ইনুর সাজা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ বছর!

উত্তর : অনেকেই মনে করেন, এসব ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের দায়বদ্ধতা বেশি। তারা অনেক সময় ঠিকভাবে দলীল-দস্তাবেজ এবং প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। যে কারণে সঠিক রায় আসে না। এক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে কি না, বিস্তারিত রায় দেখার পরেই বোঝা যাবে।

তবে ইনুর নামে তো আরও মামলা রয়েছে। ইনুর মতো আরেক দোসর রাশেদ খান মেননও বিভিন্ন মামলায় বন্দি রয়েছেন। এরা যে ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর ছিলেন, তা কার অজানা? সুতরাং কোনো চালাকি করে এদেরকে নামেমাত্র ছোটখাটো শাস্তি দেওয়া হলে জনমনে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। আইন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের এবিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।

প্রশ্ন : শেখ হাসিনা বলছেন ডিসেম্বরে দেশে আসবেন!

উত্তর : এটি শুনে অনেকে হাসছেন। ডিসেম্বরে কেন? তাকে তো এখন থেকেই সরকার চায়। বাংলাদেশের আদালত এখনই তাকে চায়। যখন থেকে মামলার আসামি হয়েছেন, তখন থেকেই তো বাংলাদেশ তাকে চায়। এত্ত সাহস থাকলে তো তখনই চলে আসতেন। তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে রাষ্ট্রের যে টাকা খরচ হয়েছে, সে খরচ আর রাষ্ট্রকে বহন করতে হত না। তিনি নিজের টাকায় এখানে আইনজীবী নিয়োগ দিতেন, আত্মসমর্পণ করতেন। কিন্তু তার সাহসে তো এটুকু কুলায়নি।

তার চেয়ে বড় কথা হল, এত বড় সাহসী মানুষ! তাহলে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন কেন? তিনি ইস্তফা দিয়ে দেশে থেকে যেতেন। তাকে হয়তো গ্রেফতার করা হত। নির্দোষ প্রমাণিত হলে বের হয়ে যেতেন। আবার নির্বাচন করতেন। জনপ্রিয় হলে জয়ী হতেন। সেসব না করে তিনি পালিয়েছেন! সে পালানো ব্যক্তিও আবার বাইরে বসে এমন কথা বলছেন!

অনেকেই বলছেন, এগুলো আসলে তৃণমূল কর্মীদেরকে উজ্জীবিত রাখার জন্য। যেন তারা মাঝে মাঝে একটু ঝটিকা মিছিল করে ফেলে। মাঝে মাঝে যেন একটু রাস্তায় নেমে ‘জয় বাংলা’ বলে ফেলে এভাবে এদেশে তাদের নাম আরও কিছুদিন বাকি থাকে। কর্মীদের মাথায় নারিকেল ভেঙে খাওয়ার মতো সুবিধা নিতেই হয়তো এমন উচ্চবাচ্য। তারা যে কতটুকু সাহসী, বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, বিচার কাজে সহযোগিতায় কতটুকু সৎসাহস রয়েছে, সেটা তো জনগণ ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছে।

প্রশ্ন : বর্তমানে মিডিয়ার ভূমিকা বিষয়ে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রত্যাশা করছি। অনেক মিডিয়াই এখনও সরাসরি স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে কাজ করছে এবং ফ্যাসিবাদী আমলেও করেছে। মিডিয়া রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভ হয়ে থাকলে এদের অন্যায়ের বিচার হওয়া উচিত নয় কি?

উত্তর : এটাকে আমরা প্রথম প্রশ্নের জবাবের সাথেও যুক্ত করতে পারি। যেখানে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি বা পাওয়া-না পাওয়া কী? তার সাথে এ বিষয়টিও যুক্ত হবে। জুলাইয়ের ব্যর্থতা হিসেবে কিছু জিনিসকে চিহ্নিত করা হলে তার মধ্যে মিডিয়ার অরাজকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং মতলবি ও চাটুকার, স্বৈরাচারের দোসর মিডিয়া হাউসগুলোকে বিচারের সম্মুখীন না করা, সেগুলোর মালিক, সম্পাদক ও তোষামোদকারী সাংবাদিকদের আইনের আওতায় না আনা বড় ব্যর্থতা। যদিও দুই-চারজন সাংবাদিক নামের কলঙ্ক ইতিমধ্যে জেলে আছেন। কিন্তু তাদের বিশাল গোষ্ঠীই রয়ে গেছে মুক্ত। তাদের মিডিয়া হাউজগুলোও সম্পূর্ণ স্বাধীন। টেলিভিশন চ্যানেল বলুন, প্রিন্ট মিডিয়া বলুন সব জায়গাতেই তারা কিছুদিন তো খোলস ধরে রেখেছিল, কিছুদিন নিজেদেরকে স্বৈরাচারবিরোধী বলে উপস্থাপন করেছিল; কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময় থেকে তারা অনেকটা আগের অবস্থায়ই ফেরত গেছে। তারা জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে বসেও সাবেক প্রভুর পক্ষে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে যাচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলোকে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি এবং তাদেরকে যে বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি এটি জুলাই গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী বড় ব্যর্থতা। জুলাই শহীদ এবং জুলাই যুদ্ধাহতদের প্রতি অবিচারও বটে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রয়োজন ছিল, মিডিয়ার অরাজকতার বিচারের জন্য বিশেষ কমিশন গঠন করা। (সবার মনে থাকবে, তখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন গণ অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম নিজেই।) তারা যে অন্যায় করেছে, তার জন্য আলাদা প্রমাণের দরকার ছিল না। অন্যদের অন্যায় প্রমাণ করতে দলীল-দস্তাবেজের দরকার হয়। কিন্তু মিডিয়াগুলো তো প্রমাণিত হয়েই আছে। প্রিন্ট মিডিয়ার সব ছাপানোই আছে। তারা কোন্ কোন্ জায়গায় স্বৈরাচারের কোন্ কোন্ অপকর্মকে সমর্থন করেছে, কোন্ কোন্ অপকর্মের জন্য উসকে দিয়েছে, কোন্ কোন্ দুর্নীতিকে সমর্থন করেছে, স্বৈরাচারের কোন্ কোন্ মিথ্যা কথাকে হাইলাইট করে সত্য বলে প্রমাণ করেছে সবই রেকর্ড আছে। একইভাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভিডিওগুলো তো ধারণ করা আছেই।

সুতরাং একটা কমিশন গঠন করলে তাদের অপকর্ম ধরা জটিল কিছু ছিল না। এছাড়া গোয়েন্দাদের কাছে নিশ্চয় তথ্য আছে, মিডিয়া হাউজগুলোর মালিক, তথাকথিত বড় বড় সাংবাদিক তৎকালীন সরকার প্রধান এবং সরকারের লোকদের সাথে কীভাবে গাঁটছড়া বেঁধেছে, তাদের থেকে কী কী অবৈধ সুযোগ সুবিধা নিয়েছে এসব তো নিশ্চয় পাকাপোক্তভাবেই রয়েছে। তো সেসব সামনে রেখেই দুষ্ট মিডিয়াগুলোর বিচার করা গেলে ভবিষ্যতে মিডিয়া বা গণমাধ্যম হয়তো কিছুটা সংযত থাকত এবং যাচ্ছেতাইভাবে দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করার সাহস পেত না। মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করতে অতটা সাহস করত না। কিন্তু সেটা হয়নি। যেখানে ছিল সেখানেই থেকে গেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারকেও এ বিষয়ে দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। এটি তো প্রসিদ্ধই আছে, খারাপ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ভালো মিডিয়া প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ব্যাপারে বিএনপি বরাবরই অদক্ষ। এটাও এই দেশের জন্য, এই দেশের জনগণের জন্য একটি দুঃখজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রশ্ন : অনেকটা স্থবির এই সময়ে উলামা-তলাবা ও দ্বীনদার শ্রেণির উদ্দেশে কী বলবেন?

উত্তর : আমরা তো মনে করি, উলামা-তলাবা ও দ্বীনদার শ্রেণির জন্য সব সময় কাজের নিজস্ব পরিসর আছে, সুযোগ আছে। নিজেদের কাজে নিয়োজিত থাকার প্রয়োজনও আছে।

তলাবায়ে কেরামের কথা যদি আসে, তাদের তো মূল কাজই হচ্ছে পড়াশোনা, গবেষণা, সত্যিকারের তালীম-তরবিয়ত এবং মুসবাত ফিকির তথা আসলাফ-আকাবিরের সঠিক চিন্তা-চেতনা লালন করে জাতির খেদমতের জন্য, ইসলামের শান্তিময় বাণী ও শিক্ষা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিজেকে সৈনিকরূপে প্রস্তুত করা এবং সর্ব প্রকারের অপ্রাসঙ্গিক ও অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা। ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে অন্তত শিক্ষাকালে নিজেদেরকে বিরত রাখা। এগুলো বর্তমান সময়ের অন্যতম দাবি।

এভাবে যদি তারা প্রস্তুত হয় এবং নিজেদেরকে সঠিক ও সৎ নাগরিক হিসেবে, দ্বীনের খাদেম হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নিশ্চয় আলোকবর্তিকা হবে।

উলামায়ে কেরাম এবং দ্বীনদার শ্রেণির কাজ তো আগেই বলা হয়েছে যে, তাদের কাজের সুযোগ অবারিত। দেশের জনগণের বিশাল শ্রেণি এখনও ন্যূনতম ধর্মীয় শিক্ষা এবং ধর্মীয় আদব-আখলাক ইত্যাদির ইলম থেকে মাহরূম রয়েছে। উলামায়ে কেরাম, দেশের দ্বীনদার শিক্ষক সমাজ এবং দেশের দ্বীনদার শ্রেণির যেমনিভাবে দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও দ্বীনী অন্যান্য কেন্দ্র রক্ষা করার দায়িত্ব, তেমনিভাবে তৃণমূল জনগণের সকল স্তরে দ্বীন পৌঁছে দেওয়াও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

এই দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করলেই সমাজের মধ্যে একসময় ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে ইনশাআল্লাহ।

 

 

advertisement