এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
সকল পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য
পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশে এখন চলছে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা। এরই মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতাও দেখা দিয়েছে। দেশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে ভয়াবহ বন্যায়। যার দরুন দেশের সাধারণ নাগরিকদের মতো এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও চরম দুর্দশার শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বেশি বন্যা কবলিত এলাকা চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রেখেছে। তবে অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা চলমান রয়েছে।
এরই মধ্যে কিছু এইচএসসি পরীক্ষার্থী আন্দোলন শুরু করেছে। তারা জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া-আসার কষ্ট ও প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এসবের সাথেই আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে শিক্ষামন্ত্রীর কিছু মন্তব্য। তিনি এ সময়ের ছাত্রদের বিষয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা একজন দায়িত্বশীল এবং মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ব্যক্তির মুখ থেকে আসা কাম্য ছিল না।
ইতিমধ্যেই এ আন্দোলন থামানোর জন্য সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খবরে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তাঁর উপদেষ্টার যে বক্তব্য এসেছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার এবং শিক্ষার্থীদেরকে পরীক্ষার হলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের তরফে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে তাঁর অনুচিত কথাবার্তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষার্থীদেরকে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। যেমন, ভুল প্রশ্নের জন্য পুরো নম্বর দেওয়া হবে, যারা সমস্যার কারণে পরীক্ষার হলে যেতে পারেনি, তাদের পরীক্ষা আবার নেওয়া হবে। তারপরেও একশ্রেণির শিক্ষার্থী আন্দোলনে থেকে গেছে। যখন এই কথাগুলো লেখা হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইচএসসি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর অনেক দেশেই এইচএসসি পর্যন্তই মাধ্যমিক স্তর থাকে। আমাদের দেশে যদিও এটিকে উচ্চমাধ্যমিক বলা হয়। এই স্তরের পরেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ধারিত হয়। এখান থেকে তারা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে যায়। বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে। সেই দৃষ্টিতে এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। সন্দেহ নেই, একারণে যে-কোনো শিক্ষার্থীরই এই স্তরের পরীক্ষা নিয়ে মাথাব্যথা থাকার কথা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটও কারও অজানা নয়। এখানে কখন বৃষ্টিপাত হবে, কখন বন্যা হয়ে যাবে– আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। সুতরাং কোনো পরীক্ষা চলাকালীন অতি বৃষ্টিপাত হওয়া, জলাবদ্ধতা হওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বিগত দিনেও এমন বহু পরীক্ষা গেছে, যখন অতিবৃষ্টি ছিল। কঠিন পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু এবারের শিক্ষার্থীরা এমন আচরণ করল এবং এমন সব কথা বলল, যা থেকে মনেই হয় না তারা বাংলাদেশের মতো জায়গায় দশ-এগারো বছর পড়াশোনা করে বড় হয়েছে।
এটা ঠিক, রাজধানীর মতো জায়গায় অতি বৃষ্টিপাতে দিনকে দিন পানি জমে থাকা, হাঁটু পানি হয়ে যাওয়া আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। সরকার ও সাধারণ নাগরিক সকলেই এ ব্যর্থতার অংশীদার। সরকারের যেমন ভালো পরিকল্পনা নেই, ভালো ব্যবস্থাপনা নেই, এই সবকিছু আমাদের এখানে বারবার হওয়া সত্ত্বেও এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রতিকার বা বৃহৎ প্রকল্প নেওয়া হয় না, তেমনিভাবে এদেশের নাগরিকদের বিশাল একটি অংশ যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়– এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র যে শ্রেণিরই হোক, তাদের বিশাল একটি অংশ এখনও পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, আইসক্রিমের বক্স, এমনকি বড় বড় বাতিল আসবাবপত্র পর্যন্ত ড্রেনে ফেলে দেয়। জলাবদ্ধতা, বিভিন্ন স্লুইস গেট ও ছোট ছোট খালবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য যে এগুলোও দায়ী– তা কে অস্বীকার করবে?
এদেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের বিশাল অংশ যে এখনও এই দায়িত্বহীনতার মধ্যে থেকে গেছে– তা থেকে উত্তরণ না হলে এই বিপদ আমাদের থাকবেই।
যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, তাদের বাপ-দাদারা কীভাবে পরীক্ষা দিয়েছে? তাদের পরীক্ষার সময় কি এ ধরনের সমস্যা হয়নি? তারা স্কুলে কীভাবে পড়েছে? এখন তো শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে স্কুলগাড়িতে যাচ্ছে, রিকশায় করে যাচ্ছে, রোড-ঘাট পাচ্ছে। তখন কীভাবে পড়াশোনা হয়েছে? সেগুলো কি পরিবারের লোকেরা তাদেরকে শোনায় না?
একথা ঠিক যে, সরকার এসব বলে তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সরকারের উচিত, শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুবিধা ও ব্যবস্থাপনা দেওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীদেরও তো দায়িত্ব আছে। শিক্ষার্থীদেরও তো বিরূপ পরিবেশে, বিরূপ পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়ার এবং সামনে অগ্রসর হওয়ার মতো মানসিকতা ও সৎসাহস থাকা দরকার। এত অল্পতেই যদি তারা দাবি-দাওয়া নিয়ে নেমে যায়, জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে যদি আন্দোলন করে, পরীক্ষার পড়াশোনা না করে, তাহলে এটি জাতির জন্য দুঃখজনক বিষয়। অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজচিন্তকদের এসব বিষয়ে ভাবা দরকার।
এবারের শিক্ষার্থী আন্দোলনে হাওয়া দেওয়ার কাজ করেছে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের কিছু কথাবার্তাও। এটা ঠিক যে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শিক্ষার সকল স্তরে অরাজকতা দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ শিক্ষক এবং শিক্ষার সাথে জড়িত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ধরপাকড় করছেন, ধমকাচ্ছেন– এসব খবরও প্রচারিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। এসব কারণে ওই দুষ্কৃতিকারীরা যে তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ক্ষেপে আছে, এটাও তো তার জানা থাকা দরকার ছিল। অথচ এরই মধ্যে তিনি বিতর্কিত কথা বলে এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করার সুযোগ দিয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী গুণধর ও সৎ লোক বলে পরিচিত। কিন্তু কোনো মহৎ কাজ করতে হলে এবং বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে কাজ করতে হলে যে দৃঢ়তার সাথে সাথে মাথাও ঠান্ডা রাখতে হয়– এটা তিনি নিশ্চয় উপলব্ধি করবেন। প্রতিকূল পরিবেশে ভালো কিছু কাজ করতে হলে, কথা কম বলে কাজটাকে এগিয়ে নেওয়া, মুখের ভাষা যথাসম্ভব সংযত ও দরদি রাখা জরুরি। দায়িত্বশীলদের আচরণ থেকে শাসক মনে না হয়ে সমাজের প্রতি, জাতির প্রতি দরদি মনে হলে বেশি উপকার দেবে।
দেশের অনেকেই চায়, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী তাঁর দায়িত্বে থাকুন। তিনি তাঁর সংস্কার কাজ যতটুকু করতে পারেন এগিয়ে নিন। ভুলভ্রান্তি আছে, সেগুলো সংশোধনও করতে হবে। সংশোধনের সুযোগও আছে। কিন্তু অন্য শিক্ষামন্ত্রীদের সাথে বা ফ্যাসিবাদী আমলের কথা যদি চিন্তা করা হয়, সে তুলনায় এই শিক্ষামন্ত্রী চেষ্টা করে যাচ্ছেন– এটা অনেকেই বলছেন। কিন্তু সেগুলোর পাশাপাশি আচরণে রূঢ়তা না থাকা, দায়িত্বশীলতা থাকা, কম কথা বলা এবং কথায় নম্রতা থাকা সব সময় অপরিহার্য, বিশেষত বর্তমান এইচএসসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এর প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থী, যারা জীবনের বড় একটি মোড়ের মধ্যে আছে, তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, তারা যেন পাঠশালায় ফিরে যায়। দেশের শিক্ষা পরিস্থিতিকে এমন না বানিয়ে ফেলে যে, আন্দোলন করলেই, হাঁকডাক দিলেই নম্বর পাওয়া যাবে, পরীক্ষা না দিয়ে পাশ করা যাবে। কার মনে নেই, ফ্যাসিবাদী আমলের কথা, যখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই একটা তামাশায় পরিণত করা হয়েছিল। পরীক্ষা একটা তামাশায় পরিণত হয়েছিল। শিক্ষা ও পরীক্ষায় শুধু টাকা খরচ ছাড়া আর কোনো কারবার ছিল না।
অটো পাশ, বিনে পরীক্ষায় পাশ, প্রতি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস আর বিনে বাধায় ফ্রি স্টাইল নকলবাজির মহড়া ছিল এই দেশে। সেখান থেকে উত্তরণ করা না গেলে এই জাতির ভবিষ্যৎ চরম অন্ধকারে নিপতিত হবে। কারণ এই ছেলেমেয়েরাই তো ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটিতে যাবে। সেখান থেকে পাশ করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস-আদালতের দায়িত্ব নেবে।
শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে পড়াশোনায়। যারা ভালো শিক্ষার্থী, যারা পড়াশোনায় মনোযোগী, তাদেরকেও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। যে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই পাশ হয়ে যেতে চায়, খারাপ পরীক্ষা দিয়ে ভালো নম্বর পেতে চায়, তারা যেন ভুল পথে যেতে না পারে বা তাদেরকে কেউ যেন ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে।
আরেকটি কথা, আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ভুল প্রশ্নের জন্য পুরো মার্ক দেওয়ার যে ঘোষণা করেছেন, তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের তো খুশি করা গেল, কিন্তু যাদের গাফলতিতে প্রশ্নপত্রে ভুল থেকে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে– তা কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী জানাননি।
একটি বোর্ডের প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত হতে মূল প্রশ্নকারীর বাইরে নিরীক্ষকদলসহ আরও বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাই হয়। তারা তো ছোটখাটো ডিগ্রিধারী বা সামান্য পদের লোক নন। তাহলে এত চোখ ফাঁকি দিয়ে ভুল থেকে যায় কী করে! এটিকে নিতান্ত গাফলতি ও চরম অবহেলা ছাড়া আর কী বলা যায়। রাষ্ট্রের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ যাদের পেছনে ব্যয় হয়, তাদের এই চরম অবহেলার জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না– তা কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী জানাননি।
মনে রাখতে হবে, দায়িত্বহীন লোকেরা এভাবে বারবার ছাড় পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে এমন কাণ্ড আরও ঘটবে এবং সরকারকে প্রতিবারই এমন বিব্রতকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।