সম্পাদকীয়
শাপলা হত্যাকাণ্ড <br> ‖
প্রতি বছরই মে মাস আসে, কিন্তু শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না
বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে মে মাস। বিশ্বব্যাপী মে মাস প্রসিদ্ধ হয়েছে শ্রমিক অধিকারের মাস হিসেবে। বিশ্বের বহু দেশেই মে দিবস পালিত হয় শ্রমিকের অধিকারের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশে মে মাসের অন্য একটি আবেদন আছে। এ মাসকে স্মরণ করার অন্য একটি বড় প্রসঙ্গ রয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘শাপলা হত্যাকাণ্ড’। বিগত ৫ মে ২০১৩ সালে বাংলার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিবাদী ও ইসলাম-বিদ্বেষী সরকারের পেটুয়া বাহিনী নিরপরাধ, নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ, ঈমানদীপ্ত, রাসূলপ্রেমী মানুষদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে, সকল মিডিয়া বিচ্ছিন্ন করে দেশের রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছিল।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ১০ জুন ২০১৩-এ প্রকাশিত রিপোর্টে লিখেছে– “হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা অধিকারকে জানান, এ পর্যন্ত ২০২ জনের মৃত্যুর খবর তাঁরা পেয়েছেন এবং প্রায় ২৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এব্যাপারে চলমান অনুসন্ধানের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অধিকার নিহত ৬১ জনের নাম সংগ্রহ করেছে।” এ রিপোর্টের জেরে ফ্যাসিবাদী সরকার এ সংস্থাটির কর্ণধার আদিলুর রহমানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে হাসিনার পতনের পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নাম ও পরিচয়সহ ৯৩ জন শহীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। তালিকাটি প্রাথমিক খসড়া এবং এ সংখ্যা যাচাই-বাছাইয়ের পর আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। বস্তুত শহীদের সংখ্যা যে এ পর্যন্ত সামনে আসা সংখ্যা থেকে অনেক বেশি– ওই সময়ের ওয়াকিফহাল মহলের কাছে অজানা কিছু নয়।
এত কিছুর পরও এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি; প্রকাশ করা হয়নি এর মাস্টারমাইন্ডদের নাম-পরিচয়ও। এই ঘটনার ক্ষতিগ্রস্তরা তো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে; কিন্তু যে সংগঠনের মাধ্যমে নবীপ্রেমিকদের এ অভূতপূর্ব জমায়েত হয়েছিল, সে সংগঠনের নেতারা ফ্যাসিবাদী আমলে তো এ নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেইনি; বরং উল্টো ফ্যাসিবাদীদের সাথে সখ্যতা বজায় রেখে চলেছে। আর ফ্যাসিবাদ বিদায় হওয়ার পরও এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না তাদের পক্ষ থেকে। অবশ্য এ সংগঠন বা সংগঠনের নেতারা ভূমিকা রাখুক বা না রাখুক, উদ্যোগ গ্রহণ করুক বা না করুক, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার বাংলাদেশের জাতীয় দায়িত্ব বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
যে সরকার নিজেকে দায়িত্বশীল সরকার মনে করবে, সে সরকারেরই কর্তব্য হচ্ছে, এই নির্মম আগ্রাসন ও হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত করে দোষীদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। এটা যতদিন করা না হবে, ততদিন এই জাতির ওপর এর দায় থেকে যাবে। শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে শত বছর পেরিয়ে গেলেও এজন্য গোটা জাতি অপরাধী বলে বিবেচিত হবে।
সুতরাং নবনির্বাচিত সরকারের কাছেও দেশের সাধারণ জনগণ, দেশের ঈমানদার মানুষ, আল্লাহর রাসূল, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতিদের এই দাবি থাকবেই– যত দ্রুততম সময়ে সম্ভব এই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত করে দোষীদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক। জনগণ প্রতীক্ষায় থাকবে, এই বিচার কখন শুরু হচ্ছে এবং কখন বাস্তবায়ন হচ্ছে।
তেল নিয়ে তেলেসমাতি <br> ‖
সরকারের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে
বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার শুরু থেকেই ব্যাপক চাপে রয়েছে। বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সাথে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকট। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যার দরুন শত শত তেলের ট্যাংকার আটকা পড়ে। এই প্রণালি দিয়েই পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, চীন ও জাপানসহ আমাদের এ অঞ্চলের দেশগুলোর বেশিরভাগ তেল সরবরাহ করা হয়। সংগত কারণেই তেলের সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার কথা। আর বিভিন্ন দেশে সংকট দৃশ্যমানও হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এখানে ক্ষমতাসীনদের দাবি ও পরিসংখ্যান হল, বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট নেই। সরকার যেসকল সোর্স থেকে তেল সংগ্রহ করে, সেখানে কোনো ঘাটতি নেই। আরও বলা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় তেলের মজুদ অনেক বেশি আছে।
কিন্তু এই এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরকার প্রথমে বিভিন্ন কথা বললেও পরে তেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করে নিজের পূর্বের অবস্থানের ব্যাপারে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। একদিকে সরকার বলছে, সংকট নেই, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। বাস্তবেও জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ না থাকায় যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় তেল দিতে পারছে না। তেল সংগ্রহের জন্য কয়েক মাইল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, ২০ থেকে ২৪ ঘণ্টা, এমনকি এক থেকে দেড় দিন পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। এর পরও কেউ কেউ তেল না নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় তেলের অবৈধ মজুদের খবরও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, তেল বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিচ্ছন্ন ছিল না। তেলের যদি ঘাটতিই না থাকে, তাহলে পাম্পগুলো তেল সরবরাহ করতে পারছে না কেন? জনগণ তেল পাচ্ছে না কেন? তেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করা হল কেন? আর যদি ঘাটতি ও সংকট থেকেই থাকে, তাহলে এত রাখঢাকের প্রয়োজন কী ছিল? তেলের সংকট হওয়ার সুস্পষ্ট কারণ বিদ্যমান আছে। আন্তর্জাতিকভাবেই সরবরাহে ঘাটতি হচ্ছে। এর পরও সরকার রাখঢাক করে গেছে।
বিদ্যমান সংকটের কথা স্বীকার করে সরকার সহজেই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারত। তেলের রেশনিং করতে পারত। অ্যাপ বা কার্ডের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে সকল গাড়িকেই তেল দিতে পারত। এতে জনদুর্ভোগ কমত। মানুষকে দীর্ঘ লাইন ধরে কষ্ট করতে হত না। সরকারকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হত না।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছে, তিনি আগেও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তিনি সরকারের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারেননি। এবারও তিনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে জনমুখে বলাবলি রয়েছে। এসব দেখে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়, আমলাদের সঙ্গে সরকারের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বোঝাপড়ায় যথেষ্ট ঘাটতি আছে। হতে পারে আমলারা তাদের ব্ল্যাকমেইল করছে কিংবা বিগত স্বৈরাচারের অনুসারী বা ভিন্ন মতের আমলারা সরকারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। তারা সফলও হচ্ছে। যে সরকারের দায়িত্বশীলরা অসৎ আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তারা কখনো সফলতার মুখ দেখতে পারবে না। এ সরকারের একেবারে সূচনাকালেই এ ধরনের ব্যর্থতা খুবই দুঃখজনক।
জ্বালানি খাত খুবই স্পর্শকাতর। এর সঙ্গে দেশের সকল খাত জড়িত। বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি– সবই এর কারণে প্রভাবিত হয়। সরকার অস্বাভাবিকহারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি করায় ইতোমধ্যেই বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন ভাড়াসহ সব ধরনের পণ্যমূল্যই বৃদ্ধি পেয়েছে।
শেষ মুহূর্তে এসে প্রধানমন্ত্রী সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে সংসদ সদস্য নিয়ে একটি কমিটি করার কথা বলেছেন, যা সংকটের প্রথম দিনেই করা যেত। সংকটের শুরুতেই অসৎ ও অদক্ষ আমলাদের চিহ্নিত করে সরিয়ে দিয়ে ভালো লোকদের মাধ্যমে একটি সুন্দর সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা যেত। তাহলে এ সমস্যা সৃষ্টি হত না।
সরকারকে বুঝতে হবে, জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থন কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। আজ আছে তো কাল নেই। মানুষ যেভাবে মুহূর্তে সমর্থন দিতে পারে, তেমনি মুহূর্তে সমর্থন তুলেও নিতে পারে। অতএব সরকারকে সুশাসনের প্রতি নজর দিতে হবে। জনসেবায় বাধা সৃষ্টিকারী আমলাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো মন্ত্রী যদি অদক্ষতার পরিচয় দেয়, তাহলে কালবিলম্ব না করে তাকে সরিয়ে দিতে বা অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করতে কুণ্ঠাবোধ করা যাবে না।
আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আক্রমণাত্মক মনোভাব থাকা কাম্য নয়। দেশ পরিচালনার স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলকে নমনীয় হতে হবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব লালন করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি দলের দায়িত্বই বেশি। বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে চলা এবং ন্যূনতম একটা সমঝোতা রক্ষা করা সরকারি দলের দায়িত্বশীলদের কর্তব্য। অযথা এবং সামান্য বিষয় নিয়ে উত্তেজনা তৈরি করার সুযোগ একেবারে দেওয়া উচিত না।
এ দেশ জনগণের। আজ এক দল ক্ষমতায় আছে তো আগামী দিন আরেক দল ক্ষমতায় আসবে। যারা জনগণের সেবা করবে, জনগণের স্বার্থে কাজ করবে, তাদেরই জনগণ মনে রাখবে। অন্যথায় জনগণ তাদের ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেরি করবে না। বিষয়টি সবার মনে রাখা দরকার।