শাওয়াল ১৪৪৭   ||   এপ্রিল ২০২৬

বিতর্ক : যুক্তি ও প্রমাণ

জুলফিকার আহমদ চীমা

[গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতীয় লেখক জাভেদ আখতার ও একজন নওজোয়ান আলেমেদ্বীনের সাথে স্রষ্টার অস্তিত্ব বিষয়ে একটি টেলিভিশন বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্পষ্টতই ঐ মাওলানা সাহেব জাভেদ আখতারকে ধরাশায়ী করে ছাড়েন। বস্তুবাদী জগতের গুরুজনদের কাছে যা ছিল অনাকাক্সিক্ষত ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। জাভেদ আখতার এভাবে পরাস্ত হবেন, তা তারা চিন্তাও করতে পারেনি। তাই তাদের অনেকেই এ ঘটনাটি যত তাড়াতাড়ি দৃশ্যপট থেকে সরে যায়, সে অপেক্ষায় থেকেছেন। আবার মুসলিম দুনিয়ায় এমন কিছু লোকজনও আছেন, যারা নিজেদেরকে অনেক শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ভেবে থাকেন। অল্প-স্বল্প ধর্ম-কর্মও করে থাকেন তারা। অন্যদিকে আলেম-উলামা এবং ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের ঘৃণা লুকাতে পারেন না। এরা বর্তমানে লেবারেল শ্রেণি বলে পরিচিত। জাভেদ আখতার ও মুফতী শামায়েল বিতর্কের পর এদের অনেকের গা জ্বালাটাই বেশি দেখা গেল। একজন আলেমের কাছে একজন বুদ্ধিজীবী কেন হেরে যাবে! এটা তাদের গায়ে সয় না। যদিও মূল বিষয়ে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চান না। কারণ নিজেদেরকে তো তারা নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দেন না। তাই ঐ শ্রেণির লোকেরা বলাবলি ও লেখালেখি শুরু করলেন, আসলে জাভেদ সাহেব সেদিন বিতর্কের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যাননি। তিনি শামায়েলের এ কথায় অমুক জবাব দিতে পারতেন। ঐ কথার এভাবে জবাব দিতে পারতেন। এমন এমন প্রশ্ন করে শামায়েলকে আটকে দিতে পারতেন। এভাবে বিভিন্ন দেশে লিবারেল শ্রেণির লোকেরা নিজেদের মুখ ঢাকার চেষ্টা করে থাকেন। তাদেরই জবাবে এক্সপ্রেস নিউজ পত্রিকার খ্যাতিম্যান কলামিস্ট জুলফিকার আহমাদ চীমা কয়েকটি কলাম লেখেন।

আলকাউসারের পাঠকদের জন্য সেগুলো কিস্তি আকারে পেশ করা হচ্ছে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ]

নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এতদিনে তারা হারিয়ে বসেছে। আর বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন প্রজন্মও নিজেদের ইসলামী নাম গোপন করতে কিংবা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিক্ষুব্ধ ও চরম পরিস্থিতিতে পরিচিত অনেকে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। কেউ তো হিন্দু নারীকে বিবাহ করছেন, কেউ আবার জাভেদ আখতারের মতো প্রকাশ্যে ইসলামহীনতার ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। 

মোদি সরকারের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির জন্য জাভেদ আখতার আল্লাহর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেছেন এবং ইসলাম ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করে চলেছেন। মে ২০২৫ ঈ. পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ চলাকালে তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, পাকিস্তান ও দোজখের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হলে তিনি দোজখই বেছে নেবেন। তার বক্তব্যের পর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট মহলে জাভেদ আখতার সম্পর্কে তীব্র ঘৃণা তৈরি হয়েছিল।

প্রথম দৃষ্টিতে এ বিতর্ক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা অসম (Uneven) মনে হচ্ছিল। কারণ এর এক পক্ষে ছিল শব্দ নিয়ে খেলতে জানা এক কবি ও সংলাপকার। যে অলংকারপূর্ণ বাক্য ব্যবহারেও বেশ পটু। অন্যদিকে ছিলেন মাদরাসা পড়ুয়া এক তরুণ আলেম, যাকে দেখে মনে হয়, আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে সে অপরিচিত। আর ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তো একেবারেই অজ্ঞ। কিন্তু বিতর্কটিতে লাখো মানুষ নিজের চোখে দেখেছেন, সে তরুণ ইংরেজি পরিভাষায় পরিপূর্ণ পারদর্শী। নির্দিষ্ট বিষয়ের যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক আলোচনাতেও বেশ পারঙ্গম।

বিতর্কে জাভেদ আখতার শব্দ-চাতুর্যের আশ্রয় নিলেন এবং পুরোনো সে প্রশ্নগুলোই আওড়ালেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নাস্তিকরা আওড়ে আসছে। যেমন, ঈশ্বর যদি থাকেনই তাহলে পৃথিবীতে অশুভ কেন আছে? মানুষ কেন দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়?

তথাকথিত অন্ধ যুক্তিবাদীদের জিজ্ঞেস করা দরকার, অশুভ না থাকলে শুভকে চেনা যাবে কীভাবে? অন্ধকারই তো আলোকে পরিচিত করে তোলে। মন্দ দেখেই তো ভালোর পরিচয় পাওয়া যায়। জুলুম ও পাপ না থাকলে তো এ দুনিয়াই জান্নাতে পরিণত হত। আর এসব প্রশ্নের বিশদ জবাব তো বিশ্ব ও মানুষের স্রষ্টা তাঁর কিতাবে আগেই দিয়েছেন।

বিতর্কটিতে মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছে, জাভেদ আখতার অনেক শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য জানতে মুফতী শামাইলের শরণাপন্ন হয়েছেন। যা তার জ্ঞানের অগভীরতাকে স্পষ্ট করে তোলে এবং তার অবস্থানকেও পুরোপুরি উন্মোচিত করে দেয়। মুফতী  শামাইল এখনো তরুণ। বয়সের সঙ্গে অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতা বাড়লে তাঁর যুক্তিতে আরও দৃঢ়তা, গভীরতা ও ব্যাপ্তি আসবে। তবুও এ বিতর্কে মুফতী শামাইল জাভেদ আখতারের মতো অভিজ্ঞ লেখককে পুরোপুরি পরাজিত করেছেন। এক তরুণের হাতে জাভেদ আখতারের বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক এ পরাভব বেশ উপভোগ্যই লেগেছে।

বস্তুত আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব কোনো তর্ক-বিতর্কের বিষয় নয়। যাদের হৃদয়ে মোহর লেগে গেছে, যারা ঘৃণার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে চরম বিদ্বেষে আক্রান্ত, তারা হয়তো ‘আমি মানব না’ এমন হঠকারিতায় অটল থাকবে। কিন্তু কেউ পক্ষপাতমুক্ত হয়ে নিজের বুদ্ধি ও বিবেক ব্যবহার করলে তার চারপাশেই এমন অসংখ্য অকাট্য প্রমাণ পাবে, যা স্পষ্টতই একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়।

আল্লাহকে অস্বীকারকারীরা প্রকৃতিকেই (Nature) সবকিছুর স্রষ্টা মনে করে থাকে। তাদের দাবি, সবকিছু বস্তু থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখান থেকেই পুরো মহাবিশ্বের উদ্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হল, বস্তুতে জীবন কীভাবে এল? তাতে কে প্রাণের সঞ্চার করল? নাস্তিক কিংবা বিজ্ঞানীদের কাছেও এর কোনো উত্তর নেই। উপরন্তু বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন, প্রকৃতির কোনো চেতনা নেই। তাহলে যে প্রকৃতি নিজেই চেতনাহীন, সে কীভাবে সৃষ্টিকে চেতনা দান করবে? এর উত্তরও ‘না’। তাহলে মানুষকে চেতনা দিল কে? এর উত্তরও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর মহাবিশ্বের স্রষ্টা তাঁর নবীদের মাধ্যমে দিয়েছেন।

বুদ্ধি ও চেতনার অধিকারী মানুষ যখন দেখে, শত শত বছর ধরে সূর্য তার কক্ষপথে এবং পৃথিবীও তার কক্ষপথে ঘুরছে; কখনো সামান্যতম পরিবর্তন আসেনি। কখনো কোনো ত্রুটি বা বিঘ্নতা ঘটেনি। অথচ সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব সামান্য কম হলে পৃথিবীর সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে যেত। আর দূরত্ব বর্তমান থেকে অনেক বেশি হলে সবকিছু ঠান্ডায় জমে যেত। এতে কি একথা স্পষ্ট হয় না, সবকিছু এক মহা পরিকল্পনার অধীনে সৃষ্টি করা হয়েছে, সর্বত্র ভারসাম্য স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিটি জিনিস মানুষের টিকে থাকা ও বিকাশের জন্য অপরিহার্য পরিমাপে সৃষ্টি করা হয়েছে?

এটি কি এক মহান ব্যবস্থাপকের মহা কীর্তি নয়? মানুষ নিজের গঠন নিয়ে চিন্তা করলেই বিস্ময়ের এক বিশাল জগৎ উন্মোচিত হয়। হৃদয় (হার্ট), মস্তিষ্ক (ব্রেইন), যকৃত (লিভার), কিডনি, চোখ, কান বা জিহ্বার সব কার্যাবলি সম্পর্কে অবগত চিকিৎসকদের জিজ্ঞেস করলে তারা জোর গলায় বলবেন, ‘এই অঙ্গগুলো আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং নিজেরাই এত জটিল ও কঠিন কাজ শুরু করেছে’ এমন কথা বলা বা চিন্তা করাও চরম অজ্ঞতা ছাড়া কিছু নয়।

মানুষের মস্তিষ্কই (Brain) এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এতে রয়েছে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন। মাত্র ২০ ওয়াটের একটি সাধারণ বাল্বের সমপরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে মস্তিষ্ক এমন সব বিস্ময়কর কাজ সম্পন্ন করে, যা হয়তো সুপার কম্পিউটারও ঠিকভাবে করতে পারে না। মানুষের যকৃতকেও চিকিৎসকেরা Biological Marvel বা মানবদেহের এক ‘অভাবনীয় বিস্ময়’ বলে অভিহিত করেছেন। অঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রায় ৫০০টি কাজ সম্পাদন করে। এটি একধরনের রাসায়নিক কারখানা, যেখানে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ। এখান থেকেই শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, শর্করা, গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল তৈরি হয়। এটি প্রতি মিনিটে দেড় লিটার রক্ত পরিশোধন করে। এর কার্যপ্রণালীর জটিলতা ও ভারসাম্য দেখে বিশেষজ্ঞরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। নিঃসন্দেহে এসবই এক মহান স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রকের সৃষ্টিশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন, যাকে তিনি যথার্থভাবেই ‘আহসানু তাকবীম’ বলেছেন।

আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বশেষ গবেষণামতে, মানুষের হৃদয়ও চিন্তা করে। এতে রয়েছে ৪০ হাজারেরও বেশি নিউরন।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, হৃদয় কেবল রক্ত পাম্প করার যন্ত্র নয়; এটি বরং চিন্তা করে এবং সিদ্ধান্তও নেয়।

এ কথাটিই শত শত বছর আগে কুরআনে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে বোঝে না।’ [দ্র. সূরা আরাফা (০৭) : ১৭৯]

নাস্তিকরা এতদিন এ আয়াত নিয়ে আপত্তি করত যে, চিন্তা ও বোঝা তো কেবল মস্তিষ্কের কাজ।

ইউরোপে ধর্ম বা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী সেখানে  চার্চ ও যাজকদের দমন-পীড়ন অত্যন্ত কঠোর ছিল। সাধারণ মানুষ তাদের জুলুম ও অবিচারের শিকার হত। ফলে এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত চার্চের আধিপত্যের অবসান ঘটায়। যার দরুন ইউরোপে চার্চ ও চার্চ-সংশ্লিষ্ট সবকিছুর বিষয়ে প্রবল নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। আর আজও তা বিদ্যমান। তাই সেখানকার বিজ্ঞানীরা সৃষ্টির বিস্ময় প্রত্যক্ষ করার পর এক মহা সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করলেও স্পষ্টত তারা ঈশ্বর বা আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করতে দ্বিধা করেন।

বিতর্ক শেষে পাকিস্তানের লিবারেল শ্রেণি নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এরা মূলত নাস্তিক গোষ্ঠীরই অংশ। এদের অধিকাংশই জাভেদ আখতারের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং তাকে ‘উপকারী’ পরামর্শ দিতে থাকেন যে, তার কী বলা উচিত ছিল আর কোন্ যুক্তি দেওয়া উচিত হয়নি ইত্যাদি।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্য় বিশ্বাসী কেউ নাস্তিকের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতে বা তাকে সমর্থন করতে পারে না। যারা একজন নাস্তিককে পরামর্শ দেয়, তারা নিজেরাও যে একই চিন্তার অনুসারী তা তো স্পষ্ট। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানকার নাস্তিকরা যেমন কাপুরুষ, তেমনি মুনাফিকও। এদের বিপরীতে অন্তত জাভেদ আখতারের এ দিকটির প্রশংসা করা যায় যে, সে তার কুফরী ও অবিশ্বাস প্রকাশ্যে স্বীকার করে। পক্ষান্তরে এখানকার মুনাফিকরা ইসলামী আকীদার খোলস ধারণ করে, কিন্তু নিজেদের প্রকৃত বিশ্বাস প্রকাশ করার সাহস রাখে না এবং মানুষকে ধোঁকা দেয়।

[এক্সপ্রেস নিউজ থেকে

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫]

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement