আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
‖ জোটের রাজনীতি ও ভোটের রাজনীতি : কিছু নিবেদন
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। দেড় দশকের আওয়ামী স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদীর পতনের পর প্রায় বছর দেড়েক হল ক্ষমতার মসনদে আছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরই মধ্যে গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন আগামী সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঈ.-এ অনুষ্ঠিত হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই তারিখে চারটি বিষয়ে১ গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, বিভিন্ন দল কর্তৃক সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। দেশের বড়-ছোট আদর্শিক ও সাধারণ সকল দলের নেতাদের মধ্যেই এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। কীভাবে মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে পারবে এবং নিজের নামের পরে এমপি লিখতে পারবে, সে চিন্তায় তাদের ঘুম নেই। ক্ষমতার রাজনীতির এই যুগে এমপিত্বই যদি না পাওয়া যায়, তাহলে আর রাজনীতি করে লাভ কী?
মনে পড়ে গেল কারাবন্দি জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনুর কথা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের বড় শত্রু এবং বলা যায়, একমাত্র শত্রু ছিল জাসদ ও অন্যান্য বাম দলগুলো। অনেকেই বলে থাকেন, শেখ মুজিব হত্যার প্রেক্ষাপটও ওই বামদের আন্দোলনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। সে জাসদ ও বাম নেতাদেরই আবার পুনর্বাসন করেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। তাদেরকে আসন ছেড়ে দিয়ে শুধু এমপি হওয়ার সুযোগই দেননি; বরং হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রীও বানিয়েছেন। তাদের স্ত্রীদেরও করেছেন সংরক্ষিত আসনের এমপি। যখন ইনুকে মন্ত্রী করা হয়, কিছু বেরসিক সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে। তাদের প্রশ্ন, আপনারা তো বাংলাদেশের সূচনা লগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগের শত্রু ছিলেন। এখন তো একেবারে আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী হয়ে গেলেন। আপনারা যে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছিলেন, নীতিগতভাবে তো বর্তমান আওয়ামী লীগ সেখানেই রয়ে গেছে?!
এ প্রশ্নের জবাবে জাসদ নেতা ইনু একটুও লজ্জা পাননি (স্মরণ করুন সে বিখ্যাত উক্তি ‘বামদের লজ্জা থাকতে নেই।’) ইনুর সোজা জবাব, রাজনীতি কোনো আঞ্জুমানে মুফীদুল ইসলাম নয়। আপনি ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেলে সে স্বাদ নেবেন না কেন?
প্রশ্নকারী সাংবাদিকরা আর বেশি এগুতে পারেনি। এখন যতই দিন যাচ্ছে, ওই চিন্তা আর ইনুর একার থাকেনি; বরং দলমত নির্বিশেষে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার চিন্তা ও চেষ্টা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নেতাদের মধ্যে বহুগুণ বেড়ে গেছে। অথচ এই লোকদের অনেকেরই কোনো গণভিত্তি নেই। কারও কারও দল বড় হলেও ব্যক্তি হিসেবে জনগণের সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। অধিকাংশ দল তো অনেকটা কাগজে-কলমে। তাদের না আছে বড় কোনো সাংগঠনিক কাঠামো, না আছে যোগ্য নেতৃত্ব আর না তারা সারা বছর জনগণের সাথে মিশে বা জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই ভোটের সময় এলেই বড় দলগুলোর প্রয়োজন হয় দলীয় মনোনয়ন আর ছোট দলগুলোর কোনো বড় দলের সাথে জোট করা। এ যেন অনেকটা রীতি হয়ে গেছে। কয়েক দশক থেকেই চলছে এ খেলা।
জোট কেন হয়?
সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় একটি জোটের থাকার কথা নয়; একটি দলের থাকার কথা। কারণ প্রত্যেক দলেরই নিজস্ব চিন্তাধারা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের একটা ছক থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেসব দেশে মৌলিক বড় দল দুটি করেই রয়েছে। মানুষ জানে, লেবার ও কনজার্টিভ পার্টির কী চিন্তা। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তারা কী কী বিষয় প্রাধান্য দেবে আর ডেমোক্রেট ও রিপাবলিক পার্টি নিজ নিজ দেশে ক্ষমতায় গেলে কোন্ পথে হাঁটবে। তাই তাদের জোট হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলো (ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য, যেখানে রাজনীতিকদের ক্ষমতাই মুখ্য) বিগত কয়েক দশক থেকে জোটের রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে এর মৌলিক কারণ ক্ষমতাবানদের গণবিচ্ছিন্ন হওয়া। কারণ এসব অঞ্চলের ক্ষমতাবানেরা জনগণকে তেমন সন্তুষ্ট রাখতে পারে না। সীমাহীন দুর্নীতি, দলবাজি, ক্ষমতায় সাধারণ মানুষের কথা ভুলে যাওয়ার রোগ এখন এ অঞ্চলে এবং পৃথিবীর অনেক দেশেই ক্ষমতাবানদের মধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। যার দরুন কোনো বড় দলও এখন এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় বসতে পারবে– এমন সাহস পায় না। তারাও ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে– না জানি ছোট ছোট দলগুলোর কাছে ভোট ভাগাভাগি হয়ে আমাদের ভরাডুবি হয়। প্রতিপক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায়। তাই বিগত অনেকগুলো নির্বাচনই ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই বড় দলগুলোকেও নির্বাচনের আগে জোটের পথে হাঁটতে দেখা গেছে। এটি আশির্বাদ হয়েছে ছোট দলগুলোর জন্য, যে দলগুলোর নেতারা এককভাবে নির্বাচন করলে হয়তো কেউ জয়ী হতে পারবে না। অথবা ঘটনাক্রমে এক-দুজন জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তারাও এখন বড় দলগুলোর সাথে জোট প্রশ্নে পাকাপোক্ত দর কষাকষিতে লিপ্ত হয়ে থাকে।
আগে তো দেখা যেত, জোট হলেও কোন্ ছোট দল কোন্ বড় দলের দিকে যাবে– তা পূর্বেই অনুমান করা যেত। এটাকে বলা হত সমমনা। এখন আর সে অনুমানের সুযোগ নেই। মনোনয়ন দাখিলের আগ পর্যন্ত আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন না, কাদের জোট কাদের সঙ্গে হচ্ছে। এ যেমন–
اپنے اپنے بے وفاؤں نے ہمیں یک جا کیا
ورنہ میں تیرا نہیں تھا اور تُو میرا نہ تھا
নিজেদেরই অবিশ্বস্ত মানুষগুলো আমাদের একত্র করেছে।
নইলে না আমি তোমার ছিলাম আর না তুমিও আমার ছিলে।
অবস্থা হয়ে গেছে এক্কেবারে মাছ বাজারের মতো– একভাগা পুঁটিমাছ নেবেন? ডানের দোকানে দামাদামি করলেন। বামের দোকানেও করলেন। কার থেকে কতটুকু বাড়তি সুবিধা নিতে পারবেন, কে কয়টি মাছ বেশি দেবে, দাম-দস্তুরের অবস্থা কী হবে– তা দেখেই কেনার সিদ্ধান্ত হবে। এমন কোনো ব্যাপার নেই, অমুক দোকানদারের গায়ে তো আগে থেকে গন্ধ বেশি আছে, তার মাছগুলো পচা হওয়ার বদনামও রয়েছে; সুতরাং কিনতে হলে তো ভালো জনের কাছ থেকেই নিতে হবে– এখন আর এমন বিষয় নেই। এখন মূল কথা হচ্ছে, কে আমাকে বেশি আসন ছাড়বে। কার সাথে জোট করলে শুধু এমপি নয় সামনে মন্ত্রিত্বের স্বাদও পাওয়া যাবে। এখন সে যে-ই হোক। তার নীতি-আদর্শ, চিন্তা-চেতনা দেখার সময় নেই। ছোট দলওয়ালাদের পূর্বসূরিরা বা তারা নিজেরাই একসময়ে ওই বড় দলগুলোর সম্পর্কে কী কী নেতিবাচক মন্তব্য করে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী কী আন্দোলন করে গেছেন– এগুলোও বিবেচনায় আনার প্রয়োজন নেই। যাদের সাথে জোট করা হচ্ছে, তাদের বর্তমান চিন্তা-চেতনা, কথোপকথন, ছোট জোটকারীদের চিন্তা বা আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক কি না– সেটাও দেখার সুযোগ নেই।
এমনই প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় সংসদকে সামনে রেখে বাংলাদেশে জোটের রাজনীতি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এদেশে আগে কোনো বাস্তবমুখী নির্বাচন হলে (পাতানো নয়) জোট গঠন হত আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে। এবার যেহেতু দেড় দশকের অপকর্মের দায়ে আওয়ামী রাজনীতি সাময়িক নিষিদ্ধ রয়েছে, তাই এখন আর সে অবস্থা নেই। এখন দেশের একক বড় দল হয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল বিএনপি। বিএনপি অনেকটা ফ্রিতেই এই অবস্থানে চলে এসেছে। কারণ যদিও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দেড় দশকেরও বেশি সময়ের টানা স্বৈরশাসনের শুরুর দিকে আন্দোলন করতে গিয়ে ব্যাপক গুম, খুন ও জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল; কিন্তু শেষের দিকে এসে তারা অনেকটা দমে গিয়েছিল। তাদের রাজনীতি বন্দি হয়ে গিয়েছিল দলীয় কার্যালয়, প্রেস রিলিজ ও সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মধ্যে। তাই ২০২৪ সনে জুলাই ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে দলীয়ভাবে বিএনপিকে তেমন প্রত্যক্ষ করা যায়নি। কিন্তু অভ্যুত্থান সফল হওয়ার প্রথম বেনিফিসিয়ারিই হয়েছে তারা। রাতারাতি তাদের কারাবন্দি নেতা-নেত্রীগণ ছাড়া পেয়ে গেছেন। পুরো দেশে আওয়ামী লীগের হরেক প্রকারের দায়দায়িত্ব ও শূণ্যস্থান (চান্দাবাজী, দলীয় আধিপত্যবিস্তার, স্থানীয় প্রশাসনে বল প্রয়োগ ইত্যাদি) স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা দখলে নিয়ে নিয়েছে। এরপর আর তাদের পেছনে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে প্রশাসনের অনেকে এবং সাবেক আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আওয়ামী ও বাম ধারার ইসলাম-বিদ্বেষী যাবতীয় গণমাধ্যমও এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই তাদের হয়ে কাজ করছে। তারাও কোনো রাখঢাক করছে না। নিজেদেরকে যত বেশি সেক্যুলার প্রকাশ করা যায়, ইসলাম-বিদ্বেষী মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে যত জোরালো কথা বলা যায়– তাতে কোনো কার্পণ্য করছে না।
অন্যদিকে ইসলামের নামে রাজনীতি করা একটি দলের তো রাতারাতিই আসমান ছুঁয়ে ফেলার অবস্থা! সাংগঠনিকভাবে সবল ও সুশৃঙ্খল হওয়ার সুনাম থাকলেও জনসমর্থন বা জনসম্পৃক্ততার বিবেচনায় বিগত সময় কখনো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় বসার মতো অবস্থান তৈরি হয়নি। কিন্তু এবার শুধু সে দলটিই নিজেদেরকে ক্ষমতাপ্রত্যাশী মনে করছে না, বরং তাদের মতো আরও অনেকে আগামীতে জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে পাচ্ছে। বিএনপি কর্তৃক তাদের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম জিয়াউর রহমানের নীতি আদর্শহীন কার্যকলাপ এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এনসিপির সেভাবে সংগঠিত হয়ে উঠতে না পারা জামায়াতের জন্য বড় দরজা খুলে দিয়েছে।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কোন্ দল ক্ষমতার মসনদে বসবে– সেটি তো সময়ই বলে দেবে; কিন্তু নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্ব থেকেই জামায়াত নিজে এবং আরও অনেকেই তাদেরকে ক্ষমতার মসনদে দেখতে পাচ্ছে। তাই জামায়াতে ইসলামীকে প্রধান দল বিবেচনায় নিয়ে তাদের সাথে আরও কিছু দলের জোটবদ্ধ হওয়ার খবরও শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি ভাগে বিভক্ত হচ্ছে : এক. বিএনপি কেন্দ্রিক। দুই. জামাত কেন্দ্রিক। বিএনপি যদিও এবার আনুষ্ঠানিক জোটের ঘোষণা দেয়নি; তবুও তারা বিভিন্ন দলের জন্য কিছু আসন ছেড়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে। যার মধ্যে যেমন রয়েছে বামপন্থি সিপিবির একাংশ, রয়েছে সাবেক আওয়ামী ঘরানার নেতাদের দল। তেমনি আছে কওমী ধারার ইসলামপন্থি দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও।
অন্যদিকে এ কথাগুলো লেখা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও বলা হচ্ছে কওমীভিত্তিক বিভিন্ন ইসলামী দল সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর সাথে এবার জোটবদ্ধ নির্বাচনের দিকে এগুচ্ছে। এসব প্রেক্ষাপটে মাসিক আলকাউসার ও মারকাযুদ দাওয়াহর শুভাকাক্সক্ষী ও দ্বীনদার মুসলমানদের অনেকে বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে হাজির হচ্ছেন। মারকাযুদ দাওয়াহর মাসিক দ্বীনী মাহফিলগুলোতেও প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে ভোট কাকে দেওয়া হবে সে প্রশ্ন রেখেছেন অনেকে। আলকাউসারের আগামী সংখ্যায় শরীয়তে ভোটের হুকুম এবং ভোট কাকে বা কাদেরকে দেওয়া উচিত– সে বিষয়ে মৌলিক নির্দেশনা প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।
আজকের নিবন্ধে আমরা ভোট-পূর্ব জোটের রাজনীতি সম্পর্কে দুয়েকটি কথা আরজ করব। এ বিষয়ে অবশ্য ২০১৮ ঈ. সনের নির্বাচনের পূর্বে (যেটি কি না পরবর্তীতে রাতের নির্বাচনের খেতাব পেয়েছিল) আলকাউসারের ডিসেম্বর ২০১৮ ঈ. সংখ্যায় একটি যৌথ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, ‘ইসলামী রাজনীতি করতে হলে জনগণের কাছে পৌঁছতে হবে’। সে সাক্ষাৎকারের কথাগুলো বর্তমান সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক। তাই এই লেখায় সে কথাগুলোর বেশি পুনরাবৃত্তি না করে ওই সাক্ষাৎকারটি নতুন পাঠকদের জন্য পুনঃপ্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কৌতূহলী পাঠক সে সাক্ষাৎকার থেকেও নিজেদের অনেক প্রশ্নের জবাব পাবেন আশা করি।
আজকে আমরা যা আরজ করতে চাই তা হচ্ছে, এবারে জোটের ধরন পূর্বের থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির হচ্ছে। একদিকে যেমন বিএনপি কোনো রাখ ঢাক না করেই সেক্যুলার, ধর্মবিদ্বেষী গোষ্ঠী এবং একটি ইসলামী দলের সাথে যৌথ নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, যেমনটি তাদের ক্ষেত্রে আগে দেখা যায়নি। আগে তাদের জোট হত সমমনাদেরকে নিয়েই। কিছুটা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন দলগুলোকে নিয়ে। এবার কিন্তু তারা মহা উদার (!)।
অন্যদিকে কওমী ধারার বেশ কয়েকটি দল, যাদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস উল্লেখযোগ্য জোটবদ্ধ হচ্ছে সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর সাথে। জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক দল। এর নেতৃত্ব তৃণমূল থেকে তৈরি হয়ে আসে। যাদের চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতা এবং ইসলামী পড়াশোনার মূল ভিত্তি মওদুদী সাহেবের লিখিত তাফসীর ও অন্যান্য বইপত্র এবং তারই আদর্শের অনুসারী দলীয় সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন নেতাদের পুস্তক-পুস্তিকা। আর মওদুদী সাহেবের ইসলামের মৌলিক বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও ইতিহাস পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গোড়া থেকেই উপমহাদেশের নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের ছিল ব্যাপক আপত্তি। তারা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর লেখাগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সেসবের সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে অনেকে স্বতন্ত্র বই লিখেও দালীলিকভাবে তার বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর খণ্ডন করে জনগণকে সতর্ক করেছেন। ওই ধারাবাহিকতায় কওমী ধারার উলামা তলাবা এবং কওমী রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে দূরত্ব চলে আসছে।
২০০১ সনের নির্বাচনে যদিও বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোটে জামায়াত ও কওমী ধারার ইসলামী ঐক্যজোট পাশাপাশি ছিল, কিন্তু তার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে যেমনিভাবে জামায়াত জোটের প্রধান দল ছিল না, তেমনি ওই নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী জালিমশাহীদের ঐক্যবদ্ধ মোকাবেলা করা অনেকে আবশ্যকীয় মনে করেছিলেন। এবার কিন্তু তেমন প্রেক্ষাপট নেই।
কওমী ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর হাল-হাকীকত নিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। একই চিন্তা-চেতনা ও একই দাবি নিয়ে রাজনীতি করলেও তাদের বহুদলে বিভক্তি বরাবরই ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে কষ্টের কারণ হয়ে আছে। এছাড়া সাংগঠনিক তৎপরতার অনুপস্থিতি, জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা না থাকা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, সত্যিকারের লিডারশিপ তৈরি না হওয়া এবং যুগ যুগ থেকে রাজনীতি করে এলেও নিজ পায়ে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জিত না হওয়ায় এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, যারা কওমী আলেমদেরকে শ্রদ্ধা করে, তাদের দ্বীনী খেদমতগুলোতে সহযোগিতা ও সমর্থন জোগায়, তারা কওমী ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও ব্যবস্থাপনায় চরমভাবে হতাশ। কওমী রাজনীতির এ অনৈক্য ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই তারা নির্বাচন এলেই পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে। কারও সাথে জোট করে দু-চারটি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে যাওয়ার আশায় বুক বাঁধে। তা করতে গিয়ে কখনো কখনো আদর্শের জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়। যা ইসলামপন্থি অনেকের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে। একটি দল বিএনপির বর্তমান চেহারা ও তাদের আচার-আচরণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই তাদের থেকে আসন চেয়ে নিচ্ছে। অথচ কীসের ভিত্তিতে তাদের সাথে ঐক্য করা হল, ভবিষ্যতে বিএনপি ইসলামের জন্য কী কী করবে এবং ইসলামবিরোধী কী কী করবে না আর ইসলামী দলটির প্রার্থীরা যদি এমপি হয়ে যায় এবং বিএনপি যদি ক্ষমতাসীন হয়, তখন তাদের তৈরি আইন-কানুন ও সিদ্ধান্তসমূহের দায়িত্ব এ দলটি নেবে কি না– সেসব বিষয়ে কিন্তু তারা কোনো কিছুই মানুষকে জানাচ্ছে না। অনেকেই বলছেন, তাদের এগুলো নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? তারা আসন পেলেই তো খুশি। তাদের কোনো কোনো মনোনয়ন-প্রত্যাশী ব্যক্তির কথাবার্তা, বিএনপির লোকদের মা-বাবা ডাকা দেখলে তো ওই প্রশ্ন পর্যন্ত যেতেই হয় না যে, তারা হাল আমলের বিএনপির সাথে ইসলামের স্বার্থে জোটবদ্ধ হচ্ছে।
অন্যদিকে বাকি কয়েকটি কওমী ধারার রাজনৈতিক দলের জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো লিখিত চুক্তি হল কি না? তাও এখনো জানা যায়নি। কীসের ভিত্তিতে এ জোট হচ্ছে। জামায়াত তাদের এতদিন থেকে লালন করে আসা ও দীক্ষা নিয়ে আসা মওদুদীবাদ থেকে সরেছে কি না– তা-ও কিন্তু ধর্মপ্রাণ লোকদেরকে জানানো হয়নি। বরং যা ধারণা করা হয়েছিল, কোনো কোনো আলেম নেতা ইতিমধ্যেই জামায়াতের পক্ষে সাফাইমূলক বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। তাই কওমী ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাড়ছেই।
জোট করা কি অনিবার্য?
আদর্শের ঐকমত্য ছাড়া জোট করার অর্থ কী? ইসলামী দলগুলো তো একটি আদর্শ লালন করে। তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদা ও শরীয়তের ব্যাখা অনুসরণ করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করার কথা বলে। তো তারা কীভাবে নিজ আদর্শের বাইরের দলের সাথে জোটবদ্ধ হতে পারে? ভবিষ্যতে ওই জোট ক্ষমতায় এলে তারা কি এদের আদর্শ মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করবে? সেক্ষেত্রে যদি নির্বাচন করতেই হয়, তাহলে মোটামুটি সম্ভাবনাময় সীমিত আসনে একক প্রার্থী দিয়েও তো নির্বাচন করা যায়। উচিত তো একই ঘরানার ইসলামী দলগুলো মিলে একটি দল হয়ে যাওয়া। সেটি করতে যদি বিলম্বও হয়, তবে নিজেরা মিলেও তো জোট করে সীমিত আসনে নির্বাচন করা যায়। তা না করে ইসলামী চিন্তা ও ইসলামী কথা এবং ইসলামী লেবাস নিয়ে যেনতেন গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ হলে সাধারণ রুচিতেও তো...!
এমপি হওয়া কি এতই জরুরি?
পুরো পাঁচ বছর রাজনীতির ময়দানে তৎপরতা থাক বা না থাক জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়া হোক বা না হোক, নির্বাচন এলেই অনেককে এমপি হওয়ার চেষ্টায় দৌড়ঝাঁপ দিতে দেখা যায়। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে আদাজল খেয়ে মনোনয়নের জন্য নেমে যান অনেকে। পার্থিব উদ্দেশ্য ও রাজনীতি করা ক্ষমতাকেন্দ্রিক গোষ্ঠীগুলোর জন্য এটি আর কোনো ব্যাপার না। মুখে যাই বলুক, তাদের রাজনীতি যে মোয়া, মন্ডা, হালুয়া-রুটি আর ক্ষমতার দাপটের উদ্দেশ্যে, তা তো রাজনীতি করে না– এমন সাধারণ মানুষও বোঝে। কিন্তু যারা ইসলামের জন্য রাজনীতি করে, তারা কি যেনতেনভাবে পদ-পদবি অর্জন করতে পারে? ইসলামের দৃষ্টিতে পদ-পদবিগুলোর কি কোনো দাবি ও জিম্মাদারি নেই? আদর্শহীন বা ভিন ঘরানার লোকদের সমর্থন নিয়ে, তাদের সহায়তায় ও করুণায় সংসদে যেতে পারলেও ভালো কিছু করার সুযোগ কতটুকু তৈরি হয়! অতীতের ইতিহাস কী বলে? বিভিন্ন সময় তো বরং উল্টোটি ঘটতে দেখা গেছে? তাই যদি এক-দুটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না দেওয়া হয়, এতে কি খুব একটা ক্ষতি হয়ে যাবে?
কিছু যুক্তি
কেউ কেউ বলছেন আগামী নির্বাচনে যাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের সাথে বৈরিতা তৈরি না করে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার উদ্দেশ্যে তারা জোট করেছেন। যুক্তিটি কতটুকু শক্তিশালী?
কারও সাথে আমার বৈরিতা নেই প্রমাণের জন্য কি তার সাথে ভোটের রাজনীতিতে যোগ দিতে হবে? সম্ভবত এ যুক্তিতেই খেলাফত মজলিসের নির্বাচনী জোট হয়েছিল ২০০৬ সনে আওয়ামী লীগের সাথে। তখন কোনো কোনো আলেমের মুখে সেক্যুলারিজমের নতুন ব্যাখ্যাও শোনা গিয়েছিল। অবশ্য এক/এগারো সরকারের সময় যখন আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে, তারা এখন এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারবে, তখন তারা একতরফাভাবে জোট ভেঙে দেয়– যাতে খেলাফত মজলিসও রক্ষা পেয়ে যায় জঘন্য দুর্গন্ধ গায়ে মাখা থেকে। সে আওয়ামী লীগের পরবর্তী ইতিহাস সকলেরই জানা।
তো যদি কওমী ধারার ইসলামী দলগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগে নির্বাচনের প্রার্থী না দেয় অথবা এককভাবে সাধ্যমতো সীমিত আসনে মোকাবেলা করে, তাতে অন্যদের সাথে বৈরিতা তৈরি হওয়ার তো কিছু নেই। ইসলাম তো কারও সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে বলে না। কিন্তু তারা যদি ইসলাম পরিপন্থি কিছু করে অথবা ইসলাম পরিপন্থি গোষ্ঠী বা তাদের কাজকে যদি ক্ষমতাসীনরা পৃষ্ঠপোষকতা বা সমর্থন দেয়, সে ক্ষেত্রে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে সাথে নিয়ে এ দলগুলো প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এ নীতি তো বরং জোটবদ্ধ হওয়া থেকে আরও সহজ। জোটে থাকলে তো চাইলেও অনেক কিছু পারা যায় না। এসব কিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ মনে করে, ইসলামপন্থি দলগুলো আদর্শহীন জোট থেকে বিরত থাকুক। তারা নির্বাচন করতে হলে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে সীমিত আসনে করতে পারে। কারও সাথে লড়াই-ঝগড়া না করে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যদি তারা ভোট পেয়ে যায়, তাহলে তো ভালো। না পেলেও হারানোর তেমন কিছু থাকবে না। কিন্তু কেবলই ক্ষমতাকেন্দ্রিক আদর্শহীন গাঁটছড়া বাঁধার ক্ষতিকর দিকগুলো থেকে তো বাঁচা যাবে।
আজ ডিসেম্বরের ২১ তারিখ। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আসতে সপ্তাহখানেক বাকি। দেখা যাক, শেষতক দলগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয়? l
টীকা
১. চারটি বিষয় হল :
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ
গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছেÑ সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত জানাবেন। (বিবিসি বাংলা, ১৩ নভেম্বর ২০২৫; গণভোট সংক্রান্ত পরিপত্র-১, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫)