রজব ১৪৪৭   ||   জানুয়ারি ২০২৬

তাদের প্রভাবে দ্বীন-ঈমান থেকে পিছিয়ে থাকব!

মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম

কুরআন কারীমের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তাআলা জান্নাতী ও জাহান্নামীদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন জান্নাতীদের নায-নিআমতের কথা জাহান্নামীদের দুঃখ ও আযাবের কথা কোথাও সংক্ষেপে, কোথাও সবিস্তারে এ কথাও কুরআনে আছে যে, জান্নাতীগণ পরস্পরে খোশ-আলাপে মেতে উঠবেন জান্নাতের নিআমতরাজি উপভোগ করতে করতে দুনিয়ার জীবনের গল্পসল্পও করবেন

এমনই এক আসরে এক জান্নাতী অন্যদের বলবে

اِنِّیْ كَانَ لِیْ قَرِیْنٌ، یَّقُوْلُ اَىِٕنَّكَ لَمِنَ الْمُصَدِّقِیْنَ، ءَاِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَّ عِظَامًا ءَاِنَّا لَمَدِیْنُوْنَ.

আমার এক সাথি ছিল, সে (আমাকে) বলত, সত্যিই কি তুমি তাদের একজন, যারা (আখেরাতের জীবনকে) সত্য মনে করে

আমরা যখন মরে মাটি ও অস্থিতে পরিণত হব, তখন কি বাস্তবিকই আমাদেরকে (আমাদের কৃতকর্মের) প্রতিফল দেওয়া হবে? সূরা সাফ্ফাত (৩৭) : ৫১-৫৩

অর্থাৎ ওই জান্নাতী অন্যদের বলবে, দুনিয়ায় আমার এক সাথি আমাকে তাওহীদ, আখেরাত ও দ্বীন-ঈমানের বিষয়ে ভুলভাল বোঝানোর চেষ্টা করত, কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে হেফাযত করেছেন তার বিভ্রান্তিতে আমাকে জড়াননি তোমরা কি তাকে দেখতে চাও?

তখন সে জাহান্নামে উঁকি দিয়ে তার সাথিকে দেখতে পাবে দোযখের আগুনে নিপতিত তাকে বলবে

تَاللهِ اِنْ كِدْتَّ لَتُرْدِيْنِ وَلَوْ لَا نِعْمَةُ رَبِّيْ لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِيْن.

অর্থাৎ তুমি তো আমাকেও ধ্বংস করতে চেয়েছিলে আল্লাহ তাআলার অপার দয়ায় আমি রক্ষা পেয়েছি নতুবা ঈমান ও হেদায়েতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে আমিও হয়তো তোমার মতো পাকড়াও হতাম এবং এই ভয়ানক আযাবে নিপতিত হতাম (দ্র. সূরা সাফ্ফাত (৩৭) : ৫৬-৫৭)

দুষ্ট সঙ্গীর প্রভাবে দ্বীন থেকে বিচ্যুতি

দ্বীন-শরীয়তের ওপর সুন্দরভাবে চলার জন্য সঙ্গী-সাথি ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজ ও পরিবেশ-প্রতিবেশেরও প্রভাব থাকে ভালো বন্ধু যেমন দ্বীন-ঈমানের পথে সহযোগিতা করতে পারে, তেমনি একজন দুষ্ট বন্ধু জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে নফস ও কুপ্রবৃত্তির প্ররোচনায় বা শয়তানের ধোঁকায় যেমন নেক কাজে অবহেলা করা হয়, তেমনি কখনো সঙ্গী-সাথির পাল্লায় পড়েও দ্বীন-শরীয়ত থেকে দূরে থাকা হয় বন্ধুরা নামাযে যায় না, একা আমি গেলে অন্যরা ঠাট্টা করবে এই ভয়ে নিজেকে দ্বীন-ঈমান থেকে পিছিয়ে রাখা হয় কোনো মেয়ে ভাবতে পারে, অন্যরা বোরকা পরে না, পর্দা করে না; একা আমি করলে অন্যরা কী বলবে? এমন অসংখ্য অজুহাতে আমরা দ্বীনের পথে অগ্রসর হতে পারি না

কুরআনের বার্তা হল, ব্যক্তি বা সমাজ অথবা নফস ও শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় বন্ধুত্ব যদি দ্বীন-ঈমানের পথে প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে সেই বন্ধুত্ব থেকে সরে আসা উচিত! কারণ মহা বিপদের দিন কেউই আমার কোনো কাজে আসবে না বরং আল্লাহ ও রাসূলের বিধান না মেনে নিজের প্রতি জুলুম ও অবিচারের দরুন নির্মম পরিণতির জন্য সেদিন কেবল আক্ষেপই করতে হবে আল্লাহ তাআলা বলেন

وَ يَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلٰي يَدَيْهِ يَقُوْلُ يٰلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُوْلِ سَبِيْلًا.

আর যেদিন জালেম ব্যক্তি (মনস্তাপে) নিজের হাত কামড়াবে এবং বলবে, হায়! আমি যদি রাসূলের সাথে পথ ধরতাম

يٰوَيْلَتٰي لَيْتَنِيْ لَمْ اَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيْلًا.

হায় আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুক ব্যক্তিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম!  সূরা ফুরকান (২৫) ২৭-২৮

অর্থাৎ যদি রাসূলের অনুসরণ করতাম এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী সরল সঠিক পথে চলতাম, তবে আজ এই আযাব থেকে আমি মুক্তি পেতাম!

জীবনে সঙ্গদোষের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এজন্য কুরআন মাজীদে সৎসঙ্গ গ্রহণের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে বিভিন্ন হাদীসেও সৎ ও অসৎ সঙ্গের লাভ-ক্ষতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে সতর্ক করা হয়েছে, শয়তান (তা মানব শয়তানই হোক বা জিন শয়তান) মানুষকে ধোঁকা ও প্ররোচনা দিয়ে বিপথগামী করে, পরে মুসিবতের সময় দূরে সরে যায় দুনিয়াতেও এ রকম করে, আখেরাতেও তাই করবে

নেতার কথায় শরীয়ত না মানা

দ্বীন-ঈমানের ওপর চলার পথে কখনো কখনো ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালীরা বাধা হয়ে দাঁড়ায় নিজে দাড়ি রাখতে চায়, কিন্তু অফিসের বস পছন্দ করে না  ভালো হয়ে চলতে চাই, কিন্তু উপরোস্ত নেতা-নেত্রীরা জুলুম করতে বাধ্য করে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রোযা রাখতে চায়, কিন্তু মা-বাবা রোযা রাখতে দেন না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে পর্দা করতে চাই, কিন্তু শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষ তা মেনে নেয় না এমন অনেক ক্ষেত্রেই ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালীদের থেকে বাধার সম্মুখীন হতে হয় অথচ কিয়ামতের কঠিন দিনে তাদের কেউই কোনো উপকার করতে পারবে না সেদিনের পরিণতির কিছু চিত্র আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে এভাবে তুলে ধরেছেন

اِذِ الظّٰلِمُوْنَ مَوْقُوْفُوْنَ عِنْدَ رَبِّهِمْ، يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ اِلٰي بَعْضِ ِالْقَوْلَ يَقُوْلُ الَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا لَوْ لَاۤ اَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِيْنَ.

যখন জালেমদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে আর তারা একে অন্যের কথা রদ করবে (দুনিয়ায়) যাদেরকে দুর্বল ভাবা হত তারা ক্ষমতাদর্পীদের বলবে, তোমরা না হলে আমরা অবশ্যই ঈমানদার হয়ে যেতাম

قَالَ الَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا لِلَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْۤا اَنَحْنُ صَدَدْنٰكُمْ عَنِ الْهُدٰي بَعْدَ اِذْ جَآءَكُمْ بَلْ كُنْتُمْ مُّجْرِمِيْنَ.

ক্ষমতাদর্পীরা যাদেরকে দুর্বল ভাবা হত তাদের বলবে, হেদায়েত তোমাদের কাছে এসে যাওয়ার পর আমরাই কি তা থেকে তোমাদের বাধা দিয়ে রেখেছিলাম? মূলত তোমরা নিজেরাই ছিলে অপরাধী

وَقَالَ الَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا بَلْ مَكْرُ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ اِذْ تَاْمُرُوْنَنَاۤ اَنْ نَّكْفُرَ بِاللهِ وَنَجْعَلَ لَهٗۤ اَنْدَادًا وَاَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَاَوُا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الْاَغْلٰلَ فِيْۤ اَعْنَاقِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا  هَلْ يُجْزَوْنَ اِلَّا مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ.

যাদেরকে দুর্বল মনে করা হয়েছিল তারা ক্ষমতাদর্পীদের বলবে, না, বরং এটা তো তোমাদের দিবা-রাত্রের চক্রান্তই ছিল (যা আমাদেরকে হেদায়েত থেকে ফিরিয়ে রেখেছিল), যখন তোমরা আমাদেরকে আদেশ করছিলে, আমরা যেন আল্লাহকে অস্বীকার করি এবং তাঁর সাথে (অন্যদের) শরীক সাব্যস্ত করি তারা যখন আযাব দেখবে তখন তারা অনুতাপ গোপন করবে আর কুফরী যারা করেছিল আমি তাদের সকলের গলায় বেড়ি পরাব তাদেরকে তো কেবল তাদের কৃতকর্মেরই প্রতিদান দেওয়া হবে [দ্র. সূরা সাবা (৩৪) : ৩১-৩৪]

অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন

وَبَرَزُوْا لِلهِ جَمِيْعًا فَقَالَ الضُّعَفٰٓؤُا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْۤا اِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ اَنْتُمْ مُّغْنُوْنَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ اللهِ مِنْ شَيْءٍ.

আর সমস্ত মানুষ আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে যারা (দুনিয়ায়) দুর্বল ছিল, তারা বড়ত্ব প্রদর্শনকারীদের বলবে, আমরা তো তোমাদেরই অনুগামী ও অনুসারী ছিলাম এখন কি তোমরা আমাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে একটু বাঁচাবে?

অর্থাৎ দুনিয়াতে তোমরা মাতব্বর হয়ে বসেছিলে আর আমরা তোমাদের তাঁবেদারি করতাম আজ এই সংকটের মুহূর্তে কিছুটা উপকার কর!

قَالُوْا لَوْ هَدٰىنَا اللهُ لَهَدَيْنٰكُمْ  سَوَآءٌ عَلَيْنَاۤ اَجَزِعْنَاۤ اَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَّحِيْصٍ.

তারা (সরদার-মাতব্বররা) বলবে, আল্লাহ যদি আমাদেরকে হেদায়েত দান করে থাকতেন, তবে আমরাও তোমাদের হেদায়েত দিতাম এখন আমরা চিৎকার করি বা সবর করি উভয় অবস্থাই আমাদের জন্য সমান আমাদের নিষ্কৃতি লাভের কোনো উপায় নেই সূরা ইবরাহীম (১৪) : ২১

একই অবস্থা হবে জাহান্নামেও যারা দুনিয়াতে নেতা-নেত্রী ও প্রভাবশালীদের অনুসরণ করত, জাহান্নামেও তারা নেতা-নেত্রী ও অনুসরণীয় লোকদের কাছে সাহায্য চাবে আল্লাহ বলেন

وَاِذْ يَتَحَآجُّوْنَ فِي النَّارِ فَيَقُوْلُ الضُّعَفٰٓؤُا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْۤا اِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ اَنْتُمْ مُّغْنُوْنَ عَنَّا نَصِيْبًا مِّنَ النَّارِ.

আর আপনি সেই সময়কে স্মরণ রাখুন, যখন তারা আগুনের ভেতর পরস্পর বিতর্ক করবে সুতরাং (দুনিয়ার) দুর্বলগণ আত্মগর্বী প্রভাবশালীদের বলবে, আমরা তো তোমাদের অনুগামী ছিলাম তা তোমরা কি আমাদের থেকে আগুনের কিছু অংশ প্রতিহত করবে? অথবা নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে?

قَالَ الَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْۤا اِنَّا كُلٌّ فِيْهَاۤ  اِنَّ اللهَ قَدْ حَكَمَ بَيْنَ الْعِبَادِ.

আত্মগর্বী প্রভাবশালী লোকেরা বলবে, আমরা সকলেই জাহান্নামে আছি আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করে ফেলেছেন  সূরা মু’মিন (৪০) : ৪৭-৪৮

 

সমাজ ও লোক-নিন্দার ভয়

দ্বীন-ঈমানের পথে কখনো বাধা হয় সমাজ ও ভ্রান্ত রেওয়াজ আমরা অনেক সময় আল্লাহ ও রাসূলের বিধান না মেনে সামাজিকতার অজুহাত দেই যে, সমাজের বাইরে যাব কীভাবে? লোকে কী বলবে?

এ প্রসঙ্গে মুমিনদের সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের কেউ যদি নিজ দ্বীন থেকে ফিরে যায়, তবে আল্লাহ এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে আর তাদের আরেকটা গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকবে

وَ لَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَآىِٕمٍ .

তারা কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবে না

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন

اِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوا الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَ يُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ.

তোমাদের বন্ধু তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা বিনীত হয়ে সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয় সূরা মায়িদা (০৫) : ৫৫

কাজেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও ভালবাসা এবং নিজের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে দ্বীন-ঈমানের পথেই চলা উচিত কারও প্ররোচনা বা ভয়ে দ্বীন ও শরীয়ত থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয় সমাজের ভ্রান্ত রেওয়াজ ও কুপ্রথার বিপরীতে শরীয়ত ও সুন্নাহর অনুসরণে কুণ্ঠাবোধ করাও সমীচীন নয়

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে কোনো কিছুর ভয় কাম্য নয় আল্লাহ তাআলা বলেন

فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَ اخْشَوْنِ.

তোমরা মানুষকে ভয় করো না, বরং ভয় কর আমাকে সূরা মায়িদা (০৫) : ৪৪

মোটকথা, দ্বীনের ওপর চলার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে, নেতা-নেত্রীর হুমকি-ধমকির ভয়ে, মানুষের নানান রকম কথায় প্রতারিত হয়ে দ্বীন-ঈমান বিসর্জন দেওয়া কিছুতেই কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না আমাকে দ্বীন-ঈমানের পথেই অগ্রসর হতে হবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনাই মেনে চলতে হবে, তবেই আমি জান্নাতীদের কাফেলায় শামিল হতে পারব, ইনশাআল্লাহ! 

 

 

advertisement