রজব ১৪৪৭   ||   জানুয়ারি ২০২৬

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড
‖ ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য বজায় রাখার বার্তা দিয়ে গেল

গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ রোজ শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাওয়া শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয় শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় ছাত্রলীগের এক সন্ত্রাসীর ছোড়া গুলিতে আহত হন তিনি

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুলেট ওসমান হাদির ডান কানের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এরপর এভারকেয়ার হাসপাতাল, সর্বশেষ সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় দেশে ও বিদেশে দীর্ঘ সাত দিন তাঁর নিবিড় চিকিৎসার পরও ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে ইহজগৎ ত্যাগ করেন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘২টা ২২ মিনিটের দিকে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় ডিআর টাওয়ারের সামনে এ ঘটনা ঘটে তিনটি মোটরসাইকেলে করে দুর্বৃত্তরা আসে এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়

হাদি অপেক্ষাকৃত কম বয়সি হলেও বিভিন্ন কারণে বছরাধিক সময় থেকে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন অনেকের কাছে অনুসরণীয় ও সাহসের প্রতীক হিসেবে তাঁর স্থান ছিল বিশেষত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী দীর্ঘ অপশাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যখনই ফ্যাসিবাদী কোনো চরিত্রের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার আভাস পাওয়া গেছে, হাদি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে সেগুলোর জোরদার সাহসী প্রতিবাদ করেছেন ফ্যাসিবাদীদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি, যারা বরাবরই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অবজ্ঞা করে আসছে, তাদের অন্যায় আচরণেরও সাহসী প্রতিবাদে এগিয়ে ছিলেন এই যুবক

যার দরুন তাঁর ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে হরেক পেশার বিশিষ্টজনসহ দেশের লাখো সাধারণ মানুষ তাঁরা হাদীর সুস্থতার জন্য দুআর পাশাপাশি সরকারের অবহেলাকেও বিশেষভাবে দায়ী করেছেন এমন একজন নাগরিক, যিনি স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে সোচ্চার রয়েছেন, এমন শক্তিগুলোর চোখে আঙুল দিয়ে কথা বলছেন, যারা বরাবরই আগ্রাসী এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনকারী বলে পরিচিত, সে লোকটিকে কেন বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হল না?

তিনি তো তাঁর ব্যক্তির জন্য কাজ করেননি তিনি কথা বলেছেন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমের পক্ষে, জনগণের অধিকারের পক্ষে তবে কেন রাজপথে প্রকাশ্যে দিবালোকে তার ওপর আক্রমণের সুযোগ পেল দুর্বৃত্তরা? হত্যার পর এতদিন পার হয়ে গেলেও মূল আসামি গ্রেফতার হল না আবার শোনা যাচ্ছে, সে নাকি পার্র্শ্ববর্তী দেশে আত্মগোপন করেছে যেখানে ইতিমধ্যে ভিআইপি আদর আপ্যায়ন পাচ্ছেন বিগত সময়ের ফ্যাসিবাদীরা

আমরা মনে করি, এই দেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থেই শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের পাকড়াও করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার অন্যথায় ষড়যন্ত্রকারীরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দ্বিধা করবে না

একথা তো স্পষ্ট, এখানে শরিফ ওসমান হাদি একজন ব্যক্তি নন; এটি একটি চিন্তা, একটি দর্শন এবং একটি জাতীয় আকাক্সক্ষার ওপর হামলা, যার মূলে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে কাউকে নাক গলাতে না দেওয়া আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যদের হস্তক্ষেপে বাধাপ্রধান এবং এদেশের সরকার গঠন ও সরকার পরিচালনায় ভিনদেশিদের নাক গলানোয় বারণ করা

যারা হাদির ওপর হামলা করেছে, তাঁকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে, তারাই কিন্তু আসল দায়ী নয়, শুধু তাদেরকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাদের পেছনের ওইসকল শক্তি, যারা এখনো এ দেশে সাংবাদিকতা, পেপার-পত্রিকা, টেলিভিশন, সুশীল, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পরিচয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে ফ্যাসিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাদেরকে বা ফ্যাসিবাদের সমর্থকদেরকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, ফ্যাসিবাদের বিচারকে বিতর্কিত করার পাঁয়তারা করছে এবং হাদির ওপর হামলাকে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাচ্ছে, তারা সকলেই এ ধরনের ঘটনার জন্য দায়ী

শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা দেশবাসীকে বার্তা দিয়ে গেল, দেশে ফ্যসিবাদের দালালেরা এখনো সক্রিয় সুযোগ পেলেই তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে; যেমনিভাবে তাদের সমর্থক ও দোসর চিহ্নিত গণমাধ্যমগুলো এবং শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সুশীল নামধারী দেশবিরোধী ও ইসলাম বিরোধী দালালেরা ফ্যাসিবাদ বিদায় হওয়ার পর অল্প কিছু দিন মুখোশ পরে নীরব থাকলেও পুনরায় তাদের আসল চেহারা প্রকাশ করেছে সে উত্তেজনা থেকে হয়তোবা শোকাতুর জনতা কিছু গণমাধ্যমের দপ্তরেও হামলা করেছে আমরা মনে করি, কোনো বিল্ডিং বা দপ্তর ভেঙে আসলে লাভ নেই যা প্রয়োজন তা হল, দালাল ও দোসরদের লাগাম টেনে ধরা, তাদেরকে ষড়যন্ত্র থেকে বিরত রাখা যারা দেড় বছর যেতে না যেতেই আবার তাদের পতিত প্রভুদের জন্য এবং ভিনদেশি মুরব্বীদের জন্য মায়াকান্না শুরু করে দিয়েছে একথা তো আর এখন বলে লাভ নেই

এই পরিস্থিতির জন্য মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু লোকই দায়ী, যারা বারবার আশকারা দিয়েছে ঐসকল বিষফোঁড় শক্তিগুলোকে সাথে এদেশের কোনো কোনো বড় রাজনৈতিক দলও সমান দায়ী তারা এ ধরনের ষড়যন্ত্রকারীদের এবং স্বৈরাচারের দোসর ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী দেশগুলোর নোংরা পক্ষপাতিত্ব করা দালালদের বিচারের জন্য তো দাবি উঠাইনি; বরং বারবার তাদের পক্ষ নিয়েছে জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে এসবের জবাব হয়তো ওই দলটি সময়মতো পেয়ে যাবে

ডক্টর ইউনূসের সরকারের সময় মব মব চিল্লাচিল্লি অনেক শোনা যায় দেশ ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রতিবাদী জনতা কর্তৃক পাকড়াও হলেই সমস্বরে তাদেরই অন্য গোষ্ঠী মব মব জিগির তোলে এটা ঠিক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার জিনিস নয়, কিন্তু এর পেছনের কারণ কেন খতিয়ে দেখা হয়নি? যাদের ওপর মব হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সে লোকেরা কি কেউ ভালো ছিল? তারা কি কেউ দুষ্কৃতিকারী ছিল না? তবে কেন আগে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়নি? যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই কাজের কাজটি করতে পারত, পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের দেশে থাকা শেকড়গুলোতে হাত দিত, তাহলে হয়তো একজন দেশপ্রেমিক, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ঝান্ডাধারী অকুতোভয় কণ্ঠের যুবক প্রকাশ্যে দিবালোকে রাজপথে গুলিবিদ্ধ হত না শরিফ ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে যখন তাঁর বিদায় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলা হয়েছে, তখন সরকার কিছুটা আদর ও মায়া দেখিয়েছে হয়তোবা সরকার চিন্তা করেছে, এতে জনগণের ক্ষোভ স্তমিত হবে এ যেন

پہلے خود کانٹے بچھائے اہل دل کی راہ ميں

ہو گئے زخمی تو ان پر پھول برسا ئے گئے

নিজেই আগে ভালো লোকদের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিল,

যখন আহত হল, তার ওপর ফুল ছিটিয়ে দেওয়া হল

শরিফ ওসমান ইবনে হাদি আখেরাতের সফরে চলে গেছেন কিন্তু তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে শাহাদাত বরণের মাঝের এক সপ্তাহ এবং দলমত নির্বিশেষে তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের যুব সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি যে ভালবাসা ও সমর্থন দেখিয়েছেন, তা এক কথায় বেনজীর এত কম বয়সে এবং কম সময় রাজপথে থেকে এত জনগণের এত ভালবাসা ও সমর্থন পৃথিবীর কম মানুষেরই অর্জন হয়েছে শহীদের প্রতি বাংলার মানুষের এই হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা ব্যক্তি কেন্দ্রিক ছিল না তারা ভালবেসেছে তাঁর কর্ম, তাঁর সাহস এবং নীতি ও আদর্শকে তারা সমর্থন দিয়েছে এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে শরীফের অকুতোভয় গর্জনকে এসব দেখে এবং মহান আল্লাহর রহমতের ওপর আশা করে জোর দিয়েই বলা যায়, ইনশাআল্লাহ এদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী এবং ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি শেষ তক সফল হবে না একজন-দুজন শরিফ হাদিকে হয়তোবা শহীদ করে ফেলা যাবে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় আবার বিকল্প কেউ ঝান্ডা হাতে নেবে তবে দেশের প্রশ্নে ও স্বৈরাচার বিরোধিতার প্রশ্নে সমাজ ও ভালো মানুষদের ঐক্য অটুট রাখা ও সুদৃঢ় করার কোনো বিকল্প নেই

আল্লাহ তাআলা মরহুম শরিফ ওসমান হাদির সকল গুনাহখাতা মাফ করে দিয়ে তাঁকে জান্নাতুল ফেরাদউসের উঁচু মাকাম দান করুন তাঁর শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সদয় হোন বাংলার মানুষের জন্য এ ধরনের আরও সাহসী ও যোগ্য নেতা সামনে এনে দিন আমীন

 

 

advertisement