সফর ১৪৪১   ||   অক্টোবর ২০১৯

উপকার ও কৃতজ্ঞতা : আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য

মাওলানা শিব্বীর আহমদ

সমাজে চলতে আমাদের অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এ সহযোগিতা যে কেবলই বিপদ ও সংকটের মুহূর্তে প্রয়োজন হয় এমন নয়, বরং সহযোগিতা প্রয়োজন হয় খুশি ও আনন্দের প্রতিটি উপলক্ষেও। কেউ যদি বড় কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তাহলে অন্যদের অংশগ্রহণেই তা পূর্ণতা পায়, আয়োজনটি সফল ও সার্থক হয়। শত শত মানুষের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করার পর যদি আশানুরূপ উপস্থিতি না হয়, তাহলে আয়োজকগণের আনন্দে ভাটা পড়বেই। আর এ অনুপস্থিতি যদি কোনো আপনজনের পক্ষ থেকে হয় তাহলে তো বলাই বাহুল্য। এমন কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সম্পর্কেও ছেদ পড়ে। শিথিল হয়ে পড়ে আত্মীয়তা কিংবা বন্ধুত্বের বন্ধন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ভর করেই টিকে থাকি। কথা হল, যখন আমরা কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পাই, উপকৃত হই, এর বিনিময়ে আমরা কী করতে পারি? এ উপকার ও সহযোগিতার বদলা আমরা কীভাবে দিতে পারি? এর কৃতজ্ঞতা আমরা আদায় করতে পারি কী করে?

সহযোগিতা ও উপকারের কত ধরন যে মানুষের সমাজে দেখা যায়! যারা অঢেল অর্থসম্পদের মালিক, তারা যেমন অসহায় ও অসচ্ছলদের সহযোগিতা করে থাকেন, ঠিক এর উল্টো অসহায়দের সহযোগিতা ছাড়াও ধনীরা একটা দিন পার করতে পারে না। শহরের মানুষ ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যায়। দুই-চারদিন বেড়ায়। এলাকার গরীব-অসচ্ছল প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয়। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এতটুকু আন্তরিকতা পেলে গরীব মানুষের কৃতজ্ঞতার অন্ত থাকে না। আবার ধনীরা যখন শহরে চলে আসে, তখন গ্রাম থেকে নিয়ে আসা অসচ্ছল পরিবারের কাজের মানুষেরাই তাদের সুখকে টিকিয়ে রাখে। এ তো একটা উদাহরণ মাত্র। আমাদের সমাজে এমন উদাহরণের অভাব নেই।

সহযোগিতা ও ভালো কাজের একটি ছোট তালিকা বর্ণিত হয়েছে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীসে। হযরত আবু যার রা. থেকে বর্ণিত সেই হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَبَسّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ، وَأَمْرُكَ بِالمَعْرُوفِ وَنَهْيُكَ عَنِ الْمُنْكَرِ صَدَقَةٌ ، وَإِرْشَادُكَ الرَّجُلَ فِي أَرْضِ الضّلاَلِ لَكَ صَدَقَةٌ ، وَبَصَرُكَ لِلرّجُلِ الرّدِيءِ البَصَرِ لَكَ صَدَقَةٌ ، وَإِمَاطَتُكَ الحَجَرَ وَالشّوْكَةَ وَالعَظْمَ عَنِ الطّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ ، وَإِفْرَاغُكَ مِنْ دَلْوِكَ فِي دَلْوِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ.

তোমার ভাইয়ের চেহারায় তাকিয়ে মুচকি হাসাও তোমার জন্যে একটি সদকা। সৎকাজের প্রতি আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বাধাপ্রদানও সদকা। পথ হারানো কাউকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়াটাও তোমার জন্যে সদকা। দৃষ্টিশক্তি দুর্বল- এমন কাউকে সহযোগিতা করাও তোমার জন্যে সদকা। রাস্তা থেকে পাথর, কাটা আর হাড্ডি সরিয়ে দেওয়াও তোমার জন্যে সদকা। ভাইয়ের বালতিতে তোমার বালতি থেকে একটু পানি ঢেলে দেওয়াও তোমার জন্যে সদকা। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৬

সহযোগিতা যেমনই হোক, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত- অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। বিশেষত যদি কখনো নিজের প্রতি দয়াকারী ব্যক্তিটির পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়, তার কোনো উপকার করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তো অবশ্যই তা কাজে লাগানো উচিত। উপকারী ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এটা এক মোক্ষম সুযোগ। এ কৃতজ্ঞতা যদি কেউ প্রকাশ না করে, তাহলে সে সমাজের চোখে তো নিন্দিত হয়ই, সে নিন্দিত হয় মহান রাব্বুল আলামীনের কাছেও। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদীস-

مَنْ لاَ يَشْكُرُ النّاسَ لاَ يَشْكُرُ اللهَ.

যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৪

বোঝা যাচ্ছে, মানুষের অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা আদায় করা আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতারই অংশ। ইসলামের শিক্ষা তো এমন- যদি কেউ তোমার সঙ্গে অসদাচরণ করে তবুও তুমি তার প্রতি ভালো আচরণ করো; তোমার কোনো আত্মীয় যদি তোমার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষা করে চলো। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

صِلْ مَنْ قَطَعَكَ، وَأَعْطِ مَنْ حَرَمَكَ، وَاعْفُ عَمّنْ ظَلَمَك.

তোমার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করো, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তুমি তাকে দান করো আর যে তোমার ওপর জুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪৫২

এই হচ্ছে মন্দ আচরণের বদলা! অন্যায় যদি কেউ করে, তাহলে অন্যায় পরিমাণ প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ যদিও আছে, কিন্তু কুরআন ও হাদীসে আমাদের উৎসাহিত করা হয়েছে আইনি এ অধিকারটুকু ছেড়ে দিয়ে ক্ষমার আচরণে নিজেদেরকে আলোকিত করতে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা--

وَ اِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوْا بِمِثْلِ مَا عُوْقِبْتُمْ بِهٖ، وَ لَىِٕنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَیْرٌ لِّلصّٰبِرِیْنَ .

যদি তোমরা শাস্তি দাওই, তবে ঠিক ততখানি শাস্তি দিবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। তবে তোমরা ধৈর্য ধারণ করলে ধৈর্যশীলদের জন্য তাই তো উত্তম। -সূরা নাহল (১৬) : ১২৬

মন্দ আচরণের ক্ষেত্রেই যদি ইসলামের শিক্ষা এমন হয়ে থাকে, তাহলে উত্তম আচরণের বদলা কেমন হবে! উপকারীর উপকার কীভাবে স্বীকার করতে হয় এর একটি  নির্দেশনা লক্ষ করুন। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ أُعْطِيَ عَطَاءً فَوَجَدَ فَلْيَجْزِ بِهِ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَلْيُثْنِ، فَإِنّ مَنْ أَثْنَى فَقَدْ شَكَرَ، وَمَنْ كَتَمَ فَقَدْ كَفَرَ.

কাউকে যখন উপহারস্বরূপ কিছু দেয়া হয়, তখন সে যদি এর পরিবর্তে দেয়ার মতো কিছু পায় তাহলে যেন তা দিয়ে দেয়। আর যে এমন কিছু না পাবে সে যেন তার প্রশংসা করে। কেননা যে প্রশংসা করল সেও কৃতজ্ঞতা আদায় করল। আর যে লুকিয়ে রাখল সে অস্বীকার করল। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২০৩৪

অর্থাৎ কেউ যখন কোনো উপহার দেয়, সম্ভব হলে তাকেও অন্য কোনো উপহার দেয়া উচিত। আর যদি এটা সম্ভব না হয়, তাহলে তার প্রশংসা করো। এতেও তার হক কিছুটা আদায় হবে। আরেক হাদীসে বলা হয়েছে-

مَنْ صُنِعَ إِلَيْهِ مَعْرُوفٌ فَقَالَ لِفَاعِلِهِ : جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا فَقَدْ أَبْلَغَ فِي الثّنَاءِ.

কারও সঙ্গে যখন কোনো ভালো আচরণ করা হয় এরপর সে যদি ভালো আচরণকারীকে বলে- জাযাকাল্লাহু খায়রান অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, তাহলে সে যথোপযুক্ত প্রশংসা করল। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২০৩৫

হাদীসের মর্ম তো স্পষ্টই- কেউ যদি কিছু হাদিয়া দেয়, অথবা বিপদে-সংকটে পাশে এসে দাঁড়ায়, ভালো কোনো পরামর্শ দেয়, কিংবা অন্য যেকোনোভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার জন্যে কমপক্ষে দুআ করো- আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। মানুষের সবকিছুই যেখানে সীমিত, সীমাবদ্ধ, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সবকিছুই অসীম, সীমাহীন। আল্লাহ যখন কাউকে পুরস্কৃত করেন, সেটা তাঁর শান মোতাবেকই করেন। কারও কাছ থেকে কোনো ভালো আচরণ পাওয়ার পর তাই আন্তরিকতাপূর্ণ এ ছোট দুআটুকুও অনেক বড় কৃতজ্ঞতা।

সার কথা হল, কেউ যদি তোমার সঙ্গে ভালো কোনো আচরণ করে তাহলে প্রথমে তাকে এর প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করো। যদি সম্ভব না হয় তাহলে কমপক্ষে তার প্রশংসা করো। আর সর্বাবস্থায় তার জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে এ দুআ তো করবেই- আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদানে ভূষিত করুন।

প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জীবনে কীভাবে এ শিক্ষা প্রতিফলিত করেছেন- এর একটি উদাহরণ দিই। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি পশু ধার নিয়েছিলেন। এরপর লোকটি এসে তার পাওনা ফেরত চাইল এবং খুবই কঠোর ও মন্দ আচরণ করল। তখন সাহাবায়ে কেরাম ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারতে উদ্যত হলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে থামিয়ে বললেন, তাকে ছেড়ে দাও; কেননা পাওনা যার, তার কিছু বলারও অধিকার রয়েছে। এরপর বললেন, তোমরা তাকে তার পশুটির মতো একটি পশু কিনে দিয়ে দাও। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা তো এর মতো কিছু পাচ্ছি না, যা পাই তা এর চেয়ে বড়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বড়টিই তাকে দিয়ে দাও। সন্দেহ নেই, তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে সবচেয়ে সুন্দরভাবে পাওনা পরিশোধ করে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৩০৫, ২৩০৬

কারও কাছ থেকে কিছু ধার নিলে তার পাওনা তাকে পরিশোধ করে দেয়াটাকে যেন আমরা এখন নিজেদের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ মনে করি। কখনো তো সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারকে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাওনার চেয়ে আরও বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, যে যত সুন্দরভাবে পাওনা পরিশোধ করবে, সে ততটাই ভালো মানুষ! যদি আগে থেকে বাড়িয়ে দেয়ার কোনো শর্ত করা না হয় এবং বাড়িয়ে দেয়ার কোনো বাধ্যতামূলক রেওয়াজও না থাকে, ঋণদাতার পক্ষ থেকে এমন কোনো দাবিও না থাকে, তাহলে ঋণ পরিশোধের সময় কিছু টাকা বাড়িয়ে দেয়ায় কোনো অসুবিধা নেই; এটা বরং ভালো। এতেও উপকারের এক ধরনের কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ أَتَى إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ، فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فَادْعُوا لَهُ، حَتَّى يَعْلَمَ أَنْ قَدْ كَافَأْتُمُوهُ.

তোমাদের প্রতি যে ব্যক্তি কোনো ভালো আচরণ করে তোমরা তার প্রতিদান দাও। যদি দেয়ার মতো কিছু না পাও তাহলে তার জন্যে দুআ করো, যাতে সে বুঝতে পরে- তোমরা তার প্রতিদান দিয়েছ। -আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ২১৬

সবকিছুর প্রতিদান নগদই হয়ে যেতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। আসল বিষয় তো শোকর ও কৃতজ্ঞতা। এ কৃতজ্ঞতা কখনো প্রকাশ পায় কোনো উপহারের বিনিময়ে অন্য আরেকটি উপহার প্রদানের মাধ্যমে, কখনো প্রকাশ পায় কোনো উপকার করার মধ্য দিয়ে, কখনো অন্য কোনো উপায়ে।

মোটকথা, কৃতজ্ঞতার মানসিকতা লালন করে যেতে হবে। এমন যেন না হয়, আমার বিপদে একজন পাশে দাঁড়াল, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু আমি  তা ভুলেই গেলাম, তার প্রতিপক্ষ হয়ে গেলাম। এমন হলে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। ওদিকে শয়তানের প্ররোচনায় তখন খুলে যেতে পারে খোঁটা দেয়ার দুয়ার। এ আশঙ্কা যদি বাস্তবে রূপ নেয় তাহলে তো পারস্পরিক যতটুকু সহযোগিতা আগে করা হয়েছিল সবটাই নিষ্ফল হয়ে যাবে। তাই তা না করে বরং অন্য কারও উপকার ও সহযোগিতার কথা মনে রাখতে হবে আজীবন। যখনই তার কোনো উপকার করার সুযোগ পাওয়া যায়, তা ছোট হোক আর বড় হোক, এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এতে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সুসংহত হবে।

একে অন্যকে এই যে সহযোগিতা- এটা হতে হবে কেবলই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে। এ সহযোগিতা হতে পারে কোনো বিপদ ও সংকটের মুহূর্তে, হতে পারে স্বাভাবিক কোনো অবস্থায়, এমনকি আনন্দঘন কোনো পরিবেশকে আরও আনন্দময় করে তোলার মধ্য দিয়েও হতে পারে। যে অবস্থাতেই হোক, যে পদ্ধতিতেই হোক, মুমিনের সবকাজের উদ্দেশ্যই তো এই একটাই- আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। একে অন্যকে হাদিয়া ও উপহার দিলে তাতেও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। কোনো বন্ধু কিংবা আত্মীয়কে দাওয়াত করে খাওয়ালে সেখানেও থাকতে হবে এই একই উদ্দেশ্য। একজনের উপহারের পর আরেকজন যখন উপহার দেবে, একজনের নিমন্ত্রণের পর আরেকজন যখন নিমন্ত্রণ করবে, তাতেও থাকবে একই লক্ষ্য, একই উদ্দেশ্য। দুনিয়ার তুচ্ছ কোনো উপকার তার লক্ষ্য হতে পারে না। দেখুন, মুমিনের সম্পদ ব্যয়ের কী লক্ষ্য আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন-

وَ مَا تُنْفِقُوْنَ اِلَّا ابْتِغَآءَ وَجْهِ اللهِ.

তোমরা তো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভার্থেই ব্যয় করে থাক। -সূরা বাকারা (২) : ২৭২

তাই কেউ উপহারের দিলে সম্ভব হলে তাকেও উপহার দিন। তবে তা যেন নিজেকে ঋণগ্রস্ত মনে করে এ ঋণ থেকে উদ্ধারের নিয়তে না হয়। বরং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে যতটুকু সম্ভব আপনিও তাকে উপহার দিন। তা যদি হয় তাহলে কার হাদিয়া ছোট, কারটা বড়- তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যাথা থাকবে না। আবার সামর্থ্য না থাকলেও কিংবা কষ্ট করে হলেও হাদিয়া আমাকে দিতেই হবে- এ চিন্তাও থাকবে না। লক্ষ করুন, হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবরকম নির্দেশনাই আমাদের দিয়েছেন। এক হাদীসে বলেছেন-تهادوا تحابوا.

তোমরা একে অন্যকে হাদিয়া দাও, এতে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। -আলআদাবুল মুফরাদ, বুখারী, হাদীস ৫৯৪

আবার অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন, কেউ যদি তোমাকে কিছু দেয়, সম্ভব হলে তুমিও তাকে কিছু দাও, তা যদি না পার তাহলে তার প্রশংসা করো। আরেক হাদীসে বলেছেন তার জন্যে দুআ করার কথা। এমন হলেই সম্ভব উপহার আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার সম্পর্ক জোরদার করা। আর যদি এমনটা না হয়, কোনো উপলক্ষে কেউ যদি কাউকে উপহার দেয়াকে কিংবা এর বিনিময় দেয়াকে নিজের জন্যে বাধ্যতামূলক মনে করে, উপহারের আদানপ্রদানে যদি স্বতঃস্ফূর্ততা না থাকে, তাহলে এতে যে মনের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে- তা নিয়ে কি কোনো সংশয়ের সুযোগ আছে!

যিনি উপহার দিচ্ছেন কিংবা সহযোগিতা করছেন তাকেও এমন চিন্তা থেকে নিজের মনমানসকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে- একসময় আমিও তার কাছ থেকে অনুরূপ কিংবা এর চেয়ে বেশি উপহার পাব। এ মানসিকতা যদি কারও থাকে, তাহলে এ উপহার প্রদান কিংবা সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসাই বাড়বে কোত্থেকে, আর এতে সওয়াবই বা কী হবে! এমন উপহার প্রদান তো বরং নিষিদ্ধ হয়ে আছে পবিত্র কুরআনে- وَ لَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ.

অধিক পাওয়ার আশায় তুমি দান করো না। -সূরা মুদ্দাছছির (৭৪) : ৬

তাই কাউকে কিছু দেয়া, সহযোগিতা করা, সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, উপকারীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার, সম্ভব হলে তার উপকার করা বা হাদিয়া দেয়া- সবটাই হবে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। একজন মুমিন হিসেবে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

 

advertisement