জুমাদাল উখরা ১৪৩৪   ||   এপ্রিল ২০১৩

খৃষ্টধর্ম না পৌলবাদ-৬

মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তাওরাত সম্পর্কে পৌলের অভিমত

কিন্তু সেন্ট পৌলের অভিমত এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি তাওরাতকে একখানি বাতিল কিতাব বলে মনে করতেন। তার মতে হযরত মসীহ (আ)-এর মাধ্যমে তাওরাতের বিধানাবলি রহিত হয়ে গেছে। ফলে তার উম্মতের জন্য সে কিতাব অনুসরণের ও তার বিধানাবলি পালনের কোন প্রশ্ন আসে না। তিনি নিজ পত্রাবলির মাধ্যমে তার ভক্ত-অনুরক্তদেরকে এ রকম শিক্ষাই দিতেন এবং তারা যাতে তাওরাত থেকে সম্পূর্ণরূপে বিমুখ হয়ে যায় সেই চেষ্টাই চালাতেন। সুতরাং তিনি রোমীয়দের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘শরীয়ত থেকে এখন আমরা মুক্ত। তার ফলে আমরা এখন লেখা শরীয়তের সেই পুরানো জীবন-পথের গোলাম নই, কিন্তু পাক-রূহের দেওয়া নতুন জীবন-পথের গোলাম হয়েছি’ ( রোমীয় ৭ : ৬)।

একটু আগেই বলা হয়েছে শরীয়ত বলতে তাওরাতকে বোঝানো হয়েছে (দেখুন কিতাবুল মুকাদ্দাসের শব্দের অর্থ ও টীকা, পৃ. ৪০১-৪০২)।

ইফিষীয়দের কাছে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘তিনি তার ক্রুশের উপরে হত্যা করা শরীরের মধ্য দিয়ে সমস্ত হুকুম ও নিয়মসুদ্ধ মূসার শরীয়তের শক্তিকে বাতিল করেছেন’ (২ : ১৪)।

গালাতীয়দের নামে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘কিন্তু এখন ঈমান এসেছে বলে আমরা আর শরীয়তের পরিচালনার অধীন নই’ (৩ : ২৫)।

তার দৃষ্টিতে তাওরাত ও শরীয়ত যেহেতু বাতিল হয়ে গেছে তাই তার অনুসরণেরও কোন সার্থকতা নেই। তিনি বলেন, ‘সেজন্য আমরাও মসীহের উপর ঈমান এনেছি, কোন শরীয়ত পালনের জন্য নয়; বরং মসীহের উপর ঈমানের জন্যই আমাদের ধার্মিক বলে গ্রহণ করা হয়; কারণ শরীয়ত পালন করবার ফলে কাউকেই ধার্মিক বলে গ্রহণ করা হবে না’ (গালাতীয় ২ : ১৬)।

তার দৃষ্টিতে তাওরাতের অনুসরণ কেবল অর্থহীন নয়, ক্ষতিকরও বটে। কেননা আসমানী কিতাব অনুসরণের সার্থকতা তো এখানেই যে, তা দ্বারা মানবাত্মায় প্রাণ সঞ্চার হয়। কিন্তু তার মতে তাওরাতের সে শক্তি নেই; বরং তা কেবল মৃত্যুই দান করতে পারে। তিনি বলেন, ‘একটা নতুন ব্যবস্থার কথা জানাবার জন্য তিনিই আমাদের যোগ্য করে তুলেছেন। এই ব্যবস্থা অক্ষরে অক্ষরে শরীয়ত পালনের ব্যাপার নয়, কিন্তু পাক-রূহের পরিচালনায় অন্তরের বাধ্যতার ব্যাপার। কারণ শরীয়ত মৃত্যু আনে, কিন্তু পাক-রূহ জীবন দান করে’ (২ করিন্থীয় ৩ : ৬)।

কি কারণে শরীয়ত মৃত্যু আনে? আনে এ কারণে যে, শরীয়তের অনুসরণ করার ফলে পাপপ্রবণতাই বাড়ে আর মৃত্যু তো পাপেরই পরিণাম। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর হূল পাপ। আর পাপের শক্তিই মুসার শরীয়ত’ (১ করিন্থীয় ১৫ : ৫৬)।

সুতরাং শরীয়ত অনুসরণের অর্থ পাপপ্রবণতায় পুষ্টি জোগানো, যার অবধারিত পরিণাম মৃত্যু। আর সেও কি স্বাভাবিক মৃত্যু? গজব ও অভিশাপের মৃত্যু। তাওরাত ও শরীয়তের অনুসরণ তার দৃষ্টিতে এমন মারাত্মক পাপ, যার পরিণামে মানুষ আল্লাহর গজবে পতিত হয়। রোমীয়দের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘শরীয়ত আল্লাহর গজবকে ডেকে আনে’ (৪ : ১৫)।

তো এই হচ্ছে তাওরাত ও মূসা (আ)-এর শরীয়ত সম্পর্কে সেন্ট পৌলের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মূলত খৃষ্টধর্মকে তাওরাত থেকে এবং খৃষ্টসম্প্রদায়কে হযরত মূসা (আ) থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষানুসারে তাঁর অনুসারীগণ তাওরাত-বিমুখ নয়; বরং তাওরাতের প্রকৃত অনুসারী হয়ে উঠত এবং আজ হয়ত খৃষ্টধর্ম নামে আলাদা কোন ধর্মের সৃষ্টিই হত না। হযরত মসীহ (আ)-এর মাধ্যমে পথহারা বনী ইসরাঈল তাওরাতের পথে ফিরে আসার ফলে হযরত মুসা (আ)-এর ধর্ম পুনরুজ্জীবিত হত। কিন্তু পৌলের

চিন্তাধারা তাতে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। তার তৎপরতার ফলে হযরত মসীহ (আ)-এর দীনী মেহনতের গতিধারা কিছুকাল পরে সম্পূর্ণ ভিন্নপথে বাঁক নিয়ে বসে এবং একপর্যায়ে তা হযরত মূসা (আ)-এর তৈরি পথ পরিহার করে এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটিয়ে স্বতন্ত্র ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করে। সুতরাং হোষ্টন ষ্ট্যুয়ার্ট চেম্বারলেন মন্তব্য করেন, ‘তিনি (পৌল) খৃষ্টধর্মকে জোড়াতালি দিয়ে ইহুদী ধর্ম থেকে আলাদা একটি আকৃতি দান করেছেন। ফলে তিনি ইয়াসূর নামে প্রতিষ্ঠিত চার্চসমূহের জনক বনে গেছেন।’

পৌলের ঘোর সমর্থক লুই উইংকও উল্লেখিত মত সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ‘পৌল না হলে খ্রিষ্টধর্ম ইহুদীধর্মের একটি শাখা হয়ে যেত এবং এটা বৈশ্বিক ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করত না’ (বিস্তারিত দ্র. খৃষ্টধর্মের স্বরূপ পৃ. ১৩৭-১৩৮)।

প্রভুর নৈশভোজ

খৃষ্টধর্মে প্রভুর নৈশভোজ (খড়ৎফ'ং ঝঁঢ়ঢ়বৎ) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। হযরত মসীহ (আ)-এর আত্মোৎসর্গের স্মারকরূপে এ প্রথা পালন করা হয়ে থাকে। এ ধর্মের বিশ্বাস, হযরত মসীহ ইহুদীদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগের রাতে হাওয়ারীদের সাথে খাবার খেয়েছিলেন। মথির ইনজীলে আছে, খাওয়ার সময় ঈসা একটি রুটি নিয়ে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালেন। পরে তিনি সেই রুটি টুকরা টুকরা করলেন এবং সাহাবীদের দিয়ে বললেন,  এই নাও, এ আমার শরীর (মথি ২৬ : ২৬)।

লূকের বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, হযরত মসীহ হাওয়ারীদের বললেন, ‘আমাকে

মনে করবার জন্য এ রকম করো’ (লূক ২২ : ১৯)।

হযরত মসীহের সে নির্দেশ পালনার্থেই নৈশভোজের প্রথাটি পালন করা হয়। বিখ্যাত খৃষ্টান পন্ডিত জাষ্টিন মর্টির তার সময়ে যেভাবে প্রথাটি পালিত হত তার বিবরণ দিতে গিয়ে লেখেন, ‘প্রতি রোববার চার্চে একটি ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে কিছুক্ষণ প্রার্থনা ও কাওয়ালী পাঠ করা হয়। তারপর উপস্থিত সকলে একে অন্যকে চুমো খেয়ে শুভেচ্ছা জানায়। তারপর রুটি ও মদ আনা হয় এবং মজলিসের সভাপতি তা নিয়ে পিতা, পুত্র ও পাক-রূহের কাছে বরকত প্রার্থনা করে এবং উপস্থিত সকলে তাতে আমীন বলে। তারপর চার্চের সেবায়েতগণ সেই রুটি ও মদ সকলের মধ্যে বিতরণ করে। এই আচার-অনুষ্ঠানের ফলে সহসা সেই রুটি মসীহের দেহ এবং মদ তাঁর রক্তে পরিণত হয়। সেই দেহ ও রক্ত খেয়ে সকলে তাদের পাপমোচন বিশ্বাসকে সজীব করে তোলে।

পরবর্তীকালে এ প্রথার নিয়মে কিছু পরিবর্তন আসলেও মূল বিশ্বাস একই রয়ে গেছে। অর্থাৎ সভাপতি যখন উপস্থিত উপাসকদের মধ্যে রুটি ও মদ পরিবেশন করে তখন সে রুটি ও মদ মসীহ (আ)-এর রক্ত-মাংসে পরিণত হয়। বাহ্যদৃষ্টিতে তাকে যাই দেখা যাক না কেন।

রুটি ও মদ কি করে রক্ত-মাংসে পরিণত হয়, এ বিষয়টা দীর্ঘকাল যাবৎ আলোচনা-পর্যালোচনার বিষয়বস্ত্ত হয়ে আছে। যার সামান্যতমও আকল-বুদ্ধি আছে, তার কাছে অবশ্যই এটা একটা আজগুবি ব্যাপার মনে হবে। তা যতই আজগুবি ও অসম্ভব ব্যাপার হোক না কেন, খৃষ্টসম্প্রদায় কিন্তু অন্ধভাবে এটা বিশ্বাস করে আসছে এবং পরম ভক্তির সাথে এ প্রথা পালন করে যাচ্ছে।

হযরত মসীহ (আ) ও নৈশভোজ

প্রশ্ন হচ্ছে হযরত মসীহ (আ) নিজেই কি এ প্রথার প্রবর্তক ছিলেন? প্রশ্ন ওঠে এজন্য যে, মানবতার উষাকাল থেকেই সর্বদা আসমানী নির্দেশনা ও নবীগণের শিক্ষা সর্বাপেক্ষা যৌক্তিক ও বৌদ্ধিকরূপে গণ্য হয়ে আসছে। নবীগণের শিক্ষায় থাকে বোধের উন্মেষ। তাতে চেতনা জাগ্রত হয়, দৃষ্টি খুলে যায় ও বুদ্ধি শানিত হয়। কিন্তু এই যে নৈশভোজের বিশ্বাস-এ তো বিলকুলই অন্ধত্ব ও মূঢ়তা, যা বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সাথে কিছুতেই যায় না। সুতরাং প্রশ্ন জাগবেই যে, এটা কি হযরত মসীহ (আ)-এর শিক্ষা?

বস্ত্তত খৃষ্টধর্মের একটি অংশ হিসেবে এ প্রথার সপক্ষে হযরত মসীহ (আ)-এর কোন নির্দেশনা নেই। প্রচলিত ইনজীলসমূহের বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ থাকার পরও তা দ্বারা এ প্রথাকে প্রমাণ করা যায় না। ইওহোন্নার ইনজীলে তো ঘটনাটিরই কোন উল্লেখ নেই। মথি ও মার্কের ইনজীলে ঘটনাটি আছে বটে, কিন্তু তাতে হযরত মসীহ (আ) একে স্থায়ী প্রথা হিসেবে পালন করার কোন হুকুম দেননি। হুকুম পাওয়া যায় কেবল লূকের বর্ণনায়। তাতে আছে, ‘আমাকে মনে করবার জন্য এ রকম করো (২২ : ১৯)।

বলাবাহুল্য, লূকের বর্ণনা দ্বারা কোন বিষয়কে হযরত মসীহের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা কঠিন। কেননা তিনি ছিলেন পৌলের শিষ্য। তার রচনায় পৌলের চিন্তা-চেতনাই ঠাঁই পেয়েছে। তিনি তার ইনজীল রচনাও করেছিলেন পৌলের পত্রাবলির পর। সুতরাং তার ইনজীলের যেসব কথা পৌলের পত্রসমূহেও আছে, বুঝতে হবে তিনি তা পৌল থেকে শিক্ষা পেয়েই লিখেছেন। নৈশভোজের বিষয়টাও সে রকমই। পৌলই প্রথমে করিন্থীয়দের কাছে লেখা চিঠিতে নৈশভোজের আদেশ উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের যে শিক্ষা দিয়েছি তা আমি প্রভুর কাছ থেকে পেয়েছি। যে রাতে হযরত ঈসাকে শত্রুদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সে রাতে তিনি রুটি নিয়ে আল্লাহকে শুকরিয়া জানিয়েছিলেন এবং তা টুকরা টুকরা করে বলেছিলেন, এটা আমার শরীর যা তোমাদেরই জন্য দেওয়া হবে। আমাকে মনে করবার জন্য এই রকম করো। খাওয়া হলে পর সেভাবে তিনি পেয়ালা নিয়ে বলেছিলেন, আমার রক্তের দ্বারা আল্লাহর যে নতুন ব্যবস্থা বহাল করা হবে সেই ব্যবস্থার চিহ্ন হল এই পেয়ালা।

তোমরা যতবার এর থেকে খাবে আমাকে মনে করবার জন্য এরকম করো (১ করিন্থীয় ১১ : ২৩-২৬)।

এর দ্বারাই বোঝা যায়, পৌলই সর্বপ্রথম হযরত ঈসা (আ)-এর নামে এ প্রথাটির গোড়াপত্তন করেন। এটা কেবল আমাদেরই উপলব্ধি নয়, খ্রিষ্টানগণও এটা অকপটে স্বীকার করেছেন। সুতরাং এফ.সি. বুরকিট লেখেন, ‘প্রভুর নৈশভোজের বৃত্তান্ত যদি আপনি মার্কের ইনজীলে পড়েন, তবে সেখানে এ কাজটি চালু রাখা সংক্রান্ত কোন আদেশ আপনি পাবেন না। কিন্তু মহাত্মা পৌল যখন যিশুর এ কাজটির কথা বর্ণনা করেন তখন তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে এই বাক্যটি যোগ করে দেন যে, ‘আমাকে স্মরণ করবার জন্য তোমরা এরূপই করো’ (দেখুন খৃষ্টধর্মের স্বরূপ পৃ. ১০২)।

খতনা

খতনা করানো নবীগণের সুন্নত। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম থেকেই এ নিয়ম চলে আসছে। তাঁর পরবর্তী সমস্ত নবীই নিজ নিজ উম্মতকে এটা পালনের আদেশ করেছেন।

তাওরাতে আছে, ‘তুমি ও তোমার সমস্ত সন্তান বংশের পর বংশ ধরে এই ব্যবস্থা মেনে চলবে। ... তোমাদের প্রত্যেক পুরুষের খতনা করতে হবে। তা তোমার ও তোমার বংশের লোকদের মেনে চলতে হবে। ... এটাই হবে তোমাদের শরীরে চিরকালের ব্যবস্থার চিহ্ন। যে লোকের পুরুষাঙ্গের সামনের চামড়া কাটা নয় তাকে তার জাতির মধ্য থেকে মুছে ফেলা হবে। কারণ সে আমার ব্যবস্থা অমান্য করেছে (পয়দায়েশ ১৭ : ৯-১৪)।

হযরত মূসা (আ)কে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, আট দিনের দিন ছেলেটির খতনা করাতে হবে (লেবীয় ১২ : ৩)।

এভাবে খতনার বিধানটি সব নবীর সময়ই চালু ছিল। এমনকি যিশুখ্রিষ্টের নিজেরও খতনা করানো হয়েছিল (দেখুন লূক ২ : ২১)।

তাওরাতের বিধান হিসেবে ইহুদীদের মধ্যে এটির সাধারণ প্রচলন ছিল। পৌলের নিজেরও খতনা হয়েছিল, যেমন তিনি তাঁর আত্মজীবনী বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। আর ইহুদী বা বনী ইসরাঈলের নবী হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়,  হযরত মসীহ (আ)-এর শিক্ষায়ও খতনা ছিল, বিশেষত যখন তাঁর থেকে এমন কোন নির্দেশ পাওয়া যায় না, যা দ্বারা এ বিধানটি রহিত হয়েছে বলে প্রমাণ করা যাবে।

খতনা সম্পর্কে পৌলের অভিমত

কিন্তু এ সম্পর্কে পৌলের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি তার পত্রাবলিতে এর অকার্যকরতা, অপ্রয়োজনীয়তা ও অসারতাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। বরং তাঁর দৃষ্টিতে এটা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ারই কারণ। তিনি গালাতীয়দের নামে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘আমি পৌল তোমাদের বলছি, শোন, যদি তোমাদের খতনা করানোই হবে তবে তোমাদের কাছে মসীহের কোন মূল্য নেই। আমি সকলের কাছে আবার এই সাক্ষ্য দিচ্ছি, যাকে খতনা করানো হয়, সে সমস্ত শরীয়ত পালন করতে বাধ্য। তোমরা যারা শরীয়ত পালন করে আল্লাহর গ্রহণযোগ্য হতে চাইছ তোমরা তো মসীহের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছ। আল্লাহর রহমত থেকে সরে গেছ (গালাতীয় ৫ : ২-৪)।

আরও বলেন, ‘খতনা করানো বা না করানোর কোন দামই নেই। মসীহের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টি হয়ে ওঠাই হল বড় কথা’ (৬ : ১৬)।

খতনা বিধানটির উপর যে তার কত গোস্সা তা আঁচ করা যায় ফিলিপীয়দের নামে লেখা চিঠি দ্বারা। তাতে বলেন, ‘ঐ কুকুরগুলো থেকে সাবধান, যারা খারাপ কাজ করে এবং শরীরের কাটা-ছেঁড়া করাবার (খতনা করানোর) উপর জোর দেয় (ফিলিপীয় ৩ : ২)।

অন্যত্র বলেন, এমন অনেক লোক আছে, যারা অবাধ্য, যারা বাজে কথা বলে ও যারা ছলনা করে বেড়ায়। যারা খতনা করানোর উপর জোর দেয়, বিশেষ করে আমি তাদের কথাই বলছি

(তীত ১ : ১০)।

বৈরাগ্য ও সন্যাসব্রত

বৈরাগ্য খৃষ্টধর্মে খুব পসন্দনীয়। তাদের দৃষ্টিতে সংসারবিমুখ হয়ে যদি আশ্রমবাসী হওয়া যায় এবং সেখানে একমনে আল্লাহর উপাসনায় নিমগ্ন থাকা যায় তবে সেটাই সংসারজীবী হয়ে আল্লাহ ও বান্দার হক আদায়ে রত থাকা অপেক্ষা উত্তম। কিন্তু তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের শিক্ষার সঙ্গে মেলে না। দুনিয়ায় যত নবী-রাসূল এসেছেন, প্রত্যেকেই সংসারজীবন যাপন করেছেন এবং মানুষকেও সে রকমই শিক্ষা দিয়েছেন। তাদের শিক্ষার ভেতর ইবাদত-বন্দেগীর মত মানুষের সাথে মেলামেশা, বেচাকেনা ও সমাজজীবনের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল। সুতরাং প্রশ্ন জাগে খৃষ্টধর্মে এ বৈপরিত্য কেন? হযরত মসীহ (আ) থেকেই কি তারা এ শিক্ষা পেয়েছে?

প্রচলিত ইনজীলসমূহে হযরত মসীহ (আ)-এর এমন কোন উক্তি পাওয়া যায় না, যা বৈরাগ্যকে সমর্থন করে। বরং তার বক্তব্য মতে তিনি যেহেতু বনী ইসরাঈলের পথহারা মেষপালকে পথ দেখানোর জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন, তাই প্রকাশ তো এটাই যে, তিনি বনী ইসরাঈলের মৌলিক অনুসরণীয় নির্দেশনা তথা তাওরাতের বিধান অনুসারে সমাজ-সংসারজীবন-ঘনিষ্ঠ শিক্ষাই দান করতেন।

এ কথা ঠিক যে, তিনি নিজে বিবাহ করেননি ও সংসারজীবন যাপন করেননি, কিন্তু এটা সন্যাসবাদের দলিল হতে পারে না। কেননা ব্যক্তিজীবনে মানুষের বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা থাকে, যদ্দরুণ ক্ষেত্রবিশেষে নিজ জীবনদর্শনের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হয় না। কাজেই সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কর্ম নয়; বরং তিনি বলেন কী সেটাই লক্ষণীয়।

হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনে সে রকম পারিপার্শ্বিকতা তো ছিলই। তিনি যখন নবী হিসেবে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করলেন তখন ইহুদীরা তার বিরুদ্ধে এমনই শোরগোল তুলল যে, তার পক্ষে সুস্থির জীবন-যাপনই মুশকিল হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত তো তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার ও তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে আসমানে তুলে নিলেন, তার পার্থিব আয়ুষ্কাল আর পূরণ হল না। এর ফলে তাঁর আর বৈবাহিক জীবন যাপনের অবকাশ হল না। কিয়ামতের আগে যখন তাঁকে আবার দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে এবং এখানে তাঁর নির্ধারিত আয়ুও পূর্ণ করা হবে, সেই জীবনে তিনি ঠিকই বিবাহ করবেন এবং তখন তাঁর সন্তান-সন্ততিও জন্ম নেবে, যেমন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।

মোটকথা বৈরাগ্যবাদ হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষা নয় এবং এটা মূল খৃষ্টধর্মে ছিলই না। কুরআন মজীদেও এর সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, কিন্তু সন্যাসবাদ-এ তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করেছিল। আমি তাদেরকে এর বিধান দেইনি। অথচ তাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি (হাদীদ : ২৭)।

বৈরাগ্যবাদ ও সেন্ট পৌল

প্রকৃতপক্ষে বৈরাগ্যবাদ সেন্ট পৌলের উদ্ভাবন। তিনিই খৃষ্টধর্মে ঈসা (আ)-এর শিক্ষাবিরোধী এই প্রথার জন্ম দিয়েছেন। তিনি নিজে তো বিবাহ করেনইনি, উপরন্তু চিঠিপত্র দ্বারা তার অনুসারীদেরকেও সেই রকম জীবন যাপনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, অবিবাহিত আর বিধবাদের আমি বলছি, তারা যদি আমার মত থাকতে পারে, তবে তাদের পক্ষে তা ভাল (১ করিন্থীয় ৭ : ৮)।

আমি চাই যেন তোমরা চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্ত থাকতে পার। অবিবাহিত লোক প্রভুর বিষয়ে ভাবে। সে চিন্তা করে কিভাবে সে প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে। বিবাহিত লোক সংসারের বিষয়ে ভাবে, সে চিন্তা করে কিভাবে সে স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করবে। এইভাবে দুই দিকই তাকে টানতে থাকে। যে মেয়ের স্বামী নেই এবং অবিবাহিতা মেয়ে প্রভুর বিষয়ে চিন্তা করে, যাতে সে শরীরে আর দিলে প্রভুর হতে পারে। কিন্তু বিবাহিতা স্ত্রীলোক সংসারের বিষয়ে ভাবে। সে চিন্তা করে কেমন করে সে স্বামীকে সন্তুষ্ট করবে। এই কথা আমি তোমাদের উপকারের জন্যই বলছি। আমি তোমাদের ধরাবাঁধার মধ্যে রাখবার জন্য তা বলছি না; বরং যা করা উচিত ও যা ভালো তা করার জন্য তোমাদের উৎসাহ দিচ্ছি। যেন তোমরা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে প্রভুর সেবা করতে পার (১ করিন্থীয় ৭ : ৩২-৩৫)।

একই চিঠিতে তিনি আরও বলেছেন, যে তার মেয়েকে বিয়ে দেয় সে ভালো করে, আর যে তাকে বিয়ে না দেয় সে আরও ভালো করে (১ করিন্থীয় ৭ : ৩৮)।

তিনি যেমন বিয়েতে নিরুৎসাহী ছিলেন, তেমনি অর্থোপার্জনেও। মানুষের দান-খয়রাতের উপরই নির্ভর করতেন। এজন্য তার কোন গ্লানি তো ছিলই না, উল্টো ধর্মশিক্ষা দানের কারণে তাকে তার প্রাপ্য মনে করতেন, অথচ দীনী কাজের কারণে মানুষের থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ না করাই নবী-রাসূলগণের শিক্ষা। তিনি বলেন, আমরা যখন তোমাদের মধ্যে রূহানী বীজ বুনেছি তখন তোমাদের কাছ থেকে যদি জাগতিক খাওয়া-পরা জোগাড় করি তবে সেটা কি খুব বেশি কিছু? (১ করিন্থীয় ৯ : ১২)।

এভাবে খৃষ্টধর্মে কুমার জীবন-যাপন, আয়-রোজগার না করে ভিক্ষাবৃত্তি ও পরনির্ভরশীলতা তথা পুরোপুরি সন্যাসবাদের প্রবর্তন সেন্ট পৌলের কীর্তি। এর সাথে হযরত মসীহ (আ)-এর শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই।

খৃষ্টধর্মের সার্বজনীনতা

বহুকাল যাবত খৃষ্টান মিশনারীরা বিশ্বব্যাপী খৃষ্টধর্ম প্রচার করে বেড়াচ্ছে এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষকে তাদের নাজাতের লক্ষ্যে খৃষ্টধর্ম গ্রহণের দাওয়াত দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে খৃষ্টধর্ম কি এমনই সার্বজনীন ধর্ম, যা দুনিয়ার সমস্ত মানুষের জন্য প্রযোজ্য? এবং যে কাউকে এ ধর্ম গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া যায় ও যে কেউ এটা গ্রহণ করতে পারে? এ ব্যাপারে হযরত মসীহ (আ)-এর নিজের

বক্তব্য কী?

প্রচলিত চার ইনজীলের বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তাতে হযরত ঈসা (আ)-এর যে সব উক্তি বর্ণিত হয়েছে তা দ্বারা স্পষ্টই জানা যায়, তিনি কেবল বনী ইসরাঈলের কাছেই প্রেরিত হয়েছিলেন। তার দাওয়াত সকল জাতির জন্য ব্যাপক ছিল না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, আমাকে কেবল বনী ইসরাঈলের হারানো ভেড়াদের কাছেই পাঠানো হয়েছে’ (মথি ১৫ : ২৪)।

কুরআন মজীদও সে কথাই বলে। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ কর, যখন মারয়াম-পুত্র ঈসা বলল, হে বনী ইসরাঈল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত (রাসূল)।-সূরা সাফফ : ৬।

তিনি তাঁর কাজকে ইহুদী জাতির মধ্যে এতটাই সীমাবদ্ধ বলে বিশ্বাস করতেন যে, এমনকি অন্যদের পার্থিব কোন উপকার হয়-এমন কাজ করতেও সহজে রাজি হতেন না।

মথির উপরিউক্ত পদটির আগে আছে, একজন কেনানীয় স্ত্রীলোক এসে চিৎকার করে বলতে লাগল, হে হুজুর, দাউদের বংশধর, আমাকে দয়া করুন। ভূতে ধরবার দরুন আমার মেয়েটি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু ঈসা তাকে একটি কথাও বললেন না। তখন তাঁর সাহাবীরা এসে তাঁকে অনুরোধ করে বললেন, ওকে বিদায় করে দিন। কারণ ও আমাদের পিছনে পিছনে চিৎকার করছে। এরই জবাবে ঈসা (আ) উপরে বর্ণিত কথাটি বলেন। যিনি পার্থিব উপকারের কাজটিকে নিজ সম্প্রদায় তথা ইহুদী জাতির জন্য এতটা সীমাবদ্ধ মনে করেন, তাঁর কাছে তাঁর নবুয়াতী ও দাওয়াতী কার্যক্রম যে তাদের পক্ষে সীমিত হবে তা বলাই বাহুল্য। এ কারণেই তিনি তার দাওয়াতকে ইহুদী জাতির বাইরে সম্প্রসারিত করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি যখন নিজ শিষ্য ও হাওয়ারীদেরকে দাওয়াতী দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন তখন তাদেরকে হুকুম দিয়েছিলেন, ‘তোমরা অ-ইহুদীদের কাছে বা সামেরীয়দের কোন গ্রামে যেও না; বরং ইসরাঈল জাতির হারানো ভেড়াদের কাছে যেও’ (মথি ১০ : ৫)

তার এসব উক্তি ও আদেশ দ্বারা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি সকল মানুষের নয়; বরং কেবল বনী ইসরাঈল ও ইহুদীদের নবী হিসেবেই প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং তার প্রচারিত ধর্ম ও তার আনীত শরীয়ত কেবল ইহুদী জাতির জন্যই অনুসরণীয়। অন্য কোন জাতির জন্য তা অনুসরণীয় নয়। সুতরাং ইহুদী ছাড়া অন্য কোন সম্প্রদায়ের কাছে তার ধর্ম প্রচার করার অবকাশ নেই। খৃষ্টান মিশনারীরা যে অন্যদের কাছে খৃষ্টধর্ম প্রচার করছে, মূলত তাদের তা করার কোন বৈধতা নেই। তারা তা করে তাদের নবীর আদেশ অমান্য করার অপরাধে অপরাধী হচ্ছে। বাকি প্রশ্ন হল, অন্য জাতির মধ্যে তাদের দাওয়াতী কার্যক্রমের সূচনাটা হল কিভাবে? কে ইহুদীদের জন্য সীমাবদ্ধ ধর্মকে অন্য জাতিতে সম্প্রসারিত করে অন্যদেরকে বিপথগামী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করল? 

পৌলের চিন্তাধারা

হ্যাঁ খৃষ্টধর্মের অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গির মত এ বিষয়টাও পৌলেরই সৃষ্টি। তিনিই প্রথম এ ধর্মকে সার্বজনীন ধর্মের রূপ দিয়েছেন। তিনিই প্রথম ইহুদী ছাড়া অন্য জাতির মধ্যে এ ধর্মের প্রচারকার্য শুরু করেন এবং দাবি করেন হযরত মসীহ (আ)ই তাঁর উপর এ দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রভু আমাকে বললেন, তুমি যাও, আমি তোমাকে দূরে অ-ইহুদীদের কাছে পাঠাব’ (প্রেরিত ২২ : ২১)।

‘আল্লাহ আমাকে অ-ইহুদীদের কাছে মসীহ ঈসার সেবাকারী হবার দোয়া করেছেন। পাক-রূহের দ্বারা যেসব অ-ইহুদীদের পাক-পবিত্র করা হয়েছে তারা যেন আল্লাহর গ্রহণযোগ্য কোরবানী হতে পারে সেজন্য তাঁরই দেওয়া সুসংবাদ তবলীগ করে আমি ইমামের কাজ করছি’ (রোমীয় ১৫ : ১৬)।

‘তোমরা যারা অ-ইহুদী তোমাদের জন্যই আমি মসীহ ঈসার বন্দি হয়েছি। তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ যে, আল্লাহ তার রহমতের ব্যবস্থা তোমাদের জানাবার ভার আমার উপর দিয়েছেন। তার গোপন উদ্দেশ্য তিনি ওহী দ্বারা আমাকে জানিয়েছেন। ... সে গোপন উদ্দেশ্য হল, এই সুসংবাদের মধ্য দিয়ে অ-ইহুদীরা মসীহ ঈসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইহুদীদের সঙ্গে একই সুযোগের অধিকারী হবে, একই শরীরের অংশ হবে’ (ইফিষীয় ৩ : ২-৬)।

‘ইহুদীদের কাছে সুসংবাদ তবলীগ করার ভার যেমন পিতরের উপর দেওয়া হয়েছিল তেমনি অ-ইহুদীদের কাছে

সুসংবাদ তবলীগ করার ভার আল্লাহ আমার উপর দিয়েছেন’ (গালাতীয়

২ : ৭)।

‘আল্লাহ আমার জন্মের সময় থেকেই আমাকে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন ...। আমি যেন অ-ইহুদীদের কাছে মসীহের বিষয়ে সুসংবাদ তবলীগ করি, এজন্য আল্লাহ যখন তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর পুত্রকে আমার কাছে প্রকাশ করলেন, তখন আমি কোন লোকের সংগে পরামর্শ করিনি’ (গালাতীয় ১ : ১৫-১৬)।

অ-ইহুদীদের কাছে একজন খ্রিষ্টীয় প্রচারক ও প্রেরিত হওয়ার দাবিমূলক এ জাতীয় বাক্য তার পত্রাবলিতে অজস্র রয়েছে। এটাও একটা খটকার বিষয় বৈকি। কেন তাকে এমন জোরদার ভাষায় এ দাবি করতে হচ্ছে? করতে হচ্ছে এজন্য যে, ইহুদী জাতির বাইরে খৃষ্টধর্ম প্রচারের যে অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা এ যাবৎকাল হযরত মসীহ (আ) ও তার শিষ্যবর্গের থেকে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার হয়ে আসছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ কারণে তাকে তীব্র প্রতিরোধেরও সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তার শিষ্য লূক প্রেরিত পুস্তকে বলেন, ‘লোকেরা এতক্ষণ পর্যন্ত পৌলের কথা শুনছিল, কিন্তু যখন তিনি অ-ইহুদীদের কথা বললেন, তখন লোকেরা জোরে চিৎকার করে বলতে লাগল, ওকে দুনিয়া থেকে দূর করে দাও, ও বেঁচে থাকবার উপযুক্ত নয়’ (প্রেরিত ২২ : ২২)।

বোঝা যাচ্ছে, খৃষ্টধর্ম যে ইহুদীদের জন্যই সীমিত ছিল এটা সকলের জানা একটি প্রতিষ্ঠিত মত। পৌলই সর্বপ্রথম সে সীমানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালান এবং তাতে পরিশেষে সফল হলেও প্রথমদিকে তাকে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আর সে কারণেই তিনি আল্লাহ ও মসীহের বরাত দিয়ে নিজ দাবিকে এতটা জোরদারভাবে বারবার উপস্থাপন করছিলেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, অ-ইহুদীদের মধ্যে খৃষ্টধর্মকে প্রচার করার এতটা গরজ তাঁর কেন দেখা দিয়েছিল?

এ গরজ বোঝার জন্য তার আরেকটি দাবি আমাদের সামনে রাখতে হবে। করিন্থবাসীদের কাছে লেখা ১ নং চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছ থেকে যে বিশেষ রহমত আমি পেয়েছি তার দ্বারাই ওস্তাদ রাজমিস্ত্রির মত আমি ভিত্তি গেঁথেছি আর তার উপরে অন্যেরা দালান তৈরি করেছে’ (১ করিন্থীয় ৩ : ১০)।

বস্ত্তত সেন্ট পৌল খৃষ্টধর্মের মোড়কে একটি নতুন ধর্মমতের ভিত্তিস্থাপন করার স্বপ্ন দেখছিলেন। যে কারণে তিনি খৃষ্টধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও হাওয়ারীদের কাছ থেকে সে ধর্মের শিক্ষা গ্রহণের কোন প্রয়োজন বোধ করেননি; বরং সোজা আরব এলাকায় চলে গিয়ে তিন বছর নিভৃত জীবন যাপন করেন এবং স্বপ্নের ধর্মটি কেমন হবে তার রূপরেখা তৈরি করেন। তারপর জেরুজালেমে ফিরে এসে পর্যায়ক্রমে সে পথে অগ্রসর হতে থাকেন। প্রথমদিকে তিনি হাওয়ারীদের সাথে মিলেই কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার উদ্ভাবিত নতুন নতুন তত্ত্ব দেখে তাঁদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে এবং পরিশেষে এক এক করে তাঁরা সকলে তার থেকে সরে পড়েন।

কিন্তু ইত্যবসরে তার যা অর্জন করার ছিল তা অর্জিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ একজন যিশু-সেবক হিসেবে সামাজিক প্রতিষ্ঠালাভ। অনন্তর তিনি পূর্ণোদ্যমে আপন লক্ষ্যে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি লক্ষ্য করে থাকবেন, অ-ইহুদী সমাজই তার কাজের উপযুক্ত ক্ষেত্র। কেননা সে সময় ইহুদীদের বাইরে আর সব জাতি সাধারণত পৌত্তলিক ছিল। আর তিনি যে ধর্মমতের নকশা এঁকেছিলেন তাও ছিল পৌত্তলিকতাঘনিষ্ঠ। একের স্থলে বহু খোদা, ঈশ্বরের অবতার-এসব তো পৌত্তলিক দর্শনই। ইহুদীদের মধ্যে সেই পৌত্তলিকতাগন্ধী ধর্ম প্রচার করা খুব সহজ ছিল না। যেহেতু হযরত মসীহের প্রচার ছাড়াও আগে থেকেই তারা তাওরাতের তওহীদী শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তাছাড়া তাদের মধ্যে মসীহ (আ)-এর প্রকৃত শিক্ষা প্রচার হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর নামে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠাদানও কঠিন ছিল। সুতরাং তিনি রোমীয়দের নামে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘যেখানে মসীহের নাম কখনও বলা হয়নি, সেখানে সুসংবাদ তবলীগ করাই আমার জীবনের লক্ষ্য। যেন অন্যের গাঁথা ভিত্তির উপরে আমাকে গড়ে তুলতে না হয়’ (রোমীয় ১৫ : ২০)।

তো এই হচ্ছে খৃষ্টধর্মকে ইহুদী জাতির বাইরে সম্প্রসারিত করে তাকে একটি সর্বজনীন ধর্মে পরিণত করার পৌলীয় প্রচেষ্টার রহস্য। পরবর্তীকালে মূল খৃষ্টধর্ম যখন পৌলের দৃষ্টিভঙ্গি ও তার প্রচারণার কাছে হেরে যায় এবং এ ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক পৌলীয় চিন্তা-চেতনাকেই আসল খৃষ্টধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে নেয় তখন তাদের কাছে এ ধর্ম একটি সাধারণ ও সার্বজনীন ধর্মের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। 

 (চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement