যিলহজ্জ্ব ১৪৩০   ||   ডিসেম্বর ২০০৯

স্বদেশ: ইতিবাচকতার পথে কেন নয়?

ওয়ারিস রব্বানী

নভেম্বর মাসের প্রায় শুরু থেকে শুরু হয়েছে বিবাদ-বিসম্বাদের ঘটনা। একটি জেলার একটি-দুটি উপজেলাকে নতুন করে জেলা বানানোর প্রাথমিক উদ্যোগ ঘোষণার পর থেকে শুরু হয়েছে এসব ঘটনার ঘনঘটা। কিশোরগঞ্জ ভাগ করে ভৈরবকে জেলা করার পক্ষে ভৈরব ও কুলিয়ারচরের অধিকাংশ মানুষ। আর অপরদিকে কিশোরগঞ্জকে অখণ্ড রাখার পক্ষে কিশোরগঞ্জের অপর কয়েকটি উপজেলার অধিকাংশ মানুষ। এ নিয়ে বিক্ষোভ, পাল্টা বিক্ষোভ, কুশপুত্তলিকা দাহ, গণস্বাক্ষর, স্মারকলিপি পর্ব শেষ হয়ে এখন চলছে হরতাল-ধর্মঘট। একটি জেলার ক্ষুদ্র একটি অংশকে আসলেই নতুন জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি না কিংবা করা হলে কোন্ সীমানা ধরে করা হবে তার কোনো কিছু ঠিকঠাক হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেছে কয়েকটি জেলার মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। তেলের লরি যেতে পারছে না, পণ্য পরিবহন হচ্ছে না, শত মাইল পথ পার হয়ে এসে যাত্রীদের মাঝপথ থেকে ঘুরে যেতে হচ্ছে আবার বাড়ির ঠিকানায়। সংবাদপত্র মারফত এসব বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই গরম গরম খবর ছাপা হচ্ছে। নতুন একটি জেলা হলে ওই জেলার অধিবাসীদের জীবনে ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি ঘটার প্রশ্নটার কাছে না গিয়েই দুর্ভোগের মাত্রা পাল্লা দিয়ে বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। এরচেয়ে হতাশাজনক বিষয় আর কী হতে পারে!

যতটুকু জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার অধীনে ভৈরবকে স্বতন্ত্র জেলা করার একটি নির্বাচনী আশ্বাস দিয়েছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ওই এলাকায় উপ নির্বাচনে এমপি হয়েছেন তারই ছেলে। এখন ভৈরবকে জেলা বানানোর দাবি ও সরকারী প্রয়াসে তারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মাঠে-ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তার ও তাদের রাজনৈতিক অনুসারী নেতাকর্মীরা। অপরদিকে কিশোরগঞ্জের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে বর্তমান জাতীয় সংসদের স্পীকার এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর মনোভাবের কথাও আসছে পত্র পত্রিকার পাতায়। শোনা যাচ্ছে, কিশোরগঞ্জ শহরে ভৈরবকে জেলা বানানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে যেসব নরম-গরম কর্মসূচি পালিত হচ্ছে তার নেতৃত্বে এ দু’নেতার অনুসারীদের ভূমিকা বড়। এর মধ্যে প্রেসিডেন্টের কুশপুত্তলিকা পুড়ানোর ঘটনাও ঘটে গেছে কিশোরগঞ্জ সদরে। এরপর থেকে ভৈরব জেলা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা চরম কর্মসূচি দিয়ে কিশোরগঞ্জকে সম্ভাব্য সব উপায়ে বয়কট করোর পথ বেছে নিয়েছেন। ভৈরব একটি বড় বাজার, নৌ বন্দর এবং বৃহত্তর সিলেট ও ক্ষেত্র বিশেষে ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল থেকে কিশোরগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় যোগাযোগ রক্ষার প্রবেশ পথ হওয়ায় ভৈরবে অনুষ্ঠিত টানা ধর্মঘট-হরতালে কয়েকটি জেলার অধিবাসীরা নানা ধরনের সংকটে পড়ে গেছেন। সাধারণ পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের সমস্যা তো এর সঙ্গে আছেই। ভৈরবকে জেলা করা-না করার দুদিকেই সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির কারণেই যদি ঘটনা এ পর্যায়ে পৌঁছে থাকে, তাহলে এই জনদুর্ভোগ দূর করার দায়িত্ব নেবে কে?

একটি জেলা ভেঙ্গে আরেকটি জেলা করা হবে অথবা হবে না-এরকম একটি প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েই যদি এত লাঠালাঠি-ফাটাফাটির ঘটনা ঘটে, এতদিনকার এক জেলার অধিবাসীরা ভাই-ভাইয়ের পরিবর্তে ঠাইঠাই হয়ে যাওয়ার পথ ধরেন তাহলে আর জাতীয় ঐক্য নামের শ্লোগানটি মাঝে-মধ্যে ব্যবহার করার সুযোগ থাকে কি? এ লেখা প্রকাশ হতে হতে হয়ত এ সমস্যাটির কিছু একটা সমাধান ঘটেই যাবে, ভৈরব নতুন জেলা হবে কিংবা কিশোরগঞ্জকে অখণ্ড রেখেই আন্দোলনকারীদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে বিরাট উদ্যোগ নিয়ে জনদুর্ভোগ ঘটানোর সংস্কৃতির কী হবে? এসব দুর্ভোগের দায় ও দুর্নাম কে নেবে? ভৈরবকে জেলা ঘোষণার উদ্যোগের প্রথম কয়দিন আবার কিশোরগঞ্জের অপর উপজেলা বাজিতপুরের বাসিন্দারা বাজিতপুরকে জেলা ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও রেলপথ অবরোধের ঘটনা ঘটিয়েছেন। সেখানে বিক্ষোভরত অবস্থায় একজনের মৃত্যুর খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। জানা নেই, ভৈরবকে জেলা ঘোষণা করলে বাজিতপুরবাসীরা আবারো মাঠে-ময়দানে সোচ্চার হয়ে উঠেন কিনা।

এখানে বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন একটি জেলা হলে সাধারণ যে পদ্ধতি ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে তাতে ওই জেলারই ৮০% দরিদ্র লোকের জীবনমানে কোনো ধরনের উন্নয়ন ঘটবে কি না। নাকি এটা কেবল উপর তলায় বসবাসকারী দু’য়েকশ লোকের জীবনের দিনবদলে ভূমিকা রাখবে।

সাধারণ মানুষের জন্য সাইনবোর্ড বদল আর নয়া নামের চমক ছাড়া যে ইস্যুতে কোনো সারবত্তা নেই সেটা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের এত হাঁকডাক আর দ্বেষাদ্বেষির ফলে আসলে লাভ-ক্ষতি কার হচ্ছে? পার্থিব কিংবা জাগতিক সুবিধা ও উন্নতির দিকটিকেই যদি বড় করে দেখা হয় তবুও বলা যায়, জেলা নিয়ে ঘটে যাওয়া এতসব কাণ্ডর মধ্য দিয়ে আবারো করুণভাবে ফুটে উঠল যে, বিভক্তি, গালমন্দ ও রাগগোস্বার মতো নেতিবাচক কাজে আমরা যতটা উৎসাহী তার সিকিভাগও ঐক্য, প্রশংসা আর সমঝোতার মতো ইতিবাচক কাজে নই।

নতুন জেলা বাস-বায়ন আর পুরনো জেলার অখণ্ডতা রক্ষায় মাঠে-ময়দানে যত মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ও অব্যাহত সমাগম ঘটেছে ও ঘটছে, নিজেদের এলাকার উন্নয়নে রাস্তা নির্মাণ, সেচ ব্যবস্থাপনা কিংবা বৃক্ষ রোপনে যদি স্বোচ্ছাশ্রমের উন্মুক্ত আহ্বান জানানো হয় তাহলে আর তাদের মাঝে তেমন সমাগম ঘটবে বলে মনে হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। কেবল এক দু’ জেলায় নয়, সারা দেশের সব জেলার বাসিন্দাদের মাঝেই।

 

advertisement