যিলহজ্জ্ব ১৪৩০   ||   ডিসেম্বর ২০০৯

অপসংস্কৃতি ও তার প্রতিকার

মুহাম্মাদ সিরাজুম মুনীর

সংস্কৃতি মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজ বিশ্বের দিকে দিকে চলছে শিক্ষা ও সংস্কৃতির যুদ্ধ। কোনো সংস্কৃতি যখন ইসলামী কার্যকলাপে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং নৈতিকতা বিবর্জিত হয় তখন তা অপসংস্কৃতি বলে চিহ্নিত হয়। এই অপসংস্কৃতির প্রভাবে জাতি তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং তরুণ সমাজ হয় বিপদগামী। মুসলমান জাতি আজ ইহুদী, খৃষ্টানদের চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবন নির্বাহের যাবতীয় রীতিনীতি অন্ধভাবে অনুকরণ করে যাচ্ছে। এহেন কার্যকলাপ থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন জীবনের সর্বস্তরে ইসলামী সংস্কৃতি চর্চা করা এবং এর ব্যাপকতার জন্য নিজস্ব মিডিয়া সৃষ্টি করা। সংস্কৃতির বিকৃত রূপই হল অপসংস্কৃতি। ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদীসের সাথে, আত্মা ও আচরণের সাথে, জীবন বোধ ও নৈতিকতার সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই, যা মানব জীবনকে কলুষময় করে এবং জীবনের ভয়াবহ পরিণতির ডেকে আনে তাই অপসংস্কৃতি। তরুণ সমাজকে আজ অসত্যের ধুম্রজালে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সঠিক পথের দিশা পাচ্ছে না তারা। মাঝিবিহীন নৌকার মতো জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে মাঝ দরিয়ায় খাবি খাচ্ছে। এভাবে মুসলমান তার ধর্মীয় স্বকীয়তা হারাচ্ছে। আজ অনেক মেয়ের চাল চলনে বুঝা যায় তারা ইসলামী বিধি-বিধানের ব্যাপারে খুবই অজ্ঞ। ইহকালই যেন তাদের সব। পরকালের চিন্তা করার সুযোগই পায় না। বেপর্দা ও অর্ধনগ্নতা মহামারির আকার ধারণ করছে। তাদের অনেকেই অধিকার আদায়ের জন্য পাশ্চাত্যের নারীদের মতো রাস্তায় নেমে শ্লোগান দিচ্ছে আর এই অধিকারে নামেই নারীদের শিক্ষা দিচ্ছে লজ্জাহীনতা এবং টেনে নিচ্ছে জাহেলী যুগের নারীদের অবস্থানে। ইহুদী, খৃস্টানরা অপসংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন অপকৌশল অবলম্বন করছে। তার মধ্যে একশ্রেণীর মিডিয়া হচ্ছে মূল হাতিয়ার। এই মিডিয়া উস্কানিদাতা ও সন্ত্রাসীর ভূমিকায় নেমেছে। ইহুদী নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া যা চায় তাই হচ্ছে। এমনকি এর মাধ্যমে জাতির ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ নাশ করার গতি ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। গানের সুর-তরঙ্গে থাকে এক প্রকারের মাদকতা যা শ্রোতাকে মাতাল করে দেয়। বিষ দেহকে হত্যা করে, জীবনের অবসান ঘটায়। আর নাচ বা নৃত্য মানুষকে আচ্ছন্ন করে। অশ্লীল গান মুনাফেকী সৃষ্টি করে যেমনিভাবে পানি শস্য উৎপন্ন করে। কুরআন মজীদে সঙ্গীত গান-বাজনা নৃত্যকে ‘লাহওয়াল হাদীস’ বলা হয়েছে। এর শাব্দিক অর্থ হল এমন কথা যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, দায়িত্ব ও কর্তব্যে তাকে গাফেল ও অসতর্ক বানিয়ে দেয়। বিজাতিরা আসল ধর্ম পরিত্যাগ করে ক্রীড়া ও কৌতুককেই ধর্মাচার হিসেবে গ্রহণ করেছে। মহান প্রভু আল্লাহ তাআলা সূরা আনআমের ৭০ নং আয়াতে তাদেরকে ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, (তরজমা) তাদেরকে পরিত্যাগ করুন, যারা নিজেদের ধর্মকে ক্রীড়া ও কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। দীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় আমাদের চিন্তা-চেতনা ও কাজে কর্মে যে অপংস্কৃতির বিষ ঢুকে পড়েছে তা সহজেই দূর করা যাবে না। এ বিষাক্ত প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করত হবে। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অসততা ও অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে তা রোধ করতে হবে। এজন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। যার ফলশ্রুতিতে নৈতিকতা অর্জিত হবে। সাথে সাথে শিক্ষিত সমাজকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। সর্বোপরি তরুণ-তরুণীদেরকে সচেতন করতে হবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামী সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার ও অনুশীলনের চেষ্টা করতে হবে। ফিল্ম বর্তমানে অশ্লীল, নির্লজ্জ ও নৈতিকতা বিবর্জিত দৃশ্যাবলির প্রদর্শনীর কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তা দর্শকদের বিশেষত তরুণ-তরুণীদের মন-মগজ ও চরিত্রের উপর অত্যন্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে। এ থেকে ধরা ছোয়ার বাইরের বিষয়কে ধরতে বা ছুঁয়ে দেখতে ও অব্যক্ত কল্পনাকে বাস্তবে রূপদান করতে তরুণরা পাগল পারা হয়ে যায়। অনেকে তাস, দাবা, জুয়াকে বিনোদন মনে করে। আর অনেকে এসব খেলায় মেতে গিয়ে আল্লাহর স্মরণ ও পরকালের কর্ম, শরীয়ত অনুসরণ, ঘর-সংসার ও যাবতীয় দায়-দায়িত্ব ভুলে যায়। তাদের সামনে জীবনের বৃহত্তর লক্ষ্য উদ্দেশ্য উপস্থিত থাকে না। আর যে জাতি এ সমস্ত রোগে আক্রান্ত সে জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও সমস্যা সংকুল। অপসংস্কৃতি রোধ কল্পে ইসলামী ব্যবস্থার আলোকে জীবনাচারের নানা পর্যায়ে ইসলামের অনুশাসন ও নৈতিকতার বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ মুমিনদের উদ্দেশ করে বলেন, তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না।’ এ সীমা দ্বারা মধ্য পন্থাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এর থেকে সুষম বিষয়ের উৎপত্তি হয়। এ দুনিয়ার সংস্কৃতির লক্ষ্য হবে সুষম বিষয় বা সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) আল্লাহ তোমাদের জন্য পছন্দনীয় বস্তু হালাল করেছেন এবং অপছন্দনীয় বস্তু হারাম করেছেন। তাই আজ পৃথিবীতে অপসংস্কৃতির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সেই স্রোতে আমরা যেন ভেসে না যাই। তাহলে আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাত দুটোই ব্যর্থ হবে। আমরা তো মুসলমান আমাদের সামনে রয়েছে আখিরাত। এ জীবনের সকল কাজকর্মের ব্যাপারে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। কুরআন মজীদে আছে, যে কণা পরিমাণ নেক আমল করে সে তা দেখতে পাবে এবং যে কণা পরিমাণ বদ আমল করে সেও তা দেখতে পাবে।’ তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকা আমাদের কর্তব্য। অপসংস্কৃতির বেড়াজাল ছিন্ন করে আমরা যেন যথার্থ ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত হই এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

advertisement