জুমাদাল উখরা-১৪৩২   ||   মে-২০১১

কুরআনে নারীর অধিকার : প্রসঙ্গ মীরাছ

আমরা যে কথাটি সব সময় বলে এসেছি এবং আমৃত্যু বলে যাব, তা হচ্ছে, নারীর কুরআনী অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। ব্যক্তি ও পরিবার, সমাজজ ও রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এটিই নারীর মুক্তি ও মর্যাদার একমাত্র পথ। এবং এ পথেই প্রতিষ্ঠিত হবে নারীর সকল অধিকার। পক্ষান্তরে অধিকার অধিকার বলে যতই চিৎকার করা হোক অযৌক্তিক ও মৌল ভিত্তিহীন কাজকর্মের দ্বারা নারীর অধিকার কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না; বরং তা নারীর মুক্তি ও মর্যাদাকে করবে সুদূর পরাহত। তাই নারী সমাজেরও কর্তব্য, সাফসাফ জানিয়ে দেওয়া, ব্যক্তি ও সমাজের কাছে আমাদের একমাত্র দাবি, আর তা হল নারী-সমাজের কুরআনী অধিকার প্রতিষ্ঠিত কর।

আজ মুসলিম সমাজের প্রতিটি পুরুষকে শপথ করতে হবে যে, আমি ব্যক্তি জীবনে নারীর সকল প্রাপ্য যথাযথভাবে পরিশোধ করব, তেমনি সমাজ-জীবনেও তাঁর কুরআনী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করব। ঈমানদার নারী ও পুরুষের এই মিছিলে যারা শামিল হতে চায় তাদের নিয়ে পথে আলো ছড়াতেই আমাদের এই সামান্য আয়োজন।

এখানে মীরাছ বিষয়ে কয়েকটি লেখা পত্রস্থ হল। লেখাগুলি পাঠ করে কারো মনে যদি মীরাছ আদায়ের প্রেরণা জাগে তাহলেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে। আল্লাহ রাববুল আলামীন আমাদের সকল আমালকে কবুল করুন। আমীন।-সম্পাদক

পুত্র-কন্যার মাঝে সমতা : কিছু নির্দেশনা

আবদুল্লাহ ফাহাদ

হাদীসে শরীফে কন্যাসন্তানের লালন-পালনের ছওয়াব ও ফযীলত যেমন আছে তেমনি আছে তার অধিকারসমূহের বর্ণনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাষায় নারীর অধিকারসমূহ বলে দিয়েছেন। আর এই অধিকারগুলো প্রধানত এমন, যা থেকে নারীকে বঞ্চিত করা হত জাহেলি যুগে। বর্তমানে যুগের অবস্থাও তা থেকে ভিন্ন নয়। তাই এখানে তাদের অবহেলিত কিছু অধিকারের কথা আলোচনা করা হল, যেন এই অবহেলার নিরসন হয়।

সন্তানদের প্রতি মমতা প্রকাশে সমতা

কারো কাছে পুত্রসন্তান বেশি প্রিয়, কারো কাছে কন্যাসন্তান। তবে অধিকাংশ মানুষই পুত্রসন্তান বেশি পছন্দ করে। মমতা ও মনের টান যেহেতু মানুষের ইচ্ছাধীন নয় তাই কারো প্রতি মনের টান বেশি হলে বা কম হলে মানুষ অপরাধী হয় না, কিন্তু এর প্রকাশটি যেহেতু মানুষের ইচ্ছা ও ইখতিয়ারের অধীন তাই এ বিষয়ে সমতা বজায় রাখা অপরিহার্য। অনেকে এই সমতা রক্ষা করে না। পুত্র-কন্যার মাঝে অসম আচরণ করে। পুত্রকে বেশি আদর করে, উপহার বেশি দেয়, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে কন্যার খোঁজখবরও নিতে  চায় না। আচার-আচরণে পিতামাতা থেকে এমন কিছু প্রকাশ পাওয়া উচিত নয়, যা দ্বারা      সন্তানের মনে এই সংশয় জাগে যে, মা-বাবা অমুককে বেশি স্নেহ করেন, আমাকে কম। সন্তানের প্রতি পিতামাতার এমন অসম আচরণ অন্যায়। কিয়ামতের দিন এ জন্য তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে।

হাদীসের প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন গ্রন্থ  মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক-এ ইমাম আবদুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম (মৃত্যু : ১২৬ হি.-২১১ হি.) বর্ণনা করেন, জনৈক আনসারী সাহাবীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকলেন। ইতিমধ্যে ঐ সাহাবীর এক পুত্র তার কাছে এল। তিনি তাকে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং কোলে বসালেন। কিছুক্ষণ পর তার এক কন্যাও সেখানে উপস্থিত হল। তিনি তার হাত ধরে নিজের কাছে বসালেন। এটি লক্ষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন-

ولو عدلت كان خيرا لك، قاربوا بين أبنائكم ولو في القبل. وفي رواية الطحاوي : فهلا عدلت بينهما؟

অর্থাৎ উভয় সন্তানের প্রতি তোমার আচরণ অভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। তোমরা নিজেদের          সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা করো। এমনকি চুমু খাওয়ার ক্ষেত্রেও।-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৯/১০০

সকল সন্তানকে সমান উপহার  দেওয়া

সন্তানদের প্রতি আদর- স্নেহ প্রকাশের মতো হাদিয়া-উপহারের ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা জরুরি। সুতরাং পিতামাতা যখন সন্তানদেরকে টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় কিংবা কোনো খাদ্যদ্রব্য দিবেন তখন সকলকে সমান হারে দিতে হবে। কন্যাকে ঠিক ততটুকুই দিবে যতটুকু পুত্রকে দেওয়া হয়েছে। ছেলেকে বেশি আর মেয়েকে কম কিংবা এর বিপরীত করা যাবে না। বিশেষ করে আনন্দের উপলক্ষগুলোতে যখন সন্তানদেরকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু দেওয়া হয় তখনও সমতা রক্ষা করা অপরিহার্য। যেমন ঈদের দিনে ঈদি সমান হারে দেওয়া, কোনো সফর থেকে ফেরার পর হাদিয়া-উপহার দিলে সবাইকে সমান দেওয়া ইত্যাদি।

হাদীস শরীফে আছে, বশীর ইবনে সাদ রা. একবার নিজপুত্র নুমান ইবনে বশীরকে কিছু জিনিস হাদিয়া করলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বাক্ষী বানানোর জন্য নুমানকে তাঁর নিকট নিয়ে এলেন। নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে এরুপ উপহার দিয়েছ? তিনি বললেন, জ্বী না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন-

فاتقوا الله واعدلوا في أولادكم. وفي رواية : قاربوا بين أولادكم.

 

 

অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় কর এবং সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। (আর এতটুকু চেষ্টা অবশ্যই কর যে, উপহার-সদাচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের অংশ যেন কাছাকাছি হয়।)-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪০৫৯, ৪০৬৪; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৯/৯৮

প্রয়োজনের ক্ষেত্রগুলো ব্যতিক্রম

পিতামাতা যদি কোনো সন্তানের প্রয়োজনের খাতিরে অন্যদের চেয়ে তার পিছনে কিছুটা বেশি খরচ করে, যেমন কারো অসুস্থতার সময় কিংবা পড়াশোনার জন্য অথবা ছেলে বা মেয়ে কোনো সফরে যাচ্ছে; একজনের সফর অল্প সময়ের, অন্যজনের সফর দীর্ঘ, একজনের সফরে অর্থের প্রয়োজন বেশি, অন্যজনের কম এ ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে তাদেরকে প্রয়োজন অনুপাতে কম-বেশি দিলে দোষ নেই। যে সন্তানের যতটুকু প্রয়োজন পিতামাতা তার জন্য ততটুকু খরচ করতে পারেন।

জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টন অপরিহার্য নয়

অনেকে জীবদ্দশাতেই স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পদ সন্তানদের মাঝে বণ্টন করতে চায়। প্রথমত এটা কোনো অপরিহার্য বিষয় নয়। দ্বিতীয়ত পিতামাতার জীবদ্দশায় তাদের সম্পদে সন্তানদের কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয় না; বরং পিতামাতাই নিজ সম্পদের মালিক। তারা ইচ্ছা করলে সন্তানদের মাঝে তা বণ্টন করতেও পারেন, ইচ্ছা করলে নাও করতে পারেন। সন্তানরা পিতামাতার কাছে এই দাবি করতে পারে না যে, আপনারা যা কিছু উপার্জন করেছেন তা আমাদের মাঝে বণ্টন করে দিন।

অনেক সন্তান এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে এবং এই বলে পিতামাতাকে বাধ্য করে যে, আপনার তো এখন আর এই সম্পদের প্রয়োজন নেই, এগুলো তো এখন আমাদের অধিকার। তাই জীবিত অবস্থায়ই সবকিছু বণ্টন করে ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে যান। আপনার মৃত্যুর পর আমরা ঠিকমতো সম্পদের হিস্যা পাব কি পাব না-এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে। সুতরাং এখনই জমিজমা বণ্টন করুন।

মনে রাখতে হবে যে, পিতামাতাই তাদের সম্পদের মালিক। সুতরাং বণ্টন করা, না করার বিষয়ে তারা স্বাধীন। অবশ্য পিতামাতা যদি মনে করেন যে, তাদের জীবদ্দশাতেই সম্পদ বণ্টন করে দেওয়া সমীচীন হবে তাহলে তারা তা করতে পারেন। যদি না করেন তবে এর সুযোগও তাদের রয়েছে।

জীবদ্দশায় যেভাবে সম্পদ বণ্টন করা হবে

যদি পিতামাতা জীবদ্দশাতেই   সন্তানদের মাঝে নিজেদের সম্পদ বণ্টন করতে চান তবে এরও অবকাশ আছে। যদিও মীরাছের অধিকার ব্যক্তির মৃত্যুর পরই সাব্যস্ত হয়, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বের সম্পদ বণ্টন যেহেতু  অগ্রিম মীরাছ বণ্টনের নিয়তে  হয়ে থাকে তাই এক্ষেত্রেও উত্তম হল শরীয়তের মীরাছ-ব্যবস্থার নীতিমালা অনুযায়ী তা বণ্টন করা এবং প্রত্যেককে তার হিস্যা        হস্তান্তর করে দেওয়া। তবে এই অগ্রিম বণ্টন যেহেতু প্রকৃত মীরাছ বণ্টন নয় তাই এক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েকে সমান হারে দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।-তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ২/৭৫

মনে রাখা উচিত যে, মৃত্যু-পূর্ব সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো ছেলে বা মেয়েকে বঞ্চিত করা কিংবা মীরাছের প্রাপ্য হিস্যা থেকে কম দেওয়া জায়েয নয়। সুতরাং তা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। 

বিবাহের কারণে কন্যার অধিকার রহিত হয় না

আমাদের সমাজের অবস্থা তো এই যে, একে তো পিতা তার জীবদ্দশায় মেয়েদেরকে সম্পদ দেয় না। এমনকি যদি বলা হয়, আপনি তো সব সম্পদ ছেলেদেরকেই দিয়ে দিলেন, মেয়েদেরকে কিছু দিলেন না? তখন জবাবে বলে, আমি তো মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। বিবাহের সময় তাকে যা কিছু দিয়েছি তাতেই তার পাওনা আদায় হয়ে গেছে। এই ধারণা ভুল। বিয়ের সময় মেয়েকে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়ার কারণে তার মীরাছের হক শেষ হয়ে যায় না। তেমনি এ কারণে তাকে পিতার সম্পদ থেকেও বঞ্চিত করা যায় না।

ছেলের বিয়েতে পিতা যেমন খরচ করেন তেমনি মেয়ের বিয়েতেও করবেন। সাধারণত দেখা যায়, পুত্রের বিয়েতে বেশি খরচ করা হয়। এটাও ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা উচিত। এর সহজ উপায় হল, নিজের আর্থিক সঙ্গতি অনুসারে আগেভাগেই নির্দিষ্ট করে নিবে যে, প্রত্যেক পুত্র-কন্যার বিয়েতে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করব। এরপর সে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ থেকে ছেলে-মেয়ের বিয়ের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করবে। যদি কারো ক্ষেত্রে কিছু বেঁচে যায় তাহলে নগদ আকারে তা প্রদান করবে। এমন যেন না হয়, এক সন্তানের বিয়েতে বেশি খরচ করা হল, অন্য সন্তানের বিয়েতে কম। কারণ এটাও এক ধরনের অন্যায়, যা শরীয়তে অপছন্দনীয়।

মোটকথা মেয়ের বিয়েতে সবকিছু দিয়ে দিয়েছি, এখন আর তার কোনো অধিকার নেই, জীবদ্দশাতেও সে আর কিছু পাবে না, মৃত্যুর পরও মীরাছের সম্পদে তার কোনো অধিকার থাকবে না-এটা স্পষ্ট জুলুম এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম।

সম্পদের হস্তান্তর অপরিহার্য

কোনো কোনো পিতামাতা তাদের জীবদ্দশায়ই তাদের সম্পদ শুধু মৌখিক বা লিখিত আকারে বণ্টন করে দেন। যেমন ঐ জমি এই ছেলের নামে, অমুক দোকান ঐ ছেলের নামে, অমুক ফ্ল্যাট এই মেয়ের নামে, অমুক প্লটটি অমুক মেয়ের নামে ইত্যাদি। কিন্তু প্রত্যেকের অংশ পৃথক পৃথক করে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপরোক্ত মৌখিক বা লিখিত ঘোষণার পরও সম্পদ পিতামাতার কব্জাতেই থাকে। এমনও হয় যে, একটি বণ্টনযোগ্য সম্পদ একাধিক সন্তানের নামে লিখে দেওয়া হয়। যেমন- একটি বড় দোকান বা বাড়ি দুই-তিন সন্তানের নামে লিখে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকের অংশ তার কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। মনে রাখতে হবে যে, হস্তান্তর করা ছাড়া শুধু মৌখিক বা লিখিত বণ্টনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা শরীয়তে নেই এবং এভাবে তাদের মালিকানাও প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং তা যথারীতি পিতার সম্পদ বলেই গণ্য হয়। সুতরাং পিতার মৃত্যুর পর মীরাছ বণ্টনের নিয়ম অনুযায়ী পুনরায় তা বণ্টন করতে হবে।

তাই জীবদ্দশায় সম্পদ বণ্টন করতে চাইলে সঠিক পদ্ধতি এই যে, প্রথমে বণ্টনযোগ্য সকল সম্পদ পৃথক পৃথক করে ভাগ করবে। এরপর সন্তানদের হাতে তা হস্তান্তর করবে। আর সম্পদ বিভিন্ন ধরনের হলে কমপক্ষে এসবের চাবি, ডকুমেন্ট বা মালিকানা সার্টিফিকেট ইত্যাদি হস্তান্তর করতে হবে। আরো সহজ ও উত্তম পন্থা এই যে, যিনি জীবদ্দশায় তার সকল সম্পদ বণ্টন করতে চান তিনি প্রথমে মুফতীর কাছ থেকে তার করণীয় বুঝে নিবেন। এরপর সে নিয়মে বণ্টন করবেন। যেন তার এই বণ্টনটি শরীয়তের দৃষ্টিতেও গ্রহণযোগ্য হয়।

যাইহোক, মেয়েকে তার প্রাপ্য হিস্যা থেকে কম দেওয়া বা একেবারেই না দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জুলুম ও নাজায়েয। হাদীস শরীফে আছে, যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশকে মীরাছ থেকে বঞ্চিত করে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের অংশ থেকে বঞ্চিত করবেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১৬/২১৫

নারীর প্রতি এই অবিচার মূলত জাহেলি যুগ থেকে চলে আসা ভ্রান্ত চিন্তারই কুফল। জাহেলি যুগে আরবের কাফিররা কন্যাসন্তানকে কোনো কিছুই মনে করত না। এমনকি তাদেরকে বাঁচার অধিকারটুকু দিতেও প্রস্ত্তত ছিল না। আর এখন মুসলমানরাও মেয়েদেরকে মীরাছ থেকে বঞ্চিত করে। এমনকি জীবদ্দশায় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও তাদেরকে বঞ্চিত করে। বিয়েশাদিতে প্রথাগত সামান্য কিছু ব্যয় করেই মনে করে যে, তাদের হক আদায় হয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট সম্পদে তাদের কোনো অধিকার নেই, এতে শুধু পুত্রদের অধিকার। এই চিন্তা ও রীতি সম্পূর্ণ ভুল; বরং পিতার সম্পদে পুত্র-কন্যা উভয়ের অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা জরুরি।

আর আগেও বলা হয়েছে যে,     সন্তানের প্রয়োজনের কারণে হাদিয়া-উপহারের ক্ষেত্রে কম-বেশি করতে কোনো দোষ নেই। তাই কোনো মেয়ে যদি অভাবী হয়, যার আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন, আর ছেলে স্বচ্ছল, প্রয়োজনের সকল কিছুই তার আছে, এ অবস্থায় পিতা যদি মেয়েকে কিছু বেশি দেন তাহলে কোনো দোষ নেই। তবে সকলেই যদি অভাবী হয় কিংবা আর্থিক দিক থেকে সকলের অবস্থা এক ধরনের হয় তাহলে তাদের মাঝে সমতা রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে কম-বেশি করবে না।

 মোটকথা, শরীয়তের অনেক বিধান রয়েছে, যে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত। এজন্য ইলমে দ্বীন অর্জনের চেষ্টা করা সকলের জন্য অপরিহার্য।

[‘‘বেটী আল্লাহ কী রহমত আওর যিন্দেগী মে তাকসীমে জায়দাদ কা তরীকা’’ শীর্ষক পুস্তিকা অবলম্বনে।]

 

মীরাছে নারীর হিস্যা ও ইসলামের    ইনসাফপূর্ণ বিধান

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া

একমাত্র ইসলামই নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। কারণ ইসলাম মানবরচিত কোনো জীবন-ব্যবস্থা নয়; বরং আল্লাহ রাববুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত দ্বীন ও শরীয়ত। আল্লাহ তাআলা সকল দুর্বলতা থেকে মুক্ত এবং অতীত ও ভবিষ্যতের সকল সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে। ইসলামের  অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মীরাছের বিধান, যা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার দেওয়া বিধান ও নীতি।

মৃতের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে জীবিত আত্মীয়দের কার হিস্যা কতটুকু তা কুরআন মজীদে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। সুতরাং তা অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন। এতে পুরুষের হিস্যা যেমন আছে তেমনি আছে নারীর হিস্যা।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

للرجال نصيب مما ترك الوالدان والاقربون، وللنساء نصيب مما ترك الوالدان والاقربون، مما قل منه او كثر نصيبا مفروضا.

অর্থ : পিতা-মাতা এবং নিকটতর আত্মীয়দের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও নিকটতর আত্মীয়দের পরিত্যাক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে। তা অল্পই হোক বা বেশি, এক নির্ধারিত অংশ।-সূরা নিসা : ৭

সাধারণত কুরআন মজীদে আহকাম ও বিধানের বিস্তারিত বিবরণ থাকে না, উসূল ও মূলনীতি থাকে, বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ থাকে হাদীস শরীফে। যেমন কুরআন মজীদে নামাযের আদেশ করে বলা হয়েছে-

اقيموا الصلاة

নামায আদায় কর। কিন্তু নামায আদায়ের পদ্ধতি, রাকাত-সংখ্যা ও     বিস্তারিত মাসায়েল এসেছে হাদীস শরীফে।

পক্ষান্তরে উত্তরাধিকারের বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। প্রত্যেক ওয়ারিসের অংশ এক এক করে কুরআন মজীদে সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। এর কারণ উল্লেখ করে পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতার অংশ উল্লেখ করার পর আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

اباءكم وابناءكم لا تدرون ايهم اقرب لكم نفعا، فريضة من الله ان الله كان عليما حكيما.

তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী তোমরা তা জান না। নিশ্চয় এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। -সূরা নিসা (৪) : ১১১

এ কারণেই মীরাছের নির্ধারিত হিস্যার উপর আপত্তি করা, জুলুম বা বৈষম্যের অভিযোগ তোলার অর্থ সরাসরি আল্লাহ তাআলা উপর অভিযোগ তোলা। আল্লাহ তাআলা মীরাছের বিধান সম্পর্কে বলেছেন-

تلك حدود الله، ومن يطع الله ورسوله يدخله جنات تجرى من تحتها الانهار خالدين فيها، وذلك الفوز العظيم، ومن يعص الله ورسوله ويتعد حدوده يدخله نارا خالدا فيها وله عذاب مهين.

অর্থ : এইসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটা মহাসাফল্য। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমাকে লঙ্ঘন করবে তিনি তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।-সূরা নিসা : ১৩-১৪

এ নিবন্ধে নারীর হিস্যা সংক্রান্ত যে বিষয়গুলোর উপর সামান্য আলোকপাত করতে চাই তা এই :

১. ইসলামের মীরাছ-ব্যবস্থায় নারীর হিস্যা সুসংরক্ষিত। অন্য কোনো ধর্ম, মতবাদ বা জীবনব্যবস্থায় এর দৃষ্টান্ত দেখানো যাবে না।

২. পুরুষকে নারীর দ্বিগুণ হিস্যা দেওয়া হয়েছে বলে যারা ইসলামের এই বিধানের সমালোচনা করেন তারা এই বিধানটিকে খন্ডিতভাবে উপস্থাপন করেন।

৩. যেসব ক্ষেত্রে একজন পুরুষকে দুজন নারীর সমান হিস্যা দেওয়া হয়েছে তা যৌক্তিক ও স্বাভাবিক নীতিমালার কারণেই দেওয়া হয়েছে।

১. ইসলামের মীরাছ-ব্যবস্থায় নারীর হিস্যা সুসংরক্ষিত

১. নারী মা হিসেবে কখনো পুরো সম্পত্তির তিন ভাগের এক ভাগ পায়, কখনো ছয় ভাগের এক ভাগ।

২. নারী দাদী ও নানী হিসেবে পুরো সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ পায়।

৩. নারী কন্যা হিসেবে কখনো পুরো সম্পত্তির  অর্ধেক পায়, দুই বা ততোধিক কন্যা হলে সকলে মিলে তিন ভাগের দুই ভাগ পায়। আর ভাইয়ের সাথে থাকলে ভাইয়ের অর্ধেক পায়।

৪. নারী পৌত্রী হিসেবে দাদার সম্পদ থেকে কখনো অর্ধেক পায়, কখনো ছয় ভাগের এক ভাগ এবং পৌত্রের সাথে হলে পৌত্রের অর্ধেক পায়।

৫. নারী সহোদরা বোন হিসেবে কখনো অর্ধেক পায়। দুই বা ততোধিক হলে তিন ভাগের দুই ভাগ পায় এবং সহোদর ভাই সাথে থাকলে ভাইয়ের অর্ধেক পায়।

৬. নারী বৈমাত্রেয় বোন হিসেবে কখনো অর্ধেক পায়, কখনো ছয় ভাগের এক ভাগ এবং একাধিক থাকলে তিন ভাগের দুই ভাগ পায়। ভাই সাথে থাকলে ভাইয়ের অর্ধেক পায়।

৭. নারী বৈপিত্রেয় বোন হিসেবে কখনো ছয় ভাগের এক ভাগ পায়, একাধিক থাকলে তিন ভাগের এক ভাগ পায়।

৮. নারী স্ত্রী হিসেবে কখনো চার ভাগের এক ভাগ, কখনো আট ভাগের এক ভাগ পায়।

শরীয়তে নারীর নির্ধারিত অংশ অন্যভাবেও দেখানো যেতে পারে। যথা :

ক. স্থায়ী ওয়ারিসদের মাঝে নারী ও পুরুষের সংখ্যা সমান

ওয়ারিসদের মধ্যে নিকটবর্তীদের কারণে দূরবর্তীগণ কখনো অংশ কম পায়, কখনো সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। কিন্তু ছয় প্রকারের ওয়ারিস এমন আছে, যারা কখনো বঞ্চিত হয় না। তাদের তিন প্রকার পুরুষ : পিতা, পুত্র ও স্বামী। আর তিন প্রকার নারী : মাতা, কন্যা ও স্ত্রী।

এরা সকলেই স্থায়ী ওয়ারিস।

খ. যাবিল ফুরুযের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের দ্বিগুণ

কুরআন মজীদে যে সকল ওয়ারিশের অংশ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাদেরকে যাবিল ফুরুয বলে। মোট ১২ প্রকার ওয়ারিস যাবিল ফুরুযের অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে ৪ প্রকার পুরুষ, ৮ প্রকার নারী।

যাবিল ফুরুয পুরুষগণ হচ্ছে : ১. স্বামী ২. পিতা ৩. দাদা, দাদার পিতা ৪. বৈপিত্রেয় ভাই।

যাবিল ফুরুয নারীগণ হচ্ছে : ১. স্ত্রী ২. মাতা ৩. দাদী, নানী, দাদীর মাতা, দাদার মাতা ৪. কন্যা ৫. পুত্রের কন্যা, পুত্রের পুত্রের কন্যা ৬. সহোদরা বোন ৭. বৈমাত্রেয় বোন ৮. বৈপিত্রেয় বোন।

গ. আসাবাতেও নারী বেশি

যাবিল ফূরুযগণ তাদের অংশ নেওয়ার পর অবশিষ্টাংশ যারা পায় তাদেরকে আসাবা বলা হয়। আসাবা তিন স্তরের। প্রথম  স্তরে চার প্রকারের পুরুষ। দ্বিতীয় স্তরে চার প্রকারের নারী আর তৃতীয় স্তরে শুধু এক প্রকারের নারী।

ঘ. কুরআন মজীদে উল্লেখিত মীরাছের নির্ধারিত হিস্যা সর্বমোট ৬টি। আর তা হল দুই ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ, আট ভাগের এক ভাগ এবং তিন ভাগের দুই ভাগ, তিন ভাগের এক ভাগ ও ছয় ভাগের এক ভাগ। এই অংশগুলো যাদের জন্য নির্ধারিত তাদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা বেশি।

নিম্নে তফসীল দেওয়া হল :

দুই ভাগের এক ভাগ : বিভিন্ন অবস্থায় মোট পাঁচ প্রকারের ওয়ারিস এই অংশ পায়। তারা হচ্ছে : ১. স্বামী ২. কন্যা ৩. পুত্রের কন্যা ৪. সহোদরা বোন ৫. বৈমাত্রেয় বোন।

এদের চার প্রকারই নারী, এক প্রকার হল পুরুষ।

চারভাগের এক ভাগ : এটি পায় দুই প্রকারের ওয়ারিস : ১. স্ত্রী ২. স্বামী।

আটভাগের এক ভাগ : এটি স্ত্রীর অংশ।

তিনভাগের দুই ভাগ : মোট চার প্রকারের ওয়ারিসের জন্য এই অংশ নির্ধারিত। এরা সকলেই নারী : ১. দুই বা ততোধিক কন্যা ২. দুই বা ততোধিক পৌত্রী ৩. দুই বা ততোধিক সহোদরা বোন ৪. দুই বা ততোধিক বৈমাত্রেয় বোন।

তিনভাগের একভাগ : এটি নির্ধারিত তিন প্রকারের ওয়ারিসের জন্য। তার মধ্যে দুজনই নারী : ১. মাতা ২. বৈপিত্রেয় বোন একাধিক হলে।

ছয়ভাগের এক ভাগ : এটি মোট সাত প্রকারের ওয়ারিশের জন্য নির্ধারিত। তন্মধ্যে দুই প্রকার পুরুষ ও পাঁচ প্রকার নারী : ১. পিতা ২. দাদা    ৩. মাতা ৪. পৌত্রী (একজন হলে)      ৫. বৈমাত্রেয় বোন ৬. দাদী, নানী, দাদার মাতা ৭. বৈপিত্রেয় ভাই ও বোন।

নারীর অংশ নির্ধারিত থাকার সুফল

মোটকথা ইসলামী শরীয়তে নারীর হিস্যা সুসংরক্ষিত।  আর নারীর অংশ নির্ধারিত হওয়ার কারণে সর্বাবস্থায় সে তার নির্ধারিত অংশ পায়। পক্ষান্তরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই   স্তরের পুরুষের অংশ নির্দিষ্ট না থাকার কারণে সে কোনো অংশ পায় না। নীচের দুটি উদাহরণ লক্ষ করুন : ১. শরীফা বেগম নিঃসন্তান অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী, একজন আপন বোন ও একজন বৈমাত্রেয় বোন রেখে গেছেন। তাদের মীরাছের হিস্যা        হবে নিম্নরূপ :

 

 

 

 

 

 

পক্ষান্তরে হাসিনা বেগমও    নিঃসন্তান ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্বামী, একজন সহোদর বোন ও এক বৈমাত্রেয় ভাই রেখে গেছেন। তাদের মীরাছের হিস্যা হবে এ রকম :

 

 

 

 

 

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শরীফা বেগমের বৈমাত্রেয় বোন সাত ভাগের এক ভাগ তথা শতকরা ১৪.২৮৫% অংশ পেলেও ঐ আত্মীয়দের উপস্থিতিতেই হাসিনা বেগমের বৈমাত্রেয় ভাই কিছুই পায়নি।

নিকটতর ওয়ারিস থাকার কারণে যে সকল দূরবর্তী ওয়ারিস সম্পদ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয় তাদের মধ্যেও পুরুষ বেশি, নারী কম। অর্থাৎ এগার প্রকারের পুরুষ ও পাঁচ প্রকারের নারী। নিম্নে তফসীল দেওয়া হল :

১. দাদা : পিতা থাকলে, তেমনি পরদাদা বঞ্চিত হয় দাদা থাকলে।

২. সহোদর ভাই : পিতা, পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্রের কোনো একজন থাকলে।

৩. বৈমাত্রেয় ভাই : পিতা, পুত্র, পৌত্র বা সহোদর ভাইয়ের কেউ থাকলে, তেমনি সহোদর বোন থাকলে (যদি কন্যার কারণে বোন আসাবা হয়)।

৪. বৈপিত্রেয় ভাই : পিতা, দাদা বা পরদাদা, তেমনি ছেলে কিংবা মেয়ে থাকলে।

৫. পৌত্র : পুত্র থাকলে। তদ্রূপ প্রপৌত্র বঞ্চিত হয় পৌত্র থাকলে।

৬. ভাতিজা (সহোদর ভাইয়ের পুত্র) : পিতা, দাদা, পুত্র বা পৌত্র অথবা প্রপৌত্র কোনো একজনের উপস্থিতিতে, তেমনি সহোদর ভাই ও বৈমাত্রেয় ভাইয়ের উপস্থিতিতে।

৭. বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পুত্র : পিতা, দাদা, পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্রের উপস্থিতিতে। তেমনি সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই কিংবা সহোদর ভাইয়ের পুত্র থাকলে।

৮. চাচা (পিতার সহোদর ভাই) : বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পুত্র থাকলে কিংবা বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পুত্র, যাদের কারণে বঞ্চিত হয় তারা কেউ থাকলে।

৯. চাচা (পিতার বৈমাত্রেয় ভাই) : আপন চাচা থাকলে কিংবা আপন চাচা যাদের কারণে বঞ্চিত হয় তারা কেউ থাকলে।

১০. চাচাত ভাই (পিতার সহোদর ভাইয়ের পুত্র) : চাচা (পিতার বৈমাত্রেয় ভাই) থাকলে, কিংবা এই চাচা যাদের কারণে বঞ্চিত হয় তারা কেউ থাকলে।

১১. চাচাত ভাই (পিতার বৈমাত্রেয় ভাইয়ের পুত্র) : আপন চাচার পুত্র থাকলে কিংবা ঐ চাচাত ভাই যাদের কারণে বঞ্চিত হয় তারা কেউ থাকলে।

নারীগণ

১. দাদী, নানী : মা থাকলে।

২. পৌত্রী : পুত্র থাকলে, কিংবা একাধিক কন্যা থাকলে (যদি পৌত্রী আসাবা না হয়)।

৩. সহোদরা বোন : পিতা, পুত্র, পৌত্র কোনো একজন থাকলে।

৪. বৈমাত্রেয় বোন : সহোদরা বোন (যখন আসাবা হয়), পিতা, পুত্র, পৌত্র কেউ থাকলে। তেমনি দুই বা ততোধিক সহোদরা বোন থাকলে (যদি তারা আসাবা না হয়)।

৫. বৈপিত্রেয় বোন : পিতা, পুত্র, কন্যা কোনো একজন থাকলে তেমনি পৌত্র বা পৌত্রী থাকলে।

এক পুরুষ দুই নারীর অংশ পায়-এটা ইসলামী উত্তরাধিকারের সর্বক্ষেত্রের নীতি নয়

ইসলামের সম্পূর্ণ মীরাছ-ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় যে, ইসলামে পুরুষকে নারীর দ্বিগুণ হিস্যা দেওয়া হয়েছে। ধারণা দেওয়া হয় যে, এটা মূলত নারী-পুরুষের মাঝে বৈষম্যমূলক চেতনারই প্রতিফলন। (নাউযুবিল্লাহ)

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে চাই যে, মীরাছের হিস্যা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে তা ঘোষিত হয়েছে। সুতরাং এখানে বৈষম্যের কথা সভয়ে পরিহার করা উচিত। এরপর ইসলাম-বিদ্বেষীদের প্রচারণার অসারতা বোঝার জন্য এ বিষয়ে চিন্তা করতে পারি।

ইসলামের মীরাছ-ব্যবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া হয় যে, পুরুষকে পুরুষ হওয়ার কারণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং নারীর দ্বিগুণ দেওয়া হয়েছে-এটা সম্পূর্ণ অসত্য প্রচারণা। কারণ গোটা মীরাছ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে তিনটি অবস্থা দেখা যায় : ১. নারী কখনো পুরুষের সমান অংশ পেয়ে থাকে। ২. কখনো পুরুষের চেয়ে বেশি পেয়ে থাকে। ৩. কখনো পুরুষ বেশি পেয়ে তাকে। নীচে কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হচ্ছে।

নারীর অংশ পুরুষের সমান

ক. দাদা-দাদী দুজনের হিস্যা ছয় ভাগের এক ভাগ। যদি মৃতের পুত্র বা পৌত্র থাকে। অর্থাৎ পুত্র ৪৫.১৬৬%, দাদী ১৬.৬৬%, দাদা ১৬.৬৬%, স্ত্রী ১২.৫%।

খ. পিতা-মাতা দুজনেরই হিস্যা ছয় ভাগের এক ভাগ। যদি মৃতের পুত্র বা পৌত্র থাকে। অর্থাৎ পিতা ১৬.৬৬%, মাতা ১৬.৬৬%, স্ত্রী ১২.৫%, ও পুত্র ৫৪.১৬৬%।

এটা কুরআন মজীদেরই বিধান। ইরশাদ হয়েছে-

ولأبويه لكل واحد منهما السدس مما ترك إن كان له ولد

উল্লেখ্য, প্রথম উদাহরণে মৃতের কন্যার হিস্যা মৃতের স্বামীর চেয়ে এবং দ্বিতীয় উদাহরণে কন্যার হিস্যা মৃতের পিতার চেয়ে বেশি।

গ. বৈপিত্রেয় ভাই বোন একত্রে থাকলে তিন ভাগের এক ভাগ সম্পত্তি উভয়ে সমান ভাগে ভাগ করে নিবে। অর্থাৎ বৈপিত্রেয় একভাই এক বোন ৩৩.৩৩%, সহোদর দুই বোন ৬৬.৬৬% পাবে।

এই বিধানটিও কুরআন মজীদে আছে। ইরশাদ হয়েছে-

وان كان رجل يورث كلالة، او امرأة وله أخ او أخت فلكل واحد منهما السدس، فإن كانوا أكثر من ذلك فهم شركاء في الثلث.

অর্থ : যদি পিতা ও সন্তানহীন কোনো পুরুষ অথবা নারীর উত্তরাধিকারী থাকে তার এক বৈপিত্রেয় ভাই বা ভগ্নী তাহলে প্রত্যেকের জন্য এক ষষ্ঠাংশ। তারা এর অধিক হলে সকলে সম অংশীদার হবে এক তৃতীয়াংশে। -সূরা নিসা : ১২)

এসব উদাহরণে দেখা যাচ্ছে, একই মাইয়েতের মীরাছে বিশেষ কিছু নারী ও পুরুষকে সমান হিস্যা দেওয়া হয়েছে।

২. নারীর অংশ পুরুষের চেয়ে বেশি

মীরাছে পুত্র ও ভাইয়ের অংশ  যেহেতু নির্ধারিত নয় তাই ভাই ও পুত্র কখনো বোন ও কন্যা থেকে কম পেয়ে থাকে। যেমন মাইয়্যেতের পিতা, মাতা এবং স্বামী বা স্ত্রীর সাথে শুধু দুই কন্যা থাকলে কন্যা যতটুকু পায় শুধু দুই পুত্র থাকলে তারা তার চেয়ে কম পেয়ে থাকে। প্রথম ক্ষেত্রে মীরাছের অংশ হবে নিম্নরূপ : স্ত্রী ১১.১১%, পিতা ১৪.৮১%, মাতা ১৪.৮১% এবং প্রত্যেক কন্যা ২৯.৬২৯% করে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মীরাছের অংশ হবে নিম্নরূপ : স্ত্রী ১২.৫%, পিতা ১৬.৬৬%, মাতা ১৬.৬৬% এবং প্রত্যেক পুত্র ২৭.০৮% করে পাবে। তাহলে ১ম ক্ষেত্রে প্রত্যেক কন্যা ২৯.৬২৯% পাচ্ছে, অথচ ঐ আত্মীয়দের সাথে পুত্র পাচ্ছে ২৭.০৮%।

 আরেকটি উদাহরণ : মাইয়্যেতের স্বামী, পিতা ও মাতার সাথে শুধু দুই কন্যা থাকলে কন্যারা যে অংশ পায় শুধু দুই পুত্র থাকলে পুত্ররা তার চেয়ে কম পায়। কারণ প্রথম ক্ষেত্রে মীরাছের অংশ হবে নিম্নরূপ : স্বামী ১৯.৯৯%, পিতা ১৩.৩৩%, মাতা ১৩.৩৩% এবং প্রত্যেক  কন্যা ২৬.৬৬% করে পাবে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মীরাছের অংশ হবে নিম্নরূপ : স্বামী ২৫%, পিতা ১৬.৬৬%, মাতা ১৬.৬৬% এবং প্রত্যেক পুত্র ২০.৮৩% করে পাবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যেক কন্যা ২৬.৬৬% সম্পদ পেয়েছে অথচ ঐ আত্মীয়দের সাথেই প্রত্যেক পুত্র পাচ্ছে ২০.৮৩%।

তেমনি কখনো বোন ভাই থেকে বেশি পায়। নীচের ছকটি দেখুন : মাইয়েতের স্বামী, মাতা, বৈপিত্রেয় বোন ও বৈমাত্রেয় বোন থাকলে প্রত্যেকের মীরাছের হিস্যা হয় নিম্নরূপ : স্বামী ৩৭.৫%, মাতা ১২.৫%, বৈপিত্রেয় বোন ১২.৫% ও বৈমাত্রেয় বোন ৩৭.৫%। পক্ষান্তরে স্বামী, মাতা, বৈপিত্রেয় বোনের সাথে যদি বৈমাত্রেয় ভাই থাকে তাহলে প্রত্যেকের হিস্যা হয় নিম্নরূপ : স্বামী ৫০%, মাতা ১৬.৬৬%, বৈপিত্রেয় বোন ১৬.৬৬% ও বৈমাত্রেয় ভাই ১৬.৬৬%।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রথম ক্ষেত্রে যে আত্মীয়দের সাথে বৈমাত্রেয় বোন শতকরা ৩৭.৫% পেয়েছে তাদের সাথেই বৈমাত্রেয় ভাই পেয়েছে তার অর্ধেকেরও কম।

এই উদাহরণগুলির সারকথা হল, একই ধরনের আত্মীয় রেখে দুজন ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করেছে, কিন্তু আত্মীয়তার ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়েও এক মাইয়েতের নারী ওয়ারিসরা অপর মাইয়েতের পুরুষ ওয়ারিসদের চেয়ে সম্পদ বেশি পেয়েছে।

আর একই মাইয়েতের পুরুষ ওয়ারিসের চেয়ে নারী ওয়ারিস বেশি পাওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে গিয়েছে। যেখানে মৃতের কন্যাকে মৃতের স্বামীর চেয়ে এবং মৃতের কন্যা মৃতের পিতার চেয়ে বেশি পেয়েছে।

সমপর্যায়ের পুরুষ মীরাছ পায় না কিন্তু নারী পায়

১. নানী ছয় ভাগের এক ভাগ পায়, কিন্তু নানা কিছুই পায় না।

২. মৃতের স্বামী এবং সহোদরা বোনের সাথে বৈমাত্রেয় বোন থাকলে বৈমাত্রেয় বোন অংশ পায়। কিন্তু এক্ষেত্রে বৈমাত্রেয় ভাই থাকলে সে পায় না।

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, পুরুষকে সর্বক্ষেত্রে অধিক হিস্যা দেয়া হয়নি। কোনো ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের হিস্যা সমান, কোনো ক্ষেত্রে বেশি। আর তা দুই মাইয়েতের মীরাছ তুলনা করলে যেমন পাওয়া যায় তেমনি এক মাইয়েতের মীরাছেও পাওয়া যায়। সুতরাং ইসলামে পুরুষের হিস্যা নারীর দ্বিগুণ-এটি ইসলামী মীরাছ-ব্যবস্থার খন্ডিত উপস্থাপনা।

এক পুরুষ পায় দুই নারীর অংশ

তৃতীয় অবস্থাটি হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন পুরুষ দুইজন নারীর সমান অংশ পেয়ে থাকে। এটাও কুরআন মজীদেরই বিধান। ইরশাদ হয়েছে-

يوصيكم الله فى اولادكم للذكر مثل حظ الانثيين

এই আয়াতের বিধান হল, মাইয়েতের পুত্র-কন্যা দুটোই যদি থাকে তাহলে পুত্র পাবে কন্যার দ্বিগুণ। তেমনি পৌত্র ও পৌত্রী থাকলে পৌত্র পাবে পৌত্রীর দ্বিগুণ।

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

وان كانوا اخوة رجالا ونساء فللذكر مثل حظ الانثيين

এই আয়াতের বিধান হল মাইয়েতের সহোদর ভাই-বোন দুজনই যদি থাকে তাহলে ভাই পাবে বোনের দ্বিগুণ। একই কথা বৈমাত্রেয় ভাই-বোনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

উপরের দীর্ঘ আলোচনার সারকথা

উপরের মীরাছ বণ্টন সংক্রান্ত শরীয়তের বিধিবিধানের কিছু অংশ উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। মনোযোগের সাথে পাঠ করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, ইসলামের মীরাছ বণ্টনের মূল ভিত্তি কখনো এই নয় যে, কাউকে শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে অধিক দেওয়া হবে, আর কাউকে শুধু নারী হওয়ার কারণে কম দেওয়া হবে বা বঞ্চিত করা হবে; এ কারণেই উপরে আমরা দেখেছি যে, সর্বক্ষেত্রে না পুরুষকে অগ্রাধিকার পেয়েছে, না নারীকে; বরং কোথাও পুরুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, কোথাও নারীকে। আল্লাহ রাববুল আলামীন সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় এবং নারী-পুরুষ উভয়েরই খালিক ও মালিক। উভয়ের জন্যই তিনি রহমানুর রাহীম। সুতরাং বান্দা ও বান্দির কাজ হল তাঁর বিধানের সামনে সমর্পিত হওয়া।

যেসব রহস্য ও তাৎপর্য মীরাছের আসমানী বিধানের পিছনে সক্রিয় তা সম্যকরূপে অবগত আছেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তবে শরীয়তের নীতিমালা ও সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির দ্বারা ইসলামের মনীষীগণ যতটুকু উপলব্ধি করেছেন তা-ও সত্যান্বেষীদের প্রশান্তির জন্য যথেষ্ট।

এক পুরুষ দুই নারীর সমান অংশ পাওয়ার কারণ

একথা সুস্পষ্ট যে, কম-বেশি শুধু নারী বা পুরুষ হওয়ার কারণে নয়; বরং দায়িত্ব, খরচ ও মৃতের সাথে সম্পর্কের মতো গভীর ও মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যারা দায়িত্ব ও কর্তব্যের ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রাপ্তি ও অধিকারের অভিন্নতার দাবি করেন তাদের বক্তব্যের অসারতা বোঝার জন্য অনেক বেশি জ্ঞান-বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। তাদের দর্শন মেনে নিলে তো গোটা পৃথিবীই অচল হয়ে যাবে।

ধরুন একটি কোম্পানিতে কিছু পুরুষ এবং মহিলা কর্মরত আছেন। সেখানে প্রত্যেকের যোগ্যতা ও দায়িত্ব অনুসারে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা আবদুল করিম। তার বেতন ২০ হাজার টাকা। খালেদা ঐ প্রতিষ্ঠানের একজন সাধারণ কর্মচারী। তার বেতন ১০ হাজার টাকা। এখন কোনো নারীবাদী যদি এখানে নারী-পুরুষের মাঝে বৈষম্য দেখতে পান এবং এই বৈষম্য দূর করার দাবি তোলেন তাহলে তা কি গ্রহণযোগ্য হবে? একই কথা উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রেও চিন্তা করা দরকার। এখানেও পুত্র ও ভাইকে কন্যা ও বোনের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে তাদের দায়িত্ব ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে ভিন্নতার কারণে। এই ভিন্নতাকে বিবেচনা না করে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নীতিতে সম্পদ বণ্টন করাটাই হবে বৈষম্য।

 একটি সর্বস্বীকৃত নীতি হল, ‘‘দায় অনুযায়ী প্রাপ্তি’’ এটাকে শরীয়তের ভাষায়

الغنم بالغرم

বলা হয়েছে। অর্থাৎ যার দায় বেশি তার প্রাপ্তি বেশি, যার দায় কম তার প্রাপ্তি কম। পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব পুরুষের উপর। শত্রুর মোকাবেলা করার দায়িত্বও পুরুষেরই। পরিবার ও সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ, তাদের চিকিৎসা ও বাসস্থানের দায়িত্বও পুরুষের উপর । নারীর উপর এমন কোনো দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি। বরং নারীর সকল খরচ পুরুষকে বহন করতে হয়। এমনকি যদি কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাহলেও ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রীর ভরণ- পোষণ ও থাকার ব্যবস্থা পুরুষের দায়িত্বে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) তোমরা তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস কর তাদেরকেও (তালাকপ্রাপ্তাদেরকে) বসবাসের জন্য সেরূপ গৃহ দাও। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সংকটাপন্ন করো না। যদি তারা গর্ভবতী হয়  তবে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে। যদি তারা তোমাদের            সন্তানদেরকে স্তন্য দান করে তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দিবে। ... সামর্থ্যবান  তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার সামর্থ্য কম সে সেই অনুযায়ী ব্যয় করবে।-সূরা তালাক :  ৬-৭

সন্তান এবং সন্তানের মাতার খরচের দায়িত্ব পিতার উপর। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) সন্তানের পিতার উপর দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী মাতার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করা। -সূরা বাকারা : ২৩৩

 মোহর আদায়ের দায়িত্ব পুরুষের উপর। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) আর তোমরা স্ত্রীদেরকে খুশিমনে তাদের মোহর দিয়ে দাও। -সূরা নিসা : ৪

বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেলে প্রদেয় মোহর ও অন্যান্য সম্পদ স্ত্রী থেকে ফেরত নেওয়া নিষেধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও (সঙ্গত কারণে শরীয়তসম্মত পন্থায় তালাক ও নিকাহর মাধ্যমে) এবং তাদের একজনকে প্রচুর ধনসম্পদ প্রদান করে থাক তবে তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।-সূরা নিসা (৪) : ২০

স্ত্রীকে অঢেল সম্পদ দিলেও তা কিছুই নেওয়া যাবে না। এই স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে আবারও মোহর পাবে। কিন্তু পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ করলে সেখানেও তাকে দিতে হবে। মোটকথা পুরুষের উপর খরচের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। নারীর উপর তা করা হয়নি।

তাছাড়া আরেকটি দিকও এখানে আছে। অনেকেরই হয়ত শুনতে ভালো লাগবে না, কিন্তু কথাটা বাস্তব। তা এই যে, পুরুষ দ্বারা বংশ প্রতিষ্ঠিত থাকে।

পুত্র দ্বারা পিতার বংশ সংরক্ষিত হয়। কিন্তু কন্যা দ্বারা সংরক্ষিত হয় অন্যের বংশ। তদ্রূপ ভাই দ্বারা পিতার বংশ সংরক্ষিত হয়, আর বোন অন্যের বংশ বিস্তার করে। যার সম্পদ বণ্টন হচ্ছে তার বংশ যার দ্বারা সংরক্ষিত হবে সেই অধিক সম্পদের অধিকারী হবে-এটাই তো যুক্তিযুক্ত।

নারীর ভরণ-পোষণ সবসময় পুরুষের জিম্মায়

* নারী যখন কন্যা তখন তার ভরণপোষণ পিতার জিম্মায়।

* কন্যার বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তার সকল খরচ পিতাকে বহন করতে হবে।

* বিয়ের সূত্রে নারী স্বামী থেকে মোহরের হকদার।

* তখন তার সকল খরচ স্বামীর উপর। তার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা ও বাসস্থান যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করা স্বামীর কর্তব্য।

* নারী বিধবা হলে তার দায়িত্ব, পিতা, পুত্র ও ভাইয়ের উপর।

* নারী যখন মা, দাদী ও নানী তখন তার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামী, পুত্র, পৌত্র ও পর্যায়ক্রমে অন্যান্য নাতিদের উপর।

মোটকথা, নারী যে কোনো         স্তরেরই হোক না কেন সর্বাবস্থায় তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কোনো না কোনো পুরুষের উপর অর্পিত হয়েছে। নারী সর্বাবস্থায় পুরুষের সহায়তা ও দায়িত্ব দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাহলে পুরুষের দায়িত্ব, ঝুঁকি ও খরচের বোঝা অনেক বেশি। সুতরাং দায় অনুযায়ী তার প্রাপ্তিও বেশি হওয়াটাই সাম্যের দাবি। নারীর দায় নেই, তবুও অন্যান্য বিবেচনায় তাকে অর্ধেক দেওয়া হয়েছে। এটা তার স্বতন্ত্র মালিকানা। যা সে জমা রাখতে পারে। আর পুরুষ পাচ্ছে দ্বিগুণ। কিন্তু এতে রয়েছে নিজের সংসারের ও তার সংশ্লিষ্ট নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব। এ দিক থেকে বিচার করলে পুরুষের প্রাপ্তি বেশি নয়।

একটি উদাহরণ

এক ব্যক্তি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে মারা গেছে। তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি তিন লক্ষ টাকা। ইসলামী মীরাছ-ব্যবস্থা অনুযায়ী কন্যা পাবে এক লক্ষ, আর ছেলে পাবে দুই লক্ষ টাকা। ছেলে বিয়ে করল এবং স্ত্রীকে মোহর দিল দুই লক্ষ টাকা। মেয়ে বিয়ে করল এবং তার মোহরও দুই লক্ষ। তার মাথার উপর রয়েছে স্ত্রী ও    সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব। পক্ষান্তরে মেয়ের নিকট জমা তিন লক্ষ টাকা। উপরন্তু তার খরচ তার স্বামীর উপর। যদি শুধু যুক্তির ভিত্তিতে ফায়সালা হত তাহলে যুক্তিবাদীরা বলত নারীর উপর যেহেতু খরচের দায়িত্ব নেই তাই তার মীরাছ না পাওয়ারই কথা। কিন্তু ইসলাম না মানবরচিত ধর্ম না মানবীয় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত; বরং এটি হল রাববুল আলামীনের প্রদত্ত দ্বীন ও শরীয়ত। তাই সাম্য ও ইনসাফের আইন একমাত্র ইসলামই দিতে পারে। এ কথা যেমন মাখলুকের অন্য সকল হকের ক্ষেত্রে সত্য তেমনি মীরাছের হকের ক্ষেত্রেও সত্য। আল্লাহ আমাদের সঠিক ইলম এবং সঠিক ঈমান নসীব করুন। আমীন।

মনে রাখুন, মুমিনের জন্য আসল বিষয় হল আল্লাহর হুকুম জানা। যখন কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে আল্লাহর হুকুম  জানা হয়ে গেল তখন বিশ্বাস ও কর্মের জন্য অন্য কোনো কিছুর অপেক্ষা নেই। যদি বিধানটির রহস্য ও তাৎপর্য নিশ্চিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে জানা না যায় কিংবা একেবারেই জানা না যায় তবুও তার বিশ্বাস ও কর্মে কোনো পার্থক্য সূচিত হবে না। সে তো আল্লাহর হুকুমের গোলাম, বুদ্ধি বা তাৎপর্যের গোলাম নয়।

দ্বীন ও শরীয়ত-বিদ্বেষীদের একটি শ্রেণী আছে, যারা তাদের বক্তব্য অকপটভাবে বলে থাকে এরা যদিও দ্বীনের কঠিন দুশমন, কিন্তু এদের পক্ষ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা কম। ক্ষতির আশঙ্কা ঐ শ্রেণীর দ্বীন-বিদ্বেষীদের থেকেই বেশি, যারা নিফাক ও কপটতার আশ্রয় নিয়ে থাকে। এদের আল্লাহর প্রতি আস্থা নেই এবং তাঁর বিধানের প্রতি বিশ্বাস নেই। কিন্তু পরিষ্কার ভাষায় তা প্রকাশ করার সাহসও নেই। তাই কখনো কুরআনের দ্ব্যর্থহীন বিধানকে আলেমদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বলে অস্বীকার করে, কখনো নিজের পক্ষ থেকে কুরআনী বিধানের কোনো ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করে এবং বলে, যেহেতু পূর্বের অনুমিতি পরিবর্তন হয়েছে সুতরাং কুরআনের বিধানও পরিবর্তিত হবে। যেন কুরআনও মানবরচিত আইনের মতো পরিবর্তন-পরিবর্ধনযোগ্য। তেমনি কখনো কুরআনের মোকাবেলায় তাদের যুক্তি ও বুদ্ধিকে পেশ করে থাকে। তারা যেন বলতে চায়, কুরআনের চেয়েও তাদের যুক্তি অগ্রগামী। তাদেরকে আমরা আল্লাহ তাআলার এই সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

ان الذين يلحدون فى اياتنا لا يخفون علينا افمن يلقى فى النار خير ام من يأتى آمنا يوم القيمة اعملوا ما شئتم انه بما تعملون بصير

যারা আমার আয়াতসমূহকে বিকৃত করে তারা অগোচর নয়। শ্রেষ্ঠ কে-যে ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে সে, নাকি যে কিয়ামতের দিন নিরাপদ থাকবে? তোমাদের যা ইচ্ছা কর। তোমরা যা কর তিনি তা দেখেন। (সূরা ফুসসিলাত (৪১) : ৪০

একথটিও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মীরাছের কুরআনী হিস্যাসমূহকে আল্লাহ তাআলা

فريضة من الله  I  نصيبا مفروضا

অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত হিস্যা বলেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, এগুলো আল্লাহর এঁকে দেওয়া সীমারেখা, যা লঙ্ঘনকারীদেরকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (সূরা নিসা (৪) : ৭, ১১, ১৩ ও ১৪)

এই কথাগুলো স্মরণ করানোর পাশাপাশি আমরা তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করি। এছাড়া আমাদের আর কী-ইবা করার আছে।

নারীর অধিকার আদায়ের আইন করুন

যে দেশের প্রায় ৮০% ভাগ মহিলা পৈত্রিক সম্পত্তিতে ইসলামের দেওয়া ন্যায্য হিস্যাটুকুও পায় না, সেখানে পুরুষের সমান দেওয়ার আইন করাটা আসলে বঞ্চিতদের সাথে প্রহসনমাত্র। অর্ধেক নিয়ে গেলেই বোনের জন্য ভাইয়ের বাড়ি, বোনের সন্তানদের জন্য মামার বাড়ি বেড়ানো বন্ধের হুমকি আসে। সেখানে যদি সমান অংশ নিয়ে যায় তাহলে বোন-ভাইয়ের মাঝে আত্মীয়তা সম্পর্কই আর থাকবে না। ইসলাম নারীর অর্ধেক ভাইয়ের কাছে রেখে তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করেছে। খরচের দায়িত্ব ও বোনের দেখাশোনার দায়িত্বও রেখেছে ভাইয়ের উপর। সুতরাং পুরুষের সমান দেওয়ার মধ্যে সাম্য নেই। এতে বরং নারীর প্রতি রয়েছে জুলুম।

ঠিক যেমন সমাজতন্ত্রের মুখরোচক শ্লোগানে গরীব মানুষের মনে ক্ষণিকের জন্য আশা জাগলেও তারা অচিরেই বুঝতে পেরেছিল যে, কেউ খাবে কেউ খাবে না-এর অর্থ সবাই খাবে-এমন নয়; বরং এর অর্থ হল আগে তো জনগণের মধ্যে কেউ খেত, কেউ খেত না। এখন থেকে আর তাদের কেউ খাবে না।

আজ যাদের মধ্যে আখেরাতে জবাবদিহিতার ভয় নেই তারা তো নারীকে পৈত্রিক অংশ থেকে নানাভাবে বঞ্চিত করে থাকে। আর যাদের মধ্যে ভয় রয়েছে তাদের কেউ কেউ অংশ দিয়ে দেয়। কিন্তু বাড়ি-ভিটার অংশ তারাও প্রায় দেয় না। আর কিছু সংখ্যক লোক এখন মীরাছ রাখেই না। মৃত্যুর পূর্বে ছেলেমেয়ের মাঝে নিজের ইচ্ছামতো বণ্টন করে যায়। যেন মীরাছ বণ্টনে কন্যা অধিক নিয়ে না যায় বা বাড়ির ভিটা কন্যার দখলে না যায়। সুতরাং নারীর জন্য কুরআন যে অংশ রেখেছে তার প্রাপ্যতাকেই নিশ্চিত করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বুঝ দান করুন। আমীন।

 

 

মীরাছে নারীর হিস্যা

শরীয়তের হুকুম ও সমাজের প্রচলন

মুফতী রশীদ আহমদ রাহ.

অনেক মুসলমান সম্পদের মোহে পড়ে শরীয়তের হুকুম মোতাবেক মীরাছ বণ্টন করে না। তারা যদি অন্যায় ও গুনাহর কাজ মনে করেও তা করে তাহলে তা একটি ফাসেকি ও মারাত্মক গুনাহ। আর-আল্লাহ না করুন-যদি কুরআনী বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অস্বীকারের কারণে হয় তাহলে তো পরিষ্কার কুফরি। মীরাছের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করার একটি ঘৃণ্য দিক হচ্ছে নারীদেরকে তাদের হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা। অনেক জায়গায় অনেক ধরনের প্রথা ও কুসংস্কার আছে, যেগুলোর মাধ্যমে নারীদেরকে তাদের হক থেকে বঞ্চিত করা হয়। যেমন :

* বিধবাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা। কোনো কোনো জায়গায় এ রসম আছে যে, স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যত্র বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে মৃত স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। এজন্য ঐ অসহায় নারীরা দ্বিতীয় বিবাহ থেকে বিরত থাকে। আর জীবনভর বৈধব্যের চিতায় জ্বলতে থাকে এরপর স্বামীর আত্মীয়-স্বজনদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তো আছেই।

* কোনো কোনো অঞ্চলে এই প্রচলন আছে যে, স্ত্রী স্বামীর বংশের না হলে তাকে স্বামীর পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। এটিও চরম মূর্খতা ও অবিচার। কুরআন মজীদে স্ত্রীর অংশ সুনির্ধারিত। বিধবা চাই স্বামীর বংশের হোক বা অন্য বংশের, দ্বিতীয় বিবাহ করুক বা না করুক সর্বাবস্থায় তার নির্ধারিত অংশ তাকে দিতেই হবে।

* বোনের হিস্যা না দেওয়া।

এই অপরাধ তো অনেক দ্বীনদারশিক্ষিত পরিবারেও পাওয়া যায়। তারা বোনদের কাছ থেকে মীরাছের হিস্যা মাফ করিয়ে নেয়। মনে রাখতে হবে, বোনদের কাছে মাফ চেয়ে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না। কারণ জাহেলী প্রথা ও রেওয়াজের কারণে মেয়েরা নিজেরাও সম্পদ চাওয়াকে দোষের মনে করে, উপরন্তু ভায়েরা অসন্তুষ্ট হবে, সমাজের লোকে নিন্দা করবে এসবের ভয় করে। এই জাহেলী প্রথা শুধু তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিতই করেনি, তাদের মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

আল্লাহর ওয়াস্তে এই অবলা নারীদের বুকচেরা হাহাকার কে ভয় করুন। এর একটি স্ফুলিঙ্গ আপনার সাজানো বাগানকে ছারখার করে দিতে পারে। হাদীস শরীফে আছে, মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করো। আল্লাহ তাআলা ও মাজলুমের ফরিয়াদের মাঝে কোনো আড়াল থাকে না (অতি দ্রুত তা কবুল হয়ে যায়।)

আর দুনিয়ার আযাব থেকে বেঁচে গেলেও আখিরাতের কঠিন আযাব থেকে তো বাঁচার কোনোই উপায় নেই। যে আযাব সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে-

 

ولعذاب الآخرة اكبر

আর নিঃসন্দেহে আখিরাতের আযাবই হল সবচেয়ে বড়।

মোটকথা, তারা যেহেতু স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাফ করে না তাই তারা মাফ করে দিলেও শরীয়তে তা গ্রহণযোগ্য নয়। উপরন্তু এই মাফ করা ও মাফ চাওয়া দুটোই গুনাহর কাজ। কারণ এর দ্বারা হিন্দুদের একটি কুপ্রথা এবং শরীয়তবিরোধী ভ্রান্ত প্রচলনকে প্রতিষ্ঠিত রাখা হয়, যা একটি কবীরা গুনাহ।

বর্তমান সময়ে এটা অপরিহার্য যে, বোন দাবি না করলেও ভাই তাদেরকে তাদের অংশ বুঝিয়ে দিবে। এটা ফরয।  এ বিষয়ে কোনোরূপ অবহেলা করা যাবে না। আর ভাই যদি অবহেলা করে তাহলে বোনের কর্তব্য, নিজের হক দাবি করা। এ বিষয়ে কারো নিন্দা-সমালোচনার পরোয়া করবে না এবং এই  ভেবে নিজের হিস্যা দাবি করা থেকে বিরত থাকবে না যে, আমি তো স্বচ্ছল। এই হিস্যার আমার প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন না থাকলেও নিজের হক উসূল করবে। যেন এই কুরসম বিলুপ্ত হয় এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।

কেউ কেউ বলে, বিভিন্ন উপলক্ষে ভাইরা বোনদেরকে যে উপহার ইত্যাদি দিয়ে থাকে তার বিপরীতে বোনেরা তাদের মীরাছের অংশ ভাইদের দেয়। এই ধারণাও ভুল। কারণ এই লেনদেনে কি বোনদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে, না তা একতরফা ঘোষণা? দ্বিতীয়ত রেওয়াজের কারণে তাদের তো কিছু বলারও উপায় নেই। সুতরাং এই সম্মতি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত বিভিন্ন সময় দেওয়া উপহার ইত্যাদি কিছু অনির্দিষ্ট বস্ত্ত, যার পরিমাণ, মূল্য সবই অনির্দিষ্ট ও অজানা। তাহলে এটি মীরাছের বিনিময় কীভাবে হতে পারে?

চতুর্থ কথা এই যে, এই উপহার আদান-প্রদান তো হয়ে থাকে আত্মীয়তা সম্পর্কের দাবিতে, যা বোনদের একটি আলাদা হক। মীরাছের সাথে এ কোনোই সম্পর্ক নেই। যারা বোনদেরকে উপরোক্ত অজুহাতে বঞ্চিত করে তারা প্রকৃতপক্ষে মীরাছের হক ও আত্মীয়তার হক কোনোটাই আদায় করে না। আর যেখানে এই প্রচলন আছে যে, বোন নিজের হিস্যা দাবি করলে এবং তাকে হিস্যা দেওয়া হলে তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় এটা তো এত বড় মূর্খতা ও জাহালত, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে রাখতে হবে, যারা এমন কাজ করে তারা অভিশপ্ত, তাদের দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই বরবাদ।

 মোটকথা, হারামকে হালাল করার জন্য এবং অবলা বোনদের মীরাছের হিস্যা আত্মসাৎ করার জন্য যত ফন্দি-ফিকিরই করা হোক না কেন শরীয়তের দৃষ্টিতে তা সব প্রত্যাখ্যাত।

* অনেক পরিবারে দেখা যায়, বোনেরা যদি মীরাছের অংশ দাবি করে তখন ভাইয়েরা বলে, তোমাদের বিয়ের সময় আববা যে আসবাবপত্র তোমাদেরকে দিয়েছিলেন ঐগুলোর দ্বারা তোমাদের মীরাছের হক উসুল হয়ে গেছে! মনে রাখবেন, এই বাহানা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ জীবদ্দশায় পিতা তার      সন্তানদেরকে যা কিছু দিয়ে থাকেন তা হাদিয়া বা উপহার হিসেবে গণ্য। মীরাছের হিস্যার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

আল্লাহ হেফাযত করুন, বোন যদি মীরাছের হিস্যা চায় তখন কোনো কোনো ভাই বলে আচ্ছা! তুমি কি ভাই চাও না মীরাছ? যদি মীরাছ চাও তাহলে ভাইকে ত্যাগ করতে হবে। আমার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আর যদি ভাই চাও তাহলে মীরাছের দাবি ত্যাগ কর।  এভাবে কোনো হিস্যা হালাল হবে না। সম্পূর্ণ হারাম থাকবে। ষ

[আহসানুল ফাতাওয়া খন্ড : ৯ থেকে কিছু সংযোজনসহ গৃহীত।

-আবদুল্লাহ মাসুম]

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ভদ্রলোকদের প্রতি কয়েকটি প্রশ্ন

আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী

নারীজাতি মায়ের জাতি। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত। তাই নারী জাতির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যারা সর্বদা নারীদের উপর জুলুম ও অবিচার করে এসেছে এবং এখনো করছে। কখনো সভ্যতা ও নারী-মুক্তির নামে, আবার কখনো সন্ত্রাস দমনের নামে এই পরিমাণ জুলুম করছে যে, অতীতের সকল মূর্খতা ও বর্বরতা তার সামনে তুচ্ছ। তাদের কথামতোই কি নারী-অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে? কুরআন ও সুন্নাহ প্রদত্ত ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে তাদের যে সন্দেহ-সংশয় তারা কি কখনো কুরআন ও সুন্নাহয় নারী-অধিকার সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসগুলো অধ্যয়ন করেছেন? তা না করেই কীভাবে তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস হল যে,-নাউযুবিল্লাহ-ইসলামে নারীদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি?

আর কুরআন-হাদীসের চর্চায় যাঁরা জীবনপাত করছেন, জীবিকার অনেক পথই রুদ্ধ বা সংকীর্ণ জেনেও ধর্মশিক্ষা ও শিক্ষাদানের ত্যাগপূর্ণ পথকেই যাঁরা স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে বেছে নিয়েছেন তাঁদের জ্ঞান যে যথার্থ নয়, সে বিষয়েইবা কেমন করে নিশ্চিত হলেন? তাঁরা যে বিজাতীয় চিন্তা-চেতনার শিকার হয়ে ঘরের সবকিছুকে পর ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তা কি তারা বুঝতে পারছেন?

সমাজ-ব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে আপনি যে মতটি পোষণ করেন, কেউ তা সমর্থন না করলেই তাকে ধর্মব্যবসায়ী, ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী নামে যে নির্বিবাদে আখ্যায়িত করে দেন এ অধিকারটি আপনি কোথায় পেলেন?

এ সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক ও বড় প্রশ্নটি হল, আপনি যদি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তবে কুরআন-হাদীসের স্বীকৃত সামাজিক কাঠামোকে গায়ের জোরে নাকচ করে দেওয়ার তো কোনোই অধিকার আপনার নেই। কারণ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ উচ্চারণের সাথে সাথে আপনি কুরআন-হাদীসের শিক্ষাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন এবং কালিমায়ে শাহাদত উচ্চারণ করে যথারীতি তার ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত : কুরআন-হাদীস নারীকে যতটুকু হক বা অধিকার দিয়েছে আপনি একে যতই অপর্যাপ্ত মনে করেন,  আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কি এ অধিকারগুলো তাঁদেরকে দিয়েছেন?

আপনি কি আপনার স্ত্রীর মোহর যথারীতি আদায় করেছেন, নাকি শ্বশুরের নিকট থেকে বড় অংকের যৌতুক নিয়ে স্ত্রীকে বৈধ স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন?

আপনি কি আপনার ফুফু ও বোনদের ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্য হকগুলো, নগদ অর্থ, জমিজমা ও পৈত্রিক বাড়ির অংশ মূল্য বাবদ প্রাপ্য পাওনা কড়ায়-গন্ডায় আদায় করেছেন? আপনার ফুফুরা বা বোনেরা কি এ বিষয়ে আপনার পক্ষে সাফাই দিতে রাজি হবেন?

আপনি নারী হয়ে থাকলে আপনার ভাইদের ও স্বামীর নিকট থেকে কি এ হকগুলো বুঝে নিতে পেরেছেন?

কুরআনের অনুশাসন অনুযায়ী  আপনার

স্বামী আপনার জীবনযাত্রার পূর্ণ ব্যয় বহনের যিম্মাদার। আপনি কি তা ভোগ করতে পারছেন, নাকি নিজে চাকুরি-বাকুরি করে নিজের ব্যয় নির্বাহ করেন? আপনার ব্যক্তি-জীবনেই যদি এগুলো আদায়ে সমর্থ না হন, জাতীয় জীবনে আপনি কী করে এগুলো প্রতিষ্ঠিত করবেন?

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যাকে মি. গান্ধী কায়েদে আজম বলে সম্বোধন করে পত্র লেখার পর আমাদের বাপদাদারাও কায়েদে আজম বলতেন। তিনি ছিলেন মি. গান্ধীর মতোই গুজরাটী। উর্দূ তিনি জানতেনও না, বলতেনও না। জীবনে একটিবার মাত্র কয়েকটি বাক্য জনসভায় উর্দূতে বলেছিলেন। তাতে সর্বমোট সতেরটি শব্দ ছিল। তিনি বলেছিলেন, মিস্টার গান্ধী কাহতা হ্যায়, পাকিস্তান কিয়া চীজ ম্যায় নেহী সমঝতা। ম্যায় কাহতা হোঁ, আরে উল্লু, জো সমঝতা নেহী উসকি মুখালিফত কাহেঁকা?

 

অর্থাৎ মি. গান্ধী বলেন, পাকিস্তান কী তা আমার বুঝে আসে না। আমি বলি, আরে উল্লুক, যেটা বুঝো না, তার বিরোধিতা কর কীভাবে? আমার মনে হয় আকেলমন্দের জন্য ইশারাই কাফী।

 

 

 

 

advertisement