রবিউল আখির-জুমাদাল উলা ১৪৪৮   ||   অক্টোবর ২০২৬

মা-বাবার জন্য হেবা আইন সংশোধন
গাছের আগায় পানি ঢালার এই প্রবণতা আর কতদিন

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

শিশুকালে উস্তাযদের মুখে একটি ফার্সী  কবিতা শোনা হয়েছিল—

ترسم نرسي بہ کعبہ، اے اعرابي

کايں ره کہ تو مي روي  بہ ترکستان است

যার সঠিক মর্ম অবশ্য বয়স হওয়ার পর বুঝে এসেছে। পঙ্ক্তিদুটির সরল অর্থ নিম্নরূপ—

হে বেদুঈন, আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তুমি যে পথে হাঁটছ, সে পথে কা‘বায় পৌঁছতে পারবে না। কারণ তোমার চলার পথ কা‘বা নয় তুর্কিস্তানে গিয়ে মিলেছে।

এ তো পঙ্ক্তিদুটির সরল বঙ্গানুবাদ। সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছে, কোনো পথিককে কোনো বিজ্ঞজন তার ভুল পথের ব্যাপারে সতর্কবার্তা শোনাচ্ছেন, ‘এই পথে তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না।’ কিন্তু এই কবিতাটির বিশেষত্ব হল, পরবর্তীতে এটি প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়। পঙ্ক্তিদুটি ওইসকল ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যেখানে মানুষ একটি গন্তব্য লক্ষ্য করে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু অবলম্বন করে ভিন্ন রাস্তা। চাওয়া থাকে একটি গন্তব্য, কিন্তু সে এমন কাজ করে, যেটা তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়ক নয়।

সাম্প্রতিককালে জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের হেবা আইনের যে সংশোধিত বিল (১০৫/২০২৬) পাশ হয়েছে, তা দেখে ঘুরেফিরে সেই পঙ্ক্তিদুটি মনে পড়ছে—

ترسم نرسي بہ کعبہ، اے اعرابي

کايں ره کہ تو مي روي  بہ ترکستان است

সংশোধিত হেবা আইনে দৃশ্যত কিছু মতলবি বা অবুঝ লোক শরীয়া এবং মা-বাবার সেবাযত্ন ও মা-বাবার স্বার্থকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করছে। কেউ কেউ বলেই ফেলছেন, শরীয়ার কথা বলে মা-বাবার স্বার্থের বিরোধিতা কেন? কেউ আবার তাদের জবাব দিচ্ছেন, মা-বাবার স্বার্থের কথা বলে শরীয়ার বিরোধিতা কেন? আসলে কি এ ধরনের বিতর্ক ঠিক? শরীয়া ও মা-বাবার স্বার্থ দুটো কি একে অন্যের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিষয়, না বিরোধপূর্ণ?

নিশ্চয় শরীয়া ও মা-বাবার স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যারা শরীয়া জানেন, ইসলামকে জানেন, তারা সেটা উপলব্ধি করতে পারেন। আমরা একটু পরে সে কথায় আসছি।

আজকের এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে আইনটির বিশ্লেষণে যাব না। এ আইনের ফিকহী বা শরয়ী বিশ্লেষণের জন্য উলামায়ে কেরাম কাজ করছেন। মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’র আমীনুত তালীম, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতীব মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব সেই কাজের সাথে রয়েছেন। এবিষয়ে তাঁর সাথে কথাও হয়েছে। আশা করা যায়, উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে যথাযথ ও সঠিক নির্দেশনা কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।

আমরা আজকে খুবই প্রাসঙ্গিক অন্য একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। সেটা হল, বর্তমানে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার অনেক কিছুই পৃথিবীর বহু দেশেই ব্যর্থ হয়ে গেছে। কৃত্রিমভাবে সেগুলো ধরে রাখা হচ্ছে। প্রত্যেক বিষয়ে আইন করে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা কবে ব্যর্থ হয়ে গেছে! কিন্তু সেই ব্যর্থ চেষ্টা বরাবরই অব্যাহত রয়েছে এবং বিতর্কিত আইন করার প্রবণতাও চলমান আছে। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আইন, আইনের খেসারত, আইন করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আমরা টানতে পারি।

বিশ্বে গত শতাব্দীতে ফ্যামিলি প্ল্যানিং বা পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল। কিছু রাষ্ট্র এ নিয়ে খুব কঠোর ছিল। চীন, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র কঠোরতা করে, শাস্তির বিধান জারি করে, চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে নারীদেরকে সন্তান জন্মদানে বাধা দেয়। একাধিক সন্তান বা বেশি সন্তান প্রসবে বিভিন্নভাবে আইনি বাধা তৈরি করে। সেই বাধার কারণে ১০০ বছর যেতে না যেতেই তাদের যে অবস্থা হয়েছে, তা বলে বোঝানোর আর দরকার নেই। সেসব দেশ এখন একটি নবজাতকের জন্য হা-হুতাশ করছে। কোনো কোনো দেশ তো বেশি সন্তান হলে উল্টো পুরস্কার দিচ্ছে, চাকরিতে প্রমোশন দিচ্ছে, বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে, বেতন দিচ্ছে! এতে কী প্রমাণিত হয়?

এতে প্রমাণিত হয়, যেসব কাজ সাধারণ গতিতে হওয়ার বিষয়, যেসব কাজ পারিবারিক শৃঙ্খলার ভেতরে হওয়ার জিনিস, সেটা রাষ্ট্র আইন করে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপার নয়।

নারীর সুরক্ষা, নারীর উন্নয়ন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য কত আইন, কত স্পেশাল কোর্টই না হল! কিন্তু নারীরা এই দেশে এবং অন্যান্য দেশে কতটুকু সুরক্ষিত হয়েছে? যারা সবচেয়ে বেশি স্বাধীন নারী, যারা শোবিজে বা অন্যান্য জায়গায় কাজ করে, যারা সবচেয়ে বেশি খোলামেলা চলে, গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, তারাই বলছে তাদের ওপর কত ধরনের নির্যাতন হচ্ছে।

আইন দিয়ে নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রবণতা ব্যর্থ হয়েছে। দরকার ছিল পুরুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি তৈরি করা; যার মধ্য দিয়ে নারী সুরক্ষা পাবে। পুরুষ সুরক্ষা পাবে নারীর মধ্যে মানবিক গুণাবলি তৈরি হওয়ার মাধ্যমে। সেটা না করে শুধু আইন করে কতটুকু হয়েছে?

এক্ষেত্রে মিরাসের উদাহরণ টানতে হয়। মিরাসের আইন তো আছে। শরীয়া আইনও আছে, রাষ্ট্রের আইনও আছে। মিরাস থেকে বঞ্চিত করার মতো অন্যায় কি প্রতিরোধ হয়েছে? মিরাসের বিধিবিধান কি ঠিকমতো কার্যকর হয়? বোনেরা কি তাদের হক পায়? অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ভাইয়েরা কি তাদের হক পায়? পায় না। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা কি আইনের, নাকি অন্য কোথাও?!

আমরা বিচারব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনের দিকে তাকাই। রাষ্ট্রের আইনে কি ঘুষ-দুর্নীতি বৈধ? তাহলে বারবার আমরা দুর্নীতিতে প্রথম দিকে থাকছি কেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনগণ কোনো ফাইল বিনে পয়সায় ছোটাতে পারছে না কেন? আইন তো আছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, আইন করে অনেক কিছুর সমাধান করার চেষ্টা হচ্ছে এবং সে চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে।

আরেকটি উদাহরণ আমরা দেশের বাহির থেকে দিতে চাই। এরপরে আমরা আমাদের মূল কথায় চলে যাব। পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৮ বছর হলে সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতা দেওয়ার পরে সেখানে কি পারিবারিক বন্ধন টিকে থেকেছে? যে সমস্যাগুলোর কারণে এ আইন করা হয়েছিল, সে সমস্যাগুলোর কি সমাধান হয়েছে? শিশুরা কি সেখানে সুরক্ষিত? সেখানে শিশু মা-বাবার বিরুদ্ধে পুলিশকে ফোন করতে পারে, কিন্তু সেই শিশুরা কি সঠিক পরিচর্যা পেয়ে বড় হয়ে ওঠে? তাদের মা-বাবার সম্পর্ক কতদিন টিকে থাকে? কতগুলো শিশুর পিতৃপরিচয় থাকে?

সেখানে বহুবিবাহ বন্ধে ও নারীর সুরক্ষার জন্য বিবাহ-পরবর্তী আইন করা হয়েছে যে, সংসার ভেঙে গেলে স্বামীর সম্পদের অর্ধেক স্ত্রী পেয়ে যাবে। এর পরিণতি কী হয়েছে? এখন ওইসকল দেশে অনেকেই বিবাহ না করে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্কে জড়ায় এবং সন্তানও জন্ম দেয়। কয়েক সন্তান হওয়ার পর সম্পর্ক টিকে থাকলে অনেকে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে!  এই প্রবণতা তৈরি হল কেন? সেই আইনের জটিলতার কারণে। সে আইন হিতে বিপরীত হয়েছে। বিবাহ হলে অর্ধেক সম্পদ না হোক, নিয়মিত যতটুকু পাওয়ার ততটুকু তো পেয়ে যেত। মহিলা মুসলিম হলে সন্তানাদি থাকলে সাড়ে বারো পার্সেন্ট পেত। স্বামীর সন্তান না থাকলে পঁচিশ পার্সেন্ট পেত। নারীকে অর্ধেক সম্পদ দেওয়াসহ আরও কিছু আইনি জটিলতা তৈরি করে ওই দেশগুলোতে বিবাহভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ ধরনের অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, যেগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, সব ক্ষেত্রে আইন করে সমাধান হয় না। আইনের ওপরেও আরও কিছু করার দরকার হয়, যেগুলো সমাধানের মূল জায়গা হল পরিবার। সেখানে আইন কাজ করে না। আইন সেখানে শুধু সর্বশেষ সুরক্ষার কাজ দেয়।

আজকে যে বিষয়ে কথা শুরু হয়েছে, সেখানে ফিরে যেতে চাই। সরকার বলছে, বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবা যেন সন্তান কর্তৃক অবহেলিত না হন, তাই হেবা আইন সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে তারা শর্তযুক্ত হেবার দুটো নতুন আইন তৈরি করেছে। মা-বাবা চাইলে শর্তযুক্ত হেবা করতে পারবেন এবং সন্তানকে হেবা করে যাওয়ার পরও মা-বাবা জীবদ্দশায় সে সম্পদ ভোগ করতে পারবেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই আইন মা-বাবাকে সুরক্ষা দেবে। কারণ বর্তমানে বিভিন্ন জায়গা থেকে, এমনকি অনেক শিক্ষিত পরিবার থেকেও খবর আসছে, মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা অসুস্থ, কিন্তু তাঁদের চিকিৎসা করা হয়নি। একাকী রেখে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ নিঃসঙ্গ অবস্থায় ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন।

আইনমন্ত্রী একটি দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে তার কথার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেগুলোর মূল কথা হচ্ছে, মা-বাবা যেন সম্পদ হেবা করে পরবর্তীতে বিপদে পড়ে না যান। মন্ত্রী মহোদয়ের যুক্তি-তর্ক নিয়ে অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। বিশেষত এখানে বলা হচ্ছে, সম্পদ দিয়ে যেন তিনি ভোগ করতে পারেন। তিনি যেন পরে প্রতারিত না হন। সম্পদ দিয়ে মা-বাবার যেন পরবর্তীতে অসুবিধা না হয়।

খুব সহজ প্রাথমিক প্রশ্নটা হচ্ছে, সম্পদ লিখে দিতে বলেছে কে? যে সন্তানকে অগ্রিম সম্পদ লিখে দেওয়া হচ্ছে, মা-বাবার মৃত্যুর পর তারাই তো সম্পদ পাবে। মা-বাবার মনে আশঙ্কা কাজ করলে সম্পদ লিখে দেবেন কেন? অগ্রিম লিখে দেওয়ার এই কসরত কেন? এর জবাব কিন্তু পাওয়া যায়নি।

এখানে অন্য কোনো কুমতলব কাজ করছে না তো?

শরীয়ত যাদেরকে সম্পদের অংশ দিতে বলেছে, তাদেরকে বঞ্চিত করার জন্য করা হচ্ছে কি না?! এটা কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি। আমরা সেটাতেও যাচ্ছি না। এই নিয়ে বিজ্ঞ আলেমগণ কাজ করছেন, তাঁরা হয়তো জানাবেন। আমরা যে বিষয়টা বলতে চাই, সেটা খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে, আইনের যে উদ্দেশ্য প্রকাশ করা হচ্ছে এবং আইনমন্ত্রী সংসদে ও সংসদের বাইরের বক্তব্যগুলোতে যা বলেছেন, তা শুনলে যে-কোনো সরলমনা মানুষেরই মনে হতে পারে, এটা তো ভালো কাজ। মা-বাবা তার সন্তানকে সম্পদ দেবে আবার সেটা নিজেও ভোগ করবে; এতে দোষের কী আছে! কারণ কারও সম্পদ তার পিতা-মাতা প্রয়োজনে ভোগ করবে, সেটা তো খুব স্বাভাবিক কথা। আইনে সে কথা বলা হলে স্বাভাবিক কথাই তো বলা হচ্ছে।

কিন্তু আমরা যদি গভীরভাবে এবং আমাদের সমাজব্যবস্থাকে খোলা চোখে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে পরিষ্কার দেখতে পাব, এই ধরনের আইন ব্যর্থ হতে বাধ্য। যে উদ্দেশ্যে আইন করার কথা বলা হচ্ছে, সে উদ্দেশ্য কখনও এই ধরনের আইন দিয়ে বাস্তবায়িত হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আইন করে যদি মা-বাবার সুরক্ষা দেওয়া যেত, সন্তানদেরকে তাঁদের সেবা-শুশ্রূষা ও চিকিৎসায় বাধ্য করা যেত, তাঁদের থাকা-খাওয়ার ভালো ইন্তেজাম করা যেত এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় সঙ্গ দেওয়ার ব্যবস্থা হত, তাহলে তো আর সমাজের এ দশা হত না। কারণ এই ধরনের আইন তো দেশে আছে। দেশে কি আইন নেই— ‘মা-বাবাকে অবহেলা করা যাবে না’ তাদেরকে খাওয়াতে হবে, পরাতে হবে, না হয় জেল-জরিমানা হবে? এরকম আইন তো আছেই। ইসলামেও আছে, আমাদের দেশীয় আইনেও আছে। তার পরও হচ্ছে না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন— দেশের কোন্ শ্রেণির মানুষের মাঝে মা-বাবাকে অবহেলা করার প্রবণতা বাড়ছে? কোন্ শ্রেণির মানুষ খুব বেশি অবহেলা করছে? কোন্ শ্রেণির মানুষ মা-বাবাকে ওল্ড হোম বা নার্সিং হোমে পাঠিয়ে দিচ্ছে? কোন্ শ্রেণির মানুষ মা-বাবাকে একাকী রেখে নিজেরা আরাম আয়েশের জীবন যাপন করতে বিদেশে যাচ্ছে? কখনও পিতা-মাতা দুজনকে, কখনও তাদের একজনকে একা রেখে চলে যাচ্ছে। কেউ দ্বিমত করবেন না, এক্ষেত্রে সমাজের এলিট শ্রেণিই অগ্রগামী। সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণির লোকেরাই এই কাজগুলোতে সবার আগে আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সন্তানকে পিতামাতা শিক্ষিত বানালেন, তাদের জন্য অঢেল অর্থ খরচ করলেন, যোগ্য বানালেন; তার পরও কেন এ প্রবণতা!

বিগত দিনগুলোতে অভিযোগ এসেছিল, কোনো মুরব্বীর মৃতদেহ পড়ে ছিল। মৃত্যুর পর কারও কোনো খবর ছিল না। অনেকদিন পর গলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, উক্ত মায়ের সন্তানেরা সবাই উচ্চশিক্ষিত। আপন আপন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। (সুশিক্ষিত শব্দটা ইচ্ছে করেই লিখলাম না)।

গতকালই আমার এক সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ করা হয়েছিল। সেখানে শিক্ষিত ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। জোয়ান-বুড়ো অনেকেই ছিলেন। অনেক বয়স্ক মুরব্বী ছিলেন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, বলুন দেখি, এই আইন করে কি মা-বাবার সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে?

তাদের সকলে, বিশেষত প্রবীণরা এক বাক্যে বলে উঠলেন, হবে না, হবে না।

উত্তরটা কাঙ্ক্ষিতই ছিল। সরকার না বুঝলেও জনগণ ঠিকই বোঝে। এই ধরনের আইন যে গাছের গোড়ায় পানি না দিয়ে আগায় পানি দেওয়ার প্রচেষ্টা— তা আর উপলব্ধির বাইরে নয়।

তাহলে কী করা উচিত?

আমাদের করণীয় হচ্ছে, পারিবারিক সেতুবন্ধন দৃঢ় করা, সৌহার্দপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, মা-বাবা কর্তৃক শিশুদের যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা করা। সন্তান কর্তৃক মা-বাবার যথাযথ সেবা ও সম্মান করা এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল রাখা। এই বিষয়গুলো মূলত আইনের সাথে সম্পর্কিত নয়। শুধু আইন করে এগুলো কখনও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আইন করে কারও ঘরোয়া বিষয় বাস্তবায়ন করা যায় না। আমরা মিডিয়াতে তো অল্প কয়টা ঘটনাই পাই। কজন পিতামাতাই-বা সন্তানের অবহেলা ও দুর্ব্যবহার মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসেন কিংবা আইন-আদালত বা মামলা-মোকাদ্দমা পর্যন্ত নিয়ে যান। অনেকেই নিজের মান-সম্মানের কথা বিবেচনা করে অথবা নিজের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কায় ওই পথে হাঁটেন না। তাই সন্দেহ নেই, এই ধরনের ঘটনা যা দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটছে।

এসব সমস্যা থেকে সুরক্ষা দিতে ইসলাম দিয়েছে যথোপযুক্ত নির্দেশনা। আমরা যদি কুরআনুল কারীমের দিকে দেখি— যে গ্রন্থ কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের হেদায়েতের, সঠিক পথে পরিচালনার একমাত্র আসমানী কিতাব, যার কোনো বিকল্প নেই— পুরো কুরআন জুড়েই সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিধি-বিধান, পথনির্দেশ এবং হেদায়েতের বাণী রয়েছে। তার মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়গুলোর দিকনির্দেশনা বেশি রয়েছে সূরা নিসায়। এটা কুরআন কারীমের চতুর্থ সূরা। সেখানে আমরা বিয়ে-তালাক-মিরাস সংক্রান্ত বিষয়াদি ও শরীয়তের অন্যান্য হুকুম-আহকামের বিবরণ দেখতে পাই। সূরাটি আমরা শুরু থেকে পড়লে দেখব, সূরা শুরু হয়েছে—

يٰۤاَيُّہَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِيۡ خَلَقَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَةٍ وَّخَلَقَ مِنۡہَا زَوۡجَہَا وَبَثَّ مِنۡہُمَا رِجَالًا کَثِيۡرًا وَّنِسَآءً وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِيۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَالۡاَرۡحَامَ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَيْکُمْ رَقِيْبًا.

[হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তারই থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের উভয় থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার ওসীলা দিয়ে তোমরা একে অন্যের কাছে (নিজেদের হক) চেয়ে থাক। এবং আত্মীয়দের (অধিকার খর্ব করা)-কে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।]

আল্লাহ তাআলা তাকওয়ার কথা দিয়ে সূরা শুরু করেছেন। ভেতরে আসছে বিধিবিধানের কথা। সামাজিক বিধিবিধান ও পারিবারিক বিধিবিধানের কথা। বিধানের বিবরণের আগে তাকওয়ার কথা বলা হয়েছে, আল্লাহকে ভয় করতে বলা হয়েছে। তাঁর কাছে যে সবাইকে ফিরতে হবে, জবাবদিহি করতে হবে, বিচারের সম্মুখীন হতে হবে— সে কথা বলা হয়েছে। মানুষকে কেন তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে— সেটাও আল্লাহ তাআলা ওই আয়াতের মধ্যেই বিশ্লেষণ করেছেন।

তাকওয়া কী? তাকওয়ার মানে খুবই স্পষ্ট। তা হচ্ছে, আমাকে সৃষ্টিকারী এক সত্তা আছেন, যাকে আমি অনুসরণ করে চলি। আমার জীবনটা সে সত্তার অধীন। তিনি আমাকে যেভাবে চলতে বলবেন, সেভাবে চলব। তিনি যা যা করতে বারণ করবেন, আমি তা থেকে বিরত থাকব। এক বাক্যে তাকওয়ার ব্যাখ্যা এভাবেই দেওয়া যায়।

মুফাসসিরীনে কেরাম এই সূরার তাফসীর করতে গিয়ে শুরুতেই জোরালোভাবে যে কথাটি বলেছেন, তা হল, সূরাটি তাকওয়া দিয়ে শুরু করার উদ্দেশ্যই হল, এই সূরায় মৌলিক যে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মানুষের মন থেকে পালন করার বিষয়। মানুষ অন্তর থেকে যখন এই বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, যখন মন থেকে বিশ্বাস করবে, আমার এভাবেই করা উচিত, এভাবেই চলা উচিত, যিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমার জন্য উপকারী বিষয়ই দিয়েছেন— এই বিশ্বাস যখন তার ভেতরে বদ্ধমূল হবে, তখনই শুধু এগুলো যথাযথ কার্যকর হবে। এই বিশ্বাস তার ভেতরে বদ্ধমূল না হলে, এই বিধিবিধানের ওপর এবং বিধানদাতার ওপরে শ্রদ্ধাবোধ না জন্মালে কখনও বিচারালয়ের আইন দিয়ে, পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে তা কার্যকর করা যাবে না।

এজন্য আল্লাহ তাআলা সূরাটি শুরু করতে গিয়েই তাকওয়ার কথা বলেছেন—

يٰۤاَيُّہَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ.

হে লোক সকল, যিনি তোমাদেরকে প্রতিপালন করেন, তাঁকে তোমরা মেনে চল, তাঁকে ভয় কর। এই মেনে চলার আহ্বান হাজারো আইন থেকে অনেক বড় ব্যাপার। বড় প্রশ্ন হল, এটা কীভাবে অর্জিত হবে? সেই অর্জনের বিষয়টিই এখন আমাদের মাঝে অনুপস্থিত। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বড় কারণও তা-ই। অসংখ্য আইন করা হচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্র দুর্নীতিতে ভরে যাচ্ছে। মানুষ এখন ভালো সরকারি কর্মচারীকেও ঘুষখোর বলে সন্দেহ করছে। ভালো কেউ চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতে পারে না। মানুষ আগেই বলাবলি শুরু করে, হাঁ, গম চুরির ভালো সুযোগ হবে। যদিও সে ভালো মানুষ। কিন্তু দাগযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কেন? ওই গোড়ার জিনিস— তাকওয়া না থাকার কারণে।

এই যে তাকওয়ার কথা দিয়ে শুরু করা হয়েছে, এটা তো শুধু ওয়াজের মাধ্যমে অর্জিত হবে না। তাকওয়া অর্জনের প্রচেষ্টা করতে হবে জীবনের শুরু থেকে। শৈশব থেকে। প্রতিটা ঘরে যদি শিশুরা সেভাবে বড় হয়ে ওঠে, যতগুলো মানবিক গুণাবলির কথা ইসলাম বলেছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন, সেগুলোর গুরুত্ব যদি শিশুদের অন্তরে বদ্ধমূল করা যায়, তাহলে সমাজ পরিবর্তন হতে বাধ্য।

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে কুমিল্লায় হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে গেল। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে ১৩ বছরের একটি বালককে তার বন্ধুরা নির্মমভাবে হত্যা করল। বলা হচ্ছে, তারাও তার কাছাকাছি বয়সের! কেন আমাদের সমাজটা এত অধঃপতনে গেল? ছোট ছোট বালক, যাদের এখনও বুঝ পরিণত হয়নি, তারা কীভাবে জানল, কীভাবে বন্ধুকে হত্যা করতে হয়! একটা ফোনের লোভে বা সামান্য টাকার লোভে মানুষ মেরে ফেলা যায়! সমাজের এই অধঃপতন হল কীভাবে? কেন সমাজপতিরা এটা নিয়ে ভাবছেন না? যারা শিক্ষার সাথে জড়িত, তারা কেন ভাবছেন না? কেন তারা ভাবছেন না যে, এখানে সেক্যুলার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যে শিক্ষায় নৈতিকতার স্থান নেই, যে শিক্ষায় স্রষ্টার দেওয়া আদর্শগুলোর স্থান নেই, যে শিক্ষায় বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের চর্চা নেই, যিনি কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় মুহসিন, যিনি শুধু বক্তব্য আর নীতিমালা দিয়ে যাননি; বরং বাস্তবায়ন করে গেছেন এবং সেগুলো শত শত বছর কার্যকরও ছিল। যে মুসলিম সমাজে ওই কালজয়ী শিক্ষা ও আদবগুলোর কোনো স্থান নেই, সে সমাজের মানুষের মধ্যে তো এগুলো তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

এমনিভাবে যে সমাজ দ্বীনী ওই শিক্ষা অর্জন করল ঠিকই, কিন্তু তার ওপর আমল নেই, সেই সমাজকেও অধঃপতন থেকে রক্ষা করা যাবে না। এক হল তালীম ও শিক্ষা, আরেক হল তরবিয়াহ ও দীক্ষা। শিক্ষা অর্জন হয়েছে, হাদীস মুখস্থ করে ফেলেছে, কিন্তু তার বাস্তব দীক্ষা নেই, আমলী প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে না, সেভাবে পরিচর্যা করে বড় করা হচ্ছে না, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন মানুষও দেখা যায়। তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুতরাং আমাদেরকে সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে হবে। শুধু গাছের আগায় পানি ঢাললে চলবে না।

পিতা-মাতার অধিকার, সেবা-শুশ্রূষা, তাঁদেরকে সঙ্গদান ও প্রয়োজনে অর্থ প্রদানের মতো বিষয়ে ইসলাম কুরআন-সুন্নাহ্য় যে নির্দেশনা, হেদায়েত, অধিকার ও সুরক্ষা দিয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে তার এক-দশমাংশও কেউ দেখাতে পারবে না।

আমরা কুরআনুল কারীম পড়লে দেখব, কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের কথা বলেছেন। একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে, সাথে যোগ করে দিয়েছেন মা-বাবার প্রতি সদাচার করো—

وَاعْبُدُوا اللّٰہَ وَلَا تُشْرِکُوْا بِہٖ شَيْئًا وَّبِالْوَالِدَيْنِ اِحْسَانًا.

এবং আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। আর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। —সূরা নিসা (৪) : ৩৬

এই আয়াতগুলোর মর্ম অনুধাবন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের কথা বলেছেন, এরপর তাঁর সঙ্গে শিরক করতে বারণ করেছেন, এর সাথেই মা-বাবার প্রতি সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন! তেমনি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হাদীসে সবচেয়ে বড় গোনাহ হিসেবে শিরকের উল্লেখ করেছেন, এর পরেই সবচেয়ে বড় গোনাহ হিসেবে পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও তাঁদের নাফরমানীকে উল্লেখ করেছেন!

আল্লাহ তাআলা বনী আদমকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য, তাঁর অনুগত থাকার জন্য। সেই নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে আর সাথেই যোগ করা হচ্ছে—

وَبِالْوَالِدَيْنِ اِحْسَانًا.

অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি সদাচার কর, তাঁদের সেবা কর, তাঁদের আনুগত্য কর।

আজকে যে আইন নিয়ে কথা হচ্ছে, সে আইনটা মূলত বার্ধক্যে পিতামাতা সন্তানকে সম্পদ লিখে দিলে তাদের কী অসুবিধা হবে— সে চিন্তা থেকে করা হয়েছে। আচ্ছা একটা আয়াত পড়া যাক। পিতা-মাতার বার্ধক্যের সময়ের কথা বলতে গিয়ে কুরআন কী বলেছে—

وَقَضٰي رَبُّکَ اَلَّا تَعْبُدُوْۤا اِلَّاۤ اِيَّاہُ وَبِالْوَالِدَيْنِ اِحْسَانًا  اِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَکَ الْکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوْ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلْ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنْہَرْہُمَا وَقُلْ لَّہُمَا قَوْلًا کَرِيْمًا، وَاخْفِضْ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْہُمَا کَمَا رَبَّيٰنِيْ صَغِيْرًا.

তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, পিতা-মাতার কোনো একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজের শ্রদ্ধা ও দয়ার ডানা অবনমন করে দাও এবং দুআ করো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছে, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন। —সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ২৩-২৪

পিতা-মাতার জন্য তো কুরআনে বহু জায়গায় বিভিন্নভাবেই সন্তানদেরকে নির্দেশ ও হেদায়েত দেওয়া হয়েছে, উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তাদের খেদমতের জন্য, তাদের প্রতি সদয় থাকার জন্য; কিন্তু এই আয়াতগুলোতে ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে তো আল্লাহর থেকে ভালো কেউ জানে না। তিনি যাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তারা কোন্ বয়সে গেলে কীসের মুহতাজ হয়? কোন্ বয়সে কী জিনিস তাদের দরকার হয়? কোন্ বয়সে গেলে তাদের মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকে? এটা তো যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বলছেন, ‘যদি তোমার মা-বাবার উভয়জন অথবা কোনো একজন তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়।’ খুবই স্পষ্ট কথা। বার্ধক্যে তো পিতা-মাতা সন্তান-নাতি-নাতনিদের কাছেই থাকবেন। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

عِنْدَکَ.

অর্থাৎ সন্তানের পাশে পিতা-মাতা।

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন— ‘উফ্’। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার পিতা-মাতা বার্ধক্যের সময় তোমার কাছে থাকলে তাদেরকে ‘উফ্’-ও বলবে না।

আরবী ভাষায় ‘উফ্’ শব্দ অনেক বেশি জটিল অর্থ বহন করে না। সাধারণ ক্ষেত্রে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি কেউ কিছু করে, সেক্ষেত্রে অনীহা বা বিরক্তি প্রকাশের জন্য উফ্ শব্দ ব্যবহৃত হয়।

এই কথা কে না জানে, বার্ধক্য আসলে মানসিক অবস্থা আগের মতো থাকে না। মুরব্বীদের মধ্যে কিছুটা অধৈর্য চলে আসে, অনেক কিছু করতে মনে চায় না। ওষুধ খেতে মনে চায় না। খাবার খেতে মনে চায় না। আপনজন যারা কাছে থাকে, তারা তাদেরকে সম্মানের সাথে বুঝিয়ে খাবার খাওয়াতে হয়। ওষুধ খাওয়াতে হয়। প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় দিতে হয়। ডাক্তার হাঁটাচলা করাতে বলেছে, সেটা করাতে হয়। এটা করতে গেলে তারা বারবারই বিরক্তি প্রকাশ করতে পারেন। সেসব ক্ষেত্রেও সন্তানাদিকে বলা হয়েছে—

فَلَا تَقُلْ لَّہُمَاۤ اُفٍّ.

তাদের কথায় তুমি বিরোধ কর না। তাদের কথায় বিরক্তি প্রকাশ কর না।

এর পরের শব্দ তো আরও গুরুত্ববহ—

وَّلَا تَنْہَرْہُمَا.

তাদেরকে কোনো ধমক দেওয়া যাবে না। বকা দেওয়া যাবে না।

এরপর বলা হচ্ছে— বকা বা ধমক তো দেওয়া যাবেই না; বরং—

وَقُلْ لَّہُمَا قَوْلًا کَرِيْمً.

তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।

উফ্ না বলা, ধমক না দেওয়া, সম্মানজনক ও নম্র ভাষায় কথা বলা— এতটুকুতেই শেষ নয়; আরও আগে বেড়ে বলা হচ্ছে—

وَاخْفِضْ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ.

তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজের শ্রদ্ধা ও দয়ার ডানা অবনমন করে দাও।

অর্থাৎ সন্তান যেন পিতা-মাতার সাথে নম্র আচরণ করে, দয়ার আচরণ করে, নরম কথা বলে, এজন্য সৃষ্টিকর্তা সন্তানের শিরা চেপে ধরেছেন, তার মধ্যে উপলব্ধি জাগ্রত করেছেন। বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার যখন মানসিক অবস্থা একটু অস্থিতিশীল, একটু রাগান্বিত এবং একটু অধৈর্য— এমন অবস্থায় সন্তানকে বলা হয়েছে, ‘তাদের সাথে খুব সুন্দর এবং নরম আচরণ কর।’

জানা কথা এটা সহজ কাজ নয়। তবুও আল্লাহ তাআলা সে দায়িত্ব দিয়েছেন। আবার সন্তানের শিরায়ও হাত দিয়েছেন। হাত দিয়ে তাকে বুঝিয়েছেন— কেন তোমাকে তাঁদের সাথে নরম আচরণ করতে হবে। সেটিই হল বিখ্যাত সে দুআ, মুসলমানরা পিতামাতার জন্য যা নিয়মিত করে থাকে—

رَّبِّ ارْحَمْہُمَا کَمَا رَبَّيٰنِيْ صَغِيْرًا.

হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।

এই দুআ আল্লাহ তাআলা এ বাক্যেও শেখাতে পারতেন— ‘আল্লাহ আমার মা-বাবাকে মাফ করে দাও’, ‘আমার মা-বাবাকে সুস্থ করে দাও’— এটা বললেই তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখানেও বলা হয়েছে—

رَبِّ ارْحَمْہُمَا.

আমার মা-বাবার ওপর তুমি দয়া কর।

এটুকু বলে আল্লাহ তাআলা থেমে থাকেননি। আল্লাহ আরেক অংশ যুক্ত করেছেন—

کَمَا رَبَّيٰنِيْ صَغِيْرًا.

হে আল্লাহ! শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে ধাপে ধাপে বড় করে তাঁরা আমাকে এ স্তরে এনেছেন। যখন আমি অবুঝ ছিলাম, তাদের সাহায্যের মুহতাজ ছিলাম, সে সময় তাঁরা আমার পরিচর্যা করেছেন। আজকে তাঁরাও আমার শিশুকালের মতো অসহায়। এ অবস্থায় তাদের ওপর আপনি দয়া করুন।

এই যে মুসলমানরা মা-বাবার জন্য সব জায়গায় এ দুআ করে থাকে, এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে, কেন মা-বাবার বার্ধক্যে সন্তান তাঁদের প্রতি পূর্বের চেয়ে বেশি সদয় হবে। আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হবে। আরও বেশি যত্নবান হবে। শুধু এই দুআটা কেউ যদি খেয়াল করে, মনোযোগ দিয়ে পড়ে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তাহলে বুঝতে পারবে, আল্লাহ তাআলা এই দুআর ছকটাকে কেন এভাবে সাজিয়েছেন!

হাদীসের কিতাবগুলোতে বিশাল অংশ আমরা পাই মা-বাবা সংক্রান্ত হাদীস। তাঁদের জন্য কখন কী করতে হবে। তাঁদের ব্যাপারে মৌলিক নির্দেশনা কী। বিভিন্ন ইমাম আদাব-শিষ্টাচার বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন। ইমাম বুখারী রাহ. স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন— ‘আলআদাবুল মুফরাদ’। সেখানে বহু অধ্যায় রয়েছে শুধু মা-বাবা সংক্রান্ত। সামগ্রিক দৃষ্টি দিলে আমরা সেখানে দেখি, ইসলাম কীভাবে একজন মুসলিমের মন-মানসকে মা-বাবার প্রতি আস্থাশীল, শ্রদ্ধাশীল, ভালবাসার পাত্র ও দয়ালু করে তৈরি করে। কীভাবে একজন মুসলিম এই মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে ওঠে।

মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব সংক্রান্ত কুরআন-সুন্নাহর সেই নির্দেশাবলি— মা-বাবার জন্য কীভাবে সন্তান ফিদা হবে, কীভাবে সন্তান নিজেকে উৎসর্গিত করবে মা-বাবার পরিচর্যা ও সেবাযত্নে— সেটা যদি আমরা শিশুকাল থেকে শিখিয়ে বড় করতে না পারি, যদি প্রাথমিক শিক্ষালয় থেকে শুরু করে পরবর্তী জীবনের সকল স্তরে এগুলো বারবার তাদের মাথায় দেওয়া না হয়, যদি মা-বাবারাই শিশুদের সামনে তাদের মা-বাবার সাথে অর্থাৎ শিশুদের দাদা-দাদির সাথে, নানা-নানির সাথে সে আচরণ করে আমলীভাবে না দেখান; তাহলে শুধু আইন করে কখনও এগুলো প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়।

এসব আইন অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। মা-বাবা একজনকে সম্পদ লিখে দেবে, আরেকজনকে দেবে না। দেখা যাবে, মা-বাবার সাথে অন্য ওয়ারিস বা অন্য সন্তানের দুশমনী বেড়ে যাবে। তারা তাকে পর ভাবা শুরু করবে।

সমাজে অনেক খারাপ সন্তান থেকে থাকবে। খারাপ সন্তান না হলে প্রশ্ন হল, লিখে দেওয়ার দরকার কী? সন্তানকে সম্পদ লিখে না দিলে কি সে মা-বাবাকে শ্রদ্ধা ও সেবা-শুশ্রূষা করবে না? এটা কি রাষ্ট্রের আইনে নেই? সেটা কি ইসলামের বিধিবিধানে নেই? সন্তান ভালো হলে তাকে লিখে না দিলেও সে করবে। দুষ্ট সন্তানের কথা চিন্তা করে আইন করা হয়ে থাকলে, সে দুষ্ট সন্তান যদি মা-বাবাকে আগে মেরে ফেলতে চায়?! তাদেরকে যদি মানসিক ও শারীরিক টর্চারিং করতে চায়? সে যদি মা-বাবাকে চিকিৎসাজনিত অবহেলা, প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয়জনিত অবহেলা করে? এগুলো তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়? যার আশঙ্কা অনেকেই করছে।

হাদীসে তো এটাও আছে; রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

أَنْتَ وَمَالُكَ لِأَبِيكَ.

তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার বাবার জন্য। —সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২২৯১

শুধু সম্পদ বলেননি, তুমি নিজেও। তাদের জন্য শারীরিক কসরত করতে হলে সেটা করবে। হাঁটাচলা করানো দরকার হলে করাবে। চিকিৎসা দেওয়া দরকার হলে দেবে। ডাক্তারের কাছে নেওয়ার দরকার হলে নেবে। তুমি নিজেও উৎসর্গিত, তোমার সম্পদও তোমার মা-বাবার জন্য উৎসর্গিত। তোমার মা-বাবা যদি তোমার সম্পদের মুহতাজ হন, তাঁদের যদি তোমার সম্পদের প্রয়োজন পড়ে, অবশ্যই তাঁরা তোমার সম্পদ ব্যবহার করবেন।

সুতরাং সন্তানদের জন্য আবার আলাদা আইন করতে হবে কেন যে, তাকে সম্পদ লিখে দিয়েছে, এখন আবার ভোগ করতে পারবে। আইন দিয়ে এই ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না।

সুতরাং গাছের আগায় পানি দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। গোড়ায় পানি দেওয়া দারকার। গাছের গোড়ায় পানি দিতে চাইলে সমাজ বদলাতে হবে। সমাজের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা, আখলাকী শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং ইসলামী ধাঁচে সন্তানের পরিচর্যা ও প্রতিপালন করতে হবে।

আমাদের সৃষ্টিকর্তা পিতা-মাতার জন্য যে বিধিবিধান দিয়েছেন, সেগুলো বদ্ধমূল করাতে হবে প্রত্যেকের দিলে— শিক্ষার মাধ্যমে, দীক্ষার মাধ্যমে। সেগুলো যদি আমরা করি, তাহলে গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া হবে। সেই গাছ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠবে, ছায়া ও ফল দেবে। সেটা না করে আগায় পানি ঢাললে সে গাছ কখনও টিকবে না।

সুতরাং ফিরে যেতে হবে আমাদেরকে গোড়ার দিকে। তাহলেই আমরা কা‘বার পথে যেতে পারব। না হলে আমরা কা‘বার উল্টো দিকেই হাঁটতে থাকব; কা‘বায় পৌঁছতে পারব না। তখন এই কবিতা আবারও আমাদের তিরস্কার করবে—

ترسم نرسي بہ کعبہ، اے اعرابي

کايں ره کہ تو مي‌ روي  بہ ترکستان است

শত শত বছর আগের কবিতা আবারো দেখা যাবে সমানভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে আমাদের সরকারগুলোর ক্ষেত্রে, দেশের হর্তাকর্তাদের জন্য, যারা সমাজকে নিয়ে স্থূল চিন্তা করেন, গোড়া থেকে সমাজকে বদলানোর, সমাজকে উন্নত করার কষ্ট করেন না এবং সে পথে অগ্রসর হন না।

আল্লাহ তাআলা এই জাতিকে রক্ষা করুন এবং জাতির কর্তা ব্যক্তিদেরকে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও সহীহ চিন্তা করার তাওফীক দান করুন— আমীন। ·

 

টীকা

১. পাঠক এবিষয়ে মাসিক আলকাউসারে প্রকাশিত (আগস্ট ২০১৭) ‘শ্রেষ্ঠ বিয়ে?!’ শিরোনামের লেখাটি পড়তে পারেন।

 

 

advertisement