রবিউল আউয়াল
নবীজীর প্রতি মহব্বত ও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা
মাওলানা আব্দুল মুমিন
হিজরী ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। আরবী রবী‘ (ربيع) শব্দের অর্থ বসন্ত। ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই এ মাসের নাম রবিউল আউয়াল। কুদরতের অনুপম নির্বাচন যে এ মাসেই পৃথিবীতে আগমন করলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যিনি প্রকৃত অর্থেই পৃথিবীর বুকে এমন বসন্ত নিয়ে এসেছিলেন, যার সজীবতা ও ফুল, ফল, রস ও সুঘ্রাণ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সকল জিন ও ইনসানের হৃদয় তৃপ্ত ও পরিতৃপ্ত হতে পারে।
এ রবিউল আউয়ালেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীনের জন্য নিজ মাতৃভূমি, বাপ-দাদার ভিটেমাটি, আত্মীয়-স্বজন এবং দীর্ঘ ৫৩ বছরের স্মৃতিবিজড়িত পরিবেশ ও আলো-বাতাসকে বিদায় জানিয়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। অবশেষে ২৩ বছরের নববী যিন্দেগী সমাপ্ত করে এ মাসেই পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। অতএব রবিউল আউয়াল কেবল মুসলিম উম্মাহরই নয়, মানব সভ্যতার ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
দিবস পালন ও ইসলাম
রবিউল আউয়াল মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য হলেও এ মাসে বিশেষ পালনীয় বা করণীয় কিছু ইসলামে নেই। অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা হল, ১২ রবিউল আউয়াল প্রিয়নবীর জন্ম ও মৃত্যু দিবস। অথচ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে ১২ রবিউল আউয়ালকে নিশ্চিতভাবে নবীজীর জন্ম বা ওফাতের তারিখ বলা ঠিক নয়। বরং অনেকের মতেই ১২ তারিখ প্রসিদ্ধ হলেও অন্য তারিখই অগ্রগণ্য। অতএব ১২ রবিউল আউয়ালকে বিশেষভাবে পালন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আমরা যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই যে, ১২ রবিউল আউয়ালই নবীজীর জন্ম ও মৃত্যু তারিখ, তাহলেও তো এ দিনটিকে দিবস হিসেবে পালন করার সুযোগ নেই। কারণ ইসলামে বিশেষ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিবস পালন করার ধারণা স্বীকৃত নয়।
একবার এক ইহুদী উমর রা.-কে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আমাদের ওপর যদি এ আয়াতটি নাযিল হত, তাহলে আমরা সে দিনটিকে ‘ঈদ’ হিসেবে পালন করতাম। আয়াতটি হল—
اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا.
[অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিআমত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে (চির দিনের জন্য) পছন্দ করে নিলাম। —সূরা মায়েদা (০৫) : ০৩]
উমর রা. বললেন, যেদিন এ আয়াতটি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর নাযিল হয়েছিল, সেদিন সম্পর্কে এবং যে স্থানে নাযিল হয়েছিল, সে স্থান সম্পর্কেও আমরা পূর্ণ অবগত আছি। আয়াতটি নাযিল হয়েছিল আরাফার ময়দানে জুমার দিনে। —সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৫
উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে উমর রা.-এর এ ঘটনা উল্লেখ করে মুফতী শফী রাহ. লেখেন—
‘ফারুকে আজম উমর রা.-এর এ উত্তরে ইসলামের একটি মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। যা দুনিয়ার সকল জাতি ও ধর্মের মাঝে ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলে। পৃথিবীর সকল জাতি ও সকল ধর্মের অনুসারীরা নিজ নিজ অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার দিনগুলোকে স্মরণীয় দিন হিসেবে পালন করে। সে দিনগুলো তাদের কাছে ঈদ ও উৎসবের মর্যাদা রাখে।
কোথাও জাতির বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্ম, মৃত্যু বা ক্ষমতাগ্রহণের দিনকে পালন করা হয়। কোথাও কোনো দেশ বা শহর বিজয়ের দিন কিংবা বড় কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার দিনকে পালন করা হয়। এসবের সারকথা ব্যক্তি বিশেষের মর্যাদা প্রকাশ করা ব্যতীত আর কিছুই নয়। ইসলাম ব্যক্তিপূজাকে সমর্থন করে না। জাহেলি যুগের রীতিনীতি ও ব্যক্তিপূজার প্রথার বিপরীতে ইসলাম মূলনীতি ও মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে স্মরণীয় করে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।
ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীলুল্লাহ বলা হয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করার এবং সেগুলোতে তাঁর পূর্ণাঙ্গরূপে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা কুরআন কারীমে আলোচনা করা হয়েছে।... তবুও না তার জন্মদিন পালন করা হয় আর না মৃত্যুদিবস। আর না অন্য কোনো বিশেষ অবস্থার দিনকে স্মরণীয় করা হয়েছে।
হাঁ, তাঁর আমলের মধ্যে যেগুলো দ্বীনের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলোকে কেবল স্মরণীয় হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়নি; বরং পরবর্তী মুসলমানদের দ্বীনের অংশ ও ফরয-ওয়াজিব সাব্যস্ত করা হয়েছে। কুরবানী, খতনা, সাফা-মারওয়ার সায়ী, মীনার তিন জায়গায় পাথর নিক্ষেপ— এ সবই সে মহান ব্যক্তিবর্গের আমলেরই স্মৃতি বহন করছে, যা তাঁরা সাধারণ মানবিক আবেগ ও স্বভাবজাত চাহিদাকে বিসর্জন দিয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছিলেন। যাতে সকল যুগের মানুষের জন্য এ শিক্ষা রয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় থেকে প্রিয়তম বস্তুকেও বিসর্জন দেওয়া উচিত।...
মোটকথা উমর রা.-এর জবাবে এ বিষয়টি ফুটে উঠেছে যে, ইহুদী, নাসারাদের মতো আমাদের ঈদ কখনও ঐতিহাসিক ঘটনার অনুগামী নয়। এমন নয় যে, আমরা যে-কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার দিনকেই ঈদ বা উৎসব হিসেবে পালন করব, যেমন করা হত প্রাচীন জাহেলি যুগে। তবে আধুনিক যুগের নব্য জাহেলিয়াত তো এ বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত করে দিয়েছে। এমনকি ভিন্ন জাতির অনুসরণে মুসলিমরাও তাতে লিপ্ত হচ্ছে।
খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের তারিখে ঈদে মীলাদ তথা জন্মদিন পালন করেছে। তা দেখে কিছু মুসলিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আালাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের তারিখে ঈদে মীলাদুন্নবী নামে একটি ঈদ সৃষ্টি করল!...
ইসলামে যদি এভাবে দিবস পালনের প্রথা সমর্থনযোগ্য হত, তাহলে নবী-রাসূলগণের প্রত্যেকের কেবল জন্মদিনই নয়; বরং তাঁদের অলৌকিক ও অনবদ্য কীর্তি ও অবদানের দীর্ঘ তালিকা আছে, যার প্রতিটিই দিবস পালনের উপযুক্ত। অন্যান্য নবী-রাসূলের পর আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবন দেখুন! তাঁর পবিত্র জীবনের প্রায় প্রতিটি দিন তো এমন কীর্তিময় অবদান থেকে শূন্য নয়, যে দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করা যেতে পারে।... এমনিভাবে তাঁর সকল মুজেযা প্রকাশের তারিখগুলোও স্মরণীয় দিবস হওয়ার যোগ্য।...
নবীজীর পর তাঁর প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবীর পবিত্র কাফেলা আছেন। তাঁদের জীবনকে স্মরণীয় করে রাখা না হলে তা কি তাদের প্রতি উম্মাহর বেইনসাফি হবে না? দিবস পালনের এ প্রথা চলতে থাকলে সাহাবায়ে কেরামের পর উম্মতের আকাবির, ওলি-বুযুর্গ ও উলামা-মশায়েখের প্রতি দৃষ্টি দিলে তো এ সংখ্যা কোটি কোটি হবে। দিন পালন করতে চাইলে এদের ভুলে গেলে তো মারাত্মক অবিচার হবে। আমরা যদি এভাবে সকলের দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তাহলে বছরের একটি দিনও দিবস পালন থেকে বাদ যাবে না। বরং প্রতিটি দিনের প্রতিটি ঘণ্টায় একাধিক দিবস ও একাধিক ‘ঈদ’ পালন করতে হবে।
এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম দিবস পালনের এ প্রথাকে জাহেলি রসম আখ্যায়িত করে এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফারুকে আজম উমর রা.-এর বক্তব্যে এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।’ —মাআরিফুল কুরআন, মুফতী শফী রাহ. ৩/৩৩-৩৬, সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য
নবীজীর মহব্বত ঈমানের অপরিহার্য অংশ
মানব সভ্যতার ওপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ ও অবদান আমাদের নবীজী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। কারণ তাঁর ওপরই আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী কুরআন কারীম নাযিল করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সকল জিন ও ইনসানের মুক্তির পথ তিনিই দেখিয়ে গিয়েছেন। একমাত্র তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই উভয় জাহানে সফলতা লাভ করা সম্ভব, অন্য কোনো মত বা পথে নয়।
তাই আল্লাহর বান্দাদের ওপর মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হক রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হক হল, তাঁর প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঈমান আনা এবং সর্বান্তকরণে তাঁর প্রতি নিখাদ ভালবাসা পোষণ করা। তাঁর প্রতি ভালবাসা ও মহব্বত ছাড়া ঈমানই পূর্ণ হবে না। নবীজীর প্রতি মহব্বত যতটা বৃদ্ধি পাবে, ঈমান ততটা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে।
হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
مَا مِنْ مُؤْمِنٍ إِلَّا وَأَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِه فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، اقرؤوا إِنْ شِئْتُمْ: اَلنَّبِيُّ اَوْلٰي بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ.
যে-কোনো ঈমানদারের জন্য দুনিয়ার সকল মানুষের তুলনায় দুনিয়া ও আখেরাতে আমিই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও নিকটতম। তোমরা চাইলে (কুরআনের এ আয়াত) তিলাওয়াত করতে পারো—
اَلنَّبِيُّ اَوْلٰي بِالْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ اَنْفُسِهِمْ.
[ঈমানদারের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও নবী বেশি ঘনিষ্ঠ। —সূরা আহযাব (৩৩) : ০৬] —সহীহ বুখারী, হাদীস ২৩৯৯
এক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
لا يُؤْمِنُ أحدُكم حتى أكونَ أحبَّ إليه من ولدِه، ووالدِه، والناسِ أجمعينَ.
তোমাদের কেউ ততক্ষণ (পূর্ণ) ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, বাবা ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হব। —সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫
একবার উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই আপনি আমার জীবন ব্যতীত বাকি সবকিছু থেকে বেশি প্রিয়।
নবীজী বললেন, না; (এতটুকু ভালবাসা যথেষ্ট হবে না)। সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, যতক্ষণ না আমি তোমার নিজের জীবন থেকেও বেশি প্রিয় হব (ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি প্রকৃত মুুুমিন হবে না)।
এরপর উমর রা. বললেন, এখন আপনি আমার জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়।
নবীজী বললেন, এখন ঠিক আছে হে উমর! —সহীহ বুখারী, হাদীস ২২৫৭
মহব্বতের আলামত
মহব্বত ও ভালবাসা মনের বিশেষ অবস্থার নাম। যা চোখে দেখা যায় না। স্পর্শ করা যায় না। তবে এর বাহ্যিক আলামত প্রকাশ পায়। ব্যক্তির বিভিন্ন আচার-আচরণ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। মহব্বত যেহেতু দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, তাই মহব্বতের মৌখিক দাবিতে মানুষ আশ্বস্ত হয় না। কেউ যদি বলে, বই আমার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী, কিন্তু তাকে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকতে দেখা যায় না, তাহলে তার দাবি অসত্যই বলা হবে। আল্লাহ তাআলার কাছেও রাসূলের প্রতি মহব্বতের নিছক মৌখিক দাবি যথেষ্ট নয়। যদি মৌখিক দাবিই যথেষ্ট হত, তাহলে মুমিন ও মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য হত কীভাবে?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ.
(হে নবী) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহও তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। —সূরা আলে ইমরান (০৩) : ৩১
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ জীবনময় বিস্তৃত
প্রিয়নবীর প্রতি মহব্বত লালন করা ঈমানের দাবি। আর মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমে। প্রশ্ন হল, নবীজীকে কতটুকু অনুসরণ করবে বা কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে অনুসরণ করবে? উত্তর হল, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তে। একজন মুমিনের জীবনের একমাত্র আদর্শ ও নমুনা হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনিই আদর্শ। ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী, আইন-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, লেনদেন, সামাজিক আচার-আচরণ, বিয়ে-শাদি, উৎসব-অনুষ্ঠান, আনন্দ-শোক— এককথায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি আমাদের আদর্শ।
ছুমামা ইবনে উছাল রা. ৬ষ্ঠ হিজরীতে মুসলমান হন। তিনি ছিলেন ইয়ামামাবাসীর সর্দার। তিনি মুসলমান হওয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ করে যে কথাগুলো বলেছিলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বললেন—
يَا مُحَمَّدُ! وَاللهِ مَا كَانَ عَلَى الْأَرْضِ وَجْهٌ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ وَجْهِكَ، فَقَدْ أَصْبَحَ وَجْهُكَ أَحَبَّ الْوُجُوهِ إِلَيَّ، وَاللهِ مَا كَانَ مِنْ دِينٍ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ دِينِكَ، فَأَصْبَحَ دِينُكَ أَحَبَّ الدِّينِ إِلَيَّ، وَاللهِ مَا كَانَ مِنْ بَلَدٍ أَبْغَضُ إِلَيَّ مِنْ بَلَدِكَ، فَأَصْبَحَ بَلَدُكَ أَحَبَّ الْبِلَادِ إِلَيَّ.
হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রিয় ও ঘৃণিত ছিল আপনার চেহারা; কিন্তু আজ আপনার চেহারাই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় চেহারা!
আল্লাহর কসম, আপনার দ্বীন ছিল আমার কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় ও ঘৃণিত; আজ আপনার দ্বীনই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ।
আল্লাহর কসম, আমার দৃষ্টিতে আপনার শহরের চেয়ে অপছন্দের কোনো শহর পৃথিবীতে ছিল না; কিন্ত আজ আপনার এ শহর আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ শহর। —সহীহ বুখারী ,হাদীস ৪৩৭২
প্রকৃত অর্থেই ঈমান এভাবেই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। চিন্তা-চেতনায় আমূল পরিবর্তন সাধন করে। জীবনদর্শনই পাল্টে দেয়। ঈমান ও রাসূলের মহব্বতের মৌখিক দাবি আছে ঠিকই, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, আমল-আখলাক, আচরণ ও উচ্চারণে প্রিয়নবীর জীবন ও আদর্শের রং নেই, সে দাবি বৃথা।
একজন মানুষ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের দাবি করবে আবার তার জীবনের সকল কাজ তার নিজস্ব গতিতেই চলবে, তা কোনোভাবেই হতে পারে না। সমাজের সাধারণ নিয়মে সমাজের সঙ্গে মিশে যাবে, পাড়া-প্রতিবেশী যা করবে, তাতেই সে তাদের মতো করেই অংশগ্রহণ করবে, আয়-ব্যয়ে হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েয ও শরীয়তে পছন্দনীয়-অপছন্দনীয়ের কোনো বাছ-বিচার করবে না; তাহলে তার ঈমানের দাবি পূর্ণাঙ্গ নয়।
দুঃখজনক হলেও বাস্তব, আজকালের বহু মুসলিম কিছু আচার-অনুষ্ঠানে ইসলাম পালন করেই সন্তুষ্ট। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রমযানের রোযা, দান-সদকা, সামর্থ্য ও সুযোগ থাকলে হজ্ব পালন, বছরে একবার মৃত বাবা-মায়ের জন্য দুআর ব্যবস্থা, মৃতের জানাযায় উপস্থিত হওয়া—ব্যস! এই হল তাদের ইসলাম। এর বাইরে যে ইসলামের অসংখ্য বিধান আছে, ওসবের প্রতি তাদের ভ্রুক্ষেপই নেই। আচার-আচরণ ও চলাফেরায় তাদের মাঝে ও একজন অমুসলিমের মাঝে তেমন কোনো তফাত দেখা যায় না।
এরা মসজিদে যেমন আছে, জুয়ার আড্ডাতেও আছে। ওয়াজ-মাহফিলে যেমন আছে, থার্টি ফাস্ট নাইট ও বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও আছে। ঈদের সময় ঈদগাহে যেমন আছে, তেমনি পূজার সময় মন্দিরেও আছে। ‘ঈদ মোবারকে’ও আছে, ‘শারদীয় শুভেচ্ছায়’ও আছে। কুরআন তিলাওয়াত যেমন শোনে, রবীন্দ্র সংগীতেও মাতে। মুখে আল্লাহর প্রশংসা যেমন আছে, দলীয় নেতাকর্মীর মিথ্যা বন্দনাও আছে। মুখে যেমন যিকির আছে, তেমনি নিজের মত ও পথের বিরোধীদের অন্যায় সমালোচনাও আছে। একদিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দরূদ পাঠ করে, অপরদিকে অন্য কোনো ব্যক্তিকে জীবনের আদর্শ বিশ্বাস করে।
এমন মুসলমানদের দেখেই আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন—
وضع ميں تم ہو نصاريٰ تو تمدّن ميں ہنود
يہ مسلماں ہيں! جنھيں ديکھ کے شرمائيں يہود
বেশ-ভূষায় খ্রিস্টান তুমি আর সংস্কৃতিতে হিন্দু!
এমন মুসলমানকে দেখে ইহুদীও লজ্জায় মুখ লুকায়।
রবিউল আউয়াল ও প্রিয়নবীর আলোচনা মজলিস
রবিউল আউয়াল মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে এ কথাও সত্য, এ মাসকে কেন্দ্র করে শরীয়তের বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। তবুও আমাদের সমাজে এ মাসে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নামে নবীজীর জন্মোৎসব পালন করা হয়। এ কাজটি কেবল বিদআত নয়; বহু বিদআত ও গোনাহের সমষ্টি। এর বিপরীতে আহলে হক উলামায়ে কেরাম এ মাসে সীরাতুন্নবীর মজলিস করে থাকেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা বা তাঁর সীরাতের প্রচার-প্রসার একজন মুমিনের সার্বক্ষণিক ফিকির ও মিশন হওয়া উচিত। মীলাদুন্নবী পালন তো বিদআত। যারা সীরাতুন্নবীর মজলিস করছি, তারাও কেন কেবল রবিউল আউয়ালের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকছি। তা কি এজন্য যে, এ মাসে একটি বড় বিদআত হয়, তাই এর বিপরীতে সহীহ মজলিস হওয়া জরুরি?
কিন্তু কথা হল, প্রিয়নবীর আলোচনা কিংবা সীরাতের চর্চা কি কেবল কারও ভুল কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এতে কি প্রিয়নবীর হক আদায় হবে? বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভালোভাবে চিন্তা করা দরকার।
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. বলেন— ‘সুধিবৃন্দ, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় আলোচনা তো এমনই এক বিষয় যে, এতে সওয়াবের কোনো প্রতিশ্রুতি না থাকলেও সর্বদাই তা করা চাই।... দেখুন, নামাযের প্রতি বৈঠকে (তাশাহহুদে) আমরা পড়ি—
السلام عليك أيها النبي
(অর্থাৎ হে নবী, আপনার প্রতি সালাম)। যোহর, আসর, মাগরিব ও এশায় দুটি করে বৈঠক করতে হয় আর ফজরে একটি। মোট নয় বৈঠক। সুন্নতে মুআক্কাদা ও বিতিরসহ হিসাব করলে দৈনিক ১৭ বৈঠক হয়। এর বাইরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ফরয, সুন্নতে মুআক্কাদা ও বিতিরের শেষ বৈঠকে মোট ১১ বার দরূদ শরীফ পড়া হয়। ১৭ আর ১১ মিলিয়ে মোট ২৮ বার প্রত্যেক মুসলমান দৈনিক রাসূলের আলোচনা আবশ্যকীয়ভাবেই করে।
‘এরপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান ও ইকামতের কথা ধরুন। প্রতিটিতেই ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ আছে। যা মুআযযিনকেও বলতে হয়, যে শোনে তাকেও বলতে হয়।... এর বাইরে যে তালিবে ইলমরা হাদীস পড়েন, তারা তো সর্বক্ষণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনাতেই থাকেন। কারণ প্রতিটি হাদীসের শুরুতে নবীজীর নামের সঙ্গে দরূদ শরীফ পড়া হয়। হাদীসের মাঝেও যখন নবীজীর নাম আসে, তখনও দরূদ পাঠ করা হয়। যেন আল্লাহ তাআলা রাসূলের নামকে এমনভাবে বিভিন্ন জায়গায় জুড়ে দিয়েছেন যে, তাঁর আলোচনা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই কোনো মুসলমানের পক্ষে।
অতএব মহব্বতের দাবি তো এটাই, সর্বদাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা হতে থাকবে। এর জন্য কোনো সভা-সেমিনার আয়োজন বা মিষ্টি বিতরণের প্রয়োজন নেই।’ —খুতুবাতে হাকীমুল উম্মত ৫/৫৩-৫৪
রসমে আটকে পড়া মহব্বত
ইসলামে কোনো আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কেবল সহীহ নিয়ত ও নিখাদ ভালবাসাই যথেষ্ট নয়; বরং তার পদ্ধতিও সহীহ হওয়া চাই। সময়, যুগচাহিদা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি বিভিন্ন হতে পারে, তবে তা অবশ্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও আদর্শের ভেতরে থেকেই হতে হবে। সুন্নতে নববীকে পাশ কাটিয়ে সীরাত চর্চা করা বাতুলতা ছাড়া আর কী!
আমাদের উদ্দেশ্য কখনোই এটা নয় যে, রবিউল আউয়ালে সীরাত আলোচনার কোনো প্রোগ্রাম করা যাবে না; বরং আমাদের কথা হল, সীরাতচর্চা যেন কেবল এ মাসের কিছু প্রোগ্রামেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আর এটা যেন কেবল প্রথা পালন বা বাৎসরিক রুটিনে পরিণত না হয়। সীরাতুন্নবী তো আমাদের জীবনাদর্শ। এটাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং উম্মাহর মাঝে এর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াকে সমগ্র জীবনের মিশন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
অনেক সময়ই এমন হয়, বহু ভালো কাজ কেবল রসম ও প্রথায় পরিণত হওয়ার কারণে তার মূল প্রাণ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। তখন দেখা যায়, মূল লক্ষ্যকে বিসর্জন দিয়ে হলেও মানুষ প্রথা রক্ষা করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ হেফাজত করুন।
সাময়িক জোশ ও আবেগই কি যথেষ্ট
ইসলামে নবীজীর প্রতি যে মহব্বতের দাবি করা হয়েছে তা এমন মহব্বত, যা দুনিয়ার সকল মহব্বতকে ছাপিয়ে যাবে। এর বিপরীতে কোনো মহব্বত ও আকর্ষণই টিকতে পারবে না। কখনও এমন হয়, কারও মাঝে মহব্বতের জোশ ও বাহ্যিক আবেগ অনেক বেশি দেখা যায়। এটা দেখে মানুষ তাকে প্রকৃত মহব্বতকারী মনে করে। অথচ প্রকৃত মহব্বত ও সাময়িক জোশ এক জিনিস নয়। প্রিয়নবীর মহব্বত এমন হবে যে, তাঁর আদর্শ আঁকড়ে ধরার জন্য, তাঁর একেকটি হুকুম পালনের জন্য সে দুনিয়ার সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকবে। কেবল সাময়িক আবেগে উদ্বেলিত হওয়া, নাত বা নবীজীবনী শুনে অশ্রুবিসর্জন দেওয়া মহব্বতের প্রকাশ বটে, কিন্তু প্রকৃত মহব্বত নয়।
এ প্রসঙ্গে শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ.-এর একটি ঘটনা স্মরণে রাখার মতো। দারুল উলূম দেওবন্দে হযরতের বুখারী শরীফের দরসের একটি ঘটনা। মাওলানা মানাযির আহসান গিলানী রাহ. তখন দাওরায়ে হাদীসের ছাত্র। তিনি লেখেন— ‘বুখারী শরীফের দরস হচ্ছিল। প্রসিদ্ধ সে হাদীস পড়া হল যে, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ (পূর্ণ) ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার বাবা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হব।’
এ অধমই নিবেদন করলাম, আলহামদু লিল্লাহ, একেবারে সাধারণ একজন মুসলমানও নবীজীর প্রতি এ পর্যায়ের মহব্বতের দানে ধন্য। এর প্রমাণ হল, মা-বাবার অপমান তো মুসলমান একটি পর্যায় পর্যন্ত সহ্য করেই নেয়। বেশির থেকে বেশি গালির পরিবর্তে সে-ও গালি দিয়ে দেয়; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামান্য অবজ্ঞাও মুসলমানকে এতটাই উত্তেজিত করে তোলে যে, সে তার হুঁশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ নিজের জীবন পর্যন্ত ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
আমার কথা শুনে শাইখুল হিন্দ রাহ. বললেন, তুমি যেমন বলেছ, বাস্তবে তেমনি ঘটে। কিন্তু এমনটা কেন হয়, তার গভীরে তোমার দৃষ্টি যায়নি। মহব্বত ও ভালবাসার দাবি হল, প্রিয়তমের ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু বিসর্জন দেবে। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি ও চাহিদার সঙ্গে সাধারণ মুসলমানের যে আচরণ তা-ও আমাদের ও তোমাদের সামনেই আছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে কী প্রত্যাশা করেন আর আমরা কী করি— এটা কে না জানে! হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবজ্ঞা যে মুসলমানরা বরদাশত করতে পারে না— তার কারণ মহব্বত নয়!
অধম নিবেদন করলাম, তাহলে আপনিই বলে দিন এর মূল কারণ কী?
মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী আমাদের হযরত বললেন, চিন্তা করলে দেখতে পাবে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবজ্ঞার মাঝে অবচেতনভাবে নিজের অবজ্ঞা ও অপমান লুকিয়ে থাকে। এতে মুসলমানের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও ভেতরের ‘আমি’টা আঘাতপ্রাপ্ত হয় যে, ‘আমরা যাকে আমাদের নবী ও পয়গম্বর মানি, তোমরা তাকে অপমান করতে পারো না।’ আঘাত লাগে মূলত নিজের ‘আমি’টার ওপর। কিন্তু আমরা বুঝতে ভুল করি যে, নবীজীর প্রতি মহব্বতের কারণেই সে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এটা আমাদের নফসের ধোঁকা।
কেউ আপন জায়গায় শান্ত মনে চিন্তা করলে নিজের আমলের ত্রুটি দেখে এ ফলাফলে পৌঁছতে পারবে। যার কাছে প্রিয়তমের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির কোনো পরোয়া নেই, আযান হচ্ছে তবুও অনর্থক গল্প-গুজব ও আড্ডা ছেড়ে যে মুআযযিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে যায় না, সে নিষ্ঠার সঙ্গে চিন্তা করে দেখুক, মহব্বতের দাবি তার মুখে মানায় কি না?” —এহাতায়ে দারুল উলূম মে বইতে হুয়ে দিন, পৃ. ১৫৩-১৫৫
নবীপ্রেম ও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা
ইসলামের দাবি হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত হবে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি। একজন মুসলমান তার পূর্ণ জীবন সাজাবে প্রিয়নবীর সুন্নাহ ও আদর্শের আলোকে। কেবল রসম-রেওয়াজ পালন করে কিংবা কোনো ঘটনায় সাময়িক কিছু প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে যদি মনে করা হয়, আল্লাহর রাসূলের হক আদায় করেছি বা আমার হৃদয়ে নবীজীর প্রতি গভীর মহব্বত ও ভালবাসা আছে, তাহলে তা কেবলই আত্মপ্রবঞ্চনা।
আল্লাহ আমাদেরকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রকৃত মহব্বত ও সঠিক অর্থে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করার, পূর্ণ জীবন তাঁর সীরাতের ওপর চলার এবং তাঁর সীরাতের প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত থাকার তাওফীক দান করুন— আমীন।