‘মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ’
সংকলকের কিছু দাবি ও তার পর্যালোচনা
মাওলানা আতাউল্লাহ ও মাওলানা শরীফ হাসান
(জুলাই ২০২৬ সংখ্যার পর)
সংকলক কর্তৃক হাদীসের মান বর্ণনা ও তার পর্যালোচনা
মাআলিমুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ ৩৯২১টি হাদীস সংবলিত একটি গ্রন্থ। এতে সংকলক প্রায় প্রতিটি হাদীসের সাথে হাদীসের মান বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। তবে এই কাজটি শাস্ত্রীয় বিবেচনায় অত্যন্ত দুর্বল হয়েছে।
প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ কিতাবের প্রায় সব হাদীসই সহীহ বা হাসান পর্যায়ের। কেবল ৩৩টি হাদীস যয়ীফ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে এ গ্রন্থে সংকলন করা হয়েছে। আর ১০টি হাদীসকে কেউ কেউ যয়ীফ আখ্যা দিলেও সেগুলো মূলত হাসান পর্যায়ের। এই ৪৩টি হাদীস ছাড়া বাকি সব হাদীস (সংকলকের দাবি অনুসারে) ‘সহীহ’ বা ‘হাসান’ মানে উত্তীর্ণ! (দ্র. মাআলিমুস সুন্নাহ ১/১৬)
আর তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের সংস্করণে থাকা বেশির ভাগ যয়ীফ ও দুর্বল বর্ণনার পরিবর্তে সমার্থক সহীহ হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সংকলকের বক্তব্য অনুযায়ী তৃতীয় সংস্করণে যয়ীফ বর্ণনা নেই বললেই চলে। (দ্র. মাআলিমুস সুন্নাহ ১/২৬)
কিন্তু সংকলকের এই দাবিগুলো যথার্থ নয়। বাস্তবে কিতাবের তৃতীয় সংস্করণেও অনেক যয়ীফ বর্ণনা রয়েছে। বেশ কিছু মালূল ও মুনকার (যা শাস্ত্রবিদগণের নিকট অশুদ্ধ, ত্রুটিপূর্ণ ও আপত্তিকর) বর্ণনাও রয়েছে। সামনে এই বিষয়গুলো সুস্পষ্টরূপে আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
মূলত সংকলক হাদীসের মান যাচাইয়ের জন্য যে নীতি অবলম্বন করেছেন সে নীতিটাই সঠিক নয়। তিন হাজারের অধিক হাদীস সংবলিত একটি গ্রন্থে, প্রতিটি হাদীসের সঠিক মান নির্ণয় করা দীর্ঘ সময় ও সাধনার দাবি রাখে। তাছাড়া হাদীসের মান যাচাইয়ের বিষয়টি বেশ সূক্ষ্ম ও জটিল। এই ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হল, সংশ্লিষ্ট হাদীসের বিষয়ে ইমামগণের বক্তব্য খুঁজে বের করা। নয়তো দেখা যাবে, নিজের অজান্তেই বারবার ইমামগণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা হচ্ছে, যা কিছুতেই কাম্য নয়। আর ইমামগণের বক্তব্যের আলোকে সমাধান না পেলে পরবর্তী ধাপগুলো অবলম্বন করতে হবে, যা আরও সূক্ষ্ম ও জটিল।
কিন্তু বড় আক্ষেপের বিষয়, হাদীসের মান বর্ণনার ক্ষেত্রে সংকলক ইমামগণের বক্তব্যের কোনো পরোয়া করেননি; বরং এই যুগের কিছু গবেষক ও টিকাকারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে কোনো বাছবিচার ছাড়া হাদীসের মান বর্ণনা করেছেন। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইমামগণের কর্মপদ্ধতির ভুল ব্যাখ্যা করে হাদীসের মান নির্ণয় করেছেন। এতে করে বহু জায়গায় হাদীসের সঠিক মান উদ্ধৃত করা সম্ভব হয়নি।
হাদীসের মান বর্ণনার বিষয়ে সংকলকের কর্মপদ্ধতি সংক্ষেপে নিম্নরূপ–
তিনি সুনানে আরবাআর ক্ষেত্রে শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী, সুনানে দারিমীর ক্ষেত্রে শায়েখ হুসাইন সালীম আসাদ দারানী, মুসনাদে আহমাদ ও সহীহ ইবনে হিব্বানের ক্ষেত্রে শায়েখ শুয়াইব আরনাউত, মুয়াত্তার ক্ষেত্রে শায়েখ আবদুল কাদের আরনাউত, সহীহ ইবনে খুযাইমার ক্ষেত্রে ড. মুস্তফা আযমী এবং আলআহাদীসুল মুখতারার ক্ষেত্রে শায়েখ আবদুল মালিক বিন দুহাইশের অনুসরণ করেছেন। মুস্তাদরাকে হাকেমের ক্ষেত্রে হাফেয যাহাবী রাহ.-এর তালখীসের ওপর নির্ভর করার কথা বলেছেন। (কিন্তু তাও সঠিক পদ্ধতিতে নয়)। আর বায়হাকী রাহ.-এর আসসুনানুল কুবরা সম্পর্কে সংকলকের কর্মপদ্ধতি বড় আপত্তিকর। তাতে বায়হাকী রাহ. কোনো হাদীস উল্লেখ করে আপত্তি না করা মানেই হাদীসটি সহীহ বা হাসান ধরে নিয়েছেন! (দ্র. মাআলিমুস সুন্নাহ ১/২১-২২)
বিস্তারিত পর্যালোচনা সামনে আসছে।
উক্ত কর্মপদ্ধতিতে বেশ কিছু আপত্তি রয়েছে। সামনে আমরা এই বিষয়ে কিছু কথা আরজ করব, ইনশাআল্লাহ্।
(তবে উল্লেখ্য, এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে অল্প কিছু নমুনা পেশ করা উদ্দেশ্য, মাআলিমুস সুন্নাহ্য় উল্লিখিত সকল দুর্বল ও আপত্তিকর বর্ণনার তালিকা পেশ করা উদ্দেশ্য নয় এবং এর প্রয়োজনও নেই।)
এক.
সংকলক সুনানে আরবাআ (তথা সুনানে তিরমিযী, সুনানে আবু দাঊদ, সুনানে নাসায়ী ও সুনানে ইবনে মাজাহ)-এর হাদীসগুলোর মান বর্ণনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ.-এর অনুকরণ করেছেন। সংশ্লিষ্ট হাদীস বিষয়ে ইমামগণের বক্তব্যের কোনো তোয়াক্কা করেননি। বিশেষত ইমাম তিরমিযী রাহ. তো প্রায় প্রতিটি হাদীসের পর হাদীসের মানও বলে দিয়েছেন। কিন্তু জানা নেই, সংকলকের নিকট ইমাম তিরমিযী রাহ.-এর বক্তব্যের চেয়েও শায়েখ আলবানী রাহ.-এর বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল!
অথচ মাআলিমুস সুন্নাহ প্রকাশিত হওয়ার বহু আগেই আরব-অনারব মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম বাস্তবতার নিরিখে শায়েখ আলবানী রাহ.-এর গবেষণা, কর্মপদ্ধতি ও রচনাবলি যাচাইপূর্বক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, হাদীসের মান নির্ণয়ে পূর্ণ তাহকীক ও যাচাই-বাছাই ছাড়া শায়েখ আলবানী রাহ.-এর অনুসরণ করার কোনো অবকাশ নেই। বাস্তবেও শায়েখ আলবানী রাহ.-এর রচনাবলিতে শাস্ত্রীয় বহু অসংগতি রয়েছে। তাই অনেক সময় তিনি নির্দ্বিধচিত্তে ইমামগণের ঐকমত্যের বিপরীতেও অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন।
শায়েখ আলবানী রাহ.-এর কর্মপদ্ধতি ও রচনাবলিতে শাস্ত্রীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে ছোট-বড় অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধও। মাসিক আলকাউসার আগস্ট, সেপ্টেম্বর ২০০৫-এ হযরাতুল উস্তায মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের লেখা ‘নাসিরুদ্দীন আলবানী রচিত সিলসিলা... একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
সামনের কিছু উদাহরণেও আমরা ইনশাআল্লাহ পরিষ্কারভাবে দেখতে পাব যে, যাচাইবিহীন শায়েখ আলবানী রাহ.-এর অনুসরণ করায় শাস্ত্রীয়ভাবে কত ভুল ও বিচ্যুতির শিকার হতে হয়েছে!
প্রথম উদাহরণ
মাআলিমুস সুন্নাহর ১৭০০ নং হাদীস–
عن عبد الله بن عمرو قال: مات رجل بالمدينة ممن ولد بها، فصلى عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم قال: يا ليته مات بغير مولده، قالوا: ولم ذاك يا رسول الله؟ قال: إن الرجل إذا مات بغير مولده، قيس له من مولده إلى منقطع أثره في الجنة.
সংকলক হাদীসটি নাসায়ী (১৮৩১) ও ইবনে মাজাহ (১৬১৪)-এর বরাতে উল্লেখ করে আলবানী সাহেবের অনুকরণে মন্তব্য করেন যে, হাদীসটি হাসান।
অথচ ইমাম নাসায়ী রাহ. নিজেই সুনানে কুবরা গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করার পর এই বলে আপত্তি করেন–
حيي بن عبد الله ليس ممن يعتمد عليه، وهذا الحديث عندنا غير محفوظ؛ -والله أعلم- لأن الصحيح عن النبي صلى الله عليه وسلم: من استطاع منكم أن يموت بالمدينة فإني أشفع لمن مات بها.
হুইয়াই বিন আবদুল্লাহ (বর্ণনাসূত্রের একজন বর্ণনাকারী) অনির্ভরযোগ্য। আমাদের মতে বর্ণনাটি সঠিক নয়। কারণ এই বিষয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হাদীস হল, তোমাদের কেউ যদি মদীনায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে আমি তার জন্য সুপারিশ করব। –সুনানে কুবরা (১৯৭১)
(قال الراقم: وحديث >من استطاع منكم أن يموت ...< أخرجه أحمد (৫৪৩৭)، والترمذي (৩৯১৭)، وابن حبان (৩৭৪১)، وقال الترمذي عقبه: حسن صحيح، غريب من حديث أيوب.)
ইমাম নাসায়ী রাহ. দুটি কারণে হাদীসটির ওপর আপত্তি করেছেন–
ক. বর্ণনাকারী হুইয়াই বিন আবদুল্লাহ অনির্ভরযোগ্য।
খ. বর্ণনাটির বক্তব্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
হুইয়াই বিন আবদুল্লাহ সম্পর্কে ইমাম বুখারী, ইমাম আহমাদ, ইমাম ইবনে আদী রাহ.-সহ অন্য ইমামগণেরও আপত্তি রয়েছে। [দ্র. আত-তারীখুল কাবীর (৩১৪৮); আলইলাল, রিওয়ায়াতু আবদিল্লাহ (৪৪৮২); আলকামিল ফিযযুআফা, ইবনে আদী (৫৬২); মীযানুল ইতিদাল, যাহাবী (২৩৯২)]
অতএব ইমামগণের আলোচনা থেকে বোঝা গেল, বর্ণনাটি ‘হাসান’ মানে উত্তীর্ণ নয়।
দ্বিতীয় উদাহরণ
মাআলিমুস সুন্নাহর ২৯১০ নং হাদীস–
عن عقبة بن عامر الجهني قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تكرهوا مرضاكم على الطعام، فإن الله يطعمهم ويسقيهم.
সংকলক হাদীসটি জামে তিরমিযী (২০৪০) ও সুনানে ইবনে মাজাহ (৩৪৪৪)-এর বরাতে উল্লেখ করেছেন। শেষে মন্তব্য করেছেন– হাসান।
অথচ বর্ণনাটিকে ইমাম আবু হাতেম বাতিল তথা অগ্রহণযোগ্য ও চরম আপত্তিকর বলেছেন। কারণ এর বর্ণনাসূত্রে বকর বিন ইউনুস নামক মুনকারুল হাদীস (যার বর্ণনা আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য) রাবী আছে। ইমাম বুখারী, উকাইলী, ইবনে আদী, ইবনুল জাওযী রাহ.-ও বর্ণনাটি দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন।
দ্রষ্টব্য : আলইলাল, ইবনে আবী হাতেম (২২১৬); আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী ৯/৫৮৩; আযযুআফা, উকাইলী, (জীবনী : আবদুল ওয়াহ্হাব বিন নাফে বুনানী); আলকামেল, ইবনে আদী, (জীবনী : বকর বিন ইউনুস), আলইলালুল মুতানাহিয়াহ, ইবনুল জাওযী (১৪৫৩)
অতএব এই বর্ণনাটিও ইমামগণের বক্তব্যের আলোকে আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। কোনোভাবেই হাসান মানে উত্তীর্ণ নয়।
মাআলিমুস সুন্নাহ্য় এমন আরও বর্ণনা আছে, যেগুলোকে সংকলক শায়েখ আলবানী সাহেবের অনুকরণে সহীহ বা হাসান বললেও হাদীস-শাস্ত্রের বড় বড় ইমামগণের নিকট তা আপত্তিকরই বটে।
এজাতীয় আরও বর্ণনা দেখুন : মাআলিমুস সুন্নাহ, বর্ণনা– ১৪৬, ৫৫৮, ৬৬০, ৬৩৮, ১৪৪০, ১৭০৩, ১৭২৪, ২৯৫১, ২৮৮৩ ও ৩০০৮
আগ্রহী পাঠকগণ উক্ত বর্ণনাগুলো হাদীস-শাস্ত্রের সংশ্লিষ্ট কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করে যাচাই করে নিতে পারেন।
অপরদিকে শায়েখ আলবানী রাহ.-এর একতরফা অনুকরণ করায় সংকলক এমন অনেক হাদীস বাদ দিয়ে দিয়েছেন, যেগুলোকে ইমামগণ সহীহ বা হাসান বললেও আলবানী সাহেব যয়ীফ বলে মত দিয়েছেন!
নমুনাস্বরূপ দেখুন : জামে তিরমিযীর হাদীস– ৫৬২, ৬৬২, ৮৪২, ৯০৯, ৯২০, ৯৩১, ১১৫৩, ১২১০, ১৬৩৭, ১৮৭০
এই বর্ণনাগুলো মাআলিমুস সুন্নাহ্য় আসেনি। খুব সম্ভব শায়েখ আলবানী রাহ. উক্ত হাদীসগুলোর বিষয়ে আপত্তি করায় সংকলক এগুলো উল্লেখ করেননি। অথচ ইমামগণ এগুলোকে সহীহ বা হাসান বলেছেন।
দুই.
ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর সুনানে কুবরা গ্রন্থের বেশ কিছু বর্ণনা মাআলিমুস সুন্নাহ্য় উদ্ধৃত হয়েছে। বর্ণনাগুলোর মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সংকলকের নীতি হল, ইমাম বায়হাকী রাহ. কোনো বর্ণনা উল্লেখ করে মন্তব্য না করা মানেই বর্ণনাটি সহীহ ও গ্রহণযোগ্য!
সংকলক এ-ও দাবি করলেন যে, ইমাম যাহাবী রাহ.-এর নীতিও এমন ছিল! অথচ শাস্ত্রীয় বিবেচনায় উক্ত নীতি যেমন সঠিক নয়, ইমাম যাহাবী রাহ.-এর দিকে এই নীতির নেসবত করাও বাস্তবসম্মত নয়।
অবশ্য ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর কিছু বক্তব্য দ্বারা বোঝা যায়, ‘তিনি তার রচনাবলিতে কেবল সহীহ হাদীসই আনবেন। দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য কোনো বর্ণনা এসে গেলে তিনি কমপক্ষে বর্ণনাটির দুর্বলতার বিষয়ে ইঙ্গিত করবেন।’
কিন্তু পরবর্তী ইমামগণ এই স্বীকৃতি দেননি যে, বায়হাকী রাহ.-এর পক্ষে উক্ত নীতিটি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তারা ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর নীরবতার ওপর ভিত্তি করে কোনো বর্ণনাকে সহীহ বলেননি; বরং আলাদাভাবে বর্ণনাটি যাচাই করে নিতে বলেন। বাস্তবেও ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর গ্রন্থাদিতে মন্তব্য ছাড়া এমন অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা শাস্ত্রীয় বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়।
মুহাক্কিক আলেমগণের অনেকেই তাদের লেখনিতে বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরেছেন। এখানে শুধু একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হচ্ছে :
শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. বলেন–
لم يف البيهقي بما التزمه، بل أخل بذلك في مواضع كثيرة من كتبه.
অর্থাৎ ইমাম বায়হাকী রাহ. যে নীতি (তথা কেবল বিশুদ্ধ বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা এবং দুর্বল বর্ণনা উল্লেখ করলেও দুর্বলতার বিষয়ে বলে দেওয়া) অবলম্বন করার কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি; বরং তার রচনাবলিতে বহু জায়গায় এর ব্যত্যয় ঘটেছে। –টীকা, কাওয়ায়েদ ফী উলূমিল হাদীস, পৃ. ১১৩
আরও দ্রষ্টব্য : মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে তাইমিয়া রাহ. ৫/৫১০; ইরশাদু তুল্লাবিল হাকায়েক, ইমাম নববী রাহ., পৃ. ১২২; আলআজউয়িবাতুল ফাযিলাহ, লখনবী রাহ. পৃ. ৭৮
দ্বিতীয়ত, সংকলক হাফেয যাহাবী রাহ.-এর ব্যাপারে দাবি করেছেন– তিনি ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর নীরবতার ওপর ভিত্তি করে কিছু বর্ণনাকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। বাস্তবে বিষয়টি আদৌ এমন নয়।
হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. আপন যুগের একজন উচ্চ পর্যায়ের নাকেদ ইমাম, যিনি নিজেই হাদীসকে গভীরভাবে যাচাই করার দক্ষতা রাখেন। এমন নাকেদ ইমামের পক্ষে কী করে উক্ত দাবি বাস্তব হতে পারে!
উক্ত দাবি যে বাস্তবতাবিরোধী এর প্রমাণ হিসেবে যাহাবী রাহ.-এরই সংকলিত কিতাব ‘আলমুহায্যাব ফী ইখতিসারিস সুনানিল কাবীর লিল বায়হাকী’ দেখে নেওয়াই যথেষ্ট।
এই কিতাবে হাফেয যাহাবী রাহ. আস-সুনানুল কুবরা গ্রন্থের ইখতিসার তথা সংক্ষেপণ করেছেন। এতে তিনি এমন অনেক হাদীসের ওপর আপত্তি জানিয়েছেন, যেগুলোতে ইমাম বায়হাকী রাহ. কোনো মন্তব্য না করে নীরব ছিলেন, যা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, হাফেয যাহাবী রাহ.-এর কাছেও উক্ত নীতি সমর্থিত নয়।
উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য : আলমুহাযযাব, হাদীস– ১০, ১২, ১৭, ২০, ৮২, ৯৩, ১৪৮, ৩৯৫, ৪০৭, ৪১৫, ৫১৩ ও ৫৫৮
বহু জায়গায় যাহাবী রাহ. ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর মত গ্রহণ না করে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
দ্রষ্টব্য : আলমুহাযযাব, হাদীস– ৩৪১, ৪০১, ৪৬৩, ১৩০৬, ২২৭১, ৮২৮১, ৮৬৪০, ১০০৬৯, ১৪২৭১
আবার কিছু জায়গায় বেশ কড়া ভাষায় আপত্তি করেছেন। (দ্র. আলমুহাযযাব ৭/৩৪৭০)
এভাবে আসসুনানুল কুবরা এবং আলমুহাযযাব গ্রন্থদ্বয়ের হাদীসগুলো পরস্পর মিলিয়ে দেখলে এমন অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে।
এসব কিছু বাদ দিয়ে ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর নীরবতা দেখেই কোনো বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলে দাবি করা, আবার যাহাবী রাহ.-এর ওপরও এই নীতি চাপিয়ে দেওয়া বড়ই আশ্চর্যের! এসব কিছুই প্রমাণ করে, হাদীসের মান যাচাইয়ে সংকলকের নীতি ও কর্মপদ্ধতি কতটা দুর্বল!
এর চেয়েও বড় পরিতাপের বিষয় হল, সংকলক নিজের আরোপিত নীতিটিও রক্ষা করতে পারেননি। তিনি ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর উদ্ধৃতিতে এমন কিছু বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর বিষয়ে স্বয়ং ইমাম বায়হাকী রাহ.-এরই আপত্তি রয়েছে! সংকলক যে স্থানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ঠিক সেখানেই ইমাম বায়হাকী রাহ. আপত্তি করেছেন অথবা অন্য কোথাও আপত্তি করেছেন।
এমন বর্ণনার সংখ্যাও কম নয়, যেগুলোতে ইমাম বায়হাকী রাহ.-এর আপত্তি না পাওয়া গেলেও অন্য ইমামগণের আপত্তি রয়েছে।
সামনের উদাহরণগুলো থেকে বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রথম উদাহরণ
মাআলিমুস সুন্নাহর ১৭০৭ নং হাদীস–
عن عبد الله بن بريدة عن أبيه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ما نقض قوم العهد قط إلا كان القتل بينهم، ولا ظهرت الفاحشة في قوم قط إلا سلط الله عليهم الموت، ولا منع قوم الزكاة إلا حبس الله عنهم القطر.
এটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বক্তব্য। মারফূ তথা নবীজীর বক্তব্য হিসেবে প্রমাণিত নয়। এর সনদে বাশীর ইবনে মুহাজির নামক বর্ণনাকারী আছেন, যিনি ভুলক্রমে ইবনে আব্বাস রা.-এর বক্তব্যটিকে বুরাইদা রা.-এর সূত্রে নবীজীর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। ইবনে আবী হাতেম রাহ. তার পিতাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এমন উত্তরই দেন।
দ্রষ্টব্য : আলইলাল, ইবনে আবী হাতেম (২৭৭৩)
সংকলক আসসুনানুল কুবরা ৯/২৩১-এর বরাতে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। সেখানেই ইমাম বায়হাকী রাহ. বিষয়টির প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। তিনি হাদীসটি মারফূ হিসেবে উল্লেখ করার পর বাশীর ইবনে মুহাজিরের ভুলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন–
كذا رواه بشير بن المهاجر
অতঃপর হাদীসটির সহীহ বর্ণনা পেশ করেন।
তাছাড়াও ইমাম বায়হাকী রাহ. হাদীসটি আসসুনানুল কুবরা গ্রন্থেরই অন্য জায়গায় বাশীর ইবনে মুহাজিরের সূত্রে উল্লেখ করে বলেন–
خالفه الحسين بن واقد، فرواه عن عبد الله بن بريدة، عن ابن عباس رضي الله عنهما من قوله أتم منه.
অর্থাৎ বাশীর বিন মুহাজির হাদীসটি মারফূ হিসেবে বর্ণনা করলেও হুসাইন বিন ওয়াকিদ কিন্তু এভাবে বর্ণনা করেননি; বরং তিনি হাদীসটি আবদুল্লাহ বিন বুরাইদার সূত্রে হযরত আব্বাস রা.-এর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণনা বাশীরের বর্ণনার চেয়েও পূর্ণাঙ্গ। –আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী ৯/৩৮৬
ইমাম বায়হাকী রাহ. এখানে এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করছেন যে, বাশীর বিন মুহাজিরের বর্ণনাটি ভুল এবং হুসাইন বিন ওয়াকিদের বর্ণনাটি সঠিক।
দ্বিতীয় উদাহরণ
মাআলিমুস সুন্নাহর ১৭৩৫ নং হাদীস–
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: كتب رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى أهل اليمن: أن يؤخذ من العسل العشر.
হাদীসটিকে ইমাম উকাইলী রাহ. মুনকার ও আপত্তিকর বলেছেন। –আযযুআফা, উকাইলী ২/৩০৯
ইমাম বায়হাকী রাহ.-ও হাদীসটি উল্লেখ করে নীরব থাকেননি; বরং হাদীসটি বর্ণনা করার পূর্বে ইমাম বুখারী রাহ.-এর বরাতে হাদীসটি অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা বলেছেন। এ-ও বলেছেন, এই মর্মে কোনো সহীহ ও প্রমাণিত হাদীস নেই। (দ্র. আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী ৪/১২৬)
উদাহরণের জন্য আরও দ্রষ্টব্য : মাআলিমুস সুন্নাহ, বর্ণনা– ১৪৪১, ২৪৩৬, ২৪৫২ ও ১৩৮১
তিন.
হাকেম আবু আবদুল্লাহ নীশাপুরী রাহ. রচিত আলমুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন একটি বৃহৎ হাদীস সংকলন। এই কিতাবে হাকেম রাহ.-এর ইচ্ছা ছিল, সহীহাইনে আসেনি এমন সহীহ হাদীসগুলো জমা করা। কিন্তু পরবর্তী প্রায় সকল আহলে ইলম এই বিষয়ে একমত যে, তার পক্ষে শুধু সহীহ হাদীসে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব হয়নি। ফলে এই কিতাবে সাধারণ দুর্বল বর্ণনা ছাড়াও অনেক আপত্তিকর ও জাল বর্ণনাও এসে গেছে। আহলে ইলমগণ এর নানাবিধ কারণও উল্লেখ করেছেন। তাই মুস্তাদরাকের বর্ণনাগুলো কোন্ পর্যায়ের তা জানার জন্য অন্যান্য ইমামগণের শরণাপন্ন হওয়া এবং মুহাদ্দিসীনে কেরাম কর্তৃক বর্ণিত শাস্ত্রীয় নীতিমালার আলোকে স্বতন্ত্র তাহকীক করা প্রয়োজন।
সংকলক এ ক্ষেত্রে যাহাবী রাহ. রচিত তালখীসুল মুস্তাদরাক কিতাবের ওপর নির্ভর করার কথা বলেছেন। কিন্তু লক্ষণীয় হল, এ কিতাবে যাহাবী রাহ.-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, মুস্তাদরাকের একটি সংক্ষিপ্ত কপি তৈরি করা। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাহাবী রাহ. নিজস্ব মতামত ব্যক্ত না করে হাকেম রাহ.-এর বক্তব্যকেই সংক্ষিপ্ত শব্দে উল্লেখ করেছেন।
এক্ষেত্রে যাহাবী রাহ.-এর মতামত জানার জন্য যেমন তালখীসের বিভিন্ন স্থান পরস্পর মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন হয়, তেমনি যাহাবী রাহ. রচিত অন্যান্য গ্রন্থাদিরও শরণাপন্ন হতে হয়।
বিষয়গুলো দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে, যা এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সম্ভব নয়।
আরও বিশদভাবে জানতে শায়েখ খালেদ র্দিরীস হাফিযাহুল্লাহর নিম্নোক্ত পুস্তিকাটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে–
الإيضاح الجلي في نقد مقولة >صححه الحاكم ووافقه الذهبي<
মাআলিমুস সুন্নাহ্য় তালখীসের এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যগুলোকে হাফেয যাহাবী রাহ.-এর নিজস্ব মতামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে তালখীসের অন্য কোনো স্থান থেকে ভিন্ন মত বোঝা যায় কি না বা তারই রচিত অন্যান্য গ্রন্থাবলিতে ভিন্ন কোনো মত পাওয়া যায় কি না অথবা অন্য শাস্ত্রবিদ ইমামগণের কী মতামত– এগুলো যাচাই করা হয়নি। অথচ শাস্ত্রীয় বিবেচনায় এগুলো অপরিহার্য। হাদীসের মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় বিবেচনায় সংকলকের কর্মপদ্ধতি যে ত্রুটিপূর্ণ, এটি তারই ইঙ্গিত বহন করে।
সামনের উদাহরণটি লক্ষ করা যেতে পারে :
মাআলিমুস সুন্নাহর ২১০৫ নং হাদীস–
عن عبد الله بن عمرو: أنه قال: يا رسول الله! أخبرني عن الجهاد والغزو، فقال: يا عبد الله بن عمرو! إن قاتلت صابرا محتسبا، بعثك الله صابرا محتسبا، وإن قاتلت مرائيا مكاثرا، بعثك الله مرائيا مكاثرا، يا عبد الله بن عمرو! على أي حال قاتلت أو قتلت، بعثك الله على تلك الحال.
বর্ণনাটি উল্লেখ করে সংকলক বলেন, হাফেয যাহাবী রাহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অথচ যাহাবী রাহ. যা বলেছেন, তা তো কেবল হাকেম রাহ.-এরই বক্তব্যের খোলাসা। যাহাবী রাহ. কিন্তু এই মত পোষণ করেন না। কারণ তিনি বর্ণনাটি মীযানুল ইতিদাল গ্রন্থে উল্লেখ করে তার বর্ণনাকারী হানান বিন খারেজা সম্পর্কে মন্তব্য করেন– لا يعرف
এই বলে তিনি রাবীর বিষয়ে যেমন আপত্তি জানালেন, তার বর্ণনাটি দুর্বল হওয়ার বিষয়েও ইঙ্গিত দিলেন। –মীযানুল ইতিদাল, যাহাবী (হানান বিন খারেজার জীবনী)
আরও দ্রষ্টব্য : তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার (হানানের জীবনী); যাইলুল মীযান, ইরাকী (হানানের জীবনী)
এছাড়াও মাআলিমুস সুন্নাহর ২৯০, ৪৯২, ১৬৮৩, ৩২৭৭, ৩০৩৭ নং বর্ণনাগুলো সংশ্লিষ্ট কিতাবসমূহের সহযোগিতা নিয়ে দেখা যেতে পারে।
উক্ত বর্ণনাগুলোতে সংকলক যাহাবী রাহ.-এর বরাতে যে মতামত পেশ করেছেন, বাস্তবে যাহাবী রাহ.-এর মত তার চেয়ে ভিন্ন।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, হাফেয যাহাবী রাহ.-এর মন্তব্য ছাড়াও কিছু বর্ণনা ‘মুস্তাদরাক’ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে এবং তাতে অন্য কোনো ইমামের মতামতও উল্লেখ করা হয়নি!
প্রশ্ন হল, সংকলক কীসের ভিত্তিতে হাদীসগুলো উল্লেখ করলেন? তিনি কি হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য তা মুস্তাদরাকে থাকাই যথেষ্ট মনে করেন! অথচ এই বর্ণনাগুলোর কোনো কোনোটির ব্যাপারে একাধিক ইমামের আপত্তি রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য : মাআলিমুস সুন্নাহ, বর্ণনা– ৩০৩, ৪৫৫, ৫৭১, ৮২৪ ও ১৬২২
চার.
‘আলআহাদীসুল মুখতারাহ’ যিয়াউদ্দীন মাকদিসী রাহ. (মৃ. ৬৪৩হি.) রচিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ। এটি মৌলিকভাবে সহীহ হাদীসের সংকলন। মাকদিসী রাহ. এতে সহীহাইনে আসেনি এমন সহীহ হাদীসগুলো জমা করার চেষ্টা করেছেন। তবে কখনও ইল্লত তথা সনদ-মতনের সূক্ষ্ম ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করতে এমন হাদীসও এনেছেন, যা বাহ্যত সহীহ মনে হলেও বাস্তবে ‘মা‘লূল’ ও ত্রুটিপূর্ণ। (দ্র. আলআহাদীসুল মুখতারাহ, যিয়া মাকদিসী ১/৬৯)
সুতরাং ‘মুখতারাহ’ থেকে কোনো বর্ণনা উদ্ধৃত করার সময় মাকদিসী রাহ. বর্ণনাটি ‘মা‘লূল’ বা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দিয়েছেন কি না, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এ-ও লক্ষণীয় যে, মাকদিসী রাহ.-এর মতের সাথে অন্য ইমামগণের (বিশেষত তার পূর্ববর্তী ইমামগণের) মতভিন্নতা আছে কি না। কিন্তু এসব বিষয়ের প্রতি মাআলিমুস সুন্নাহ্য় লক্ষ রাখা হয়নি।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই কিতাব থেকে উদ্ধৃত বর্ণনাগুলোর মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এমন একজন টীকাকারের ওপর নির্ভর করা হয়েছে, যিনি ইমামগণের বিপরীতে মনগড়া নবআবিষ্কৃত এক পন্থায় হাদীসের মান নির্ণয় করেছেন, যা শাস্ত্রীয় বিবেচনায় সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও পরিত্যাজ্য।
এই পদ্ধতির মূলকথা হল, শুধু হাফেয ইবনে হাজার রাহ. রচিত তাকরীবুত তাহযীব গ্রন্থে উল্লিখিত রিজালের মান দেখেই সেগুলোর মনগড়া ব্যাখ্যা অনুসারে হাদীসের মান নির্ণয় করা হবে।
এক্ষেত্রে অন্যান্য ইমামগণের কর্ম ও বক্তব্য এবং তাসহীহ-তাযয়ীফ সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, যুক্তি ও প্রমাণাদি কিছুই দেখার প্রয়োজন নেই! (দ্র. আলআহাদীসুল মুখতারাহ, টীকাকার ড. আবদুল মালিক বিন দুহাইশ-এর ভূমিকা ১/৬৪)
স্বয়ং তাকরীবুত তাহযীব গ্রন্থের সংকলক হাফেয ইবনে হাজার রাহ.-এর কাছেও এই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়।
এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে এর বিস্তারিত পার্যালোচনা ও খণ্ডনের সুযোগ নেই। আগ্রহী পাঠকগণ এর দালীলিক পর্যালোচনা ও বিস্তারিত খণ্ডন জানতে মুহতারাম উস্তায মাওলানা সাঈদ আহমাদ বিন গিয়াসুদ্দীন আহমাদ (দামাত বারাকাতুহুম) রচিত ‘আততা‘কীবুল মুমাজ্জাদ’ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে নিতে পারেন।
এমন টীকাকারের ওপর নির্ভর করে হাদীসের মান নির্ণয় করলে তা কেমন হবে, বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরও দুঃখজনক বিষয় হল, কিছু স্থানে মুখতারাহ গ্রন্থের টীকাকারের কথাও সঠিকভাবে উদ্ধৃত করা হয়নি!
(দ্র. মাআলিমুস সুন্নাহ, বর্ণনা– ৪৭, ১৬৯৭, ১৬৯৮)
পাঁচ.
এই কিতাবের দুর্বলতার একটি বড় দিক হল, এতে অনেক স্থানে একই বিষয়ে বর্ণিত সহীহ হাদীস না এনে যয়ীফ হাদীস আনা হয়েছে। আর কোথাও সনদ ও অর্থ-মর্মের বিবেচনায় অধিক অগ্রগণ্য হাদীস বাদ দিয়ে তার চেয়ে কম মানের হাদীস আনা হয়েছে। অথচ তা এই সংকলনের উদ্দেশ্য-পরিপন্থি।
এজাতীয় হাদীসের সূচি তৈরি করা হলে তা অবশ্যই অনেক দীর্ঘ হবে। এখানে কেবলমাত্র নমুনাস্বরূপ কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হচ্ছে–
১. মাআলিমুস সুন্নাহর ৩৬৮ নং হাদীস–
عن أبي هريرة قال: والله، لولا آيتان في كتاب الله تعالى ما حدثت عنه - يعني عن النبي صلى الله عليه وسلم- شيئا أبدا، لولا قول الله: اِنَّ الَّذِیْنَ یَكْتُمُوْنَ مَاۤ اَنْزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتٰبِ وَیَشْتَرُوْنَ بِه ثَمَنًا قَلِیْلًا. إلى آخر الآيتين. [البقرة: ১৭৪ و ১৭৫].
সংকলক হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহ (২৬২) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। অথচ এটি সহীহ বুখারীতে (১১৮ ও ২৩৫০) আরও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
২. মাআলিমুস সুন্নাহর باب السمر بعد العشاء অধ্যায়ে (১০৬১, ১০৬২, ১০৬৩) যথাক্রমে জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ ও সহীহ ইবনে হিব্বান থেকে তিনটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে সহীহ বুখারী (৫৪৭) ও সহীহ মুসলিমে (৬৪৭) আরও দীর্ঘ হাদীস রয়েছে।
৩. মাআলিমুস সুন্নাহর ১২৯৯ নং হাদীস–
عن عبد الله بن مسعود قال: كنا لا نتوضأ من موطئ، ولا نكف شعرا، ولا ثوبا.
সংকলক এটি সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিযী ও সুনানে ইবনে মাজাহর বরাতে উল্লেখ করেছেন। অথচ এ বিষয়ে সহীহ বুখারীতে (৮১০) আরও দীর্ঘ মারফূ হাদীস রয়েছে।
৪. মাআলিমুস সুন্নাহর ميراث الجد অধ্যায়ে (২৫৫২-২৫৫৫) চারটি আসার উল্লেখ করা হয়েছে । অথচ এ বিষয়ে জামে তিরমিযীতে (২০৯৯) মারফূ হাদীসও আছে, যা সংকলক উদ্ধৃত করেননি।
ছয়.
এই কিতাবের আরেকটি বড় দুর্বলতার দিক হল, এতে অনেক ক্ষেত্রে মুতাকাদ্দিম (অগ্রবর্তী) কিতাবের বরাত না দিয়ে মুতাআখখির (পরবর্তী) কিতাবের বরাত দেওয়া হয়েছে। অথচ সংকলকের নীতি অনুসারে অগ্রবর্তী কিতাবের বরাত দেওয়াই উচিত ছিল।
এমন অসংগতির নানাবিধ কারণ থেকে একটি কারণ হল, বর্ণনাসমূহের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংকলক এই যুগের বিভিন্ন গবেষক ও টীকাকারের ওপর নির্ভরশীল। তাই দেখা যায়, অগ্রবর্তী কোনো কিতাব, যেমন সুনানে তিরমিযীতে একটি বর্ণনা এসেছে, যার ওপর শায়েখ আলবানী রাহ. আপত্তি করায় সংকলক আপন নীতি অনুযায়ী তা গ্রহণ করলেন না। কিন্তু পরে দেখা গেল, বর্ণনাটি পরবর্তী কোনো কিতাব যেমন আল-আহাদীসুল মুখতারায় আছে এবং সেখানে টীকাকার বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন, তাহলে সংকলক বর্ণনাটি সহজেই গ্রহণ করে নেন। বোঝা গেল, হাদীসের মান যাচাইয়ে সংকলকের নীতিমালা এমনই যে, এর মাধ্যমে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই বর্ণনার প্রতি দ্বিমুখিতা প্রকাশ পায়। অন্য দিকে এই নীতিমালার কারণে সংকলক হাদীসের বরাত উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে যেই নীতি অবলম্বন করেছেন (তথা যথাসম্ভব অগ্রবর্তী কিতাবের বরাত দেওয়া) তা-ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে। কিছু উদাহরণ–
১. মাআলিমুস সুন্নাহর ২৬২৮ নং হাদীস–
عن ابن عباس رضي الله عنهما، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من ولدت له أنثى، فلم يئدها، ولم يهنها، ولم يؤثر ولده -يعني الذكر- عليها أدخله الله بها الجنة.
বর্ণনাটি মুস্তাদরাক (৭৩৮৪)-এর বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তা মুসনাদে আহমাদ (১৯৫৭) ও সুনানে আবু দাউদেও (৫১৪৬) বিদ্যমান। খুব সম্ভব শায়েখ আলবানী রাহ. ও শায়েখ শুআইব আরনাউত রাহ. বর্ণনাটিকে যয়ীফ বলায় তিনি উক্ত দুই গ্রন্থ থেকে হাদীসটি গ্রহণ করতে পারেননি।
এদিকে তালখীসুল মুস্তাদরাকে হাদীসটি সম্পর্কে ‘সহীহ’ শব্দ দেখে তা গ্রহণ করে নিয়েছেন। অথচ এখানে শায়েখ আলবানী রাহ.-এর কথা সঠিক ছিল। কারণ এর সনদে ইবনু হুদাইর নামে এক রাবী আছেন, যার ব্যাপারে যাহাবী রাহ. মীযান গ্রন্থে বলেন–
لا يعرف
অর্থাৎ বর্ণনাকারী হিসেবে সে অপরিচিত।
২. মাআলিমুস সুন্নাহর ১৭২২ নং হাদীস বায়হাকী রাহ.-এর আসসুনানুল কুবরা (৪/১২২)-এর বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এটি মুয়াত্তায়ও বিদ্যমান। [দ্র. মুয়াত্তা মালেক, ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনা, কিতাবুল মুসাকাত (হাদীস ২)
৩. মাআলিমুস সুন্নাহর ১৫৮১ নং হাদীস মুখাতারা গ্রন্থের বরাতে এসেছে। অথচ এটি ‘সহীহ ইবনে খুযাইমাহ’ (২৫৬৫); ‘সহীহ ইবনে হিব্বান’ (২৭০৯) ও ‘মুস্তাদরাকে হাকেম’ (১৬৩৪, ২৪৮৮)
– এই গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান।
সাত.
এই গ্রন্থে সংকলক থেকে বিভিন্নভাবে বড় অসতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে। ইতিপূর্বে এর বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
বড় পরিতাপের বিষয় হল, এক স্থানে তিনি এমনই অসতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন যে, ইমাম মুসলিম রাহ.-এর বক্তব্যের অংশবিশেষকে হাদীসের অংশ বানিয়ে দিয়েছেন!
সংকলক মাআলিমুস সুন্নাহর ৩৩৯ নং বর্ণনাটি এভাবে উদ্ধৃত করেন–
عن عائشة رضي الله تعالى عنها: أنها قالت: أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن ننزل الناس منازلهم، مع ما نطق به القرآن من قول الله تعالى:وَفَوْقَ كُلِّ ذِیْ عِلْمٍ عَلِیْمٌ [يوسف: ٧٦].
এখানে শেষের চিহ্নিত অংশটুকু ইমাম মুসলিম রাহ.-এর বক্তব্যের অংশবিশেষ। ইমাম মুসলিম রাহ.-এর অলোচনার পূর্বাপর থেকে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। জানা নেই, এমন স্পষ্ট বিষয়ে সংকলক কেন ভ্রমের শিকার হলেন! ওয়াল্লাহু আ‘লাম।
এছাড়াও সংকলকের কর্মপদ্ধতিতে আরও নানা ধরনের আপত্তি রয়েছে, যা সংক্ষিপ্ততার লক্ষ্যে এখানে উল্লেখ করা হল না।
পরিশিষ্ট
হাদীসে নববী এক বিস্তৃত জগৎ। এককভাবে তা উম্মতের কারও পক্ষে আয়ত্ত করা অতীতে সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও তা অসম্ভব।
হাদীস সংরক্ষণের স্বর্ণযুগে প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী বড় বড় মুহাদ্দিসগণ তাদের সিনায় লাখ লাখ হাদীস ধারণ করেছেন। তবুও কিছু না কিছু হাদীস ছুটে গেছে তাদের থেকে। তাদের কেউই সকল হাদীস আয়ত্ত করার দাবি করেননি। তাহলে এই যুগে এসে এমন দাবি কীভাবে সম্ভব!
অতএব মাত্র ৩৯২১টি হাদীসসংবলিত একটি গ্রন্থের বিষয়ে কী করে নিম্নের দাবি করা যায়–
–এতে সমগ্র হাদীস ও সুন্নাহর সারসংক্ষেপ চলে এসেছে!
–কিতাবটি পাঠককে হাদীসের কিতাবসমূহে সংরক্ষিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল বাণী, হুকুম-আহকাম ও হেদায়েতের সঙ্গে পরিচয় করাবে!
–প্রত্যেক মুসলমান –যেই শ্রেণি বা সংস্কৃতির হোক না কেন– দ্বীন-দুনিয়ার সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় হাদীস এতে পেয়ে যাবে!
–কিতাবের প্রতিটি অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট সকল বিধান ও বিষয়ের হাদীস এসে গেছে!
–এই সংকলনবহির্ভূত হাদীসগুলোর তেমন কোনো প্রয়োজন নেই!!!
এ সবই অবিবেচনাপ্রসূত দাবি। বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর কোনো মিল নেই। কারণ :
–হাদীসের অসংখ্য কিতাব থেকে মাত্র ১৪টি কিতাবের হাদীস এতে সংকলিত হয়েছে।
–তাতেও প্রসিদ্ধ অনেক হাদীস এ সংকলনে স্থান পায়নি।
–সহীহাইনের প্রচুর হাদীস বাদ পড়েছে।
–অন্যান্য কিতাবেরও বহু সহীহ হাদীস আসেনি।
সংকলক দাবি করেছেন, কিতাবের প্রতিটি হাদীস সহীহ বা হাসান পর্যায়ের। অথচ–
–অগ্রহণযোগ্য ও আপত্তিকর হাদীসও এতে এসেছে।
–প্রচুর পরিমাণে যয়ীফ ও দুর্বল হাদীস এসেছে।
–হাদীসের মান নির্ণয়ে খুবই দুর্বল ও আপত্তিকর কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে।
তাই এই কিতাব অধ্যয়ন করলে বা এই কিতাব দ্বারা উপকৃত হতে চাইলে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার জীবন কুরআন-সুন্নাহর নূর ও হেদায়েত দ্বারা আলোকিত করে দিন– আমীন।
وصلّى الله تعالى وسلّم وبارك علٰى خير خلقه نبيّنا محمّد وعلٰى آله وصحبه أجمعين، والحمد لله ربِّ العالَمين.