একই দিনে সারা বিশ্বে রোযা ও ঈদ পালন করার মতবাদ
‖ একটি দলীলবিহীন মতবাদ
‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন-৩য় কিস্তি
[গত মে মাসের ০৯ তারিখে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন রমনা’য় ‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে দেশের দ্বীনী বিভিন্ন ঘরানার প্রতিনিধি আলেমগণ অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন গত জুন ২০২৬ সংখ্যা থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে।
বায়তুল মোকাররমের সম্মানিত খতীব হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক দামাত বারাকাতুহুম উক্ত সেমিনারে যে সারগর্ভ আলোচনা পেশ করেছেন তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।]
হযরত খতীব ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম বলেন–
আমাদের দেশে যারা বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা-ঈদ করার নবসৃষ্ট মতের প্রবক্তা, তারা বিভিন্ন খ্যাতিমান আলেমের নাম ব্যবহার করে তাদেরকে এই নবসৃষ্ট মতের পক্ষের বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে থাকেন। যেসকল খ্যাতিমান আলেমের মধ্যে অন্যতম হলেন, শায়েখ আবদুল আযীয বিন বায রাহ.।
শায়েখ বিন বায রাহ. কী বলেছেন?
শায়েখ বিন বায রাহ. আরব বিশ্বের একজন অতি প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব এবং আমাদের দেশেও অনেকের কাছে সুপরিচিত। এ কারণেই এ মতের প্রবক্তারা তাঁর নাম বিশেষভাবে ব্যবহার করেন এবং দাবি করেন যে, তিনিও নাকি তাদের মতের পক্ষে!
নবউদ্ভাবিত ওই মতের একজন কড়া সমর্থক জনাব সাইয়েদ আব্দুস সালাম সাহেব তার বইয়ে (কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অভিন্ন তারিখে হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রয়োজনীয়তা) শায়েখ বিন বাযের উদ্ধৃতি এনেছেন। শায়েখের একটি ফতোয়ার কিছু অংশ উল্লেখ করে এই দাবিও করেছেন– ‘এটা শায়েখের সর্বশেষ বক্তব্য!’
আব্দুস সালাম সাহেব কোত্থেকে জানলেন এটা শায়েখের সর্বশেষ বক্তব্য!
আচ্ছা মানলাম, এটি শায়েখ বিন বাযের সর্বশেষ ফতোয়া। কিন্তু প্রশ্ন হল, আপনি ফতোয়ার প্রথম অংশ উল্লেখ করেছেন, শেষ অংশ উল্লেখ করেননি কেন?
আমি এখন আপনাদেরকে শায়েখ বিন বাযের উক্ত ফতোয়ার দুটি অংশই দেখাচ্ছি। জনাব আব্দুস সালাম সাহেব যে অংশ উদ্ধৃত করেছেন সেটি এবং যে অংশ উদ্ধৃত করেননি সেটিও।
তিনি উদ্ধৃত অংশের শুধু অনুবাদ উল্লেখ করেছেন। এখানে মূল আরবী উল্লেখ করা হল–
الصواب اعتماد الرؤية وعدم اعتبار اختلاف المطالع في ذلك؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أمر باعتماد الرؤية ولم يفصل في ذلك، وذلك فيما صح عنه صلى الله عليه وسلم أنه قال: صوموا لرؤيته، وأفطروا لرؤيته، فإن غم عليكم فأكملوا العدة ثلاثين. متفق على صحته. وقوله صلى الله عليه وسلم: لا تصوموا حتى تروا الهلال أو تكملوا العدة، ولا تفطروا حتى تروا الهلال أو تكملوا العدة. والأحاديث في هذا المعنى كثيرة.
এখানে বিন বায রাহ. তাঁর মত অনুসারে উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয় বলেছেন এবং তার পক্ষে–
صوموا لرؤيته، وأفطروا لرؤيته
–হাদীস উল্লেখ করেছেন।
শায়েখ বিন বায রাহ.-এর আলোচনার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ যে অংশটি জনাব আব্দুস সালাম সাহেব উদ্ধৃত করেননি, তা হল–
وقد ذهب جمع من أهل العلم إلى أن لكل بلد رؤيته، إذا اختلفت المطالع. واحتجوا بما ثبت عن ابن عباس رضي الله عنه أنه لم يعمل برؤية أهل الشام. وكان في المدينة رضي الله عنه، وكان أهل الشام قد رأوا الهلال ليلة الجمعة وصاموا بذلك في عهد معاوية رضي الله عنه، أما أهل المدينة فلم يروه إلا ليلة السبت، فقال ابن عباس رضي الله عنهما لما أخبره كريب برؤية أهل الشام وصيامهم: نحن رأيناه ليلة السبت فلا نزال نصوم حتى نراه أو نكمل العدة.
واحتج بقول النبي صلى الله عليه وسلم: صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته، الحديث. وهذا قول له حظه من القوة، وقد رأى القول به أعضاء مجلس هيئة كبار العلماء في المملكة العربية السعودية، جمعا بين الأدلة، والله ولي التوفيق.
অর্থাৎ আহলে ইলমের এক জামাত এ মত গ্রহণ করেছেন যে, উদয়স্থল ভিন্ন হলে প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য তাদের হেলাল দেখাই ধর্তব্য হবে। এটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর মত। শামে শুক্রবার রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে) হেলাল দেখা যাওয়ার সংবাদ মদীনায় এসেছে, কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তা গ্রহণ করেননি; বরং বলেছেন, আমরা রোযা রাখতে থাকব, যতক্ষণ না (২৯তম রমযানের সন্ধ্যায়) শাওয়ালের হেলাল দেখব অথবা (২৯-এর সন্ধ্যায় হেলাল দেখা না গেলে) রমযান মাস ত্রিশ দিন পুরা করব।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস–
صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته
(তোমরা হেলাল দেখে রোযা শুরু কর, হেলাল দেখে রোযা শেষ করে ঈদ কর) –দ্বারা দলীল দিয়েছেন।
এই মত যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদ এ মতটিই গ্রহণ করেছেন। যাতে উভয় দিকের দলীলের ওপর আমল হয়ে যায়। (মাজমূউ ফাতাওয়া ও মাকালাতিম মুতানাওইয়াহ, খ. ১৫, পৃ. ৮৩-৮৪, প্রকাশক : আররিআসাতুল আম্মাহ, চতুর্থ প্রকাশ : ১৪২৭ হি./২০০৬ ঈ.; তুহফাতুল ইখওয়ান বি-আজউইবাতিন মুহিম্মাতিন তাতাআল্লাকু বি-আরকানিল ইসলাম, পৃ. ১৫৮-১৫৯, মুআসসাসাতুশ শায়েখ আবদুল আযীয বিন বায আলখায়রিয়্যাহ)
তাহলে আমরা দেখতে পেলাম, জনাব আব্দুস সালাম সাহেব কর্তৃক উদ্ধৃত শায়েখ বিন বাযের ফতোয়ার মধ্যেই ‘ইখতিলাফুল মাতালে ধর্তব্য’– এই মতের সমর্থন রয়েছে।
শায়েখ বিন বাযের যে ফতোয়ার অংশ বিশেষ উল্লেখ করে আবদুস সালাম সাহেব দাবি করলেন– ‘এটাই শায়েখের সর্বশেষ বক্তব্য’– সে ফতোয়াতেই তো শায়েখ বিন বায স্থানীয় হেলাল দেখা ধর্তব্য হওয়াকে শক্তিশালী মত বললেন। এটাই যদি শায়েখ বিন বাযের সর্বশেষ ফতোয়া হয়ে থাকে, তো দেশে দেশে যে হেলাল কমিটি হিসেবে আমল হচ্ছে, সেটাকে কি তিনি দলীলনির্ভর বললেন, নাকি গলত বললেন?! গলত তো বলেনইনি, বরং বলেছেন, আমাদের এখানে সৌদিতে সর্বোচ্চ উলামা পরিষদও এটাই গ্রহণ করেছেন এবং এটা গ্রহণ করলে উভয় দিকের দলীলের ওপর আমল হয়ে যায়।
শায়েখ বিন বায রাহ.-কে কেউ জিজ্ঞাসা করেছেন, প্রতি বছর রমযানের শুরু ও শেষে বেশ অস্থিরতা দেখা যায়। মুসলিম দেশগুলোতে মতভেদ হয়– কেউ আগে ঈদ করে, কেউ পরে। এ সমস্যার সমাধান কী?
শায়েখ বিন বায রাহ. উত্তরে বলেছেন–
الأمر واسع بحمد الله، فلكل أهل بلد رؤيتهم، كما ثبت ذلك عن ابن عباس رضي الله عنهما... وبهذا قال جماعة من أهل العلم، ورأوا أن لكل أهل بلد رؤيتهم، فإذا ثبتت في المملكة العربية السعودية مثلا، وصام برؤيته أهل الشام ومصر وغيرهم فحسن؛ لعموم الأحاديث، وإن لم يصوموا وتراءوا الهلال، وصاموا برؤيتهم، فلا بأس، وقد صدر قرار من مجلس هيئة كبار العلماء في المملكة العربية السعودية، بأن لكل أهل بلد رؤيتهم؛ لحديث ابن عباس المذكور وما جاء في معناه.
বিষয়টি আলহামদু লিল্লাহ খুবই প্রশস্ত। প্রত্যেক অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য তাদের হেলাল দেখাই ধর্তব্য হবে, যেমনটি প্রমাণিত আছে ইবনে আব্বাস রা. থেকে।
...আহলে ইলমের এক জামাত এ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ যদি সৌদিতে হেলাল দেখা প্রমাণিত হয় আর শাম ও মিশরের অধিবাসীরাও রোযা রাখেন, তাহলে তা ভালো। কারণ হাদীসসমূহ আম ও সাধারণ। আর যদি রোযা না রাখেন বরং নিজেদের এলাকার হেলাল অন্বেষণ করেন এবং নিজেদের হেলাল দেখা অনুসারে রোযা রাখেন, তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই। সৌদিয়ার ‘হাইআতু কিবারিল উলামা’ (সর্বোচ্চ উলামা পরিষদ) থেকে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, ইবনে আব্বাস রা.-এর উপরিউক্ত হাদীস এবং এর সমার্থক বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে প্রত্যেক অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য নিজেদের হেলাল দেখা ধর্তব্য। (প্রাগুক্ত : পৃ. ৮৪-৮৫)
এখানে আরও একটি ফতোয়া উদ্ধৃত করছি। তাঁর কাছে পাকিস্তান থেকে প্রশ্ন এসেছিল যে, পাকিস্তানে রমযান ও শাওয়ালের হেলাল দেখা যায় সৌদির পরে, কখনও দুই দিন পরে। এখন প্রশ্ন এই যে, আমরা কি সৌদির সাথে রোযা শুরু করব, না পাকিস্তানবাসীর সাথে।
প্রশ্নকারী পাকিস্তানে বসবাস করলেও পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন না। সম্ভবত সৌদি আরবের নাগরিক ছিলেন। শায়েখ ইবনে বায যে উত্তর দিয়েছিলেন তা নিম্নরূপ–
الذي يظهر لنا من حكم الشرع المطهر أن الواجب عليكم الصوم مع المسلمين لديكم، لأمرين : أحدهما : قول النبي صلى الله عليه وسلم : الصوم يوم تصومون، والفطر يوم تفطرون، والأضحى يوم تضحون. خرجه أبو داود وغيره بإسناد حسن، فأنت وإخوانك مدة وجودكم في الباكستان ينبغي أن يكون صومكم معهم حين يصومون، وإفطاركم معهم حين يفطرون، لأنكم داخلون في هذا الخطاب.
ولأن الرؤية تختلف بحسب اختلاف المطالع، وقد ذهب جمع من أهل العلم، منهم ابن عباس رضي الله عنهما، إلى أن لأهل كل بلد رؤيتهم.
الأمر الثاني: أن في مخالفتكم المسلمين لديكم في الصوم والإفطار تشويشا ودعوة للتساؤل والاستنكار، وإثارة للنزاع والخصام، والشريعة الإسلامية الكاملة جاءت بالحث على الاتفاق والوئام، والتعاون على البر والتقوى، وترك النزاع والخلاف، ولهذا قال تعالى: وَاعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّلَا تَفَرَّقُوۡا.
وقال النبي صلى الله عليه وسلم لما بعث معاذا وأبا موسى رضي الله عنهما إلى اليمن: بشرا ولا تنفرا وتطاوعا
ولا تختلفا.
শায়েখ এ ফতোয়ায় ঐ প্রশ্নকারীদের বলেছেন, তোমাদের বিষয়ে পবিত্র শরীয়তের বিধান আমাদের এ-ই মনে হচ্ছে যে, যাদের সাথে তোমাদের অবস্থান তাদের সাথেই তোমাদের রোযা রাখা জরুরি। এটা দুই কারণে–
এক. ঐ হাদীসের ইরশাদ, যাতে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
الصوم يوم تصومون، والفطر يوم تفطرون، والأضحى يوم تضحون.
এ কারণে তুমি ও তোমার সাথিরা যে পর্যন্ত পাকিস্তানে থাকবে, তোমাদের রোযা ও ঈদ তাদের সাথেই হওয়া চাই। কারণ তোমরা এ হাদীসের সম্বোধনে শামিল।
দুই. শায়েখ দ্বিতীয় কারণ যা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ হল– তোমরা যেখানে আছ, রোযা ও ঈদে যদি ওখানকার মুসলমানদের বিরোধিতা কর, তাহলে বিশৃঙ্খলা হবে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পথ খুলবে। ঝগড়া-বিবাদ হবে। অথচ শরীয়তের আদেশ নিজেদের একতা ও সম্প্রীতি রক্ষা করা এবং নেকী ও তাকওয়ার পথে পরস্পর সহযোগী হওয়া।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-সহ আহলে ইলমের এক জামাত যখন প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য আলাদা আলাদা হেলাল দেখার প্রবক্তা তখন পাকিস্তানের অধিবাসীরা যদি নিজেদের হেলাল দেখা অনুসরণ করে, তাহলে এটিও নেকীর কাজ। এতে তাদের সহযোগিতা করা জরুরি। ওখানে অবস্থান করে তাদের বিরোধিতা করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ তোমাদের নেই। (মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাতিম মুতানাউইয়াহ, শায়েখ ইবনে বায ১৫/১০৩-১০৪, চতুর্থ প্রকাশ ১৪২৭ হি.)
একই নির্দেশনা শায়েখ বিন বায রাহ. অন্যান্য ফতোয়াতেও প্রদান করেছেন, যা তার ওই কিতাবেই দেখা যেতে পারে। (প্রাগুক্ত : ১৫/১০০-১০২)
জনাব আব্দুস সালাম সাহেব শায়েখ বিন বাযের এই ফতোয়াগুলো উদ্ধৃত না করে শুধু একটা ফতোয়ার কিছু অংশ উদ্ধৃত করে শায়েখ বিন বাযকে নিজেদের পক্ষের হিসেবে পেশ করেছেন।
আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ.-এর ব্যাপারেও তিনি একই কাজ করেছেন। ‘মজমূয়ায়ে ফাতাওয়া মাওলানা লখনবী’ নামে খুবই সংক্ষিপ্ত একটা উর্দূ অনুবাদ থেকে কিছু ইবারত তুলে দিয়ে তাঁকেও নিজেদের পক্ষের হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
অথচ আবদুল হাই লখনবী রাহ.-এর ‘মাজমূআতুল ফাতাওয়া’ দেখুন। ‘খুলাসাতুল ফাতাওয়া’-এর সঙ্গে হাশিয়াতে এই কিতাব ছাপানো আছে। এটি তাঁর ফতোয়া সংকলন। যে ভাষায় তিনি ফতোয়া লিখেছেন, সে ভাষাতেই তা সংকলিত ও গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে এ কিতাবে। এর আবার উর্দূ অনুবাদও আছে। আব্দুস সালাম সাহেব মূল কিতাবও দেখেননি, পূর্ণ অনুবাদ গ্রন্থটাও দেখেননি। কোত্থেকে অন্য একটা অনুবাদ নিয়েছেন; খুবই সংক্ষিপ্ত একটা অনুবাদ। সেখান থেকে তিনি উদ্ধৃত করেছেন।
যেহেতু আপনি গবেষণা পেশ করছেন, তাহলে তথ্য মূল কিতাব থেকে নেওয়া উচিত নয় কি? আচ্ছা, মূল কিতাব পেলেন না, তাহলে তার পূর্ণ উর্দূ অনুবাদ গ্রন্থ আছে, সেখান থেকে নিন! তাও না করে আপনি সংক্ষিপ্ত একটা অনুবাদ থেকে কয়েক লাইন তুলে দিয়ে দাবি করে বসলেন, আবদুল হাই লখনবী রাহ. নাকি আপনাদের পক্ষে!
অথচ আপনাদের পক্ষে হওয়া তো সম্ভবই নয়। আপনারা যেভাবে বলেন, সেভাবে তো তিনি ওই ফতোয়ার মধ্যেও বলেননি! কিন্তু তাঁর দালীলিক আলোচনা সমৃদ্ধ বিস্তারিত তিন-চারটা ফতোয়া আছে, যেখানে তিনি বলেছেন, প্রত্যেক অঞ্চল যার যার দেখা অনুসারে আমল করবে। এটা হল– أصح المذاهب
সর্বাধিক সহীহ মাযহাব।
এটাকে আরেক জায়গায় বলেছেন–
مذھب معتمد
নির্ভরযোগ্য মাযহাব।
আরেক জায়গায় বলেছেন, এটা অধিকাংশ ফকীহের ফতোয়া। (দেখুন :
মাজমূআতুল ফাতাওয়া, আবদুল হাই লখনবী রাহ., খ. ১, পৃ. [যথাক্রমে] ২৫৬, ২৭১ ও ২৬৪, খুলাসাতুল ফাতাওয়ার সঙ্গে মুদ্রিত নুসখা)
জনাব আব্দুস সালাম সাহেব আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ.-এর এই ফতোয়া তিনটি একদমই উল্লেখ করেননি। যে মাযহাবকে হযরত রাহ. ‘আসাহ’ তথা সর্বাধিক সহীহ বলেছেন, ‘মু‘তামাদ’ বলেছেন এবং ‘অধিকাংশ ফকীহের মাসলাক’ বলেছেন এবং তিন তিনটি ইস্তেফতার জবাবে ওই অনুযায়ীই ফতোয়া দিয়েছেন, সেটিই বেমালুম চেপে গেছেন! আব্দুস সালাম সাহেব এসবকিছু বাদ দিয়ে কেবল একটা কথা উল্লেখ করে দাবি করে বসেছেন, আবদুল হাই লখনবী রাহ. নাকি তাদের পক্ষে! আলেমরা নাকি আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ.-এর ফতোয়া গ্রহণ করছেন না!
আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ. আর শায়েখ বিন বায রাহ.-এর বিষয়টা তো দেখলেন।
তাদের উদ্ধৃত আরেকটি হাওয়ালা দেখুন, ‘ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া’। তালিবুল ইলম ভাইয়েরা জানেন, মাহমুদুল হাসান গঙ্গুহী রাহ.-এর জন্ম ১৩২৫ হিজরীতে এবং ইন্তেকাল ১৪১৭ হিজরী মোতাবেক ১৯৯৬ সালে। তাঁর ফতোয়ার কিতাব হল ‘ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া’। অনেক খণ্ডের কিতাব।
আশ্চর্যের কথা হল, এই মাহমুদুল হাসান গঙ্গুহীকে তারা মনে করেছেন শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ.। শাইখুল হিন্দ হলেন মাহমুদ হাসান আর ইনি হলেন মাহমুদুল হাসান। তো তারা মাহমুদ হাসান শাইখুল হিন্দ, যার ইন্তেকাল ১৩৩৯ হিজরীতে, তাঁর পরিচয় লাগিয়ে দিচ্ছেন মাহমুদুল হাসান গঙ্গুহীর জন্য, যার ইন্তেকাল ১৪১৭ হিজরীতে। কোথায় ১৪১৭ হিজরী আর কোথায় ১৩৩৯ হিজরী! কিন্তু তারা ১৩৩৯ হিজরীর ব্যক্তিকে নামিয়ে দিচ্ছেন ১৪১৭ হিজরীতে ইন্তেকালকারী ব্যক্তির স্তরে। তবে কথা উদ্ধৃত করছেন ১৪১৭ হিজরীতে ইন্তেকালকারী মাহমুদুল হাসান গঙ্গুহী রাহ.-এরই।
আরও আশ্চর্যের কথা হল, যে ফতোয়া তারা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে দস্তখত হল ১৩৫৮ হিজরীর। এই ফতোয়া লাগিয়ে দিচ্ছে এমন ব্যক্তির নামের সাথে, যার ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছে ১৩৩৯ হিজরীতে! অর্থাৎ ১৩৩৯ হিজরীতে যাঁর ইন্তেকাল হয়ে গেছে, তার নামে আমাদের কাছে ফতোয়া পেশ করছে, যেই ফতোয়া লেখা হয়েছে ১৩৫৮ হিজরীতে! এই হল তাদের গবেষণা!
যাইহোক, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়াতে উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য, ধর্তব্য নয়, উভয় রকম আছে। অবশ্য তিনি–
لا عبرة لاختلاف المطالع
–মত গ্রহণ করেছেন এবং সেটার পক্ষে বেশি লিখেছেন। কিন্তু তিনি আবার এটাও বলেছেন যে, মূল হল নিজের এলাকার হেলাল দেখা। তিনি বলেছেন–
اصل یہ ہے کہ ہر شہر والے اپنے اپنے مطلع کے مکلف ہیں جیسے کہ اوقات نماز کا حال ہے، ایسے ہے صوم وافطار کا حال ہے...
(দ্র. ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, খ. ১৫, পৃ. ৬৭-৬৮, প্রকাশক : মাকতাবায়ে মাহমুদিয়া, প্রকাশকাল : ১৪৩০/২০০৯)
আফসোস! জনাব আব্দুস সালাম সাহেব এ গুরুত্বপূর্ণ কথাটিই উল্লেখ করেননি।
শরহু মুখতাসারিল কারখী প্রসঙ্গ
হযরত খতীব ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা-ঈদ পালন করার মতের প্রবক্তা, তাদের সাথে ২০১৭ সালে আমাদের বসা হয়েছিল। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বসার ব্যবস্থা করেছিল। উক্ত মজলিসে যেসমস্ত উদ্ধৃতি পেশ করেছি, তাতে আমরা বলেছিলাম, ইমাম কুদূরী রাহ. ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’তে বলেছেন, অনেক দূরে হেলাল দেখা গেলে সেটা আমাদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।’
এরপর হযরত উক্ত কিতাবের সংশ্লিষ্ট খণ্ডটি উচু করে সবাইকে দেখিয়ে বলেন, দেখুন! আমার হাতে ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’ কিতাবের কপি আছে। ইমাম আবুল হুসাইন কুদূরী রাহ. ‘মুখতাসারুল কারখী’-এর শরাহ লিখেছেন। যার পুরো নাম হল– ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী লিল ইমামিল কুদূরী’। ইমাম কুদূরী রাহ.-এর ইন্তেকাল ৪২৮ হিজরীতে।
ফাউন্ডেশনে তাদের সাথে যখন মজলিস হয়, তখন কিতাবটি পাণ্ডুলিপি আকারে ছিল। আমরা তখন পাণ্ডুলিপি থেকেই প্রিন্ট করে সেখানে উদ্ধৃতি পেশ করেছিলাম। কিন্তু এখন আলহামদু লিল্লাহ, ৯ খণ্ডে কিতাবটি ছেপে এসেছে।
পরবর্তীতে তারা করলেন কী?! অপপ্রচার শুরু করলেন– আমরা নাকি বলেছি, ‘মুখতাসারুল কুদুরী’র মধ্যে ইমাম কুদুরী বলেছেন...! অথচ ‘মুখতাসারুল কুদূরী’ আলাদা কিতাব, ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’ আলাদা কিতাব। একই লেখকের দুইটি আলাদা আলাদা কিতাব।
‘মুখতাসারুল কুদূরী’ আমাদের মাদরাসাগুলোতে পড়ানো হয়, আমাদের নেসাবভুক্ত কিতাব। সব ছাত্ররা পড়ে। সেখানে এই মাসআলা নেই। পক্ষেও নেই, বিপক্ষেও নেই।
এই মাসআলা আছে একই লেখকের দীর্ঘ ও বড় একটি কিতাব ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’র মধ্যে। সেখানে ইমাম কুদূরী রাহ. বলেন–
وَهذَا إِذَا كَانَ بَيْنَ البَلَدَيْنِ تَقَارُبٌ لَا تَخْتَلِفُ فِيهِ مَطَالِعُ الهِلَالِ. فَأَما إِذَا بَعُدَ أَحَدُ البَلَدَيْنِ مِنَ الآخَرِ بُعْدًا كَثِيرًا، لَمْ يَلْزَمْ أَهْلَ أَحَدِ البَلَدَيْنِ حُكْمُ الْآخَرِ؛ لِأَن مَطَالِعَ البِلَادِ تَخْتَلِفُ.
এটা আপনি ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’র দ্বিতীয় খণ্ডের ৩৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় দেখে নিতে পারেন। ২০১৭ সালে আমরা তখন পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন উনারা আমাদের নামে অপপ্রচার করেন। তাদের প্রস্তুতকৃত শারঈ ফাতওয়ার মধ্যে এবং ভিডিও আলোচনাতেও সবাইকে দেখান যে– দেখুন, তারা বলে, ইমাম কুদূরীর কিতাবে আছে, আসলে নেই!’ ‘মুখতাসারুল কুদূরী’তে তো নেই, ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’তেও নেই। তার পরও বলে দিয়েছে আছে!...
কিন্তু ভাইয়েরা আমার! আপনারা সবাই এখন দেখলেন যে, ইমাম কুদূরী রাহ.-এর ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’তে উক্ত উদ্ধৃতিটি আছে। কিন্তু তাঁদের সমস্যা হল, তাঁরা হয়তো ‘শরহু মুখতাসারিল কারখী’ যে ইমাম কুদুরীর কিতাব, সেটাই হয়তো জানেন না বা কিতাবটিই দেখেননি। কিংবা অন্য কী ঘটেছে, আল্লাহ্ই ভালো জানেন! কিন্তু এখন আমরা হাতেনাতে দেখিয়ে দিলাম যে, ইমাম কুদূরীর কিতাবে আছে।
মজার কথা হল, ইমাম কুদূরীর একথা আরও অনেক কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে। কমপক্ষে ৮/১০ কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু এখন তারা বলে কী, মূলেই যখন নাই, তো অন্যরা উদ্ধৃত করলে আর কী লাভ?!
আরে, উদ্ধৃতি পেশকারীরা যদি নির্ভরযোগ্য হন এবং তার উদ্ধৃতি ভুল হওয়ার কোনো দলীল না থাকে, তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে আপনি সেটা কীভাবে উড়িয়ে দেবেন?
ইমাম কুদূরীর বক্তব্য আমরা যদি নির্ভরযোগ্য ওই ৮/১০ কিতাবের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করতাম, তবুও তা শাস্ত্রীয় বিচারে সঠিক হত। তাতে আপত্তির কিছু থাকত না। কিন্তু আমরা তো উদ্ধৃতিটি একেবারে সরাসরি মূল কিতাব থেকে দেখিয়েছি। সেটি যে আরও অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবেও উদ্ধৃত হয়েছে, তাও দেখিয়েছি। এর পরও তাদের একই কথা– ‘কোথাও নাই, কোথাও নাই...!!
ছাপানো কিতাবে আছে, পাণ্ডুলিপিতে আছে, কিন্তু তারপরও তারা বলছেন– নাই! নাই!!
নিজেদের তো খবরই নেই, এমনকি যারা এর উদ্ধৃতিতে বলেছেন, তাদের কথাও উড়িয়ে দিচ্ছেন। কত বড় স্পর্ধা! যে কথা ইমাম কুদুরীর কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, সেটার ব্যাপারেই বলছে যে, হাজারজনও যদি বলে থাকেন যে, ইমাম কুদূরী একথা বলেছেন, কারও কথা গ্রহণযোগ্য নয়! বলুন, নাউযুবিল্লাহ।
আলমুহীতুল বুরহানী প্রসঙ্গ
আচ্ছা, আরেকটা বিষয় দেখুন, ‘আলমুহীতুল বুরহানী’। এটা ২৫ খণ্ডের কিতাব। তার ৩ নম্বর ভলিউমটা এখন আমার হাতে। এখানে সওমের আলোচনায় এই মাসআলা আছে– অন্য অঞ্চলের হেলাল ধর্তব্য হবে কি না?
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মজলিসে আমরা এর উদ্ধৃতি পেশ করেছিলাম। একটা প্রসিদ্ধ কথা আছে– ‘লা ইবরাতা লিখতিলাফিল মাতালি ফী যাহিরির রিওয়ায়াহ’। সেটার প্রসঙ্গে আমরা বলেছি যে, এই কিতাব থেকেও বোঝা যায়, এটা যদি ‘যাহিরুর রিওয়ায়াহ’ হত, তাহলে তিনি যাহিরুর রিওয়ায়াতের আলোচনা অবশ্যই করতেন; কিন্তু তিনি তা করেননি। সেখানে নাদিরুর রিওয়ায়াতের আলোচনাই আছে। ওইভাবে আমরা এই কিতাবের ইবারত উদ্ধৃত করে দিয়েছি এবং আমরা বলেছি, এটা করাচির ‘ইদারাতুল কুরআনে’র প্রকাশনা। ইদারাতুল কুরআন কিতাবটি বৈরুত থেকে ছাপিয়েছে। এই এডিশনের খণ্ড ও পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখসহ আমরা উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। আমাদের উদ্ধৃতি এই কিতাবের হুবহু মুওয়াফিক। একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিল আছে।
দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ ও পাণ্ডুলিপি তুলনা
কিন্তু তারা করলেন কী?! আমরা যে এডিশনের উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেই এডিশন না নিয়ে অন্য আরেকটা এডিশন তথা দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহর এডিশন নিয়েছেন। উলামায়ে কেরাম জানেন, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুতের প্রকাশনীগুলোর মধ্যে একটি দুর্বল প্রকাশনী। যার প্রকাশনার মধ্যে নির্ভরযোগ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। তবে তাদের প্রকাশিত কিতাবের সংখ্যা অনেক। কিতাব ছেপেছে অনেক। কিন্তু নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে সেই অনুযায়ী কিতাব ছাপানোর অভ্যাসটা তাদের অনেক কম। একটা পাণ্ডুলিপি পেয়ে গেছে, ব্যস, মান যেমনই হোক, ওটা কম্পোজ করে ছেপে দিয়েছে। এটা দারুল কুতুবিল-ইলমিয়্যাহর একটা অভ্যাস। মুহাক্কিক আলেমরা তো বিষয়টি জানেনই; আজকাল মাদরাসার অনেক তালিবে ইলমও জানে।
এই দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহর এডিশনটা তারা সামনে নিয়েছেন। নিয়ে বললেন যে, দেখেন দেখেন, এখানে শুরুতে দুই লাইন আছে, এই দুই লাইন হুজুররা হযফ (মুছে) করে দিয়েছে, বাদ দিয়ে দিয়েছে...!
অথচ ঐ দুই লাইনের মধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে কিছুই নেই, তাদের পক্ষেও অতিরিক্ত কোনো দলীল নেই।
কিন্তু তারা বলেছেন, আমরা নাকি ইচ্ছা করেই ওই দুই লাইন বাদ দিয়ে দিয়েছি, নাউযুবিল্লাহ। অথচ আমরা ইদারাতুল কুরআনের এডিশন থেকে নিয়েছি, যেভাবে আমরা উদ্ধৃত করেছি, সেখানে সেভাবেই আছে। তারা যে দুই লাইনের কথা বলছে, ওটাতে তাদের কোনো ফায়েদা নেই। তার পরও কথা হল সেটা আছে শুধু দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহর এডিশনে, যাদের প্রকাশনার মান তেমন নির্ভরযোগ্য নয়।
কথা এখানেই শেষ নয়। দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহর কাছে মাত্র একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। হালাবের (আলেপ্পোর) আহমদিয়া মাকতাবার শুধু একটা পাণ্ডুলিপি থেকে তারা কিতাবটি ছেপেছে। আর ইদারাতুল কুরআন থেকে প্রকাশিত যে কপির উদ্ধৃতি আমরা দিয়েছি, ৫টা পাণ্ডুলিপি থেকে এই কপি ছাপানো হয়েছে। এই ৫ পাণ্ডুলিপির মধ্যে ওই দুই লাইন নেই। সেজন্য ইদারাতুল কুরআনের এডিশনে এই দুই লাইনের উল্লেখ নেই। এখন ৫ পাণ্ডুলিপিতে যে কথা সেটা অধিক গ্রহণযোগ্য, নাকি এক পাণ্ডুলিপিরটা?
কথা এখনও শেষ হয়নি! ইদারাতুল কুরআন-এর কাছে ছিল পাঁচটি পাণ্ডুলিপি। আমরা আরও ১৫ টি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছি। যেগুলোর মধ্যে ওই পাণ্ডুলিপিও আছে, যা আলমুহীতুল বুরহানীর সংকলক ও রচয়িতার জীবদ্দশাতেই অনুলিখন করা হয়েছে। কে অনুলিখন করেছেন, কোন্ ফকীহ, তাঁর নাম আছে, কোন্ তারিখে করা হয়েছে, সেটাও লেখা আছে।
এমন নির্ভরযোগ্য একাধিক পাণ্ডুলিপি, বরং এরকম ১৫ আর ইদারাতুল কুরআনের ৫টি, মোট ২০টি পাণ্ডুলিপির মধ্যে ওই দুই লাইন নেই। শুধু একটা পাণ্ডুলিপিতে ওই দুই লাইন আছে, যেখান থেকে দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ কপি করেছে।
এখন ২০ পাণ্ডুলিপিতে যা আছে সেটা যারা পেশ করেছে তারা ভুল করল, না তোমরা ভুল করলে?
আশা করি, পাঠক বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন!
(তারপর হযরত ট্যাব থেকে একটি পাণ্ডুলিপির সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার ছবি সবাইকে দেখিয়ে দেন।)
আমাদের সহপাঠী মুফতী রহীমুদ্দীন সাহেবের ছেলে মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী। মাশাআল্লাহ, পাণ্ডুলিপির জগতের সাথে তার বেশ ভালো পরিচয়। ভাতিজাকে বলেছি, তুমি একটু পাণ্ডুলিপিগুলো আমাকে সংগ্রহ করে দাও। সে অল্প সময়েই ২০টি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে মুসান্নিফের জীবদ্দশায় লেখা পাণ্ডুলিপিও আছে। মুসান্নিফ ইন্তেকাল করেছেন ৬১৬ হিজরীতে। আর ৫৮৭ হিজরীর দিকে লেখা পাণ্ডুলিপিও আছে আমাদের কাছে। সেই পাণ্ডুলিপির মধ্যে এই লাইনদুটি নেই।
[আলোচক কর্তৃক সংযোজিত ও পরিমার্জিত]
(চলবে ইনশাআল্লাহ)