একটি আয়াত একটি বার্তা : সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যারা
বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয় এক পুণ্যময় রজনী। জুমার দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে সেই বরকতময় আবেশ; মাঝে আছে জুমার পবিত্র ক্ষণ। এই পুরো সময়টাই অত্যন্ত বরকত ও তাৎপর্যপূর্ণ। এর যে-কোনো এক লগ্নে একটি আমল করে প্রভূত কল্যাণ ও সৌভাগ্য লাভ করা সবার জন্যই সহজ।
বলছিলাম সূরা কাহফ তিলাওয়াতের ফযীলতের কথা। আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন–
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، أَضَاءَ لَه مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَه وَبَيْنَ الْبَيْتِ الْعَتِيقِ. (إسناده صحيح)
যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জায়গা থেকে বাইতুল্লাহ পর্যন্ত আলো জ্বলজ্বল করতে থাকবে। –ফাযায়েলে কুরআন, কাসেম ইবনে সাল্লাম, পৃ. ২৪৪; ফাযায়েলে কুরআন, মুস্তাগফিরী, বর্ণনা ২১১; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, বর্ণনা ২৪৪৪; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৩/২৪৯ (১)
সেদিন রাত পেরিয়ে দিন ফুরাতে চলল, অথচ কিছুটা ব্যস্ততা, কিছুটা অবহেলা ও বিস্মৃতির কারণে আমলটি তখনও করা হয়নি। বায়তুল মোকাররমে জুমার নামায আদায়ের সুযোগ হয়েছিল। নামায শেষে মাদরাসায় ফেরার পথে হঠাৎ মনে পড়ল, আজ তো সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা হয়নি! গাড়িতে বসেই তিলাওয়াত শুরু করে দিলাম।
তিলাওয়াত প্রায় শেষের দিকে। হঠাৎ একটি আয়াত ভীষণভাবে নাড়া দিল।
আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে রয়েছে মর্মস্পর্শী এক বার্তা–
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْاَخْسَرِیْنَ اَعْمَالًا، اَلَّذِیْنَ ضَلَّ سَعْیُهُمْ فِی الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا وَهُمْ یَحْسَبُوْنَ اَنَّهُمْ یُحْسِنُوْنَ صُنْعًا.
(হে নবী!) আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব, কর্মে কারা সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা সেসব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সমস্ত দৌড়ঝাঁপ সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, অথচ তারা মনে করে তারা খুবই ভালো কাজ করছে। –সূরা কাহফ (১৮) : ১০৩-১০৪
ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেলাম! আমল তো ঠিকঠাক করতেও পারি না; যেটুকু করা হচ্ছে, কবুল হচ্ছে তো? আয়াতের বার্তা বড় ভয়াবহ! কিছু মানুষের চেষ্টা মেহনত সবই বৃথা যায়, অথচ নিজেদের ধারণা– তারা অনেক নেক আমল ও সৎকাজ করে! আল্লাহ হেফাযত করুন! যেমন আমল করলে তা কবুল হবে, তিনি সন্তুষ্ট হবেন, তেমন আমল করার তাওফীক দান করুন!
ইবনে কাসীর রাহ. উক্ত আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন, শরীয়ত অনুমোদিত নয়, এমন পন্থায় যারাই যে-কোনো কাজ করবে, তাদের জন্যই এই আয়াতের পয়গাম। তাদের আমল কবুল হবে না। শরীয়তবিরোধী পন্থায় ধর্মীয় কাজ করে কেউ যদি ধারণা করে যে, সঠিক করছে, তাহলে সে ভুলের ওপর আছে এবং তার আমল প্রত্যাখ্যাত। (দ্র. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৫/২০২)
কাজেই আমল করতে হবে ইখলাসের সাথে, খাঁটি নিয়তে, একমাত্র আল্লাহর জন্য। শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য।
হয়তো দ্বীনী কোনো কাজই করা হচ্ছে, দান-খয়রাত, সেবা ও সামাজিক কাজ, অথচ নিজের মধ্যে ঈমান নেই, নিজেই কুফর বা শিরকে লিপ্ত, তাহলে ওইসব কাজ আখেরাতে কোনো কাজে আসবে না। কারণ ঈমান সবার আগে। সবকিছুর পূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশুদ্ধ ঈমান আনতে হবে এবং আখেরাতের বিশ্বাস থাকতে হবে। অন্যথায় সব বাতিল হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন–
وَالَّذِیْنَ كَفَرُوْۤا اَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِیْعَةٍ یَّحْسَبُهُ الظَّمْاٰنُ مَآءً حَتّٰۤی اِذَا جَآءَهٗ لَمْ یَجِدْهُ شَیْـًٔا وَّ وَجَدَ اللهَ عِنْدَهٗ فَوَفّٰىهُ حِسَابَهٗ وَاللهُ سَرِیْعُ الْحِسَابِ.
আর যারা কাফের তাদের কর্মগুলো মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে পিপাসার্ত লোক মনে করে পানি, অবশেষে যখন সে তার কাছে পৌঁছে, তখন বুঝতে পারে, তা কিছুই নয়। সেখানে সে আল্লাহকে পায়। আল্লাহ তার হিসাব পরিপূর্ণরূপে চুকিয়ে দেন। আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহীতা। –সূরা নূর (২৪) : ৩৯
আল্লাহর নিকট কোনো আমল কবুল হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত যেহেতু ঈমান, তাই যার ঈমান নেই, সে যত ভালো কাজই করুক, আখেরাতে এর বিনিময়ে সে কিছুই পাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন–
وَقَدِمْنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰهُ هَبَآءً مَّنْثُوْرًا.
তারা (দুনিয়ায়) যা-কিছু আমল করেছে, আমি তার ফয়সালা করতে আসব এবং সেগুলোকে শূন্যে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি (-এর মতো মূল্যহীন) করে দেব। –সূরা ফুরকান (২৫) : ২৩
আল্লাহ তাআলা সমস্ত বাতিলপন্থিদের কর্মের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন ছাইয়ের সঙ্গে। ঝড়ের সময় বাতাসে ছাই যেমন উড়ে যায়, তেমনি কাফেরদের কুফর তাদের ভালো কাজগুলোকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ইরশাদ হয়েছে–
مَثَلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ اَعۡمَالُہُمۡ کَرَمَادِۣ اشۡتَدَّتۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ یَوۡمٍ عَاصِفٍ لَا یَقۡدِرُوۡنَ مِمَّا کَسَبُوۡا عَلٰی شَیۡءٍ ذٰلِکَ ہُوَ الضَّلٰلُ الۡبَعِیۡدُ.
যারা নিজ প্রতিপালকের সাথে কুফরী কর্মপন্থা অবলম্বন করেছে, তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্ম সেই ছাইয়ের মতো, প্রচণ্ড ঝড়ের দিনে তীব্র বাতাস, যা উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা যা কিছু উপার্জন করে, তার কিছুই তাদের হস্তগত হবে না। এটাই তো চরম বিভ্রান্তি। –সূরা ইবরাহীম (১৪) : ১৮
আবার কোনো দ্বীনী কাজও যদি সুন্নত তরীকায় করা না হয় বা করতে গিয়ে যদি শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে সেটাও আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তা আখেরাতে কোনো কাজে আসবে না।
সূরা কাহফের উল্লিখিত আয়াতে রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়গাম। কোনো কাজ গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কেবল সহীহ নিয়তই যথেষ্ট নয়; বরং আগে কাজটা সহীহ হতে হবে, আবার তার পদ্ধতিও সঠিক হওয়া আবশ্যক! অনেক সময় দ্বীনের নামে কোনো কাজ করা হয়, কিন্তু কাজটিই শরীয়তসম্মত নয়; বরং মনগড়া, অথবা করা হচ্ছে শরীয়ত-সুন্নত বিরোধী তরীকায়, তখন নিয়ত সহীহ হওয়া সত্ত্বেও পণ্ডশ্রম হয় এবং সমস্ত কর্মই বিফলে যায়।
বিখ্যাত বুযুর্গ ফুযাইল ইবনে ইয়ায রাহ. বলেন–
إن العمل إذا كان خالصا ولم يكن صوابا لم يقبل، وإذا كان صوابا ولم يكن خالصا لم يقبل، حتى يكون خالصا صوابا.
কোনো আমল যদি ইখলাসপূর্ণ হয়, কিন্তু সঠিক না হয়, তবে তা কবুল হবে না। আবার যদি আমল সঠিক হয়, কিন্তু ইখলাসপূর্ণ নয়, তখনও কবুল হবে না; যতক্ষণ না আমলটি ইখলাসপূর্ণ ও সঠিক হয়। অর্থাৎ উভয় শর্ত একসাথে পাওয়া যায়। –আলইখলাসু ওয়ান নিয়্যাহ, ইবনু আবিদ দুনইয়া, পৃ. ৫০; হিলইয়াতুল আউলিয়া ৮/ ৯৫
তবে কোনটি সঠিক, কোন পন্থা সঠিক তা নির্ণয় হবে কীভাবে? নির্ণয়ের জন্য রয়েছে নবীজীর সুন্নাহ। নবীজীর সুন্নাহ অনুযায়ী হলেই সঠিক, অন্যথায় নয়।
ফুযাইল ইবনে ইয়ায রাহ. বলেন–
والخالص إذا كان لله والصواب إذا كان على السنة.
অর্থাৎ আমল তখনই খাঁটি ও ইখলাসপূর্ণ হয়, যখন তা একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয় এবং তখনই ‘সঠিক’ গণ্য হয়, যখন তা সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। –প্রাগুক্ত
কাজেই আমাদের প্রত্যেকটি ইবাদত ও নেক আমল সুন্নত তরীকায় ও শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় করা উচিত।
প্রসঙ্গত, একটি দ্বীনী আমল হল দাওয়াত ইলাল হক্ব ও তাবলীগে দ্বীন। মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা এবং মানুষের কাছে সহীহ দ্বীন পৌঁছে দেওয়া।
এ বিষয়ে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারকাতুহুম বলেন–
‘সহীহ কথাটিও সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় হওয়া শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কাজেই যা বলব ও লিখব, সহীহ নিয়তে বলব, সহীহ নিয়তে লিখব। বিষয় তো হক হতেই হবে– তা বলার অপেক্ষা রাখে না এবং এটি এক নম্বর শর্ত। কিন্তু যা বলব বা লিখব, আমার হক ও সহীহ কথার উপস্থাপনও ন্যায়সম্মত হতে হবে, ইনসাফের সাথে হতে হবে। মার্জিত ভাষায় হতে হবে। ভুল বলব না, না জেনে বলব না, অর্ধেক জেনেও বলব না এবং অন্যায় বলব না।’ (জুমার বয়ান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ : ১৮ যিলহজ্ব ১৪৪৭ হি./৫ জুন ২০২৬ ঈ.)
কাজেই আমার প্রতিদিনের আমল ও দাওয়াতী কাজ তথা সবকিছু যেন ইখলাসপূর্ণ ও সুন্নাহসম্মত পন্থায় হয়।
আল্লাহ তাআলাই তাওফীক দেওয়ার মালিক। ·
টীকা
১. এই আছারটি ‘মারফূ হুকমী’তথা বাহ্যত এটি আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর বক্তব্য হলেও মূলত এটি নবীজীর হাদীস।
হাফেজ দিমইয়াতী রাহ. বলেন–
وإن كان موقوفا فمثله مثل المرفوع، لأن مثل هذا لا يقال من قبل الرأي والاجتهاد، والله أعلم.
এই বর্ণনাটি যদিও ‘মাওকূফ’; কিন্তু এজাতীয় ‘‘মাওকূফ’ বর্ণনা ‘মারফূ’-এর হুকুমে। কারণ এমন ফযীলতের কথা নিজ মতামত বা ইজতিহাদের ভিত্তিতে বলা যায় না। –ফাতহুল কারীবিল মুজীব আলাত তারগীব ওয়াত তারহীব, খ. ৪, পৃ. ৭১৯