একই দিনে সারা বিশ্বে রোযা ও ঈদ পালন করার মতবাদ
‖ একটি দলীলবিহীন মতবাদ
‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন-২য় কিস্তি
গত মে মাসের ০৯ তারিখে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন রমনা’য় ‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে দেশের দ্বীনী বিভিন্ন ঘরানার প্রতিনিধি আলেমগণ অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন মাসিক আলকাউসারের গত সংখ্যায় (যিলহজ্ব ১৪৪৭ হি.) প্রকাশিত হয়েছে।
বায়তুল মোকাররমের সম্মানিত খতীব হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক দামাত বারাকাতুহুম উক্ত সেমিনারে যে সারগর্ভ আলোচনা পেশ করেছেন তার একাংশ গত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে নিজ এলাকার হেলাল দেখে চান্দ্রমাস শুরু হত। হেলাল দেখা না গেলে মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করে পরবর্তী মাস শুরু করা হত। কোনো সাক্ষী এসে যদি বলত, আমরা হেলাল দেখেছি, সেই সাক্ষ্য অনুযায়ী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমল করেছেন এবং আমল করতে বলেছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকটবর্তী এলাকার সাক্ষ্য দেরিতে এলেও তা গ্রহণ করেছেন। অনেক দূরবর্তী এলাকা থেকে নবীজীর কাছে হেলালের সাক্ষ্য আসার কোনো ঘটনা আমাদের জানামতে ঘটেনি। কিন্তু সাহাবা যুগে এমন ঘটনা ঘটেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মদীনায় ছিলেন। তাঁর কাছে শামে হেলাল দেখা যাওয়ার খবর এসেছে। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি এবং বলেছেন নবীজীর নির্দেশ আমাদের প্রতি এমনই।
পাহাড় ঘেরা এক এলাকার কিছু লোক আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর কাছে এসে বলল, আমরা পাহাড় ঘেরা এলাকায় বাস করি। তাই অন্যরা যখন হেলাল দেখে, তখন আমরা হেলাল দেখি না। উমর রা. তাদেরকে অন্য এলাকার হেলালের খোঁজ রাখতে বলেননি। সতর্কতার কথা বলে এক দিন আগে রোযা রাখার কথাও বলেননি; বরং বলেছেন, তোমরা হেলাল দেখা অনুযায়ী আমল কর; হেলাল দেখা না গেলে ত্রিশ দিন পূর্ণ করে পরের মাস শুরু কর।
খতীব ছাহেব আরও বলেন, উমর রা. ও ইবনে আব্বাস রা. যে মত গ্রহণ করেছেন, এটি শুধু তাদের দুইজনের মত নয়; বরং এটি সকল সাহাবায়ে কেরামের মত। সাহাবায়ে কেরামের যুগে এর বিপরীতে কোনো একটা উদ্ধৃতি ওই ভাইদের কাছে নেই, যারা আজ এক দেখার মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে ঈদ করাতে চাচ্ছেন! সর্বপ্রথম হেলাল দেখা অনুযায়ী ঈদ করা ফরয দাবি করছেন!’
হযরতের গুরুত্বপূর্ণ বয়ানের যতটুকু অংশ গত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এ বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। অবশিষ্ট আলোচনার কিছু অংশ হযরতের সংযোজন ও পরিমার্জনসহ এ সংখ্যায় পেশ করা হচ্ছে।
আমাদের দেশে যারা পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা-ঈদ করার নবসৃষ্ট মতের প্রবক্তা, তারা–
يَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ
–আয়াতটি তাদের মতের পক্ষে পেশ করে থাকেন। অথচ আয়াতে হেলালের কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে এই ভাইয়েরা মাস শুরু করতে চায় কনজাঙ্কশন থেকে। এ প্রসঙ্গে তারা “রোজা, ঈদ, কুরবানীসহ চাঁদের তারিখ নির্ভর সকল ইবাদাত বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের একই চান্দ্রতারিখ ও একই দিনে পালন সম্পর্কিত তাফসীর, হাদীস ও ফিকহের ১৩৬ খানা গ্রন্থের শার‘ঈ ফাত্ওয়া”তে বিভিন্ন তাফসীরের কিতাব থেকে বিভিন্ন ইবারত উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তাতে তাদের নতুন নতুন দাবিগুলোর কোনো কিছুই নেই। প্রশ্ন হল, আপনারা এইসব ইবারত কেন পেশ করছেন! আপনারা এই আয়াতের ওপর যেসব অদ্ভুত কথা (বরং বলতে হয় উদ্ভট কথা) চাপিয়ে দিচ্ছেন, পারলে সেগুলোর উদ্ধৃতি দেখান। কোন্ মুফাসসির বলেছেন– এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা লুনার ক্যালেন্ডার দেখে রোযা-ঈদ করার কথা বলেছেন– সেটা দেখান! নিউ মুন (কনজাঙ্কশন) থেকে মাস শুরু করতে হবে অথবা ‘সর্বপ্রথম দেখা অনুযায়ী রোযা-ঈদ করা সবার ওপরে ফরয’– এমন কথা কোন্ মুফাসসির বলেছেন– তা দেখান! আপনার যা দাবি, তাফসীরের কিতাব থেকে তা বের করুন। সেটা তো এই কিতাবগুলোতে নেই; বরং তার বিপরীতে রয়েছে অনেক অনেক উদ্ধৃতি। তাদের কিতাবে তারা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সর্বপ্রথম উদ্ধৃতি এনেছেন রূহুল মাআনী থেকে। অথচ সেই কিতাবে এই আয়াতের অধীনেই লেখক আলূসী রাহ. বলেছেন–
لأن الصوم مقرون برؤية الهلال، وكذا الإفطار، ولذا قال النبي صلى الله عليه وسلم: صُوْمُوا لِرُؤْيَتِه وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِه.
অর্থাৎ রোযা রাখা ও ঈদ করা হেলাল দেখার সাথে যুক্ত। কারণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা হেলাল দেখে রোযা রাখো, হেলাল দেখে ঈদ করো। –তাফসীরে রূহুল মাআনী, খ. ২, পৃ. ৭২, মাকতাবায়ে এমদাদিয়া মুলতান
তাদের সামনে এ কথাগুলো থাকা সত্ত্বেও তারা তা উদ্ধৃত করেননি।
আলূসী রাহ.-এর অন্য একটি কিতাব–
غرائب الاغتراب ونزهة الألباب
-এ ‘ইখতিলাফুল মাতালে’-এর আলোচনা আছে। সেখানে তিনি বলেছেন–
وإنكار اختلاف المطالع أظهر مكابرة من إنكار اختلاف الأصابع... نعم، اختلف في اعتبار ذلك الاختلاف شرعا في نحو الصوم، فذهب كثير من الحنفية مع إقرارهم بوجوده إلى عدم اعتباره، فيلزم عندهم أهل المغرب الصوم برؤية أهل المشرق هلال شهر رمضان. والحق اعتباره.
এই ইবারতের সারসংক্ষেপ হল, উদয়স্থলের ভিন্নতাকে অস্বীকার করা চরম পর্যায়ের হঠকারিতা। হাঁ, রোযা-ঈদ ইত্যাদি বিষয়ে শরয়ী বিধানে এ ভিন্নতা ধর্তব্য কি না– এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক হানাফী ফকীহ উদয়স্থলের ভিন্নতার বাস্তবতাকে স্বীকার করেও (শরয়ী বিধানে) তা ধর্তব্য নয় বলে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, পূর্বের লোকদের রমযানের হেলাল দেখার দ্বারা পশ্চিমের লোকদের ওপর রোযা রাখা আবশ্যক হবে। কিন্তু হক কথা হল, (শরয়ী বিধানে) উদয়স্থলের ভিন্নতার ধর্তব্য আছে। –গারাইবুল ইগতেরাব ওয়া নুযহাতুল আলবাব, আলুসী রাহ. পৃ. ৪৬১, প্রকাশক, দারুল আরাবিয়্যাহ।
এরকমভাবে আমরা তাদের উল্লেখকৃত কিতাবসমূহ থেকে অনেক উদ্ধৃতি দেখাতে পারব, যা তাদের দাবির বিপরীত।
দ্বিতীয় কথায় আসি। এই ১৩৬ কিতাবের উদ্ধৃতির মধ্যে তাদের নতুন দাবিগুলোর উল্লেখ নেই। তাদের দাবি– সর্বপ্রথম দেখা অনুযায়ী আমল করা পুরো পৃথিবীর জন্য ফরয, মক্কার দেখা অনুসারে রোযা-ঈদ করা পুরো পৃথিবীর জন্য ফরয, নিউ মুন তথা অমাবস্যা (কনজাঙ্কশন) থেকে মাস শুরু করতে হবে– এসবের কোনো কিছুই ওইসকল কিতাবে নেই। তেমনি লুনার ক্যালেন্ডারের কথাও নেই।
মোটকথা, তাদের এসকল বক্তব্য না আয়াতে আছে, না হাদীসে আছে, না এই হাওয়ালাগুলোতে আছে।
সহজ উপায় হল, আপনারা যে কিতাবগুলোর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখান থেকে আপনাদের দাবির পুরো কথাটা দেখান! শুধু–
لا عبرة لاختلاف المطالع
–দেখালে হবে না। শুধু এতটুকু তো আপনাদের দাবি নয়। আপনাদের দাবি তো এই পাঁচ-ছয়টা কথার পুরো সমষ্টি। আপনারা বলছেন, অন্যদের পরে শুরু করার কারণে নাকি আমাদের দুটি বা একটি ফরয রোযা ছুটে যাচ্ছে, ফরয তরক হচ্ছে, অন্যরা যেদিন ঈদ করছে, সেদিন রোযা রেখে আমরা নাকি হারাম কাজ করছি! এমন কথা কোনো একজন ফকীহ থেকে দেখান যে, মুসলিমগণ ফিকহের এই স্বীকৃত অভিমত ‘يعتبر اختلاف المطالع’ (উদ্য়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য) অনুযায়ী রোযা-ঈদ করে থাকেন, তাদের ওপর অন্য মাতলা-এর রুইয়াত হিসেবে রোযা না রাখা হারাম এবং ঈদ না করা হারাম– কোনো ফকীহ এমন কথা বলেছেন, দেখান! আপনাদের উদ্ধৃত কিতাবগুলো থেকেই দেখান! আপনাদের উদ্ধৃত কিতাবগুলো থেকে আপনাদের এ কথাগুলো দেখাতে পারবেন না! কীভাবে দেখাবেন? এগুলো তো অন্যায় কথা; শরীয়ত পরিপন্থি কথা।
জেদ্দা ফিকহ একাডেমির ফয়সালা!
তারা বারবার একটা কথা খুব প্রচার করেন যে, ওআইসির ফয়সালা তো হয়ে আছে! কথাটি পত্র-পত্রিকায়ও আসে এবং মিডিয়ার ভাইয়েরাও বলে থাকেন।
ওআইসি থেকে কীসের ফয়সালা হয়েছে? এ প্রসঙ্গে যে ফয়সালাটি উদ্ধৃত করা হয়, সেটি তো ওআইসির ফয়সালা নয়; ওআইসির অধীনে একটা ফিকহ একাডেমি আছে, ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ নামে। সেখানে একবার এ আলোচনা উঠেছিল এবং তখন তারা একটা প্রস্তাব পাস করে রেখেছে। কিন্তু এটার আমল কীভাবে হতে পারে– সেটা তারা চিন্তাও করেননি। একটা ইখতিলাফী বিষয়ে তারা নিজেদের ইজতিহাদ অনুযায়ী ফয়সালা করেছেন। পুরো দুনিয়ার আলেমদের ইজমা হয়েছে– এমন কথা কখনও নয়; বরং অনেক ফিকহ একাডেমি কর্তৃক এর বিপরীত ফয়সালা হয়ে আছে।
কিন্তু যে কথা আমি বলতে চাচ্ছি– এই ফয়সালা ১৪০৭ হিজরী মোতাবেক ১৯৮৬ সনে হয়েছে। তখন থেকে আজ ২০২৬ পর্যন্ত বহু বছর কেটে গেছে। সেদিন যারা ফয়সালায় ছিলেন, তারা এতদিন কী করেছেন? ওই ফিকহ একাডেমির সদস্যগণ তো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকা হিসেবে রোযা ও ঈদ করেন। কেউ নিজেদের হেলাল কমিটির বিরুদ্ধে যাননি। যেমন, শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী। অনেক বড় ব্যক্তিত্ব। তিনি উক্ত ফিকহ একাডেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু তিনি কী করেন? তিনি কি পাকিস্তানের হেলাল কমিটির বিপরীতে গিয়ে আলাদা ঈদ করেন? ডক্টর ইউসুফ কারযাবী রাহ. কখনও আলাদা ঈদ করেছেন? মুস্তফা ওয়াহবা যুহাইলী রাহ. কি কখনও আলাদা ঈদ করেছেন? সেখানে যারা দস্তখত করেছেন, তাদের মধ্য থেকে একজনের নাম দেখিয়ে দিন, যিনি নিজ দেশের হেলাল কমিটির বিরুদ্ধে গিয়ে আলাদা ঈদ করেছেন!
ওই মজলিসে এই ফয়সালার সময় মজলিসে উপস্থিত যামানার অনেক বড় বড় ফকীহ বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু ‘ধর্তব্য নেই’-এর পক্ষে যারা হাত তুলেছেন, তাদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ ফয়সালা হয়েছে। যারা এ ফয়সালার পক্ষে হাত উঠিয়েছেন, তাদের কেউ নিজ দেশের হেলাল কমিটির বাইরে গিয়ে রোযা-ঈদ করেছেন– এমন একটা ডকুমেন্ট বা তথ্য দিন!
উক্ত ফিকহ একাডেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী সাহেবের কথা শুনুন! ওই ফয়সালা হয়েছিল ১৯৮৬ সনে। আমি আপনাকে এখন শোনাব ২০০৯-এর কথা। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম পাকিস্তানের করাচি বায়তুল মোকাররম মসজিদে বলেছেন–
تو ہميں جو حکم ہے وہ يہ کہ جب نو ذوالحجہ تمھارے حساب سے آئے تو اس وقت تمھارے ليے يہ فضيلت حاصل ہوگي، روزہ رکھنے کي فضيلت حاصل ہوگي۔ لہٰذا يہ سمجھنا کہ بھئي وہاں تو ايک دن پہلے ہو گيا، ہم ايک دن بعد منا رہے ہيں، يہ جو دل ميں خيالات لوگوں کے پيدا ہوتے ہيں، يہ سب اس کي طرف کوئي توجہ دينے کي ضرورت نہيں۔ بعض لوگ اس کو اپنے بزعم خود يہ سمجھتے ہيں کہ بھئي اب تو سائنس کا دور ہے، تو سائنس کے دور ميں اس کے لحاظ سے اب جب وہاں عرفات کا دن ہو گيا تو ہميں کيا ضرورت ہے، ہميں بھي اسي کے ساتھ کر دينا چاہيے ... ارے يہ سائنس کي بات نہيں، سائنس کي الٹي کي بات ہے!!*
অর্থাৎ শরীয়তের বিধান হল, তোমাদের এলাকায় যে দিন ৯ যিলহজ্ব সেদিন রোযা রাখলে ৯ যিলহজ্বের রোযার ফযীলত তোমাদের হাসিল হবে।
এ কারণে যারা এমন বলে যে, অমুক জায়গায় তো এক দিন আগে হয়ে গেছে আর আমরা এক দিন পরে করছি– এসব লোকদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।
কিছু লোক এমনও বলে যে, এখন তো বিজ্ঞানের যুগ। আর বিজ্ঞানের দাবি হল, যেদিন ওখানে ৯ যিলহজ্ব আমাদেরও সেদিন ৯ যিলহজ্বের রোযা রাখা।
হযরত বলেন, ‘না না, এটা বিজ্ঞানের দাবি নয়; বরং বিজ্ঞানবিরোধী। বিজ্ঞানের দাবি হল, যার যার হেলাল হিসেবে আমল করা। আর তোমরা যা বলতে চাচ্ছ, সেটি বিজ্ঞানের বিপরীত।’
তিনি আরও বলেছেন–
سب کو مکہ مکرمہ کےاور مدينہ طيبہ کے تابع نہيں کيا جا سکتا۔ يہ ناممکن ہے، نہ عملاً ممکن ہے، نہ عقلاً ممکن ہے۔ لہٰذا اس ميں شک وشبہ نہيں ڈالنا چاہيے۔
অর্থাৎ সবাইকে তোমরা মক্কা-মদীনার হেলাল হিসেবে আমল করাবে– এটা অসম্ভব। যুক্তির বিচারে অসম্ভব, আমল ও প্রায়োগিকভাবেও অসম্ভব। এটা সম্ভবই নয়, কাজেই এগুলোর পেছনে পড়বে না। তোমরা যার যার দেশে যখন ৯ যিলহজ্ব হয়, তখন রোযা রাখবে। তোমরা তোমাদের তারিখ অনুযায়ী রোযা রাখলে রোযার সওয়াব পাবে।
এই হল ওআইসির ফিকহ একাডেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী ছাহেবের বক্তব্য। এবার আসুন জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রসঙ্গে।
আপনারা নিশ্চয়ই আলবেরুনীকে চিনে থাকবেন। তার জন্ম ৩৬২ হি. মোতাবেক ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে আর মৃত্যু ৪৪০ হি. মোতাবেক ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন বহুবিদ্যায় পারদর্শী এক অসাধারণ মনীষী ও বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর ছিল গভীর দখল এবং এ বিষয়ে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রচনা করেছেন।
তাঁর কিছু বক্তব্য শুনুন :
তিনি তাঁর লিখিত–
الآثار الباقية عن القرون الخالية
–গ্রন্থে সন-তারিখের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন–
ثم تاريخ هجرة النبي محمد صلى الله عليه وسلم من مكة إلى المدينة، وهو على السنين القمرية برؤية الأهلة، لا الحساب، وعليه يعمل أهل الإسلام بأسرهم.
অর্থাৎ হিজরী তারিখ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এটি চান্দ্রবর্ষের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা নতুন চাঁদ (হেলাল) দেখার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, হিসাবের মাধ্যমে নয়। এবং সমস্ত মুসলমানের আমল এই তরীকা মোতাবেক। –আলআছারুল বাকিয়া, পৃ. ২৯
আরেক জায়গায় লিখেছেন–
ويبتدؤن بالشهر من عند رؤية الهلال، وكذلك شرع في الإسلام، كما قال الله تعالى: يَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ.
অর্থাৎ আরবের লোকজন হেলাল দেখে মাস শুরু করে এবং এই বিধানই দেওয়া হয়েছে ইসলামে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
يَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ .
–আলআছারুল বাকিয়া, পৃ. ৬৪
এক বেদআতী ফেরকা, যারা হিসাবের ভিত্তিতে চান্দ্রমাস গণনা করে রোযা ও ঈদ করত এবং রমযান মাসকে সব সময় ত্রিশ দিন গণনা করত, এদের খণ্ডন করতে গিয়ে আলবেরুনী লিখেছেন– ইহুদী-খ্রিস্টানরা তো মাসের হিসাব ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে করে থাকে, কিন্তু মুসলমানের জন্য হেলাল দেখা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
... اليهود والنصارى، فإذا لهم جداول وحسبانات يستخرجون بها شهورهم ويعرفون منها صيامهم، والمسلمون مضطرون إلى رؤية الهلال وتفقد ما اكتساه القمر من النور واشترك بين نصفه المرئي ونصفه المستور (الآثار الباقية : ص৬৪)
অর্থাৎ ইহুদী-খ্রিস্টানরা তো পূর্ব-প্রস্তুতকৃত ক্যালেন্ডার দিয়ে মাসের হিসাব বের করে এবং এর মাধ্যমেই তাদের রোযার সময় অবগত হয়ে থাকে। অন্যদিকে মুসলমান হেলাল দেখতে এবং চাঁদের যে অংশ আলো গ্রহণ করেছে তা খোঁজ করতে বাধ্য। (আলআছারুল বাকিয়া, পৃ. ৬৪)
তিনি আরও বলেছেন, হিন্দুরা চান্দ্রমাস গণনা করে কনজাঙ্কশন থেকে। অর্থাৎ অমাবস্যা চলাকালে সূর্য ও চন্দ্রের যে কনজাঙ্কশন ঘটে, সেখান থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের চান্দ্রমাস গণনা আরম্ভ করে। তাঁর আরবী বক্তব্য নিম্নরূপ–
وكذلك شهور الهند مع شهور العرب، ولا تزال تتقدم أوائلها، لأنها محسوبة من اجتماع النيرين...
এখানে তিনি বলেছেন, হিন্দুদের মাস গণনা আরম্ভ হয় ইজতিমা (অমাবস্যার মধ্যে চাঁদ ও সূর্য একই রেখায় এসে যাওয়ার সময়, যাকে ইংরেজিতে বলে Conjunction) থেকে। (আত-তাফহীম, পৃ. ১৬৮)
তিনি পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে, অমাবস্যার মাঝখানে সংঘটিত Conjunction থেকে চান্দ্রমাস শুরু করে হিন্দুরা। আর হিসাবের মাধ্যমে পূর্ব প্রস্তুতকৃত ক্যালেন্ডার দিয়ে রোযার তারিখ ঠিক করে ইহুদী-খ্রিস্টানরা। এদের সকলের বিপরীতে মুসলিম উম্মাহ কুরআনের নির্দেশ মোতাবেক হেলাল দেখে চান্দ্রমাস শুরু করে।
আল্লামা আলবেরুনী তাঁর আরেকটি অতি মূল্যবান গ্রন্থ ‘আলকানূনুল মাসউদী’-এর অষ্টম প্রবন্ধের ১৪তম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দর্শনযোগ্য নতুন চাঁদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য একটি মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। এ থেকে কারও এই ভুল বোঝার সম্ভাবনা ছিল যে, তিনি বোধহয় হেলাল দেখার পরিবর্তে হিসাবের আলোকে কেবল দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাকে ভিত্তি বলে গণ্য করতে চাচ্ছেন। অতএব তিনি এই পরিচ্ছেদের প্রারম্ভে একটি নোট সংযুক্ত করে দিয়েছেন, যাতে এরকম কোনো ভুল ধারণার সৃষ্টি না হয়। তিনি এ পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন–
الفصل الثاني في سمت الهلال
অর্থাৎ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : হেলালের দিক ও অবস্থান সম্পর্কে অবগতি বিষয়ে।
এরপর তিনি শুরুতেই বলেছেন–
أحكام الشهور في الإسلام من الحج والصيام راجعة إلى رؤية الهلال، فهي إذن من أجل ما يصرف إليه الاهتمام، وهي وإن فرضت برؤية العيان دون الحساب الذي ما له إلى الاعتبار والامتحان، فشتان بين من يحوم في طلبه حول موضعه وبين من يجيل بصره في آفاق السماء ويطلبه في الظلام...
এতে বলেছেন, ‘ইসলামের বিধান হজ্ব ও সিয়াম যেহেতু হেলাল দেখার সাথে সম্পৃক্ত, তাই হেলাল দেখা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। এসমস্ত ইবাদত যদিও হেলালকে চোখে দেখার ভিত্তিতে ফরয করা হয়েছে, হিসাবের ভিত্তিতে নয়, তবুও হেলাল দেখার সুবিধার জন্য হেলালের দিক ও অবস্থান সম্পর্কে অবগতি থাকা দরকার। একজন ঠিক জায়গায় হেলাল তালাশ করছে আরেকজন আন্দাযে চারদিকে কেবল দেখে বেড়াচ্ছে– দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে। প্রথমজন সহজে হেলাল দেখতে পারবেন।
সামনে তিনি এ বিষয়ের মূলনীতি উল্লেখের পর লিখেছেন–
وإذا نصب على الهلال كما وصفنا، ثم نظر الناظر إليه من طرفه الأسفل إلى ما يسامته من السماء، لم يخف فيه الهلال الممكن الرؤية، وإذا أدركه منه نفر، انعقد برؤيتهم أحكام الشريعة.
এ বক্তব্যের সারমর্ম হল–
যদি উপরিউক্ত পন্থায় হেলাল তালাশ করা হয়, তাহলে দর্শনযোগ্য হেলাল ইনশাআল্লাহ দৃষ্টির অগোচর থাকবে না। যদি কিছু মানুষ হেলাল দেখতে পায়, তাহলে তাদের দেখার ভিত্তিতে শরীয়তের বিধান সাব্যস্ত হয়ে যাবে। –আলকানূনুল মাসউদী ২/৯৬৪, প্রকাশক : মজলিসে দায়েরায়ে মা‘আরিফে উসমানিয়া হায়দারাবাদ, ১৩৭৪ হি.=১৯৫৫ ঈ.।
আমাদের যে ভাইয়েরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব এবং লুনার ক্যালেন্ডারকে হেলাল দেখার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আজ পুরো উম্মতকে এর ওপর আমল করার দাওয়াত দিচ্ছেন! তারা মনে করেন যে, এটা নতুন কোনো দাওয়াত এবং তারা সুন্দর কোনো দাওয়াত পেশ করছেন। হায়! তারা যদি জানতেন যে, ইহুদী-খ্রিস্টানদের অনুকরণ করে হাজার বছর আগেই এই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং এর ওপর আমলও হয়েছে! কিন্তু আফসোসের কথা হল, আহলে হক কারও পক্ষ থেকে এই দাওয়াত আসেনি। আহলে হক কেউ এর ওপর আমল করেননি। কারা দাওয়াত দিত এবং কারা এর ওপর আমল করত– এটা আপনারা প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইমাম তাকীউদ্দীন মাকরীযীর যবানে শুনুন। তিনি তার বহুল সমাদৃত কিতাব আলমাওয়ায়েজু ওয়াল ই‘তিবার বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল আছার (আলখুতাতুল মাকরীযিয়্যাহ)-এ লেখেন–
وجميع الأحكام الشرعية مبنية على رؤية الهلال عند جميع فرق الإسلام، ما عدا الشيعة، فإن الأحكام مبنية عندهم على عمل شهور السنة بالحساب.
অর্থাৎ সমস্ত শরয়ী বিধানের ভিত্তি হেলাল দেখার ওপর। মুসলমানদের সব দল ও ফেরকার কাছে এটাই পদ্ধতি। শুধু শিয়াদের কাছে হিসাব-নির্ভর ক্যালেন্ডারের ওপর বিধানসমূহের ভিত্তি। (আলখুতাতুল মাকরীযিয়্যাহ, খ. ১, পৃ. ২৮৫, মাকতাবাতুস সাকাফাতিদ দীনিয়্যাহ, কায়রো, মিশর)
শিয়াদের মধ্যেও অনেক দল, অনেক ফেরকা আছে। সব ফেরকাই হিসাব-নির্ভর ক্যালেন্ডারের প্রবক্তা নয়। বাতেনী শিয়ারা (ইসমাঈলী শিয়া) এর প্রবক্তা। শিয়াদের এই ফেরকা কাফের-মুরতাদ হওয়ার ব্যাপারে আহলে হকের কারও কোনো দ্বিমত নেই। এই বাতেনী শিয়ারাই হেলাল দেখার পরিবর্তে হিসাবের প্রবক্তা ছিল। তারা আগে থেকে প্রস্তুত করা ক্যালেন্ডার মোতাবেকই রোযা ও ঈদ করত। আল্লামা আলবেরুনী আলআছারুল বাকিয়াহ আনিল কুরূনিল খালিয়াহ’ কিতাবে এই ফেরকার বিস্তারিত খণ্ডন করেছেন।
তিনি এটাও লিখেছেন– এই ফেরকা এমন ছিল যে, তারা মুসলমানদেরকে গালি দিত এবং এ কথা বলে কটাক্ষ করত যে, তোমরা হেলাল দেখার অপেক্ষায় বসেই থাকো। দেখো না, ইহুদী-খ্রিস্টানরা ক্যালেন্ডার দেখেই রোযা রাখে এবং চান্দ্রমাস হিসাব করে! তাদের হেলাল দেখার অপেক্ষা করতে হয় না।
(واقتفى أثر القوم بوضع كتاب طعن فيه على طالبي الهلال بالرؤية، وسبهم وعيرهم باستغناء اليهود والنصارى عن طلب الهلال للصيام وأوائل الشهور، بما عندهم من الجداول واشتغال المسلمين بالمتشابه من الأحوال...)
আলবেরুনীর পুরো আলোচনা আলআছারুল বাকিয়া গ্রন্থের বিভিন্ন স্থান থেকে পড়া যেতে পারে। দেখুন– পৃষ্ঠা : ১৯৭, ১৬৪-১৭০, ৬৪-৬৮, ৩১ ও ৭
ওপরের আলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট যে, লুনার ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করার এই নব উদ্ভাবিত চিন্তার সূচনা হয়েছে বাতেনী শিয়াদের মতো বেঈমান ফেরকার মাধ্যমে। আর তারা এটা নিয়েছে ইহুদী-খ্রিস্টানদের থেকে। উদ্দেশ্য কেবল এইটুকু যে, আগে থেকে ঈদের দিন নির্ধারিত থাকলে যে আনন্দ ও পুলক, সেটুকু উদ্যাপন করা। ব্যস, আনন্দ উদ্যাপনই উদ্দেশ্য, আল্লাহ্র বিধান মান্য করার কোনো পরোয়া নেই!!
আমাদের মনে রাখা উচিত যে, যারা আজ ‘হিসাব হিসাব’ করছে, মুসলিম উম্মাহকে হেলাল দেখার শরয়ী বিধান থেকে দূরে সরিয়ে লুনার ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করাতে চাচ্ছে, তারা তো আসলে উম্মাহকে বাতেনী শিয়াদের পথেই নিয়ে চলেছে। তাহলে কি তাদের কাছে মুসলমানদের পথের চেয়ে ইহুদী-খ্রিস্টানদের পথই বেশি ভালো লাগে! আল্লাহ তাআলা এই ভ্রান্ত দাওয়াত থেকে পুরো উম্মতকে হেফাযতে রাখুন– আমীন!
এতক্ষণ পূর্বের যুগের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীর বক্তব্য শুনলেন। বর্তমান যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বইপত্রও আমাদের কাছে আছে। তাদের অনেকের সাথে সরাসরি পত্র যোগাযোগও করেছি। তাদের একজনের বক্তব্য শুনুন–
International Astronomical Center (IAC) -এর প্রধান, জর্ডান আলজামইয়্যাতুল ফালাকিয়্যার হিলাল পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান ও ‘আলইত্তিহাদুল আরাবী লিউলূমিল ফাযায়ি ওয়াল ফালাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডক্টর মুহাম্মাদ শওকত ঊদাহ।
তার কাছে আমরা একই দিনে রোযা ও ঈদের প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম যে, কিছু লোক এই মতবাদের দাওয়াত দিচ্ছে, এ বিষয়ে আপনারা কী মনে করেন, তিনি উত্তরে লিখেছেন–
مسألة هل يصوم الناس معا أو لا يصومون معا فهي مسألة فقهية يجيب عليها الفقهاء وليس نحن الفلكيون، بالنسبة لنا فنحن مجرد حاسبون، نطوع حساباتنا لما يطلبه ويقره الفقهاء.
‘সমস্ত মানুষ একই তারিখে রোযা রাখবে, না আলাদা আলাদা রাখবে– এটা তো ফিকহী মাসআলা। এর জওয়াব তো উলামায়ে কেরাম দেবেন। আমরা তো কেবল হিসাব জানি। ফকীহগণ যেভাবে বলবেন, আমরা সেভাবেই হিসাবের খেদমত পেশ করে দেব।’ এটা তিনি আমাদেরকে ১৫ অক্টোবর ২০১৪ ঈ.-এর চিঠিতে লেখেন।
১৩ মে ২০১৩ ঈ.-এর পত্রে তিনি এটাও লিখেছেন–
من الناحية العملية والعلمية لا يمكن توحيد جميع البلاد الإسلامية بناء على رؤية الهلال، فلا يمكن الطلب من سكان أندونسيا وماليزيا والدول الشرقية الانتظار لمعرفة نتيجة تحري الهلال في موريتانيا، ففي هذه الحالة ستشرق الشمس في أندونسيا والناس لا تعرف بعد هل هذا اليوم هو عيد أم لا مثلاً!
فغاية ما يمكن فعله هو توحيد الدول الإسلامية بناء على تقويم هجري مبني على الحسابات الفلكية، أما التوحيد المبني على الرؤية الفعلية فهذا وهم، ولا يمكن تحقيقه.
অর্থাৎ বাস্তবতার আলোকে এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই হেলাল দেখার ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা-ঈদ করা সম্ভব নয়। এটা কীভাবে হতে পারে যে, আমরা ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য প্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বিধান চাপিয়ে দেব যে, তারা যেন মৌরিতানিয়ার হেলাল দৃষ্টিগোচর হওয়ার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করে। এমন করতে গেলে তো ইন্দোনেশিয়ায় সূর্যোদয় হয়ে যাবে, তখনও তারা জানতে পারবে না যে, আজ ঈদ হবে, নাকি রোযাই রাখতে হবে।
হেলাল দেখার ভিত্তিতে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা অসম্ভব। এটা নিছক কল্পনা। একে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।
ডক্টর মুহাম্মাদ শওকত ঊদাহ তার প্রবন্ধ ‘আলহিলাল বাইনাল হিসাবাতিল ফালাকিয়্যাতি ওয়ার রুইয়াতি’-এ বলেছেন, কোনো স্থানের হেলাল দেখা গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্য ধর্তব্য হবে কি না– এ ফয়সালা উলামায়ে কেরাম করবেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নয়।
তিনি আরও লেখেন, হিজরী মাসের সূচনা কীভাবে হবে– এটা শরীয়তের মাসআলা। এর ফয়সালা করবেন ফকীহগণ, জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নয়। দেখুন তার প্রবন্ধ, আলহিলাল বাইনাল হিসাবাতিল ফালাকিয়্যাতি ওয়ার রুইয়াতি, পৃ. ৭, ১১, ১৩
আর জানা কথা– এই বিষয়ে ফকীহগণের ইজমা আছে যে, চান্দ্রমাস শুরু করার ক্ষেত্রে হেলাল দেখাই ভিত্তি; অন্য কিছু নয়। মুহাম্মাদ শওকত ঊদাহ একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তাই তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, কোন্ বিষয় শরীয়তের সাথে সম্পৃক্ত আর কোন্টা জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত।
এই হল যারা বাস্তবে বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের পণ্ডিত তাদের কথা। আর যারা অন্য বিষয়ের ইঞ্জিনিয়ার তাদের বক্তব্য হল, হুজুররা বিজ্ঞান বোঝে না! বিজ্ঞান না বোঝার কারণে হুজুররা লুনার ক্যালেন্ডারের বিরোধিতা করেন! এজন্যই তারা একই দিনে বিশ্বব্যাপী রোযা ও ঈদ করার বিপক্ষে!
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ বাস্তবতা উপলব্ধি করার তাওফীক দান করুন এবং সকল প্রকার প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত রাখুন– আমীন।
[আলোচক কর্তৃক সংযোজিত ও পরিমার্জিত]
(চলবে ইনশাআল্লাহ)
টীকা
* এ বিষয়ে হযরতের পূর্ণ আলোচনা নিম্নরূপ–
کہ سارى عبادتىں تمام روئے زمىن کے اوپر، سارے مسلمان اىک ہى وقت مىں، اىک ہى لمحے مىں، اىک ہى دن مىں انجام دىں، ىہ ممکن نہىں۔ىہ ہو نہىں سکتا۔ىہاں دن ہے، وہاں رات ہے۔ىہاں رات ہے، وہاں دن ہے۔
لہذا شرىعت نے آسان کر دىا ہے معاملہ۔ آپ کو حساب کتاب لگانے کى ضرورت نہىں کہ بھئى سعودى عرب مىں اس وقت کىا ٹائم ہوا ہوگا، لہذا اس کے حساب سے ہم سعودى عرب کے حساب سے ىہاں پر ظہر پڑھىں، ىا عصر پڑھىں، ىا مغرب پڑھىں۔ کوئى حساب کتاب لگانے کى ضرورت نہىں۔ تم اپنے افق پر دىکھو، تمھارے افق پر کىا پوزىشن ہے۔ جو افق پر تمھارے پوزىشن ہے، اس کے مطابق تم اپنى عبادتىں انجام دے لو۔ تم نے چاند دىکھا؟ نہىں دىکھا، ٹھىک ہے، تمھارے اوپر مکلف نہىں ہے۔ اىک دن بعد کرنا۔ تم نے ابھى دىکھا کہ تمھارے ہاں فجر طلوع ہو گئى؟ بس نماز پڑھ لو۔ىعنى تمھىں حساب لگانے کى ضرورت نہىں کہ سعودى عرب مىں بھى طلوع ہوئى کہ نہىں ہوئى۔ اور مکے مىں جب وہ نماز ہوگى تو اس وقت فجر پڑھىں گے ہم۔ جب مکے مىں اذان ہوگى ... اس کا ہمىں مکلف شرىعت نے نہىں کىا۔ہمىں اس بات کا مکلف کىا ہے کہ ہمارے افق کے لحاظ سے جو صورت حال ہے اس کے مطابق عبادتىں انجام دىں، لہذا اگر وہاں اىک دن پہلے چاند نظر آگىا اور ہمارے ہاں اىک دن بعد نظر آىا کوئى فرق نہىں پڑتا ، وہ ہمارے اىک دن پہلے عىدالاضحى منائىں گےہم اىک دن بعد منائىں گے، وہ اىک دن پہلے عرفات مىں بىٹھے ہىں ہم اىک دن بعد۔
تو ہمىں جو حکم ہے وہ ىہ کہ جب نو ذوالحجہ تمھارے حساب سے آئے تو اس وقت تمھارے لىے ىہ فضىلت حاصل ہوگى، روزہ رکھنے کى فضىلت حاصل ہوگى۔ لہٰذا ىہ سمجھنا کہ بھئى وہاں تو اىک دن پہلے ہو گىا، ہم اىک دن بعد منا رہے ہىں، ىہ جو دل مىں خىالات لوگوں کے پىدا ہوتے ہىں، ىہ سب اس کى طرف کوئى توجہ دىنے کى ضرورت نہىں۔ بعض لوگ اس کو اپنے بزعم خود ىہ سمجھتے ہىں کہ بھئى اب تو سائنس کا دور ہے، تو سائنس کے دور مىں اس کے لحاظ سے اب جب وہاں عرفات کا دن ہو گىا تو ہمىں کىا ضرورت ہے، ہمىں بھى اسى کے ساتھ کر دىنا چاہىے ... ارے ىہ سائنس کى بات نہىں، سائنس کى الٹى کى بات ہے!! اس لىے کہ اگر سائنس کا تقاضا ىہ ہے کہ ہر جگہ، ہر علاقے مىں، وہاں کے حساب کا اعتبار ہوتا ہے، وہاں کا افق دىکھا جاتا ہے، وہاں سورج کى پوزىشن کىا ہے وہ دىکھا جاتا ہے، وہاں چاند کى پوزىشن كيا ہے وہ دىکھا جاتا ہے، وہاں دن ہے ىا رات ہے ىہ دىکھا جاتا ہے، تو سب کو مکہ مکرمہ کےاور مدىنہ طىبہ کے تابع نہىں کىا جا سکتا۔ ىہناممکن ہے، نہ عملاً ممکن ہے، نہ عقلاً ممکن ہے۔ لہٰذا اس مىں شک وشبہ نہىں ڈالنا چاہىے۔"
* পূর্ণ আলোচনাটি শুনতে ক্লিক করুন :