কুরআনের শিক্ষা
‖ যা বলব, ভেবে বলব : প্রতিটি কথা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেছেন–
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ.
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত। –সূরা কফ (৫০) : ১৮
মানুষ ভালো-মন্দ যা কিছু বলে, সম্মানিত লিপিকর ফেরেশতাগণ সব লিখে রাখেন। তারা যেমন মানুষের সব কাজ লিখে রাখেন, তেমনি সব কথাও লিখে রাখেন। কিয়ামতের দিন মানুষ দেখবে, যা কিছু সে করেছে, যা সে বলেছে, সব লেখা আছে; কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি। সে কোনো কিছু অস্বীকারও করতে পারবে না। কারণ সবকিছুই সে লিপিবদ্ধ দেখবে। আবার মুখও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, সে এই এই বলেছিল।
আমাদের কথায় যে কত রকমের ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, কত ধরনের সমস্যা আছে, তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের চূড়ান্ত উদাসীনতার কারণে কথার ক্ষেত্রে কতভাবে যে শরীয়তের সীমা লঙ্ঘিত হয়। কথায় কত জুলুম যে আমরা করে ফেলি, এর ফিরিস্তি অনেক লম্বা।
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
إِنّ العَبْدَ لَيَتَكَلّمُ بِالكَلِمَةِ، مَا يَتَبَيّنُ فِيهَا، يَزِلّ بِهَا فِي النّارِ أَبْعَدَ مِمّا بَيْنَ المَشْرِقِ.
অর্থাৎ বান্দা চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে ফেললাম, যার কারণে সে পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৭
সুতরাং কথার ব্যাপারে খুব সচেতন হওয়া দরকার। আল্লাহ হেফাযত করুন, হয়তো চিন্তা-ভাবনা না করে বলা কোনো কথাই আমাদের ঠেলে দেবে জাহান্নামের গভীরে।
আমরা সকলেই কমবেশি জানি যে, মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ইত্যাদি বড় বড় কথার দোষ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক সতর্কবাণী এসেছে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মাঝে মাঝে এসব ঘটে গেলেও সাধারণত আমরা এ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। তবে কথার আরেকটি বড় সমস্যার ব্যাপারে আমরা খুব উদাসীন। দিনদিন তা আমাদের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সেটা হল– মজা করে কিছু বলা, ঠাট্টা করে বলা। সময়ের ভাষায় বলে ‘ট্রল করা’ ও ‘ফান করা’। এজাতীয় শব্দের আড়ালে আমরা প্রায়শ অত্যন্ত জঘন্য ও গুরুতর অন্যায় কথা বলে ফেলি, তারপরে বলি, এটা তো মজা করে বলেছি।
ট্রল করা বা ফান করা তো কথার এমন এক রোগ যে, প্রায় সব সমস্যাই এর মধ্যে আছে। মিথ্যা, পরনিন্দা, অপবাদ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ, অশ্লীলতা, গালিগালাজ– কী নেই এর মধ্যে। ট্রলের নামে আরেকজনের গায়ের রং, আকার-আকৃতি, কথা বলার ধরন ও বুঝ-বুদ্ধি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য মিথ্যা রটানো হয়, অপবাদ দেওয়া হয়। কাউকে পেরেশান করার জন্য ধোঁকার আশ্রয় নেওয়া হয়। আর এসবের পরে যদি কোনো ঝামেলা হয়ে যায়, তখন যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বলে, আরে বোঝো নাই, এটা তো মজা করে বলেছিলাম।
মজা করে অনেক সময় এমন কথাও বলা হয়ে যায়, যেটা আসমান-জমিন কেঁপে যাওয়ার মতো কথা। শরীয়তের সব সীমা লঙ্ঘন হয়ে যায়। আল্লাহ হেফাযত করুন, কেউ কেউ তো দ্বীন-শরীয়তের ব্যাপারেও অত্যন্ত জঘন্য কথা বলে ফেলে। তারপরে আবার উল্টো অন্যকে ধমক দিয়ে বলে, আরে ভাই! এত সিরিয়াস হচ্ছেন কেন? এটা তো মজা করছি, ফান করছি।
দ্বীন-শরীয়ত কি তামাশার বিষয়? ফান করার বিষয়। সব বিষয়েই কি মজা করা যায়! এখন তো এজাতীয় শব্দকে তরুণ প্রজন্ম ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমরাও এতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। সে ব্যাপারে সজাগ হচ্ছি না।
মনে রাখা দরকার, আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ.
মানুষ যা কিছুই বলে, তা লেখার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে।
যা মনে আসে, বলে ফেলি। বলার আগে চিন্তা করি না, কথাটা কেমন! এ কথা বলার কোনো দরকার আছে কি না! এ কথার কারণে গুনাহ হবে কি না, ভাবি না। মনে পড়ল, ব্যস বলে ফেলি। লেখার ক্ষেত্রেও তা-ই। বলার ও লেখার ক্ষেত্র ও বিষয় যেমন বাড়ছে, সমান তালে অসতর্কতাও বাড়ছে।
কথার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে কুরআন কারীমে একাধিক আয়াত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অনেক হাদীসে যবানের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে ইরশাদ করেছেন–
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسٰۤي اَنْ يَّكُوْنُوْا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَآءٌ مِّنْ نِّسَآءٍ عَسٰۤي اَنْ يَّكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ، وَلَا تَلْمِزُوْۤا اَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوْا بِالْاَلْقَابِ.
হে মুমিনগণ! পুরুষরা যেন অপর পুরুষদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। নারীরাও যেন অপর নারীদের উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যে নারীদের উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যকে দোষারোপ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। –সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১১
আরেক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةِ.
দুর্ভোগ প্রত্যেক ওই ব্যক্তির, যে পেছনে ও সামনে মানুষের নিন্দা করে। –সূরা হুমাযাহ (১০৪) : ১
তো আমরা হয়তো ইচ্ছাকৃত গীবত-অপবাদ থেকে সতর্ক থাকি, বেঁচে থাকি। কিন্তু অন্যদিকে ট্রল করা বা ফান করাকে তেমন সমস্যা মনে করি না। অথচ এর মধ্য দিয়েই গীবত-অপবাদ হয়ে যায়। অন্যকে উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়। অশ্লীল কথা বলা হয়। এর আড়ালে ও আশ্রয়ে আরও কত কবীরা গুনাহ যে হয়ে যায়, কতভাবে যে শরীয়তের সীমা লঙ্ঘিত হয়ে যায়, ভ্রুক্ষেপ করি না। সতর্ক হই না।
মনে রাখতে হবে, যা কিছু বলছি, সব লিখে রাখা হচ্ছে। যাচ্ছেতাই বলতে থাকলে এতে অন্যের ক্ষতি হওয়ার চেয়ে বরং নিজেরই এত বেশি ক্ষতি হয়ে যায় যে, তা মেটানোর আর কোনো সুযোগ থাকে না। কাজেই যবানের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। সত্যিকারের মুসলিম অহেতুক কথা ও কাজে লিপ্ত থাকতে পারে না। ভুল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এটা তার নিত্যকার কাজ হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন–
وَقُلْ لِّعِبَادِيْ يَقُوْلُوا الَّتِيْ ہِيَ اَحْسَنُ
আমার (মুমিন) বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথাই বলে, যা উত্তম। –সূরা বনী ইসরাঈল (১৫) : ৫৩
নিজেদের মধ্যে তো বটেই, আল্লাহ তাআলা কাফের-মুশরিকদের কটূক্তির জবাবেও ভালো ও উত্তম কথা বলতে বলেছেন। তাদের মন্দ কথার জবাবে মন্দ কথা বলতে নিষেধ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার উকবা ইবনে আমের রা.-কে তিনটি নসীহত করেছিলেন। এর মধ্যে একটি হল–
أمْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ.
তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। –জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪০৬
অনিয়ন্ত্রিত কথাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলে। আখেরাতেও এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। মজা করে বলা কথাকে আমরা সাধারণত গুনাহের কারণ মনে করি না, অথচ হতে পারে সেই কথাটাই আল্লাহ তাআলার কাছে খুব গুরুতর। তিনি তাতে অত্যন্ত নাখোশ হবেন। এজন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কথার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং চুপ থাকাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় বলেছেন।
শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম তার এক লেখায় যবানের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে লিখেছেন–
‘কথার ক্ষেত্রে কীভাবে আমরা সতর্ক হতে পারি আমার আব্বাজান (মুফতী মুহাম্মাদ শফী) রাহ.এর একটা সুন্দর মাপকাঠি বলে দিয়েছেন এবং আলহামদু লিল্লাহ তা আমার দিলে বসে গেছে। তিনি বলেছেন, যখন তুমি কোনো কথা বলবে বা লিখবে, তখন চিন্তা করবে যে, এটা আমাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে। আপনারাও এ বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখুন, যদি আপনাদেরকে বলা হয়, বেলা দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত আপনি যত কথা বলবেন, সব রেকর্ড করা হবে এবং তা থানায় পেশ করা হবে। এর ভিত্তিতে আপনাকে গ্রেফতারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এখন বলুন, ওই দুই ঘণ্টা কেমন সতর্কতার সাথে কথা বলবেন! আপনি তো সাবধান থাকবেনই, ওই সময় অন্য কেউ আপনার সাথে কথা বলতে এলে তাকেও বলবেন, ভাই! আমার কথা রেকর্ড হচ্ছে এবং উল্টাপাল্টা কিছু বললে আমার গ্রেফতারির পরোয়ানা আসতে পারে। সুতরাং এ মুহূর্তে আমার সাথে কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলো না।
মোটকথা, তখন আমাদের মুখ থেকে মাপা মাপা কথা বের হবে এবং শুধু প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান কথাই বলা হবে।
আমার আব্বাজান রাহ. বলতেন, ভাই! আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সবার সাথেই তো রেকর্ডার লাগানো আছে। কিয়ামতের দিন এই রেকর্ডারের ভিত্তিতে আপনার সম্পর্কে ফয়সালা হবে। সুতরাং দুনিয়ার আদালতের পক্ষ থেকে আপনার কথা রেকর্ড করা হলে যেমন সতর্কতার সাথে কথা বলতেন, ঠিক ওইরকম সতর্কতার সাথেই কথা বলুন। সর্বদা স্মরণ রাখুন, আমার যবান থেকে যা কিছু বের হচ্ছে, আখেরাতে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং বুঝে-শুনে, আল্লাহকে ভয় করে কথা বলা আমার সার্বক্ষণিক কর্তব্য।’
অতএব, সব সময় মনে রাখার চেষ্টা করব, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ আমাদের বলা প্রতিটি কথাই লিখে রাখছেন। কাজেই যা বলব, ভেবে-চিন্তে বলব।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সদা সতর্ক থাকার তাওফীক দান করুন।