যিলহজ্ব ১৪৪৭   ||   জুন ২০২৬

‘মারানজাঁ মারানজ’
‖ কষ্ট দেবেন না, কষ্ট পাবেনও না

মাওলানা আবরারুয যামান

মানুষের নানান অভিযোগ মাঝেমধ্যে শুনতে হয়। অভিযোগ শোনার পর কিছু কথা বলাও লাগে; বলি। কোনো কথায় অভিযোগকারী খুশি হন, কোনো কথায় আবার মনে কষ্ট পান। অধিকাংশ অভিযোগেই থাকে একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি। আমার মন্তব্য যদি সেই একতরফা ভাবনার অনুকূলে যায়, তিনি শান্তি পান; আর যদি চিন্তার মোড় একটু অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিই, তখনই অসন্তোষ শুরু হয়। এ কারণে অনেক সময় চুপ থাকাই নিরাপদ মনে হয়।

***

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। অভিযোগের সূত্র সম্পর্কের দাবি। সেই দাবি থেকে দেনাপাওনার হিসাব। পারস্পরিক আশা ও আকাক্সক্ষার একটি কাল্পনিক অবয়ব, একটি কল্পিত তালিকা। সেই তালিকায় কোনো ঘাটতি ও কমতি দেখা দিলেই, শুরু হয় সম্পর্কের টানাপোড়েন। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ।

যখনই শুনি এমন অভিযোগ দুই পক্ষের উভয় থেকে, ভিন্ন ভিন্নভাবে, তখনই মনে চায় আলাদা করে দুজনকেই বলি, আগে আপনি নিজে খুশি হতে শিখুন।

কথাটি মনে আসে, মুখে আনি না। কারণ যিনি অভিযোগ করতে আসেন, তিনি আসেন সান্ত্বনা নিতে, আঘাত পেতে নয়। কিন্তু অন্তরে কথাটি থেকে যায়, ‘খুশি হওয়ার যোগ্যতা’। অভিযোগকারীর দৃষ্টি থাকে শুধু একদিকে অপর পক্ষের কাজ হল আমাকে খুশি করা। কিন্তু আরেকটি দিকও যে আছে, সেটি তিনি ভাবেন নাআমার মধ্যে কি খুশি হওয়ার গুণ ও যোগ্যতা আছে?’

ভালো কিছু দেখাতে যেমন যোগ্যতা লাগে, তার চেয়েও বেশি দরকার ‘ভালো কিছু দেখতে পারার যোগ্যতা’। অল্পতেই খুশি হয়ে যেতে সবাই পারে না। যারা পারে, তারা কম কষ্ট পায়, কম কষ্ট দেয়। তারা নিজেরাও শান্তিতে থাকে, অন্যদেরও শান্তিতে রাখে। এমন মানুষ সব যুগেই কম ছিল, আজও কম।

প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শিক্ষাই উম্মতকে দিতে চেয়েছেন।

لَاتَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ.

নবীজীর বাণী এমনই, প্রতিটি যুগের প্রতিটি মানুষ যা থেকে নিতে পারে জীবনকে অনিন্দ্য সুন্দর করার সমৃদ্ধ উপাদান। মর্মে বিদ্ধ হয় হাদীসের শব্দগুলো। কী অসাধারণ সুর ও শৈলী! শব্দে শব্দে কী সুগভীর আহ্বানপ্রতিবেশী যেন প্রতিবেশী থেকে আগত কোনো উপহারকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করে। এমনকি সেটি যদি বকরির পায়ের খুরও হয়।’

বকরির পায়ের খুর কেন, মুরগির গোশতেও আমরা রাজি না। অভিযোগ যিনি করেছেন, তিনি ‘শিক্ষিত’ মানুষ। বিবাহই যেন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। কেন? ‘গুরুতর অপরাধ’ হয়ে গেছে। তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গেছেন। তারা আপ্যায়ন করেছে মুরগির গোশত দিয়ে। দস্তরখানে ছিল না গরুর গোশত। এতে তিনি যারপরনাই অপমান বোধ করেছেন। এজন্য তিনি পারেন না মেয়েকেই তুলে নিয়ে আসেন!

সমস্যাটি সত্যিই গুরুতর। তবে এর উৎস কোথায়? উৎস যেখানে, সেখানটায় দৃষ্টি যায় না আমাদের। খুশি হওয়ার যোগ্যতা আমরা হারিয়েছি। কিংবা আজও পারিনি অর্জন করতে মহামূল্যবান এ সিফাত, এ গুণ।

***

সহকর্মী মাওলানা যহীর বিন হাবীব। হাফিযাহুল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহু। কম কথার মানুষ। মাঝেমধ্যে দুয়েক কথা যা বলেন, হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বললেন, ফারসি ভাষায় একটি প্রবচন আছে, ‘মারানজাঁ মারানজ’ যার অর্থ ‘কষ্ট দিয়ো না, কষ্ট পেয়ো না।’

দুনিয়ায় কিছু মানুষ এমন থাকে, যারা কাউকে কষ্ট দেয় না। নিজেরাও কারও দ্বারা কষ্ট পায় না।

তার কথার মর্ম তখন তেমন বুঝিনি। পরে চিন্তা করেছি এমন মানুষ হওয়ার জন্য কিছু গুণ তো লাগবে। কী সেই গুণ? কোনো সন্দেহ নেই, সে গুণের সর্বাগ্রে রয়েছে ‘খুশি হয়ে যাওয়ার সিফাত।’ খুশি যে হতে শেখেনি, তাকে কেউ খুশি করতে পারে না। এ গুণটি অর্জন করে নিতে হয়। আল্লাহর কাছে চেয়ে নিতে হয়। এ খুশির স্তর আছে। সর্বোচ্চ স্তরের নাম ‘রেযা বিল কাযা।’

এখানে যে খুশির কথা বলছি, সেটি খুশি হয়ে যাওয়ার অতি সাধারণ একটি স্তর। এ স্তরে জীবনকে উন্নীত করা খুব যে কঠিন তা কিন্তু নয়!

অল্প থেকে অল্পে, আরও অল্পে যিনি ভীষণ খুশি হয়ে যেতে পারেন, তিনি মানুষকে কষ্ট দিবেন সে ফুরসত তার হবেই-বা কখন। আর কারও দ্বারা কষ্ট পাওয়ার তো তার প্রশ্নই আসে না। কষ্ট পাওয়ার অগণিত উপলক্ষ্যের মাঝেও তার দৃষ্টি আটকে থাকে খুশি থাকার একটি-দুটি উপলক্ষ্যের দিকেই।

***

এই যে খুশি হওয়ার উপাদান খোঁজা, খুশি হয়ে যাওয়ার মতো কিছু একটা খুঁজে বের করে নেওয়া কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়কেই খুশির উপলক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া এসবই আল্লাহর নির্দেশ এবং প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সুন্নত।

এ সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রকাশই তো ঘটে দাম্পত্য জীবনে। এ জীবনটাকে ‘মারানজাঁ মারানজ’ বানানোর কী অসম্ভব সুন্দর কৌশল খোদ রাব্বুল আলামীন শিক্ষা দিচ্ছেন

فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا.

এটি সূরা নিসার উনিশ নম্বর আয়াত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের শেখাচ্ছেন খুশি থাকার আসমানী কৌশল। স্ত্রীর কাছ থেকে এমন কোনো আচরণ হয়ে গেল, যা সত্যিই মন খারাপ করে দেয়, কী করতে হবে তখন? মহা প্রজ্ঞার অধিকারী মহান মাওলা আমাদের হেকমত ও প্রজ্ঞা শেখাচ্ছেন। আমাদের চিন্তার মোড়টা একটু ঘুরিয়ে দেওয়ার সবক দিচ্ছেন। তখন চিন্তা করতে হবে, ‘আল্লাহ তাআলা এর মাঝেই হয়তো রেখেছেন অগণিত কল্যাণ ও বরকত।’ একেই হয়তো বলে চিন্তার গতিপথ নির্ধারণ করে নেওয়া এবং সেই গতিপথেই জীবনটাকে চালানো।

***

প্রফেসর হযরত হামীদুর রহমান রাহ.-এর যবানে শোনা অসাধারণ একটি বক্তব্য। হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর কোনো এক হজ্বের সফরে প্রফেসর হযরতও ছিলেন। হাফেজ্জী হুজুরের কাছে নালিশ এল তাঁরই এক মুরীদের বিষয়ে। নালিশ হল, সেই মুরীদ আপনার বিরুদ্ধে এই এই করে।

নালিশদাতা হয়তো ভেবেছিল, হাফেজ্জী হুজুর এতে নালিশদাতার ওপর খুশি হবেন।

হাফেজ্জী হুজুর তখন বলেছিলেন, ‘অন্যের খুবী দেখন চাই।’

খুবী মানে সৌন্দর্য ও ভালো দিক। যার বিরুদ্ধে নালিশ, তার মধ্যে সুন্দর অনেক দিকও আছে। ভালো অনেক গুণ ও সিফাতও আছে।

‘দেখন চাই’ মানে দেখা উচিত। হাফেজ্জী হুজুর সেই ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিলেন, মানুষের মন্দ দিকগুলো দেখার অভ্যাস পরিবর্তন করুন। মানুষের ভালো ও সুন্দর দিকগুলো দেখার অভ্যাস গড়ুন।

এ গল্প প্রফেসর হযরত শোনাতেন। খুব বেশি শোনাতেন। কেন শোনাতেন? তিনি চাইতেন, মানুষের মধ্যে এই ‘খুবী’ দেখার সিফাত পয়দা হয়ে যাক। সৃষ্টি হোক খুশি হয়ে যাওয়ার মালাকা ও যোগ্যতা। মানুষ যেন মানুষের ভালোগুলো দেখতে শেখে। বিনা প্রয়োজনে মন্দগুলোর দিকে না তাকায়। মন্দগুলো দেখলে এবং দেখতেই থাকলে মন খারাপ হবেই। সম্পর্ক নষ্ট হবেই।

***

সুতরাং আমি এই নিয়ত করতে পারি, আজ থেকে আমি খুশি থাকব। সহজে নারাজ হব না। অল্পতেই কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হব না। এটি অর্জনযোগ্য গুণ। খুশি হয়ে যাওয়া এবং সন্তুষ্ট থাকার এ সিফাতটি ‘কাসবী সিফাত’। মুজাহাদার মাধ্যমে যেটি অর্জন হতে পারে। এ মুজাহাদার অনেক স্তর ও পর্যায় আছে। তবে শুরুতেই প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি বা মনকে তৈরি করে নেওয়া। মন তৈয়ার হয়ে গেলে কাজ সহজ হয়। এজন্য নিজের নফসকে নিজেই শাসন করা শিখতে হয়। যখনই কারও ওপর (অহেতুক) নারাজির পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনই নফসকে শাসন করি। নফসের এ দুষ্ট প্রবৃত্তিকে চোখ রাঙানি দিই। বারবার ইস্তেগফার পড়তে থাকি। নিজের জীবনের অগণিত অসৌন্দর্য, যেগুলো আল্লাহ তাআলা মানুষের দৃষ্টির আড়াল করে রেখেছেন, সেদিকে লক্ষ করে নিজে নিজে লজ্জিত হই। আমার মাওলার এমন কত হক আমি নষ্ট করেছি, আমার মাওলার কত হুকুম আমি লঙ্ঘন করেছি! সেসব কল্পনা করে নিজের ওপরই বরং চরম অসন্তোষের মনোভাব ধারণ করি।

যার প্রতি আমার নারাজি, আমার প্রতিও থাকতে পারে তার অনেক অনেক ইহসান ও অনুগ্রহ, আমি জোর করে সেসব স্মরণ করি।

এ কথাও চিন্তা করি, আমি কেন তার ওপর নারাজ হচ্ছি। সে কি আমার কোনো হক নষ্ট করেছে? কোনো ফরয যিম্মাদারি তার ওপর ছিল, সেটি সে লঙ্ঘন করেছে?

চিন্তা করে দেখলাম, তা তো নয়! তাহলে আমি কেন তার ওপর নারাজ হব, অসন্তুষ্ট হব?

নফসকে শাসনে রাখতে চাইলে চিন্তার শেষ নেই। চিন্তার শাখা ও উপশাখার অভাব নাই। ‘নফসের শাসন’ শব্দটি লেখায় এসে গেল ঠিক। কিন্তু বাস্তবতা হল, এ বড় ভারী বিষয়। রাব্বে কারীমের একান্ত ইহসান একান্ত অনুগ্রহ ও তাওফীক ছাড়া কার পক্ষে সম্ভব এ শাসন, নফসের ওপর মজবুত এ নিয়ন্ত্রণ? আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা। আল্লাহ্ই সর্বনিয়ন্ত্রক, সর্বনিয়ন্তা।

তবে উপায় যে নেই তা নয়। উপায় আছে। একটি উপায় হল, এ বিষয়ক দুআগুলোর ইহতিমাম করা। বিশেষ করে খুশি থাকতে পারার কিছু দুআ আছে। প্রিয় নবীজীর প্রিয় দুআ।

এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বলা যায় নবীজীর শেখানো এই দুআ

اَللّهُمَّ إِنِّيْ أسْأَلُكَ الرِّضَا بَعْدَ الْقَضَاءِ.

আয় আল্লাহ! আমি চাই আপনার কাছে ফয়সালা হয়ে যাওয়ার পর উক্ত ফয়সালায় খুশি হয়ে যাওয়ার গুণ। মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ২০৭০৫

অর্থাৎ আমি যেন খুশি থাকতে পারি অন্যের ওপর। শুধুই নিজের নফস ও নাফসানিয়্যাতের কারণে আমি যেন কারও ওপর অসন্তুষ্ট না হই। আমার জীবনে কষ্টকর যা কিছু ঘটে, আমি সেটি খুশির সাথে গ্রহণ করতে পারি।

অন্যকে খুশি করতে পারারও দুআ আছে, থেকে থাকবে। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্যের আচরণে নারাজ না হয়ে বরং খুশি ও রাজি থাকার দুআ। পাশাপাশি মানসিকতা ও প্রচেষ্টা।

যা বলতে চাচ্ছি, মূলকথা হয়তো এসে গেছে। তারপরও তৃপ্তি হচ্ছে না। মনে হয় বলতে যাচ্ছি যা, বলতে পারছি না। সমস্যার মূল জায়গাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চাচ্ছি, যেন দেখাতে পারছি না। হয়তো-বা উদাহরণের দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। কিন্তু মন বলে, থাকুক উদাহরণের উপস্থাপন। সেটি ব্যক্তিই খুঁজে নিক নিজের জীবন থেকে। চারপাশের পরিবেশ থেকে। সর্বোপরি নিজের বোধ, বুদ্ধি ও চিন্তা থেকে।

আল্লাহর তাওফীক হয়ে গেলে তো সবই হয়ে গেল।

 

 

advertisement