যিলহজ্ব ১৪৪৭   ||   জুন ২০২৬

ঈদের আনন্দে ওয়াকফের অবদান
‖ সহমর্মিতার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

মাওলানা শাহাদাত সাকিব

ঈদ উপলক্ষ্যে সমাজের প্রতিটি স্তরে কিছু উপহার পৌঁছে দেওয়ার জন্য মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসে গড়ে তোলা হয়েছিল এক সুদৃঢ় ও মানবিক ব্যবস্থাওয়াকফ’ বা স্থায়ী দানের কাঠামো। ওয়াকফ, দান-সদকার কেবল সাধারণ একটি রূপ ছিল না; এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত সামাজিক ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য সমাজের প্রতিটি মানুষকে, বিশেষত দুর্বল ও বঞ্চিত শ্রেণিকে মর্যাদার সাথে সকলের আনন্দে শরীক করা।

আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় দায়িত্বশীল শাসক ও সমাজনেতারা নিজেদের সম্পদকে ব্যক্তিগত ভোগের সীমা ছাড়িয়ে এমনভাবে উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে ঈদের মতো আনন্দঘন মুহূর্তে কোনো অভাবী পরিবার বঞ্চিত না থাকে, কোনো এতীম শিশুর চোখ থেকে অশ্রু না ঝরে। ঈদের দিনগুলোকে কেন্দ্র করে এই ওয়াকফের বিশেষ কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খাদ্য বিতরণ, মিষ্টান্ন সরবরাহ, কুরবানীর গোশত বণ্টন এসব কিছুই হত ওয়াকফের সম্পদ থেকে। নিম্নে ঈদকেন্দ্রিক ওয়াকফের কিছু নমুনা তুলে ধরা হল।

ঈদুল ফিতরে মিষ্টান্ন বিতরণের জন্য ওয়াকফ

ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দের এক অনন্য উপলক্ষ্য। ঈদের দিন দরিদ্র, এতীম ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে মিষ্টান্ন ও সুস্বাদু খাদ্য বিতরণের জন্য ওয়াকফের একটি বিশেষ ধারা প্রচলিত ছিল। এসব ওয়াকফের উপার্জিত অর্থ থেকে খাদ্য ও মিষ্টান্ন ক্রয় করে তা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হত। এই ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আমীর সরগতমিশ (صرغتمش)-এর প্রতিষ্ঠিত ওয়াকফে। তিনি তার ওয়াকফ দলীলে উল্লেখ করেন

ويصرف في عيد الفطر من كل سنة مِائَتا درهم نقدة، يشترى بها كعكا وتمرا وبندقا وخشكنانا، ويفرق ذلك على الأيتام، ومؤدبهم والعريف، على ما يراه الناظر في ذلك.

অর্থাৎ প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের দিন ওয়াকফের লভ্যাংশ থেকে ২০০ দিরহাম ব্যয় করে কেক, খেজুর, কাজুবাদাম এবং ‘খুশকনান’ নামক বিশেষ মিষ্টান্ন ক্রয় করা হবে। এরপর তা এতীম শিশু, তাদের শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কদের মাঝে বিতরণ করা হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক পরিস্থিতি অনুযায়ী তা যথাযথ বণ্টন করবেন। আলআওকাফ ওয়াল হায়াতুল ইজতিমাইয়্যাতু ফী মিসর, পৃ. ১৪৩

এ থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়, ওয়াকফ কেবল একটি দানব্যবস্থা ছিল না; এটি ছিল একটি সুসংগঠিত সামাজিক কল্যাণ কাঠামো। যেখানে শুধু খাদ্য বিতরণই লক্ষ্য ছিল না; মর্যাদা ও সম্মানের সাথে বঞ্চিত মানুষকে ঈদের আনন্দে শরীক করাও ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

কুরবানীর ঈদে গোশত বিতরণের জন্য ওয়াকফ

ঈদ একটি আনন্দের দিন। ঈদুল আযহার দিনে আল্লাহর নির্দেশে কুরবানীর পশু জবাই করা হয়। কিন্তু কুরবানী করার সামর্থ্য সবার নেই। তাই ইসলামের নির্দেশনা হল, সামর্থ্যবানরা কুরবানী করে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অসহায় দরিদ্রের ঘরে গোশত পৌঁছে দেবে।

সমাজের এমন বহু মানুষ রয়েছে, যাদের পক্ষে কুরবানী দেওয়া তো দূরের কথা, সারা বছর গোশত খাওয়ার সুযোগও খুব সীমিত। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই ইসলামের ইতিহাসে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য ও মানবিক ব্যবস্থা ওয়াকফের মাধ্যমে কুরবানীর পশু সংগ্রহ ও গোশত বণ্টন।

ওয়াকফকৃত সম্পদের লভ্যাংশ থেকে গরু, উট, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া ক্রয় করা হত এবং ঈদুল আযহার দিন সেগুলো কুরবানী করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে বিতরণ করা হত। বিশেষভাবে এতীম, অসহায়, দরিদ্র এবং দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

মামলুকী যুগের শাসক সুলতান কাইতাবাই তার প্রতিষ্ঠিত ওয়াকফে কুরবানীর জন্য একটি সুস্পষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা করেন।

তিনি উল্লেখ করেন

يصرف في كل سنة تمضي من سني الأهلة في عشر ذي الحجة الأول، منها ما مبلغه من الفلوس الموصوفة أعلاه ثمانية آلاف درهم، نصفها أربعة آلاف درهم، أو ما يقوم مقام ذلك من النقود، عند الصرف في ثمن بقرتين، كل منها تجرى في الأضحية، يضحى بها تجاه الجامع المذكور أعلاه، فإحداهما تفرق على أرباب الوظائف بالجامع المذكور، والأخرى تفرق صدقة على من يحضر يوم الذبح عند الجامع المذكور من الفقراء، ويكون ذلك يوم عيد النحر، يستمر ذلك جميعه كذلك على الدوام.

অর্থাৎ প্রতি বছর ওয়াকফকৃত সম্পদ থেকে যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে কুরবানী করার জন্য দুটি গরুর মূল্য বাবদ আট হাজার দিরহাম ব্যয় করা হবে। গরু দুটোকে উল্লিখিত জামে মসজিদের পাশে জবাই করা হবে। একটি গরুর গোশত মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকদের মাঝে বণ্টন করা হবে। আর অপরটির গোশত জবাইয়ের দিন মসজিদের আশেপাশে উপস্থিত ফকির-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। এই কার্যক্রম সর্বদা বহাল থাকবে। আলআওকাফ ওয়াল হায়াতুল ইজতিমাইয়্যাতু ফী মিসর, পৃ. ১৪৩

এ থেকে স্পষ্ট, কুরবানীর গোশত বণ্টন ছিল একটি পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সামাজিক কার্যক্রম।

সুলতান হাসান তার ওয়াকফে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি কাঠামো নির্ধারণ করেছিলেন।

তিনি বলেন

ويصرف من ريع الوقف المذكور ثمن رأسين من الإبل وعشرين رأسا من المعز وعشرة أروس من كباش الضأن، يذبح ذلك في عيد الأضحى، وتقسم نصفين، فالنصف منه يصرف على المقيمين بالأماكن المذكورة، من الطلبة، وأرباب الوظائف على ما يراه الناظر، والنصف الثاني يفرق على الأيتام، والمؤدبين والعريفين، والفقراء، والمساكين في خارج الأماكن المذكورة من الجيران وغيرهم.

উল্লিখিত ওয়াকফের লভ্যাংশ থেকে দুটি উট, বিশটি ছাগল ও দশটি ভেড়া ক্রয় করা হবে। এগুলো ঈদুল আযহার দিন জবাই করে গোশত দুই ভাগ করা হবে। এক ভাগ ওই প্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত ছাত্র ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। দ্বিতীয় অর্ধেক এতীম শিশু, তাদের শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরের ফকির-মিসকিন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। আলআওকাফ ওয়াল হায়াতুল ইজতিমাইয়্যাতু ফী মিসর, পৃ. ১৪৩

ঈদ উপলক্ষ্যে সর্বস্তরের মানুষের ঘরে খাবার ও উপহার পৌঁছানোর যে মহান ঐতিহ্য আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই, তা কেবল সুলতান, আমীর বা ধনাঢ্য শাসকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এই মানবিক কাজে সাধারণ মানুষরাও এগিয়ে এসেছে। তাদের অনেকেই নিজেদের সীমিত সম্পদ ও উপার্জন থেকে ওয়াকফ করেছে, যাতে সমাজের এতীম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষরা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়।

একজন সাধারণ মানুষ কর্তৃক এর একটি চমৎকার নমুনা পাওয়া যায় ড. সাইয়েদ ঈসা হামদী (السيد عيسى حمدي)-এর ওয়াকফের দলীলে। ১৯৩০ সালে তিনি নিজের কিছু জমি ওয়াকফ করেন, তাঁর এই ওয়াকফের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল অসহায় শিশুরা যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয় এবং দরিদ্র লোকজন যেন কুরবানীর গোশত খেতে পারে।

তিনি তাঁর ওয়াকফ দলীলে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন

وأن يصرف من ريع وقفيته ثمن شراء كسوة عبارة عن قميص، ولباس، وصديرى، وطربوش، وحذاء لكل تلميذ من تلاميذ الكتاب الذي أنشأه، وتوزع عليهم سنوياً في مناسبة عيد الفطر، كما خصص عشرة جنيهات لشراء أضحية تذبح وتوزع على فقراء بلدته كفر شبراهور في كل عيد أضحى.

তিনি তার ওয়াকফকৃত সম্পদের আয় থেকে নির্ধারণ করেছেন যে, কামিজ, পোশাক, গেঞ্জি (ভেস্ট), তরবুশ (পাগড়ি-টুপি) ও জুতা ক্রয় করে তা তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রের (মক্তব) প্রতিটি ছাত্রকে প্রদান করা হবে। এটি প্রতি বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়াও তিনি প্রত্যেক ঈদুল আযহার জন্য দশ পাউন্ড বরাদ্দ করেছিলেন, যা দিয়ে একটি কুরবানীর পশু ক্রয় করে জবাই করা হবে এবং তা তার জন্মস্থান কাফর শাবরাহুর গ্রামের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। আলআওকাফ ওয়াস সিয়াসাহ ফী মিসর, পৃ. ৩৩৪

লক্ষণীয় বিষয় হল, তিনি শিশুদের কেবল একটি জামা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি; জামা, পায়জামা, কটি, টুপি থেকে শুরু করে জুতো পর্যন্ত অর্থাৎ মাথা থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সেট উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, অভাবী ছাত্ররা যেন ঈদের দিন নতুন পোশাকের অভাবে মন খারাপ করে না থাকে।

উপরিউক্ত ঐতিহাসিক দলীলগুলো আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে

প্রথমত, তখনকার সমাজে কুরবানীর গোশতে সকলকে শরীক করার একটি সচেতন প্রয়াস ছিল। বিত্তবানেরা সচেষ্ট থাকতেন, যেন ঈদের আনন্দ সবাই উপভোগ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শুধু এককালীন দান নয়; ওয়াকফের মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি স্থায়ী ও টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। একবার ওয়াকফ করে দেওয়ার পর বছরের পর বছর সংশ্লিষ্ট সেবা কার্যক্রম অব্যাহত থাকত।

ফলে দরিদ্র, এতীম ও অসহায় মানুষেরা প্রতি বছর ঈদুল আযহার দিন কিছু না কিছু অবশ্যই পেত।

 

 

advertisement