ঈদুল আযহা ও কুরবানী
‖ গুরুত্ব ফাযায়েল ও মাসায়েল
আলকাউসার ডেস্ক
কুরবানী ইসলামের শিআর ও মৌলিক নিদর্শন। আল্লাহ তাআলার কুরব তথা নৈকট্য অর্জনের এক বিশেষ বিধান। কুরবানী মিল্লাতে ইবরাহীমীর সাথে উম্মতে মুসলিমার এক মেলবন্ধন। এতে আছে রাব্বুল আলামীনের আদেশের সামনে সমর্পিত হওয়ার মহান দীক্ষা।
কুরবানী আদম আ.-এর যুগ থেকে বিদ্যমান। সূরা মায়েদায় আল্লাহ তাআলা আদম আ.-এর দুই সন্তানের কুরবানীর কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআন মাজীদে যার বিবরণ এসেছে এভাবে–
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَاَ ابْنَيْ اٰدَمَ بِالْحَقِّ اِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْاٰخَرِ قَالَ لَاَقْتُلَنَّكَ قَالَ اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ.
আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের কাহিনীটি শুনিয়ে দিন। যখন তারা দুজনে কুরবানী করল এবং একজনের কুরবানী কবুল হল আর অন্যজনেরটি কবুল হল না। তখন সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবুল করেন। –সূরা মায়েদা (৫) : ২৭
তবে পূর্ববর্তী সকল নবীর শরীয়তে কুরবানীর পন্থা এক ছিল না। সবশেষে উম্মতে মুসলিমা তথা সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের জন্য কুরবানীর যে পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশ করা হয়েছে, তার মূল সূত্র মিল্লাতে ইবরাহীমীতে বিদ্যমান। এজন্য কুরবানীকে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ নামেও অভিহিত করা হয়। ইবরাহীম আ. কর্তৃক নিজ পুত্র ইসমাইলকে কুরবানী করার সে মহিমান্বিত দাস্তানের বর্ণনা কুরআন মাজীদে এভাবে এসেছে–
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يٰبُنَيَّ اِنِّيْۤ اَرٰي فِي الْمَنَامِ اَنِّيْۤ اَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرٰي قَالَ يٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْۤ اِنْ شَآءَ اللهُ مِنَ الصّٰبِرِيْنَ، فَلَمَّاۤ اَسْلَمَا وَتَلَّهٗ لِلْجَبِيْنِ، وَنَادَيْنٰهُ اَنْ يّٰۤاِبْرٰهِيْمُ، قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ، اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الْبَلٰٓؤُا الْمُبِيْنُ، وَفَدَيْنٰهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ، وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْاٰخِرِيْنَ، سَلٰمٌ عَلٰۤي اِبْرٰهِيْمَ، كَذٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ، اِنَّهٗ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِيْنَ.
অনন্তর যখন পুত্রটি তাঁর সাথে চলাফেরা করার মতো বয়সে উপনীত হল, তখন তিনি বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবাই করছি। অতএব তুমিও চিন্তা কর, তোমার কী মত।
তিনি বললেন, আব্বাজান! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পূর্ণ করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।
ফলকথা, যখন তাঁরা আত্মসমর্পণ করলেন এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শায়িত করলেন এবং আমি তাঁকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! নিশ্চয়ই তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি বিশিষ্ট বান্দাদেরকে এরূপই পুরস্কার প্রদান করে থাকি। প্রকৃতপক্ষেও তা ছিল একটি বড় পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে একটি শ্রেষ্ঠ জবাইয়ের পশু দান করলাম। এবং ইবরাহীমের জন্য পরবর্তীদের মধ্যে এ রীতি চালু রেখেছি যে, (তারা বলে,) ইবরাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে সে আমার ঈমানদার বান্দাগণের (বিশিষ্ট) একজন। –সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০২-১১১
পিতা-পুত্রের এই ত্যাগ ও আত্মত্যাগ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে এত পছন্দনীয় হল যে, তিনি কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য তা বিধিবদ্ধ করে দিলেন।
নিম্নে কুরবানী সম্পর্কিত কিছু আয়াত-হাদীস উল্লেখ করা হল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন–
قُلْ اِنَّنِيْ هَدٰىنِيْ رَبِّيْۤ اِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ دِيْنًا قِيَمًا مِّلَّةَ اِبْرٰهِيْمَ حَنِيْفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ،لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ.
(হে নবী!) বলুন, আমার প্রতিপালক আমাকে একটি সরল পথে পরিচালিত করেছেন, যা সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন; ইবরাহীমের মিল্লাত, যিনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে আল্লাহ-অভিমুখী করেছিলেন; আর তিনি ছিলেন না শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত।
বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত (কুরবানী) ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এরই হুকুম দেওয়া হয়েছে এবং আনুগত্য স্বীকারকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম। –সূরা আনআম (৬) : ১৬১-১৬৩
সূরা কাউসারে ইরশাদ হয়েছে–
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ.
সুতরাং আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। –সূরা কাউসার (১০৮) : ২
কুরবানী এতটাই গুরুত্বপূর্ণ আমল যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কখনো ছাড়েননি। মদীনার দশ বছরের প্রতি বছরই নবীজী কুরবানী করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন–
أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلّ سَنَةٍ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর ছিলেন। প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন। –জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৯৫৫
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى عِيدًا جَعَلَهُ اللهُ لِهذِهِ الْأُمَّةِ.
আমি আযহার দিনের (অর্থাৎ ঈদের দিন কুরবানী করার) ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছি। এ দিনটিকে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য ঈদ নির্ধারণ করেছেন। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনিভাবে গুরুত্ব সহকারে প্রতি বছর কুরবানী করতেন, তাঁর সাহাবীগণও গুরুত্বের সাথে কুরবানী করতেন।
মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রাহ. বলেন–
سَأَلْتُ ابْنَ عُمَرَ عَن الضَّحَايَا: أَوَاجِبَةٌ هِيَ؟
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, কুরবানী কি ওয়াজিব?
তিনি জবাব দিলেন–
ضَحَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْمُسْلِمُونَ مِنْ بَعْدِه، وَجَرَتْ بِهِ السُّنَّةُ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী করেছেন। তাঁর পরে মুসলিমগণও কুরবানী করেছেন। এটিই ধারাবাহিক অনুসৃত আমল ও সুন্নাহ। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১২৪
জামে তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে, এক ব্যক্তি ইবনে উমর রা.-কে উপরিউক্ত প্রশ্ন করলে তিনি ওপরের কথাটি বলেন। সে আবার প্রশ্ন করলে তিনি বললেন–
أَتَعْقِلُ؟ ضَحَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالمُسْلِمُونَ.
قال الترمذي: هذا حديث حسن.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী করেছেন; তাঁর পরে মুসলিমগণও কুরবানী করেছেন– (আমি একথা বলার পরও কি) তুমি বোঝ না!? –জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৬
কার ওপর কুরবানী ওয়াজিব?
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলংকার, বসবাস ও সাংসারিক খরচের প্রয়োজন আসে না– এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় মূল্যবান সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নেসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নেসাব হল– তা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা, রুপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয়, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। –আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫
নেসাবের মেয়াদ
কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে (১০, ১১, ১২ যিলহজ্ব) যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে। এমনকি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে গেলেও কুরবানী ওয়াজিব হবে। –বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২
কুরবানীর সময়কাল
যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাযের পর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানী করা যায়। তবে সবচেয়ে উত্তম হল, প্রথম দিন কুরবানী করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন। –বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
যেসব পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য বন্য প্রাণী যেমন : হরিণ, বন্য গরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। –ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
لَا تَذْبَحُوا إِلّا مُسِنّةً، إِلّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضّأْنِ.
তোমরা কুরবানীতে ‘মুছিন্না’ ছাড়া জবাই করো না। যদি তা পাওয়া দুষ্কর হয়, তবে ৬ মাস বয়সের ভেড়া-দুম্বা জবাই করতে পার। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১৭৯
ইমাম নববী রাহ. বলেন, মুছিন্না হল, ৫ বছর বয়সি উট, ২ বছরের গরু বা মহিষ এবং ১ বছর বয়সি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা। –শরহু মুসলিম, ইমাম নববী ২/১৫৫
আরও দেখুন : তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ৩/৫৫৮
মাসআলা : কুরবানীর জন্য উট কমপক্ষে ৫ বছর এবং গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছর বয়সি হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ন্যূনতম ৬ মাস বা তার বেশি বয়সের কোনো ভেড়া বা দুম্বা যদি হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার কারণে ১ বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। ৬ মাসের কম হলে জায়েয হবে না।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে তা দ্বারা কোনো অবস্থাতেই কুরবানী করা জায়েয হবে না। –ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬
কুরবানীর পশুর দাঁত ওঠা কি জরুরি?
কুরবানীর পশু কিনতে গেলে দেখা যায়, লোকেরা পশুর দাঁত দেখে। কুরবানীর জন্য গরু, মহিষ দুই বছর এবং ছাগল এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি; বিশেষ দাঁত ওঠা জরুরি নয়।
তাই কোনো গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদির ব্যাপারে যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, কুরবানীর নির্ধারিত বছর পূর্ণ হয়েছে; কিন্তু এখনো বিশেষ দাঁত ওঠেনি, তাহলে সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবে।
যেহেতু কুরবানীর নির্ধারিত বছর পূর্ণ হলেই পশুর বিশেষ দাঁত উঠে থাকে, তাই দাঁতকে নির্ধারিত বছর পূর্ণ হওয়ার আলামত মনে করা হয়। একারণেই কুরবানীর পশু কিনতে গেলে মানুষ দাঁত দেখে থাকে। এতে আপত্তির কিছু নেই। –বাযলূল মাজহূদ ১৩/১৮; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৬১১-৬১৩
পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথার গ্রহণযোগ্যতা
যদি বিক্রেতা বলে, কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে এবং পশুর শারীরিক গঠন দেখেও তা-ই মনে হয়, তাহলে বিক্রেতার কথার ওপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। –আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী শফী রাহ. পৃ. ৫
কুরবানীর জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পশু নির্বাচন করা
ইউনুস ইবনে মাইসারা ইবনে হালবাস রাহ. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী আবু সাঈদ যুরাকী রা.-এর সঙ্গে কুরবানীর পশু কিনতে যাই।
ইউনুস ইবনে মাইসারা রাহ. বলেন–
فَأَشَارَ أَبُو سَعِيدٍ إِلَى كَبْشٍ أَدْغَمَ، لَيْسَ بِالْمُرْتَفِعِ وَلَا الْمُتضِعِ فِي جِسْمِه، فَقَالَ: اشْتَرِ لِي هَذَا، كَأَنَّهُ شَبَّهَهُ بِكَبْشِ رَسُولِ اللهِ صلّূى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
আবু সাঈদ রা. একটি ‘আদগাম’ দুম্বার দিকে ইশারা করলেন, যা খুব মোটাও নয় এবং একেবারে জীর্ণও নয়। দুম্বাটির দিকে ইশারা করে বললেন, আমার জন্য এটি খরিদ কর। যেন তিনি এই দুম্বাটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুম্বার সদৃশ গণ্য করেছেন। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১২৯
(‘আদগাম’ অর্থ হল, যে পশুর মধ্যে কালো রঙের মিশ্রণ থাকে, বিশেষ করে কানে ও চোয়ালের নিচে।)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন–
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ، يَطَأُ فِي سَوَادٍ، وَيَبْرُكُ فِي سَوَادٍ، وَيَنْظُرُ فِي سَوَادٍ، فَأُتِيَ بِهٖ لِيُضَحِّيَ بِه...
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী করার জন্য শিং-বিশিষ্ট একটি দুম্বা আনার নির্দেশ দিলেন, যার হাত-পা কালো, চোখও কালো। দুম্বাটি আনা হল। তিনি বললেন, আয়েশা! ছুরি নিয়ে আসো। (ছুরি আনা হল।) বললেন, পাথরে ঘষে ধার কর। আয়েশা রা. ধার করে আনলেন। তখন তিনি ছুরিটা নিলেন। এরপর দুম্বাটিকে শোয়ালেন এবং জবাই করলেন। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯২
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন–
ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِه، وَسَمَّى وَكَبَّرَ، وَوَضَعَ رِجْلَه عَلূى صِفَاحِهِمَا.
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি সাদা-কালো বর্ণের বড় শিং-বিশিষ্ট নর দুম্বা কুরবানী করলেন।
তিনি গর্দানে পা রেখে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বলে নিজ হাতে জবাই করলেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৬
যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয নয়
বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
أَرْبَعٌ لَا يُضَحَّى بِهِنَّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلَعُهَا، وَالْعَجْفَاءُ الَّتِي لَاتُنْقِي.
অর্থাৎ চার ধরনের পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে না–
১. যে পশুর চোখের জ্যোতি ক্ষতিগ্রস্ত।
২. যে পশু অতি রুগ্ণ।
৩. যে পশু বেশি খোঁড়া।
৪. যে পশু অতি শীর্ণকায়। –সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৯; সুনানে দারেমী, হাদীস ১৯৯২; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১৯০৯৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১৪৪; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৯
আলী ইবনে আবী তালেব রা. বলেন–
نهى رسولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أن يُضَحّى بالمُقابَلَةِ أو بمُدابَرَةٍ أو شَرْقاءَ أو خَرْقاءَ أو جَدْعاءَ.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কানের অগ্রভাগ কাটা প্রাণী, কানের গোড়া থেকে কেটে ঝুলে আছে এমন প্রাণী, কান ফেটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়া প্রাণী, কানে গোল ছিদ্রবিশিষ্ট প্রাণী ও কান বা নাক একেবারে কেটে গেছে– এমন প্রাণী কুরবানী করতে নিষেধ করেছেন। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬০৯
আলী রা. বলেন–
أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَسْتَشْرِفَ العَيْنَ وَالأُذُنَ.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে (হাদী ও কুরবানীর) প্রাণীর চোখ ও কান সুস্থ হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখার আদেশ করেছেন। –জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯২০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩১৪৩
মাসআলা : এমন শুকনো ও দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। –জামে তিরমিযী ১/২৭৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪
মাসআলা : যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যার দরুন মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। কিন্তু শিং ভাঙার কারণে যদি মস্তিষ্কে আঘাত না পৌঁছে, তাহলে সে পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। তাই যে পশুর শিং অর্ধেক বা কিছু অংশ ফেটে বা ভেঙে গেছে কিংবা শিং একেবারেই ওঠেনি, সে পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। –জামে তিরমিযী ১/২৭৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪
মাসআলা : যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা, সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের কম কাটা হয়, তাহলে তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয।
উল্লেখ্য, জন্মগতভাবেই যদি কোনো পশুর কান ছোট হয়, সেক্ষেত্রে তা দ্বারা কুরবানী করতে অসুবিধা নেই। –জামে তিরমিযী ১/২৭৫; মুসনাদে আহমাদ ১/৬১০; ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৭-২৯৮; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫২
উট, গরু বা মহিষে ৭ পর্যন্ত অংশীদার হওয়া যায়
উট, গরু বা মহিষে এক থেকে সাত পর্যন্ত যে-কোনো ভাগেই কুরবানী করা যায়। আর ভেড়া, দুম্বা বা ছাগল একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়। একাধিক অংশে তা কুরবানী করা জায়েয নয়।
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন–
خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مُهِلِّينَ بِالْحَجِّ : فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنْ نَشْتَرِكَ فِي الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ، كُلّ سَبْعَةٍ مِنّا فِي بَدَنَةٍ.
আমরা হজ্বের ইহরাম বেঁধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। তিনি আমাদেরকে প্রতি উট ও গরুতে সাত জন করে শরীক হয়ে কুরবানী করার আদেশ করলেন। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩১৮
আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
الْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْجَزُورُ عَنْ سَبْعَةٍ.
একটি গরু সাত জনের পক্ষ থেকে এবং একটি উট সাত জনের পক্ষ থেকে (কুরবানী করা যাবে)। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৮০৮
উপরিউক্ত হাদীসদুটি থেকে প্রমাণিত যে, একটি উট, গরু বা মহিষ সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। এটি অধিকাংশ আহলে ইলমেরও মত।
মাসআলা : উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যে-কোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। অর্থাৎ কুরবানীর পশুতে এক সপ্তমাংশ বা এর অধিক যে-কোনো অংশে অংশীদার হওয়া জায়েয। এক্ষেত্রে ভগ্নাংশ যেমন, দেড় ভাগ, আড়াই ভাগ, সাড়ে তিন ভাগ হলেও কোনো সমস্যা নেই। –বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : সাত জনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হবে না। যেমন : কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। –বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
কুরবানী ও আকীকা আলাদাভাবেই করা উচিত। তবে একত্রে করলে আদায় হবে না– তা নয়। একত্রে করলেও কুরবানী-আকীকা দুটোই আদায় হবে। কারণ আকীকাও একধরনের কুরবানী। হাদীস শরীফে আকীকার ওপরও ‘নুসুক’ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। আর এখানে ‘নুসুক’ অর্থ কুরবানী।
হাদীসের আরবী পাঠ এই–
سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْعَقِيقَةِ فَقَالَ: لَا أُحِبُّ الْعُقُوق، كَأَنَّه كَرِهَ الِاسْمَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، نَسْأَلُكَ عَنْ أَحَدِنَا يُولَدُ لَه، فَقَالَ: مَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَنْسُكَ عَنْ وَلَدِه فَلْيَفْعَلْ، عَلَى الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافَأَتَانِ، وَعَلَى الْجَارِيَةِ شَاةٌ.
[দ্র. মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ৭৯৬১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৭১৩, ৬৭২২; সুনানে আবু দাউদ (আকীকা অধ্যায়), হাদীস ২৮৪২; সুনানে নাসায়ী ৭/১৬২, হাদীস ৪২১২]
আকীকাও যখন এক প্রকারের কুরবানী, তখন একটি গরু বা উট দ্বারা একাধিক ব্যক্তির (সাত জন পর্যন্ত) আলাদা-আলাদা কুরবানী আদায় হওয়ার হাদীসগুলো থেকে কুরবানী-আকীকা একত্রে আদায়ের অবকাশও প্রমাণিত হয়। এটা শরীয়তের পক্ষ হতে প্রশস্ততা যে, গরু বা উটের ক্ষেত্রে একটি ‘জবাই’ সাত জনের সাতটি জবাইয়ের স্থলাভিষিক্ত গণ্য হয়। একারণে একটি উট বা গরু সাত জনের পক্ষে যথেষ্ট হয়।
মাসআলা : কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে পৃথক অংশে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে। –ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫০; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : মাসিক আলকাউসার, সফর ১৪৩৪/জানুয়ারি ২০১৩, ‘দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর : ইয়াওমে আরাফার রোযা ও কুরবানির সাথে আকীকা’, মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ
আরও দেখুন : যিলহজ্ব ১৪৪২/জুলাই ২০২১, ‘একটি গরুতে একই ব্যক্তির কুরবানীর সাথে আকীকা বা ঈসালে সাওয়াবের অংশ রাখা : একটি দালীলিক পর্যালোচনা’, মাওলানা মুহাম্মাদ আনোয়ার হুসাইন
নবীজী জবাই করার সময় কী দুআ পড়তেন?
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দুইটি দুম্বা কুরবানী করেছেন। যখন তিনি দুম্বাগুলো কেবলামুখী করে শুইয়েছেন, তখন এই দুআ পড়েছেন–
إِنِّيْ وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَّمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، لَا شَرِيْكَ لَه وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ، بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللّٰهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ.
অর্থ : আমি সম্পূর্ণ একনিষ্ঠভাবে সেই সত্তার দিকে নিজের মুখ ফেরালাম, যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং যারা শিরক করে, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত (কুরবানী) এবং আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের রব (মালিক ও প্রতিপালক)। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এরই হুকুম দেওয়া হয়েছে এবং আমিই (এই উম্মতের) প্রথম আনুগত্য স্বীকারকারী। বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।
হে আল্লাহ! এ পশু আপনারই পক্ষ থেকে [অর্জন হয়েছে] এবং আপনারই জন্য [কুরবানী করছি।] –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ২৮৯৯; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ১৭১৬
কখনো কুরবানী করার সময় শুধু বলেছেন–
بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ
(দ্র. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৮১০; জামে তিরিমিযী, হাদীস ১৫২১)
কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবাই করা উত্তম
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবাই করতেন।
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন–
ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِه، وَسَمَّى وَكَبَّرَ...
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি সাদা-কালো বর্ণের বড় শিং-বিশিষ্ট নর দুম্বা কুরবানী করলেন।
তিনি ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বলে নিজ হাতে জবাই করলেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৬
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ঈদগাহে ঈদুল আযহার নামায আদায় করলাম। খুতবা (নামায) শেষে তাঁর কাছে একটি দুম্বা আনা হল। তিনি নিজ হাতে দুম্বাটিকে জবাই করলেন। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৮৯৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৮১০; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২১
জবাইয়ের সময় পশুকে অযথা কষ্ট না দেওয়া
অনেক সময় জবাইয়ের মুহূর্তে পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া হয়। যেমন, জবাই করার অনেক আগে পশুকে বেঁধে শুইয়ে রাখা হয়। তেমনি জবাইয়ের জন্য প্রস্তুত করার সময় অপ্রয়োজনে টানা-হ্যাঁচড়া করা হয়; যাতে পশুর অনেক কষ্ট হয়। বিশেষ করে অমসৃণ রাস্তা বা পাথুরে জমিনের ওপর যদি পশুকে টানা-হ্যাঁচড়া করা হয়, তখন পশুর কষ্ট অনেক বেশি হয়।
তেমনি এক পশুর সামনে আরেক পশুকে জবাই করা, জবাইয়ের ছুরি ধারালো না হওয়া, জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া ছেলা ইত্যাদি সবই পশুকে কষ্ট দেওয়ার শামিল। এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর পশুর আরামের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। পশু জবাই করার আগে; বরং পশুকে মাটিতে শোয়ানোর আগেই ছুরি ধার দিয়ে নিতেন। পূর্বে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে শিং-বিশিষ্ট একটি দুম্বা আনা হল কুরবানী করার জন্য। তখন তিনি বললেন–
يَا عَائِشَةُ! هَلُمِّي الْمُدْيَةَ. ثُمَّ قَالَ: اشْحَذِيهَا بِحَجَرٍ، فَفَعَلَتْ، ثُمَّ أَخَذَهَا وَأَخَذَ الْكَبْشَ فَأَضْجَعَه ثُمَّ ذَبَحَه.
আয়েশা! ছুরি নিয়ে আসো। (ছুরি আনা হল।) নবীজী বললেন, ছুরিটি পাথরে ঘষে ধার কর। আয়েশা রা. ধার করে আনলেন। এরপর নবীজী দুম্বাটিকে ধরে শোয়ালেন এবং জবাই করলেন। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯২
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে দেখিয়েছেন, কীভাবে জবাই করলে পশুর কষ্ট কম হয়। সাথে সাথে মৌখিকভাবেও নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন উত্তম পন্থায় জবাই করা হয়। পশুর কষ্ট কম হয়।
শাদ্দাদ ইবনে আউস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَه، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَه.
আল্লাহ তাআলা সবকিছুর প্রতি অনুগ্রহ করা অপরিহার্য করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে, উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করবে। যখন জবাই করবে উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করবে। জবাইকারী যেন তার ছুরিতে শান দিয়ে নেয় এবং পশুর কষ্ট লাঘব করে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৫৫; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৪১৩
জবাইয়ে ছুরি চালনায় একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে...
জবাইয়ে ছুরি চালনায় একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে প্রত্যেককে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। –রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪
কুরবানীর গোশতের ব্যাপারে নবীজীর নির্দেশনা
কুরবানীর গোশত বণ্টন
কুরবানীর গোশত বণ্টনের বিষয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের বিবরণ দিতে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন–
يُطْعِمُ أَهْلَ بَيْتِهِ الثُّلُثَ، وَيُطْعِمُ فُقَرَاءَ جِيرَانِهِ الثُّلُثَ، وَيَتَصَدَّقُ عَلَى السُّؤَّالِ بِالثُّلُثِ
رَوَاهُ الْحَافِظُ أَبُو مُوسَى الْأَصْفَهَانِيُّ، فِي الْوَظَائِفِ، وَقَالَ: حَدِيثٌ حَسَنٌ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ পরিবারের লোকদের খাওয়াতেন, এক তৃতীয়াংশ অভাবী প্রতিবেশীদের খাওয়াতেন আর এক তৃতীয়াংশ যাঞ্চাকারীদের দান করতেন। –আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৯/৪৪৮
সাহাবায়ে কেরাম রা.-ও কুরবানীর গোশত তিন ভাগে বণ্টনের এই নীতির অনুসরণ করতেন। আলকামা রাহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মিনায় জবাই করার জন্য আমার সঙ্গে একটি পশু প্রেরণ করেছেন এবং বলেছেন–
كُلْ أَنْتَ وَأَصْحَابُكَ ثُلُثًا، وَتَصَدَّق بِثُلُثِه، وَابْعَثْ إِلَى آلِ أَخِي عُتْبَةَ بِثُلُثٍ.
জবাই করার পর এক তৃতীয়াংশ তুমি ও তোমার সাথি-সঙ্গী খাবে, এক তৃতীয়াংশ সদকা করবে আর এক তৃতীয়াংশ আমার ভাই উতবার পরিবারে প্রেরণ করবে। –আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ৯/৩৪২ (৯৭০২); কিতাবুল আছার, আবু হানীফা (রেওয়ায়েত আবু ইউসুফ), বর্ণনা ৫৮২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৩৩৫৬
উল্লেখ্য, কুরবানীর গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব; আবশ্যক নয়। এমনিভাবে একেবারে ওজন করে তিন ভাগ করাও আবশ্যক নয়। কুরবানীদাতা চাইলে এতে কম-বেশি করতে পারবে।
আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
كُلُوا، وَأَطْعِمُوا، وَاحْبِسُوا، أَوْ ادَّخِرُوا.
তোমরা কুরবানীর গোশত নিজেরা খাও, অন্যদের খাওয়াও এবং (যতটুকু ইচ্ছা) জমা করে রাখো। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৩
কুরবানীর গোশত বণ্টনে এজাতীয় প্রথা পরিহার করুন
কোনো কোনো এলাকায় কুরবানীর গোশত বণ্টনের একটি সমাজপ্রথা চালু আছে। সমাজের নিয়ম হল, এলাকার যারা কুরবানী করেন, তাদের কুরবানীর গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে সমাজে জমা করতে হয়। পরবর্তীতে এই গোশত– নির্দিষ্ট সমাজভুক্ত সকল ব্যক্তিবর্গ, যারা কুরবানী করেছেন এবং যারা কুরবানী করেননি– সবার মধ্যে বণ্টন করা হয়।
কুরবানীর গোশত বণ্টনের এজাতীয় পদ্ধতি সাধারণ দৃষ্টিতে একটি ভালো উদ্যোগ মনে হতে পারে; কিন্তু কোনো সামাজিক প্রথা বা রীতি পালন করার জন্য তা শরীয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ ও আমলযোগ্য কি না– তাও নিশ্চিত হতে হয়। ভালো নিয়ত থাকলেও শরীয়ত সমর্থন করে না অথবা ইসলামের নীতির সাথে মানানসই নয়– এমন কোনো কাজ করা বা এমন কোনো রীতি অনুসরণ করার সুযোগ নেই।
উল্লিখিত সমাজপ্রথাটিতে উদ্দেশ্য ভালো হলেও যে পদ্ধতিতে তা করা হয়, এতে শরীয়তের দৃষ্টিতে মৌলিক কিছু আপত্তি রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল, সামাজিক এ প্রথার কারণে সকলেই তার কুরবানীর এক তৃতীয়াংশ গোশত সমাজের লোকদের হাতে দিতে বাধ্য থাকে এবং এর বিলি-বণ্টন ও গ্রহীতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু সমাজপতিদেরই হাত থাকে। গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা শরীয়তসম্মত নয়। কেননা শরীয়তে কুরবানী ও গোশত বণ্টন একান্তই কুরবানীদাতার নিজস্ব বিষয়।
ঈদের দিন সম্মিলিতভাবে জামাতে নামায আদায় করতে বলা হলেও কুরবানীদাতা কত মূল্যের পশু কিনবে, সে পশু কোথায় জবাই করবে, গোশত কীভাবে বণ্টন করবে– এ বিষয়গুলো কুরবানীদাতার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শরীয়তে কুরবানীর কিছু গোশত সদকা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের কুরবানীর গোশত দিতে তাকিদও দেওয়া হয়েছে (যা আমরা ওপরের আলোচনা থেকে জেনেছি); কিন্তু তা কুরবানীদাতার ওপর অপরিহার্য করা হয়নি। বরং কুরবানীদাতা কী পরিমাণ গোশত নিজে রাখবে, কী পরিমাণ সদকা করবে এবং কাকে কাকে বিলি করবে আর কী পরিমাণ আগামীর জন্য সংরক্ষণ করবে– এগুলো কুরবানীদাতার একান্তই নিজস্ব ব্যাপার এবং ব্যক্তিগতভাবে করার কাজ। এটিকে সামাজিক নিয়মে নিয়ে আসা ঠিক নয়।
তাই শরীয়তের মাসআলা জানা না থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোশত বণ্টনের উল্লিখিত যে পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে, তা পরিহারযোগ্য।
কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা
আবু মূসা আশআরী রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
نَهَيْتُكُمْ عن زِيارَةِ القُبُورِ فَزُورُوها، ونَهَيْتُكُمْ عن لُحُومِ الأضاحي فَوْقَ ثَلاثٍ، فأمْسِكُوا ما بَدا لَكُم...
আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত কর। তোমাদেরকে কুরবানীর গোশত তিন দিনের পরে খেতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমাদের খুশিমতো তা সংরক্ষণ করে রাখতে পারো... । –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭৭; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২০৩৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৬৯৮
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াকেদ রাহ. বলেন–
نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَكْلِ لُحُومِ الضَّحَايَا بَعْدَ ثَلَاثٍ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিনের পর কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. বলেন, আমি আমরা (বিনতে আবদুর রহমান রা.)-এর সামনে বিষয়টি পেশ করলে তিনি বললেন, ইবনে ওয়াকেদ সত্যই বলেছে। আমি আয়েশা রা.-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় ঈদুল আযহার সময় বেদুঈনদের কিছু পরিবার শহরে আগমন করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তিন দিনের পরিমাণ জমা রেখে কুরবানীর বাকি গোশতগুলো সদকা করে দাও।
পরবর্তী সময়ে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষেরা তো কুরবানীর পশুর চামড়া দিয়ে পাত্র প্রস্তুত করছে এবং তার মাঝে চর্বি গলাচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাতে কী হয়েছে?
তারা বলল, আপনিই তো তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত খেতে বারণ করেছেন।
তখন নবীজী বললেন–
إِنَّمَا نَهَيْتُكُمْ مِنْ أَجْلِ الدَّافَّةِ الَّتِي دَفَّتْ، فَكُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا.
আমি তো তখন বেদুঈনদের আগমনের কারণে একথা বলেছিলাম। এখন তোমরা খেতে পার, জমা করে রাখতে পার এবং সদকা করতে পার। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭১
কুরবানীর পশুর গোশত-চর্বি বিক্রি করা যাবে না
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
إِنِّي كُنْتُ أَمَرْتُكُمْ أَنْ لَا تَأْكُلُوا الْأَضَاحِيّ فَوْقَ ثَلَاثَةِ أَيّامٍ لِتَسَعَكُمْ، وَإِنِّي أُحِلّهُ لَكُمْ، فَكُلُوا مِنْهُ مَا شِئْتُمْ، وَلَا تَبِيعُوا لُحُومَ الْهَدْيِ، وَالْأَضَاحِيِّ فَكُلُوا، وَتَصَدّقُوا، وَاسْتَمْتِعُوا بِجُلُودِهَا، وَلَا تَبِيعُوهَا، وَإِنْ أُطْعِمْتُمْ مِنْ لَحْمِهَا، فَكُلُوا إِنْ شِئْتُمْ.
আমি তোমাদেরকে কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি খেতে নিষেধ করেছিলাম; যাতে তোমরা সবাই তা পেয়ে যাও। এখন আমি তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি। সুতরাং যতদিন ইচ্ছা তা খেতে পার। আর তোমরা ‘হাদী’ ও কুরবানীর গোশত বিক্রি কর না। নিজেরা খাও এবং অন্যদেরকে দান কর। আর এগুলোর চামড়া নিজেদের কাজে ব্যবহার করো; তবে তা বিক্রি কর না। তোমাদেরকে যদি এর গোশত খেতে দেওয়া হয়, তাহলে তোমরা চাইলে তা খেতে পার। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬২১০
মাসআলা : কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত, চর্বি– কোনো কিছু বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। –ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫৪; ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০১
কুরবানীর পশুর চামড়া ব্যবহার ও বিক্রি
কুরবানীর পশুর চামড়া কুরবানীদাতা নিজে ব্যবহার করতে পারবে, অন্যকেও হাদিয়া দিতে পারবে। কুরবানীর চামড়ার মূল্য সদকা করার নিয়তে তা বিক্রিও করা যাবে। কিন্তু কুরবানীর পশুর চামড়া নিজে ভোগ করার নিয়তে বিক্রি করা জায়েয নেই।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
مَنْ بَاعَ جِلْدَ أُضْحِيّتِه فَلاَ أُضْحِيّةَ لَه.
قال الحاكم: هূذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ مِثْل الأولِ وَلَمْ يُخرجَاهُ.
যে ব্যক্তি তার কুরবানীর পশুর চামড়া (নিজে ভোগ করার নিয়তে) বিক্রি করবে, তার কুরবানী শুদ্ধ হবে না। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩৪৬৮) –আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১
কুরবানীর পশুর গোশত-চামড়া পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না
আলী ইবনে আবী তালিব রা. বলেন-
أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِه، وَأَنْ أَتَصَدّقَ بِلَحْمِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلّتِهَا، وَأَنْ لاَ أُعْطِيَ الْجَزّارَ مِنْهَا، قَالَ: نَحْنُ نُعْطِيهِ مِنْ عِنْدِنَا.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর (কুরবানীর উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কুরবানীর পশুর গোশত, চামড়া, আচ্ছাদনের কাপড় সদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেছেন, আমি তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজের পক্ষ থেকে দেব। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩১৭; সহীহ বুখারী, হাদীস ১৭১৬
সুতরাং কুরবানীর গোশত, চামড়া ইত্যাদি পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। অবশ্য নির্ধারিত পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসেবে কাঁচা গোশত বা রান্না গোশত দেওয়া যাবে। –আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮
জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
কুরবানীর পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর চামড়া বা কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। –আলমাবসূত, সারাখসী ১৬/৪০; আলজাওহারাতুন নায়্যিরাহ ১/৩৪৮
কাজের মানুষকে কুরবানীর গোশত দেওয়া বা খাওয়ানো
কুরবানীর পশুর গোশত বা অন্য কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। তাই পারিশ্রমিক হিসাবে ঘরের কাজের মানুষকে কুরবানীর গোশত বা অন্য কোনো কিছু দেওয়া যাবে না। অবশ্য পারিশ্রমিকের নিয়ত ছাড়া ঘরের অন্য সদস্যদের মতো কাজের মানুষদেরও কুরবানীর গোশত খাওয়ানো বা দেওয়া যাবে। –আহকামুল কুরআন, জাস্সাস ৩/২৩৭; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪; আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬; ইমদাদুল মুফতীন, পৃ. ৮০২
অন্য কারও ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে
অন্যের ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি সাপেক্ষে আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো। –বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১১
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী দেশে করা
এক দেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির কুরবানী অন্য দেশেও আদায় করা জায়েয। তাই চাইলে বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি নিজ কুরবানী দেশেও আদায় করতে পারবে। এতে অসুবিধা নেই। –ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫; আদ্দুররুল মুখতার ৬/২৯৬
কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে হলে কখন জবাই করবে?
কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে, ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। –আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে, তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে এবং তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ওসিয়তের কুরবানী করা হয়, তাহলে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না; গরিব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। –মুসনাদে আহমাদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫; ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬; ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৫২
ঈদুল আযহার দিনের বিশেষ কিছু সুন্নাত-আদাব
ঈদের দিনের সুন্নতসমূহের মধ্যে কিছু সুন্নত এমন, যা ঈদুল ফিতরের সাথে খাছ। যেমন–
* সদাকাতুল ফিতর আদায় করা।
* ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে যাওয়া।
আবার কিছু সুন্নত-মুস্তাহাব-আদাব এমন, যা উভয় ঈদেই রয়েছে। যেমন–
* গোসল করা।
* উত্তম পোশাক পরিধান করা।
* তাকবীর বলা।
* পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া।
* এক পথে যাওয়া, ভিন্ন পথে ফেরা।
* একে-অপরের জন্য দুআ করা।
কিছু সুন্নত-মুস্তাহাব রয়েছে, কেবল ঈদুল আযহার সাথে খাছ। যেমন–
* প্রথমে ঈদের নামায তারপর কুরবানী করা।
* ঈদের নামাযের আগে কিছু না খাওয়া; কুরবানীর পর কুরবানীর গোশত থেকে খাওয়া।
এসকল সুন্নত-আদাব থেকে ঈদুল আযহায় বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন– এমন কয়েকটি বিষয় আলোচনা করা হল :
ঈদের নামায সকাল সকাল
দুই ঈদেই ঈদের নামায সকাল সকাল পড়া চাই। বিশেষ করে ঈদুল আযহায়। কারণ এ ঈদে কুরবানীর আমল রয়েছে; যা ঈদের নামাযের আগে করা যায় না এবং তা সময়সাপেক্ষ আমল। তেমনি ঈদুল আযহার যে আরেকটি সুন্নত– ‘সকালে কিছু না খেয়ে কুরবানী গোশত থেকে খাওয়া’– এর জন্যও সকাল সকাল নামায আদায় করা দরকার।
তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে খুমাইর রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
خَرَجَ عَبْدُ اللهِ بْنُ بُسْرٍ، صَاحِبُ رَسُولِ اللهِ صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مَعَ النّاسِ فِي يَوْمِ عِيدِ فِطْرٍ، أَوْ أَضْحَى، فَأَنْكَرَ إِبْطَاءَ الْإِمَامِ، فَقَالَ: إِنا كُنّا قَدْ فَرَغْنَا سَاعَتَنَا هذِهِ، وَذلِكَ حِينَ التسْبِيحِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুস্র রা. ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার দিন লোকদের সাথে ঈদের নামায পড়ার জন্য ঈদগাহে গেলেন। ইমামের আসতে বিলম্ব হলে তিনি এর প্রতিবাদ করলেন এবং বললেন, এ সময় তো আমরা (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) নামায পড়ে ফারেগ হয়ে যেতাম। (রাবী বলেন,) আর এটা নফলের (অর্থাৎ চাশতের) সময় ছিল। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩১৭
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে বুস্র রা. সিরিয়ায় অবস্থান অবলম্বন করে নিয়েছিলেন এবং সেখানকার ‘হিম্স’ নামক স্থানে তাঁর ইন্তেকাল হয়। সম্ভবত সেখানকার এ ঘটনা যে, ঈদের নামাযে ইমামের বিলম্ব করার ওপর তিনি আপত্তি ওঠালেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমরা ঈদের নামায সকাল সকাল পড়ে ফারেগ হয়ে যেতাম। (মাআরিফুল হাদীস)
আগে ঈদের নামায তারপর কুরবানী
বারা ইবনে আযিব রা. বলেন–
خَطَبَنَا النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَوْمَ النّحْرِ، قَالَ: إِنّ أَوّلَ مَا نَبْدَأُ بِه فِي يَوْمِنَا هذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمّ نَرْجِعَ، فَنَنْحَرَ فَمَنْ فَعَلَ ذلِكَ فَقَدْ أَصَابَ سُنّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَإِنّمَا هُوَ لَحْمٌ عَجّلَه لِأَهْلِه، لَيْسَ مِنَ النّسُكِ فِي شَيْءٍ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, এই দিনে আমাদের প্রথম কাজ নামায আদায় করা। এরপর কুরবানী করা। সুতরাং যে এভাবে করেছে তার কাজ আমাদের তরীকা মতো হয়েছে। আর যে আগেই জবাই করেছে, (তার কাজ তরীকা মতো হয়নি। অতএব,) তা তার পরিবারের জন্য সময়ের আগেই পাঠানো গোশত, কুরবানী নয়। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯০৭
আরেক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصّلاَةِ فَإِنّمَا ذَبَحَ لِنَفْسِه، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصّلاَةِ فَقَدْ تَمّ نُسُكُه، وَأَصَابَ سُنّةَ المُسْلِمِينَ.
যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানীর পশু জবাই করেছে, সেটা তার নিজের জন্য সাধারণ জবাই হবে। আর যে নামাযের (ও খুতবার) পরে জবাই করেছে, তার কুরবানী পূর্ণ হয়েছে এবং সে-ই মুসলমানদের রীতি অনুসরণ করেছে। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৫৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬১
ঈদুল আযহায় নবীজী কুরবানীর গোশত থেকে প্রথম আহার গ্রহণ করতেন
বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَغْدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتَّى يَأْكُلَ، وَلَا يَأْكُلُ يَوْمَ الْأَضْحَى حَتَّى يَرْجِعَ، فَيَأْكُلَ مِنْ أُضْحِيَّتِه.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন (ঈদগাহে) কিছু না খেয়ে বের হতেন না আর কুরবানীর দিন (ঈদগাহ থেকে) ফিরে আসার পূর্বে কোনো কিছু খেতেন না; (ঈদগাহ থেকে ফিরেই কুরবানী করতেন এবং) কুরবানীর গোশত থেকে (প্রথম) আহার গ্রহণ করতেন। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৯৮৪; সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ১৭১৫
ঈদের দিন একে অপরের সাথে দেখা হলে বলবে...
ঈদের দিনের একটি দুআ সাহাবায়ে কেরামের মাঝে প্রচলন ছিল। এ দুআর মূলকথা হল, আমলের পর পরস্পরে আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার দুআ করা। রোযার ঈদে এক মাস রোযা, তারাবী, তিলাওয়াত ইত্যাদি আমলের পর ঈদের দিন কবুলিয়াতের জন্য দুআ করা আর ঈদুল আযহার দিন কুরবানী যেন আল্লাহ কবুল করেন, সেজন্য পরস্পরে দুআ করা।
জুবায়ের ইবনে নুফাইর রাহ. বলেন–
كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ إِذَا الْتَقَوْا يَوْمَ الْعِيْدِ يَقُولُ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكَ.
সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন–
تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكَ.
আল্লাহ কবুল করুন আমাদের পক্ষ হতে ও আপনার পক্ষ হতে। –ফাতহুল বারী ২/৫১৭
ইখলাসই প্রথম কথা, ইখলাসই শেষ কথা
প্রথম ও শেষ কথা– সকল আমলের ক্ষেত্রে তো বটেই, বিশেষ করে কুরবানীর ক্ষেত্রে ভালোভাবে স্মরণ রাখি এবং বারবার একথার মুরাকাবা করি– ইখলাস ও তাকওয়া হল কুরবানীর রূহ ও প্রাণ। তাকওয়া ও ইখলাস থাকলে কুরবানী সার্থক; অন্যথায় তা অন্তঃসারশূন্য একটি আমল মাত্র।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন–
لَنْ یَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَ لٰكِنْ یَّنَالُهُ التَّقْوٰی مِنْكُمْ، كَذٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰی مَا هَدٰىكُمْ، وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِیْنَ.
আল্লাহর কাছে পশুর গোশত পৌঁছে না আর পশুর রক্তও না; বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর, তিনি তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন বলে। যারা সুচারুরূপে সৎকর্ম করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও। –সূরা হজ্ব (২২) : ৩৭
স্মরণ করুন নবীজীর মুখনিঃসৃত দুআ, যা তিনি কুরবানী করার সময় পড়েছেন–
إِنِّيْ وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَّمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، لَا شَرِيْكَ لَه وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ، بِسْمِ اللهِ واللهُ أَكْبَرُ، اَللّٰهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ.
অর্থ : আমি সম্পূর্ণ একনিষ্ঠভাবে সেই সত্তার দিকে নিজের মুখ ফেরালাম, যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং যারা শিরক করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত (কুরবানী) এবং আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের রব [মালিক ও প্রতিপালক]। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এরই হুকুম দেওয়া হয়েছে এবং আমিই (এই উম্মতের) প্রথম আনুগত্য স্বীকারকারী। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।
হে আল্লাহ! এ পশু আপনারই পক্ষ থেকে [অর্জিত হয়েছে] এবং আপনারই জন্য [কুরবানী করছি]। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২
আদম আ.-এর দুই সন্তানের যার কুরবানী কবুল হয়েছিল, তার এই ভাষ্য স্মরণ করুন– ‘আল্লাহ তো মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবুল করেন।’
কুরআন মাজীদে তাদের সে কুরবানীর বিবরণ এসেছে এভাবে–
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَاَ ابْنَيْ اٰدَمَ بِالْحَقِّ اِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْاٰخَرِ قَالَ لَاَقْتُلَنَّكَ قَالَ اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ.
আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের কাহিনীটি শুনিয়ে দিন। যখন তারা দুজনে কুরবানী করল এবং একজনের কুরবানী কবুল হল আর অন্যজনেরটি কবুল হল না। তখন সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকীদেরই কুরবানী কবুল করেন। –সূরা মায়েদা (৫) : ২৭
আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়া ও ইখলাসের সাথে কুরবানী করার তাওফীক দান করুন।
[সংকলন ও প্রস্তুতকরণ :
মাওলানা মুহাম্মাদ ফজলুল বারী
নযরে সানী :
মাওলানা মুহাম্মাদ আনোয়ার হুসাইন]