যিলহজ্ব ১৪৪৭   ||   জুন ২০২৬

একই দিনে সারা বিশ্বে রোযা ও ঈদ পালন করার মতবাদ : একটি দলীলবিহীন মতবাদ
‖ ‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন

গত ২০ যিলকদ ১৪৪৭ হিজরী মোতাবেক ০৯ মে ২০২৬ ঈসায়ী রোজ শনিবার, রাজধানীর রমনায় অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত উক্ত সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক উলামায়ে কেরাম এবং দ্বীনী বিভিন্ন ঘরানার প্রতিনিধি আলেমগণ অংশগ্রহণ করেন। ইমাম-খতীব, আলেম-উলামা এবং জেনারেল শিক্ষিত দ্বীনদার সুধীবৃন্দের স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক উপস্থিতি, গভীর মনোযোগ এবং দীর্ঘ সময়জুড়ে সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ উক্ত সেমিনারকে এক হৃদয়গ্রাহী, প্রাণবন্ত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত পরিবেশে রূপ দেয়। সেমিনার হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বাইরের খোলা জায়গায় চেয়ার পাতা ছিল এবং এলইডি স্ক্রিনের ব্যবস্থা ছিল। ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক উপস্থিতি সেখানে বসে মজলিসে শরীক হন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া মোহাম্মাদপুর-এর সম্মানিত মুহতামিম মাওলানা মুফতী মাহমুদুল হাসান দামাত বারাকাতুহুম।

সকাল নয়টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত ছিল সেমিনারের প্রথম অধিবেশন। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক হাফিযাহুল্লাহ, জামিয়াতুন নূর আলইসলামিয়া চট্টগ্রাম-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা ওবায়দুল্লাহ হামযা হাফিযাহুল্লাহ, পটিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতী মাওলানা মুফতী শামসুদ্দিন জিয়া হাফিযাহুল্লাহ, ইমদাদুল উলূম রশিদিয়া মাদরাসা ফুলবাড়িগেট, খুলনা-এর মুহতামিম মাওলানা গোলামুর রহমান হাফিযাহুল্লাহ প্রমুখ প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন।

সকাল সাড়ে দশটা থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ছিল প্রবন্ধ উপস্থাপন পর্ব। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব সেমিনারে উপস্থাপনের জন্য প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত সারগর্ভ প্রবন্ধ প্রস্তুত করেছিলেন। প্রবন্ধটি বই আকারে মুদ্রণ করে সেমিনারে উপস্থিত লোকদেরকে হাদিয়া দেওয়া হয়। সময় সীমাবদ্ধতার কারণে হযরত খতীব ছাহেব পুরো প্রবন্ধ পাঠ না করে তার আলোকে অত্যন্ত জরুরি কিছু বিষয় আলোচনা করেন।

আলোচনার শুরুতে তিনি প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন

‘এ প্রবন্ধে চান্দ্রমাস শুরু করার মুতাওয়ারাস তথা অনুসৃত পদ্ধতি, যার ওপর আমাদের দেশে আমল হয়, তার দলীল পেশ করা হয়েছে। নতুন যে দাবি এসেছে, তার ওপর পর্যালোচনা করা হয়েছে। নতুন দাবির পক্ষে দলীলের নামে যা কিছু পেশ করা হয়, সেগুলোর পর্যালোচনা এখানে মোটামুটি দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ কিতাব আল্লাহর রহমতে প্রস্তুত আছে, সেটার সারসংক্ষেপ হিসেবে এ প্রবন্ধ পেশ করা হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ পড়ে শোনাতেও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাই প্রবন্ধে আলোচিত বিষয়গুলো থেকে অতি সামান্য কিছু বিষয় সেমিনারে পেশ করতে চাচ্ছি।’

খতীব ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের বিশ্লেষণমূলক সারগর্ভ আলোচনার সারাংশ এখানে তুলে ধরা হল

“রোযা ও ঈদ পালন করার অনুসৃত পদ্ধতির দলীল মোটামুটি আমাদের সবারই জানা আছে। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে নিজ এলাকার হেলাল দেখে চান্দ্রমাস শুরু হত। হেলাল না দেখতে পেলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা হল

فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ، فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ.

অর্থাৎ হেলাল দেখা না গেলে মাসের গণনা ত্রিশ পূর্ণ কর। ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়ার পর নতুন মাস শুরু হবে।

২৯ রমযানের সন্ধ্যায় হেলাল দেখা না গেলে সবাই তারাবী পড়তেন, ত্রিশতম রোযার সাহরী খেতেন, রোযা রাখতেন। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলে এসেছে। হাঁ, সাক্ষী এসে যদি বলত, আমরা গত সন্ধ্যায় হেলাল দেখেছি, সেই সাক্ষ্য অনুযায়ী আমল করার কথা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।

এখানে আমরা তিনটি বিষয় পেলাম :

এক. হেলাল দেখা।

দুই. হেলালের সাক্ষ্য।

তিন. হেলাল দেখা না গেলে ত্রিশ দিন পূর্ণ করা।

হেলালের সাক্ষ্যের বিষয়ে তরীকা ছিল নিকটবর্তী এলাকা থেকে সাক্ষ্য এলে, চাই ঠিক সময়ে আসুক বা দেরিতে আসুক, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করেছেন। আগের দিন সন্ধ্যায় মুসাফিরেরা পথে হেলাল দেখে পরের দিন যোহরের পরে এসে সাক্ষ্য পেশ করেছে; নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন এবং ত্রিশতম রোযা ভেঙে ঈদ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঈদের নামাযের সময় যেহেতু পার হয়ে গিয়েছিল, তাই পরের দিন ঈদের নামায আদায় করেছেন।

প্রশ্ন হল, এই যে সাক্ষ্য এল, সেটি কত দূর থেকে এসেছে? কত মাইল দূর থেকে এসেছে? নবীজীর যুগে এক সন্ধ্যায় হেলাল দেখে পরের দিন বিকেলে যে নবীজীর কাছে এসেছিল, কত মাইল দূর থেকে এসেছিল? পাঁচ শ মাইল?! এক শ মাইল দূর থেকে?!

অর্থাৎ যদিও হেলালের সাক্ষ্য পেয়েছেন দেরিতে, কিন্তু সে হেলালের উদয় হয়েছে মদীনার নিকটেই। এজন্য হাদীস ও সীরাতের শিক্ষা হল, নিকটের সাক্ষ্য দেরিতে এলেও গ্রহণ করা। কিন্তু অনেক দূরবর্তী এলাকা থেকে নবীজীর কাছে হেলালের সাক্ষ্য আসার কোনো ঘটনা নবীজীর যামানায় আমাদের জানামতে ঘটেনি। কিন্তু সাহাবাযুগে এমন ঘটনা ঘটেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর আযাদকৃত গোলাম কুরাইব রাহ. বলেন, উম্মুল ফযল বিনতুল হারেস আমাকে মুআবিয়া রা.-এর কাছে শামে পাঠিয়েছেন। আমি শামে এলাম। রমযানের হেলাল দেখা গেল। আমি জুমার রাতে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, হেলাল দেখেছি। উম্মুল ফযল রা.-এর দেওয়া দায়িত্ব আদায় করে এরপর মাসের শেষে আমি মদীনায় পৌঁছলাম।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কবে হেলাল দেখেছ?

বললাম, আমি মানুষের সাথে জুমার রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) হেলাল দেখেছি। তারা সবাই রোযা রেখেছেন এবং মুআবিয়া রা.-ও রোযা রেখেছেন। তিনি বললেন, কিন্তু আমরা তো শনিবারের রাতে (শুক্রবার দিবাগত রাতে) হেলাল দেখেছি। তাই আমরা ত্রিশ পুরো করা পর্যন্ত রোযা রেখেই যাব, যদি না এর আগে আমরা (নিজেরা) হেলাল দেখি।

কুরাইব রাহ. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে বললেন

أولا تكتفي برؤية معاوية وصيامه؟

আপনি কি মুআবিয়া রা.-এর হেলাল দেখা এবং (জুমাবারে) তাঁর রোযা শুরু করাকে যথেষ্ট মনে করেন না?

তিনি বললেন

لَا، هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

 না; আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্দেশই দিয়েছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৮৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ৬৯৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩৩২; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২১১১; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ১৯১৬)

মূলত এই ঘটনার সময় মুআবিয়া রা. শামের গভর্নর ছিলেন। মূল খলীফা ছিলেন আমীরুল মুমিনীন উসমান রা.। তাই এটি উসমান রা.-এর খেলাফত আমলের ঘটনা। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. শামে হেলাল দেখাকে মদীনার জন্য যথেষ্ট মনে করেননি।

কুরাইব রাহ.-এর ঘটনা ও ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইবনুল হুমাম রাহ. ফাতহুল কাদীরে বলেছেন

ولا شك أن هذا أولى، لأنه نص...

অর্থাৎ দলীল হিসেবে এটি এই বিষয়ে অগ্রাধিকার পজিশনে আছে। কারণ এটি এই বিষয়ে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

আর

صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته.

এই হাদীসে উভয় ব্যাখ্যার অবকাশ আছে। যার যার হেলাল দেখা অনুসারে রোযা রাখার অর্থও হতে পারে, এক স্থানের দেখা অনুসারে অন্য স্থানে রোযা রাখার বিধানের অর্থও হতে পারে। ফাতহুল কাদীর ২/৩১৪

কিন্তু ইবনে আব্বাস রা.-এর এই হাদীস এক দিক স্পষ্ট করে দেয় যে, দূরবর্তী এলাকার দেখা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। কাজেই এই হাদীসকে প্রাধান্য দিতে হবে।

হাঁ, ইবনুল হুমাম রাহ. অন্য ব্যাখ্যাও করেছেন। কিন্তু একথা স্বীকার করেছেন যে, এটা এই বিষয়ে ‘নস’ তথা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য। তারপর ‘ইয়ুকালু’ (يُقَالُ) বলে যদিও অন্য ব্যাখ্যার কথাও বলেছেন, কিন্তু দৃঢ়তার সাথে যেটা বললেন এবং যেটাকে ‘নস’ বললেন, তার মোকাবালায় ‘ইয়ুকালু’-এর ব্যাখ্যা চলবে না।

সাহাবায়ে কেরামের কাছে অনেক দূরবর্তী এলাকার হেলাল দেখার খবর এসেছিল। তাঁরা সেটি গ্রহণ করেননি এবং বলেছেন, নবীজীর নির্দেশ আমাদের প্রতি এমনই। কাজেই এই স্পষ্ট দলীলের সামনে একথা বলা যে, পৃথিবীর কোনো এক জায়গার দেখা পুরো দুনিয়ার জন্য যথেষ্ট; বরং জরুরি এবং ফরয কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমন কথা তো ইতিপূর্বে কেউই বলেননি। যারা এক জায়গার দেখা অন্য জায়গার জন্য প্রযোজ্য মনে করেন, কাছাকাছি হলে তো সবাই বলেন, আর দূরবর্তী হলেও কেউ কেউ যদিও বলেছেন, গ্রহণ করা যেতে পারে বা গ্রহণ করতে হবে, যদি খবর এসে যায়। কিন্তু দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সবার জন্য প্রযোজ্য হবে, সবার জন্য একই দিনে রোযা-ঈদ করা ফরয হবে এমন কথা কোনো মাযহাবের কোনো ইমাম বলেননি এবং এর পক্ষে কোনো দলীলও নেই।

ইমাম সাঈদ ইবনে মানসূর (২২৭ হি.) সহীহ সনদে খলীফায়ে রাশেদ উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণনা করেন, কিছু মানুষ পাহাড় ঘেরা জায়গায় বসবাস করত। উমর রা.-এর নিকট তাদের কিছু লোক এসে বলল

إنا ناس بين الجبال.

আমীরুল মুমিনীন! আমরা তো পাহাড় ঘেরা এলাকায় বাস করি। অন্যান্য বসতি আর আমাদের মাঝে উঁচু উঁচু পাহাড়।

لانهلُّ الهلال إذا أهلَّه الناس.

লোকেরা যখন হেলাল দেখে, তখন আমরা হেলাল দেখি না। অতএব আপনি আমাদের কী হুকুম করেন?

উমর রা. বললেন

الوضح إلى الوضح، فإن خفي عليكم  فأتموا العدة ثلاثين يوما، ثم انسكوا.

হেলাল থেকে হেলাল। যদি হেলাল আড়ালে পড়ে, তাহলে গণনাকে ত্রিশে পূর্ণ কর। এরপর ইবাদত (সওম বা ঈদ) কর।

এই ঘটনা তো হুবহু সেই বিষয়ে, যেই বিষয় নিয়ে আজকের দ্বন্দ্ব। প্রথম হেলাল আমরা পাচ্ছি না, অন্যরা আমাদের আগে দেখে, পরে আমরা খবর শুনি যে, অন্যরা আমাদের আগে দেখে ফেলেছে। তখন আমরা কী করব?

উমর রা. বলেছেন, তোমরা তোমাদের হেলাল দেখে আমল কর الوضح إلى الوضح হেলাল থেকে হেলাল। হেলাল দেখা না গেলে ত্রিশ পুরা করো।

এখানে আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. একথা বলেননি যে, অন্য এলাকায় নতুন হেলালের খোঁজ নিয়ো। সে অনুযায়ী আমল কর। একথাও বলেননি যে, আপাতত নিজেদের হেলাল দেখা অনুযায়ীই আমল কর। এরপর যদি জানতে পারো যে, তোমাদের আগেই লোকেরা হেলাল দেখেছে, তাহলে এক রোযা কাযা করে নিয়ো। আবার তিনি একথাও বলেননি যে, তোমাদের হেলাল দেখা যেহেতু অন্যদের পরেই হয়ে থাকে, তাই সতর্কতামূলক এক দিন আগে থেকেই তোমরা রোযা রাখতে শুরু কর। কারণ তোমরা হেলাল না দেখলেও কোথাও না কোথাও তো হেলাল দেখাই যাবে। এমন কিছুই তিনি বলেননি।

আমীরুল মুমিনীন শুধু একথা বলেছেন যে, তোমরা নিজেদের হেলাল দেখা অনুযায়ী আমল কর। হেলাল দেখা না গেলে ত্রিশ তারিখ পূর্ণ করে পরের মাস শুরু কর। পরের মাস রমযান হলে রোযা শুরু কর। শাওয়াল হলে ঈদ কর।

উমর রা.-এর এই ঘটনা ইমাম সাঈদ ইবনে মানসূর রাহ.-এর সনদসহ উল্লেখ করেছেন ইমাম আবু সুলাইমান আলখাত্তাবী রাহ.। (দ্রষ্টব্য : গরীবুল হাদীস, আবু সুলাইমান আলখাত্তাবী, খ. ২, পৃ. ১০২-১০৩, জামেয়া উম্মুল কুরা, প্রকাশকাল ১৪২২ হি. ২০০১ ঈ.)

সাহাবায়ে কেরামের যুগে এর বিপরীতে কোনো একটা উদ্ধৃতি আমাদের ওই ভাইদের কাছে নেই, যারা আজ এক দেখার মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে ঈদ করাতে চাচ্ছেন! কেবল এক জায়গার দেখা নয়, বরং বিশ্বের সর্বপ্রথম হেলাল দেখা দিয়ে সবাইকে ঈদ করানো ফরয দাবি করছেন।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে এটুকু তো স্পষ্ট হল যে, আমরা যেটার ওপর আমল করছি, তার উদ্ধৃতি আমাদের কাছে আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানা ও সাহাবায়ে কেরামের যামানা থেকেই এভাবে আমল চলে আসছে। যেটা দেখার বিষয় ছিল তা হল অনেক দূরের খবর (যা সেই সময় পরে আসত, এখন আমরা নগদ পেয়ে যাচ্ছি) এটা গ্রহণ করব কি না? সে ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের ফয়সালা হল, তোমরা তোমাদের দেখার ওপর আমল কর।

এখন যে কথাটি আমি বলতে চাচ্ছি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা, আমাদের তালিবুল ইলম ভাইয়েরা ভালো জানেন, ফিকহের কিতাবে আছে, ‘ইখতিলাফুল মাতালি’ মুতাবার কি না? এক্ষেত্রে ফিকহের কিতাবে দুটি মত আছে।

হেলাল তো আর পুরো পৃথিবীতে একসাথে দৃশ্যমান হয় না এবং এটা হওয়া সম্ভবও না। ভৌগোলিক ও বিভিন্ন কারণ আছে। একই সন্ধ্যায় সবাই একসাথে হেলাল দেখবে না; বরং কেউ আগে দেখবে, কেউ পরে দেখবে। এটা একটা বাস্তবতা। কিন্তু শরীয়তের বিধানের মধ্যে উদয়স্থলের এই ভিন্নতা ও পার্থক্য ধর্তব্য হবে কি না?

অধিকাংশ ফহীহ ও বিজ্ঞ আলেম বলেন, ধর্তব্য হবে। কিছু ফকীহ বলেন, ধর্তব্য হবে না। দ্বিতীয় মতটির শিরোনাম হল

لا عبرة لاختلاف المطالع.

উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য হবে কি না এই ইখতিলাফী মাসআলার সঙ্গে আমাদের এই বন্ধুদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা এই উভয় মাযহাবের বিপরীতে নতুন একটা মতবাদ দাঁড় করিয়েছেন! বিষয়টা আমাদের খুব ভালো করে বুঝতে হবে।

অনেকে মনে করে, আমরা যে কানযুদ দাকায়েকে পড়েছি

لا عبرة لاختلاف المطالع.

এ কথাটাই তো ড. আব্দুল্লাহ মারুফ ও সাদ্রার ওই ভাইয়েরা বলে থাকেন। তাতে অসুবিধা কী? দোষের কী আছে?

মনে রাখবেন, তাদের মতবাদের মধ্যে অনেক সমস্যা বিদ্যমান।

‘কানযুদ দাকায়েক’ কিতাবের

لا عبرة لاختلاف المطالع.

-এর সঙ্গে এই ভাইদের কোনো সম্পর্ক নেই। কেন নেই এ বিষয়টা ভালো করে বুঝতে হবে।

তাদের মতটি বিদআত। নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আগে যে মাযহাবের মধ্যে দুইটি মত ছিল, এটি উভয় মতের বাইরে সম্পূর্ণ বিদআতী একটি মত। এর মানে হল, তাদের এই মত উম্মতের ‘ইজমায়ে সুকূতী’ এবং ‘ইজমায়ে আমলী’-এর খেলাফ। আর তারা এটাকে যেভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়, সেটা তো পুরো উম্মতের ‘সরীহ ইজমা’র খেলাফ। কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়তের স্পষ্ট বিরোধী।

এ কথাটা যদি সাফভাবে আমরা বুঝে নিতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ মাসআলাগুলো হল্ হয়ে যাবে।

দেখুন, কানযুদ দাকায়েক কিতাবের

لا عبرة لاختلاف المطالع

এটা তো অনেক ফকীহের মত। কিন্তু তাদের কেউ কি বলেছেন যে, বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা শুরু করা এবং একই দিনে ঈদ করা ফরয বা জরুরি? একটা রেফারেন্সও দেখাতে পারবেন না তারা।

(তারপর খতীব ছাহেব তাদের প্রস্তুতকৃত বিস্তারিত ফতোয়াটি দেখিয়ে বলেন) এই হল তাদের বিস্তারিত ফতোয়া। তারা নিজেরাই এখানে বলেছেন যে, এখানে তারা ১৩৬টি কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই ১৩৬টি কিতাবের মধ্যে কোনো একটি কিতাব, যেটি হাওয়ালা হতে পারে, রেফারেন্স যোগ্য, এমন একটি কিতাবের মধ্যেও ‘ওয়াহদাতুল আইয়াদ

توحيد أوائل الشهور/ توحيد الأهلة

তথা পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ শুরু করাকে ফরয-ওয়াজিব, এমনকি সুন্নতে মুআক্কাদা বলা হয়েছে, এমনকি মুস্তাহাব বলা হয়েছে তাদের এই বিস্তারিত ফতোয়া থেকে এমন একটা নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতি চাই। নেই তাদের কাছে।

অর্থাৎ যা তারা বলছেন আর যেসব কিতাবের উদ্ধৃতি তারা দিচ্ছেন, দুইয়ের মাঝে বিস্তর ফারাক। যা তারা বলছেন এবং করছেন, সেটা তাদের উদ্ধৃত কিতাবের মধ্যেই নেই।

শুধু তাই নয়; বরং তারা যেসব মনীষীর নাম নিয়েছেন, তাঁদের অনেকের থেকে এই বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য আছে যে, এরকম তাকাল্লুফ ও কসরত করে বিভিন্ন জায়গা থেকে হেলালের সাক্ষ্য ও সংবাদ সংগ্রহ করে একই দিনে রোযা-ঈদ পালনের চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা ওয়াজিব হওয়ার কোনো দলীল নেই।

যেমন হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর ফতোয়া সংকলন ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ থেকে তারা একটা উদ্ধৃতি টেনেছেন। কিন্তু এই উদ্ধৃতি টানতে গিয়ে নিজেদের মতলবের বিরুদ্ধের কথাটি তারা আনেননি। ইমদাদুল ফাতাওয়ার ২য় খণ্ডের ১৫৫ নম্বর পৃষ্ঠায় আছে, থানভী রাহ. বলেছেন, হেলালের বিষয়ে যারা অথরিটি ও দায়িত্বশীল, তাঁরা যে ফয়সালা করবে, সেই ফয়সালার সাথে দ্বিমত করবে না। নিজেও এর খেলাফ আমল করবে না এবং অন্যদেরকে আমল করার জন্যও বলবে না; বরং হেলালের ফয়সালার বিষয়ে যথাযথ অথরিটি ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর আমল করবে।”

সুতরাং যারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের আমলের বিরুদ্ধে এক দিন আগে, দুই দিন আগে ঈদ করে, তাদের জন্য হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.-এর হাওয়ালা দেওয়া চলে?

আরও শুনুন, ঐ যামানায় তো মানুষ পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা-ঈদ করার চিন্তাও করত না। তবে মোটামুটি বড় একটা এলাকা নিয়ে সব জায়গার খবর জমা করে এক দিনে করা যায় কি না এ বিষয়ে হযরত থানভী রাহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল।

হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ. নিজে কিন্তু

لا عبرة لاختلاف المطالع.

‘উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়’-এর প্রবক্তা। তা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন

چونکہ کوئی حکم بلا دلیل ثابت نہیں ہوتا، اور اس کے وجوب کی کوئی دلیل نہیں، لہذا یہ امر (دوسرے شہروں سے رویت ہلال کی خبریں منگوانا) واجب نہیں۔

এখানে বলা হয়েছে, যেহেতু দলীল ছাড়া কোনো বিধান সাব্যস্ত হয় না আর প্রশ্নোক্ত কাজ ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে কুরআন-হাদীসের কোথাও এই দলীল নেই যে, অন্য অঞ্চল থেকে আমরা সাক্ষ্য ও সংবাদ সংগ্রহ করে মানুষকে একসাথে ঈদ করার ব্যবস্থা করে দেব। যেহেতু এর কোনো দলীল নেই, কাজেই একে ওয়াজিব বলার কোনো অবকাশ নেই। ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১২৯

‘শরীয়ত আমাদেরকে এর আদেশ না করা সত্ত্বেও যদি এমন ঘটে যায়, তাহলে কী হুকুম’ থানভী রাহ. এ বিষয়ে নিজের মত পেশ করেছেন যে, সে রুয়াতের اعتبار করা জরুরি।

কিন্তু এই ভাইয়েরা থানভী রাহ.-এর ওই বক্তব্য, যা আমি আগে পড়লাম, তা তো উল্লেখই করেননি; উল্টো যেখান থেকে উদ্ধৃতি টেনেছেন, তার শুরুর এমন বাক্যের অনুবাদ করেননি, যা তাদের মতবাদকে খণ্ডন করে দেয়।

থানভী রাহ. কথা শুরু করেছেন এই বলে

اس کا مکلف تو نہیں،  لیکن...

কিন্তু এই ভাইয়েরা

اس کا مکلف تو نہیں

(শরীয়ত আমাদেরকে অন্য অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করার আদিষ্ট বানায়নি) থানভী রাহ.-এর এই কথাটার অনুবাদ করেননি। এর পর থেকে অনুবাদ করেছেন। যারা অনুবাদনির্ভর তারা তো বুঝবে না কী ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যারা উর্দূ বোঝে, তারা যখন দেখবে, তাদের উদ্ধৃতির শুরুতেই আছে

اس کا مکلف تو نہیں

তো ‘উসকা’ মানে কী এটা খুঁজতে তো মূল দেখতে হবে! মূল কিতাব খুললেই পাওয়া যাবে, হযরত থানভী রাহ. বলেছেন, শরীয়ত আমাদেরকে আদেশই দেয়নি। প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৯

তারা যে ফতোয়ার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সে ফতোয়াতেই তাদের মতের বিপরীত বলা হয়েছে। এমনিভাবে তারা দারুল উলূম দেওবন্দের সদরে মুফতী নেযামুদ্দীন আযমী রাহ.-এর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, হযরত নেযামুদ্দীন রাহ. لا عبرة لاختلاف المطالع-এর প্রবক্তা। তা সত্ত্বেও তিনি তার এক ফতোয়ায় বলেছেন

یہ چیز ( توحید اہلہ ) شرعا تو مطلوب ہی نہیں ہے، اور نہ اس کا التزام ہی درست یا محمود ہوگا، بلکہ یہ چیزیں منشأ شرع اور شارع علیہ السلام کے خلاف ہیں، جیسا کہ ہم اپنے رسالہ توحید الاہلہ میں تفصیل سے کہہ چکے ہیں۔

অর্থাৎ শরীয়ত কখনো ‘তাওহীদুল আহিল্লা’-এর বিধান দেয়নি। এটা শরীয়তে কাম্যও নয়, প্রশংসনীয় কাজও নয়; বরং এটা শরীয়তের মানশা ও রুচি-প্রকৃতি বিরোধী। শরীয়তের ইচ্ছা-বিরোধী। এই বিষয়ে আমি আমার পুস্তিকা ‘তাওহীদুল আহিল্লা’য় বিস্তারিত বলেছি। মুন্তাখাবাতে নেযামুল ফাতাওয়া ২/১২২

ইনিও কিন্তু তাদের উদ্ধৃত ব্যক্তিদের একজন। নেযামুদ্দীন রাহ.-এর বক্তব্যে তাদের কর্মকাণ্ডের উল্লেখ নেই; আছে অন্য কথা, যেটা আমরা এখন পড়লাম। এভাবে তারা যেসব মনীষীর রেফারেন্স টেনেছেন, মূলত ওসব মনীষীর বক্তব্য আর এদের মতবাদ এক নয়। ওই মনীষীদের বক্তব্যের বিষয়ে আগেই বলেছি যে, উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য হবে কি না এই বিষয়ে দুইটি মত আগে থেকেই চলে আসছে। আর ওই দুই মতের কোনো মতের প্রবক্তাই একথা বলেন না যে, অন্য জায়গা থেকে খবর সংগ্রহ করে একই দিনে ঈদ-রোযা পালন করানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। নতুবা ফরয রোযা ছুটে যাবে! ঈদের দিন রোযা রাখার গোনাহ হবে!

এমন কথা পূর্বের ফকীহদের কেউ বলেননি, আর না ফিকহ ফতোয়ার নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে এমন কথা আছে।

সারকথা হল, তাদের দাবিকৃত মতবাদ এবং তার প্রায়োগিক রূপ, যা তারা করে থাকে, তা কুরআন-হাদীসের দলীল দ্বারাও প্রমাণিত নয়, হাদীস-তাফসীরের ব্যাখ্যাগ্রন্থেও নেই এবং ফিকহ-ফতোয়ার কিতাবেও নেই।

(প্রবন্ধকারের বক্তব্য আরও দীর্ঘ। বাকি অংশ প্রবন্ধকারের পরিমার্জন ও জরুরি সংযোজনসহ আগামীতে পেশ করা হবে, ইনশাআল্লাহ। এখন আমরা দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচকদের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করছি।)

সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশনে বিভিন্ন ঘরানার পাঁচজন আলেম বক্তব্য রাখেন। আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা আহমাদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ, যারা বিশ্বব্যাপী রোযা ও ঈদ একই দিনে পালনকে জরুরি মনে করে, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “বৈশ্বিক ঐক্য তৈরি করতে গিয়ে আপনি স্থানীয় অনৈক্য তৈরি করে দিলেন। বাংলাদেশের সকল ঘরানার উলামায়ে কেরাম চান্দ্রমাস শুরু করার ভিত্তির বিষয়ে একমত। যে বিষয়টাতে গোটা দেশ প্রায় ঐক্যবদ্ধ, সে বিষয়টাতে একটা জিনিস আমদানি করে, একটা জিনিস নতুন করে শুরু করে মূলত আপনি স্থানীয় অনৈক্য তৈরি করছেন।

আপনার বিচ্ছিন্ন কোনো চিন্তা বা ধারণা, যেটা উম্মাহ্র বড় অংশ লালন করছে না, দেশের প্রায় সমস্ত উলামায়ে কেরাম লালন করছেন না, সেটা আপনি উম্মাহ্র মধ্যে প্রয়োগ করে উম্মাহকে বিভ্রান্ত করছেন, মানুষকে আপনি ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে প্রবেশ করাচ্ছেন। সন্দেহাতীতভাবে এটি আল্লাহর দরবারে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো একটি কাজ।”

বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সভাপতি অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল্লাহ ফারুক হাফিযাহুল্লাহ বলেন, “শায়েখ বিন বায বলেছেন, সৌদি আরবের যেসব কর্মকর্তা বিভিন্ন দেশে দূতাবাসে কর্মরত আছেন, তারা সেই দেশের হেলাল অনুযায়ী সিয়াম ও ঈদ পালন করবেন। তারা সৌদি আরবের হেলালকে ফলো করবেন না।”

ডক্টর ফারুক আরও বলেন, “আসুন! আপনারা উম্মতের মাঝে বিভক্তি তৈরি করবেন না। আমি মনে করি, একই দেশে একাধিক দিনে ঈদ উদ্যাপন করা উম্মাহ্র ঐক্যে কুঠারাঘাত। বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস আজকের এই প্রবন্ধের ওপরে এবং আজকের বিষয়বস্তুর ওপরে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করছে।”

আলজামেয়াতুস সিদ্দীকিয়া দারুস সালাম ফুরফুরা ঢাকা-এর নায়েবে মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ নোমান হাফিযাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের পীর সাহেব হুজুরের (হযরত আবু বকর আব্দুল হাই মেশকাত সিদ্দীকী দামাত বারাকাতুহুম) প্রতিনিধি হিসেবে আমি আজকে উপস্থিত হয়েছি। পূর্ব থেকেই অন্য একটি প্রোগ্রাম নির্ধারিত থাকার কারণে পীর সাহেব হুজুর আসতে পারেননি। হুজুর আমাকে পাঠিয়েছেন তার পক্ষ থেকে কিছু কথা বলার জন্য।”

এরপর মাওলানা মুহাম্মাদ নোমান বলেনআমাদের পীর সাহেব হযরত আবু বকর আব্দুল হাই মেশকাত সিদ্দীকী দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন, কুরআন-হাদীস ও যুক্তির নিরিখে এটাই সাব্যস্ত হয়; এটাই সঠিক মত যে আঞ্চলিক হেলাল দেখে সবাই রোযা রাখবে। এটা আমার বাবা আবুল আনসার আব্দুল কাহহার সিদ্দীকী রাহ. এবং আমার দাদা আব্দুল হাই সিদ্দীকী রাহ.-এর মত এবং আমারও মত। আমাদের কিছু অনুসারী, তারা আমাদের আমলগুলো তথা যিকির-আযকার ইত্যাদি নেয়; কিন্তু স্থানীয় হেলাল দেখা অনুযায়ী রোযা-ঈদ করার বিষয়ে আমার, আমার বাবার ও দাদার যে মত, তা তারা গ্রহণ করে না। এটাও তাদের নেওয়া উচিত।”

মাওলানা নোমান সাহেব আরও বলেন, “বৈশ্বিক ঐক্যের নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা তো হিতে বিপরীত হয়ে যাচ্ছে। যে মতের কথা তারা বলছে, সেটি আসলে ভ্রান্ত মত, কুরআন-হাদীস তা সাপোর্ট করে না। যুক্তি ও ভূগোল তা সাপোর্ট করে না।”

ছারছীনা দারুস সুন্নাত কামিল মাদরাসার হেড মুহাদ্দিস মাওলানা সিরাজুম মুনীর হাফিযাহুল্লাহ বলেন, “কিতাবের মধ্যে (উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হওয়া না হওয়া বিষয়ে) যে ইখতেলাফ রয়েছে, এরা কিন্তু সেই ইখতিলাফের বাইরে। ইখতেলাফ এক জিনিস, ফেতনা আরেক জিনিস। আমার নিজের বিশ্লেষণ, তাদের বইপুস্তক-লেখালেখি ও ভিডিও থেকে তাদের দাবি-দাওয়া ও দলীল-প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং আজকের সেমিনারের প্রবন্ধ পড়ে যে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট, তা হল তারা যেটা করে, সেটা ইখতেলাফ না; সেটা ফেতনা। তারা যে দাবি করে, পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ পালন করা, এটা কখনোই সম্ভব নয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া ঢাকা-এর শায়খুল হাদীস মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম ছাহেব হাফিযাহুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “অত্যন্ত সারগর্ভ এক প্রবন্ধের আংশিক আমরা শুনলাম। হযরত খতীব ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম রচিত এ বিষয়ের একটি বিস্তারিত গ্রন্থের সারাংশ হল এ প্রবন্ধ। আমরা লক্ষ করেছি, কত বিস্তৃত পরিসরে এবং কত বড় আকারে তিনি এ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।

আমরা তো জ্ঞানের মূল্য দিতে জানি না। আমাদের লোকেরা তা পারে না। আমার বিশ্বাস এ রচনা যদি ক্যামব্রিজ বা অক্সফোর্ডে দাখিল করা হত, তাহলে নিশ্চিত তারা এর ওপরে ডক্টরেট দিত। যারা পড়বে তারা এটা বলতে বাধ্য হবে। কিন্তু জ্ঞানের তো আমরা মূল্য দিতে জানি না। আমরা মুখরোচক কথায় হারিয়ে যাই। এই যে কথা উঠেছে বিশ্বব্যাপী একই দিনে ঈদ এটা তো সম্পূর্ণই জাহালাত, সম্পূর্ণ অজ্ঞতাপ্রসূত একটি কথা। যা সম্ভব নয়; কোনো কালেই সম্ভব ছিল না, সম্ভব নয়। চৌদ্দ শ বছর যাবৎ যা হয়ে এসেছে, সেটাই মূলত বস্তুনিষ্ঠ ও দলীলনির্ভর। সারা বিশ্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে আপন আপন স্থানের হেলালের ভিত্তিতেই রমযানের রোযা ও ঈদ হয়ে এসেছে। সাহাবায়ে কেরামের যুগেই তো ইসলাম আরব এলাকা অতিক্রম করে এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা ও আফ্রিকায় পৌঁছে গেছে। তখন তো একই দিনে রোযা ও ঈদের কথা ওঠেনি। তখনো আঞ্চলিক হেলালের ভিত্তিতে আমল হয়েছে। যুগ যুগ ধরে এভাবেই হয়ে এসেছে। ফিকহের কিতাবে যে মতভেদের কথা বলা আছে, তার সাথে নবসৃষ্ট এ মতের কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টি প্রবন্ধের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সারা বিশ্বে রোযা-ঈদ একই দিনে করতে হবে এমন কথা কোনো কালে কেউ বলেনি। এটা ভাঙন সৃষ্টির এক চক্রান্ত।

খুব মনে পড়ে আমাদের বায়তুল মোকাররমে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী খতীব ছিলেন, হযরত মাওলানা ওবায়দুল হক রাহ.। আমরা একবার কোনো এক প্রয়োজনে হযরতের কাছে গিয়েছিলাম। তখন তিনি এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ইসলামের খেদমত কী জানো? এরপর তিনি বলেন, কোনো একটা জিনিস আস্ত আছে, সেইটাকে তুমি ভাঙিয়া দাও। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, ইসলামের নাদান দোস্ত যারা, তারা এভাবে ভাঙন সৃষ্টি করে আর সেটাকেই মনে করে ইসলামের খেদমত!

এখনো কিন্তু সেই প্রক্রিয়াই চলছে। আমরা ইসলামের বিশেষত্ব থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আঞ্চলিক হেলাল দেখার ওপর ভিত্তি করে রোযা রাখা ও ঈদ করা এটা ইসলামের বিশেষত্ব। এটা ইসলামের সৌন্দর্য। নতুন নতুন মুখরোচক কথা বলে মুসলিমদেরকে ইসলামের যে বিশেষত্ব, তা থেকে দিন দিন দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটাও সেই ধরনেরই একটা কাজ। আমাদের সেটা বুঝতে হবে। উলামায়ে কেরাম যদি এ প্রবন্ধ ভালোভাবে পড়েন এবং এটা সাধারণ শিক্ষিতদের কাছে ছড়িয়ে দেন, নিশ্চিত মানুষ বুঝতে পারবে একই দিনে বিশ্বব্যাপী ঈদ অসম্ভব। সম্পূর্ণ অজ্ঞতাপ্রসূত কথা। এবং তারা বুঝতে পারবে এটাই সত্য যে, আঞ্চলিক হেলাল দেখার ওপর ভিত্তি করে আমাদের রোযা রাখতে হবে এবং ঈদ করতে হবে।”

এরপরে এলইডি স্ক্রিনে তথ্যচিত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ পালন করা সম্ভব না হওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ডক্টর এস এম লুৎফুল কবির।

এরপর আজকের সেমিনারের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য, শহীদবাগ জামে মসজিদের খতীব মাওলানা আব্দুল গাফফার ছাহেব হাফিযাহুল্লাহ। ঘোষণাপত্রটি নিম্নরূপ

১. ইসলামী শরীয়তে চান্দ্রমাস শুরুর মানদণ্ড হল হেলাল দেখা, হেলালের সাক্ষ্য। অন্যথায় মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ করা। এ মানদণ্ড বাদ দিয়ে কনজাঙ্কশন/অমাবস্যা থেকে মাস শুরু করা শরীয়ত পরিবর্তন এবং নিজ খেয়াল-খুশি মোতাবেক নতুন শরীয়ত প্রবর্তন করার শামিল।

এমনিভাবে হেলাল দেখার পরিবর্তে জ্যোতির্বিজ্ঞান-ভিত্তিক আগাম প্রস্তুতকৃত হিজরী ক্যালেন্ডারের নামে বিভিন্ন লুনার ক্যালেন্ডারকে মানদণ্ড বানানোও স্পষ্ট নাজায়েয ও শরীয়তে হস্তক্ষেপের শামিল।

২. মুসলমানদের ঈদ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের মতো নিছক আনন্দ-উৎসব নয়; বরং ঈদ হচ্ছে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই একে অন্যান্য জাতির উৎসবের আদলে উদ্যাপন করার চিন্তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অযৌক্তিক।

৩. একই তারিখে সারা বিশ্বে রোযা ও ঈদ পালনকে জরুরি মনে করা একেবারেই দলীলহীন দাবি এবং কার্যক্ষেত্রে এর বাস্তবায়নও অসম্ভব। নবসৃষ্ট এ মতবাদ কিন্তু

لا عبرة لاختلاف المطالع.

শীর্ষক ফিকহী অভিমতের সমার্থক নয়।

৪. সর্বপ্রথম হেলাল দেখাকে একমাত্র ভিত্তি গণ্য করা এবং এটিকে পুরো বিশ্বের জন্য গ্রহণ করাকে ফরয মনে করা দলীলবিহীন এবং উম্মতের ইজমা পরিপন্থি। সাথে সাথে তা বাস্তবিকপক্ষে পুরো বিশ্বের জন্য আমলযোগ্যও নয়। তাই এমন একটি মত দেশ ও জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

৫. মক্কার হেলাল দেখাকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া কেবল দলীলহীনই নয়; বরং নবীযুগ, খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবাযুগ এবং তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের যুগসহ উম্মতে মুসলিমার নীতি ও কর্মপরম্পরার গোটা ধারারই বিরোধী। নির্ধারিত করে অন্য কোনো শহরকেও ভিত্তি বানানো যায় না। কারণ নিজ অঞ্চলে হেলাল প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সে অনুযায়ী আমল না করে অন্য অঞ্চলের হেলালের অপেক্ষা করা সর্বসম্মতিক্রমে শরীয়ত পরিপন্থি।

৬. এটা একেবারেই গলদ কথা যে, উলামায়ে কেরাম জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রকে এক মনে করার কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের বিরোধিতা করেন। এমনটি নয়; বরং তারা শরয়ী প্রমাণাদির কারণেই এ বিষয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবকে ভিত্তি মনে করেন না। স্বয়ং মুসলিম মনীষী জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণও বিশ্বব্যাপী ইবাদত ও আহকামের ক্ষেত্রে একে ভিত্তি মনে করেন না। কারণ তারা মনে করেন, এগুলো একান্তই দ্বীনী বিষয়। এতে আমাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়; বরং শরীয়ত যা বলে তা-ই মেনে নেওয়া আমাদের ঈমানী কর্তব্য।

৭. শরয়ী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অথরিটি নয়। তথাপি শুধু অবগতির জন্য বলা হচ্ছে যে, বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণও পুরো বিশ্বে একই দিনে রোযা-ঈদ পালন করার প্রবক্তা নন।

৮. যে পদ্ধতি এতদ্অঞ্চলে আগে থেকেই চলে আসছে, যে ব্যাপারে দেশের অধিকাংশ উলামা-মাশায়েখ একমত, সেটার পরিবর্তনের কোনো শরয়ী কার্যকারণ উপস্থিত নেই। তাছাড়া অনুসৃত ধারার ওপর বহাল থাকাতেই রয়েছে মঙ্গল।

৯. একে তো অনুসৃত পদ্ধতিকে বদলানোর কোনো বৈধ কারণ নেই। দ্বিতীয়ত, এর পরিবর্তনের ফলে দেশের মধ্যে ভীষণ বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। কারণ দেশের সর্বত্র যেসব ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও তাদের অনুসারীগণ রয়েছেন, তারা দলীলবিহীন কোনো নতুন কিছু কখনোই মেনে নেবেন না।

১০. দেশের কোনো আইন বা সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে যদি শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো আপত্তি না থাকে, তবে তা মেনে চলা মুসলিম নাগরিকদের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব। বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত জাতীয় হেলাল কমিটি রোযা, ঈদসহ সকল চান্দ্রমাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় কমিটি। তাই এ কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া মুসলিমদের কর্তব্য।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

‘রোযা ও ঈদ বিশ্বব্যাপী একই দিনে পালনের দাবির ভ্রান্তি নিরসন ও শরয়ী বিশ্লেষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার ২০২৬-এর পক্ষে

 

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক 

প্রবন্ধ উপস্থাপক, আজকের সেমিনার

 

মুফতী মাহমুদুল হাসান

সভাপতি, আজকের সেমিনার।

 

***

সবশেষে সভাপতির ভাষণ ও মুনাজাত। হযরত সভাপতি সাহেব বলেন, অনেকে নেটের বিভিন্ন জায়গায় এগুলো দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যায়।

তিনি যুবক ভাইদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা নেটে এখানে সেখানে কিছু আলোচনা সমালোচনা দেখে উলামায়ে কেরামের প্রতি আস্থা হারাবেন না। আলহামদু লিল্লাহ আপনাদের জন্য উপযুক্ত রাহবার উলামায়ে কেরাম দেশে আছেন; বিশ্বে আছেন। আমরা তাদের রাহবারিতে চলব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন আমীন।

উপস্থিত সকলকে নিয়ে তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে দুআ করেন হে আল্লাহ! যারা বিপরীত অবস্থান নিয়ে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা করছে, তাদের মধ্যে সহীহ সমঝ পয়দা করে দিন। উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে সঠিক বুঝ নিয়ে তারা যেন সঠিক পথে আসতে পারে, সেই তাওফীক তাদেরকে দান করুন। সকল প্রকার বিভ্রান্তি থেকে হেফাযত করুন।

দুপুর সোয়া একটার দিকে সেমিনার সমাপ্ত হয়।

 

***

[প্রবন্ধকারের নযরে সানীর পর প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত প্রথম কিস্তি ছাপা হল। বাকি অংশ আগামীতে পেশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন :

মাওলানা সায়ীদুল হক

মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম]

 

 

advertisement