যিলহজ্ব ১৪৪৭   ||   জুন ২০২৬

সৃষ্টি দেখে স্রষ্টাকে চিনি

মাওলানা আবু রুশায়দ

বিখ্যাত তাবেয়ী আতা ইবনে আবী রা­­বাহ রাহ. বলেন, আমি আর উবাইদ ইবনে উমাইর একবার আয়েশা রা.-এর কাছে গেলাম। তিনি পর্দার আড়াল থেকে উবাইদ ইবনে উমাইরকে বললেন, তাহলে আমার কাছে আসার সময় তোমাদের হল!

উবাইদ ইবনে উমাইর বললেন, আম্মাজান! কথায় আছে দেরিতে সাক্ষাৎ কর, তাহলে মহব্বত বাড়বে।

জবাবে আয়েশা রা. বললেন, বাদ দাও তোমার এসব ভণিতার কথা!

তারপর উবাইদ বললেন, আচ্ছা, আপনি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্চর্যজনক কোনো ঘটনা বলুন।

আয়েশা রা. কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, শোনো তাহলে! এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, আয়েশা, আমাকে আজ রাতে বেশি করে আল্লাহর ইবাদত করতে দাও।

আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনার সোহবত-সান্নিধ্য ভালবাসি আর আপনি যা যা পছন্দ করেন, তাও ভালবাসি।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে ওযু করে নামাযে দাঁড়ালেন। নামাযে কাঁদতে শুরু করলেন। এত কাঁদলেন যে, তার দাঁড়ি ও জামার আঁচল ভিজে গেল। অশ্রু গড়িয়ে জমিনেও গিয়ে পড়ল।

শেষ রাতের দিকে বেলাল রা. তাঁকে ফজরের নামাযের সময় হওয়ার সংবাদ দিতে এসে কাঁদতে দেখে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাঁদছেন কেন? আল্লাহ তো আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?

এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আজ আমার প্রতি একটি আয়াত নাযিল হয়েছে। তার ধ্বংস অনিবার্য, যে এই আয়াত পড়বে, অথচ এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে না।

তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন

اِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَاٰيٰتٍ لِّاُولِي الْاَلْبَابِ، الَّذِيْنَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ قِيٰمًا وَّقُعُوْدًا وَّعَلٰي جُنُوْبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُوْنَ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا  سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজনে ও রাতদিনের পালাক্রমে আগমনে বহু নিদর্শন আছে ওইসকল বুদ্ধিমানদের জন্য যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে (এবং তা লক্ষ করে বলে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র, সুতরাং আপনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করুন। সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৯০-১৯১

দ্র. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬২০; আখলাকুন নবী, আবুশ শায়খ আসবাহানী, হাদীস ৫৪৪

আল্লাহ তাআলা আসমান-জমিন, গ্রহ-নক্ষত্রসহ সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন। এসব তাঁরই সৃষ্টি, তিনিই এসব নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন।

আসমান-জমিনসহ এ বিশ্বজগতের সমস্ত কিছুর সৃষ্টি এবং এগুলোর পরিবর্তন ও পরিক্রমণে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন, উপদেশ ও চিন্তার খোরাক। উল্লিখিত আয়াতে সে কথাই তিনি বলেছেন।

কুরআনে অন্যত্র আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে বলেন

اِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَذِكْرٰي لِاُولِي الْاَلْبَابِ.

নিশ্চয়ই এর মধ্যে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য উপদেশ আছে। সূরা যুমার (৩৯) : ২১

সুতরাং সত্যিকারের বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি সৃষ্টিজগতের যেদিকেই তাকাবে, এক মহান সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টির নিদর্শন দেখতে পাবে, তাঁর বড়ত্ব-মহত্ত্ব ও ক্ষমতা-আধিপত্যের প্রকাশ এবং সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও নৈপুণ্য দেখতে পাবে। যদি তার সত্যাসত্য-বোধ ও ন্যায়-ইনসাফের দৃষ্টি থাকে, তাহলে সে অবশ্যই নিজ পরিচয় ও কর্তব্য-করণীয়র দিশা পাবে।

সেই সঙ্গে বিস্ময় ও মুগ্ধতায় তার যবানে উচ্চারিত হতে থাকবে

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

আল্লাহ! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।

প্রশ্ন হল, কারা এই ‘উলুল আলবাব’? জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ! বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ! আল্লাহ কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় উলুল আলবাবের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বলেছেন। সূরা আলে ইমরানের উল্লিখিত আয়াতে সংক্ষেপে বলেছেন, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে, তারা উলুল আলবাব, তারা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান।

আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিরাজি ও পবিত্র কুরআন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমাদেরকে ঈমানের আলো-বিধৌত হওয়ার তাওফীক দান করুন এবং প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাতারে শামিল করুন আমীন।

 

 

advertisement