কুরবানীর শিক্ষা
‖ সবকিছু কেবল আল্লাহর জন্য
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেছেন–
قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ، لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ.
(হে নবী!) আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই (এই উম্মতের) প্রথম আনুগত্যকারী। –সূরা আনআম (৬) : ১৬৩
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে সকল মুমিন-মুসলিমকে এই হেদায়েত দিয়েছেন যে, মুমিনের জীবনের সবকিছুই হবে এক আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে। মুমিন নামায ও কুরবানীসহ সকল ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্যই করবে। আল্লাহ যখন যে হুকুম করবেন, তৎক্ষণাৎ তা পালন করতে সদা প্রস্তুত থাকবে।
মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আখেরাতকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হবে। এমনকি মুমিনের উৎসব ও আনন্দ উদ্যাপনও হবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ও আল্লাহর সীমারেখার ভেতরে থেকে। আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে আনন্দ উদ্যাপনের জন্য যে দুইটি দিন দিয়েছেন, এর মধ্যে একটি হল ঈদুল আযহা বা কুরবানীর দিন। এদিনও আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমেই মুমিন আনন্দ উদ্যাপন করবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
إِنّ أَوّلَ مَا نَبْدَأُ بِه فِيْ يَوْمِنَا هذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ.
অর্থাৎ আজকের দিনে আমরা সর্বপ্রথম ঈদের নামায আদায় করব। এরপর কুরবানী করব। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৮
সুতরাং মুমিন বান্দা এ উৎসবের দিনে প্রথমে নামায তারপরে কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে। আর তারপরে নিজেও আল্লাহর মেহমানদারি গ্রহণ করে, অপরকেও আল্লাহর মেহমানদারিতে শরীক করে। এভাবে মুমিন বান্দা নামায ও কুরবানীসহ জীবনের সব কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও আল্লাহর মর্জিমতো করার চেষ্টা করে। যেহেতু তার সবকিছুই আল্লাহর জন্য, তাই সে আনন্দ উদ্যাপনের ভেতর দিয়েও লাভ করে আল্লাহর রহমত, বরকত ও বিপুল সওয়াব।
কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব আমল। সামর্থ্যবান ও প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের কুরবানী করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কুরবানী করতেন, অন্যদেরকেও কুরবানী করতে উৎসাহ দিতেন।
মুমিন বান্দা কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি এই আনুগত্য নিবেদন করে যে, সে আল্লাহর জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে ও বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, তা যত প্রিয়ই হোক না কেন। যেমন, ত্যাগ ও আনুগত্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। তাঁকে আল্লাহ তাআলা স্বপ্নে নির্দেশ দিয়েছিলেন আপন পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী করতে। তিনি এ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে যে ত্যাগ ও আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা তা অত্যন্ত পছন্দ করেছেন। তাঁর সে সুন্নতের অনুসরণেই পশু কুরবানী করার বিধান দেওয়া হয়েছে। এ কুরবানী হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সেই মহান ত্যাগেরই অনুসরণ। আল্লাহ চান, তাঁর সকল বান্দাই তাঁর প্রতি ওই রকম ঈমান ও আনুগত্যের মনোভাব লালন করবে।
সুতরাং কুরবানী আমাদের এ চেতনা লালন করার শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর হুকুম পালনে যে-কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। নিজের সবকিছু এক আল্লাহর জন্য নিবেদিত ও উৎসর্গিত করার মতো ঈমান রাখতে হবে এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মতো একনিষ্ঠ ও সমর্পিত বান্দা হতে হবে।
আল্লাহ তো এই পশু কুরবানীর ভেতর দিয়েই দেখেন– বান্দা তাঁর প্রতি কেমন ঈমান রাখে। আল্লাহর হুকুম পালন ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার মতো ঈমান তার আছে কি না! কুরবানীসহ সকল ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্য করার মতো নিয়ত ও ইখলাস আছে কি না! আল্লাহ দেখেন, বান্দা নিয়ত ও কর্মে কতটা তাঁর অভিমুখী!
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন–
لَنْ يَّنَالَ اللّٰہَ لُحُوْمُہَا وَلَا دِمَآؤُہَا وَلٰکِنْ يَّنَالُہُ التَّقْوٰي مِنْکُمْ کَذٰلِکَ سَخَّرَہَا لَکُمْ لِتُکَبِّرُوا اللّٰہَ عَلٰي مَا ہَدٰىکُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِيْنَ.
আল্লাহর কাছে তাদের গোশত পৌঁছে না আর তাদের রক্তও না; বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। এভাবেই তিনি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর, তিনি তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন বলে। যারা সুচারুরূপে সৎকর্ম করে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। –সূরা হজ্ব (২২) : ৩৭
অতএব আমরা যদি পশু কুরবানীর মাধ্যমে সেই ঈমান অর্জন করার চেষ্টা করি এবং সে চেষ্টা অব্যাহত রাখি, তাহলেই কুরবানী যথাযথ হবে এবং আল্লাহ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
কুরবানী আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের আতিথেয়তা। তাই আল্লাহ তাআলা কুরবানীর গোশত নিজে খেতে এবং অন্যকে খাওয়াতে উৎসাহিত করেছেন।
কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন–
وَالْبُدْنَ جَعَلْنٰهَا لَكُمْ مِّنْ شَعَآىِٕرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَآفَّ فَاِذَا وَجَبَتْ جُنُوْبُهَا فَكُلُوْا مِنْهَا وَاَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ كَذٰلِكَ سَخَّرْنٰهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ.
কুরবানীর উট (ও গরু-ছাগল ইত্যাদি)-কে তোমাদের জন্য আল্লাহর ‘শাআইর’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের পক্ষে তাতে আছে কল্যাণ। সুতরাং যখন তা সারিবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়ানো থাকে, তার ওপর আল্লাহর নাম নেবে। তারপর যখন (জবাই হয়ে যাওয়ার পর) তা কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার গোশত থেকে নিজেরাও খাও, ধৈর্যশীল অভাবীকেও খাওয়াও এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে। এভাবেই আমি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। –সূরা হজ্ব (২২) : ৩৬
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
كُلُوْا وَادّخِرُوْا وَتَصَدّقُوْا.
তোমরা (কুরবানীর গোশত) খাও, জমা করে রাখ এবং দান-খয়রাত কর। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭২
সুতরাং আমাদের কর্তব্য, আল্লাহর এ আতিথেয়তা গ্রহণ করা এবং অন্যদেরকেও এতে শরীক করা। আল্লাহর আতিথেয়তা কত বড় সৌভাগ্য ও মর্যাদার বিষয়! এজন্য আল্লাহর প্রতি থাকতে হবে শোকরগোযার ও বিনয়াবনত। কুরবানীর গোশত খাওয়া কেবলই উৎসব বা উদরপূর্তি নয়; এতে রয়েছে ইবাদতের মহিমা। কুরবানীর গোশত অন্যকে খাওয়ানো বা বিতরণ করা হল আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারীর প্রতিনিধিত্ব এবং শোকরগোযারীর প্রকাশ। কুরবানীদাতা যেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের মেহমানদারী করছে।
অতএব কুরবানীর পশু জবাই, গোশত বিতরণ ও গোশত খাওয়া সবটাই যেহেতু ইবাদত। তাই এতে সর্বোচ্চ বিনয় ও ইখলাস এবং আল্লাহভীতি ও আল্লাহমুখিতা কাম্য।
কাউকে কিছু দেওয়ার সময় সত্যিকার মুমিনের মনের ভাব কেমন থাকে, সে সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে–
وَالَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَاۤ اٰتَوْا وَّقُلُوْبُهُمْ وَجِلَةٌ اَنَّهُمْ اِلٰي رَبِّهِمْ رٰجِعُوْنَ.
আর যারা যা দেওয়ার তা দেয় ভীত-কম্পিত হৃদয়ে, (এজন্য যে) তাদেরকে নিজ প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। –সূরা মু’মিনূন (২৩) : ৬০
আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে-কোনো ইবাদত ও দান এমন ভীত-কম্পিত মনেই হওয়া উচিত। এই দান ও ইবাদত আল্লাহ কবুল করবেন তো! নাকি আমার কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে তা নিষ্ফল হয়ে যাবে –এ ভয় অন্তরে থাকতে হবে। এটাই হল তাকওয়া ও আল্লাহভীতির প্রকাশ আর এ তাকওয়াই ইবাদতের প্রাণশক্তি। নামায ও কুরবানীসহ প্রতিটি ইবাদতেই তাকওয়ার প্রাণশক্তি থাকা অপরিহার্য। তাহলেই এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হবে এবং সওয়াব পাওয়া যাবে। আল্লাহ তো ইবাদতের মধ্য দিয়ে বান্দার এ তাকওয়াই দেখতে চান।
কুরবানী সম্পর্কেও তিনি বলেছেন–
لَنْ يَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰي مِنْكُمْ.
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত ইত্যাদি পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।
কুরবানী এ পবিত্র জীবনবোধের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে যে, এ জীবন আল্লাহপ্রদত্ত এবং তিনি এ জীবন এজন্যই দিয়েছেন, যেন আমরা কেবল তাঁরই ইবাদত ও আনুগত্য করি। কুরবানী আমাদের কাছে জীবনের এই অর্থ ও তাৎপর্যের পয়গামই নিয়ে আসে।