যিলকদ ১৪৪৭   ||   মে ২০২৬

হজ্ব : সংক্ষিপ্ত ফাযায়েল ও মাসায়েল

আলকাউসার ডেস্ক

আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু আদেশ-নিষেধ ও আনুগত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্রষ্টা, মানুষ তাঁর বান্দা; এ সত্য যেমন অবিসংবাদিত, তেমনি তাঁর সঙ্গে মানুষের আরেকটি গভীর সম্পর্ক হল মহব্বতের। যখন আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ সিফাত ও গুণাবলি কোনো হৃদয়ে সত্যিকার অর্থে উদ্ভাসিত হয়, তখন সেই হৃদয়ে জন্ম নেয় অপার্থিব এক প্রেমআল্লাহর প্রতি গভীর মহব্বত। এ মহব্বত মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জীবন উৎসর্গে উদ্বুদ্ধ করে।

হজ্বের বিভিন্ন আমল এই মহব্বত ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রকাশ। ইহরামের সরল পোশাক, তালবিয়ার ধ্বনি, কা‘বা শরীফের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সায়ী, আরাফা, মুযদালিফা ও মিনার ময়দানে অবস্থান সবকিছুই যেন আল্লাহপ্রেমিক বান্দার হৃদয়ের ভাষা।

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ এই ধ্বনিতে বান্দা ঘোষণা করে, সে তার প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছে। এভাবেই হজ্ব মানুষকে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালবাসা, আনুগত্য ও আত্মনিবেদনের শিক্ষা দেয়।

মুমিন বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ এই যে, তিনি তাকে এমন কিছু ইবাদত দান করেছেন, যার মাধ্যমে বান্দা রূহানী তারাক্কী, কলবের সুকূন ও প্রশান্তি এবং দুনিয়া-আখেরাতের খায়ের ও বরকত লাভ করে। এমনই একটি ইবাদত হল হজ্ব।

হজ্ব ও উমরায় গমনকারী আল্লাহর মেহমান। তারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়, আর তিনিও তাদের দুআ কবুল করে নেন। (দ্র. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৮৯৩)

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হজ্ব করল এবং অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকল, সে ওইদিনের মতো (নিষ্পাপ হবে), যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫২১

হজ্বের প্রতিটি আরকান ও আমলের মধ্যেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ সওয়াব ও ফযীলত। হজ্ব শুধু একটি সামগ্রিক ইবাদতই নয়; এর প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পদক্ষেপেই নিহিত রয়েছে পৃথক পৃথক রহমত ও বরকত।

হজ্বের অন্যতম প্রধান একটি আমল তালবিয়া পাঠ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কেউ তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ডানে-বামে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যা কিছু আছে, সবই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করতে থাকে। জামে তিরমিযী, হাদীস ৮২৮

মোটকথা, হজ্ব এমন এক ইবাদত, যা বান্দাকে গুনাহমুক্ত করে, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং তাকে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্যের অধিকারী করে তোলে। তাই এই মহান ইবাদত যথাযথ আদব, ইখলাস ও সুন্নাহর অনুসরণে আদায় করা অপরিহার্য।

নিম্নে হজ্ব সংক্রান্ত জরুরি কিছু মাসআলা আলোচনা করা হল, যা হজ্ব আদায়ে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

হজ্বের জরুরি মাসায়েল

হজ্বের প্রকার

হজ্ব তিন প্রকার। ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু। মীকাতের বাইরে থেকে আগমনকারী যে-কোনো প্রকার হজ্ব করতে পারেন।

১. ইফরাদ : শুধু হজ্বের নিয়তে মীকাত বা তার আগ থেকে ইহরাম বেঁধে হজ্ব সম্পাদন করা।

২. কিরান : হজ্বের মাসসমূহে (শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব) একই সঙ্গে হজ্ব ও উমরার নিয়তে মীকাত বা তার আগ থেকে ইহরাম বেঁধে প্রথমে উমরা করা। উমরা সম্পন্ন করে হালাল না হয়ে ওই ইহরামেই হজ্ব করা এবং কুরবানী করা।

৩. তামাত্তু : হজ্বের মাসসমূহে মীকাত বা তার আগ থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরা পালন করা এবং মাথা হলক বা কসর করে ইহরামমুক্ত হয়ে যাওয়া। এরপর এই সফরেই (অর্থাৎ হজ্বের মাসসমূহে) হজ্বের নিয়তে নতুন করে ইহরাম করে হজ্ব পালন করা এবং কুরবানী করা।

বাংলাদেশ থেকে যারা যান, তারা সাধারণত তামাত্তু হজ্বই করে থাকেন। তাই এখানে তামাত্তু হজ্বকে মূল ধরে বাকি দুই প্রকারকে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উমরা

উমরা হল, মীকাত বা তার আগ থেকে শুধু উমরার ইহরাম করে বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করা। সাফা-মারওয়ায় সায়ী করা। এরপর মাথার চুল মুণ্ডিয়ে বা ছেঁটে হালাল হওয়া।

ইহরাম (ফরয)

ইহরাম হল, হজ্ব বা উমরার নিয়তে তালবিয়া পাঠ করা। তালবিয়া হল

لَبَّيْكَ اَللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيْكَ لَكَ.

হজ্ব বা উমরার নিয়তে এই তালবিয়া পাঠ করার দ্বারাই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। সুতরাং ইফরাদ আদায়কারী শুধু হজ্বের নিয়ত, কিরান আদায়কারী হজ্ব ও উমরার নিয়ত আর তামাত্তু আদায়কারী প্রথমে শুধু উমরার নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবে। পরবর্তীতে হজ্বের সময় হজ্বের নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবে।

* বদলি হজ্বকারী যার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করছে, তার পক্ষ থেকে ইহরামের নিয়ত করবে। এভাবেআমি অমুকের পক্ষ থেকে উমরা বা হজ্বের ইহরাম করছি।’

তালবিয়ার ক্ষেত্র ও নিয়ম

উমরা ও তামাত্তু আদায়কারী উমরার ইহরাম বাঁধার পর থেকে উমরার তাওয়াফ করার আগ পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়া পড়তে থাকবে। উমরার তাওয়াফ শুরুর সাথে সাথে তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দেবে। এরপর হজ্বের ইহরামের পর থেকে ১০ যিলহজ্ব কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে। তদ্রূপ ইফরাদ ও কিরান আদায়কারী ইহরামের পর থেকে ১০ যিলহজ্ব কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে।

মাসআলা : পুরুষের জন্য সশব্দে তালবিয়া পাঠ করা মুস্তাহাব। আর মহিলাগণ নিঃশব্দে তালবিয়া পড়বে।

মাসআলা : মহিলাগণ হায়েয-নেফাস অবস্থায়ও তালবিয়া পাঠ ও ইহরাম করতে পারবে।

ইহরাম বাঁধার আগে করণীয়

ইহরাম বাঁধার আগে মোচ, নখ ও শরীরের অতিরিক্ত পশম পরিষ্কার করবে। উত্তমরূপে গোসল করবে, সম্ভব না হলে ওযু করবে। মানাসিক, পৃ. ৯৭

ঋতুমতী মহিলার জন্যও ইহরামের আগে গোসল করা মুস্তাহাব।

পুরুষগণ নতুন বা পরিষ্কার দুটি সাদা চাদর নেবে। একটি লুঙ্গির মতো করে পরবে, অপরটি চাদর হিসেবে ব্যবহার করবে। তবে মহিলাগণ স্বাভাবিক কাপড়ই পরবে। তাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় জুতা-মোজা পরারও অবকাশ রয়েছে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৪৪৪০

ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি ব্যবহার

ইহরাম বাঁধার আগে খালি শরীরে আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব। আতর বা সুগন্ধির ঘ্রাণ ইহরাম গ্রহণের পর বাকি থাকলেও অসুবিধা নেই। আর ইহরামের আগে ইহরামের কাপড়ে আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধ নয়। তবে এমন গাঢ় সুগন্ধি লাগানো নিষেধ, যা ইহরামের পরও বাকি থাকে। তাই ভালো হল, ইহরামের কাপড়ে সুগন্ধি না লাগানো।

দুই রাকাত নফল পড়া : মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে ইহরাম বাঁধার আগে দুই রাকাত নফল নামায পড়বে।

ইহরাম অবস্থায় যা নিষেধ

* সাজ-সজ্জা গ্রহণ করা। চুল দাড়ি আঁচড়ানো ও চুলে সিঁথি করা। কাপড় বা শরীরের উকুন মারা। নখ কাটা, চুল ও পশম কাটা বা উপড়ানো।

* পুরুষের জন্য শরীরের কোনো অঙ্গের গঠন অনুযায়ী তৈরিকৃত বা সেলাইকৃত পোশাক পরিধান করা। যেমন : পাঞ্জাবি, জুব্বা, শার্ট, সেলোয়ার, প্যান্ট, গেঞ্জি, কোট, সোয়েটার, জাঙিয়া ইত্যাদি।

* পুরুষের জন্য মাথা ও চেহারা ঢাকা নিষেধ। টুপি, চাদর, কম্বল ইত্যাদি দ্বারাও চেহারা ও মাথা ঢাকা যাবে না। আর মহিলারা পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢেকে রাখবে। তবে চেহারায় কাপড় লাগাবে না। বর্তমানে এক ধরনের ক্যাপ পাওয়া যায়, যা পরিধান করে সহজেই চেহারার পর্দা করা যায়। এতে চেহারায় কাপড়ও লেগে থাকে না।

* পায়ের পাতার উঁচু অংশ ঢেকে যায় পুরুষের এমন জুতা পরিধান করা নিষেধ। তাই এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরতে হবে, যা পরলে ওই উঁচু অংশ খোলা থাকে।

* ইহরাম অবস্থায় কাপড় বা শরীরে আতর-সুগন্ধি লাগানো নিষেধ। ইচ্ছাকৃত আতরের ঘ্রাণ নেওয়াও নিষেধ। সুগন্ধি সাবান দ্বারা হাত-পা ইত্যাদি ধোয়া যাবে না। পাউডার, স্নো, ক্রিম, পারফিউম ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।

* যে-কোনো তেল সুঘ্রাণযুক্ত হোক বা না হোক তেল ব্যবহারের নিয়তে কিংবা সুঘ্রাণের নিয়তে তা ব্যবহার করা যাবে না। সুঘ্রাণমুক্ত তেল ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করলে কোনো জরিমানা আসবে না।

* বিমানে বা হোটেলে যে ওয়েট টিস্যু দেওয়া থাকে, ইহরাম অবস্থায় সেগুলো ব্যবহার করা যাবে না।

* খাওয়ার পর সুগন্ধিযুক্ত হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে হবে।

* ইহরাম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করা বা স্ত্রীর সাথে এ সংক্রান্ত কোনো কথা বলা বা কাজ করা নিষেধ।

ইহরাম অবস্থায় যা নিষেধ নয়

* পুরুষের মাথা ও মুখমণ্ডল ছাড়া বাকি শরীর চাদর ইত্যাদি দিয়ে আবৃত করার সুযোগ আছে।

* ইহরাম অবস্থায় ইহরামের পোশাক (ময়লা বা নাপাক না হলেও) পরিবর্তন করা যাবে।

* টুথপেস্ট ও মাজন দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা যাবে।

* সাবান ব্যবহার না করে গোসল করা যাবে। তবে ইচ্ছাকৃত শরীরের ময়লা পরিষ্কার করা বা ওঠানো যাবে না।

* সুঘ্রাণযুক্ত ফল খাওয়া যাবে। তবে ইচ্ছাকৃত ফলের ঘ্রাণ নেওয়া মাকরূহ।

* মশা-মাছি, পিঁপড়া, বিচ্ছু ও কষ্টদায়ক পোকামাকড় প্রয়োজনে মারা যাবে।

* মাথা ও দাড়ি চুলকানো জায়েয। চুল পড়ার আশঙ্কা থাকলে কম চুলকানো ভালো।

* সেলাইযুক্ত বেল্ট, ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে।

* ঘ্রাণমুক্ত লিপজেল, ভ্যাসলিন প্রয়োজনবশত ব্যবহার করা যাবে।

তাওয়াফ (ফরয)

তাওয়াফ হল, হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে পুরো কা‘বা ঘর বিশেষ নিয়মে সাত বার চক্কর দেওয়া।

ইসতিলাম

সরাসরি হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়া অথবা হাত দিয়ে স্পর্শ করে বা হাত দিয়ে ইশারা করে তালুতে চুমু খাওয়া।

ইযতিবা

পুরুষের জন্য তাওয়াফের শুরুতে ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রাখাকে ইযতিবা বলে।

রমল

রমল হচ্ছে কাঁধ হেলিয়ে দুলিয়ে ছোট ছোট পদে কিছুটা দ্রুত ও বীরদর্পে হাঁটা।

তাওয়াফের পদ্ধতি

তাওয়াফের নিয়ত করে প্রথমে হাজরে আসওয়াদের কোণ বরাবর যাবে এবং হাজরে আসওয়াদকে ইসতিলাম করবে। এরপর ওই জায়গায় দাঁড়িয়েই কা‘বা শরীফকে বাম দিকে রেখে হাতীমের বাইরে দিয়ে তাওয়াফ শুরু করবে। হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত (দাগ দিয়ে চিহ্নিত স্থান) পৌঁছলে এক চক্কর পূর্ণ হবে। এরপর আবার ইসতিলাম করবে এবং পূর্বের নিয়মে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করবে। এভাবে সাতটি চক্কর পূর্ণ করলে একটি তাওয়াফ হবে। সপ্তম চক্কর শেষে পুনরায় ইসতিলাম করে তাওয়াফ শেষ করবে।

উমরা ও হজ্বের তাওয়াফের নিয়ম একই। শুধু নিয়তে পার্থক্য।

মাসআলা : যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে, সেই তাওয়াফের শুধু প্রথম তিন চক্করে পুরুষের রমল করা সুন্নত। অবশিষ্ট চার চক্করে স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবে।

তদ্রূপ এ তাওয়াফের পুরো সময় তাদের জন্য ইযতিবা করা সুন্নত। মানাসিক, পৃ. ১২৯

মাসআলা : মহিলাদের রমল ও ইযতিবা নেই। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১৩১১১

মাসআলা : হায়েয, নেফাস ও গোসল ফরয অবস্থায় তাওয়াফ করা জায়েয নেই। তেমনি বিনা ওযুতেও তাওয়াফ করা জায়েয নেই। তাওয়াফের জন্য ওযু থাকা ওয়াজিব।

মাসআলা : পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করতে সক্ষম নন এমন মাযুর ব্যক্তি হুইল চেয়ার কিংবা কোনো বাহনে চড়ে তাওয়াফ করতে পারবে।

তাওয়াফের দুই রাকাত নামায

ফরয বা নফল সব তাওয়াফের শেষেই দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব। এই নামায মাকামে ইবরাহীমের পেছনে পড়া মুস্তাহাব। সেখানে পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে হারামের যে-কোনো স্থানে পড়া যাবে।

মাসআলা : মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে এ দুই রাকাত নামায বিলম্ব না করে আদায় করা উত্তম। মাকরূহ ওয়াক্তে এ নামায পড়বে না; বরং তা শেষ হওয়ার পর পড়ে নেবে। গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১১৬

সায়ী (ওয়াজিব)

‘সায়ী’ হল, সাফা-মারওয়ার মাঝে সাত চক্কর দেওয়া। সাফা থেকে শুরু করে মারওয়াতে পৌঁছলেই এক চক্কর হবে। এরপর মারওয়া থেকে সাফাতে আসলে দ্বিতীয় চক্কর হবে। এভাবে সাত চক্কর পূর্ণ করা।

মাসআলা : সায়ী ওযু অবস্থায় করা মুস্তাহাব। হায়েয, নেফাস ও গোসল ফরজ অবস্থায় সায়ী করা মাকরূহ। তবে কেউ করলে আদায় হয়ে যাবে।

মাসআলা : সায়ীর সময় সবুজ বাতি দ্বারা চিহ্নিত স্থান পুরুষের মধ্যম গতিতে দৌড়ে অতিক্রম করা মুস্তাহাব। মহিলাগণ স্বাভাবিকভাবে হাঁটবে।

মাসআলা : সায়ী পায়ে হেঁটে করা ওয়াজিব। তবে অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে তা সম্ভব না হলে হুইল চেয়ারে করা যাবে।

হলক (ওয়াজিব)

সায়ী সমাপ্ত করার পর হলক বা কসর করে অর্থাৎ মাথা মুণ্ডিয়ে বা চুল ছোট করে ইহরামমুক্ত হয়ে যাবে।

সংক্ষেপে হজ্বের পাঁচ দিনের আমল

৮ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের পর ইহরাম অবস্থায় মিনায় যাবে। সেখানে রাত যাপন করবে। যোহর থেকে ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায মিনায় আদায় করবে।

৯ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের পর আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা করবে। সূর্য ঢলার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় উকূফ করবে। যোহর ও আসর আরাফায় আদায় করবে।

সূর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা করবে। সেখানে রাত যাপন করবে। মাগরিব-এশা উভয় নামায এশার ওয়াক্তে আদায় করবে। ফজরের নামায ফজরের ওয়াক্তেই পড়বে।

১০ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে, দিন ফর্সা হয়ে যাওয়ার পর মুযদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশে রওয়ানা করবে। মুযদালিফা থেকে সাতটি কঙ্কর সংগ্রহ করবে। মিনায় পৌঁছে জামরা আকাবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। এরপর হজ্বের কুরবানী করবে এবং মাথা মুণ্ডিয়ে বা চুল ছোট করে ইহরামমুক্ত হয়ে যাবে।

এরপর মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে যিয়ারত করবে এবং সায়ী করবে।

১১ ও ১২ যিলহজ্ব মিনায় তিনটি জামরার প্রতিটিতে ৭টি করে মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে।

হজ্ব আদায়ের পদ্ধতি (কিছুটা বিস্তারিত)

৮ থেকে ১২ যিলহজ্ব মোট পাঁচ দিন হজ্বের মূল সময়। ১৩ যিলহজ্বেও হজ্ব সংশ্লিষ্ট কিছু ঐচ্ছিক আমল আছে। এ দিনগুলোর আমলের ধারাবাহিক বিবরণ নিম্নে উপস্থাপিত হল

১ম দিন : ৮ যিলহজ্বের আমল

১. হজ্বের ইহরাম বাঁধা (ফরয) : ইফরাদ ও কিরান আদায়কারী হজ্বের ইহরাম পূর্ব থেকেই করে থাকে। তামাত্তু আদায়কারী মিনায় যাওয়ার পূর্বে হজ্বের ইহরাম করবে।

হজ্বের ইহরাম বাঁধার স্থান : মহিলাগণ নিজ নিজ অবস্থান স্থল থেকেই ইহরাম বাঁধবে। আর পুরুষরা চাইলে নিজ অবস্থানস্থল থেকে ইহরাম বাঁধতে পারে। তবে মসজিদে হারামে এসে ইহরাম বাঁধা উত্তম।

২. বেশি বেশি তালবিয়া পড়া (সুন্নত) : হজ্বের ইহরামের পর থেকে ১০ যিলহজ্ব জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়া পড়তে থাকবে। কঙ্কর নিক্ষেপের সময় থেকে তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দেবে। মানাসিক, পৃ. ২২৫

৩. মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা (সুন্নত) : ৮ যিলহজ্ব যোহর থেকে ৯ যিলহজ্ব ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায মিনায় পড়া সুন্নত।

৪. মিনায় রাত যাপন করা (সুন্নত) : ৮ যিলহজ্ব দিবাগত রাত মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। অবশ্য কেউ মিনায় অবস্থান না করলেও তার হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। তবে মাকরূহ হবে। মানাসিক, পৃ. ১৮৮-১৮৯

 

২য় দিন : ৯ যিলহজ্বের আমল

১. তাকবীরে তাশরীক পড়া (ওয়াজিব) :

৯ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১৩ যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর হাজ্বীদেরও তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব।

২. উকূফে আরাফা বা আরাফায় অবস্থান করা (ফরয)

উকূফে আরাফা অর্থ আরাফায় অবস্থান করা। এটি হজ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয। হাদীস শরীফে এসেছে, হজ্ব হল আরাফায় অবস্থানের নাম। জামে তিরমিযী, হাদীস ৮৮৯

উকূফে আরাফার সময় শুরু হয় ৯ যিলহজ্ব সূর্য ঢলার পর থেকে। শেষ হয় আগত রাতের সুবহে সাদিক হলে। তবে উকূফের মূল সময় হল, এদিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আর সূর্য ঢলার পর থেকেই উকূফ শুরু করা সুন্নত।

সূর্য ঢলার পর যখনই আরাফায় পৌঁছবে, তখন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময় উকূফ করা ওয়াজিব। এর আগে আরাফা থেকে বের হলে পুনরায় ফিরে আসা জরুরি। অন্যথায় দম ওয়াজিব হবে।

যদি কেউ সূর্যাস্তের আগে উকূফ করতে না পারে, তবে সুবহে সাদিকের আগে যে-কোনো স্বল্প সময় আরাফায় অবস্থান করলেও ফরয আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য মূল সময়ে আরাফায় না পৌঁছার কারণে অনেক ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে।

যোহর ও আসর একত্রে পড়া : মসজিদে নামিরার জামাতে শরীক হতে পারলে যোহর ও আসর একত্রে ইমামের পেছনে আদায় করবে। আর জামাতে শরীক হতে না পারলে কাফেলার আহলে ইলমগণ যেভাবে আমল করেন, সেভাবেই আমল করবে। অর্থাৎ তারা যোহর-আসর আলাদা পড়লে আলাদাই পড়বে। একত্রে পড়লে একত্রে পড়বে। এ নিয়ে বিবাদে জড়াবে না।

উকূফে আরাফার করণীয় : উত্তম হল, তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নিচে এসে কেবলামুখী হয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যিকির-দুআয় মশগুল থাকা। অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তা বা কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।

মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা : সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান থেকে মাগরিবের নামায না পড়ে মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হবে।

মুযদালিফায় পৌঁছে করণীয় : মুযদালিফায় পৌঁছে এশার ওয়াক্তে মাগরিব ও এশা একত্রে পড়বে (জামাতে পড়ুক বা একাকী)। এর আগে মাগরিব পড়লে তা আদায় হবে না; বরং সেখানে পৌঁছার পর এশার ওয়াক্ত থাকলে পুনরায় মাগরিব-এশা একত্রে পড়তে হবে। অবশ্য এশার ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হলে পথেই মাগরিব-এশা পড়ে নেবে। এক্ষেত্রেও পৌঁছার পর এশার ওয়াক্ত বাকি থাকলে এ দুই নামায পুনরায় পড়তে হবে।

৩. মুযদালিফায় রাত যাপন (সুন্নত)

৯ যিলহজ্ব দিবাগত রাতে মুযদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নাতে মুআক্কাদা।

৩য় দিন : ১০ যিলহজ্বের আমল

১. উকূফে মুযদালিফা (ওয়াজিব)

উকূফে মুযদালিফার সময় হল ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত। সুবহে সাদিকের পর সামান্য কিছু সময় মুযদালিফায় অবস্থান করলেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে একেবারে ফর্সা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সুন্নত। গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১৬৫

মহিলা ও বৃদ্ধদের উকূফে মুযদালিফার হুকুম : অতিশয় বৃদ্ধ, নারী কিংবা অধিক পীড়িত ব্যক্তির জন্য মুযদালিফায় অবস্থান না করে আরাফা থেকে সরাসরি মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি আছে। মানাসিক, পৃ. ২১৯

উকূফের স্থান : (মুহাসসির নামক স্থান ব্যতীত) মুযদালিফা ময়দানের যে-কোনো অংশেই উকূফ করা যায়। তবে মসজিদে মাশআরে হারামের নিকট উকূফ করা উত্তম।

মিনায় রওয়ানা : ১০ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে মিনার উদ্দেশে রওয়ানা হবে। সূর্যোদয় পর্যন্ত বিলম্ব করা সুন্নতের খেলাফ। মিনায় পৌঁছে জামরা আকাবায় রমী (কঙ্কর নিক্ষেপ) করবে।

২. জামরা আকাবায় রমী করা (ওয়াজিব)

এদিন শুধু জামরা আকাবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।

মাসআলা : শুধু প্রথম দিনের সাতটি কঙ্কর মুযদালিফা থেকে সংগ্রহ করা মুস্তাহাব। অবশ্য অন্য জায়গা থেকে নিলেও অসুবিধা নেই।

কংকরের ধরন : বুট বা ছোলার দানার মতো ছোট কঙ্কর মারা ভালো। বড়জোর খেজুরের বিচির মতো হতে পারে। বড় পাথর মারা মাকরূহ। মানাসিক, পৃ. ২২২

মাসআলা : সাতটি কঙ্কর সাত বারে মারতে হবে। কেউ যদি সাতটি কঙ্কর এক বারে নিক্ষেপ করে, তবে একটি কঙ্কর মারা হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। তখন আরও ছয়টি কঙ্কর পৃথক পৃথকভাবে মারতে হবে। আহকামে হজ্ব, পৃ. ৭৫

মাসআলা : কঙ্কর নিক্ষেপের স্থানে যে চওড়া দেয়াল আছে, তাতে কঙ্কর লাগানো জরুরি নয়; বরং বেষ্টনীর ভেতরে পড়াই যথেষ্ট। কোনো কঙ্কর যদি বেষ্টনীর বাইরে পড়ে যায়, তবে তা ধর্তব্য হবে না। এর পরিবর্তে আরেকটি কঙ্কর পুনরায় নিক্ষেপ করতে হবে। রদ্দুল মুহতার ২/৫১২

১০ যিলহজ্ব রমীর সময় : ১০ যিলহজ্ব কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হল, সুবহে সাদিকের পর থেকে আগত রাতের সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত। তবে সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য ঢলে যাওয়ার (অর্থাৎ যোহরের সময়ের আগ পর্যন্ত) সময়ের ভেতর রমী করা মুস্তাহাব।

উল্লেখ্য, ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং সূর্যাস্তের পর থেকে আগত রাতের সুবহে সাদিক পর্যন্ত রমী করা মাকরূহ। তবে মহিলা, দুর্বল ও অসুস্থদের জন্য এ দুই সময় রমী করা মাকরূহ নয়। তেমনি ভিড় বেশি হলে অন্যদের জন্যও রাতে রমী করা মাকরূহ নয়। গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১৬৯-১৭০

মাসআলা : জামরা আকাবায় রমীর পর দুআর জন্য এখানে অবস্থান না করা সুন্নত। তাই কঙ্কর মেরে দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করবে। মানাসিক, পৃ. ২২৪

অন্যকে দিয়ে রমী করানো : পুরুষ বা মহিলা, প্রত্যেকে নিজের রমী নিজেই করবে। শরয়ী কোনো ওযর ব্যতীত শুধু ভিড়ের অজুহাতে অন্যের দ্বারা রমী করালে তা আদায় হবে না; পুনরায় নিজে রমী করতে হবে। নতুবা দম ওয়াজিব হবে। গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ১৮৮

মাসআলা : ঋতুমতী মহিলারাও রমী করতে পারবে। এ কারণে কোনো জরিমানা আসবে না।

তালবিয়া বন্ধ : হজ্বের ইহরামের পর থেকে ১০ যিলহজ্ব জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত উত্তম যিকির ছিল তালবিয়া। জামরা আকাবায় প্রথম কঙ্কর নিক্ষেপের সময় থেকে তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দিতে হবে। এর পর থেকে তালবিয়া পড়ার বিধান নেই। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২১৮)

৩. দমে শোকর বা হজ্বের কুরবানী (ওয়াজিব)

তামাত্তু ও কিরান আদায়কারীদের হজ্বের কুরবানী করা ওয়াজিব।

মাসআলা : জামরা আকাবায় রমীর পর কুরবানী করবে। এরপর চুল কাটবে।

মাসআলা : ইফরাদ আদায়কারীর ওপর এ কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে করলে ভালো। মানাসিক, পৃ. ২২৬

মাসআলা : ইফরাদ আদায়কারীদের যেহেতু ওয়াজিব কুরবানী নেই, তাই তারা রমীর পরই চুল কেটে হালাল হতে পারবে। তবে কুরবানী করলে কুরবানীর পর চুল কাটা উত্তম।

দমে শোকরের সময় : ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত (জামরা আকাবায় রমীর পর) কুরবানীর সময়। তবে ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের পর থেকে সময় শুরু হলেও সূর্যোদয়ের পর কুরবানী করা সুন্নত।

কুরবানীর স্থান : হজ্বের কুরবানী হেরেমের সীমার ভেতরে করা জরুরি। হেরেমের বাইরে জবাই করলে হজ্বের কুরবানী আদায় হবে না।

মাসআলা : হেরেমের যে-কোনো স্থানে কুরবানী করা যায়। তবে মিনায় করা সুন্নত। রদ্দুল মুহতার ২/৫৩২

৪. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা (ওয়াজিব)

মাথা মুণ্ডানোর সময় শুরু হয় ১০ যিলহজ্ব কুরবানীর পর। ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত এ ওয়াজিব আদায়ের সুযোগ আছে। এর চেয়ে বিলম্ব করলে দম ওয়াজিব হবে।

চুল কাটার পরিমাণ : পুরুষের জন্য মাথা মুণ্ডিয়ে ফেলাই উত্তম। চুল না মুণ্ডিয়ে যদি ছোট করে তবে আঙুলের অন্তত এক কর (প্রায় এক ইঞ্চি) পরিমাণ ছোট করা ওয়াজিব। মহিলাগণ পুরো মাথার চুলের অগ্রভাগ থেকে অন্তত এক কর পরিমাণ ছোট করবে।

এ পরিমাণ চুল মাথার এক চতুর্থাংশ থেকে কাটলেও হালাল হয়ে যাবে।

তবে মাথার এক অংশ মুণ্ডিয়ে অন্য অংশে চুল রাখা বা ছোট বড় করে রাখা মাকরূহে তাহরীমী। তাই এমনটি করবে না। মানাসিক, পৃ. ২২৯

মাসআলা : কারও চুল আগে থেকেই এক কর বা এর চেয়ে ছোট থাকলে হালাল হওয়ার জন্য চুল ছোট করা যথেষ্ট হবে না; সেক্ষেত্রে মাথা মুণ্ডানো জরুরি। রদ্দুল মুহতার ২/৫১৬

মাসআলা : কারও মাথা পূর্ব থেকে মুণ্ডানো থাকলে কিংবা পুরো মাথা টাক থাকলে হালাল হওয়ার জন্য মাথায় ক্ষুর বুলিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট। বাদায়েউস সানায়ে ২/২১২

মাসআলা : মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করার আগে নখ বা শরীরের অতিরিক্ত পশম ইত্যাদি কাটা যাবে না। কাটলে নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা দিতে হবে।

মাসআলা : উমরা আদায়কারী উমরার সকল কাজ শেষ করার পর এবং কিরান ও তামাত্তু আদায়কারী হজ্বের কুরবানী করার পর আর ইফরাদ আদায়কারী জামরা আকাবায় কঙ্কর মারার পর নিজে চুল কাটার পূর্বেও অন্যের চুল কেটে দিতে পারবে। মানাসিক, পৃ. ২৩০

চুল কাটার স্থান : হাজ্বীদের ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য মিনাতে মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা সুন্নত। অবশ্য হেরেমের সীমার ভেতর অন্য কোথাও করে নিলেও এ ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। আর হেরেমের বাইরে করলেও হালাল হয়ে যাবে। তবে দম ওয়াজিব হবে। মানাসিক, পৃ. ২৩০

মাসআলা : মাথা মুণ্ডালে বা চুল ছোট করলে ইহরামমুক্ত হয়ে যাবে। এরপর থেকে স্ত্রী ব্যতীত ইহরামের নিষিদ্ধ সবকিছুই হালাল হয়ে যাবে। আর তাওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করার পর স্ত্রীও হালাল হয়ে যাবে।

৫. তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করা (ফরয)

তাওয়াফে যিয়ারত হজ্বের গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এই তাওয়াফ ছাড়া হজ্ব সম্পন্ন হয় না; এমনকি এ তাওয়াফের আগে স্বামী-স্ত্রী মিলনও বৈধ নয়। এই তাওয়াফ না করে কেউ দেশে চলে এলে, তাকে আবার মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ করতে হবে।

তাওয়াফে যিয়ারতের সময় : এই তাওয়াফের সময় হল ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিক থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের আগে করলে তা আদায় হবে না।

তবে সুন্নত হচ্ছে, ১০ই যিলহজ্ব রমী, কুরবানী ও মাথা মুণ্ডানো এই তিন কাজ করার পর তাওয়াফে যিয়ারত করা। কেউ যদি সুবহে সাদিক হওয়ার পর অন্যান্য আমল করার আগে তাওয়াফে যিয়ারত করে নেয়, তার তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে। তবে সুন্নতের খেলাফ হবে।

মাসআলা : যদি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগে তাওয়াফে যিয়ারত করতে না পারে, বিলম্বের কারণে দম দেওয়া জরুরি। তবে বিলম্বে হলেও নিজেকে সশরীরে তাওয়াফ করতে হবে। আহকামে হজ্ব, পৃ. ৮০

মাসআলা : অসুস্থ হলেও তাওয়াফে যিয়ারত নিজেকেই করতে হবে। প্রয়োজনে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু অন্যকে দিয়ে বদলি তাওয়াফ করানো যাবে না।

মাসআলা : পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করার সামর্থ্য থাকাবস্থায় হুইল চেয়ারে বা অন্য কোনো বাহনে চড়ে তাওয়াফে যিয়ারত করা বৈধ হবে না। কেউ করলে ওই তাওয়াফ পুনরায় পায়ে হেঁটে করা জরুরি। নতুবা দম দিতে হবে।

মাসআলা : তাওয়াফে যিয়ারতের এক চক্করও ছুটে গেলে দম ওয়াজিব হবে। তবে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের আগে তা আদায় করে নিলে দম মাফ হয়ে যাবে।

ঋতুমতী মহিলার তাওয়াফে যিয়ারত

ঋতুমতী মহিলা পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। যদি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের এত আগে পবিত্র হয়ে যান যে, নিজ স্থান থেকে গিয়ে সূর্যাস্তের আগেই তাওয়াফে যিয়ারতের অন্তত চার চক্কর করা সম্ভব, তাহলে অবশ্যই এর ভেতরেই তাওয়াফ সেরে নিতে হবে। পবিত্র হওয়ার পর এতটুকু সময় পাওয়া সত্ত্বেও এ সময়ের ভেতর তাওয়াফে যিয়ারত না করলে দম ওয়াজিব হবে। আর যদি এই সময়ের ভেতর চার চক্কর আদায় করাও সম্ভব না হয়, তাহলে পবিত্র হওয়ার পর আদায় করে নেবেন। এক্ষেত্রে বিলম্বের কারণে কোনো জরিমানা আসবে না।

পবিত্র হওয়ার আগেই দেশে ফিরতে হলে

যদি কোনো মহিলা হায়েয বা নেফাস অবস্থায় থাকার কারণে তাওয়াফে যিয়ারত করতে না পারে, আর পবিত্র হওয়ার আগেই তার দেশে ফেরার সময় হয়ে যায়, কোনোভাবেই তা বাতিল করা বা বিলম্ব করা সম্ভব না হয়, তবে এই অপারগতার কারণে সে এ অবস্থাতেই তাওয়াফ করবে। আর এজন্য একটি উট বা গরু হেরেমের এলাকায় জবাই করবে। সাথে আল্লাহ তাআলার দরবারে ইস্তিগফারও করবে।

মোটকথা, কোনো অবস্থাতেই তাওয়াফে যিয়ারত না করে দেশে যাবে না। অন্যথায় তাকে আবার মক্কায় এসে তাওয়াফ করতে হবে। যতদিন তাওয়াফ না করবে ততদিন স্বামীর সাথে থাকতে পারবে না। রদ্দুল মুহতার ২/৫১৮-৫১৯

৬. হজ্বের সায়ী করা (ওয়াজিব)

হজ্বের সায়ীর সময় : হজ্বের সায়ীর মুস্তাহাব সময় হল তাওয়াফে যিয়ারতের পর। অবশ্য হজ্বের সায়ী আগেও করে নেওয়া যায়। আগে করার জন্য শর্ত হল, হজ্বের ইহরাম করে মিনায় যাওয়ার আগে একটি নফল তাওয়াফ করা। এরপর হজ্বের সায়ী করে নেওয়া।

অতএব, যারা মিনায় যাওয়ার পূর্বে হজ্বের সায়ী করেছে তাদের যেহেতু তাওয়াফে যিয়ারতের পর আর সায়ী করতে হবে না, তাই এই তাওয়াফে তাদেরকে ইযতিবা-রমলও করতে হবে না। কিন্তু যারা ইতিপূর্বে হজ্বের সায়ী করেনি তাদের এই তাওয়াফের পর সায়ী করতে হবে, তাই এই তাওয়াফে তারা ইযতিবা-রমলও করবে।

এ পর্যায়ে হজ্বের ওয়াজিব আমলগুলো প্রায় সব শেষ। শুধু ১১ ও ১২ যিলহজ্বের রমী করা (ওয়াজিব) এবং মক্কা থেকে চলে আসার আগে তাওয়াফে বিদা (ওয়াজিব) বাকি আছে।

মাসআলা : ১০ই যিলহজ্ব রাত থেকে ১২ তারিখ কঙ্কর মারা পর্যন্ত রাতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। রাতের অধিকাংশ সময় মিনায় থাকলেও এই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। কেউ যদি মিনায় না থাকে, তবে সুন্নতের খেলাফ হবে বটে, কিন্তু এ কারণে কোনো প্রকার জরিমানা দিতে হবে না। ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৩

৪র্থ দিন : ১১ যিলহজ্বের আমল

১১ যিলহজ্ব তিন জামরায় সাতটি করে মোট ২১টি কঙ্কর মারা ওয়াজিব।

১১ যিলহজ্ব রমীর সময় : ১১ যিলহজ্ব রমীর সময় হল যোহরের সময় থেকে আগত রাতের সুবহে সাদিক পর্যন্ত। সম্ভব হলে এই দিন সূর্যাস্তের আগে রমী করে নেওয়া উত্তম। সূর্যাস্তের পর মাকরূহ সময়।

মাসআলা : মহিলা ও দুর্বল ব্যক্তিরা তেমনিভাবে ওই সময় অত্যধিক ভিড় হলে অন্যরাও সূর্যাস্তের পর এই রমী করতে পারবে।

মাসআলা : প্রথম দুই জামরাতে রমী করে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দুআ করা সুন্নত। জামরা আকাবায় রমীর পর দুআ নেই। রদ্দুল মুহতার ২/৫২১

পঞ্চম দিন : ১২ যিলহজ্বের আমল

১২ যিলহজ্ব তিন জামরাতেই রমী করা ওয়াজিব। এদিনও রমী করার সময় হল যোহরের সময় থেকে আগত রাতের সুবহে সাদিক পর্যন্ত। এবং সূর্যাস্তের আগে রমী করে নেওয়া উত্তম।

মাসআলা : ১১ ও ১২ তারিখ যোহরের পূর্বে রমীর সময় শুরু হয় না। তাই এ সময় কেউ রমী করলে তা আদায় হবে না।

১৩ যিলহজ্বের আমল

মাসআলা : ১২ যিলহজ্ব দিবাগত রাতে মিনায় থাকা মুস্তাহাব এবং ১৩ তারিখ রমী করাও মুস্তাহাব।

মাসআলা : কেউ যদি ১৩ তারিখ মিনায় থাকতে না চায়, তাহলে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগেই মিনা ত্যাগ করতে হবে। ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পর মিনা ত্যাগ করা মাকরূহ। অবশ্য এরপরও কেউ যদি রাতে মিনা ত্যাগ করে, তবে এ কারণে কোনো জরিমানা ওয়াজিব হবে না।

আর কেউ যদি মিনায় ১৩ তারিখ সুবহে সাদিক পর্যন্ত থাকে তার জন্য ওই দিন রমী করা ওয়াজিব। রমী না করলে দম ওয়াজিব হবে। রদ্দুল মুহতার ২/৫২১

১৩ যিলহজ্ব রমী করার সময়

১৩ তারিখ সুবহে সাদিক থেকেই রমী করার সময় শুরু হয়ে যায়। তবে সূর্য ঢলার পর করা উত্তম। আর এদিন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই রমী করার সময় শেষ হয়ে যায়। তাই এর আগে রমী না করলে দম ওয়াজিব হবে।

তাওয়াফে বিদা : মীকাতের বাইরে থেকে আগত হাজ্বীদের জন্য তাওয়াফে যিয়ারতের পর মক্কা মুকাররামা ত্যাগ করার আগে একটি তাওয়াফ করা ওয়াজিব। একে তাওয়াফে বিদা বলা হয়।

তাওয়াফে বিদার সময় : তাওয়াফে যিয়ারতের পর তাওয়াফে বিদার সময় শুরু হয়। যাদের দ্রুত দেশে ফিরতে হবে, তারা চাইলে তাওয়াফে যিয়ারত এবং হজ্বের অন্যান্য আমল সম্পন্ন করার পর ১০ তারিখেও তাওয়াফে বিদা করে নিতে পারবেন। অবশ্য যারা বিলম্বে মক্কা ত্যাগ করবেন, তারা তাওয়াফে বিদা পরেই করবেন।

মাসআলা : তাওয়াফে যিয়ারতের পর নফল তাওয়াফ করলে তা দ্বারাও বিদায়ী তাওয়াফের ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য বিদায়ী তাওয়াফের নিয়তে আলাদা করে তাওয়াফ করে নেওয়া ভালো।

মাসআলা : তাওয়াফে বিদার সময় কোনো মহিলা যদি ঋতু অবস্থায় থাকেন এবং ফেরার আগে পবিত্র না হন, তাহলে এই তাওয়াফ আদায় না করেই দেশে চলে আসতে পারবেন। এ কারণে কোনো জরিমানা আসবে না।

বদলি হজ্ব

হজ্ব ফরয হওয়ার পর শক্তিসামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি হজ্ব করতে না পারে এবং এ অবস্থায় মাযুর হয়ে হজ্বে যাওয়ার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলে; তদ্রূপ কোনো মহিলার ওপর হজ্ব ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি মাহরাম পাননি, এ অবস্থায়ই বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, তার ওপর কর্তব্য হল, কাউকে দিয়ে বদলি হজ্ব করানো। আর মৃত্যু এসে গেলে বদলি হজ্বের অসিয়ত করে যাওয়া।

মাসআলা : বদলি হজ্ব নিজ দেশ থেকেই করাবে। এক্ষেত্রে আত্মীয় অনাত্মীয়, নারী-পুরুষ যে কাউকে দিয়ে হজ্ব করানো যাবে। তবে উত্তম হল, এমন কাউকে দিয়ে হজ্ব করানো, যিনি আগে নিজের ফরয হজ্ব করেছেন এবং হজ্বের মাসায়েল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছেন।

মাসআলা : বদলি হজ্বকারী প্রেরকের পক্ষ থেকে ইহরাম করতে ভুলে গেলে তার ওপর জরুরি হল, হজ্বের কাজ শুরু করার আগেই প্রেরকের পক্ষ থেকে নিয়ত করে নেওয়া। তাহলেও বদলি হজ্ব আদায় হয়ে যাবে।

মাসআলা : প্রেরণকারীর অনুমতিক্রমে বদলি হজ্বকারী তামাত্তু বা কিরানও করতে পারবে। ইফরাদই করতে হবে এমন নয়।

মদীনা মুনাওয়ারা যিয়ারত

হজ্বের সফরে মদীনা মুনাওয়ারায় উপস্থিতি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা যিয়ারত অনেক বরকতপূর্ণ ও সৌভাগ্যের বিষয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত অনেক নিদর্শন এখানে রয়েছে, যা দেখার দ্বারা অন্তরে রাসূলের মহব্বত তাজা হয়।

হাদীস শরীফে এসেছে, মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামায পড়া মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্য মসজিদে এক হাজার রাকাত আদায় করার চেয়ে উত্তম। সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৯০

রিয়াযুল জান্নাহ-এর ব্যাপারে এসেছে, এটি জান্নাতের বাগানসমূহের মাঝে একটি বাগান। সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৯৫

তাই হাজ্বী সাহেবদের জন্য মদীনা মুনাওয়ারায় হাজির হয়ে বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পেশ করে বরকত লাভ করা একান্ত কর্তব্য।

লক্ষণীয় : এখানে সংক্ষিপ্তভাবে হজ্বের কিছু ফাযায়েল ও মাসায়েল উল্লেখ করা হল। কলেবর যেন বৃদ্ধি না পায় সেজন্য সকল মাসআলার উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়নি। অন্যথায় প্রত্যেকটি মাসআলাই দলীলনির্ভর। উদ্ধৃতির প্রয়োজনে পেছনের সংখ্যাগুলোও দেখে নেওয়া যেতে পারে।

 

 

advertisement