দৈনন্দিন জীবনের আমল-ইবাদত
‖ তাযকিয়া হাসিলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম
হামদ ও সালাতের পর...
প্রত্যেকটা নেক আমলের একটা দেহ থাকে, একটা প্রাণ থাকে। বিশেষত ইবাদত শ্রেণির নেক আমলসমূহের।
ইবাদতের শর্ত ও রোকনের মাধ্যমে যেমন তার দেহ ও কাঠামো তৈরি হয়, ইবাদতের উসূল ও আদাব রক্ষার মাধ্যমে তার মধ্যে রূহ ও প্রাণের সঞ্চার হয়।
আমি কুরআন কারীমের সূরা তওবা থেকে একটি আয়াত তিলাওয়াত করেছি–
خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَ تُزَكِّيْهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ اِنَّ صَلٰوتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ.
(হে নবী!) আপনি তাদের সম্পদ থেকে সদাকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে দেবেন এবং তাদের জন্য দুআ করুন। নিশ্চয়ই আপনার দুআ তাদের পক্ষে প্রশান্তি। আর আল্লাহ সব কথা শোনেন, সবকিছু জানেন। –সূরা তওবা (৯) : ১০৩
প্রত্যেক নেক আমল, বিশেষত ইবাদত শ্রেণির আমলগুলোর মধ্যে একটা দেহ ও প্রাণ আছে। আমলের কাঠামো সামনে আসার মাধ্যমেই তা অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু আমলের সকল বরকত ও কল্যাণ এবং পূর্ণ ফায়েদা পেতে হলে আমাকে আমলের রূহ ও প্রাণ হাসিল করতে হবে। অবশ্যই আমলের মূল অস্তিত্ব ও কাঠামো এসে গেলেই তার একটা বরকত ও ফযীলত পাওয়া যায়। কিন্তু পূর্ণ ফযীলত, বরকত ও ফায়েদা পেতে হলে আমলের রূহের প্রতিও আমাকে যত্নবান হতে হবে।
নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, কুরআন কারীম তিলাওয়াত, দুআ-দরূদ, যিকির-তাসবীহ ইত্যাদি সরাসরি ইবাদত। ইবাদত ছাড়া অন্যান্য নেক আমলের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। কিন্তু ইবাদত শ্রেণির (সালাত, সওম, যাকাত, হজ্ব) আমলের ক্ষেত্রে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সদাকা সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন–
خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً.
হে নবী, আপনি মুসলিমদের সম্পদ থেকে সদাকা গ্রহণ করুন।
এই সদাকা দ্বারা যাকাত তথা ফরয সদাকা উদ্দেশ্য। যদিও শব্দের ব্যাপকতার মধ্যে অন্যান্য সদাকাও আসে, কিন্তু প্রেক্ষাপট ও পূর্বাপর থেকে এখানে যাকাতই বোঝা যায়।
تُطَهِّرُهُمْ
এই সদাকা দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন।
وَ تُزَكِّيْهِمْ بِهَا
আর তাদেরকে কলুষতামুক্ত করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন।
যাকাত-সদাকাসহ যে-কোনো ইবাদত ও নেক আমলের ফায়েদা হল তহারাত ও তাযকিয়া। যাকাতের মাধ্যমে আমার সম্পদ যেমন পবিত্র হবে, আমার আখলাক-চরিত্রও পবিত্র হবে। আমার ওপর যে পরিমাণ যাকাত ওয়াজিব হয়, হিসাব করে তা যথাযথভাবে আদায় করলাম– কেবল এটুকু দ্বারা যাকাতের পূর্ণ ফায়েদা হাসিল হবে না; বরং আমার নিয়ত ও ইখলাস এবং ইহতিসাব থাকতে হবে। ইহতিসাব মানে এই আমলের ফায়েদাগুলো মনের মধ্যে হাযির রাখা, সওয়াবের আশা রাখা এবং আমলের যেসব আদব রয়েছে সেসবের প্রতিও যত্নবান থাকা।
যাকাত-সদাকার আদব কী কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন–
وَ الَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَاۤ اٰتَوْا وَّ قُلُوْبُهُمْ وَجِلَةٌ اَنَّهُمْ اِلٰي رَبِّهِمْ رٰجِعُوْنَ.
অর্থাৎ যাকাত-সদাকা পেশ করতে হবে বিনয়ের সাথে এবং এমন অবস্থায় যে, আমার দিল-হৃদয় প্রকম্পিত। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং আমার ফায়েদার জন্য আল্লাহর বান্দাদের কাছে এই দান পেশ করছি, আমার আল্লাহ মেহেরবানী করে সেটি কবুল করবেন তো! এই অনুভূতিটা অন্তরে জাগরূক থাকা। [দ্র. সূরা মুমিনূন (২৩) : ৬০]
মূলত যে-কোনো নেক আমল করার ক্ষেত্রেই দিলটা এমন ভীত প্রকম্পিত থাকা সেই আমলের আদব।
বিনয় মানে, দান করার সময় মালিক মালিক ভাব বা মনোভাব থাকবে না। মনোভাব থাকবে এমন– এই সম্পদের প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ তাআলা; আল্লাহ আমাকে এর প্রতিনিধি বানিয়েছেন। কুরআন কারীমের ভাষায়–
وَ اَنْفِقُوْا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُّسْتَخْلَفِيْنَ فِيْهِ.
আর যে সম্পদে তোমাদেরকে প্রতিনিধি করেছেন, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। –সূরা হাদীদ (৫৭) : ৭
এই সম্পদ আমার হাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত, যাদের হাতে পেশ করা হচ্ছে এটি তাদের হক। আমার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়। বরং তাদের হক কেবল তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সে গ্রহণ করেছে, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ।
সাথে সাথে দিলের মধ্যে এই ভয়ও কাজ করবে, না জানি কোনো ত্রুটির কারণে আল্লাহ আমার এই দান কবুল না করেন! এজন্য দুআও করবে, আল্লাহ, আপনি মেহেরবানী করে আমার দান কবুল করে নিন!
এগুলো হল যাকাতসহ যে-কোনো ইবাদতের আদব। এই আদবগুলো উপস্থিত থাকলে ইবাদতের মধ্যে প্রাণ আসবে। তার যে ফায়েদা রয়েছে– তাহারাত ও তাযকিয়া, সেটিও প্রতিফলিত হবে। অর্থাৎ আমার আকীদার পরিশুদ্ধি, আমলের পরিশুদ্ধি, আখলাক ও সীরাতের পরিশুদ্ধি, মুআমালা-মুআশারাতের পরিশুদ্ধি, আমার চিন্তা-চেতনার পরিশুদ্ধি এবং অর্থ-সম্পদের পরিশুদ্ধি– সবই হাসিল হবে।
তার আগের কথা হল, আমার অর্থ-সম্পদ ও উপার্জন যেন হালাল হয়, তার প্রতি খেয়াল রাখা। প্রত্যেক ইবাদতের শর্ত, বিশেষ করে যেসকল রোকন রয়েছে, এমনকি উক্ত আমলের যেসকল আদব রয়েছে, সেগুলোর প্রতিও যত্নবান হওয়া। বিশেষত যে আদবগুলোর সম্পর্ক অন্তর্জগতের সাথে; ইবাদতের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য সেগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া অনেক জরুরি। এতে ইবাদত যেমন প্রাণবন্ত হবে, ইবাদতের মৌলিক ফায়েদা ও কল্যাণও অর্জিত হবে।
যাকাতের ক্ষেত্রে আরেক আদব হল–
قَوْلٌ مَّعْرُوْفٌ وَّ مَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِّنْ صَدَقَةٍ يَّتْبَعُهَاۤ اَذًي وَاللهُ غَنِيٌّ حَلِيْمٌ.
যাকাত তো বটেই, অন্য সাধারণ দান-সদাকার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ আদব হল, অনুগ্রহ না ফলানো। অর্থাৎ দান গ্রহণকারীর কষ্ট হয় এমন কোনো কথা বা আচরণ না করা। তবেই সদাকার ফায়েদা যথাযথ পাওয়া যাবে। আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমের সূরা বাকারার অনেকগুলো আয়াতে এ বিষয়ে আলোচনা ও সতর্ক করেছেন। তোমরা সদাকা-খয়রাত কর নিজের ফায়েদা ও কল্যাণের জন্য। তবেই সেটি আখেরাতে কাজে আসবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে। এক লোক তার জীবনের শেষ অবস্থায় আছে। সন্তান-সন্ততি ও ওয়ারিসদের জন্য অনেক ধন-সম্পদ রেখে যাচ্ছে। কারণ তার চলে যাওয়ার পর সন্তানরা অসহায় হয়ে গেলেও অন্তত এই সম্পদগুলো যেন কাজে আসে। ঠিক এমন সময় যদি আসমানী কোনো মুসিবত এসে সম্পদগুলো ধ্বংস করে দেয়, তখন কী দশা হবে?
তেমনি তোমার দান-সদাকা যা করছ, সব তো আখেরাতের জন্যই করছ। কিন্তু আখেরাতে গিয়ে কিছুই পাবে না, যদি দান করার পর গ্রহণকারীকে কোনো কথা বা আচরণে কষ্ট দাও কিংবা খোঁটা দাও বা অনুগ্রহ ফলাও। আখেরাতে তোমার নেকীর অনেক প্রয়োজন, কিন্তু কিছুই কাজে আসছে না, এমন দান-সদাকা করার চেয়ে ভালো হল তুমি কিছু না দিয়ে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। দিতে পারলাম না, মনে কিছু নেবেন না। এতীম, গরিব, মিসকীন ও অসহায় ব্যক্তিকে কিছু না দিয়ে এভাবে ক্ষমা চেয়ে নেওয়াও অনেক ভালো– এমন সদাকার চেয়ে, যা দান করা হল, কিন্তু আদব রক্ষা হল না। যেমন, সদাকা প্রদান করার পর তোমার কোনো কথা, কাজ বা আচরণে সে অপমান বোধ করেছে।
আমলের ফযীলত, বরকত ও ফায়েদা পেতে হলে আমলের রূহের প্রতিও যত্নবান হতে হবে
আগের আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম, প্রত্যেক ইবাদতের মধ্যেই কিছু উসূল ও আদব থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে ইবাদতে প্রাণ ও রূহ আসে। ইবাদতে রূহ এলেই তার সকল ফায়েদা ও বরকত হাসিল হয়। যেমন যাকাতের ফায়েদা পবিত্রতা। এই ফায়েদা দুনিয়াতেই আমি পাব ইনশাআল্লাহ। ঈমান তাজা হবে, আখলাক ও চিন্তা-চেতনা পরিশুদ্ধ হবে। কার্পণ্যের চিকিৎসা হবে।
যেভাবে দৈনন্দিনের আমলগুলো আমার জন্য তাযকিয়া
আমরা তাযকিয়া চাই; নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চাই। আমরা দৈনন্দিন যেসব আমল ও ইবাদত করি, অথবা সপ্তাহে বা বছরে যেসব আমল করি, তাযকিয়ার অনেক উপাদানই আল্লাহ তাআলা সেগুলোর মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। একেক আমলের দ্বারা ঈমানী যিন্দেগীর একেক দিকের তাযকিয়া হয়। অথচ সেগুলোর দিকে অনেকেরই সেভাবে খেয়াল করা হয় না।
অনেকেই তাযকিয়াকে আলাদা একটা প্রোগ্রাম মনে করি এবং এর জন্য আলাদা আয়োজন করে থাকি। সেটি কখনো হয়ে ওঠে, কখনো হয়ে ওঠে না। এজন্য আলাদা প্রোগ্রাম করার চিন্তা না করেও যদি দৈনন্দিন টুটা-ফাটা কমবেশি যা আমল হচ্ছে, সেই আমলের মধ্যেই আমি তাযকিয়া ও ইসলাহের অনুসন্ধান করি, তাহলে তাযকিয়া সহজ হতে থাকবে এবং তারাক্কী হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
প্রত্যেক আমলের মধ্যে ইখলাস, ইহতিসাব এবং ওই আমলের উসূল ও আদাবের প্রতি যদি যত্নবান হই, আমলের মধ্যে রূহ ও প্রাণ আসবে এবং এর দ্বারাই আমার তারাক্কী হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
সদাকা-খায়রাত
আমি দশ টাকাই দান করি না কেন, দানটা যদি বিনয়ের সাথে হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, আমার দান গ্রহণ করার কারণে গ্রহণকারীর প্রতি যদি আমার কৃতজ্ঞতা বোধ হয়, তার প্রতি আমি দয়া করেছি– এই মনোভাব যদি না থাকে, তাহলে অল্প টাকার দানও আমার জন্য যেমন অনেক সওয়াব নিয়ে আসবে, সাথে সাথে তার দ্বারা আমার আমল-আখলাক-চরিত্র এবং চিন্তা-চেতনার তারাক্কী হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
রোযা
এভাবে রোযার ব্যাপারেও হাদীস শরীফে আমাদেরকে বলা হয়েছে, তুমি রোযা রাখছ, তো রোযার হক আদায় কর। হাদীসে বলা হয়েছে–
الصِّيَامُ جُنَّةٌ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَجْهَلْ.
রোযা ঢালস্বরূপ; সুতরাং অশ্লীলতা পরিহার কর এবং মূর্খের আচরণ কর না। –সহীহ বুখারী, হাদীস ১৮৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫১
রোযা ঢাল। রোযা আমার জন্য তখনই ঢাল হবে, যখন আমি রোযার আদব রক্ষা করে চলব। রোযার আদবের মধ্যে যবানের হেফাযত অন্যতম। ব্যাপকভাবে সকল হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে, বিশেষত যবানের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে, তবেই রোযা আমার জন্য ঢাল হবে। ফলে রোযার বরকতে জাহান্নাম থেকে বাঁচা যেমন আমার জন্য সহজ হবে, সাথে সাথে রোযার ফায়েদা ও প্রাণ তাকওয়াও আমার হাসিল হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ!
রোযার প্রাণ তাকওয়া। এটি তখনই আসবে, যখন আমি এভাবে চিন্তা করব এবং অগ্রসর হব, যে আল্লাহর জন্য রোযা অবস্থায় হালাল বিষয়গুলো ছেড়ে দিলাম, যে বিষয়গুলো আমার জন্য সারা বছরই হারাম, সব সময় নাজায়েয, সেগুলো থেকে কি বেঁচে থাকব না? পানাহার ত্যাগ করলাম, কিন্তু গীবত ত্যাগ করলাম না, রোযা রাখলাম, কিন্তু গুনাহ ছাড়লাম না, চোখের গুনাহ, হাতের গুনাহ ত্যাগ করলাম না– এটা হতে পারে না। এই রোযা হল আমার জন্য তাযকিয়া। তাকওয়া হাসিল হলেই তো তাযকিয়া। রোযার দ্বারা আমার মুহাসাবা ও আত্মসমালোচনার ফিকির আসতে থাকবে এবং নিজের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ভাবার মানসিকতা তৈরি হবে। রোযার বিষয়ে হাদীসে দুটো শব্দই স্পষ্ট বলা হয়েছে–
إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا.
আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে, বিধানটি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সেটি বিশ্বাস করে এবং সওয়াবের আশা রেখে।
আরেক হাদীসে এসেছে–
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَعَرَفَ حُدُودَهُ، وَحَفِظَ مَا يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَحْفَظَ، كَفَّرَ مَا قَبْلَهُ.
অর্থাৎ যে ব্যক্তি রোযা রাখল এভাবে যে, রোযার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নির্ধারিত যে সীমারেখা রয়েছে, তা বুঝে আমল করেছে এবং মেনে চলেছে, যা থেকে বেঁচে থাকা দরকার, সেগুলো থেকে বেঁচে থেকেছে, তবেই সে রোযার ফায়েদা পাবে। তার পেছনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
কাজেই রোযা আমার জন্য তাযকিয়া। যদি আমি ইখলাস, ইহতিসাব ধারণ করি এবং রোযা অবস্থায় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি। বিশেষ করে যবান হেফাযত করি; এর গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি।
সালাত
সালাতের বিষয়টিও এমনই। আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰي عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ.
নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে মুসল্লিকে বিরত রাখে। তাহলে নামায সরাসরি তাযকিয়া হয়েই গেল। নামায অবস্থায় তো বিরত থাকছেই। নামায যদি খুশূ-খুযূসহ হয়, সুন্নত তরীকায় হয়, নামাযী ব্যক্তির জীবনেও তার প্রভাব পড়তে থাকবে। নামায সুন্নত মোতাবেক হওয়া খুশূ-খুযূর অংশ। কাজেই নামায যদি সুন্নত মোতাবেক হয় এবং খুশূ-খুযূর সঙ্গে হয়, তাহলে এই নামায তাযকিয়ার কাজ দেবে ইনশাআল্লাহ।
হাদীস শরীফে একটি ঘটনা এসেছে। এক মুসল্লি রাতে নামায আদায় করে, আবার সকালে চুরিও করে। চুরির বদ অভ্যাস তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে তার বিষয়ে আপত্তি পেশ করা হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
إِنَّه سَيَنْهَاهُ مَا تَقُولُ.
অর্থাৎ একটু সবর কর, ধৈর্য ধর। তুমি যে সমস্যার কথা বলছ, সেটি কেটে যাবে। ধীরে ধীরে তার নামায যখন পাকা হবে এবং সে পাকা মুসল্লি হবে, দেখবে এই সমস্যা চলে যাবে।
ঠিকই দেখা গেল কিছু দিন পর তার এই বদ অভ্যাস চলে গেল। (দ্র. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯৭৭৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৫৬০)
বান্দা যখন তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা নামায শুরু করল– ব্যস, তার নামাযের ইহরাম হয়ে গেল। সালাম ফেরানোর মাধ্যমে সে ইহরাম থেকে হালাল হবে। আমি তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করলাম। এটি এমন ইহরাম যে, বান্দা যতক্ষণ নামাযে আছে, ততক্ষণ আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপে আছে। আর তখন বান্দার মাঝে আর কেবলার মাঝে তার রব। এই অনুভূতি যদি সালাতের মধ্যে জাগ্রত থাকে, সেই সালাত আমার জন্য তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি।
হজ্ব
এমনিভাবে হজ্ব ও উমরাও আমার জন্য তাযকিয়া। নিয়ত আর তালবিয়া যদি যথাযথ হয়, সেটি অনেক তারাক্কীর উপাদান হবে ইনশাআল্লাহ।
অনেক সময় সফরে পরীক্ষার হালত আসে। বিমানবন্দরে কোনো কারণে আটকা পড়তে হয়। ইহরাম করে ঘর থেকে বের হয়েছে, কিন্তু এয়ারপোর্টে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
অনেকে পরামর্শ দেন, বিমান উড়াল দেওয়ার পর নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছালে তালবিয়া পড়ে ইহরামের নিয়ত করতে। কাপড় বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই পরে নিতে পারেন, তাতে সমস্যা নেই। ইহরামের কাপড় পরা তো আর ইহরাম নয়। ইহরাম শুরু হয়, মীকাতে পৌঁছে বা তার আগে থেকে হজ্ব বা উমরার নিয়ত করে তালবিয়ার মাধ্যমে। শুধু সাদা দুটি কাপড় পরার দ্বারা ইহরাম শুরু হয় না। ইহরামের কাপড় পরাকে অনেকে বলে ইহরাম বাঁধা। ইহরামের কাপড় পরা আর ইহরাম শুরু করা দুটি ভিন্ন জিনিস। তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে যেভাবে নামায শুরু করি বা নামাযে প্রবেশ করি, হজ্ব ও উমরায় প্রবেশ করা হয় নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে (এবং হজ্বের ইহরাম করতে হয়, যার জন্য যে মীকাত, সেই মীকাত থেকে বা তার আগে থেকে।)
আপনি চাইলে বিমান ছেড়ে দেওয়ার পরও নিয়ত করে তালবিয়া পড়ে ইহরাম সম্পন্ন করতে পারেন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অথবা এয়ারপোর্টে গিয়ে নামায পড়েও নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে ইহরাম করতে পারেন। তবে ইহরামের শর্ত ও নিয়ম অনুযায়ী থাকতে হবে।
ইহরাম করার পর এখন বিমানবন্দরে দেরি হচ্ছে। কখনো আটকা পড়লে পেরেশান হব না। এক-দুই দিনের জন্য আটকা পড়ল সেটা একপ্রকার কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকা পড়লে কী করবে? হালাল হয়ে যাবে। এজন্য সেখানে দম দিতে হবে। দম দেওয়ার পর হালাল হবে। ইহরাম হয়েছে, কিন্তু ইহরামের কাজ করতে পারেনি, আটকা পড়েছে, সেজন্য দম দিতে হবে।
তালবিয়ার মর্ম যদি আমার মধ্যে এসে যায়, তাহলে হজ্ব ও উমরার মাধ্যমেই তাযকিয়া হচ্ছে। বিষয়টার প্রতি আমাদের খেয়াল করা জরুরি।
দৈনন্দিনের ইবাদত ও আমলের মাধ্যমে আমরা তাযকিয়ার মেহনত করতে পারি। প্রতিদিনই তো আমি ইস্তিগফার করি। প্রতিদিন দরূদ শরীফ পড়ি। প্রতিদিন ‘সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ’ পড়ি। প্রতিদিন খাওয়ার আগে-পরে ঘুমের আগে-পরে দুআ পড়ি। রাতে ঘুম ভাঙলেও দুআ পড়ি। আমলগুলো এমনভাবে আদায় করি, যেন কেবল গতানুগতিক হয়ে না যায়। অনেক সময় তো আমলও হয় না। খাওয়া শুরু করলাম, কিন্তু দুআ পড়লাম না। ঘুমিয়ে পড়লাম, কিন্তু দুআ পড়ে ঘুমালাম না। মানে কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে কাজের যে যিকির ও নেক আমল সেটি হচ্ছে না। ঘরে প্রবেশ করলাম, কিন্তু ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা, সালাম দেওয়া, দুআ পড়া– এসব খেয়াল করলাম না।
মসজিদে প্রবেশ করতে দুআ পড়ে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করলাম না, বের হওয়ার সময় বাম পা আগে দিলাম না।
এভাবে যে কাজের সাথে যে যিকির ও দুআ যুক্ত, কাজটা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দুআ হচ্ছে না। যে কাজের সাথে যে আদব যুক্ত, কাজ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আদবটার প্রতি খেয়াল করা হচ্ছে না। যদি ওই আদব ও দুআর প্রতি লক্ষ রাখি এবং দুআর মর্মের প্রতি খেয়াল করি, দিলের মধ্যে হাযির করি, তাহলে প্রতিটা আমলের মধ্যেই আমার তাযকিয়া হতে থাকবে।
‘বিসমিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ’-এর যিকির ও তাসবীহর মধ্যে রয়েছে তাযকিয়া
প্রতিটা তাসবীহ ‘সুবহানাল্লাহ আলহামদু লিল্লাহ’-এর মধ্যেই রয়েছে তাযকিয়া।
হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দা.বা.-এর কিতাব ‘যিকর ও ফিকর’। সেখানে প্রথম লেখার শিরোনাম হল–
شروع اللہ کے نام سے
(আল্লাহর নামে শুরু করলাম।) প্রত্যেক কাজেই বিসমিল্লাহ।
এই যে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ি, কেন পড়ি? কী অনুভূতিতে পড়ব? বিসমিল্লাহ পড়ার সময় আমার উপলব্ধিটা কী হবে? সেটাই ওই কিতাবের শুরুতে হযরত স্পষ্ট করেছেন।
খাওয়া শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’। কেন পড়ব?
আমার সামনে যে আল্লাহ তাআলার এই নিআমত খাবার এল, তার পেছনে কত জনের মেহনত আছে। এই খাবার আমার সামনে আসার পেছনে আল্লাহর কত মাখলুক কাজ করেছে। এসব চিন্তা করে দিলে হাযির করলেই বুঝে আসবে, এই এক লোকমা খাবার অথবা এক চুমুক পানি আল্লাহর কত বড় নিআমত! বিষয়গুলো যখন বান্দা দিলের মধ্যে হাযির করে দিল থেকে পড়বে– আলহামদু লিল্লাহ অথবা বিসমিল্লাহ, সেই বিসমিল্লাহর মাধ্যমে তাযকিয়া হবে। সেই ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বান্দাকে পরিশুদ্ধ করবে।
এমন অনুভূতি নিয়ে যে খাবার খাওয়া হয়, সেই খাবার খাওয়ার পরে অন্তত আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার মধ্যে কি বান্দা কোনো পাপের কাজ করতে পারে? এই যে আল্লাহর দেওয়া খাবারের লোকমা গ্রহণ করলাম। আল্লাহ! আমি এর উপযুক্ত ছিলাম না, এই এক লোকমা খাবার আমার জন্য তোমার অপার নিআমত, আমি তোমার শোকর আদায় করছি, এই অনুভূতিতে খাবার শেষ করার পরে অন্তত কিছু সময় হলেও তো বান্দা পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারে! তারপর আরেক কাজ আসবে। সেই কাজের দুআ-যিকির ও আদব রয়েছে, তা যদি বান্দা যথাযথ আদায় করে, দেখা যাবে ২৪ ঘণ্টায় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য বান্দার জন্য রয়েছে অনেক অনেক উপাদান ও ব্যবস্থা।
প্রসঙ্গ তওবা-ইস্তিগফার
দুআ-ইস্তিগফার, যিকির-তাসবীহ ইত্যাদির মাধ্যমে যদি অনুভূতিটা সজাগ রাখা হয়, যেন আমার মাধ্যমে কোনো গুনাহ না হয়, আল্লাহর কোনো ফরয যেন আমার থেকে ছুটে না যায়! এর নামই তো তাযকিয়া। প্রত্যেক বিসমিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ-এর মধ্যে রয়েছে তাযকিয়া। আর আস্তাগফিরুল্লাহ-এর মধ্যে তো তাযকিয়া রয়েছেই। কারণ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি মানে গুনাহ ছেড়ে তওবাও করছি। অর্থাৎ গুনাহ থেকে পাকসাফ হয়ে যাওয়ার ফিকির ও চেষ্টা করছি।
একটি কথা কী, প্রত্যেক ইস্তিগফারের মধ্যে তওবা লুক্কায়িত আছে; তওবার মধ্যে ইস্তিগফার লুক্কায়িত আছে। আমি বলছি, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন, বাহ্যত যদিও এখানে তওবা শব্দ নেই, কিন্তু ইস্তিগফার যদি দিল থেকে হয়, তার মধ্যে তওবা থাকেই। বান্দা যখন তওবা করে, সেখানে ইস্তিগফারও থাকে। কারণ তওবা করার একটা উদ্দেশ্য যেমন গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প পেশ করা এবং সামনে না করার ওয়াদা করা, তেমনি অতীত গুনাহের জন্যও ক্ষমা চাওয়া। আর যদি তওবা ও ইস্তিগফারের শব্দসহ একসাথে বলে–
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِي لَا إِله إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ.
তাহলে তো হয়েই গেল।
أَتُوبُ অর্থ কী?
আল্লাহ, আমি আপনার দিকে ফিরে আসছি। আমি তো উল্টো পথে রওয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহ, আমি ফিরে আসছি! আমি ক্ষমা চাই, আপনি ক্ষমা করুন!
এখন কেউ যদি এভাবে তওবার কালিমা পড়ে, কিন্তু গুনাহ ছাড়ে না, অর্থাৎ মুখে বলছে, আমি ফিরে আসছি, বাস্তবে ফিরে আসছে না– এটা এক ধরনের ধোঁকা নয় কি? কোনো মুমিন বান্দা যদি এমন বলে, তো কতক্ষণ অবাস্তব কথা বলে যেতে পারবে? একপর্যায়ে তাকে গুনাহ ছেড়েই দিতে হবে। এজন্য তওবা-ইস্তিগফারের কালিমার মধ্যেই তাযকিয়া রয়েছে। আর তওবা কখনো ইস্তিগফার-শূন্য হয় না। ইস্তিগফার তওবা-শূন্য হয় না।
দরূদ শরীফে রয়েছে তাওহীদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
দরূদ শরীফ এমন ইবাদত, একাধারে যার মধ্যে রয়েছে তাওহীদ, আল্লাহর যিকির, দুআ। রয়েছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শোকরগুযারী। দরূদ পড়ে বান্দা নবীর জন্য চাচ্ছে আল্লাহর কাছে। আল্লাহ যেন নবীজীর মর্যাদা বুলন্দ করেন! তাঁকে ‘মাকামে মাহমূদ’ ও জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন।
যে বান্দা নবীর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, সে কি কখনো কোনো পীরের কাছে অথবা মাজারে গিয়ে মাজারওয়ালার কাছে চাইতে পারে? পীরের কাছে চাইবে, নাকি পীরের জন্য আল্লাহর কাছে চাইবে? আল্লাহ ছাড়া যদি কারও কাছে চাওয়ার সুযোগই থাকত, তাহলে কার কাছে চাওয়ার সুযোগ থাকত? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে; যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সর্বশেষ নবী এবং বিশ্বনবী। অথচ সেই নবীর জন্যই আমরা দরূদ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাচ্ছি। এজন্য দরূদ শরীফের মধ্যে রয়েছে তাওহীদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আল্লাহর মাখলুকের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির জন্যও আল্লাহর কাছেই চাওয়া হচ্ছে এবং তিনি নিজে উম্মতের কাছে আবদার করেছেন; বলছেন, তোমরা আমার জন্য আল্লাহর কাছে দরূদ পাঠ কর। একবার দরূদ পাঠ করলে এই এই সওয়াব পাবে। দশটি গুনাহ মাফ হবে, দশটি দরজা বুলন্দ হবে। দশটি নেকী পাবে।
‘দরূদ পড়’ মানে আমার জন্য আল্লাহর কাছে রহমতের ভিক্ষা চাও! হাঁ, নবীজী আমাদের দরূদ পড়ার মুহতাজ নন; তাঁর ওপর দরূদ পড়তে পারা আমাদের সৌভাগ্য। কিন্তু তিনি আল্লাহর রহমতের মুহতাজ আর আল্লাহ তো সার্বক্ষণিক তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করছেনই।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন আমাদেরকে তাঁর ওপর দরূদ পড়তে বলেছেন এবং এই বিষয়ে শরীয়তের বিধান শিক্ষা দিয়েছেন, তেমনি উম্মতের প্রতি এটা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ হক হওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত। তবে এটাও সত্য যে, বিভিন্ন হাদীসে দরূদ পাঠের প্রতি উম্মতকে যে ভাষায় উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে, এতে আবদারের সুরই পরিলক্ষিত হয়েছে। এটা মূলত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বোচ্চ তাওয়াযু এবং বিনয়।
যাইহোক, নবীজী উম্মতের কাছে নিজের জন্য দুআ চাইতেন। দরূদ পাঠ করার যেমন উৎসাহ দিতেন, হুবহু দুআ শব্দেও বলেছেন। উমর রা.-কে বলেছেন, তোমার দুআয় আমাকে স্মরণ রেখো!
দুআ আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়
দুআ যদি কেবল আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক না হয়ে দিল থেকে হয়, সেটি অনেক বড় তাযকিয়া। লালবাগ শাহী মসজিদের খতীব ছিলেন মাওলানা আমিনুল ইসলাম রাহ.। তাঁর মুখে আমি সরাসরি শুনেছি। ঢাকা উদ্যানে জামিয়াতুল আযীযের যখন প্রথম কাজ শুরু হয়, তখন শাইখুল হাদীস রাহ., খতীব উবায়দুল হক রাহ. এবং মাওলানা আমিনুল ইসলাম রাহ. প্রমুখ উলামায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কাজের জন্য দুআর আয়োজন হবে। মাওলানা আমিনুল ইসলাম রাহ. বলেছেন, ‘দুআ তো আজকাল আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গিয়েছে!’
প্রতিষ্ঠানে একটা নিয়ম থাকে, অমুক অমুক সময় দুআ হয়, তখন সবাই একসাথে দুআ করে।
আরেক হল কোনো অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ্য করে দুআ করা। এগুলোতে নিষেধ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক দুআ করা যায়। সেটিও আমরা দিল থেকে এবং আদব রক্ষা করে করার চেষ্টা করব। কিন্তু কথা হল, কেবল আনুষ্ঠানিক আর প্রাতিষ্ঠানিক-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? দুআ তো স্বতন্ত্র ও একান্ত ইবাদত এবং সব সময়ের ইবাদত।
দুআ একটি স্বতন্ত্র ইবাদত এবং তা করতে হবে একান্তভাবে। একেবারে নিয়ত করে যে, এই ১০-১৫ মিনিট আমি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দুআ করব। নিজের সকল প্রয়োজন তাঁর কাছে তুলে ধরব। যেভাবে দুই রাকাত চার রাকাত নফল নামায অথবা সালাতুল হাজতের নিয়ত করে স্বতন্ত্রভাবে পড়ি, ঠিক তেমনি স্বতন্ত্রভাবে কেবল দুআর জন্যই সময় বের করে আল্লাহর কাছে একান্তভাবে দুআ করা। দু-চার জন পাঁচ-ছয় জন মিলে দুআ করছি তা নয়; বরং আমি একাই আল্লাহর কাছে চাচ্ছি। স্বতন্ত্র ইবাদত ও আমল হিসেবে দুআ করছি আর নিজের প্রয়োজনগুলো আল্লাহর কাছে একান্তভাবে চাচ্ছি। এই মজলিসে আমরা সবাই আছি। কিন্তু আমাদের মধ্যেই আল্লাহর কোনো বান্দা মনে মনে আল্লাহর কাছে তার কোনো বিষয়ে দুআ করছেন, হাজত পেশ করছেন, সেটাও একটা আমল। অথবা আছিই আমি একা, আর কেউ নেই। তখন আমি আল্লাহর কাছে দুআ করছি। এভাবে একান্তভাবে দুআ করা এবং দুআকে স্বতন্ত্র আমল ও উদ্দেশ্য মনে করে করা চাই!
দুআ একটি স্বতন্ত্র ইবাদত : গাফেল দিলে দুআ করা নয়
আল্লাহ তাআলা দুআকে আমাদের জন্য স্বতন্ত্র ইবাদত বানিয়ে দিয়েছেন। এমন নয় যে, ঠ্যাকায় পড়লাম আর একটু দুআ করলাম। অথবা দশে দুআ করছে, সাথে আমিও হাত তুললাম এবং শরীক হলাম। হাঁ, এগুলোও দুআর অংশ। ভুল বুঝবেন না! এই দুআরও গুরুত্ব ও ফায়েদা আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যে দুআর ইবাদতকে আমাদের জন্য বিধান বানিয়েছেন, সেটি কেবল এই সীমিত অর্থে নয়। শুধু কেবল এভাবে দুআ করলাম অথবা আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুআয় অংশগ্রহণ করলাম আর দুআ ইবাদত হওয়ার বিধান আমার থেকে আদায় হয়ে গেল– এমন নয় বিষয়টি। বরং আমাকে যে-কোনো সময় যে-কোনো প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে স্বতন্ত্রভাবে দুআ করতে হবে। সেটি পাঁচ মিনিট দশ মিনিট হতে পারে, এক-দুই মিনিটও হতে পারে, আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টাও হতে পারে। হাত উঠিয়ে হতে পারে, হাত ওঠানো ছাড়াও হতে পারে। গাড়িতে বসে আছি অথবা কোথাও হেঁটে যাচ্ছি, তখনো দুআ করতে পারি। আর আমার যখন যা প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তো দুআ করবই। যেগুলোকে আমি ঠ্যাকা ও জরুরত মনে করি না সেখানেও দুআ করব।
একটা কথা কী, আমি যদি কেবল নিজের প্রয়োজন ও ঠ্যাকার সময়ই দুআ করি, তাহলে কি রমযানের বিশেষ ফযীলত ও বরকত পাওয়া আমার দ্বারা সম্ভব হবে? দুআকে স্বতন্ত্র আমল বানিয়ে একান্তভাবে দুআ করার অভ্যাস যদি না করি, তাহলে কি রমযান থেকে আমার আমলনামার ভান্ডার পূর্ণ করার ব্যবস্থা হবে? পুরো রমযান যদি কেবল আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুআর ওপরই থাকি এবং ব্যক্তিগত ও স্বতন্ত্র দুআর আমল না করি, তাহলে কীভাবে হবে?
আমি যেন যে-কোনো সময়ই দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে নিতে পারি। দুআর দরজা বারো মাসের সব সময়ই খোলা। কিন্তু রমযান মাসে বিশেষভাবে খোলা। দিন রোযার কারণে আর রাত রমযানের রাত হওয়ার কারণে– পুরো রমযান মাসই দুআর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসময় আল্লাহর কাছে দুআ করলেই পেয়ে যাচ্ছি। হাত ওঠালেই পাচ্ছি।
অন্তত রমযানের দুআটাও যদি আমার এই মেযাজ ও মানসিকতা থেকে না হয়, তাহলে তো আমি পিছিয়ে থাকব। কাজেই দুআকে নিজের একান্ত আমল ও স্বতন্ত্র আমল বানাতে হবে। গাফেল দিলে দুআ করলে সেটি আসলে দুআই হয় না। দুআর বাক্য ও কথামালা আওড়ানো যায়, কিন্তু যাকে বলে ‘দুআ করা’, গাফেল দিলে তা কীভাবে হবে?
দুআ যতটুকু না চাওয়া-পাওয়ার মাধ্যম, তার চেয়ে বেশি হল তাযকিয়ার আমল
দুআর মাধ্যমে যতটুকু না আল্লাহর থেকে আমার হাসিল করা হবে, তার চেয়ে বেশি হবে তাযকিয়ার আমল।
অনেক সময় এমন হয়, আমার যে জরুরত আছে, সেটাই অনুভূতিতে নেই। ওই জায়গাগুলোতেও দুআ করা। শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী ছাহেব হুজুর একথা খুব বলেন। দুআর প্রয়োজন আছে, কিন্তু আমার অনুভূতিতে নেই। আমি মনে করছি আমার প্রয়োজন নেই, অথচ প্রয়োজন আছে।
এই যে আমরা একটু পরে এখান থেকে বের হব। সাধারণ চিন্তা হল, একটু হেঁটে গিয়ে পাকা রাস্তায় উঠব, একটা অটোতে করে আলীপুর চলে যাব। কিন্তু আমাদের মুরব্বীরা আমাদেরকে শেখান যে, যখনই কোথাও বের হওয়ার চিন্তা করবে, আল্লাহর কাছে দুআ কর, আল্লাহ আমি যেন ঠিকভাবে নিরাপদে পৌঁছাতে পারি! পথে যেন তাড়াতাড়ি গাড়ি পেয়ে যাই! গাড়ি যেন নিরাপদে সুন্দরভাবে গন্তব্যে পৌঁছে যায়! এই দুআ মুখে না বললে অন্তত মনে মনে করতে পারি। অনেকে এই দুআকে জরুরত মনে করে না। মনে করে, এখান থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে চলে যাব। অথবা ট্রেনের টিকেট কেটে চলে যাব।
এসব ক্ষেত্রে দুআর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি না। অথচ নবীজীর শিক্ষা হল–
لِيَسْأَلْ أَحَدُكُمْ رَبَّه حَاجَتَه حَتّূى يَسْأَلَه الْمِلْحَ، وَحَتّى يَسْأَلَه شِسْعَ نَعْلِه إِذَا انْقَطَعَ.
মানুষ যেন তার সকল প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চায়। এমনকি লবণ ফুরিয়ে গেলে বা জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলে সেটিও যেন আল্লাহর কাছে চায়। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৬০৪/৯
আমরা সাধারণত এধরনের ছোট ছোট প্রয়োজনকে কিছুই মনে করি না। এগুলোও যে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে– এটি আমাদের যেহেনে থাকে না।
যাইহোক, দুআ স্বতন্ত্র ও একান্ত আমল। এটাকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না করি।
উপরে আমরা যে বিষয়গুলো আলোচনা করলাম, সেগুলো মাথায় রেখে যখন বান্দা দুআ করতে থাকবে, তার তাযকিয়া হতে থাকবে।
তাযকিয়ার মেহনত দুইভাবে হয়
তাযকিয়ার মেহনত দুইভাবে হয়। কখনো স্বতন্ত্রভাবে প্রোগ্রাম করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেটারও ফায়েদা আছে এবং প্রয়োজনও আছে। কিন্তু শুধু তার মধ্যে তাযকিয়াকে সীমাবদ্ধ রাখলে তাযকিয়ার তারাক্কী অনেক ধীরগতিতে হবে এবং তার ফায়েদাও খুব কম হবে।
তাযকিয়ার ফায়েদা বেশি থেকে বেশি হতে থাকবে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যদি দৈনন্দিনের সকল আমলের মধ্যেই তাযকিয়ার ফিকির করি এবং এ ফায়েদা হাসিল করার চেষ্টা করি। ছোট থেকে ছোট বড় থেকে বড় প্রতিটা ইবাদত ও আমলের মধ্যে যদি প্রাণ সঞ্চার করার চেষ্টা করি। আর সেটি তখনই হবে, যখন আমল সুন্নত মোতাবেক করা হবে এবং তার সকল উসূল ও আদব রক্ষা করা হবে। এজন্য ইবাদত ও অন্যান্য আমলগুলো আমাদের খেয়াল করে মনোযোগ দিয়ে করা উচিত। আমার যে ইবাদতটির মধ্যে প্রাণ ও রূহ আসবে, সেটাই আমার ইসলাহ ও তাযকিয়ার উপাদান হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উপলব্ধি করে আমল করার তাওফীক নসীব করুন– আমীন!
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.
[মাসিক দ্বীনী মজলিস
মারকাযুদ দাওয়াহ, হযরতপুর প্রাঙ্গণ
১৬ রমযান ১৪৪৭ হি./৬ মার্চ ২০২৬ ঈ.
জুমাবার
শ্রুতলিখন : মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম]