যিলকদ ১৪৪৭   ||   মে ২০২৬

ইলমুল কিরাআতের ইমাম
‖ আবুল কাসেম শাতেবী রাহ.

মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুনির

তৎকালীন আন্দালুসের পূর্ব দিকের প্রাচীন এক নগরী শাতেবা। ষষ্ঠ হিজরীতে এটি ছিল ইলমুল কিরাআতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। জ্ঞানের এই নগরীতে ৫৩৮ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম আবুল কাসেম শাতেবী। পুরো নাম কাসেম ইবনে র্ফীরুহ ইবনে খলাফ ইবনে আহমাদ আররুআইনী আশশাতিবী আলআন্দালুসী রাহ.।

আবুল কাসেম শাতেবী রাহ. ছিলেন জন্মান্ধ। তবে অন্ধত্ব তার ইলম চর্চায় বাঁধা হয়ে উঠতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তাকে দান করেছিলেন অসাধারণ মেধা, প্রতিভা ও স্মৃতিশক্তি। ফলে তিনি স্বাভাবিক জীবনে এতই দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন, অপরিচিত কেউ সহজে বুঝতে পারত না যে, তিনি চোখে দেখেন না।

জন্মভূমি শাতেবা থেকেই তার শিক্ষাদীক্ষার সূচনা হয়েছিল। এখানে তার অন্যতম প্রধান উস্তায ছিলেন ইমাম ইবনুল লায়ূহ আন্নাফ্যী রাহ. (মৃ. ৫৫৫ হি.-এর পরে)। তার কাছে তিনি প্রসিদ্ধ সাত কেরাত অনুযায়ী আলাদা আলাদাভাবে পুরো কুরআন মাজীদের সবক গ্রহণ করেন এবং উস্তাযের পক্ষ থেকে এ শাস্ত্রের সনদ লাভ করেন। এরপর তিনি পূর্ব আন্দালুসের আরেক প্রসিদ্ধ নগরী ‘বালানসিয়া’য় যান। সেখানে কেরাত, হাদীস, ফিকহ ও আরবী ভাষাতত্ত্বের ওপর বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন।

ইলমুল কিরাআতে তার অন্যতম প্রসিদ্ধ উস্তায ছিলেন

ইবনে হুযাইল রাহ. (মৃ. ৫৬৪ হি.), আবুল হাসান ইবনুন নি‘মাহ রাহ. (মৃ. ৫৭৬ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ইশবীলী রাহ. (মৃ. ৬০০ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে জাফর বালানসী রাহ. (মৃ. ৫৮৬ হি.) প্রমুখ। এদের কাছ থেকে তিনি হাদীস, ফিকহ এবং আরবী ভাষাতত্ত্বের সবকও নিয়েছিলেন।

কর্মজীবন

ইলমী সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে এসে তিনি ইলমুল কিরাআতের বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। অনেকেই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। দিকে দিকে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

ছোটবেলা থেকেই শাতেবী রাহ. বক্তৃতায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাই একসময় তাকে সরকারিভাবে শাতেবার খতীবের দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়। কিন্তু শাতেবী রাহ. এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে চাচ্ছিলেন না। তাই এক পর্যায়ে দেশ ছেড়ে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন।

৫৭২ হিজরীতে শাতেবী রাহ. হিজরতের লক্ষ্যে প্রথমে হজ্বের নিয়তে বের হন। প্রথমে মিশরের ‘ইসকান্দারিয়া’য় পৌঁছেন। সেখানে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আবু তাহের সিলাফী রাহ. (মৃ. ৫৭৬ হি.)-সহ অন্যান্য মাশায়েখে কেরামের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। এরপর মিশরের ‘ফুসতাত’ নগরীতে যান। সেখানে মিশরের প্রাচীন মসজিদ জামে আমর ইবনুল আস রা. মসজিদে কিছুদিন ইলমুল কিরাআতের দরস প্রদান করেন।

তখন চলছিল সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী রাহ. (মৃ. ৫৮৯ হি.)-এর শাসনকাল। তার খুবই ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি ছিলেন কাযী আবদুর রহীম আলবায়সানী রাহ. (মৃ. ৫৯৬ হি.)। ইতিহাসে যিনি ‘আলকাযিল ফাযিল’ নামে সুপরিচিত। তিনি ইমাম শাতেবী রাহ.-কে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন এবং তার যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে চাইতেন। ৫৮০ হিজরীতে কাযী সাহেব মিশরের কায়রোতে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এটি ‘আলমাদরাসাতুল ফাযিলিয়্যাহ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই মাদরাসায় ইলমুল কিরাআতের পাঠদানের জন্য কাযী সাহেব শাতেবী রাহ.-কে অনুরোধ করেন এবং তার জন্য আলাদা ঘর নির্মাণ করে দেন। শাতেবী রাহ.-এর বাকি জীবন এই প্রতিষ্ঠানেই কেটেছিল।

ইমাম শাতেবী রাহ. একাধারে ইলমুল কিরাআত, তাফসীর, ফিকহ, হাদীসসহ বহু শাস্ত্রের পণ্ডিত ছিলেন। তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দেখে সবাই খুব আশ্চর্য হত। তার শাগরিদরা শায়খের স্মৃতিশক্তির ওপর এতটাই ভরসা করতেন যে, তার স্মৃতির ওপর নির্ভর করে নিজেদের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে সংযোজন ও ভুল সংশোধন করতেন।

একবার শাতেবী রাহ.-এর উপস্থিতিতে একটি ফিকহী মাসআলার আলোচনা উঠল। তিনি সে বিষয়ে একটি বক্তব্য উল্লেখ করলেন। এরপর শাগরিদদের বললেন, তোমরা অমুক কিতাবের অমুক জায়গায় মাসআলাটি খুঁজে দেখ।

পরে দেখা গেল, তিনি যে জায়গা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, সে জায়গায়ই মাসআলাটি রয়েছে। শাগরিদরা বললেন, আপনি কি ফিকহের মাসআলা-মাসায়েলও মুখস্থ করেছেন?

তিনি বললেন, আমি এক উট বোঝাই কিতাব মুখস্থ করেছি।

জিজ্ঞেস করা হল, তাহলে আপনি ফিকহের দরস দেন না কেন?

তিনি বললেন, অন্ধদের কুরআন চর্চা ছাড়া অন্য কিছু করা উচিত নয়।

রচনাবলি

সেসময় আরবী ভাষায় পদ্যে কিতাব রচনার খুব চর্চা ছিল। ইমাম শাতেবী রাহ.-এর সবগুলো রচনাই ছিল পদ্যে রচিত। তিনি ৫০০ চরণে ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. (মৃ. ৬৪৩ হি.)-এর ‘আত্তামহীদ’ কিতাবটির সংক্ষিপ্তসার তৈরি করেছিলেন। কুরআনের আয়াত সংখ্যা বিষয়ে তার একটি রচনার নামনাযিমাতুয্ যাহর’। তার আরেকটি বিখ্যাত রচনা হলআকীলাতু আত্রাবিল কাসাইদ’, যা মুসহাফে উসমানীর লিখন-পদ্ধতি সম্পর্কে রচিত। এছাড়াও ইলমুল কিরাআতের বিভিন্ন বিষয়ে তার আরও বেশ কয়েকটি রচনার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এ শাস্ত্রে তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রচনাটি হলহিরযুল আমানী ওয়া ওয়াজহুত্ তাহানী’। যা পরবর্তীতে ‘মানযূমাতুশ শাতিবী’ বা শুধু ‘শাতিবিয়্যাহ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

এটি মূলত ইমাম আবু আমর আদ্দানী রাহ.-এর ‘আত্তাইসীর ফিল কিরাআতিস্ সাব‘ই’ কিতাবটিকে সামনে রেখে রচিত। বরং বলা যায়, এটি ওই কিতাবেরই সারসংক্ষেপ। এতে তিনি ১১৭৩টি চরণে দানী রাহ.-এর কিতাবটিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় সংযোজন করেছেন এবং কেরাতের ইমামদের ইখতেলাফও উল্লেখ করেছেন।

শাতেবী রাহ.-এর ইখলাস ও দুআর বরকতে এ কিতাবকে আল্লাহ তাআলা অভাবনীয় গ্রহণযোগ্যতা দান করেন। তার যামানা থেকে আজও পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র এই কিতাবের পাঠ ও চর্চা বিদ্যমান। এ কিতাবকে কেন্দ্র করে আরও অন্তত দুই শতাধিক কিতাব রচিত হয়েছে। এর মধ্যে আলামুদ্দীন সাখাবী রাহ. (মৃ. ৬৪৩ হি.), আবু আবদিল্লাহ ফাসী রাহ. (মৃ. ৬৫৬ হি.), আবু শামাহ মাকদিসী রাহ. (মৃ. ৬৬৫ হি.), বুরহানুদ্দীন জা‘বারী রাহ. (মৃ. ৭৩২ হি.)-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইমাম শাতেবী রাহ. কাশ্ফ ও কারামাতওয়ালা একজন বুযুর্গও ছিলেন। প্রয়োজন ছাড়া সাধারণত কথা বলতেন না। অত্যন্ত নিমগ্নতা ও গাম্ভীর্য নিয়ে তিনি কুরআনের দরসে বসতেন। সাধারণত ফজরের নামাযের পরেই দরসে বসে যেতেন। এজন্য তালিবুল ইলমরা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকত। ফজর থেকে যোহর পর্যন্ত পুরোটা সময় তিনি কুরআনের পাঠদানে ব্যস্ত থাকতেন। অনেক সময় এমন হত, তিনি ফজরের ওজু দিয়ে যোহরও আদায় করতেন।

ইমাম ইবনুল জাযারী রাহ. (মৃ. ৮৩৩ হি.) বলেন, আল্লাহ তাআলা শাতেবী রাহ.-এর রচনাবলি এবং তাঁর শাগরিদদের মধ্যে অনেক বরকত দান করেছেন।

তার শাগরিদদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন বহু গ্রন্থপ্রণেতা আলামুদ্দীন সাখাবী রাহ., তৎকালীন মিশরের শায়খুল র্কুরা কামালুদ্দীন আদ্দ্বরীর রাহ. (মৃ. ৬৬১ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে উমর আলকুরতুবী রাহ. (মৃ. ৬৩১ হি.), আবু বকর আল্লাখ্মী রাহ. (মৃ. ৬৩৪ হি.), ‘কাফিয়া’ কিতাবের মুসান্নিফ ইবনুল হাজেব রাহ. (মৃ. ৬৪৬ হি.) প্রমুখ।

সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী রাহ. বাইতুল মাকদিস বিজয় করার পর শাতেবী রাহ. সেখানে এক রমযান কাটানোর জন্য গিয়েছিলেন। এটি ছিল শাতেবী রাহ.-এর ইন্তেকালের দুয়েক বছর আগের কথা। সে বছর মাসজিদুল আকসায় তিনি পুরো রমযান থাকেন এবং ইতিকাফ করেন।

ইন্তেকাল

৫৯০ হিজরীর ২৮ জুমাদাল আখিরাহয় এই মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন। তার জানাযায় বহু মানুষের সমাগম হয়। জামে আমর ইবনুল আস (রা.) মসজিদের ইমাম শায়েখ আবু ইসহাক আলইরাকী রাহ. (মৃ. ৫৯৬ হি.) তার জানাযার ইমামতী করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

 

তথ্যসূত্র :

জামালুল কুররা, আলামুদ্দীন সাখাবী, পৃ. ৫৭৮; ইনবাহুর রুওয়াত, জামালুদ্দীন কিফতী ৪/১৬০; ওফাইয়াতুল আ‘য়ান ৪/৭১; ত্ববাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা, তাজউদ্দীন সুবকী ৭/২৭০-২৭২; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ২১/২৬১-২৬৪; আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ ১৪/৪২৮; গায়াতুন নিহায়াহ, ইবনুল জাযারী ২/৯১৭-৯২১

 

 

advertisement