শাওয়াল ১৪৪৭   ||   এপ্রিল ২০২৬

তাফসীরুল কুরআন
‖ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

[২ রমযান ১৪৪৭ হি., ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঈ.]

 

আল্লাহ দেখতে চান, কে রাসূলের আনুগত্য করে, কে করে না!

 

হামদ ও সালাতের পর... 

কুরআন কারীমের তাফসীর পড়ার আগে কুরআন কারীম বোঝার চেষ্টা করা। কোন্ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের কী বলেছেন, কোন্ আয়াতে আমাদের প্রতি কী হেদায়েত ও বার্তা দিয়েছেন, তা সঠিকভাবে বোঝা ও অনুধাবন করার চেষ্টা করা। কুরআনের প্রতি ঈমান আনা এবং কুরআনের বিধান মোতাবেক নিজের যিন্দেগী গড়া। কুরআন কারীমের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখা, বেশি বেশি তিলাওয়াত করা এবং কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থমর্ম বোঝার চেষ্টা করা এ সবই কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ হক।

সবচেয়ে বড় হক হল কুরআনের প্রতি ঈমান আনা। তার পরের হক কুরআনের বিধানগুলো নিজের যিন্দেগীতে বাস্তবায়ন করা এবং কুরআন কারীমের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখা ও তিলাওয়াত করা। তিলাওয়াতের পরের কাজ হল কুরআনের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।

আজকাল অনেকে বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ খরিদ করে খুব পড়তে থাকে, অথচ সে কুরআনের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত করা ও শেখার ফিকির ও মেহনত করে না। এটা নিয়ম পরিপন্থি। আপনি কুরআনের তরজমা পড়ার জন্য অনেক সময় ব্যয় করছেন, কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য একটু সময়ও ব্যয় করছেন না; এতে ধারাবাহিকতা লঙ্ঘন হচ্ছে। সিরিয়াল হল সর্বপ্রথম কুরআনের তিলাওয়াত শেখা, তারপর কুরআনের অর্থমর্ম বোঝার চেষ্টা করা। তাছাড়া শুধু অনুবাদ দেখে কুরআনের অর্থমর্ম শেখা যায় না। অনুবাদ গ্রন্থটি যদি নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে সহায়ক একটা ভূমিকা পালন করতে পারে; কিন্তু কুরআনের অর্থমর্ম শিখতে হলে আপনাকে সরাসরি কোনো আলেমের শরণাপন্ন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন আমীন।

গত রাতের তারাবীতে কুরআন কারীমের দ্বিতীয় পারা তিলাওয়াত করা হয়েছে। সেখান থেকে কিছু আয়াতের হেদায়েত ও শিক্ষা সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা সহীহ বলা ও বোঝা এবং আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফীক নসীব করুন। 

 

أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

سَیَقُوْلُ السُّفَهَآءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلّٰىهُمْ عَنْ قِبْلَتِهِمُ الَّتِیْ كَانُوْا عَلَیْهَا  قُلْ لِّلهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ  یَهْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ.

وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْكُمْ شَهِیْدًا، وَ مَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِیْ كُنْتَ عَلَیْهَاۤ اِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ یَّتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ یَّنْقَلِبُ عَلٰی عَقِبَیْهِ  وَ اِنْ كَانَتْ لَكَبِیْرَةً اِلَّا عَلَی الَّذِیْنَ هَدَی اللهُ، وَمَا كَانَ اللهُ لِیُضِیْعَ اِیْمَانَكُمْ اِنَّ اللهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ.

[অচিরেই নির্বোধ লোকেরা বলবে, সেটা কী জিনিস, যা এদেরকে (মুসলিমদেরকে) তাদের সেই কেবলা থেকে অন্য দিকে মুখ ফেরাতে উদ্বুদ্ধ করল, যার অভিমুখী তারা এ যাবৎ ছিল? আপনি বলে দিন, পূর্ব ও পশ্চিম সব আল্লাহরই। তিনি যাকে চান সরল পথের হেদায়েত দান করেন।

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। পূর্বে তুমি যে কেবলার অনুসারী ছিলে, আমি তা অন্য কোনো কারণে নয়, বরং কেবল এ কারণেই স্থির করেছিলাম যে, আমি দেখতে চাই—কে রাসূলের আদেশ মানে আর কে তার পেছন দিকে ফিরে যায়, সন্দেহ নেই এ বিষয়টা বড় কঠিন, তবে আল্লাহ যাদেরকে হেদায়েত দিয়েছেন, তাদের পক্ষে (মোটেই কঠিন) না। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমান নিষ্ফল করে দেবেন। বস্তুত আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু। সূরা বাকারা (০২) : ১৪২-১৪৩]

প্রথম ও দ্বিতীয় পারা এবং তৃতীয় পারার প্রথম অংশ জুড়ে সূরা বাকারা। এটি কুরআন কারীমের সবচেয়ে বড় সূরা। ঈমান-আকীদা ও শরীয়তের বিধানের অনেক বড় অংশ এই সূরায় এসেছে। কেউ যদি সূরা বাকারার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিফয করে, ভালোভাবে বুঝে অনুধাবন করে এবং তার বিধানগুলো আলাদা আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে ইসলামী শরীয়তের অনেক বড় অংশই সে শিখে ফেলবে ইনশাআল্লাহ। এজন্য সাহাবায়ে কেরামের কাছে সূরা বাকারার অনেক বেশি গুরুত্ব ছিল এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে, একজন মানুষ যদি সূরা বাকারা আত্মস্থ করে ফেলে, সে যেন শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধানের অনেক বড় অংশ পেয়ে গেল এবং শিখে ফেলল। সাহাবীরা যখন কাউকে দেখতেন যে, তার সূরা বাকারা শেখা হয়ে গেছে, সবাই তার দিকে গুরুত্বের সাথে তাকাতেন এবং সকলের দৃষ্টিতে তার বিশেষ এক মর্যাদা ও সম্মান পরিলক্ষিত হত।

বুদ্ধিমান ব্যক্তি অন্যায় ও অহেতুক প্রশ্ন করে না

দ্বিতীয় পারার শুরুতে প্রথমে এসেছে কেবলার বিধান। মসজিদুল হারামের দিকে আমরা কেবলামুখী হই এবং সেদিকে ফিরে নামায আদায় করি। যেহেতু আমরা মসজিদুল হারামের পূর্ব দিকে অবস্থান করি, সেজন্য পশ্চিম দিকে ফিরলেই আমাদের মসজিদুল হারামের দিকে ফেরা হয়ে যায়। যারা মসজিদুল হারাম থেকে পশ্চিম দিকে আছেন তারা পূর্ব দিকে ফিরলে মসজিদুল হারামের দিকে ফেরা হয়। মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মসজিদুল হারাম যেহেতু দক্ষিণ দিকে, সেজন্য মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মসজিদে হারামের অভিমুখী হতে হলে দক্ষিণ দিকে ফিরতে হয়। মসজিদুল হারামকে কেবলা বানিয়ে নামায আদায় করা ফরয। নামাযের ফরযগুলোর মধ্যে তাকবীরে তাহরীমার আগেই যেসব ফরয ও শর্ত রয়েছে, কেবলামুখী হওয়া তার অন্যতম। আমার নামাযে কেবলা কোন্ দিকে হবে, তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ঠিক করবেন। ইসলামের প্রথম কেবলা মসজিদে হারাম ও বাইতুল্লাহ। মাঝে কিছু সময় এমন অতিবাহিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আলমাসজিদুল আকসা বা বাইতুল মাকদিসকে কেবলা বানিয়ে দেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে যখন মদীনা মুনাওয়ারায় এলেন, তখন মসজিদে আকসার দিকে ফিরে নামায আদায় করতেন। ইহুদী-নাসারারাও তাদের ইবাদতের মধ্যে বাইতুল মাকদিসকে কেবলা মনে করে। মদীনা মুনাওয়ারায় আসার পর আল্লাহর হুকুমে প্রায় ষোলো-সতেরো মাস নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেন। তারপর আল্লাহ তাআলা নতুন বিধান দিলেন, এখন থেকে মসজিদে হারামকে কেবলা হিসেবে গ্রহণ কর এবং মসজিদে হারামের দিকে ফিরে নামায আদায় কর।

এই নতুন বিধান আসার পর ইহুদী-নাসারারা সুযোগ পেল। তাদের যেহেতু ইসলাম পছন্দ হয় নাইসলামের নবীকে তারা পছন্দ করে না, কুরআন পছন্দ করে না; ফলে কেবল সুযোগের সন্ধানে থাকে, কীভাবে নবীজীকে নিয়ে মশকরা করা যায়। অথচ তাদের নবীগণ তাদের থেকে ওয়াদা ও স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন যে, আখেরী নবীর আগমনের পর তোমরা তাঁর ওপরই ঈমান আনবে। তাঁর উম্মতের মধ্যে প্রবেশ করবে। তাঁর শরীয়ত গ্রহণ করবে। তাঁর প্রতি হেদায়েতের যে কিতাব-কুরআন অবতীর্ণ হবে, সেই কুরআনের প্রতি ঈমান আনবে। এটা তাদের নবীগণ তাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে তারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনতে পারেনি। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনেনি। আবদুল্লাহ ইবনে সালামসহ কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ঈমান এনেছেন; কিন্তু অনেক ইহুদী-নাসারাই পারেনি। অথচ তারা নিশ্চিত জানত, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবী।

এই দ্বিতীয় পারার শুরুতেই আছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন

اَلَّذِیْنَ اٰتَیْنٰهُمُ الْكِتٰبَ یَعْرِفُوْنَهٗ كَمَا یَعْرِفُوْنَ اَبْنَآءَهُمْ  وَ اِنَّ فَرِیْقًا مِّنْهُمْ لَیَكْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَهُمْ یَعْلَمُوْنَ.

অর্থাৎ এই ইহুদী-নাসারারা নিজের সন্তানদেরকে যেমন চেনে, আখেরী নবীকে তেমনই চেনে যে এই সে নবী, যার খোশখবরি তাওরাত ও ইঞ্জিলে এসেছে। যার বিষয়ে আমাদের নবীরা আমাদেরকে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন এবং সতর্ক করে গেছেন। সবকিছু জেনেও তারা হিংসা ও হঠকারিতাবশত ঈমান ও ইসলাম থেকে দূরে থেকেছে। 

আল্লাহ তাআলার নির্দেশে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইতুল মাকদিস থেকে ঘুরে বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে নামায আদায় শুরু করলেন, তারাও ঠাট্টা শুরু করল হাঁ, এতদিন করল একটা, এখন করছে আরেকটা! এতদিন নামায পড়ল বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে, এখন আবার পড়ছে কা‘বার দিকে ফিরে!

একদিন এদিকে, আরেকদিন ওদিকে, কী তামাশা!

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন

قُلْ لِّلهِ الْمَشْرِقُ وَ الْمَغْرِبُ.

আপনি বলে দিন, পূর্ব ও পশ্চিম সব আল্লাহরই।

আল্লাহ্ই বিধান দিয়েছেন, এখন থেকে মসজিদে আকসা আর কেবলা নয়; কেবলা হবে মসজিদে হারাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত এটিই হবে আহলে ইসলাম ও আহলে হকের কেবলা।

আল্লাহ তাআলা এ-ও বলেছেন, নতুন এই বিধান আসতে না আসতে দেখবে, নির্বোধ লোকেরা সমালোচনা শুরু করেছে।

আল্লাহ তাআলা তাদের ‘নির্বোধ’ বলেছেন এবং তিনি বলতেই পারেন। মুসলিমদের পক্ষ থেকে তাদের ‘নির্বোধ’ বলা হচ্ছে না, বরং সরাসরি আল্লাহ্ই তাদের ‘নির্বোধ’ বলেছেন; যিনি খালিক ও মালিক। ইহুদী-নাসারাদের খালিক-মালিকও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া আর কেউ নয়।

কেন আল্লাহ তাদের ‘নির্বোধ’ বলেছেন? কারণ অন্যায় প্রশ্ন উত্থাপনকারী বুদ্ধিমান হয় কীভাবে? বুদ্ধিমান ব্যক্তি অনর্থক ও অন্যায় প্রশ্ন করে না। অন্যায় আপত্তি তোলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আয়াত থেকে আমাদের এই শিক্ষাও গ্রহণ করতে হবে। সবাই জানি, শরীয়ত ও বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাঁর হুকুমেই এতদিন নবীজী বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায পড়েছিলেন। আল্লাহ্ই আবার হুকুম করছেন, এখন থেকে কেবলা হবে মসজিদে হারাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদে হারামই কেবলা হিসেবে থাকবে। কাজেই এখন থেকে মসজিদে হারামের দিকে ফিরেই নামায পড়তে হবে। আগের কেবলা যেমন আল্লাহর হুকুমে ছিল, এই নতুন কেবলাও আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে। সুতরাং প্রশ্ন-আপত্তি কেন?

আল্লাহ বলেন 

قُلْ لِّلهِ الْمَشْرِقُ وَ الْمَغْرِبُ.

পূর্ব, পশ্চিম, (উত্তর, দক্ষিণ,) সবদিকের খালিক ও মালিক হলেন আল্লাহ।

মসজিদে আকসার মধ্যে বরকত রেখেছেন আল্লাহ, মসজিদে হারামের মধ্যেও বরকত রেখেছেন আল্লাহ। আর হেদায়েতের প্রথম কেন্দ্র হিসেবে আল্লাহ তাআলা বাইতুল্লাহকেই বানিয়েছিলেন। কাজেই তিনিই জানেন, কোন্টাকে কেবলা বানাবেন। এতদিন মসজিদে আকসার হুকুম দিয়েছিলেন, এখন বাইতুল্লাহর হুকুম দিচ্ছেন। আল্লাহর যা হুকুম এসেছে, ব্যস, তা-ই পালন কর এবং মান্য কর।

یَهْدِیْ مَنْ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ.

আল্লাহ যাকে চান ‘সীরাতে মুস্তাকীম’-এর পথ দেখান।

وَكَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْكُمْ شَهِیْدًا.

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। সূরা বাকারা (০২) : ১৪৩

আয়াতের এই অংশে উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার বড় ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে।

কে রাসূলের আনুগত্য করে, কে করে না! 

এর পরেই বলা হচ্ছে

وَ مَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِیْ كُنْتَ عَلَیْهَاۤ اِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ یَّتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ یَّنْقَلِبُ عَلٰی عَقِبَیْهِ.

এর তাফসীর হল, হে নবী! এতদিন আপনি যে কেবলার দিকে ফিরে নামায আদায় করেছিলেন, সেই বিধান আমি কেন দিয়েছি? তারপর সেই বিধান পরিবর্তন করে নতুন যে বিধান দিলাম এবং বললাম, এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত এটাই কেবলা এই বিধান কেন দিয়েছি?

উদ্দেশ্য একটাই 

لِنَعْلَمَ مَنْ یَّتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ یَّنْقَلِبُ عَلٰی عَقِبَیْهِ.

এটা ছিল আমার পক্ষ থেকে পরীক্ষা কে রাসূলের কথা শোনে আর কে শোনে না। কে রাসূলকে অনুসরণ করে, কে করে না! কে রাসূলের আনুগত্য করে, কে করে না এই পরীক্ষার জন্য এই বিধান দেওয়া হয়েছে।

মানুষ কি কেবলা নিয়ে দলাদলি ও অন্যায় পক্ষপাত করে, নাকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেশ করা বিধান গ্রহণ করে নেয় সেটিই তিনি দেখতে চাচ্ছেন।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। মক্কায় থাকাকালে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পূর্ববর্তী নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও নূহ আলাইহিস সালামের মতো মসজিদে হারামের দিকে ফিরেই নামায পড়তেন। মদীনা মুনাওয়ারায় আসার পর বা আসার কিছুদিন আগে যখনই নতুন করে মসজিদে আকসার অভিমুখী হওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে, সেটা কি কুরআনের আয়াতে এসেছে, না নবীজীর হাদীসের মাধ্যমে এসেছে?

উত্তর হল, নবীজীর হাদীসের মাধ্যমেই বিধানটা এসেছে। আবার ১৬-১৭ মাস বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায পড়ার পর পুনরায় মসজিদে হারামকে কেবলা বানানোর নতুন যে বিধান এসেছে, কুরআনের বাণী থেকে বোঝা যায়, এটিও হাদীসের মাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ প্রথমে বিধানটা হাদীসের মাধ্যমে এসেছে, তারপর আল্লাহ তাআলা এর সমর্থনে কুরআনের আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেছেন। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা ঈমানের পরীক্ষা নিলেন, কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেওয়া বিধান মানল আর কে মানল না!

খেয়াল করে শুনুন! এই আয়াতের মর্ম হল, আল্লাহ তাআলা বলছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরআনের আয়াত শোনান, কেবল তখনই তাঁকে অনুসরণ করবে এমন হলে কিন্তু রাসূলুল্লাহর প্রতি ঈমান সাব্যস্ত হবে না; বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পবিত্র হাদীস ও সুন্নাহ পেশ করেন তখনো তাঁর অনুসরণ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরআনের আয়াত শোনান তখন যেমন তাঁকে মানা জরুরি, তেমনি তিনি যখন হাদীস ও সুন্নাহ শোনান অথবা কোনো আমল করে দেখান তখনো তাঁকে মানা জরুরি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে যা বলেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বলেন।

রাসূলুল্লাহর হাদীস ও সুন্নাহ এবং তাঁর বাণীও আল্লাহর পক্ষ থেকে। সেগুলো ওহীরই একটা প্রকার। সেগুলোর ওপর কেউ ঈমান না আনলে তার ঈমান সাব্যস্ত হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান সাব্যস্ত হতে হলে তাঁর ওপর নাযিলকৃত কুরআন মানা যেমন জরুরি, তাঁর হাদীস ও সুন্নত মানাও জরুরি।

আল্লাহ পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন, তোমরা কি সরাসরি কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে বিধান পেলে মানবে আর রাসূলুল্লাহর হাতে বিধান পেলে মানবে না? অথচ সেটাও শরীয়তের বিধান, আল্লাহরই বিধান। সরাসরি কুরআনের আয়াত ছাড়াও যদি রাসূলুল্লাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিধান পেশ করেন, তখন রাসূলুল্লাহকে মানছ কি না সেটাও আল্লাহ দেখতে চাচ্ছেন। না মানলে ব্যর্থ ও বিফল, মানলে কামিয়াব ও সফল।

এ থেকে নামধারী ‘আহলে কুরআন’রা নিজেদের মুমিন হওয়ার বিষয়টি যাচাই করে নিতে পারে।

ভালো লাগা খারাপ লাগার মানদণ্ড আমার মন বা গুরু নয়; মানদণ্ড কুরআন ও সুন্নাহ

আল্লাহর বিধান যখন এসে যায় তখন আমার মনে কেমন লাগে না লাগে তা আমি দেখব না। আমার ভালো লাগে, নাকি খারাপ লাগে সেটা আমি দেখব না। ভালো-খারাপের মানদণ্ড আমার মন নয়। আমার খেয়াল খুশি কখনো ভালো-মন্দের মানদণ্ড হতে পারে না। ভালো-মন্দের মানদণ্ড হল কুরআন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও শিক্ষা। এটা নিতে হবে কুরআন থেকে। আমার কাছে ভালো লাগে, আমার কাছে ভালো লাগে না, আমার মন মানে না, ওভাবে হলেই না আমার কাছে ভালো লাগত! এই যে আমার মন মানে না, আমার কাছে এটা ভালো লাগে, ওটা ভালো লাগে না, আমার গুরুর কাছে এটা ভালো লাগে, ওটা ভালো লাগে না, বিশ্বমোড়লদের কাছে এটা ভালো লাগে, ওটা ভালো লাগে না এগুলো মানদণ্ড নয়; মানদণ্ড হল কুরআন ও সুন্নাহ। মানদণ্ড হল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও সীরাত।

আল্লাহ তাআলা সেটাই বলেছেন। তিনি পরীক্ষা করতে চান, তোমরা কি আল্লাহর বিধান মান, নবীজীর তরীকা মান, নাকি নিজের মনচাহি যিন্দেগী ভালবাস?

وَ اِنْ كَانَتْ لَكَبِیْرَةً اِلَّا عَلَی الَّذِیْنَ هَدَی اللهُ.

অর্থাৎ এই যে আনুগত্য, নিজের রুচি-অভিরুচির বিপরীতে যখন আল্লাহর বিধান এসে যাবে, তার সামনে মাথা নত করা এবং সতঃস্ফূর্ত মেনে নেওয়াই হল মুমিনের কাজ। এটা সবাই পারে না। এর জন্য দরকার আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে হেদায়েত ও তাওফীক।

যিকিরের সবচেয়ে বড় ফলআল্লাহ্ও আমাকে স্মরণ করবেন

দ্বিতীয় পারার ২য় পৃষ্ঠা থেকে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করা হচ্ছে

كَمَاۤ اَرْسَلْنَا فِیْكُمْ رَسُوْلًا مِّنْكُمْ یَتْلُوْا عَلَیْكُمْ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیْكُمْ وَ یُعَلِّمُكُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَ یُعَلِّمُكُمْ مَّا لَمْ تَكُوْنُوْا تَعْلَمُوْنَ، فَاذْكُرُوْنِیْۤ اَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوْا لِیْ وَ لَا تَكْفُرُوْنِ، یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اسْتَعِیْنُوْا بِالصَّبْرِ وَ الصَّلٰوةِ  اِنَّ اللهَ مَعَ الصّٰبِرِیْنَ، وَلَا تَقُوْلُوْا لِمَنْ یُّقْتَلُ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ  بَلْ اَحْیَآءٌ وَّ لٰكِنْ لَّا تَشْعُرُوْنَ.

(এ অনুগ্রহ ঠিক সেই রকমই) যেমন আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য থেকে, যে তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হেকমতের তালীম দেয় এবং তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেয়, যা তোমরা জানতে না। সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব আর আমার শোকর আদায় কর, আমার অকৃতজ্ঞতা করো না।

হে মুমিনগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য লাভ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে আছেন। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা (তাদের জীবিত থাকার বিষয়টা) উপলব্ধি করতে পার না। সূরা বাকারা (০২)  : ১৫১-১৫৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আখেরী উম্মতের প্রতি অনেক নিআমত দান করেছেন। অনেক অনুগ্রহ করেছেন। বড় কয়েকটি অনুগ্রহ এখানে আলোচনা করেছেন। অনেক কিছু এই কুরআন এবং এই নবীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে শিখিয়েছেন। তোমরা আল্লাহর এই নিআমতগুলোর শোকর আদায় কর।

আল্লাহ বলেন

فَاذْكُرُوْنِیْۤ اَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوْا لِیْ وَ لَا تَكْفُرُوْنِ.

তোমরা আমাকে স্মরণ কর। তোমাদেরকে এত নিআমত দান করা হল এবং এই কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস ও শরীয়তের মাধ্যমে তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার যিকির করার পদ্ধতিও শেখানো হল। কাজেই আল্লাহর যিকির আদায় কর। যিকির করার সবচেয়ে বড় ফল হল, তুমি আল্লাহর যিকির করলে আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন। সুবহানাল্লাহ!

আমরা সাধারণ নাখান্দা নালায়েক বান্দা। আল্লাহ আমাদেরকে স্মরণ করবেন। আমি যখন সুবহানাল্লাহ বলব, আল্লাহ বলবেন দেখো আমার বান্দা আমার পবিত্রতা বর্ণনা করছে!

আমি যখন আলহামদু লিল্লাহ বলব, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বলবেন দেখো আমার বান্দা আমার প্রশংসা করছে! আমার শোকর আদায় করছে।

আমি বলব, আল্লাহু আকবার; আল্লাহ বলবেন, দেখো আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করছে!

আপনি দুআর মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করবেন, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমাকে রমযানের খায়ের ও বরকত দান করুন! আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলবেন, দেখ, আমার বান্দা কী চাচ্ছে আমার কাছে? আমি সব দিয়ে দিলাম।

আমি আল্লাহকে স্মরণ করব, যিকিরের একটা বাক্য উচ্চারণ করব, যিকিরের একটা আমল করব, আল্লাহ কতভাবে আমাকে স্মরণ করবেন! আমলনামার ফেরেশতাকে বলবেন, এটা লেখ। আমার বান্দা নেক আমল করেছে, লেখ। আল্লাহ তাআলা কত ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন!

আল্লাহ ফেরেশতার মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু আল্লাহর কাজের হেকমত ও রহস্য আল্লাহ্ই জানেন। একেক কাজের জন্য অনেক অনেক ফেরেশতা তিনি নিযুক্ত করে রেখেছেন। বান্দা একবার আল্লাহ তাআলার যিকির করলেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হুকুম ঊর্ধ্বজগৎ ও নিম্নজগতের সব জায়গায় চালু হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় যিকির নামায, তারপর তিলাওয়াত

সবচেয়ে বড় যিকির নামায। তার পরের যিকির কুরআন তিলাওয়াত। আর ‘সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার’-এর যিকির তো এমন সহজ যিকির, যা চলতে-ফিরতে উঠতে-বসতে সব সময় করতে পারি। শুয়েছি, ঘুম আসতে পাঁচ-সাত-দশ মিনিট কিছু সময় তো লেগেই যায়। খুব কম মানুষ আছে, বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেই ঘুম এসে যায়। হাঁ, কারও দেরি না হলে সেটাও আল্লাহর নিআমত। কিন্তু ঘুম আসতে যতক্ষণ সময় লাগছে, ততক্ষণ আল্লাহ তাআলার যিকির করতে থাকি। যতক্ষণ আমি যিকিরে থাকব, আল্লাহর রহমতও আমার সঙ্গে থাকবে।

আল্লাহ বলেছেন

فَاذْكُرُوْنِیْۤ اَذْكُرْكُمْ

(তোমরা আমার যিকির কর, আমি তোমাদের স্মরণ করব।)

যিকিরের এর চেয়ে বড় ফযীলত আর কী চাই? আছে অনেক ফযীলত। যদি এমন বলা হত যে, তোমরা যিকির কর, আমি সওয়াব দিব, তাহলেও বহুত বড় বিষয় ছিল। সওয়াব তো আল্লাহ তাআলা দেবেনই, কিন্তু এখানে তা বলেননি। বলেছেন

اَذْكُرْكُمْ

অর্থাৎ তুমি আমার যিকির করলে আমিও তোমাকে স্মরণ করব।

এটা সাধারণ সওয়াবের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বের কথা নয় কি! এই একটা কথা চিন্তা করলেই যিকিরের ব্যাপারে কোনো গাফলতি করতে পারি না।

গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেক বড় যিকির

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয যিকির। আল্লাহ যত নেক আমল ফরয করেছেন, ফরয নেক আমলগুলো স্মরণ রাখা এবং পালন করা সবচেয়ে বড় যিকির। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেক বড় যিকির। কারণ আল্লাহর স্মরণ থাকলে বান্দা গুনাহ করতে পারে কীভাবে? শয়তান কতভাবে ধোঁকা-ওয়াসওয়াসা দেয় এবং গোনাহের মধ্যে ফেলে দেয়! তখন যদি শক্ত হয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আরে আল্লাহ তো দেখছেন! আল্লাহ নারাজ হবেন! এভাবে যদি বান্দা শক্ত হয়ে যায়, তাহলে গোনাহ থেকে বাঁচা সহজ।

ফরয যিকির এই তিন প্রকার। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায আদায় করা, আল্লাহ যত নেক আমল ফরয করেছেন সেগুলো আদায় করা এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা; অর্থাৎ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এই তিন প্রকারের ফরয যিকিরের ব্যাপারে কোনো অবহেলা আমরা করব না ইনশাআল্লাহ।

আর যত নফল, মুস্তাহাব যিকির আছে সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। এগুলো অনেক বড় যিকির, একবার সুবহানাল্লাহ বললে আমলনামা পূর্ণ হয়ে যায়!

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

الْحَمْدُ لِلهِ تَمْلَأُ الْمِيزَانَ، وَسُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ تَمْلَآَنِ - أَوْ تَمْلَأُ - مَا بَيْنَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ.

আলহামদু লিল্লাহ’ যিকির মিযানের পাল্লা পূর্ণ করে দেয়। ‘সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদু লিল্লাহ’ আসমান-যমীনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেয়। সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩

আল্লাহ তাআলা বলেছেন

فَاذْكُرُوْنِیْۤ اَذْكُرْكُمْ وَ اشْكُرُوْا لِیْ وَ لَا تَكْفُرُوْنِ.

অর্থাৎ আমার যিকির কর, আমি  তোমাদের স্মরণ করব। আমার নিআমতের শোকর আদায় কর। না-শোকরি করবে না এবং অবাধ্য হবে না। অবাধ্য হলে এবং নিআমতের না-শোকরি করলে বিপদ আছে।

কোন্ নিআমত? আল্লাহ অনেক নিআমত দান করেছেন, কিন্তু এখানে দ্বীন-ঈমান বিষয়ক নিআমতের উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন আমাকে স্মরণ কর এবং শোকর আদায় কর।

আমার ছেলে কুরআনের হাফেয হল, ছেলে কায়দার সবক নিল, আম্মাপারার সবক নিল, আলিফ-লাম-মীমের সবক নিল, এসব খুশির বিষয় কি না?

অবশ্যই খুশি ও নিআমতের বিষয়।

সন্তানকে কুরআন শেখাতে পারলাম, মাদরাসায় পাঠাতে পারলাম, এগুলো অবশ্যই খুশি ও নিআমতের বিষয়।

 আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণকারীদের মৃত বলো না

وَلَا تَقُوْلُوْا لِمَنْ یُّقْتَلُ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ.

অর্থাৎ যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছে এবং শহীদ হয়েছে, তাদেরকে মুর্দা ও মৃত বলবে না।

بَلْ اَحْیَآءٌ وَّ لٰكِنْ لَّا تَشْعُرُوْنَ.

বরং প্রকৃতপক্ষে তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা (তাদের জীবিত থাকার বিষয়টা) উপলব্ধি করতে পার না।

অন্য আয়াতে আছে

بَلْ اَحْیَآءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ یُرْزَقُوْنَ.

বরং তারা জীবিত। তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে রিযিক দেওয়া হয়। সূরা আলে ইমরান (০৩) : ১৬৯

আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া লোকেরা জীবিত। দুনিয়ার হায়াত শেষ করে শহীদ হয়ে গেল, কিন্তু শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করার পর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার হায়াত থেকে অনেক শক্তিশালী হায়াত দান করেছেন, সুবহানাল্লাহ! কাজেই তাদেরকে তোমরা মৃত বলতে পারো না। যদিও তাদের জীবিত থাকার বিষয়টি তোমরা বোঝ না। কারণ তোমরা বাহ্যত একটি মৃত দেহ নিজ হাতেই দাফন করে এসেছ।

শহীদদের দেহ পর্যন্ত মাটি খায় না। এমন অনেক ঘটনা ইতিহাসে আছে। কোনো কারণে কবর খুলে গেছে। তখন  দেখা যায়, বহু বছর আগের কবর হওয়া সত্ত্বেও এখনো দেহ অক্ষত আছে। এমনকি কাফনের কাপড়টা পর্যন্ত অক্ষত আছে।

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন

وَ لَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَیْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَ الْجُوْعِ وَ نَقْصٍ مِّنَ الْاَمْوَالِ وَالْاَنْفُسِ وَالثَّمَرٰتِ، وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیْنَ، الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَصَابَتْهُمْ مُّصِیْبَةٌ  قَالُوْۤا اِنَّا لِلهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیْهِ رٰجِعُوْنَ، اُولٰٓىِٕكَ عَلَیْهِمْ صَلَوٰتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ  وَ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ.

আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনো) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ  শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। যারা তাদের কোনো মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, ‘আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং এরাই আছে হেদায়েতের ওপর। সূরা বাকারা (০২) : ১৫৫-১৫৭

আল্লাহর কাছে সবরকারীদের কী মর্যাদা, আল্লাহ তাদেরকে কী কী দান করেন, এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আপনারা নিজেরা তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন থেকে পড়ে নিতে পারেন।

এই পারা থেকেই আর দুটি আয়াত তিলাওয়াত করব

لَیْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَ الْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَالْیَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلٰٓىِٕكَةِ وَ الْكِتٰبِ وَ النَّبِیّٖنَ وَ اٰتَی الْمَالَ عَلٰی حُبِّهٖ ذَوِی الْقُرْبٰی وَالْیَتٰمٰی وَالْمَسٰكِیْنَ وَابْنَ السَّبِیْلِ وَالسَّآىِٕلِیْنَ وَ فِی الرِّقَابِ وَاَقَامَ الصَّلٰوةَ وَ اٰتَی الزَّكٰوةَ  وَ الْمُوْفُوْنَ بِعَهْدِهِمْ اِذَا عٰهَدُوْا  وَ الصّٰبِرِیْنَ فِی الْبَاْسَآءِ وَالضَّرَّآءِ وَ حِیْنَ الْبَاْسِ  اُولٰٓىِٕكَ الَّذِیْنَ صَدَقُوْا  وَ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ.

পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা র্প্বূ বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে, বরং পুণ্য হল (সেই ব্যক্তির কার্যাবলি), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষ দিনের ও  ফেরেশতাদের প্রতি এবং (্আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়-স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সংকটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। এরাই তারা, যারা সাচ্চা (নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত) এবং এরাই মুত্তাকী। সূরা বাকারা (০২) : ১৭৭

এক আয়াতেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঈমান ও ইসলামের আকীদাগুলো জানিয়ে দিলেন। ইসলামের ভিত্তি যেসব ফরয আমল ও ইবাদত রয়েছে, আল্লাহর হক ও বান্দার হক সম্পর্কে আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন। নেক কাজের বিবরণ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেগুলো জানা, বোঝা এবং পদ্ধতি বুঝে সহীহ তরীকায় সমস্ত নেক কাজ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

রমযান সিয়াম ও কুরআনের মাস

রমযান সিয়াম ও কুরআনের মাস। সেই বিষয়ের আয়াতগুলোও দ্বিতীয় পারায় এসেছে

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَالْفُرْقَانِ  فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْیَصُمْهُ،  وَمَنْ كَانَ مَرِیْضًا اَوْ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ.

রমযান মাস—যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে—যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হেদায়েত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য দিনে সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে। সূরা বাকারা (০২) : ১৮৫

কুরআন কেন এসেছে?

বোঝার জন্য। মানব ও জিন জাতির হেদায়েতের জন্য।

وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی

অর্থাৎ হেদায়েতের যাবতীয় নিদর্শন এই কুরআনে রয়েছে।

وَالْفُرْقَانِ

কুরআনের আরেক নাম ফুরকান। কুরআন কারীমের অনেকগুলো নাম রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নাম আলকুরআন। আরেকটি নাম ‘আলফুরকান’।

কেন কুরআনকে ‘ফুরকান’ বলা হয়েছে?

আল্লাহ তাআলা বলেন, এই কুরআনের মধ্যে আমি ফুরকান অবতীর্ণ করেছি। অর্থাৎ ওসব বিধান ও নিদর্শন আমি এই কুরআনে অবতীর্ণ করেছি, ওসব নিয়মনীতি এই কুরআনে রেখেছি এবং ওসব হেদায়েত এই কুরআনে অবতীর্ণ করেছি, যেগুলো অবলম্বন করলে তোমরা হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে পারবে। কোন্টা হক, কোন্টা বাতিল, কোন্টা সহীহ, কোন্টা গলত, কোন্টা কল্যাণ, কোন্টা অকল্যাণ, কোন্টা হেদায়েত, কোন্টা গোমরাহী, কোন্টা তাওহীদ, কোন্টা শিরক, কোন্টা ঈমান, কোন্টা কুফর সব পার্থক্য করতে পারবে এই কুরআনের মাধ্যমে। সুবহানাল্লাহ! কাজেই হেদায়েত আমাকে কুরআন থেকেই নিতে হবে।

সংবিধান সংস্কার করার প্রথম কথাই হল সংবিধানকে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধারা থেকে মুক্ত করা

এবার যারা নতুন করে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হলেন, যেদিন তাদের শপথ পাঠ হয়েছে, তার একদিন পরে সন্ধ্যায় আমরা রমযানের চাঁদ দেখলাম। সবাই নতুন দফতর শুরু করলেন। ধর্মমন্ত্রী এখানে এসে চাঁদের ঘোষণা দিলেন বুধবার সন্ধ্যায়। বৃহস্পতিবারে আমরা প্রথম রোযা রাখলাম। এটা একটা শুভ লক্ষণ! এদিকে নতুন সরকার শুরু হয়েছে আর ওদিকে রমযানের মতো বরকতপূর্ণ মাসও শুরু হয়েছে। এই শুভযাত্রা তখনই শুভ হবে, যদি কুরআনের হেদায়েত নিয়ে সরকারের পথচলা শুরু হয়।

মনে রাখতে হবে, শপথ কিন্তু ভালো জিনিস। নেক কাজে শপথ করা ভালো। দায়িত্ব পেয়েছি, এ দায়িত্ব ও আমানতের হক আদায় করব। দায়িত্ব যথাযথ পালন করার শপথ করা ভালো। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এক কথা মনে রাখতে হবে। শপথের মধ্যে বলা হয়েছে, সংবিধান সংরক্ষণ করবে এবং সংবিধান বাস্তবায়ন করবে। সংবিধান সংরক্ষণ করার প্রথম কাজই হল, সংবিধানের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত ও বিরোধী যা কিছু আছে সেসব থেকে সংবিধানকে মুক্ত করা। এটা হল সংবিধান সংস্কারের প্রথম কাজ।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে সর্বপ্রথম খলীফা হয়েছেন আবু বকর সিদ্দীক রা.। তারপর উমর রা., তারপর উসমান রা., তারপর আলী রা.। যারা ঈমান আমল, তাকওয়া এবং বুদ্ধি-উপলব্ধির দিক থেকে অগ্রসর, তারা খুলাফায়ে রাশিদীনের হাতে প্রথমে বাইআত গ্রহণ করতেন। তারপর অন্য সকল মুসলমান বাইআত গ্রহণ করতেন। এটা ছিল খেলাফতের বাইআত। সে বাইআত কীসের ওপর হত শপথের বিষয়টা আপনাকে সেখান থেকে বুঝতে হবে। প্রত্যেক খলীফার প্রথম ভাষণগুলো আপনি শুনুন। সেখানে কী বলা হয়েছে? আবু বকর রা.-এর ভাষণ শুনুন! উমর রা.-এর ভাষণ শুনুন! সেখানে সকল দেশের মুসলিম সরকারদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। সেই বাইআত হত ‘আলাল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’। অর্থাৎ আপনি দেশ পরিচালনা করবেন (দেশ মানে তখনকার দেশ তো বাংলাদেশের মতো এটুকু ছিল না, বরং পুরো মুসলিম বিশ্ব) আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বান্দাদেরকে পরিচালনা করবেন আল্লাহর দেওয়া কিতাব ও আল্লাহর নবীর সুন্নাহ অনুযায়ী। এই বিষয়ের ওপর আমরা আপনার বাইআত গ্রহণ করলাম।

على الكتابِ والسنَّةِ.

কিতাব ও সুন্নাহর ওপর।

আর খলীফাগণ বলতেন, আমি যতক্ষণ শরীয়ত ও ইনসাফের ওপর থাকব, কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক বলব, ততক্ষণ তোমরা আমার আনুগত্য করবে। যখনই আমার মধ্যে কোনো বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি বা উল্টো কিছু দেখবে, তোমরা আমাকে সোজা করে দেবে, শুধরে দেবে। আমি আল্লাহর নাফরমানীর কোনো কথা বলে বসলে সেক্ষেত্রে তোমরা আমার আনুগত্য করবে না।

সুতরাং এখান থেকে আমাদেরকে শপথের কথা শিখতে হবে। শপথের মধ্যে যে সংবিধানের কথা বলা হয়েছে, সংবিধানের কাজ হল আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়ন করার নিয়ম-নীতি লেখা। সংবিধান কোনো শরীয়ত বানাবে না।

সংবিধান কি শরীয়ত? কখনো নয়। সংবিধানকে শরীয়ত মনে করলে ঈমানই থাকবে না।

সংসদ ও সংবিধানের কাজ কী?

শরীয়ত হল কুরআন-হাদীসে আল্লাহ তাআলার দেওয়া বিধি-বিধান ও নিয়ম-নীতি আর সংবিধান হল কিছু ব্যবস্থাপনাগত নিয়ম-নীতি। সংবিধানের কাজ হল আল্লাহর দেওয়া শরীয়ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে ফিকির করা। আল্লাহ তাআলা যেখানে উন্মুক্ত রেখেছেন, অর্থাৎ এই তরীকাও চলতে পারে, ওই তরীকাও চলতে পারে, সেখানে আমরা কোন্টা গ্রহণ করব তা ঠিক করা।

কিছু বিধান ফরয হিসেবে নির্ধারিত। কিছু হারাম হিসেবে নির্ধারিত। হারামে লিপ্ত হওয়া যাবে না, ফরয ছাড়া যাবে না। হালাল-হারাম ও জায়েয-নাজায়েযের যে সীমারেখা আল্লাহ তাআলা ঠিক করে দিয়েছেন, সেই সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। আর কিছু আল্লাহ তাআলা মুক্ত রেখেছেন, পরিভাষায় তাকে বলা হয় মুবাহ। অর্থাৎ এভাবেও করা যায়, ওভাবেও করা যায়। করলেও গোনাহ নেই, না করলেও গোনাহ নেই। সব রকম হতে পারে। তো আমরা কোন্টা গ্রহণ করব তা ঠিক করার জন্যই সংসদ ও সংবিধান।

একই রাস্তার উভয় দিক থেকে যদি গাড়ি আসা শুরু হয়, ঝামেলা হতে পারে। সেজন্য মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে দুই রাস্তা করে দেওয়া হয়। একটা আসার রাস্তা আরেকটা যাওয়ার রাস্তা। আপনি চাইলে এটাকে আসার রাস্তাওটাকে যাওয়ার রাস্তা করতে পারেন আবার এর বিপরীতও করতে পারেন। কিন্তু একটা তো ঠিক করতে হবে! ঠিক না করলে এক্সিডেন্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। একদিকে চলার পরেও সমস্যা হয়। তো এখন আমরা কোন্টা করব এটা পরামর্শ করে ঠিক করতে হবে। এরকম অনেক বিষয় রয়েছে, যেখানে একাধিক পদ্ধতি হতে পারে, আমরা কোন্ পদ্ধতি অবলম্বন করব, কীভাবে চলব, পরামর্শ করে ঠিক করতে হয়। সেটাই সংসদ ও সংবিধানের কাজ। হালাল-হারামের বিধান বানানো সংবিধানের কাজ নয়। বিধান আল্লাহ তাআলা কুরআন-হাদীসে দিয়ে দিয়েছেন। কাজেই বিধান আমাদেরকে নিতে হবে কুরআন-হাদীস থেকে।

সংবিধান সংস্কারের একটা কথা উঠছে। এই সংস্কার কীভাবে হবে? সংস্কারের প্রথম মানদণ্ড হল

لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ

সংস্কারের প্রথম মানদণ্ড কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শরীয়ত। তার আলোকেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

আগের খতীব হযরত মাওলানা ওবায়দুল হক ছাহেব রাহ.-এর বয়ান আমি শুনেছি। হুজুর বলেছেন, যারা কুরআন-হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের বিশেষজ্ঞ এবং ফকীহ ও মুফতী, তাদের নিয়ে একটা বোর্ড গঠন করুন। তাদের পরামর্শে দেশ পরিচালনা করুন।

অর্থাৎ আপনার সংবিধানকে প্রথম ওই বোর্ডের সামনে পেশ করুন! এই প্রথম কাজটা ড. ইউনুস সাহেবরা করতে পারেননি। বর্তমান সরকার যেন করতে পারে, আল্লাহ তাআলা তাদের সেই তাওফীক দান করুন আমীন।

ইউনুস সাহেব সংস্কারের কথা অনেক বলেছেন, কিন্তু এই কাজটা করতে পারেননি। সংবিধানকে প্রথমেই উলামায়ে কেরামের কাছে পেশ করতে হবে। উলামায়ে কেরাম সংবিধানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে বলবেন এখানে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কিছু আছে কি না? যে ধারাগুলোকে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী বলে চিহ্নিত করবেন, সেগুলোকে বাদ দিতে হবে এবং সংবিধানের উপরিউক্ত শরয়ী অবস্থান সংবিধানের শুরুতেই স্পষ্ট করে দিতে হবে।

তারপর সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সামনে পেশ করতে পারেন। তারা দেখবেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট হিসেবে আরও ভালো কিছু হতে পারে কি না? কিন্তু প্রথমেই দেখতে হবে, কুরআন-হাদীস ও শরীয়ত বিরোধী কিছু আছে কি না? থাকলে বাদ দিতে হবে এবং মুছে ফেলতে হবে। 

মূল কাজের খবর নেই, কেবল সংস্কার সংস্কার! এভাবে সংস্কার হবে না। সংস্কারের কথা আল্লাহ তাআলা বলেছেন

وَ الْفُرْقَانِ

অর্থাৎ কোন্টা সঠিক, কোন্টা বেঠিক, কোন্টা আসল সংস্কার আর কোন্টা নকল সংস্কার, পার্থক্য করার মানদণ্ড হল কুরআন।

পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন

وَ اِذَا سَاَلَكَ عِبَادِیْ عَنِّیْ فَاِنِّیْ قَرِیْبٌ  اُجِیْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ فَلْیَسْتَجِیْبُوْا لِیْ وَ لْیُؤْمِنُوْا بِیْ لَعَلَّهُمْ یَرْشُدُوْنَ.

(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ  যখন  আমাকে  ডাকে  আমি  তার  ডাক শুনি। সুতরাং তারাও আমার কথা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করুক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়। সূরা বাকারা (০২) : ১৮৬

আয়াতে আল্লাহর দরবারে দুআ করার কথা বলা হয়েছে। সবসময় আল্লাহর নিকট দুআ করব, কিন্তু রমযান মাসে কোনো সুযোগই যেন বাদ না যায়! দুআর কোনো একটা সুযোগ ও মুহূর্ত যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়! আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই তাওফীক দান করুন।

[শ্রুতলিখন : মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম]

 

 

advertisement