শাওয়াল ১৪৪৭   ||   এপ্রিল ২০২৬

প্রসঙ্গ ঈদ উদযাপন
‖ ঈদকে বিদআত ও জাহেলী রীতিনীতি থেকে পবিত্র রাখুন

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

اَلْحَمْدُ لِلهِ وَسَلَامٌ عَلٰى عِبَادِهِ الَّذِيْنَ اصْطَفٰى.

ইসলাম আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিআমত। স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীন। এতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ও পবিত্র শরীয়ত। মানব জীবনের কোনো অঙ্গন, ছোট-বড় কোনো দিক এমন নেই, যাতে ইসলামের হেদায়েত নেই এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও সুন্নাহর কোনো আমলী নমুনা নেই।

উম্মতে মুসলিমা বড় সৌভাগ্যবান যে, আল্লাহ তাআলা তাদের হেদায়েতের জন্য আখেরী কিতাব কুরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং সব সময়ের জন্য তা সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। পাশাপাশি এ কিতাবের তাফসীর ও আমলী রূপায়ণ হিসেবে আখেরী নবী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সুন্নাহ ও সীরাতকে সংরক্ষিত রেখেছেন। এমনকি অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে, কোনো ফিতনার সম্মুখীন হলে কী করতে হবে সে হেদায়েতও রয়েছে কুরআন-সুন্নাহ ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে। এ বিষয়ে উম্মতের রাহবারীর ধারা জারি থাকার জন্য খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের তরীকা, খাইরুল কুরূনের আমলী নমুনা সবকিছুই আল্লাহ তাআলা হেফাজত করেছেন এবং মুজাদ্দিদীনে উম্মত ও তায়েফায়ে মানসূরার ধারাও কিয়ামত পর্যন্তের জন্য জারি করে দিয়েছেন।

এসকল আয়োজন তো এজন্যই যে, এর মাধ্যমে এ দ্বীন ও শরীয়ত সব ধরনের বিদআত, বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা থেকে সংরক্ষিত থাকবে। আলহামদু লিল্লাহ, এসব সংরক্ষিত আছেও এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেও। কুরআন কারীম সকল বিদআত, শরীয়তে দখলদারী এবং সকল প্রকার অপব্যাখ্যা হারাম করেছে এবং এসব থেকে দূরে থাকা ফরয করেছে। বিদআত ও সকল দখলদারীকে شرع بغير إذن اللهِ (শারউন বিগাইরি ইযনিল্লাহ) নাম দিয়েছে। সকল বিকৃতি ও অপব্যাখ্যাকে ইলহাদ আখ্যায়িত করেছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের তরীকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাকে জাহান্নামের কারণ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

উম্মতে মুসলিমাকে ইসলাম যেমন স্বতন্ত্র আকীদা-বিশ্বাস এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ শরীয়ত দান করেছে, তেমনি তাদের স্বতন্ত্র ও পবিত্র সভ্যতাও দান করেছে। তাই ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন, স্বতন্ত্র ও পবিত্র সভ্যতা। সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনো বিষয়ে এ উম্মত ভিন জাতির দ্বারস্থ হওয়ার না কোনো প্রয়োজন আছে, না এর কোনো অবকাশ আছে।

দ্বীন-শরীয়তের সকল বিষয়েই ইসলামের ঘোষণা

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ.

এই দ্বীন-শরীয়তে যে-ই এমন কিছু সৃষ্টি করবে, যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭১৮

আর শাআইরে ইসলাম তথা যেসব বিধান ও আমল ইসলামের প্রতীক হিসেবে বিবেচ্য, সেগুলোর বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাতে কোনো ধরনের সংযোজন-বিয়োজন আরও বড় ধৃষ্টতা।

ঈদ’ ইসলামের প্রতীক। শাআয়েরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا، وَهٰذَا عِيدُنَا.

অর্থাৎ প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে, পর্ব আছে। আমাদের মুসলিম উম্মাহর উৎসব এটা, অর্থাৎ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৫২

অপর এক হাদীসে এসেছে

قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا، فَقَالَ: مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ.

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় গিয়ে দেখলেন, সেখানকার লোকজন বছরের দুটি দিনে উৎসব পালন করে। তিনি তাদের এ দিনদুটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, জাহেলী যুগ থেকেই আমরা এ দুটি দিনে আনন্দ-উৎসব করে আসছি।

তাদের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা এ দুই উৎসবের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি উৎসব তোমাদের দান করেছেন। উৎসব দুটি হল, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৪

উল্লিখিত হাদীসদুটির বড় শিক্ষাই হল, আমাদের ঈদ ভিন্ন। মুসলিম উম্মাহর ঈদ ভিন্ন। আমাদের স্বতন্ত্র সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আদর্শ আছে। আমরা অন্যদের তালে চললে হবে না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত আমাদের জীবনের জন্য উত্তম ও নির্ভুল আদর্শ। আমাদের দেখতে হবে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ঈদ উদ্যাপন করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম ও খুলাফায়ে রাশেদীন কীভাবে  ঈদ উদ্যাপন করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন

لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡہِمۡ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ.

এ আয়াতের শিক্ষা হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নবীর সাহাবীদের সীরাতে রয়েছে উম্মতের জন্য উত্তম আদর্শ। [সূরা মুমতাহিনা (৬০) : ৬]

আল্লাহ তাআলা রমযান মোবারকের পুরো মাসের রোযা ফরয করেছেন। এই ফরয ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হল, এই মাসে আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়েতের বাণী মহাগ্রন্থ কুরআন লাভ করেছি। কাজেই এর শোকর হিসেবে এ মাসে রোযা রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে। রমযানের দিনে রোযা এবং রাতের তারাবী, তাহাজ্জুদ ও তিলাওয়াতের মাধ্যমে আমরা রমযানের হক আদায় করার চেষ্টা করেছি। সেই মহা নিআমত ও ফরয ইবাদতের শোকর হচ্ছে এই ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরে শোকর আদায়ের সুন্নাহসম্মত তরীকা হল

ক. ঈদুল ফিতরের দিন বেশি বেশি তাকবীর পাঠ করা

اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، وَلِلهِ الْحَمْدُ.

খ. আল্লাহর শোকর আদায় করা।

গ. আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব বর্ণনা করা।

ঘ. ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকাত ঈদের নামায আদায় করা।

ঙ. ঈদের নামাযের পর দুটি খুতবা।

চ. দুআ করা।

ছ. ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা।

জ. কিছু মিষ্টান্ন খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া।

এই হল ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের মৌলিক আমল।

বর্তমানে ঈদকে আমরা বিদআত ও জাহেলী রীতিনীতিতে কলুষিত করে ফেলছি। ঈদের রাতে মেহেদি উৎসবের কথা শোনা যায়। মহিলারা ঈদ বা অন্য কোনো উপলক্ষ্যে মেহেদি লাগাবে, এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ঈদের আগের রাতে এটাকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র উৎসবের আয়োজন করতে হবে কেন? এতে কেবল মেহেদি লাগিয়েই শেষ নয়, ছেলেরা মেহেদি লাগিয়ে দেয় মেয়েদের! ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসে এ উৎসব পালন করছে। এখানে তো ঈদের নাম দিয়ে পর্দার ফরয বিধান লঙ্ঘন করা হচ্ছে, যা সুস্পষ্ট হারাম ও জাহেলী রীতিনীতি। মুসলিম উম্মাহ ঈদ উপলক্ষ্যে মেহেদি উৎসব করতে পারে না। আজ মেহেদি উৎসব করলে আরেকদিন আরেক উৎসব করবে। গায়ে হলুদ করবে। বিয়ের অন্যান্য বিদআতকেও টেনে আনবে ঈদের রাতে!

গত বছর থেকে আরেকটি রেওয়াজ চালু হয়েছে আমাদের দেশে। ঈদ মিছিল! এটা আবার কী জিনিস! আপনি কি ইসলাম ধর্মের ঈদ পালন করছেন, না সমাজের অন্য কোনো জাতির উৎসব পালন করছেন!

ঈদুল ফিতর তো ইসলামের ঈদ, উম্মতে মুসলিমার ঈদ, নবীজীর শেখানো ঈদ, ইসলামী শরীয়তের ঈদ। এটাকে সেভাবেই পালন করা চাই, যেভাবে পালন করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও খুলাফায়ে রাশেদীন। ‘ঈদ মিছিল’ নামে শরীয়তে কোনো কিছুই নেই।

কেউ হয়তো বলতে পারেন, আমরা এসব শরীয়তের আমল হিসেবে করি না, এমনিতেই করি, বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে করি।

মুসলিমের জন্য তো উদ্দেশ্যহীন কিছু করার সুযোগ নেই। মুসলিম উম্মাহ উদ্দেশ্যহীন কিছু করতে পারে না। ঈদের নামে কিছু করতে হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাযুগের নজির থাকতে হবে। ঈদ এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ থেকে। কুরআন-হাদীস থেকে। এই মিছিল তো কুরআন-হাদীস, রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ ও সীরাতের কোথাও নেই।

কেউ বলেন, সুলতানী আমলে ছিল। কোন্ সুলতানের আমলে! আমরা কি তার অনুসরণ করব, নাকি রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করব; যিনি ঈদের ঘোষণা দিয়েছেন!

আপনাকে-আমাকে তো অনুসরণ করতে বলা হয়েছে সাহাবায়ে কেরামের, অনুসরণ করতে বলা হয়েছে খুলাফায়ে রাশেদীনের, খাইরুল কুরূনের, সাহাবা যুগের, তাবেয়ী যুগের, তাবে-তাবেয়ী যুগের!

অন্য জাতির উৎসব-পর্বে শিরক-বিদআত থাকে, মনের ইচ্ছেমতো নানা আয়োজন থাকে, বেহায়াপনা থাকে। কিন্তু আমাদের ঈদ হল শরীয়তের শিক্ষা মোতাবেক তাওহীদের ঈদ, সুন্নাহর ঈদ। এখানে কোনো শিরক থাকবে না, বিদআত থাকবে না। জাহেলী কোনো রীতিনীতি থাকবে না, কোনো কুসংস্কার থাকবে না। বিজাতীয় কোনো সংস্কৃতি এখানে যুক্ত হতে পারবে না। এখানে থাকবে শুধু হেদায়েতের আলো, সুন্নাহর আলো। এজন্যই তো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ‘ঈদ’কে তাদের ‘উৎসব’ থেকে ভিন্ন ঘোষণা করেছেন ।

মুসলিম উম্মাহর ঈদ আলাদা, উৎসব আলাদা; যা সব ধরনের শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত। সব ধরনের অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা থেকে মুক্ত। সেখানে ঢোল-তবলার কোনো স্থান নেই, সেখানে কোনো গান-বাজনা নেই। যে ঢোল-তবলা ও বাজনা নবীজী হারাম করেছেন, যে গানবাদ্য ও পর্দাহীনতাকে শরীয়ত হারাম করেছে, কুরআন যেসব কর্মকাণ্ডকে لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ  আখ্যায়িত করেছে, সেগুলো এখন পালন করা হচ্ছে ঈদ মিছিলের নামে!

ঈদুল ফিতরকে ইসলামের একটি শিআর (নিদর্শন ও পরিচয়চিহ্ন) ও শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধানের পরিবর্তে একটি সামাজিক রীতি ও দেশীয় সংস্কৃতির আদলে সাজানোর পরিকল্পনা চলছে। মেহেদি উৎসব, ঈদ মিছিল, গান-বাজনা, বেহায়াপনা এগুলো ঈদের মাহাত্ম্য ও পবিত্রতাকে কলুষিত করছে।

একারণেই দেখা যায়, এ ঈদ মিছিলের মাধ্যমে এক শ্রেণির বেদ্বীন মানুষ খুব আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। অথচ ওরা ঈদের নামাযও পড়ে না, রোযাও রাখে না। এলজিবিটির লোকেরাও অংশগ্রহণ করছে ঈদ মিছিলে! তাদের প্রতীকও ব্যবহার করা হচ্ছে এই মিছিলে! ঈমান-ইসলাম তো দূরের কথা, সাধারণ শালীনতাবোধও যাদের মধ্যে নেই, তারা মুসলিমদের এই ঈদ মিছিলে নিজেদের প্রতীক নিয়ে অনুপ্রবেশ করছে।

মনে রাখতে হবে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদেরকে হালাল-হারাম ও জায়েয-নাজায়েযের বিধান দিয়েছেন। আনন্দ-উৎসব কীভাবে উদ্যাপন করতে হবে, শোকের সময় কী করতে হবে, বিপদাপদে কী করতে হবে সে বিধানও তিনি দিয়েছেন। শুধু পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, রমযান মাসের রোযা এতটুকু দিয়েই ক্ষান্ত হননি, মানব জীবনের যত অঙ্গন আছে, যেখানে যে বিধান দরকার, সব দিয়েছেন। কুরআন কারীমে তার উল্লেখ আছে, হাদীস শরীফেও তার বিস্তারিত বিবরণ আছে, তেমনি নবীজীর সীরাতে আছে, ইসলামী শরীয়তে আছে, খুলাফায়ে রাশেদীনের তরীকা এবং সাহাবায়ে কেরামের তরীকায় সেগুলো আছে। ইসলামী ফিকহ ও ফতোয়ায় সুবিন্যস্তভাবে যা সংকলিত ও পরিবেশিত হয়েছে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ.

তোমরা আমার তরীকা আঁকড়ে ধর এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের তরীকা আঁকড়ে ধর। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭১৪৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৮৭০; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২

ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ দেখেছে। নবীজীর পরে খলীফা ছিলেন আবু বকর রা., উমর রা., উসমান রা., আলী রা.। আল্লাহর রাসূল বলছেন, তোমরা তাদের সুন্নত মজবুতির সাথে আঁকড়ে ধর। এত শক্তভাবে ধর, যেন এই মত ও পথ থেকে তোমাকে কেউ সরাতে না পারে। একেবারে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধর, যাতে এই আদর্শ তোমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে। কারণ হেদায়েত এই সুন্নতের মধ্যেই। শরীয়তের দলীলের বাইরে, কুরআন-সুন্নাহর বাইরে, নবীর তরীকা, সাহাবীর তরীকার বাইরে নতুন যত কিছু আবিষ্কার হবে, সব বিদআত। আর বিদআতের মধ্যে রয়েছে গোমরাহী। হেদায়েত একমাত্র সুন্নতের মধ্যে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللهِ ثَلَاثَةٌ مُلْحِدٌ فِي الْحَرَمِ، وَمُبْتَغٍ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهْرِيقَ دَمَه.

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের বরং সবচেয়ে ঘৃণিত তিন শ্রেণির মানুষ

এক.

مُلْحِدٌ فِي الْحَرَمِ.

যারা হারাম শরীফের হক ও আদব লঙ্ঘন করে, হারামে বসে বিদআত আবিষ্কার করে, শরীয়তের বিধানে বিকৃতি ঘটায়, হারামে বসে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা করে। এই শ্রেণির মানুষ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত।

দুই.

مُبْتَغٍ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ.

যারা মুসলিম হয়েও যেসকল জাতি ওহীর জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, কুরআন-হাদীসের আলো থেকে বঞ্চিত, এমন লোকদের রীতিনীতি পছন্দ করে, তাদের রীতিনীতি খুঁজে বেড়ায়!

এ শ্রেণির মানুষও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের।

তিন.

مُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهْرِيقَ دَمَه

যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও রক্তপাতের চেষ্টা করে। সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৮৮২

আল্লাহ আমাকে মুসলিম বানিয়েছেন। আমার জন্য জীবনের সকল ক্ষেত্রের নির্দেশনা আছে ইসলামে। সময় যতই অগ্রসর হোক না কেন, যামানা যতই পরিবর্তন হোক না কেন আমাদেরকে নবীজীর সুন্নত থেকেই আলো নিতে হবে। এর থেকে দূরে সরলে নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হবে। হাতে-কলমে নবীজী যেমন দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, তেমনি নবীজীর ইন্তেকালের পর খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম দেখিয়ে দিয়েছেন।

ঈমানের দুর্বলতার কারণে অথবা সঠিক ইলমের অভাবে কারও মনে হতে পারে, তখন তো নবীজী ছিলেন। নবীজীর বরকতে চলেছে সবকিছু। এখন তো নবীজী চলে গেছেন। এখন কী হবে? তাদের বোঝা উচিত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তা যেমন বরকতপূর্ণ তাঁর পবিত্র সীরাতও বরকতপূর্ণ। সে সীরাতকেই আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য উসওয়াতুন হাসানা ঘোষণা করেছেন। এ উসওয়ায়ে হাসানাকে সামনে নিয়ে চললে আমরা কখনো নববী বরকত থেকে মাহরূম হব না।

যাদের মনে উপরিউক্ত চিন্তা আসে, তারা খুলাফায়ে রাশেদীনের সোনালি জীবন দেখি। আল্লাহ তাআলা খুলাফায়ে রাশেদীনকে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, হালাত ও অবস্থার যত পরিবর্তনই হোক, আল্লাহর শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্তই চলবে। ইসলামের দুশমন, মুখে ইসলাম আছে, কিন্তু বাস্তবে ইসলাম গ্রহণ করেনি, এ ধরনের লোকেরা নানা জায়গা থেকে নানা ধরনের ফিতনা করার চেষ্টা করেছে! খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরাম একমাত্র নববী আদর্শ দিয়েই সবকিছুর মোকাবেলা করেছেন।

চতুর্থ খলীফা আলী রা.-এর ইন্তেকালের পরও সাহাবায়ে কেরাম রা. আরও ৬০ বছরের মতো হায়াতে ছিলেন। সর্বশেষ সাহাবী ইন্তেকাল করেছেন ১০০ হিজরীর পর। এই ১০০ বছর দুনিয়া দেখেছে, সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরেছেন! যুগ ও হালাতের যত পরিবর্তনই হয়েছে, ইসলামের শত্রুরা যতই এ আলো নিভিয়ে দিতে চেয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম তা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন মজবুতভাবে।

কেউ কেউ ভাবে, এসব শিক্ষা তো পুরোনো! এখন তো নয়া যামানা। আধুনিক যুগে নতুন কিছু প্রয়োজন। তথাকথিত আধুনিক বিশ্ব থেকে আমাদের সবক নিতে হবে, নাউযুবিল্লাহ! এমন ধারণা যারা করে, আসলে ইসলামের প্রতি তাদের ঈমান নেই, নবীজীর সীরাতের প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই। এরা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় মানুষের তালিকায়।

বাস্তব সত্য হল, যামানা যত অগ্রসর হবে, দুনিয়াবাসী দুনিয়ার দিক থেকে যত উন্নতি লাভ করবে, ততই তারা কুরআন-সুন্নাহ, ইসলামী শরীয়ত, নবীজীর সীরাত এবং সাহাবায়ে কেরামের তরীকা থেকে আলো গ্রহণ করার আরও বেশি মুখাপেক্ষী হবে।

অতএব আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামের শিক্ষা ও দ্বীনের ইলম এ পরিমাণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে এবং এতটুকু সচেতনতা অবশ্যই থাকতে হবে যে, ইসলামের নামে কোনো বিদআত আবিষ্কার হলে, শরীয়তের বিধানের কেউ বিকৃতি ঘটালে যেন বুঝতে পারি। কোনো বিদাআত আবিষ্কৃত হবে, শরীয়তের বিধানের কোথাও বিকৃতি ঘটানো হবে আর একজন মুসলিম তা টেরই পাবে না, এমনটা যেন কোনোভাবেই হতে না পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার তাওফীক দান করুন, যাতে যামানার কোনো ফিতনা বা যুগের কোনো পরিবর্তন আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিন্দু পরিমাণও বিচ্যুত করতে না পারে আমীন।

هٰذَا وَصَلَّى اللهُ تَعَالَى وَبَارَكَ وَسَلَّمَ عَلٰى سَيِّدِنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدٍ وَعَلٰى آلِه وَصَحْبِه أَجْمَعِينَ. وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

 

 

advertisement