আল্লাহর প্রতি বিনীতদের জন্য সুসংবাদ
মাওলানা ইমরান বিন তাজুল ইসলাম
আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের একটি বিশেষ গুণ হল বিনয়াবনত হওয়া, আল্লাহর সম্মুখে নত হওয়া; একে কুরআনের ভাষায় ‘ইখবাত’ বলে। এই গুণটি আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কুরআন কারীমের একাধিক স্থানে তিনি এ গুণের প্রশংসা করেছেন।
এক আয়াতে ইরশাদ করেছেন–
فَاِلٰهُكُمْ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ فَلَهٗۤ اَسْلِمُوْا وَ بَشِّرِ الْمُخْبِتِیْنَ.
তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ। সুতরাং তোমরা তাঁরই আনুগত্য করবে। আর (হে নবী) সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। –সূরা হজ্ব (২২) : ৩৪
এখানে আল্লাহ তাআলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর প্রতি বিনীতদের সুসংবাদ দিতে বলেছেন। কীসের সুসংবাদ? সূরা হুদের একটি আয়াতে তিনি সেই সুসংবাদ ঘোষণা করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে–
اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ اَخْبَتُوْۤا اِلٰی رَبِّهِمْ اُولٰٓىِٕكَ اَصْحٰبُ الْجَنَّةِ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ .
যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে এবং নিজ প্রতিপালকের সামনে বিনীত প্রশান্ত হয়ে গেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা তাতে সর্বদা থাকবে। –সূরা হুদ (১১) : ২৩
অর্থাৎ যারা আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হয়, আল্লাহর সম্মুখে সর্বদা অবনত থাকে, তাদের জন্য সুসংবাদ হল– তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং চিরকাল জান্নাতে থাকবে।
ইখবাত কী, মুখবিত কারা?
উল্লেখিত আয়াতদ্বয়ে দুইটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে– اَخْبَتُوْۤا ও الْمُخْبِتِيْنَ ।
اَخْبَتُوْۤا اِلٰى رَبِّهِمْ অর্থ– تخشعوا له واطمأنوا به তারা আপন রবের প্রতি বিনয়ী ও প্রশান্ত। –বাহিরুল কুরআন, বয়ানুল হক ২/৬৫৭
আর الْمُخْبِتِيْنَ অর্থ– المتواضعين المطمئنين إلى الله আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত, আল্লাহর প্রতি প্রশান্ত। –তাফসীরুল ওয়াসীত, ওয়াহিদী ৩/২৭১
সুতরাং ‘মুখবিত’ হল ওই ব্যক্তি, যে একমাত্র আল্লাহরই হুকুম মান্য করে, তাঁর সম্মুখেই মাথা নত করে, তাঁরই ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে, তাঁরই সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং তাঁর ইবাদত-উপাসনায় হৃদয়ে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে।
মুখবিত-এর গুণবৈশিষ্ট্য
আল্লাহর প্রতি বিনীত ও আত্মনিবেদিতদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা তাদের কিছু গুণাবলি উল্লেখ করেছেন।
ইরশাদ হয়েছে–
وَ بَشِّرِ الْمُخْبِتِیْنَ الَّذِیْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَ جِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَالصّٰبِرِیْنَ عَلٰی مَاۤ اَصَابَهُمْ وَ الْمُقِیْمِی الصَّلٰوةِ وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ .
আর (হে নবী) সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত হয়, যে কোনো বিপদাপদে আক্রান্ত হলে ধৈর্যশীল থাকে এবং যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। –সূরা হজ্ব (২২) : ৩৪-৩৫
এখানে আল্লাহ তাআলা মুখবিতদের চারটি গুণ উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেকটি গুণ আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হওয়া ও আত্মনিবেদনের বড় বড় একেকটি দিক।
এক. তাকওয়া
প্রথম গুণ বলা হয়েছে–
الَّذِیْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ.
যাদের সামনে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত হয়।
তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। তাদের সামনে যখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তাদেরকে যখন আল্লাহর বাণী শোনানো হয়, তখন আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের কথা স্মরণ করে তাদের অন্তর ভীত-কম্পিত হয় এবং তারা অবনত মস্তকে আল্লাহর হুকুম-আহকাম গ্রহণ করে নেয় এবং আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের গুনাহের কাজ ছেড়ে দেয়।
দুই. সবর
দ্বিতীয় গুণ বলা হয়েছে–
وَ الصّٰبِرِیْنَ عَلٰی مَاۤ اَصَابَهُمْ.
যে কোনো মসিবতে আক্রান্ত হলে ধৈর্যশীল থাকে।
তারা বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে। দুঃখ-কষ্ট দেখা দিলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অসন্তোষ প্রকাশ করে না। সর্বাবস্থায় সত্য ও সঠিক পথে অবিচল থাকে, সর্বদা আল্লাহরই আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আল্লাহর সঙ্গেই অন্তর জুড়ে রাখে। কোনো ধরনের প্রলোভনে সত্য-বিচ্যুত হয় না।
তিন. সালাত কায়েম করা
তৃতীয় গুণ বলা হয়েছে–
وَ الْمُقِیْمِی الصَّلٰوةِ.
যারা সালাত কায়েম করে।
সালাত কায়েম করার মানে হল, সালাতের যাবতীয় বিধিবিধান ও আদবের প্রতি মনযোগী হয়ে পূর্ণ খুশু-খুযুর সঙ্গে সর্বদা সময়মতো সালাত আদায় করা।
চার. আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা
আর চতুর্থ গুণ বলা হয়েছে–
وَ مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ یُنْفِقُوْنَ.
আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।
অর্থাৎ তারা নিজেদের সম্পদের হক আদায় করে। আল্লাহর পথে ব্যয় করে, প্রাপ্যদের হক আদায় করে, দুঃস্থ-অভাবীদের জন্য খরচ করে। মোটকথা, আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে ফরয প্রাপ্যও আদায় করে এবং নফল দান-সদকাও করে।
এভাবেই আল্লাহ তাআলা বিনীতদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের গুণাবলির বর্ণনা দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের তা অর্জন করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করা উচিত। সে চেষ্টার একটা দিক হল অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।
নবীজী সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতেন–
رَبِّ اجْعَلْنِيْ لَكَ شَكَّارًا، لَكَ ذَكَّارًا، لَكَ رَهَّابًا، لَكَ مِطْوَاعًا، لَكَ مُخْبِتًا، إلَيْكَ أوَّاهًا مُنِيْبًا.
হে আল্লাহ! আমাকে করুন– আপনার প্রতি সর্বত কৃতজ্ঞ, আপনাকে সর্বদা স্মরণকারী, আপনার ভয়ে ভীত-সস্ত্রস্ত, আপনার প্রতি পূর্ণ অনুগত, প্রশান্তির সাথে আপনার প্রতি বিনয়াবনত এবং আপনার নিকট আহাজারিকারী ও প্রত্যাবর্তনকারী। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৫১: সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৩০
এই দুআটি আমরাও নিজেদের দুআ-মুনাজাতে শামিল করে নিতে পারি। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন।