শাওয়াল ১৪৪৭   ||   এপ্রিল ২০২৬

কুরআনের বার্তা
‖ শাসনভার আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরীক্ষা

মাওলানা আবু হুরায়রা

ক্ষমতার পালাবদল আল্লাহর হুকুমেই হয়। এ মর্মে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা সূরা আ‘রাফে ইরশাদ করেছেন

اِنَّ الْاَرْضَ لِلهِ یُوْرِثُهَا مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِیْنَ  .

বিশ্বাস রাখ, জমিন আল্লাহর। তিনি নিজ বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর শেষ পরিণাম মুত্তাকীদেরই অনুকূলে থাকে। সূরা আ‘রাফ (০৭) : ১২৮

আল্লাহ যখন যাকে চান, কোনো এলাকার শাসন ক্ষমতায় বসিয়ে দেন। যাকে যখন ক্ষমতা দান করেন, এটা তার জন্য পরীক্ষা। কারও ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। আজ যে ক্ষমতাধর, কালকে তার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। আজ যে দুর্বল, আগামীকাল আল্লাহ তাকে শক্তিশালী বানিয়ে দিতে পারেন। যুগে যুগে এটাই আল্লাহর রীতি। তাই যখন যার হাতে আল্লাহ শাসন ক্ষমতা তুলে দেন, তাকে অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, এটা আমার জন্য পরীক্ষা। এটা আমার কাছে আমানত।

আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমতা দিয়ে পরীক্ষা করেন। দেখেন, ক্ষমতা পেয়ে কে তাঁকে ভুলে যায়, স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে আর কে আরও বেশি আল্লাহমুখী হয়।

মূসা আলাইহিস সালাম বনী ইসরাইলকে বলেছিলেন, আল্লাহ তোমাদের দুশমনদের ধ্বংস করে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। এতদিন যে ভূমি তাদের কর্তৃত্বে ছিল, আল্লাহ সেখানে তোমাদের প্রতিষ্ঠা দান করবেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখবেন, ক্ষমতা পেয়ে তোমরা কী কর? তারা ক্ষমতা পেয়ে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল; তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাও কি না। এভাবে তাদের স্থলাভিষিক্ত করে আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেছেন

ثُمَّ جَعَلْنٰكُمْ خَلٰٓىِٕفَ فِی الْاَرْضِ مِنْۢ بَعْدِهِمْ لِنَنْظُرَ كَیْفَ تَعْمَلُوْنَ  .

অতঃপর পৃথিবীতে আমি তোমাদেরকে তাদের পর স্থলাভিষিক্ত করেছি, তোমরা কী রূপ কাজ কর তা দেখার জন্য। সূরা ইউনুস (১০) : ১৪

আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যে একজনের পরিবর্তে আরেকজনকে ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠা দান করেন, এর দ্বারা তিনি দেখতে চান, পরবর্তীজনের কর্মপন্থা কেমন হয়।

উমর রা. এ আয়াত তিলাওয়াত করে বলতেন

 صدق ربنا، ما جعلنا خلائف في الأرض، إلا لينظر إلى أعمالنا، فأروا الله خير أعمالكم، بالليل والنهار، والسر والعلانية.

অর্থাৎ আমাদের রব সত্য বলেছেন। তিনি এজন্যই আমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, যেন তিনি আমাদের আমল দেখতে পারেন। সুতরাং আল্লাহকে তোমাদের সর্বোত্তম আমল দেখাও। দিনে-রাতে গোপনে ও প্রকাশ্যে, সর্বক্ষেত্রে। তাফসীরে তবারী ১৫/৩৯

মুমিন ক্ষমতা পেয়ে আল্লাহকে ভুলে যায় না

সত্যিকার মুমিন বান্দা শাসন ক্ষমতা পেয়ে আল্লাহকে ভুলে যায় না। একে আল্লাহর দান মনে করে। এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করে। ফলে আরও বেশি আল্লাহমুখী হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী অধীনদের দেখভাল ও পরিচালনা করে।

হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম মিশরের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন

 رَبِّ قَدْ اٰتَیْتَنِیْ مِنَ الْمُلْكِ وَ عَلَّمْتَنِیْ مِنْ تَاْوِیْلِ الْاَحَادِیْثِ فَاطِرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ  اَنْتَ وَلِیّٖ فِی الدُّنْیَا وَ الْاٰخِرَةِ  تَوَفَّنِیْ مُسْلِمًا وَّ اَلْحِقْنِیْ بِالصّٰلِحِیْنَ         .

হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে রাজত্বেও অংশ দান করেছেন এবং স্বপ্ন-ব্যাখ্যার জ্ঞান দ্বারাও আমাকে ধন্য করেছেন। হে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর স্রষ্টা! দুনিয়া ও আখেরাতে আপনিই আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে এমন অবস্থায় মৃত্যু দান করেন যে, আমি থাকব আপনারই অনুগত। আর আমাকে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন। সূরা ইউসুফ (১২) : ১০১

কী অপূর্ব ভাষায় তিনি আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ স্বীকার করেছেন! আল্লাহমুখিতার কী অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন! কী বিনয়াবনত হয়েই না প্রার্থনা করেছেন সুন্দর জীবন শেষে এক সুন্দর মৃত্যুর যেন মিলিত হতে পারেন আল্লাহর নেক বান্দাদের সাথে। যে শাসক জীবদ্দশায় কামনা করেন উত্তম মৃত্যু এবং আখেরাতে নেক বান্দাদের সঙ্গ, কতই না উত্তম ছিলেন সেই শাসক!

হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামকে আল্লাহ দান করেছিলেন বিপুল ও বিস্তৃত ক্ষমতা। তাঁর রাজত্ব ছিল মানুষ ও জিন জাতির ওপর। তিনি পশুপাখির ভাষা বুঝতে পারতেন। বাতাসকেও তার অনুকূল করে দেওয়া হয়েছিল। এত ক্ষমতা ও প্রাচুর্য পেয়েও এক মুহূর্তের জন্য তিনি আল্লাহকে ভোলেননি। সকলের  সম্মুখে বলেছেন, এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। তিনি বলেছেন

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّیْرِ وَ اُوْتِیْنَا مِنْ كُلِّ شَیْءٍ ؕ اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِیْنُ .

হে মানুষ! আমাদেরকে পাখিদের বুলি শেখানো হয়েছে এবং সমস্ত (প্রয়োজনীয়) জিনিস আমাদের দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটা (আল্লাহ তাআলার) সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। সূরা নামল (২৭) : ১৬

ক্ষমতা পেয়ে আল্লাহকে ভুলে যায় কাফের

নমরূদ ও ফেরাউন ক্ষমতা পেয়ে আল্লাহকে ভুলে বসেছিল। তারা হয়ে উঠেছিল দাম্ভিক ও অহংকারী। তারা একে আল্লাহর দান বলে স্বীকারই করছিল না; বরং নিজেরাই প্রভু সেজে বসেছিল। নমরূদ দম্ভভরে বলেছিল  أَنَا أُحْيِيْ وَ أُمِيْتُ  আমিই জীবন মৃত্যুর মালিক। দেখ, আমি কীভাবে জীবন ও মৃত্যু দেই।

একথা বলে সে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যার এবং একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দিল। এই তামাশা করে সে প্রভু সেজে বসতে চাইল।

আর ফেরাউনের দম্ভোক্তি ছিল এমন

يَا قَوْمِ أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي أَفَلَا تُبْصِرُونَ .

হে আমার কওম! মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? এবং (দেখ) এইসব নদ-নদী আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে! তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না? সূরা যুখরুফ (৪৩) : ৫১

সে আরও বলেছিল

يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ.

হে পরিষদবর্গ! আমি তো আমার নিজেকে ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো মাবুদ আছে বলে জানি না। আর হে হামান! তুমি আমার জন্য আগুন দিয়ে মাটি জ্বালাও (অর্থাৎ ইট তৈরি কর) এবং আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত তৈরি কর, যাতে আমি তার ওপর উঠে মূসার প্রভুকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, সে (অর্থাৎ মূসা) একজন মিথ্যাবাদী। সূরা কাসাস (২৮) : ৩৮

ক্ষমতা পেয়ে যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করেছে, আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়াতেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। কত ক্ষমতাধর জাতি ও প্রতাপশালী শাসককে অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করে দিয়েছেন, কঠিন শাস্তি দিয়েছেন সেসবের অনেক ঘটনাই আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। সকলের জন্য তাতে শিক্ষার অনেক উপকরণ রয়েছে। আর আখেরাতে তাদের জন্য তো কঠিন শাস্তি রয়েছেই। তারা জাহান্নামেও থাকবে সবার আগে আগে। আল্লাহ বলেন, কিয়ামতের দিন ফেরাউন নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদের সকলকে নিয়ে জাহান্নামে যাবে। [সূরা হুদ (১১) : ৯৮]

দুনিয়াতে তারা সবক্ষেত্রে নেতৃত্বের জন্য লালায়িত থাকত, আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামে রাখবেন সবার আগে আগে। সেদিন তারা হবে অপরাধীদের সরদার! দুনিয়ায় যারা তাদের অধীন ও অনুগত ছিল, তারাই সেদিন আল্লাহর কাছে বলবে, যেন ওইসব নেতা ও শাসকদের শাস্তি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আরও নির্মম শাস্তি দেওয়া হয়। তারা ওই নেতাদেরকে নিজেদের পায়ের নিচে পিষতে চাইবে। এর চাইতে লাঞ্ছনা আর কী হতে পারে!

সকল শাসকের জন্যই ওই আয়াতে বিশেষ শিক্ষা রয়েছে, যেখানে আল্লাহ ফেরাউনের দরবারে এক মুমিন বান্দার উপদেশ বর্ণনা করেছেন। সেই মুমিন বান্দা অহংকারী ফেরাউনের সামনে ঈমানের যে বাণী ও নসীহত পেশ করেছিল, তার এক পর্যায়ে বলেছিল

یٰقَوۡمِ لَکُمُ الۡمُلۡکُ الۡیَوۡمَ ظٰہِرِیۡنَ فِی الۡاَرۡضِ فَمَنۡ یَّنۡصُرُنَا مِنۡۢ بَاۡسِ اللّٰہِ اِنۡ جَآءَنَا.

হে আমার সম্প্রদায়! আজ তো রাজত্ব তোমাদের, দেশে তোমরাই প্রবল। কিন্তু আমাদের ওপর যদি আল্লাহর আযাব এসে পড়ে, তবে এমন কে আছে, যে তাঁর বিপরীতে আমাদের সাহায্য করবে? সূরা মুমিন (৪০) : ২৯

অতএব, শাসকের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। একটি দায়িত্ব ও যিম্মাদারী। আল্লাহ হিসাব নেবেন কে এর হক আদায় করেছে আর কে হক আদায় করেনি। আল্লাহ আমাদেরকে এ নিআমতের কদর করার বোধ ও অনুভূতি দান করুন।

 

 

advertisement