রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

রমযান মাসে কুরআন কারীমই হোক তালিবুল ইলমের প্রধান ব্যস্ততা

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

রমযান মাস হল কুরআন নাযিলের মাস। রমযান মাসের সঙ্গে কুরআন মাজীদের গভীর সম্পর্ক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

شَہۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡہِ الۡقُرۡاٰنُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡہُدٰی وَالۡفُرۡقَانِ فَمَنۡ شَہِدَ مِنۡکُمُ الشَّہۡرَ فَلۡیَصُمۡہُ وَمَنۡ کَانَ مَرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ  یُرِیۡدُ اللّٰہُ بِکُمُ الۡیُسۡرٰوَلَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ  وَلِتُکۡمِلُوا الۡعِدَّۃَ وَلِتُکَبِّرُوا اللّٰہَ عَلٰی مَا ہَدٰىکُمۡ وَلَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ.

অর্থাৎ রমযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হেদায়েত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়। সূরা বাকারা (০২) : ১৮৫

তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ এবং পরবর্তীতে তাবেয়ীন ও সালাফে সালেহীন সকলেরই জীবনে লক্ষ করলে দেখা যায়, তাঁরা অন্য সময়ের তুলনায় রমযান মাসে কুরআন মাজীদের প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ বাড়িয়ে দিতেন।

হাদীস শরীফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلّى الله عَلَيه وسَلّم أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ القُرْآنَ؛ فَإِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلّى الله عَلَيه وسَلّم حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ أَجْوَدُ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ.

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে দানশীল। রমযানে তাঁর দানশীলতা আরো বেড়ে যেত যখন জিবরীল তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। জিবরীল প্রতি রাতেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং পরস্পরে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা বেগবান বাতাসের চেয়েও গতিশীল হত। সহীহ বুখারী, হাদীস ০৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সম্পর্কে স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমান বলেন

كان عبد الله بن مسعود يقرأ القرآن في غير رمضان من الجمعة إلى الجمعة.

তিনি আরও বলেন

أنه كان يقرأ القرآن في رمضان في ثلاث.

অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বছরের অন্যান্য মাসে সাত দিনে এক খতম করতেন। আর রমযান মাসে প্রতি তিন দিনে খতম করতেন। ফাযাইলুল কুরআন, আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম, পৃ. ১৭৭, ১৮০

সালাফের জীবনেও দেখা যায় তাঁরা রমযানে কুরআন মাজীদের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতেন।

ইমাম মালেক রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি রমযান মাসে হাদীসের দরস ও আহলে ইলমদের মজলিস থেকে বিরতি নিতেন এবং মুসহাফ দেখে কুরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন। লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ৪০০

ইমাম সুফিয়ান সাওরী রাহ. রমযানে সকল (নফল) ইবাদত স্থগিত করে কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হতেন। লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ৪০০

তাই তালিবুল ইলম ভাইদের কর্তব্য, রমযান মাসে কুরআন মাজীদকেই প্রধান ব্যস্ততার বিষয় বানানো। অন্য ব্যস্ততার কারণে যেন কুরআন মাজীদের গুরুত্ব কমে না যায়। কেউ যদি কুরআনকে একমাত্র ব্যস্ততার বিষয় বানাতে পারে, তাহলে তো আরো ভালো। খুব খেয়াল রাখতে হবে, যাতে রমযানের সময়গুলো অপ্রয়োজনীয় কাজ তো দূরের কথা, কম প্রয়োজনীয় কাজেও ব্যয় না হয়।

সালাফে সালেহীন যেখানে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য অন্যান্য নফল ইবাদত স্থগিত রাখতেন, সেখানে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কাজে এই মূল্যবান সময় নষ্ট করা খুবই দুঃখজনক।

মাহে রমযানে তালিবুল ইলমগণ কী কী উপায়ে কুরআন মাজীদে ব্যস্ত থাকবেন

প্রথমত : অন্য সময়ের তুলনায় কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দেওয়া।

দ্বিতীয়ত : যারা আংশিক বা পূর্ণ কুরআন হিফযের নিআমত লাভ করেছেন, তারা হিফযের ইয়াদ আরো পাকা করবেন।

তৃতীয়ত : গায়রে হাফেযগণ এবং যারা পূর্ণ কুরআন হিফয করতে পারেননি, তারা এই মাসের একটি অংশ হিফযে ব্যয় করবেন।

চতুর্থত : কুরআন মাজীদের তরজমা ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর মুতালাআ করা।

পঞ্চমত : কুরআন মাজীদ তাযাক্কুর ও তাদাব্বুরের সাথে তিলাওয়াত করা।

অর্থাৎ কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, একাগ্রতা ও খোদাভীতির সাথে তিলাওয়াত করা। তাদাব্বুর মানে শুধু তরজমা ও তাফসীর পড়া নয়; বরং কুরআনের হেদায়েত ও কুরআন আমাদের কাছে কী চায় তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নোমানী রাহ.-এর কিতাব قرآن آپ سے کیا کہتا ہے؟ মুতালাআ করলে ফায়েদা হবে ইনশাআল্লাহ। তাদাব্বুরের সময় কুরআন মাজীদের তরজমা ও একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীরগ্রন্থ সামনে রাখা উচিত। যেমন তাফসীরে উসমানী, মাআরিফুল কুরআন, তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন বা তাফসীরে হেদায়াতুল কুরআন।

তাদাব্বুর ও তাযাক্কুর হল তিলাওয়াতের রূহ। যেমন খুশু-খুযূ নামাযের রূহ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ.

অর্থাৎ এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা ছদ (৩৮) : ২৯

ইবনে আতিয়্যা রাহ. বলেন

وظاهر هذه الآية يعطي أن التدبر من أسباب إنزال القرآن.(المحرر الوجيز ٥٠٣/٤)

সারা বছরই তাদাব্বুর ও তাযাক্কুর-এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া কর্তব্য। আর রমযানে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কুরআন মাজীদ তাদাব্বুরের সাথে তিলাওয়াতে অভ্যস্ত হওয়ার একটি সহজ উপায় হল, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কুরআনের উলূম ও মাআরিফ খাতায় নোট করার অভ্যাস গড়ে তোলা। এতে ধীরে ধীরে কুরআনের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বাড়ে এবং কোনো একটি বিষয়ে কুরআনের সামগ্রিক বার্তার একটি চিত্র সামনে আসে। যা একজন তালিবে ইলমের ইলমকে সমৃদ্ধ করে এবং ইলমে বরকত লাভের কারণ হয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ. বলেন, আমি এক দিনে কুরআন খতম করলাম এবং গুনে দেখলাম, কুরআনে নব্বইয়ের অধিক জায়গায় সবরের আলোচনা আছে। মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, ইবনুল জাওযী, পৃ. ৩৮৪

কুরআন হল সমস্ত ইলমের উৎস। তাই একজন তালিবুল ইলমকে অবশ্যই কুরআনের সঙ্গে গভীর মুনাসাবাত পয়দা করতে হবে। কুরআনের মূল পয়গাম, উলূম ও মাআরেফ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কুরআনের আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। রমযান মাস হল তা অর্জন ও অনুশীলনের সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই সুযোগ গ্রহণ করার তাওফীক দান করুন আমীন।

 

 

advertisement