সবচে ধ্বংসাত্মক নেশা
হামেদ মীর
যেকোনো ধরনের নেশাই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর নেশা হল ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের নেশা। ক্ষমতার নেশায় ডুবে থাকা মানুষ শুধু অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যও বিপদে পরিণত হয়। এই নেশা অধিকাংশ মানুষকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। আপনি নিশ্চয়ই এমন অনেক মানুষকে চেনেন, যারা ক্ষমতা পাওয়ার আগে খুব বিনয়ী ছিল। বারবার বলত, আমি তো আপনাদের সেবক। কিন্তু ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হাতে পাওয়ার পরই তারা ফেরাউনের মতো আচরণ শুরু করে। ক্ষমতার নেশা প্রথমেই মানুষের দৃষ্টিশক্তির ওপর আক্রমণ করে। ক্ষমতাবান ব্যক্তি নিজের বাইরে না কিছু দেখতে পায় আর না কিছু বোঝে। সে দেশ ও জাতির স্বার্থকেও নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখে।
কিছু ক্ষমতাবান তো নিজেদেরকে আল্লাহর নির্বাচিত বলে দাবি করে। তারা বলে, আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ উদ্দেশ্যে ক্ষমতা দিয়েছেন এবং সেই উদ্দেশ্য যেকোনো মূল্যে লাভ করতে হবে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ বলে ঘোষণা করে এবং সেই স্বার্থ হাসিলের জন্য নৈতিকতা ও সভ্যতার সব সীমা অতিক্রম করাকে জায়েয মনে করে। ক্ষমতার নেশায় নিমজ্জমান ব্যক্তিরা ভুলে যায়, ক্ষমতা আসলে আল্লাহর দেওয়া কোনো নিআমত নয়, বরং আমানত। আমানত তো মানুষকে পরীক্ষার মুখোমুখি করে।
ক্ষমতার নেশায় নিমজ্জিত ব্যক্তিরা প্রায়ই চাটুকারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। চাটুকাররা প্রত্যেক ক্ষমতাবানকে এটাই বোঝায়, আল্লাহ তাদের মাধ্যমে বড় কোনো কাজ করাতে চান। আপনি সমালোচকদের কোনো পাত্তাই দেবেন না। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের নেশায় ডুবে থাকা ব্যক্তির কাছে সমালোচনাও অনেক খারাপ লাগে। মতবিরোধকে তারা বিশ্বাসঘাতকতা মনে করতে থাকে এবং ভিন্নমত দমনের জন্য নিত্য নতুন আইন তৈরি করে। গণতন্ত্র ধীরে ধীরে একনায়কতন্ত্রে রূপ নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সমাজে চরমপন্থা জন্ম নেয় এবং বিভাজন বাড়তে থাকে।
এ শাসন পদ্ধতি ভণ্ডামিরও প্রসার ঘটায়। মানুষ ক্ষমতার নেশায় মত্ত ব্যক্তিদের সামনে প্রশংসা করে, কিন্তু আড়ালে তাকে গালমন্দ করে। এরপর ক্ষমতার নেশা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ছোটখাটো অফিসের বাইরে বসা একজন দারোয়ানও ভেতরে স্লিপ পৌঁছে দেওয়ার সামান্য ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে। ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল, থানার ইনচার্জ, আদালতের বিচারক এবং তার কর্মচারিও নিজ নিজ ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে থাকে। সব ক্ষমতাবানরা এটা ভুলে যায়, ক্ষমতা আসলে একটি অস্থায়ী দায়িত্ব, কিন্তু সেটিকে তারা নিজেদের ক্ষমতার স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করে।
এই নেশায় আক্রান্ত নারী-পুরুষেরা শুধু অন্যের দোষই দেখতে পায়, নিজের দোষ তাদের চোখে পড়ে না। অধীনরা তাদেরকে শুধু সে কথাই বলে, যা তাদের ভালো লাগে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তখন উপরস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার রক্ষাকেই সরকারি নীতি বানিয়ে ফেলে। এর ফল বেইনসাফি, জুলুম ও নিপীড়নের আকারে প্রকাশ পায়।
আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি ক্ষমতার নেশার ক্ষতি নিয়ে বলছি, কিন্তু ক্ষমতার নেশায় মত্ত কারও নাম কেন নিচ্ছি না? আপনি হয়তো এ-ও ভাবছেন, আজকাল সাংবাদিকরা ক্ষমতাবানদের দাসে পরিণত হয়েছে। তাই কলাম লেখক আর কার কী নাম নেবে? সাংবাদিকতার এই দুর্বলতার কারণে কিছু মানুষ পত্রিকা ও টেলিভিশন ছেড়ে ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও নাম বলে দেওয়া সহজ। তাই অনেক সাংবাদিক পত্রিকা, টিভি ছেড়ে ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজের সত্য বলার শখ পূর্ণ করছে। কিন্তু আমি যে ক্ষমতাবানের কথা বলছি, সে তো সামাজিক মাধ্যমও নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও যদি নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়, তখন কী হবে?
এই ব্যক্তি স্বাধীন গণমাধ্যমকে ঘৃণা করে। সে পত্রিকা ও টেলিভিশনের নাম নিয়ে তাদেরকে গালমন্দ করে। ক্ষমতার নেশায় ডুবে থাকা এই ব্যক্তি শুধু স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নয়, বিশ্বশান্তির জন্যও হুমকি। সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে চায়, অথচ তার প্রতিটি কাজ শান্তির জন্য বিপদ তৈরি করে। এখনো যদি আপনার বুঝে না আসে, তাহলে সব আশঙ্কা মাথায় নিয়ে তার নামও লিখে দিচ্ছি। তিনি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি কেবলই চাটুকারপ্রিয় এবং আত্মকেন্দ্রিকও।
ক্ষমতার নেশায় নিমজ্জিত অন্য সবার মতো ট্রাম্পের রাগও বড় সমঝদার। আপনি হয়তো ভাবছেন, রাগ তো রাগই। রাগ আবার সমঝদার হয় কী করে? ক্ষমতাবানদের রাগ আসলেই সমঝদার হয়ে থাকে। এ রাগ কেবল দুর্বলদের ওপরই বর্ষিত হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাগ ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর তো বর্ষিত হয়, কিন্তু চীন ও রাশিয়ার ওপর বর্ষিত হওয়ার সাহস পায় না। এ রাগ থেকে জন্ম নেওয়া বেইনসাফীর বিরুদ্ধে কোনো দুর্বলর চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করলে এবং বিক্ষোভ করলে, তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়।
আজকাল ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্পের আচরণ সবার সামনে। ট্রাম্প সাহেবের মতে, ইসরাইল পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত দেশ আর ইরান সবচেয়ে অত্যাচারী দেশ। ট্রাম্প আগেও ইসরাইলের সাথে মিলে ইরানের ওপর হামলা করেছিল এবং আবার আরেক দফা হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলায় হামলার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই তেলের ভান্ডার দখল করা, ইরানের ওপর হামলারও একই উদ্দেশ্য...!
ট্রাম্পের মতো মানুষেরা প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের জন্য সন্ত্রাসবিরোধী বয়ান তৈরি করে এবং বিশ্বশান্তির জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমাগত বাড়তে থাকা নিরাপত্তার হুমকির কারণে সৌদি আরবও এখন ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে অস্বীকার করেছে। পৃথিবীর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা আছে, ইরানে হামলার বিরোধীতাকারী ‘বন্ধু দেশগুলো’কেও শিগগিরই হুমকি দেওয়া শুরু হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো বন্ধুদের হারাতে পারে।
আমি কলামের শুরুতে বলেছিলাম, ক্ষমতার নেশায় ডুবে থাকা ব্যক্তি শুধু অন্যদের জন্য নয়, নিজের জন্যও বিপদে পরিণত হয়। ট্রাম্প এখন নিজ দেশের জন্যও বিপদে পরিণত হয়েছে। কারণ তাঁর এজেন্ডা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করা। ইতিহাস বলে, প্রতিটি ছোট-বড় ট্রাম্প নিজের স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজ জাতির অপূরণীয় ক্ষতি করে।
দুআ করুন, আল্লাহ তাআলা যেন এই পৃথিবীকে ক্ষমতার নেশায় ডুবে থাকা সব ছোট-বড় ট্রাম্পের ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখেন।
[দৈনিক জঙ্গ (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) থেকে
অনুবাদ : ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল]