মাহে রমযান
‖ রোযাদারের জন্য বরকত ও আনন্দের দুটি মুহূর্ত
মাহে রমযান। আমল ও ইবাদতের ভরা বসন্ত। ঋতু বসন্তে যেমন পুরো প্রকৃতিজুড়ে স্নিগ্ধ সজীবতা ছড়িয়ে পড়ে, শুকনো জীর্ণ পত্র-পল্লবহীন গাছগাছালিতেও নতুন নতুন পাতা গজায়, বনাঞ্চল-পল্লি থেকে বহু দূরের কংক্রিটময় শহরেও টবের গাছে উঁকি দেয় নতুন কিশলয়। তেমনি রমযানে পুরো প্রকৃতিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রহমত ও কল্যাণের স্নিগ্ধ ধারা। প্রতিটি হৃদয়ে জেগে ওঠে ইবাদত ও আল্লাহমুখিতার অসীম আবেগ। দ্বীনবিমুখ জনমানবের শক্ত হৃদয়েও দোলা লাগে এ আবহের। জেগে ওঠে তার সুপ্ত ঈমানী চেতনা, লুপ্তপ্রায় হৃদয়-সঞ্জীবনী।
বছরে একবার আসে মাহে রমযান। তাতে যেমন থাকে তাকওয়া অর্জনের সুযোগ, তেমনি থাকে অফুরান নিআমত, রহমত ও বরকত। থাকে ইবাদত ও আমলের মুগ্ধকর নানা আয়োজন। তারাবীর দীর্ঘ নামায, ভোররাতের সাহরী, তাহাজ্জুদ, অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত, গুরুত্বের সাথে তাসবীহ ও দরূদ পাঠ, ব্যাপক দান ও সদকা, সারাদিনের রোযা শেষে ইফতার, শেষ দশকের ইতিকাফ ও লাইলাতুল কদরের ইবাদত।
রমযানের প্রতিটি আমলেই থাকে অন্যরকম ভালোলাগা। থাকে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। থাকে সওয়াব ও প্রতিদান এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের তীব্র আকর্ষণ।
রমযানের সাহরী
রমযানের বিশেষ দুটি আমল রয়েছে, যা মানবীয় চাহিদা-সংশ্লিষ্ট হওয়ায় অনেকের কাছে নেক আমল হিসেবে উপলব্ধ হয় না। তন্মধ্যে একটি হল সাহরী, অপরটি ইফতার।
রমযানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ আমল এ দুটি।
হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
تَسَحَّرُوا، فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً.
তোমরা সাহরী খাও। কেননা সাহরীতে বরকত রয়েছে। –সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৯৫
সাধারণত মানুষ কোনো জিনিসের আধিক্য, বৃদ্ধি বা উন্নতি বিবেচনা করে পরিমাণের বিচারে। অর্থাৎ সংখ্যা বা পরিমাণে বেশি হলে বেশি, কম হলে কম। দৃশ্যত অধিক হলে উন্নতি, তা না হলে উন্নতি নয়।
কিন্তু বরকত হল এমন বিষয়, যা প্রয়োজন পূরণ, কার্যকারিতা ও প্রকৃত উপকার সাধনকে বুঝিয়ে থাকে। অর্থাৎ পরিমাণে কম হয়েও প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, যথাযথ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে এবং প্রকৃত অর্থে উপকার দান করতে পারে– এমন বিষয়কে বলা হয় বরকত।
সাহরীর ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তাতে বরকত রয়েছে। আর বরকত প্রতিটি মানুষের জীবনেই আবশ্যকীয় একটি প্রয়োজন। তাই সাহরীর মাধ্যমে তা লাভ করার বিষয়ে উৎসাহিত করেছেন। ইরশাদ করেছেন–
تَسَحَّرُوا وَلَوْ بِجُرْعَةٍ مِنْ مَاءٍ.
তোমরা সাহরী খাও। যদিও তা এক ঢোক পানি পান করে হোক না কেন। –সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৪৭৬
তিনি আরও বলেছেন–
السَّحُورُ أَكْلُه بَرَكَةٌ، فَلَا تَدَعُوهُ وَلَوْ أَنْ يَجْرَعَ أَحَدُكُمْ جُرْعَةً مِنْ مَاءٍ، فَإِنَّ اللهَ عز وجل وَمَلَائِكَتَه يُصَلُّونَ عَلَى الْمُتَسَحِّرِينَ.
সাহরী খাওয়ায় বরকত রয়েছে। তাই তোমরা তা ছেড়ো না, যদিও তা এক ঢোক পানি পান করে হোক না কেন। কেননা যারা সাহরী খায়, আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য রহমতের দুআ করতে থাকেন। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১০৮৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৪৬৭
এ হাদীসগুলো থেকে সাহরীর গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝে আসে।
শেষ রাতে, সমস্ত চরাচরকে ঘুমে রেখে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহান একটি হুকুম পালনের প্রস্তুতি হিসেবে বরকতময় দস্তরখানে শরীক হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের ভেতরে পানাহার সমাপ্ত করার তড়িৎ আয়োজনে নিজেকে ব্যস্ত রাখার পুলকময় মুহূর্তটুকু বাস্তবিক পক্ষেই বর্ণনাতীত।
সাহরীকে আল্লাহ তাআলা আবশ্যক করেননি। যেন শেষ রাতের এই নিদ্রাঘন মুহূর্তে ঘুম না ভাঙলে কারও কষ্টে পড়তে না হয়। যেন স্বাভাবিকভাবেই তার রোযা হয়ে যায়। তবে সাহরীর বরকত ও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন। জানিয়েছেন, এর মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ রহমত এবং ফিরিশতাদের বিশেষ দুআ লাভ করা যায়।
সাহরীর পবিত্র মুহূর্তে
সাহরী খেতে হয় সুবহে সাদিকের আগে। যে সময়টা ‘তাহাজ্জুদের সময়’ হিসেবে পরিচিত। সারা বছর আল্লাহর নেক বান্দাগণ এসময় ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং সর্বোচ্চ ফযীলতের নফল নামায ‘তাহাজ্জুদ’ আদায়ে মগ্ন হন। দীর্ঘ সময় দুআ-মুনাজাত ও রোনাযারিতে অতিবাহিত করেন।
কিন্তু সাধারণ মুমিনদের অনেকেই নিয়মিত এ নামায আদায় করতে পারেন না, অনেকটা অলসতা এবং কিছুটা ক্লান্তি ও অপর্যাপ্ত ঘুমের অজুহাত থাকে তাদের।
তবে রমযান মাসে এ সময় আমলদার ও সাধারণ সকল মুমিন-মুসলমান জেগে ওঠেন এবং বরকতময় সাহরীতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ইচ্ছা করলেই তারা দুই-চার রাকাত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে পারেন। কিছু সময় কাটাতে পারেন জায়নামাযে। প্রেম-আকুল দুআ মুনাজাতে।
কুরআন মাজীদে মুত্তাকীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে–
كَانُوْا قَلِیْلًا مِّنَ الَّیْلِ مَا یَهْجَعُوْنَ، وَبِالْاَسْحَارِ هُمْ یَسْتَغْفِرُوْنَ.
তারা রাতে খুব কম ঘুমায়। সাহরীর সময় ইস্তিগফার করে। –সূরা যারিয়াত (৫১) : ১৫-১৮
তাকওয়া অর্জনের এ মাসে রোযাদারমাত্রই গুরুত্বপূর্ণ এ আমলে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
এ মাসে রোযার মাধ্যমে যেমন তাকওয়ার অনুশীলন হয়, তেমনি সাহরীর মাধ্যমে লাভ হয় অসীম বরকত। সেইসঙ্গে মুত্তাকীদের গুরুত্বপূর্ণ আমল তাহাজ্জুদ; তাতেও অভ্যস্ত হওয়ার জন্য থাকে অবারিত সুযোগ। যে নামায সম্পর্কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللَّيْلِ.
ফরয নামাযের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামায হল রাতের (তাহাজ্জুদের) নামায। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩
ঘুমভাঙা সাহরীর অবারিত এ সুযোগে প্রভাময় হয়ে উঠুক প্রতিটি মুমিনপ্রাণ। সাহরীর বরকতে বরকতময় হোক সবার জীবন। তাহাজ্জুদের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকস্নাত হোক পুরো চরাচর। তাকওয়ার দৌলত লাভ করুক মুমিনকুল। রমযানের সুবহে সাদিক সবার জীবনে বয়ে আনুক স্থায়ী কল্যাণ ও অফুরান বরকতের ফল্গুধারা।
রমযানের বিশেষ আমল ইফতার
আল্লাহর হুকুম পালন ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সারাদিন রোযা রাখার পর ইফতারের মুহূর্তটি সত্যিই তুলনাহীন।
হাদীস শরীফে এসেছে–
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِه، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّه.
রোযাদারের জন্য দুটি বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। একটি হল ইফতারের সময়। অপরটি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫১
শুধু তাই নয়। এ সময় আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেন এবং তার দুআ কবুল করেন।
হাদীস শরীফে এসেছে–
ثَلاَثَةٌ لاَ تُرَدّ دَعْوَتُهُمْ: الصّائِمُ حَتّى يُفْطِرَ، وَالإِمَامُ العَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللهُ فَوْقَ الغَمَامِ وَيَفْتَحُ لَهَا أَبْوَابَ السّمَاءِ وَيَقُولُ الرّبّ: وَعِزّتِي لأَنْصُرَنّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ.
তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না :
এক. ইফতার পর্যন্ত রোযাদারের দুআ।
দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ।
তিন. মজলুমের দুআ। আল্লাহ তাআলা এ দুআকে মেঘমালার উপরে নিয়ে যান। এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন। রব বলেন, আমার ইযযতের কসম! বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৯৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৫২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯৭৪৩
আরেক হাদীসে এসেছে–
إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِه لَدَعْوَةً مَا تُرَدُّ.
ইফতারের সময় রোযাদারের অন্তত একটি দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (অর্থাৎ কমপক্ষে একটি দুআ অবশ্যই কবুল করা হয়।) –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৫৩; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১৪৩৪৩
সারাদিনের রোযা শেষে ইফতারের দস্তরখানে অপেক্ষা করা, দুআ কবুলের গুরুত্বপূর্ণ সে মুহূর্তে দুআমগ্ন হওয়া, এরপর ওয়াক্ত হওয়ামাত্রই পানির পেয়ালায় তৃপ্তির চুমুক দেওয়া, রোযার মতো মহান একটি ইবাদত পালনের অলৌকিক আনন্দ উপলব্ধি করা– সে বিবরণ তুলে ধরা সত্যিই অসম্ভব।
এ মুহূর্তটির তাৎপর্য কতটুকু তা অনুমান করা যায় একটি হাদীস থেকে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
إِنَّ لِلهِ عز وجل عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وَذلِكَ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ.
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির ফয়সালা করেন এবং এটা রমযানের প্রতি রাতেই ঘটে থাকে। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৬৪৩; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৮০৮৯
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, ইফতারের মুহূর্তটি বান্দার জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ! এ সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে কত বড় মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন! কত বড় প্রাপ্তির জন্য কবুল করেন! রোযাদারের ওসিলায় না জানি আরও কত মানুষকে এ সময় মুক্তি দান করেন!
ইফতারের সময়ের কিছু করণীয়
ইফতারের সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিবেচনায় প্রত্যেক রোযাদারের উচিত এ সময় আল্লাহমুখী হওয়া। আল্লাহপ্রদত্ত মর্যাদা, আনন্দ ও প্রতিদান লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। দুআ-মুনাজাতে মগ্ন হওয়া। পরিবারের সদস্যদেরকেও এ দুআয় শরীক হতে উৎসাহিত করা এবং তাদের কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি এ সময় এভাবে দুআ করতেন–
اللّهُمّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الّتِي وَسِعَتْ كُلّ شَيْءٍ أَنْ تَغْفِرَ لِي.
হে আল্লাহ! আমি আপনার সর্বব্যাপী রহমতের ওসিলায় প্রার্থনা করছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৫৩
তাছাড়া যেহেতু এ সময় মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে, তাই নিজের জন্য, নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠজন এবং সকল মুমিন-মুসলমানের জন্য মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির দুআ করা যায়। এমনিভাবে যে কোনো চাওয়া ও প্রার্থনা আল্লাহ তাআলার কাছে পেশ করা যায় এবং সেই চাওয়া পূরণ হওয়ার দৃঢ় আশা করা যায়।
ইফতারের আমলে নিজে শরীক হওয়ার পাশাপাশি অন্যকে শরীক করার ব্যাপারেও উৎসাহিত করা হয়েছে হাদীসে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–
مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِه، غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا.
যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোযাদারের সমান সওয়াব পাবে। তবে রোযাদারের সওয়াবে কোনো কম করা হবে না। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৮০৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৪৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭০৪৪, ২১৬৭৬
তাই নিজের জন্য যেমন, তেমনি পড়শি, আত্মীয়, পরিচিত-অপরিচিত যে কারও জন্য সাধ্যমতো ইফতারের ব্যবস্থা করা উচিত। অন্যকে ইফতার করানোর এই সৌভাগ্যপূর্ণ আমলে অবশ্যই অংশগ্রহণ করা উচিত। কাউকে ইফতার সামগ্রী কিনে দেওয়া কিংবা নগদ অর্থ দেওয়া অথবা নিজ ঘরে প্রস্তুতকৃত ইফতারেই শরীক করা যায়।
আমাদের সমাজে ইফতার করানো এবং ইফতারী হাদিয়া দেওয়ার উদ্যোগ-আয়োজন কিছু পরিমাণে হলেও আছে। কিন্তু সাহরী করানো বা সাহরী-সামগ্রী হাদিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আসলে সাহরীর সময়টা এমন, যখন কাউকে দাওয়াত করে আনা মুশকিল। একেবারে নিকট পড়শি ছাড়া কারও ঘরে খাবার পৌঁছানোও খুব সহজ নয়। তাই সাধ্যমতো অন্যকে সাহরী সামগ্রী হাদিয়া দেওয়ারও চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে যেসব পরিবার প্রকৃত অর্থেই প্রয়োজনগ্রস্ত, যাদের ঘরে তৃপ্তির সাথে সাহরী গ্রহণের ব্যবস্থা নেই, তাদেরকে অর্থ বা সাহরী সামগ্রী পৌঁছানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
ইফতারের দুআ
হাদীস শরীফে এসেছে ইফতারের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত দুআটি পড়তেন–
اللّهُمّ لَكَ صُمْتُ، وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ.
হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই রোযা রেখেছি এবং আপনার রিযিক দিয়েই ইফতার করছি। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩৫৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৯৭৪৪
অত্যন্ত সরল এ দুআয় রোযার উদ্দেশ্যের কথা যেভাবে স্মরণ করা হয়েছে, তেমনি প্রকাশ করা হয়েছে আল্লাহর নিআমতের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। খুব সংক্ষিপ্ত একটি দুআ। যে কারও পক্ষে মুখস্থ করে নেওয়া সহজ। আমাদের উচিত, ইফতারের সময় উপলব্ধির সাথে এ দুআ পড়া।
ইফতার গ্রহণ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন–
ذَهَبَ الظّمَأُ وَابْتَلّتِ الْعُرُوقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللهُ.
পিপাসা নিবারিত হয়েছে। শিরা-উপশিরা সতেজ হয়েছে। আর প্রতিদানও সাব্যস্ত হয়েছে ইনশাআল্লাহ। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩৫৭; সুনানে কুবরা, নাসায়ী, হাদীস ৩৩১৫
এ দুআটিতেও কী সরল স্বীকারোক্তি এবং আশার বাণী ফুটে উঠেছে। পিপাসা নিবারণ, শিরা-উপশিরার সতেজতা, তৃপ্তি বোধ ও প্রতিদানের আশার কথা একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এটি যে কারও হৃদয় স্পর্শ করার মতো একটি দুআ। নিশ্চয় তা আল্লাহ তাআলার কাছেও খুব পছন্দের।
তাই খুব যত্নের সাথে, গুরুত্ব দিয়ে দুআটি পড়া উচিত। ক্ষুধার মুহূর্তে সুস্বাদু বাহারী আয়োজনেও যেন এ দুআ পড়তে ভুলে না যাই, সেই চেষ্টা করা উচিত।
অনেক সময় দেখা যায়, ইফতারের ব্যস্ততায় মাগরিবের আযানের জবাব দেওয়া হয় না। অথচ আযানের জবাব দেওয়ার ফযীলত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ লাভ হবে। (দ্র. সহীহ বুখারী, ৪৭১৯)
তাই সামান্য একটু কষ্ট হলেও ইফতার গ্রহণের সাথে সাথে মাগরিবের আযানের জবাব দেওয়া উচিত।
রমযানের সকল ফযীলত, কল্যাণ, বরকত ও সৌভাগ্য আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নসীব করুন। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রমযানের সকল আমল সর্বোত্তমভাবে আঞ্জাম দেওয়ার তাওফীক দান করুন– আমীন।