রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

রোযাদারকে ইফতার করানো
‖ সালাফের মহান ঐতিহ্য এবং রবের সন্তুষ্টি লাভের অনন্য মাধ্যম

মাওলানা শাহাদাত সাকিব

রমযান এক মহিমান্বিত মাস। পবিত্র এ মাসে একজন মুমিন শুধু নিজের আত্মশুদ্ধির চেষ্টাই করে না; অন্যের সেবার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথও খুঁজে নেয়।

রমযানের একটি মহৎ নেক আমল হল অন্যকে ইফতার করানো। এটি কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়; এটি ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ ও পরোপকারের এক অনন্য নিদর্শন। সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ।

সারাদিন না খেয়ে থাকার পর সূর্যাস্তের সময় রোযাদার যখন ইফতার করেন, তার মনে এক বিশেষ আনন্দ ও প্রশান্তি কাজ করে। এই আনন্দ একা উদ্যাপন করার চেয়ে কাউকে নিয়ে উপভোগ করার মধ্যে রয়েছে এক অভাবনীয় আনন্দ ও সওয়াব। বিশেষ করে ক্ষুধার্ত, অভাবী ও অসহায় মানুষদের ইফতার করানোর মাধ্যমে সহমর্মিতা ও সমবেদনার ফুল ফুটে ওঠে। যা ধনী-গরিবের মাঝে এক বন্ধন তৈরি করে, সমাজের সকল মানুষের মধ্যে ভালবাসা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে।

ইফতার করানোর সবচেয়ে বড় ফযীলত হল, যে ব্যক্তি ইফতার করাবে, সে রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।

যায়েদ ইবনে খালেদ জুহানী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَه مِثْلُ أَجْرِه، غَيْرَ أَنَّه لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا.

যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোযাদারের সমান সওয়াব পাবে। তবে এতে রোযাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কমবে না। জামে তিরমিযী, হাদীস ৮০৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৪৬

ইসলামের ইতিহাসে রমযান মানেই ছিল হৃদয় উন্মুক্ত করার মৌসুম। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের গৃহ, আমির-উমারা ও মন্ত্রীদের প্রাসাদ সবকিছুই যেন একে একে রূপ নিত দয়ার দস্তরখানে। রমযান মাসে রোযাদারকে ইফতার করানোর জন্য শহরের অলিগলি, শিক্ষাকেন্দ্র, খানকা, এমনকি পথের পাশে পাশে সবখানেই থাকত ভিন্ন আয়োজন।

খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইফতার

খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে রোযাদারের ইফতার ও ভরণপোষণের বিষয়টি দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়; অধিকার হিসেবে বিবেচিত হত। উমর রা. ও উসমান রা.-এর যুগে রমযানকালীন সমাজকল্যাণ সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।

উমর রা. ও উসমান রা.-এর উদ্যোগ

রমযান মাস এলে উমর রা. বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতেন।

আল্লামা তাবারী রাহ. বলেন

وَكَانَ عُمَرُ يَجْعَلُ لِكُلِّ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ مِنْ أَهْلِ الْفَيْءِ فِي رَمَضَانَ دِرْهَمًا فِي كُلِّ يَوْمٍ، وَفَرَضَ لِأَزْوَاجِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دِرْهَمَيْنِ دِرْهَمَيْنِ، فَقِيلَ لَه:

لَوْ صَنَعْتَ لَهُمْ طَعَامًا فَجَمَعْتَهُمْ عَلَيْهِ! فَقَالَ: أُشْبِعُ النَّاسَ فِي بيوتهم،فأقر عُثْمَانُ الَّذِي كَانَ صَنَعَ عُمَرُ، وَزَادَ فَوَضَعَ طَعَامَ رَمَضَانَ، فَقَالَ: لِلْمُتَعَبِّدِ الَّذِي يَتَخَلَّفُ فِي الْمَسْجِدِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَالْمُعْتَرِّينَ بِالنَّاسِ فِي رَمَضَانَ.

উমর রা. রমযান মাসে বায়তুল মাল থেকে রাষ্ট্রীয় ভাতাপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এক দিরহাম করে বরাদ্দ দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের জন্য প্রতিদিন দুই দিরহাম করে নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁকে বলা হল, আপনি চাইলে তাদের জন্য একসাথে খাবারের ব্যবস্থা করে সবাইকে এক দস্তরখানে বসাতে পারতেন।

উমর রা. উত্তরে বললেন, আমি চাই মানুষ তাদের নিজেদের ঘরেই তৃপ্তিভরে খেতে পারুক।

উমর রা.-এর এই ব্যবস্থা উসমান রা.-ও বহাল রেখেছেন। এছাড়াও তিনি রমযানের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা চালু করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এ খাদ্য তাদের জন্য, যারা মসজিদে ইবাদতে মগ্ন থাকে, পথিক এবং রমযানে যারা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাদের জন্য। তারীখে তাবারি ৪/২৪৬

উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর আমল

অনেক সাহাবী ব্যক্তিগত উদ্যোগেও রোযাদারকে ইফতার করানোর ব্যবস্থা করতেন। নবীজীর চাচাতো ভাই উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.-এর নাম এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি রমযান মাসে প্রতিবেশীকে নিয়মিত ইফতার করিয়েছেন। তিনিই ইসলামে প্রথমবারের মতো পথের ওপর উন্মুক্ত দস্তরখান বিছিয়ে সাধারণ মানুষকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছেন।

ইবনুদ দাওয়াদারী রাহ. লেখেন

وعبيد الله أوّل من فطّر جيرانه فى شهر رمضان، وأوّل من وضع الموائد على الطريق ودعا إلى طعامه فى الإسلام.

উবাইদুল্লাহ ছিলেন ইসলামে প্রথম ব্যক্তি, যিনি রমযান মাসে তাঁর প্রতিবেশীকে ইফতার করিয়েছেন, তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি পথের ওপর দস্তরখান সাজিয়ে মানুষকে খাবারের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। কানযুদ দুরার ১/৩৮৯

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর আমল

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. কখনো একাকী ইফতার করতেন না। কোনো দরিদ্র-অভাবীকে সঙ্গে নিয়েই ইফতার করতেন।

ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. লিখেন

وكان ابن عمر يصوم، ولا يفطر إلَّا مع المساكين، فإذا منعه أهله عنهم لم يتعش تلك الليلة، وكان إذا جاءه سائل وهو على طعامه، أخذ نصيبه من الطعام وقام، فأعطاه السائل.

ইবনে উমর রা. রোযা রেখে মিসকীনদের সঙ্গেই সর্বদা ইফতার করতেন। যদি তাঁর পরিবার তাঁকে মিসকীনদের সঙ্গে ইফতার করতে বাধা দিত, তবে তিনি সেই রাতে খাবারই খেতেন না। কোনো ভিক্ষুক খাবারের সময় তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলে তিনি নিজের খাবার তাকে দিয়ে দিতেন। লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১৬৮

উমাইয়া শাসনামলে ইফতার আয়োজন

খুলাফায়ে রাশেদীনের পরে উমাইয়া শাসকরাও দান ও আতিথেয়তার এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় উমাইয়া শাসক মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. দারুল মারাজিলপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হজের মৌসুমে ক্লান্ত হাজিরা সেখানে পেতেন তৃপ্তির আহার, রমযানে অভাবী রোযাদাররা সেখানে ইফতার করতেন। মক্কার পবিত্র ভূমিতে গড়ে ওঠা এই দারুল মারাজিলযেন ঘোষণা দিত বাইতুল্লাহর ছায়ায় কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না।

আল্লামা ফাকেহী তাঁর আখবারু মক্কা গ্রন্থে লেখেন

ومنها دار المراجل، وهي في أصل جبل الديلمى. فأما دار المراجل فكانت لآل المؤمّل من بني عدي بن كعب، فابتاعها معاوية رضي الله عنه، وإنما سمّيت دار المراجل، لأنه كان فيها قدور صفر، كان يطبخ فيها طعام الحاجّ، وطعام شهر رمضان في زمن معاوية رضي الله عنه.

এর মধ্যে আরেকটি হল দারুল মারাজিল। এটি ছিল জাবালুদ দাইলামীর পাদদেশে। দারুল মারাজিলমূলত ছিল বনী আদী ইবনে কাব গোত্রের আলমুয়াম্মালপরিবারের সম্পত্তি। পরে মুআবিয়া রা. এটি কিনে নেন।

এটি দারুল মারাজিলবা হাঁড়ির ঘর নামে পরিচিত হওয়ার কারণ ছিল, সেখানে তামার তৈরি বড় বড় হাঁড়ি ছিল, যাতে মুআবিয়া রা.-এর শাসনামলে হাজ্বীদের খাবার এবং রমযান মাসের খাদ্য রান্না করা হত। আখবারু মক্কা ৩/২৮৭

মুআবিয়া রা.-এর পর অন্যান্য উমাইয়া শাসকও রোযাদারদের ইফতার করানোর এ ধারা অব্যাহত রাখেন। এমনকি কঠোরতা ও শাসনের নির্মমতার জন্য বিতর্কিত হাজ্জাজ বিন ইউসুফও রমযান মাসে প্রতিদিন রোযাদারদের জন্য বিপুল খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তিনি প্রতিদিন এক হাজার দস্তরখান প্রস্তুত করাতেন। প্রতিটি দস্তরখানে থাকত চল্লিশটি রুটি, এক পাত্র সারিদ, ভাজা গোশত, ভাত, মাছ। সঙ্গে থাকত খেজুরের সিরকা ও শাকসবজি।

হাজ্জাজ নিজে দস্তরখানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতেন।

মাঝে মাঝে উপস্থিত মেহমানদের জিজ্ঞেস করতেন

هل تفقِدون شيئًا أو ترون تقصيرًا؟

কোনো কিছুর ঘাটতি আছে? কোনো অবহেলা চোখে পড়েছে?

লোকেরা উত্তর দিত, না। আনসাবুল আশরাফ ১৩/৩৭৬

এই বর্ণনা প্রমাণ করে, রোযাদারকে খাওয়ানো ইসলামী সমাজে এতটাই প্রতিষ্ঠিত এক আমল ছিল যে, তা শুধু ন্যায়বান শাসকই নয়, বরং কঠোরতম শাসকদের জীবনেও রমযানের এক অবিচ্ছেদ্য আমল হয়ে উঠেছিল।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের বাইরেও অনেকে নিজ উদ্যোগে ইফতারের ব্যবস্থা করতেন।

হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান রাহ.-এর আমল

হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান রাহ. ছিলেন অনেক বড় ফকীহ। তিনি ছিলেন ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর উস্তায এবং ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.-এর ঘনিষ্ঠ ছাত্র। হাম্মাদ রাহ. প্রচুর ধনসম্পদের মালিক ছিলেন। এ সম্পদ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনে। রমযান মাসে তাঁর দান ও উদারতা আরও অনেক বেড়ে যেত। তিনি রমযানে প্রতিদিন পঞ্চাশজন মানুষকে ইফতার করাতেন। ঈদের রাতে তাদের প্রত্যেককে একটি করে নতুন কাপড় দিতেন।

সলত ইবনে বিসতাম রাহ. বলেন

وكان يفطِّر كل يوم في رمضان خمسين إنسانًا، فإذا كان ليلة الفطر، كساهم ثوبًا ثوبًا.

তিনি (হাম্মাদ) রমযানে প্রতিদিন পঞ্চাশজন মানুষকে ইফতার করাতেন। আর ঈদের রাতে তাদের প্রত্যেককে একটি করে নতুন কাপড় দিতেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা ৫/২৩৮

আব্বাসী শাসনামলে ইফতার আয়োজন

রমযান এলে আব্বাসী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে মানবিক দায়িত্ব যেন রাষ্ট্রের নীতিতে রূপ নিত। খলীফার নির্দেশে নগরীর প্রতিটি মহল্লায় গড়ে উঠত বিশেষ আতিথেয়তা কেন্দ্র, যা ইতিহাসে দারুয যিয়াফাহনামে পরিচিত।

সেখানে রান্না উন্নতমানের হত।  খাদ্য তালিকায় প্রায় নিয়মিতই থাকত, ভেড়ার গোশত ও রুটি। পুরো বাগদাদেই এই ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যেন রাষ্ট্রের কোনো দরিদ্র রোযাদার ইফতারের সময় নিজেকে উপেক্ষিত মনে না করে। প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্বে আমানতদার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গ নিয়োজিত থাকতেন।

আল্লামা ইবনুল আসীর রাহ. লেখেন

فِي شَهْرِ رَمَضَانَ، أَمَرَ الْخَلِيفَةُ بِبِنَاءِ دُورٍ فِي الْمَحَالِّ بِبَغْدَادَ لِيُفْطِرَ فِيهَا الْفُقَرَاءَ، وَسُمِّيَتْ دُورَ الضِّيَافَةِ، يُطْبَخُ فِيهَا اللَّحْمُ الضَّأْنُ، وَالْخُبْزُ الْجَيِّدُ، عَملَ ذَلِكَ فِي جَانِبَيْ بَغْدَادَ، وَجَعَلَ فِي كُلِّ دَارٍ مَنْ يُوثِقُ بِأَمَانَتِه، وَكَانَ يُعْطِي كُلَّ إِنْسَانٍ قَدَحًا مَمْلُوءًا مِنَ الطَّبِيخِ وَاللَّحْمِ، وَمَنًّا مِنَ الْخُبْزِ، فَكَانَ يُفْطِرُ كُلَّ لَيْلَةٍ عَلَى طَعَامِه خَلْقٌ لَا يُحْصَوْنَ كَثْرَةً.

রমযান মাসে খলীফা নির্দেশ দেন, বাগদাদের বিভিন্ন মহল্লায় দরিদ্রদের ইফতারের জন্য বিশেষ ঘর নির্মাণ করতে। এসব ঘরের নাম দেওয়া হয় দারুয যিয়াফাহ’ (আতিথেয়তার গৃহ)। সেখানে খাসি বা ভেড়ার গোশত রান্না করা হত এবং উৎকৃষ্ট রুটি প্রস্তুত করা হত। বাগদাদের উভয় প্রান্তে (পূর্ব ও পশ্চিমে) এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এমন প্রত্যেক ঘরে একজন বিশ্বস্ত ও আমানতদার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত থাকত। প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি পাত্র ভরে তরকারি ও মাংস এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ রুটি দেওয়া হত। ফলে প্রতি রাতে অগণিত মানুষ সেখানে ইফতার করত। আলকামিল ফিততারীখ ১০/২৬৬

এ ঘটনাটিই সিবত ইবনুল জাওযী আরও বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন

وفيها رتَّبَ الخليفةُ في رمضان دور المضيف ببغداد من الجانبين عشرين دارًا، في كلِّ دار في كلِّ ليلة خمس مئة قَدَح، وألفُ رَطْل من الطبيخ الخاصِّ، والخبز النَّقي والحلوى، وغير ذلك، مستمرًا في كلِّ رمضان.

বাগদাদের উভয় পাশে রমযান মাসে খলীফা বিশটি দারুয যিয়াফাহস্থাপন করতেন। প্রতিটি দারুয যিয়াফাহ’-এ প্রতি রাতে পাঁচ শ পাত্র খাবার, এক হাজার রতিল বিশেষ রান্না, সাদা রুটি, মিষ্টি এবং অন্যান্য উপকরণ পরিবেশন করা হত। এই ব্যবস্থা পুরো রমযান মাস জুড়ে চলত। মিরআতুয যামান ২২/১৫৯

প্রিয় পাঠক! প্রত্যেকটি দারুয যিয়াফাহ-এ প্রতি রাতে ৫০০ পেয়ালা খাবার পরিবেশন করা হত। সে হিসেবে বাগদাদজুড়ে ২০টি দারুয যিয়াফাহথেকে প্রতিদিন আনুমানিক দশ হাজার রোযাদার সম্মানজনকভাবে ইফতার করার সুযোগ পেত!

এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রমাণ করে, আব্বাসী শাসনামলে রমযানে রাষ্ট্রই এটি দেখাশোনা করত যে, কোনো রোযাদার যেন ক্ষুধায় কষ্ট না করে। এটি ছিল রাষ্ট্রের সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রতিফলন।

রমযান মাসে দামেশকের চিত্র

তৎকালীন দামেশকে কেউ রমযানে একা একা ইফতার করত না। শাসক, আমীর, কাযী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিতেন সঙ্গী-সাথি, দরিদ্র ও পথচারীদের জন্য।  বণিক ও বড় দোকানিরাও দিনের শেষে হিসেবের খাতা বন্ধ করে দাওয়াতের মাধ্যমে খুলে দিতেন বদান্যতার খাতা।

অভাবী ও গ্রাম্য লোকেরা প্রতি রাতে কারও ঘরে কিংবা মসজিদে জড়ো হত। প্রত্যেকে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু না কিছু নিয়ে আসত। কেউ রুটি, কেউ খেজুর, কেউ সামান্য তরকারি।

তারপরে একসাথে বসে তারা ইফতার করত, সেখানে ক্ষুধা নিবারণের চেয়েও বড় ছিল ভ্রাতৃত্ব ও একতার তৃপ্তি ও প্রাপ্তি।

আবদুল কাদির বাদরান লিখেছেন

ومن فضائل أهل دمشق، أنه لا يفطر أحد منهم في ليالي رمضان وحده البتة، فمن كان من الأمراء والقضاة والكبراء، فإنه يدعو أصحابه والفقراء يفطرون عنده، ومن كان من التجار وكبار السوقة صنع مثل ذلك، ومن كان من الضعفاء والبادية، فإنهم يجتمعون كل ليلة في دار أحدهم أو في مسجد، ويأتي كل أحد بما عنده فيفطرون جميعًا.

দামেশকবাসীর একটি গুণ এই যে, রমযানের তাদের কেউ কখনো একা ইফতার করে না। আমীর, কাযী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গী ও দরিদ্রদের দাওয়াত দিয়ে ইফতার করান। বণিক ও বড় দোকানিরাও একই ব্যবস্থা করে। দুর্বল ও গ্রাম্যলোকেরা প্রতি রাতেই তাদের কারও বাড়িতে বা মসজিদে সমবেত হন এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী যা নিয়ে আসে, তা দিয়ে সকলে মিলে ইফতার করে। মুনাদামাতুল আতলাল, পৃ. ৫৫

এই ছিল আমাদের আকাবির-আসলাফের রমযান মাসে ইফতার আয়োজন, যেখানে ইফতার কেবল সূর্যাস্তের পর ক্ষুধা নিবারণের আয়োজন নয়। এখানে দস্তরখানে একাকার হত ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান, নিঃশব্দে ঝরে পড়ত পদমর্যাদার অহংকার আর সম্পদের অহমিকা।

ইফতার করানো সমাজের মানুষকে শুধু তৃপ্তই করে না, পরস্পরের মধ্যে গড়ে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। আজও সেই ভালবাসা ছড়িয়ে দিতে হবে আমাদের। যেন আমাদের মাধ্যমে আবার জিন্দা হয় সেই পুরোনো ঐতিহ্য সহমর্মিতার পুরোনো দস্তরখান।

রমযান এমন পবিত্র মৌসুম, যেখানে একটি খেজুরও কারও নেকীর খাতায় লিপিবদ্ধ করতে পারে অগণিত সওয়াব, এক প্লেট ইফতারও জাগিয়ে তুলতে পারে সমাজে সহমর্মিতার নতুন সূর্যোদয়। 

 

 

advertisement