রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

আদর্শ শাসক
‖ খুলাফায়ে রাশিদীনের জীবন থেকে কিছু নমুনা

মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আমাদের জন্য রয়েছে সকল বিষয়ের উত্তম নমুনা ও আদর্শ। তাকওয়া-পরহেযগারী, সততা-দায়িত্বশীলতা, ন্যায়-ইনসাফ সবদিক থেকেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরেই স্বর্ণযুগ হল খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগ। এজন্য নবীজী আমাদেরকে বিশেষভাবে তাঁর এবং খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। ইরশাদ করেছেন

عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ.

তোমরা আমার সুন্নত ও আমার খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নত দৃঢ়ভাবে ধারণ কর। মাড়ির দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধর। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭১৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৭ 

শাসক হিসেবে খুলাফায়ে রাশিদীন কেমন ছিলেন? তাঁদের আদর্শ শাসন ও নেতৃত্বের কিছু দিক বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে তুলে ধরা হল। আবু বকর রা. খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেই ভাষণে তিনি বলেন

أَمَّا بَعْدُ: أَيُّهَا النَّاسُ، فَإِنِّي قَدْ وُلِّيتُ عَلَيْكُمْ وَلَسْتُ بِخَيْرِكُمْ، فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِينُونِي، وَإِنْ أَسَأْتُ فَقَوِّمُونِي، الصّدْقُ أَمَانَةٌ، وَالْكَذِبُ خِيَانَةٌ، وَالضَّعِيفُ فِيكُمْ قَوِيٌّ عِنْدِي حَتّى أُرِيحَ عَلَيْهِ حَقَّهُ إنْ شَاءَ اللهُ، وَالْقَوِيُّ فِيكُمْ ضَعِيفٌ عِنْدِي حَتّى آخُذَ الْحَقَّ مِنْهُ إنْ شَاءَ اللهُ، لَا يَدَعُ قَوْمٌ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللهِ إلّا ضَرَبَهُمُ اللهُ بِالذُّلِّ، وَلَا تَشِيعُ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ إلّا عَمَّهُمْ اللهُ بِالْبَلَاءِ، أَطِيعُونِي مَا أَطَعْتُ اللهَ وَرَسُولَه، فَإِذَا عَصَيْتُ اللهَ وَرَسُولَه فَلَا طَاعَةَ لِي عَلَيْكُمْ.

হে লোকসকল! আমার ওপর তোমাদের শাসনের দায়িত্ব এসেছে, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। সুতরাং যদি আমি সঠিক পথে চলি, তোমরা আমাকে সহযোগিতা করো; আর যদি আমি ভুল পথে যাই, তবে তোমরা আমাকে সোজা করে দিয়ো (সঠিক পথ দেখিয়ে দিয়ো)।

সত্য ও সততা হল আমানত এবং মিথ্যা হল খেয়ানত।  তোমাদের মধ্যে  যে দুর্বলসে আমার কাছে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি (আল্লাহর ইচ্ছায়) তার প্রাপ্য অধিকার তাকে ফিরিয়ে দিই। আর  তোমাদের মধ্যে  যে শক্তিশালীসে আমার কাছে দুর্বল যতক্ষণ না আমি (আল্লাহর ইচ্ছায়) তার কাছ  থেকে অন্যের হক উদ্ধার করে দিই।

যখনই  কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ করা  ছেড়ে  দেয়, আল্লাহ তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে  দেন। আর যখনই কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদের ওপর মহামারি বা বিপদাপদ ব্যাপক করে  দেন।

 তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমার আনুগত্য করো, যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করি। কিন্ত যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হই, সেক্ষেত্রে আমার আনুগত্যের  কোনো অবকাশ  নেই। মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২০৭০; তবাকাতে কুবরা, ইবনে সাদ ৩/১৬৭; সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৬৬০-৬৬১; তারীখে তবারী ৩/২১০

আবু বকর রা.-এর ভাষণে একজন আদর্শ শাসকের  মৌলিক কিছু গুণ

ক. বিনয় ও সত্যবাদিতা

 খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরে আবু বকর রা.-এর কণ্ঠে ছিল বিনয় এবং মুখে ধ্বনিত হয়েছিল ঐক্যের বার্তা।

খ. শাসক হবেন জনতার সেবক ও খাদেম

আবু বকর রা. স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন। যেন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিও তাঁর কাছে গিয়ে ন্যায়বিচার পায়। শুধু তাই নয়, তার কাছে কারও সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে বড় হবে একজন সাধারণ নাগরিকের হকও অধিকার নিশ্চিত করা। 

গ. স্বৈরাচারী মনোভাব পরিহার

নিজের ভুল স্বীকার ও শাসিতের সংশোধনী গ্রহণ করার মনোভাব আদর্শ শাসকের মহৎ গুণ। আবু বকর রা. স্পষ্ট বলেছিলেন

فَإِنْ أَحْسَنْتُ فَأَعِينُونِي، وَإِنْ أَسَأْتُ فَقَوِّمُونِي.

আমি সঠিক পথে চললে আমাকে সাহায্য করো আর ভুল করলে সংশোধন করে দিয়ো।

ঘ. জুলুমের প্রতিকার, ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা

আবু বকর রা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে দুর্বল, আমার কাছে সে-ই সবচেয়ে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি তার অধিকার আদায় করে দিই। আর তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিটিও আমার কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্বল, যতক্ষণ না তার হাত থেকে অন্যের (মাজলুমের) হক উদ্ধার করে দেই।

অপরাধী প্রভাবশালী বা শক্তিশালী, তা শাসকের দেখার বিষয় নয়। তার থেকে মজলুমের হক উদ্ধার করে তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই শাসকের কাজ।

ঙ. তাকওয়া ও খোদাভীতি

আদর্শ শাসক কেবল জনগণের কাছেই নয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছেও প্রতিটি কাজের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকেন। এজন্য আবু বকর রা. ক্ষমতা ও দায়িত্বকে নিজের জন্য পরীক্ষাহিসেবে গ্রহণ করেছেন।

চ. জিহাদ

খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর রা. স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন

لَا يَدَعُ قَوْمٌ الْجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللهِ إلّا ضَرَبَهُمُ اللهُ بِالذُّلِّ.

যখনই কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেন।

ছ. অশ্লীলতার সকল পথ বন্ধ করা

কোনো দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি, স্থিতি ও নিরাপত্তার জন্য অশ্লীলতা বন্ধ হওয়া অতি জরুরি। কারণ অশ্লীলতা সামাজিক ভারসাম্য ও পারিবারিক বন্ধন ধ্বংস করে, একটি জাতিকে দ্বীন-বিচ্ছিন্ন ও আল্লাহদ্রোহী করে তোলে এবং ভেতর থেকে মেরুদণ্ডশূন্য বানিয়ে দেয়। 

আদর্শ শাসকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অশ্লীলতার সকল পথ রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধ করা এবং বিদ্যমান অশ্লীলতা দূর করার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিশেষত (বর্তমান এলজিবিটির মতো) এমন অশ্লীলতার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার কারণে পূর্ববর্তী কোনো জাতিকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের ওপর আল্লাহর লানত হয়েছে।

আবু বকর রা. বলেছেন

وَلَا تَشِيعُ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ إلّا عَمَّهُمْ اللهُ بِالْبَلَاءِ.

যখনই কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাদের ওপর মহামারি বা বিপদাপদ ব্যাপক করে দেন।

জ. শাসকের আনুগত্য নিঃশর্ত নয়

নিঃশর্ত আনুগত্য’-এর দাবি করা আদর্শ শাসকের কাজ নয়। আদর্শ শাসক কখনো শাসিতের নিঃশর্ত আনুগত্য দাবি করতে পারে না। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কারও নিঃশর্ত আনুগত্য হয় না। তাই আবু বকর রা. স্পষ্টভাবে বলেছিলেন

أَطِيعُونِي مَا أَطَعْتُ اللهَ وَرَسُولَه، فَإِذَا عَصَيْتُ اللهَ وَرَسُولَه فَلَا طَاعَةَ لِي عَلَيْكُمْ.

অর্থাৎ যতক্ষণ তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথ অর্থাৎ শরীয়তের ওপর থাকবেন, ততক্ষণ জনগণ তাঁর অনুসরণ করবে। যদি তিনি পথচ্যুত হন, তবে জনগণ তাকে বর্জন করবে। এটিই জবাবদিহিতামূলক শাসনের মূল ভিত্তি।

কুরআন-সুন্নাহর ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা করা আদর্শ শাসকের বিশেষ দায়িত্ব

উমর রা. একবার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন, শাসকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল জনগণকে দ্বীন-ঈমান ও শরীয়তের ইলম শিক্ষা দেওয়া। তাদেরকে শিক্ষিত আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। তাদের ওপর জুলুম বা তাদের সম্পদ লুণ্ঠন না করা।

তাঁর বক্তব্য ছিল

أَلَا إِنِّي وَاللهِ مَا أَبْعَثُ إِلَيْكُمْ عُمَّالًا لِيَضْرِبُوا أَبْشَارَكُمْ وَلَا لِيَأْخُذُوا أَمْوَالَكُم .وَلَكِنْ أَبْعَثُهُمْ إِلَيْكُمْ لِيُعَلِّمُوكُمْ دِينَكُمْ وَسُنَّتَكُمْ.

জেনে রেখো! আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিনিধি শাসক ও কর্মকর্তাদেরকে তোমাদের প্রহার করার জন্য কিংবা তোমাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য পাঠাই না। আমি তাদেরকে তোমাদের কাছে পাঠাই, যেন তারা তোমাদের দ্বীন ও সুন্নাহ শিক্ষা দিতে পারে। (দ্র. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩২৯২১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৮৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৫৩৭; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৮৫৬০; তারীখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ৪৪/২৭৮)

নামাযের প্রতি যত্নবান হওয়া শাসক-প্রশাসকের বিশেষ গুণ

ঈমানের পর ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল নামায। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। কেবল ইবাদতই নয়, নামায মুমিনের জীবনে আখলাক, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা রক্ষারও অন্যতম উপায়। কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নামায মানুষকে অন্যায়, অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নবীজীর কাছে এক ব্যক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করা হল, সে রাতে নামায পড়ে, সকাল হলে চুরি করে।

এ শুনে নবীজী বলেছেন

سَيَنْهَاهُ مَا تَقُولُ.

অচিরেই তার নামায তাকে এ থেকে বিরত রাখবে। সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৫৬০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯৭৭৮

নামাযে অবহেলা হলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। এজন্য আমীরুল মুমিনীন উমর রা. রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিযুক্ত কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে ফরমান পাঠালেন

إِنَّ أَهَمَّ أَمْرِكُمْ عِنْدِي الصَّلَاةُ فَمَنْ حَفِظَهَا وَحَافَظَ عَلَيْهَا حَفِظَ دِينَه، وَمَنْ ضَيَّعَهَا فَهُوَ لِمَا سِوَاهَا أَضْيَعُ.

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামায। যে ব্যক্তি নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হবে এবং গুরুত্বের সাথে নামায আদায় করবে সে তাঁর দ্বীনকে হেফাযত করবে। আর যে ব্যক্তি নামায নষ্ট করবে (নামাযের ক্ষেত্রে অবহেলা করবে) সে অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে অধিক নষ্টকারী (অবহেলাকারী) হয়ে থাকবে। (দ্র. মুয়াত্তা মালেক, বর্ণনা ৬; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২০৩৮)

কাজেই শাসক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের বিশেষ গুণ হল নামাযের প্রতি যত্নবান হওয়া। মুসলিম নাগরিকদের জন্যও সময়মতো যথাযথভাবে নামায আদায় করার ব্যবস্থা করা।

সূরা হাজ্ব (২২)-এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলাই ইরশাদ করেন

اَلَّذِیْنَ اِنْ مَّكَّنّٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَاٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَاَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ،  وَ لِلهِ عَاقِبَةُ الْاُمُوْرِ .

তারা এমন যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদেরকে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করে এবং অন্যায় কাজে বাধা দেয়। সব কাজের পরিণতি আল্লাহরই হাতে।

বিচারের কাঠগড়ায় শাসক-শাসিত সমান

একবার উমর রা. ও উবাই ইবনে কাব রা.-এর মধ্যে একটি বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। মীমাংসার জন্য তারা তৎকালীন বিচারক যায়েদ ইবনে সাবিত রা.-এর নিকট যান। উমর রা. বিচারককে বললেন, আমরা আপনার কাছে এসেছি, যেন আপনি আমাদের মাঝে মীমাংসা করে দেন! বিচারক যায়েদ ইবনে সাবেত রা. আমীরুল মুমিনীনকে নিজের পাশের আসনে বসতে দিলেন। এতে আমীরুল মুমিনীন উমর রা. খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। কারণ তিনি এখানে বিবাদী। আর বিচারকের নিকট শাসক-শাসিত, বাদী-বিবাদী সবাই সমান।

তখন উমর রা. বিচারককে বললেন, আপনি বিচারে পক্ষপাতিত্ব করছেন। আমাকে আর আমার প্রতিপক্ষকে একইভাবে বসতে দিন।

মামলার রায়ের পরে খলীফাতুল মুসলিমীন উমর রা. বিচারকের উদ্দেশে আবারও বললেন

لَا تُدْرِكُ بَابَ الْقَضَاءِ حَتّى لَا يَكُونَ لِي عَلى أَحَدٍ عِنْدَكَ فَضِيلَةٌ.

অর্থাৎ ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি বিচারকার্যের প্রকৃত স্তরে পৌঁছাতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনার কাছে আমার আর সাধারণ কোনো নাগরিকের মর্যাদা সমান হয়। (দ্রষ্টব্য : তারীখে মাদীনা, ইবনে শাব্বা ২/৭৫৫; সুনানে কুবরা, বাইহাকী, বর্ণনা ২০৫১০; তারীখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ১৯/৩১৯)

জনসেবায় উমর রা.-এর বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপ 

জনগণের প্রতি অনুগ্রহ নয়, জনসেবা হল আদর্শ শাসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য। এক্ষেত্রেও খুলাফায়ে রাশিদীন আমাদের জন্য আদর্শ। উমর রা.-এর শাসনকালের কিছু বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা যায়। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসাফির ও অভাবী লোকদের জন্য মেহমানখানা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে আটা, ছাতু, খেজুর এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী সব সময় মজুদ রাখা হত, যেন নিঃস্ব ও সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তিদের জন্য সেখান থেকে সাহায্য সরবরাহ করা যায়।

এছাড়া তিনি মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী রাস্তায় এমন সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা মুসাফিরদের যাতায়াত ও জনগণের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। একইভাবে সিরিয়া ও হিজাযের মধ্যবর্তী পথেও জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। (দ্র. আততারাতীবুল ইদারিয়্যাহ ১/৪৪৭)

সংকটকালে জনতার কষ্টের অংশীদার হওয়া 

মদীনায় একবার খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেক বেড়ে গেল। তখন খলীফাতুল মুসলিমীন উমর রা. দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি ও খাদ্যের সংকট দেখে আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করলেন। সেইসঙ্গে নিজের স্বাভাবিক খাবার ছেড়ে একেবারে নিম্নমানের যব খাওয়া শুরু করলেন। এতে তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছিল। তখন তিনি নিজের পেটের দিকে ইশারা করে বললেন

وَاللهِ مَا هُوَ إِلّا مَا تَرَى حَتّى يُوَسِّعَ اللهُ عَلى الْمُسْلِمِينَ.

আল্লাহর কসম, (খাদ্য হিসেবে) তোমার জন্য এ ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ নেই, যা তুমি দেখছ। যতক্ষণ না আল্লাহ মুসলিমদের সচ্ছলতা ফিরিয়ে দেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩৫৬২৪; তারীখে মাদীনা, ইবনে শাব্বাহ ২/৭৪২

জনগণ কষ্ট করবে আর শাসক ভালো ভালো খাবার খাবে, এটি আদর্শ শাসকের পরিচয় নয়। 

সরেজমিন অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ

সব সময় অন্যের মাধ্যমে জনসাধারণের খোঁজখবর নিলে সঠিক খবর পাওয়া যায় না। তাই কখনো কখনো শাসকের কর্তব্য সরেজমিনে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। উমর রা. অনেক সময় জনগণের খোঁজখবর নিতে গভীর রাতে নিজেই বের হয়ে মদীনার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন কারও কোনো প্রয়োজন আছে কি না। কেউ ক্ষুধা বা অনাহারে কষ্ট পাচ্ছে কি না। কোথাও কেউ অপরাধে জড়াচ্ছে কি না ইত্যাদির তদারকি করতেন।

তাবেয়ী আসলাম রাহ. বলেন, এক রাতে আমি খলীফা উমর রা.-এর সঙ্গে বের হলাম। চলতে চলতে এক জায়গায় গিয়ে আমরা দেখলাম, এক মহিলা চুলায় হাঁড়ি বসিয়েছে আর আশপাশে তার বাচ্চারা ক্ষুধায় কাঁদছে। মহিলাটির সঙ্গে সালাম বিনিময়ের পরে উমর রা. বললেন, তোমাদের কী অবস্থা? বাচ্চারা কাঁদছে কেন?

মহিলা বলল, রাত আর শীত আমাদের পথ আটকে দিয়েছে। আর বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে। 

উমর রা. বললেন, তাহলে হাঁড়িতে কী?

মহিলা উত্তর দিল, এতে শুধু পানি। ওদের শান্ত করার জন্য আমি কৌশল করেছি, যেন তারা ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের আর উমরের মাঝে আল্লাহ্ই বিচার করবেন।

উমর রা. কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, হে আল্লাহর বান্দী! উমর তোমাদের খবর জানবে কীভাবে?

মহিলা বলল

يَتَوَلّى عُمَرُ أَمْرَنَا ثُمَّ يَغْفُلُ عَنَّا.

তিনি আমাদের শাসনভার গ্রহণ করবেন আর আমাদের ব্যাপারে গাফেল থাকবেন?!

আসলাম রাহ. বলেন, এরপর উমর রা. আমাকে নিয়ে দ্রুত বায়তুল মাল’-এর আটার গুদামে এলেন। সেখান থেকে এক বস্তা আটা আর কিছু চর্বি নিলেন।

আমাকে বললেন, এটি আমার পিঠে তুলে দাও।

আমি বললাম, আমি এটি বহন করছি!

তিনি বললেন

أَنْتَ تَحْمِلُ وِزْرِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟

কেয়ামতের দিন কি তুমি আমার পাপের বোঝা বহন করবে?!

এই বলে নিজেই পিঠে আটা ও চর্বির বস্তা বহন করলেন। ওই নারীর ঝুপড়ির কাছে পৌঁছে বোঝা নামালেন, হাঁড়িতে আটা ও চর্বি ঢাললেন এবং নিজ হাতে আগুন জ্বালিয়ে হাঁড়ির নিচে ফুঁ দিতে লাগলেন।

রান্না শেষ হলে বললেন, একটি পাত্র দাও!

মহিলা পাত্র আনলে তিনি তাতে খাবার ঢেলে বললেন, নাও, বাচ্চাদের খাওয়াও।

শিশুরা পেট ভরে খাওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন। তারপরে উঠে দাঁড়ালেন।

তখন মহিলাটি বলল

جَزَاكَ اللهُ خَيْرًا، كُنْتَ أَوْلَى بِهَذَا الأَمْرِ مِنْ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ.

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন! আমীরুল মুমিনীনের চেয়ে আপনিই এ পদের বেশি যোগ্য ছিলেন।

উমর রা. বললেন, ঠিক বলেছ। যখন তুমি আমীরুল মুমিনীনের কাছে যাবে, আমাকে সেখানেই পাবে, ইনশাআল্লাহ।

এরপর তিনি কিছুটা দূরে গিয়ে উবু হয়ে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তাঁকে অন্য কাজের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর যখন শিশুরা খেলাধুলা করে ঘুমিয়ে পড়ল, তখন উঠে দাঁড়ালেন। আমাকে বললেন, আসলাম! ক্ষুধার জ্বালায় ওরা কাঁদছিল। তাই আমি ওদের হাসতে দেখার আগে এখান থেকে যেতে চাচ্ছিলাম না।  (দ্র. ফাযাইলুস সাহাবা, আহমাদ, পৃ. ৩৮২; তারীখে তাবারী ৪/২০৫; তারীখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ৪৪/৩৫৩; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/১৩৬) 

উমর রা.-এর আরেকটি ঘটনা তো আমরা প্রায় সকলেই জানি। ওই যে এক মা তার মেয়েকে দুধে পানি মেশাতে বলেছিল এবং মেয়েটি তা করতে বারণ করল। উমর রা. তা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছিলেন। পরে ওই মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিবাহ দিয়েছিলেন। সেই ঘটনাও এমন গভীর রাতে টহল দেওয়ার কারণেই ঘটেছিল। (দ্র. তারীখু দিমাশক, ইবনে আসাকির ৭০/২৫৩; আখবারু উমর ইবনে আবদুল আযীয, আর্জূরী, পৃষ্ঠা ৪৮)

অবহেলা নয়, দুর্বলদের বিশেষ যত্ন নেওয়া

উমর রা. একদিন কোনো এক গোত্রের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। দৃষ্টিশক্তিহীন এক ভিক্ষুককে দেখে পেছন থেকে তার বাহুতে মৃদু স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আহলে কিতাব (ইহুদী-খ্রিস্টানদের) কোনো গোত্রের লোক?

বৃদ্ধ উত্তর দিল, আমি একজন ইহুদী।

উমর রা, প্রশ্ন করলেন, তুমি এই অবস্থায় (ভিক্ষাবৃত্তিতে) বাধ্য হলে কেন?

বৃদ্ধ বলল, জিযইয়া-কর পরিশোধের চাপ, অভাব-অনটন এবং বার্ধক্য সব মিলিয়ে আমি খুব চাপে আছি।

সাথে সাথে উমর রা. বৃদ্ধের হাত ধরলেন এবং তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ঘরে যা ছিল, সেখান থেকে তাকে কিছু দান করলেন। এরপর বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) দায়িত্বশীলকে ডেকে পাঠালেন, নির্দেশ দিলেন

انْظُرْ هذَا وَضُرَبَاءَهُ؛ فَوَاللهِ مَا أَنْصَفْنَاهُ أَن أكلنَا شبيبته ثُمَّ نَخُذُلُه عِنْدَ الْهَرَمِ.

একে এবং এর মতো আরও যারা আছে তাদের অবস্থা দেখো। আল্লাহর কসম! আমরা আসলে ওর প্রতি মোটেই ইনসাফ করিনি; যদি ওর যৌবনের উপার্জন আমরা ভোগ করি আর বার্ধক্যে এসে ওকে এভাবে ছেড়ে দিই।

বর্ণনাকারী বলেন, তারপর উমর রা. সেই বৃদ্ধের এবং তার মতো অন্যান্য অভাবী অমুসলিমদের ওপর থেকে জিযইয়া মওকুফ করে দিলেন। (বর্ণনাকারী) আবু বাকরা বলেন, আমি উমর রা.-এর এই ঘটনা এবং সেই বৃদ্ধকে সচক্ষে দেখেছি। (দ্র. কিতাবুল খারাজ, পৃ. ১৩৯; আলআমওয়াল, ইবনে যানজূয়া ১/১৬৯; আলআমওয়াল, কাসেম, বর্ণনা ১১৯) 

দ্বীনী বিষয়ে ফেতনা ও বিশৃঙ্খলা রোধে শাসকের দায়িত্ব

আদর্শ শাসকের দায়িত্ব কেবল বাহ্যিক অন্যায়-অপরাধ দমন এবং রাস্তাঘাট বা অর্থনীতি ঠিক রাখা নয়, বরং জনগণের দ্বীন-ঈমান ও সহীহ আকীদা রক্ষা করাও তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। উমর রা. জনগণের বিষয়ে সেই খোঁজখবরও রাখতেন এবং কেউ বিপথগামী হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতেন। একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। বনী তামীম গোত্রের সাবীগ ইবনে আসাল নামক এক ব্যক্তি মদীনায় এসে কুরআনের কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যা করে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। এই খবর আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর কানে পৌঁছালে তিনি তাকে ডেকে পাঠান।

সাবীগ যখন তাঁর কাছে এসে বসল, উমর রা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে?

সে উত্তর দিল, আমি আল্লাহর বান্দা সাবীগ।

উমর রা. বললেন, আর আমি আল্লাহর বান্দা উমর।

এরপর উমর রা. খেজুরের ডাল দিয়ে তাকে সজোরে আঘাত করতে শুরু করলেন। মারতে মারতে রক্তাক্ত করে দিলেন। এক পর্যায়ে সাবীগ বলল

حَسْبُكَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، فَقَدْ وَاللهِ ذَهَبَ الَّذِي كُنْتُ أَجِدُ فِي رَأْسِي.

আমীরুল মুমিনীন! যথেষ্ট হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমার মাথায় (সংশয়ের) যে ভূত চেপেছিল সেটি দূর হয়ে গেছে।

বর্ণনাকারী বলেন, মূলত উমর রা. একজনকে শাস্তি দিয়ে অন্যদের সাবধান করলেন, যেন দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি ছেড়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কেউ বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে! কারণ একজন দায়িত্বশীল শাসক হিসেবে জনগণের ঈমান-আকীদা ও আমলের তত্ত্বাবাধান করাও আদর্শ শাসকের দায়িত্ব। (দ্র. সুনানে দারেমী, ১/২৫২, বর্ণনা ১৪৬; আশশরীআ, আজূররী ১/৪৮৩, বর্ণনা ১৫৩; আল ইবানাতুল কুবরা, ইবনে বাত্তা, ২/৬০৯, বর্ণনা ৭৮৯)

 প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা

উসমান রা.-এর এক নিকটাত্মীয়কে যোগ্যতার ভিত্তিতেই কূফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একবার তার বিরুদ্ধে মদপানের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি যখন খলীফা উসমান রা.-এর দরবারে যায়, বিচলিত না হয়ে তিনি সরাসরি সাক্ষীগণের জবানবন্দি নেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর দেরি না করে উসমান রা. তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন যেন এই প্রশাসকের ওপর দণ্ডবিধি কায়েম করা হয়। সেখানে আলী রা., তাঁর ছেলে হাসান রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা.-সহ অনেক বিশিষ্ট সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। উসমান রা. আলী রা.-কে উদ্দেশ করে বললেন

يَا عَلِيُّ، قُمْ فَاجْلِدْهُ.

উঠুন, একে বেত্রাঘাত করুন।

তারপর তাকে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭০৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৪৮০)

অর্থাৎ অত্যন্ত বিনয়ী ও লাজুক সাহাবী খলীফা উসমান রা.-ও ছিলেন দুষ্টের দমনে হিমালয়ের মতো অটল। নিজের নিকটাত্মীয়ের ক্ষেত্রে যেমন স্বজনপ্রীতি করেননি, তেমনি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তির অপরাধের কারণেও তাকে পদচ্যুত করে শাস্তির মুখোমুখি করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। 

উসমান রা.-এর বাজার তদারকি

স্বর্ণযুগে খলীফার সঙ্গে মসজিদে জনগণের নিয়মিতই দেখা-সাক্ষাৎ হত। তখন খলীফাগণ যেমন রাষ্ট্র চালাতেন, তেমনি মসজিদে ইমামতি ও খুতবাও প্রদান করতেন। উসমান রা. মসজিদে গেলে জনগণ থেকে সরাসরি দ্রব্যমূল্যের খবর নিতেন। মূসা ইবনে তালহা রাহ. বলেন, আমি উসমান রা.-কে দেখেছি মিম্বরে বসে লোকজনের খবরাখবর নিচ্ছেন এবং দ্রব্যমূল্য ও বাজারের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন। (দ্রষ্টব্য : মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫৪০; তারীখে দিমাশক, ইবনুল আসাকির ৩৯/২২৮)

রাগ-অনুরাগ ও আবেগের বশবর্তী না হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আদর্শ শাসকের একটি বড় গুণ

কোনো দায়িত্বশীল বা আদর্শ শাসক কখনো আবেগ বা রাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। কারণ, শাসন ক্ষমতা ও বিচারিক দায়িত্বসহ যে কোনো দায়িত্বই আল্লাহর দেওয়া আমানত। 

একবার জাদাহ ইবনে হুবাইরা রাহ. খলীফাতুল মুসলিমীন আলী রা.-এর নিকট এসে বললেন, আমীরুল মুমিনীন! একটা বিষয় লক্ষ করলাম, আপনার কাছে বিচারপ্রার্থী হয়ে এমন দুজন ব্যক্তি আসে, যাদের মধ্যে একজন আপনাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। আর অন্যজন আপনার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট। অথচ আপনি বিচারের সময় ইনসাফ অনুযায়ী এই দ্বিতীয় ব্যক্তির পক্ষেই রায় দিয়ে থাকেন!

একথা শুনে আলী রা. তাকে বললেন, আরে, এখানে আমার যদি এখতিয়ার থাকত তাও আমি এমনই করতাম। (অর্থাৎ ইনসাফের পক্ষেই ফয়সালা করতাম।) কিন্তু এটি তো আল্লাহর বিধান। (দ্র. তারীখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ৪২/৪৮৮; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৭/৬০০)

খুলাফায়ে রাশিদীনের জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের শেখায়, শাসনক্ষমতা প্রভাব প্রতিপত্তি, জাগতিক স্বার্থ হাসিলের ব্যবস্থা নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান আমানত এবং ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্ব। তাদের খেলাফত থেকেই নিতে হবে আদর্শ শাসকের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য।

 

 

advertisement