রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

আমার আব্বা হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রাহ.
‖ কুরআন ছিল তাঁর রমযানের প্রধান ব্যস্ততা

মাওলানা আবরারুয যামান

আকাবির কা রামাযানহযরত শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহ.-এর একটি অনবদ্য কিতাব। আকাবির কীভাবে রমযান কাটিয়েছেন সে বিবরণ তিনি এ কিতাবে তুলে ধরেছেন। কিতাব রচনার মাকসাদ ছিল নমুনা দেখানো। তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে অনেক সময় আদর্শের উপস্থাপন বেশি প্রয়োজনীয় হয়। কখনো এর প্রভাবও হয় অনেক গভীর। এজন্যই আলকুরআনে এসেছে নবী-রাসূলগণের গল্প ও সীরাত। এসেছে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের বহুমাত্রিক কাহিনী।

আমাদের ঘরে তারাবীর জামাত

আমার জীবনে যাঁরা আকাবির, তাঁদের অন্যতম, আমার সারেতাজ, আমার মুরশিদ, আমার আব্বা হযরত মাওলানা আবদুল হাই পাহাড়পুরী রাহ.। তাঁর জীবনের অনেক কিছুই আল্লাহ আমায় দেখিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর রমযান। রমযানের আমলমুখর দিন, ইবাদতনিমগ্ন রাত। কমযোর এ বান্দার ওপর মহান মাওলার রহম করম ও সীমাহীন মেহেরবানী যে, তিনি আমায় সুযোগ দিয়েছিলেন জীবনের প্রায় দুদুটি যুগ তারাবীর নামাযে আব্বাকে এবং আম্মাকেও কুরআন শোনানোর। সেই সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আব্বার রমাযান মাস এবং বিশেষ করে তারাবীর কিছু হাল ও কাইফিয়াত।

আমার হিফয সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে দেখেছি, আব্বা সাধারণত তারাবীর জামাত ঘরেই করতেন। কেন করতেন? এর একটি বাহ্যিক উত্তর আছে। সাধারণত মসজিদের তারাবীতে তাড়াহুড়ো থাকে। আব্বার পছন্দ ছিল না এ প্রবণতা। অন্তর্নিহিত আরেকটি কারণও আছে। সে কারণটি কোনোদিন তিনি মুখে উচ্চারণ করেননি। কিন্তু আমরা বুঝে নিয়েছি। সেটি ছিল একটি আবেগ। কলিজার টুকরা সন্তানের পেছনে তারাবী আদায় করার আবেগ। তারাবীর জামাতে সন্তানের যবানে কুরআন কারীমের তিলাওয়াত শুনতে আগ্রহ নেই কার? ঘরের সেই জামাতগুলোতে শরীক থাকত সাধারণত ঘরের সদস্যরাই। আব্বা, আম্মা, ভাই-বোন। সময়ের পরিক্রমায় সে জামাত একসময় অনেক ছোট হয়েছে। একসময় মুক্তাদি ছিলেন শুধুই দুজন। শুধুই আব্বা ও আম্মা। আব্বার ইন্তেকালের পরও চলেছে সেই ঘরোয়া তারাবী। সেখানে ছিলেন শুধুই আম্মা। স্মৃতিগুলো বড় বেশি কাঁদায়, তবু লিখে যাই যদি কেউ পেয়ে যায় শিক্ষার কোনো উপাদান!

আব্বা তিলাওয়াত শুনতেন তন্ময় হয়ে। নিয়মতান্ত্রিক হাফেয ছিলেন না আমার আব্বা। কিন্তু ছিলেন হাফেযের বাপ। এটি তাঁর মুখের একটি সরস উচ্চারণ। কেউ একজন আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কি হাফেয? আব্বা সাথেসাথে উত্তর দিয়েছিলেন, হাফেয না; হাফেযের বাপ!

তারাবীর তিলাওয়াতে আটকে গেলে বলে দিতেন। ভুল করলে শুধরে দিতেন। সালাম ফেরানোর পর উচ্চারণগত ত্রুটিগুলোর সংশোধন করে দিতেন। ওয়াকফ ও ওয়াসলের বিষয়গুলো খুব খেয়াল করতেন। এভাবে তারাবীর নামাযে আব্বার সান্নিধ্য হয়ে উঠেছিল আমার জন্য এক রূহানী হিফযখানা। হয়ে উঠেছিল তাজবীদ ও তারতীল শিক্ষার জীবন্ত পাঠশালা

একবারের স্মৃতি। সেদিন চলছিল সূরা বনী ইসরাঈলের তিলাওয়াত। আমি ইমাম। আমার মুক্তাদি’  আব্বা ও  আম্মা। আর কেউ নেই।  পড়ছিলাম সূরা বনী ইসরাঈলের তেইশ ও চব্বিশ নম্বর আয়াত

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا  اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا، وَاخۡفِضۡ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحۡمَۃِ وَقُلۡ رَّبِّ ارۡحَمۡہُمَا کَمَا رَبَّیٰنِیۡ صَغِیۡرًا.

আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহর ইবাদত করার এবং মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণ করার। তাদেরকে একটুও কষ্ট না দেওয়ার। তারা যখন পৌঁছে যান বার্ধক্যে, তাদের সাথে আরও বেশি সুন্দর ও মোলায়েম আচরণ করার। আমি পড়ছিলাম আয়াতদুটি। নামাযের মধ্যেই আমার মন চলে গেল আমার বৃদ্ধ মা ও বাবার দিকে। নামাযের মধ্যেই মাওলায়ে পাকের প্রতি পরম কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠছিল। এমন সৌভাগ্য পৃথিবীতে কয়জন মানুষের হয়! আয়াতের মর্ম আমার হৃদয়ে জোয়ার তুলছিল, মনের মাঝে উথাল-পাথাল করছিল ঢেউ। রাব্বে কারীমের প্রতি কৃতজ্ঞতার সুতীব্র অনুভূতি। দুহাত বেঁধে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার মাওলার সামনে। মাওলার সামনে দাঁড়িয়েই কী সোনালি সুযোগ মা বাবা দুজনকেই শোনাতে পারছি কুরআনের সুর! নামাযের মধ্যেই আমি আপ্লুত হয়ে পড়লাম...! আল্লাহর শোকর, আবারও আল্লাহর শোকর যে, মহা সৌভাগ্যে ভরা   এমন নিআমত তিনি আমায় দান করেছিলেন।

তারাবীর মধ্যবিরতিগুলোতে আব্বা চা পান করতেন। এতে পরবর্তী রাকাতগুলোতে আসত প্রাণবন্ততা। নতুন উদ্যম নিয়ে আদায় হত পরবর্তী রাকাতগুলো। সাধারণত এক পারা করেই পড়া হত। ঊনত্রিশ রাতেই খতম হত। শেষ দুই বা চার রাকাত আব্বাই পড়াতেন, যতদিন স্বাভাবিক সুস্থ ছিলেন। আমাদের ইচ্ছে ও আবেগকে মূল্যায়ন করেই আব্বা এটি করতেন। খতমের পর ঘরের সবাইকে নিয়ে আব্বা মুনাজাত করতেন। সে মুনাজাতে কান্নার রোল পড়ত। আম্মা-আব্বার সাথে আমরা এতগুলো ভাইবোন যখন হাত তুলতাম, এক নূরানী আবহ তৈরি হত। মুনাজাতে আব্বা যেসব কথা বলতেন, খুব সাদামাটা কথা। কিন্তু কলিজা চিড়ে কান্না আসত। ছোট ছোট বাচ্চারাও বসত মুনাজাতে। বাচ্চাগুলোও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকত। অদ্ভুত সুন্দর ছিল সেসব দিনরাত। মুনাজাতের সেসব শব্দমালা। আজ সবকিছুই কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়।

এ লেখাটি লেখার সময় আমি নতুন করে আকাবির কা রামাযানদেখেছি। সেখানে এবং তাযকিরাতুল খালীলেও আছে এমন নযীর। হযরত সাহারানপুরী রাহ. ঊনিশ রমযানে মিরাঠ চলে যেতেন। তাঁর মিরাঠী আহবাবের সন্তানদের খতমে শরীক হতেন। তাদেরকে নিয়ে বিশেষ দুআ করতেন। খতমের দিনে সবাইকে নিয়ে দুআর ইহতিমাম আকাবিরের জীবনে ছিল। এমন আয়োজন যদি হয় বেতাকাল্লুফ, এখানে থাকে অনেক নূর ও নূরানিয়াত এবং রূহ ও রূহানিয়াত।

একসময় আব্বা ইশার ফরয মসজিদেই আদায় করতেন। ফরয শেষ করে ঘরে ফিরে আসতেন। পরবর্তীতে ফরযও ঘরে পড়তেন। পরে কেন ফরয ঘরে পড়তেন প্রশ্ন করিনি কোনোদিন। তবে আব্বার মেযাজ ও রুচির আলোকে বলতে পারি, হতে পারে সেটি মানুষের বদগুমানী থেকে বাঁচার জন্য এবং মানুষকেও বদগুমানীর গুনাহ থেকে রক্ষার জন্য। তারাবী না পড়ার মন্দ ধারণা কারও মধ্যে হয়তো আসতে পারে।

রমযানে আব্বার তিলাওয়াত

ব্যক্তিগত আমলের মধ্যে আব্বা বেশি জোর দিতেন কুরআন কারীম তিলাওয়াতের ওপর। রমযানে সাধারণত অন্যান্য কিতাবাদি মুতালাআ বন্ধ থাকত। মুতালাআলার সময়টা তিলাওয়াতে কাটাতেন। তিলাওয়াতের মধ্যে তাড়াহুড়ো ছিল না। মধ্যম আওয়াজে পড়তেন। কামরার বাইরে তিলাওয়াতের শব্দ আসত না। কিন্তু একটা মধুর গুনগুন শোনা যেত। চোখের আলো কমে যাওয়ার পর একটি বড় অক্ষরের মুসহাফ সংগ্রহ করেছিলেন। সেটি দেখেই তিলাওয়াত করতেন। গ্লুকোমার নির্মম আঘাতে সে আলোটুকুও যখন নিভে গেল, আব্বা তখন আমাদের কারও কাছ থেকে তিলাওয়াত শুনতেন। কখনো আমি, আমার ভাই, কখনো বোনদের মধ্যে কেউ আব্বাকে তিলাওয়াত শোনাতাম। এতে করে আমরা তাঁর সন্তানরা বহুবার তাঁকে কুরআন শোনানোর সৌভাগ্য অর্জন করতে পেরেছি।

সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্য সাধারণত যোহরের পরের কিছু সময় বরাদ্দ ছিল। যোহরের পর মসজিদেই সাক্ষাৎ সেরে নিতেন। সাক্ষাৎ সেরে বাজার নিয়ে ঘরে ফিরতেন। রমযানের বড় বাজার মাসের আগেই করে ফেলতেন।

রাতের আমল

আব্বার রমযানের রাতগুলো ছিল অন্য রকম। তারাবীর পর হালকা কিছু নাশতা করে তিলাওয়াত ও আমলে মগ্ন হতেন। সাহরী পর্যন্ত চলত সে আমল। রমযানের বিশ্রাম ফজরের পরেই করতেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই  বিশ্রাম কিছুটা দীর্ঘ হত। বিশ্রামের পর ঘরের টুকটাক কাজ নিজ হাতেই সারতেন। যেহেতু মাদরাসার নিয়মতান্ত্রিক সবক তখন বন্ধ থাকত, এ সময় ঘরের জমে থাকা কাজগুলো করতেন। রমযানও এ থেকে বাদ পড়ত না। আমাদের ঘর ছিল জীর্ণ ও পুরোনো। টুকটাক অনেক কাজ তৈরি হত ও জমতে থাকত। মাদরাসার বিরতির সময়গুলোতে আব্বা এ কাজগুলো নিজেই করতেন। আমাদেরকে সঙ্গে রাখতেন। রমযানের বিরতিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সকালের বিশ্রামের পর আব্বা এ কাজগুলো করতেন।

এটি আমার দেখা আমার আব্বার রমযানের একটি ছোট্ট কারগুযারী। সত্য কথা হল, যেভাবে দেখার কথা ছিল একজন আল্লাহওয়ালার জীবন, সে দেখা আমি দেখিনি, দেখতে পারিনি। তারপরও এ খণ্ডিত দেখা থেকে আমার আল্লাহওয়ালা পিতার ইবাদতনিমগ্নতা ও রমযান কেন্দ্রিক যে মশগুলিয়াতের সবক আমি পেয়েছি, যদি কাজে লাগাতে পারি, এতটুকুও আমার ও আমাদের জন্য অনেক অনেক বড় সবক। আল্লাহ তাআলা আমলের তাওফীক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।  

 

 

advertisement