রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

‘মুখোশ উন্মোচন’, কিন্তু...!

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

[আদীব হুযুর দামাত বারাকাতুহুমের এ গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি একুশ বছর আগের। আমার জানামতে তা এখনো ছাপা হয়নি। হঠাৎ লেখাটির কথা মনে পড়ল এবং মনে হল, এ মহূর্তে তা পাঠকদের জন্য উপকারী হবে। মূলত এতে আমাদের সবার জন্যই শিক্ষা গ্রহণের অনেক কিছু রয়েছে। আর এমন একটি ঐতিহাসিক লেখা এমনিতেও সংরক্ষিত হওয়া জরুরি।

কারো পুরনো লেখা ছাপার আগে তাকে দেখিয়ে নেওয়া বা তার থেকে নতুন করে অনুমতি নেওয়া মুনাসিব। এ লেখাটির ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। সেজন্য লেখকের খেদমতে পূর্ব মাযেরাত।

جزاه الله خيرا جزيلا في الدارين جميعا، وبارك في حياته وقلبه وقلمه، ومدرسته وذريته في البيت والمدرسة.

বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক]

 

ইনকিলাবের মুক্তাঙ্গনে কিছুদিন আগে (মাওলানা) মওদূদী ও জামায়াতের সমালোচনা করে একটা কড়ালেখা লিখেছিলেন সাইফুল আদল নামে জনৈক মুফতী সাহেব। সেই লেখার একটা চড়াজওয়াব দিয়েছেন গত ১৭ই মে (২০০৫) ইনকিলাবের একই পাতায় জনৈক আবদুল আযীয। তিনি, অবশ্য মুফতী নন, ‘কলেজ লেকচারার। লেকচারার সাহেব তার লেখাটার নাম দিয়েছেন মুখোশ উন্মোচন। তা মুখোশ তিনি ভালোই উন্মোচন করেছেন, তবে কিনা বেচারা মুফতী সাহেবের চেহারার ত্বকেরও যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছেন।

আমার এক দ্বীনী ভাইয়ের অনুরোধে দুটো লেখাই পড়লাম। তিনি বলেছিলেন, কষ্ট করে হলেও পড়তে। কষ্ট করেই পড়তে হল। এত কষ্ট হল যে, প্রথমে ঝরল চোখের পানি, এখন ঝরছে কলমের কালি। দুঃখের বিষয়, ‘মুফতীএবং অমুফতী’, শালীনতা উভয়েরই হাতছাড়া (কিংবা বলুন কলমছাড়া’) হয়ে গেছে। দুজনেরই মনে রাখা উচিত ছিল, এটা চারদেয়ালের বাইরে মুক্তাঙ্গন এবং আমাদের কলম ঠোকাঠুকিহতে পারে অন্যদেরপুলকের কারণ। লেকচারার সাহেবের ভাষায় মুফতী সাহেব না হয়, অজ্ঞ, অপরিপক্ব, ঈর্ষাকাতর, ফতোয়াবাজ ইত্যাদি। কিন্তু তিনি নিজে তো কিঞ্চিৎবিজ্ঞতা ও পক্বতার পরিচয় দিতে পারতেন! মুফতী সাহেবকে তিনি আসমানী আয়াত বিল্লাতী হিয়া আহসান’ (তর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়)-এর যে তালীম দিয়েছেন, নিজের বেলায় কেন তিনি তা ভুলে গেলেন। ফতোয়াবাজিহল বামপাড়ার খান্দানি গালি। এটা ব্যবহার না করেও তো মুফতী সাহেবকে হেদায়েতকরা যেত!

একটা বিষয় আমার বড় অবাক লাগে, জামায়াতের দলীয় আকীদাহল, ‘রাসূলে খোদা ছাড়া আর কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করবে না’, সেজন্য মওদূদী সাহেব একেবারে কলজে পোড়ানো ভাষায় সাহাবা কেরামের সমালোচনা করে গেছেন। কিন্তু একই সূত্রে যখন মওদূদী সাহেবের সামান্যতম সমালোচনাও করা হয়, তখন জামাতী বন্ধুরা একেবারে কোরতার বাইরে এসে পড়েন এবং বেচারা সমালোচনাকারীকে তুলোধুনো করে ছাড়েন। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, তাদের মতে সাহাবা কেরামের সমালোচনা জায়েয আর মওদূদী সাহেবের সমালোচনা না জায়েয!

যাই হোক, উভয় পক্ষকেই আমি অনুরোধ করব, পত্রিকার পাতায় যা খুশি লিখুন এবং মুক্তাঙ্গনে যত ইচ্ছে বিতর্ক করুন, কিন্তু কলম যেন বেপর্দানা হয় এবং লেখা যেন শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে, এ বিষয়ে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে।

লেকচারার আবদুল আযীয সাহেব যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমি কিছু কথা বলতে চাই তার লেখার জবাবে। কাদিয়ানী প্রসঙ্গে নিযামী সাহেব কী বললেন, কেন বললেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের সাথে তার বক্তব্যের মিতালিকতটুকু সে প্রসঙ্গে না-ই বা গেলাম, কিন্তু এটা তো পরিষ্কার যে, নিযামী সাহেবের মন্তব্য অন্তত এ যাত্রা কাদিয়ানীদের শেষ রক্ষা করেছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এটাই চেয়েছিলেন। জামায়াত সব সময় গর্ব করে, আমরাও স্বীকার করি, কাদিয়ানী বিরোধী জিহাদে শরীক হয়ে মওদূদী সাহেব অনেকটা ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু জামায়াত এ কথা কেন ভুলে যায় যে, কাদিয়ানী বিরোধী জিহাদে মওদূদী সাহেব যাদের কাতারে শামিল হয়েছিলেন, সেই ওলামায়ে কেরামই তাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন? ফাঁসির রায় ঘোষণার মূল রহস্য অবশ্য এখনো অজ্ঞাত, তবে এটা তো ঠিক যে, এর ফলে আন্দোলন সেদিন ভিন্নপথে চলে গিয়েছিল এবং সে যাত্রা কাদিয়ানীদের শেষ রক্ষা হয়েছিল! জনৈক সাংবাদিক তাই মন্তব্য করেছিলেন, ‘মওদূদী হলেন হিরো, আন্দোলন হল জিরো।

এ বিষয়ে আমি নিজে অবশ্য কোনো সিদ্ধান্তমূলক কথা বলছি না, আমি শুধু বলতে চাই, ওলামায়ে কেরাম অকারণে ফতোয়ার তীরদ্বারা কাউকে বিদ্ধ করেন না। মওদূদী সাহেবের কলম যতদিন সংযত ছিল, ততদিন তারা তার উদার প্রশংসা করেছেন এবং প্রয়োজনে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু যখনই তার অসংযত কলম সাহাবা কেরামের সমালোচনায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তখন উম্মতের অভিভাবক হিসেবে ওলামায়ে কেরামকে বাধ্য হয়েই তার প্রতিবাদ করতে হয়েছে। অথচ বিভেদ সৃষ্টির দায়ে উল্টো তাদেরকেই দায়ী করা হয়। বলুন তো, কে মওদূদী সাহেবকে মজবুর করেছিল উম্মতের এমন নাযুক সময়ে, এমন নাযুক বিষয়ে কলম ধরতে! তার পরে ওলামায়ে কেরাম বিভিন্নভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন বিষয়টির গুরুতরতা, কিন্তু তিনি তার কলম থামাতে রাজী হলেন না। তখন উম্মতকে গোমরাহী থেকে হেফাজত করতে প্রতিবাদ করা ছাড়া ওলামায়ে কেরামের আর কী উপায় ছিল?

মওদূদী সাহেবের ফায়সাল পুরস্কারসম্পর্কে তার অনুসারীরা একটু যেন বেশী মাত্রায় উদ্বেলিত, আবদুল আযীয সাহেবও ব্যতিক্রম নন। কিন্তু একজন বাদশাহর পুরস্কার তো আর হক না-হকের আলামত হতে পারে না, সুতরাং এ নিয়ে এত হৈ চৈ করার কী কারণ হল। ফায়সাল পুরস্কারআরো অনেকেই পেয়েছেন। আমাদের মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-কে জোর অনুরোধ করা হয়েছিল। প্রথমে তিনি সম্মত হননি, পরে আপন শায়েখের আদেশে তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু এ নিয়ে তাঁর ভক্তকুলের মাঝে কোনো হৈ চৈ হয়নি। প্রসঙ্গত, আল্লামা নদভী রাহ. যিনি একসময় আরব বিশ্বে মওদূদীকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, পরবর্তী জীবনে কিন্তু তিনি শক্ত হাতে তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। আল্লামা নদভীর বইটি (বাংলায় অনুবাদ হয়েছে) প্রত্যেক চিন্তাশীল ব্যক্তিরই পড়ে দেখা উচিত।

আরব বিশ্বে মওদূদীর গগনচুম্বীজনপ্রিয়তা সম্পর্কে সুপ্রিয় আবদুল আযীয অনেক কথাই বলেছেন, কিন্তু আসল বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। মুফতী সাহেবের এ প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি যে, মওদূদীর এত এত বই আরবীতে তরজমা হল, ‘খেলাফত ও রাজতন্ত্রবইটির তরজমা কেন হল না? কীসের ভয়ে? আবদুল আযীয সাহেবের ভাষায় আকীদাতুল উস্তায আলমাওদূদীকিতাবটি আলিমরা লিখেছিলেন সউদী আরব তথা আরব বিশ্ব থেকে মওদূদীকে উৎখাত করার জন্য, কিন্তু তিনি নাকি যতই ভাবেন, ততই অবাক হন যে, আলিমদের উদ্দেশ্য সফল না হওয়ার কারণ কী?

কারণ আমাদের আলিমগণ বুখারী, মুসলিমের শায়েখ হলেও আধুনিক প্রচার কলাকৌশলের শায়েখনন। আপনাদের মোকাবেলায় এ ক্ষেত্রেও তারা বরং একেবারেই তিফলে মাকতাব। তাই বাজার থেকে বই উধাও করে ফেলার কৌশল আমাদের ভোলাভালা আলিমদের কল্পনায়ও আসে না। আপনাদের সংগঠন মজবুত, কম্যুনিস্টদের চেয়েও মজবুত, পক্ষান্তরে তখন এবং এখন সব সময় সংগঠনে আমরা আনাড়ী। নইলে আপনারা যেখানে এমন একাট্টাসেখানে আমাদের ঐক্য মাত্র তিন ভাগ। সুতরাং সউদী আরব বা তাদের মুরব্বী আমেরিকা, কোথাও থেকে আপনাদের উৎখাত করা সম্ভব নয়। অবশ্য ওলামায়ে কেরাম একবার যদি এক হতে পারতেন, তাহলে বোঝা যেত ইসলামী জনতা কাদেরকে ইসলামী শক্তি মনে করে। তবে একটা কথা, শক্তি ও সংগঠন যতই মজবুত হোক, জামায়াতের সুদীর্ঘ কালের বিশাল আয়োজনপূর্ণ রাজনীতির খোলাছা কিন্তু একটাই, জোয়ারের তোড়ে এগিয়ে যাওয়া এবং ভাটার টানে পিছিয়ে আসা। এটা কীসের আলামত, জামাতীদের অবশ্যই তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

সুপ্রিয় আবদুল আযীয গর্ব করে লিখেছেন, ‘বাতিলের মোকাবেলায় হকের প্রতিষ্ঠায় প্রায় দুই শতাধিক তেজোদীপ্ত যুবক অম্লান বদনে শীর দিয়েছে, আমামা দেয়নি।

আমার জানা মতে জামাতী বন্ধুদের মুখে কিঞ্চিৎ দাড়ি থাকলেও কখনো মাথায় তাদের আমামা থাকে না, সুতরাং দেয়া না দেয়ারও প্রশ্ন আসে না। আমামা তো থাকে আলিমদের মাথায়, তারা অবশ্য শীর দেয় আমামা দেয় নাএবং বিপদকালে লেবাসও বদল করে না। বেশী দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, মালিবাগে এবং শহীদ বাড়িয়ায়কারা শহীদ হল? আফগানিস্তানে কারা জান দিল? সর্বোপরি মার্কিন সরকার পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো নিয়ে কেন এত চিন্তিত? হল দখলের দাঙ্গায় মারা যাওয়া আর মসজিদ রক্ষার জন্য জান দেয়া কি এক হল?

আবদুল আযীয লিখেছেন, ‘ঐক্যের বাণী নিয়ে প্রফেসর গোলাম আযমসহ জামায়াত নেতৃবৃন্দ মরহুম হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদীস মাওলানা আযীযুল হক, চরমোনাইয়ের পীর ছাহেব প্রমুখের কাছে বার বার ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু... ...

জী, আমিও বলি, এখানে একটা কিন্তুআছে। ইতিহাস সাক্ষী, জামায়াতের বিভিন্ন দুঃসময়ে ওলামায়ে কেরাম বার বার আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু প্রয়োজনে ব্যবহারএটাই ছিল জামায়াতের ব্যবহার। একাত্তরের কেয়ামতেরপর যার ছায়ায় জামায়াত আত্মপ্রকাশকরেছিল (ইত্তেহাদুল উম্মাহর ব্যানারে), তার নাম খতীবে আযম মাওলানা ছিদ্দীক আহমদ। তিনি ভেবেছিলেন, এত বড় কেয়ামত জামায়াতের চরিত্রে নিশ্চয় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। না, যথারীতি সেখানেও বড় একটা কিন্তুএসে হাজির হয়েছিল এবং খতীবে আযমের মতো ব্যক্তিকেও ব্যবহৃতহওয়ার মধুরঅভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছিল।

মওদূদী সাহেব ও তার অনুসারীদেরকে ওলামায়ে কেরাম বার বার অনুরোধ করেছেন, ‘মাকামে সাহাবা ও ইছমাতে আম্বিয়া’-এর মতো নাযুক আকীদার বিষয়ে কলম বন্ধ রাখুন এবং ঐক্যের পথে আসুন। কিন্তু জামায়াতের এক কথা, মওদূদী যা খুশী লিখবেন, আমরা শুধু পড়ব, তিনি যা খুশী বলবেন, আমরা শুধু শুনব, প্রতিবাদ করলেই বলা হবে, আলিমরা ইসলামী ঐক্যের বিরোধী। তালগাছ আমারএমন ঐক্য তো হতে পারে শুধু ভারত-বাংলাদেশের মাঝে।

হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর দরবারে গোলাম আযমের ধরনাদেয়ার যে কথা আবদুল আযীয সাহেব বলছেন! আমি নিজেই তার সাক্ষী। গোলাম আযমের আবদার এবং হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর জবাব আমি নিজের কানে শুনেছি। আমার সৌভাগ্য, সেদিন আমি দেখেছিলাম, কেমন হয় মুমিনের ঈমানী ফারাসাত! ধৈর্য ধরে গোলাম আযমের দীর্ঘ বয়ানশুনে হযরত শুধু দুটি বাক্য বললেন, ‘ইত্তিহাদুল উম্মাভালো কথা, তবে কীসের ওপর ইত্তিহাদ? শাড়ি তো নয়া, কিন্তু দুলহান তো পুরানা। শুধু শাড়ি নয়, দুলহান বদল করুন। আকলমন্দের জন্য ইশারা কাফী, আর গোলাম আযমকে তার শত্রুরাও আকলমন্দ মনে করে। তাই বুঝতে তার বিলম্ব হল না যে, ইনি আসলে অন্য কিছু। সুতরাং আবদুল আযীয সাহেবরা যা-ই করুন ঐক্যের মারছিয়াআর শোনাবেন না।

আমি বলি না, জামায়াত ও কাদিয়ানী একেবারে এক কাতারে। আমি শুধু বলতে চাই, কাদিয়ানীদের সাথে বিরোধের মূল বিষয় হল আকীদায়ে খতমে নবুওয়াত। এই আকীদার বিশ্বাস হল ঈমান আর এই আকীদার অস্বীকার বা বিকৃতি হল কুফর। আর জামাতের সাথে বিরোধের মূল বিষয় হল, ইছমতে নবী ও আদালাতে সাহাবা। এটা হক ও গোমরাহীর মাসআলা। ইসলামী উম্মাহর সর্বকালীন ও সর্বজনীন আকীদা এই যে, নবীগণ সকলেই মাসুম ও নিষ্পাপ, কিন্তু মওদূদী বলে(ন), নবীদের ইছমত কখনো কখনো তুলে নেয়া হত, যাতে প্রমাণিত হয় যে, তারা মানবছিলেন। এটা সত্য হলে নবুওয়াত ও রিসালাতের গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তদ্রূপ নবুওয়াতের সোহবতপ্রাপ্ত সাহাবা কেরামের একক ও সামগ্রিকআদালাত ও ন্যায়পরতা স্বীকার না করলে দ্বীনের বুনিয়াদই ধ্বসে যায়। সুতরাং এ বড় ভয়ংকর গোমরাহী। এটা ইসলামী ফিকহের মাযহাবী ইখতিলাফ নয়, এটা হক ও গোমরাহীর বিরোধ।

আবদুল আযীয বলতে চান, যে মওদূদী শত শত পৃষ্ঠা লিখেছেন সাহাবা-প্রশস্তির উপর, তিনি কীভাবে হতে পারেন সাহাবার নিন্দাকারী!

দেখুন, কেউ যদি জেগে ঘুমুতে চান, আমি তার নিদ্রায়ব্যঘাত ঘটাব না। তবে সত্যি যারা নিদ্রিত, শুধু তাদের জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, শত পৃষ্ঠার প্রশংসা এক পৃষ্ঠার নিন্দাকে বৈধতা দান করে না। এক মন দুধে এক ফোঁটা... ... এ তো আমাদেরই দেশের প্রবাদ। গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নবী প্রশস্তিশুনবার মতো, যাকে বলে পাক্কা আশেকে রাসূল। তাঁর একটি মশহুর কাবিতাপঙ্ক্তি হল

 ‘মুহম্মদ-প্রেমহয় যদি কুফুরি,

কসম খোদার, সেরা কাফির আমি দুনিয়ার।

গোলামের বাচ্চা’ ‘ছোট্টএকটা কাজ করেছে। নবীর শুরু থেকে আখেরীশব্দটি সরিয়ে দিয়েছে।

মওদূদীর সাহাবা প্রশস্তিওসাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হত, যদি তিনি ছোট্ট একটা কাজ না করতেন, ‘একটু একটুনিন্দা করে সাহাবা কেরামের আদালাত ভবনেরইট খুলে না ফেলতেন। অমুক সাহাবী ঘুষের লেনদেন করেছেন, তহবিল তছরুপ করেছেন, অমুক সাহাবী স্বৈরাচার ও স্বজনপ্রীতির পলিসিগ্রহণ করেছেন।আপনিই বলুন, এই তবরুকবিতরণের পর প্রশস্তির কী মূল্য থাকে! তবু আমরা কৃতজ্ঞ, কারণ নামের আগে হযরতএবং পরে রাদিয়াল্লাটুকু তিনি বহাল রেখেছেন।

লেকচারার আবদুল আযীয সাহেবের একটি লেকচারশুনুন মওদূদীর সাহাবা সমালোচনাতো তার নিজস্ব নয়, আলবিদায়া, আলকামিল, তাবারী প্রভৃতি জগদ্বিখ্যাত ও সর্বজনস্বীকৃত ইতিহাসগ্রন্থ থেকে আহরিত। সুতরাং অপরাধ হলে ঐ ইতিহাস সংকলক জগদ্বরেণ্য ঐতিহাসিকদের হবে, মওদূদীর কেন হবে?

জী, অতি সরল যুক্তি এবং বহুবার ব্যবহৃত এবং আবদুল আযীযের পূর্বে তাদের নেতা মওদূদী সাহেবও এসব যুক্তি বারবার দেখিয়েছেন। কিন্তু স্বয়ং আল্লামা তাবারী যে তার কিতাবের ভূমিকায় সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, এসকল বর্ণনার সত্যমিথ্যার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা শুধু সংগ্রহ ও সংকলন করেছি, পর্যালোচনা ও নির্বাচন করিনি, এ প্রশ্নের কী জবাব আছে বড় হুজুরএবং ছোট হুজুরদের কাছে?

বস্তুত এ বিষয়ে শেষ কথা হল, দুটি মাত্র শব্দ, ‘কালেকশনসিলেকশন। ঐতিহাসিকগণ যা কিছু পেয়েছেন বিনা বিচারে তা সংগ্রহ করেছেন এবং সনদ ও সূত্র উল্লেখ করে দায়িত্বমুক্ত হয়েছেন। সেটাই ছিল তাদের তখনকার করণীয়। পরবর্তী কালের গবেষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, সনদ ও সূত্র এবং অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে বর্ণনার সত্যমিথ্যা নির্ধারণ করা এবং গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ‘বড় হুজুরতা করেননি, তিনি শুধু পছন্দেরবর্ণনাগুলো বরণকরেছেন, আর অপছন্দেরগুলো বিসর্জন দিয়েছেন। আমাদের অপরাধ, আমরা জী হুজুরবলতে পারিনি এবং বলতে পারব না।

ইমাম ইবনে তায়মিয়া, মোল্লা আলী কারী, শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও শাহ ইসমাঈল শহীদ, এদের নাম নিয়েছেন (শাহ) আবদুল আযীয। তিনি বলতে চান, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের এসকল বরেণ্য ইমামের সাহাবা সম্পর্কিত বক্তব্যের মওদূদী সাহেব প্রতিধ্বনি করেছেন মাত্র। সুতরাং ইমামের নামায নষ্ট না হলে মুক্তাদির নামায কেন নষ্ট হবে?’

হয়, মুক্তাদি দুষ্টহলে এমনও হয়। প্রথম কথা, ‘সাহাবানিন্দাসবার জন্য সমান অপরাধ। এখানে আগে-পিছে নেই, ইমাম-মুক্তাদি নেই। দ্বিতীয় কথা, সে যুগের ইমামদের বক্তব্যে ভুল কিছু থাকলেতা কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, তার প্রভাব সর্বপ্লাবী ছিল না। পক্ষান্তরে প্রধানত বিশ শতকের একাডেমিক, সাংগঠনিক ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার সুবাদে মওদূদীর মতামতসর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে, তাই তার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তৃতীয় কথা, পূর্ববর্তী কোনো ইমাম কোনো সাহাবীর শানে গোস্তাখী করেছেন এটা আসলেই মিথ্যা কথা।

আবদুল আযীয সাহেব ইমামদের উদ্ধৃতি এনেছেন এবং সেগুলোর কুশলী তরজমা করেছেন। সময়ের অভাবে আমরা তার কৃত তরজমা মেনে নিয়েই বলছি, ইমামদের বক্তব্যের খোলাছা তো শুধু এই :

ক. শক্তি, প্রজ্ঞা ও অন্যান্য গুণে হযরত উছমান হযরত ওমরের মতো ছিলেন না।

এ বক্তব্যে দোষের কিছু নেই। হযরত উছমানের স্তর ও মর্যাদা যে হযরত ওমরের পরে ছিল, সে তো জানা কথা, যেমন হযরত ওমর রা.-এর স্তর হযরত আবু বকর রা.-এর পরে ছিল। তবে তাঁরা সবাই আদর্শখলীফা ছিলেন। নিজ নিজ সময় ও পরিস্থিতিতে তাঁদের নীতি ও পদক্ষেপ সঠিক ছিল এবং পরবর্তী কালের উম্মতের জন্য তা আদর্শ।

খ. হযরত উছমান রা.-এর স্বভাবপ্রকৃতি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রা. থেকে ভিন্ন ছিল। কেননা হযরত উছমান কখনো কঠোরতার পরিবর্তে নমনীয়তার (সঠিক তরজমা, ‘নম্রতার’) আশ্রয় নিতেন।

এ মন্তব্যেও আপত্তির কিছু নেই। কারণ আসলেই তিনি ছিলেন স্বভাবনম্র। এই স্বভাবনম্রতার কারণেই তো নিজের জীবনের বিনিময়েও তিনি মদীনায় রক্তপাতের অনুমতি দেননি।

গ. তাঁর নিযুক্ত প্রশাসকদের মাঝে ছিদ্দীকী ও ফারুকী যুগের প্রশাসকদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য ছিল না। এটাও সত্য কথা। ছিদ্দীকী, ফারুকী, উছমানী ও আলাবী এই চার যুগের শাসক ও শাসিতদের মাঝে পার্থক্য থাকাই তো স্বাভাবিক, তবে তা হল ন্যায় ও কল্যাণেরই স্তর তারতম্য, ভালো ও মন্দের নয়।

মওদূদী সাহেব যদি শুধু এইটুকু বলতেন, তাহলে আমাদের নরমমাথা এত গরম হত না। কিন্তু মওদূদী সাহেব যা বলেছেন, তার একটি মাত্র নমুনা দেখুন-

খলীফা ওমর রা.-এর নির্দেশ ছিল, পরবর্তী খলীফা এ বিষয়ে দায়বদ্ধ থাকবেন যে, তিনি আপন গোত্রের সাথে কোনো সুবিধামূলক আচরণ করবেন না, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তৃতীয় খলীফা হযরত উছমান এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত মানদণ্ড রক্ষা করতে পারেননি। তার আমলে বনু উমাইয়াকে প্রচুর পরিমাণে বড় বড় পদ এবং বাইতুল মাল থেকে বড় বড় দান প্রদান করা হয়েছিল।’ (খিঃ ওয়া মুঃ পৃঃ ৯৯)

শব্দপ্রয়োগ কুশলী বটে, কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়ায়। পূর্ববর্তী খলীফার আদেশ লঙ্ঘন, স্বজনপ্রীতি, বাইতুল মালের খেয়ানত এবং (আধুনিক যুগের) দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ, এই নয় কি! সুতরাং হে সৈয়দ মওদূদী! এখন আপনি যেখানে আছেন, সেখানে আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন।

হাদীস শরীফে এসেছে, যে শাসক সরকারি পদ বণ্টনে স্বজনপ্রীতি করে, তার ওপর আল্লাহর লানত (আততারগীব ওয়াত তারহীব) এমনকি এ যুগের শাসকের জন্যও এটা অমার্জনীয় অপরাধ। তাহলে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উম্মতের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, যার সম্পর্কে আল্লাহর নবীর ভবিষ্যদ্বাণী হলফেতনার সময় উছমান হেদায়াতের উপর সুদৃঢ় থাকবেন’ (তিরমিযী, আলবিদায়া)। একজন খলীফা নিহত হবেন এবং ফেতনা হবে, কিন্তু তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়নীতির ওপর অবিচল থাকবেন। (আলবিদায়া- ৭) তাঁর সম্পর্কে এমন গোসতাখী কীভাবে বরদাশত করা যায়!

আমাদের প্রশ্ন, নবুওয়াতের ছোহবতধন্য উম্মতের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির খেলাফতের যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে এ যুগের মওদূদী যখন আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসনকায়েম করবেন, তখন কী অবস্থা হবে?

শরীয়তী দৃষ্টিকোণ ছাড়া নিছক ইতিহাসের দৃষ্টিতেও এ জঘন্য অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। হযরত উছমান রা.-এর খেলাফতকালে ৪৭ জন প্রশাসক ছিলেন। ইতিহাসে তাদের নামের তালিকা রয়েছে। (আলকামিল, খ. ৩, পৃ. ৫০-৫১)

আদমের বেটা হিসাবে অবশ্য এই সাতচল্লিশ জনের সবাই হযরত উছমানের আত্মীয়। তবে ঐতিহাসিকগণ এ দীর্ঘ তালিকা থেকে মাত্র পাঁচজনকে চিহ্নিত করেছেন, যারা দূর বা নিকট কোনো না কোনোভাবে তাঁর আত্মীয় ছিলেন।

যথা : মুআবিয়া রা., ওয়ালীদ ইবনে ওকবা রা., সাঈদ ইবনুল আছ রা. এই তিনজন ছিলেন উমাইয়া বংশের। তবে তাদের আত্মীয়তাও ঘরের আত্মীয়তা ছিল না। অন্য দুজন হলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আমির রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাআদ ইবনে আবী সারাহ। এই পাঁচ জনই ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সাহাবী।

ফেতনাকারীদের অভিযোগের জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে মজলুম খলীফা হযরত উছমান রা. যা বলেছিলেন এ যুগের ফেতনাকারীরাও তা শুনে রাখুনতারা বলে, আমি আমার খান্দানকে বেশী ভালবাসি এবং তাদেরকে বেশী দান করি। কিন্তু সে ভালবাসা অন্যায় কাজে তাদের সাহায্য করে না, শুধু তাদের হকতাদের কাছে পৌঁছে দেয়, আর তাদেরকে আমি শুধু নিজের মাল থেকে দান করি। মুসলমানদের মাল না আমি নিজের জন্য হালাল মনে করি, না অন্য কারো জন্য। আমি তো পূর্ববর্তী তিন যুগেও তাদেরকে দান করতাম। খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় আমি আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ছিলাম। অথচ এখন আমার হজে¦র জন্য দুটি উট ছাড়া কিছু নেই। (তারপর তিনি মদীনার হাজিরানদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমার কথা সত্য নয়? তারা বলল, আল্লাহর কসম, সত্য)

মওদূদী সাহেব! আল্লাহর কসম, সত্য! ইতিহাসযদি অন্য কিছু বলে তবে তা ছুড়ে ফেলুন এবং জান্নাতীখলীফার কথা সত্য বলে গ্রহণ করুন।

অবশেষে এই বলে আমি আমার লেখার ইতি টানছি, মওদূদী ও তার জামাতের প্রতি ওলামায়ে কেরামের ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ তখনো ছিল না, এখনো নেই, কিন্তু সাহাবা কেরামের সমালোচনা ও দোষচর্চা তারা বরদাশত করতে পারেন না। সুতরাং সুপ্রিয় আবদুল আযীয, আপনি আপনার লেখার সমাপ্তিতে ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা যদি আন্তরিক হয়, তাহলে দয়া করে সাহাবা কেরামের সমালোচনার ফিতনা পরিত্যাগ করুন, তারপর ঐক্যের কথা বলুন। ইনশাআল্লাহ ইস্পাত কঠিন ঐক্যের জন্য আমরা প্রস্তুত। আল্লাহ কবুল করুন, আমীন।

 

আবু তাহের মিছবাহ্

শিক্ষক, আরবী ভাষা ও সাহিত্য

মাদরাসাতুল মাদীনাহ, ঢাকা

১১/৪/১৪২৬ হি.

 

 

advertisement