বায়তুল মোকাররমের মিম্বর থেকে
‖ রমযানের যথাযথ কদর করুন, তাকওয়া ও মাগফিরাত লাভে সচেষ্ট হোন
হামদ ও সালাতের পর...
أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ.
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ.
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَ الْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْیَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِیْضًا اَوْ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ یُرِیْدُ اللهُ بِكُمُ الْیُسْرَ وَ لَا یُرِیْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَ ِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰی مَا هَدٰىكُمْ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ.
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শোকর আদায় করছি, তিনি আমাদেরকে রমযানুল মোবারকের এই পবিত্র মাসে উপনীত করেছেন। রমযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান সিয়াম আদায় করতে পারছি, আলহামদু লিল্লাহ! বরকতপূর্ণ এই মাসে বিশেষ দুটি আমল রয়েছে, যা অন্য মাসে নেই। দিনে ফরয রোযা, রাতে তারাবী। এই দুই আমল ছাড়া রমযানে আমরা যত ইবাদত করি, সবই রমযানের বাইরেও সারা বছর রয়েছে।
রমযানের রোযা সম্পর্কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدّمَ مِنْ ذَنْبِه.
ঈমানের দাবিতে এবং ইহতিসাবের সাথে যে ব্যক্তি রমযান মাসে রোযা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার পেছনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮
আমি মুমিন। ঈমানের দাবিতে মুমিনের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ ও বিধান হল রমযান মাসে রোযা রাখা। একজন মুমিন হিসেবে আল্লাহর সেই হুকুম পালনের জন্য এবং তাঁকে রাজি-খুশি করার জন্য আমি রমযানের রোযা রাখছি। একেই হাদীস শরীফে ঈমানের সাথে রোযা রাখা বলা হয়েছে।
ইহতিসাব অর্থ হল, সওয়াবের আশা। অর্থাৎ রোযা রাখছি আল্লাহর নিকট থেকে সওয়াব লাভ করার জন্য। এই রোযা রাখার বিনিময় একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমি নিতে চাই।
খুতবায় তিলাওয়াতকৃত আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ.
রমযান মাস; যে মাসে নাযিল হয়েছে কুরআন।
هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَالْفُرْقَانِ.
অর্থাৎ মানুষের হেদায়েতের জন্য এবং হেদায়েতের নিদর্শন সম্বলিত এই কুরআন। আর যেই কুরআন হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য নিরূপণকারী।
কাজেই এত মাহাত্ম্যপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে কুরআন পেয়েছ রমযান মাসে, তার শোকর আদায় কর! সেই শোকরের প্রথম কাজ হল রমযান মাসে রোযা রাখা। কুরআনের ভাষায়–
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْیَصُمْهُ.
যে ব্যক্তি রমযান পেয়ে গেল এবং রমযানে উপনীত হল, তার কাজ হল রোযা রাখা।
ওযর ছাড়া কাযা আদায়েও বিলম্ব উচিত নয়
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন–
وَ مَنْ كَانَ مَرِیْضًا اَوْ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ.
অর্থাৎ আর যে এই পরিমাণ অসুস্থ যে, রোযা রাখা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যায় অথবা সে সফরে আছে, তার জন্যও আল্লাহ তাআলা ছাড় দিয়েছেন। এখন কাযা করবে, পরে সুযোগ হওয়া মাত্রই দেরি না করে আদায় করে নেবে।
অসুস্থতার কারণে রোযা রাখতে না পারলে আল্লাহ তাআলা ছাড় দিয়েছেন। ঠিক আছে, এখন রাখা লাগবে না; কিন্তু সুস্থ হলে পরবর্তীতে কাযা করে দিতে হবে। সুস্থ হয়ে গেলেই অথবা সফর থেকে ফিরে এলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব কাযা করে নেওয়া। সুযোগ পাওয়ার পর বিলম্ব করা ঠিক নয়। রমযানের মধ্যেই সুস্থ হয়ে গেলে অবশিষ্ট রোযাগুলো রাখবে। আর ছুটে যাওয়া রোযাগুলো ঈদুল ফিতরের পর যত দ্রুত সম্ভব কাযা করে ফেলবে। বিশেষ কোনো ওযর ছাড়া কাযা আদায়ে বিলম্ব করা উচিত নয়।
মুসাফির বলতে কী বোঝায়?
মুসাফিরের বেলায়ও একই কথা। রমযানে সফর থেকে ফিরে আসা হলে অবশিষ্ট রোযাগুলো আদায় করতে থাকবে আর ঈদুল ফিতরের পরে ছুটে যাওয়া রোযাগুলো কাযা আদায় করে নেবে।
কিন্তু হাঁ, মুসাফিরের অর্থ ও সংজ্ঞা আমাকে জানতে হবে! ঢাকার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত গেলে মুসাফির হয় না। আরবী ভাষা ও শরীয়তের দৃষ্টিতে যেটুকু দূরত্বে গমন করার নিয়ত করে বের হলে ‘সফর’ বলা হয়, সেই সফর এখানে উদ্দেশ্য। বর্তমান যাতায়াতব্যবস্থার মতো আগে এত সুন্দর ব্যবস্থা ছিল না। মানুষ তখন উটের পিঠে সফর করত। যাত্রাবিরতি, বিশ্রাম, পানাহার ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণসহ অবিরাম তিন দিন সফর করে যত দূর উটের পিঠে করে সফর করা যায়, সেটাই হল শরয়ী সফর। হিসাব করে এবং আন্দায করে দেখা গিয়েছে, সাধারণত এটি হয় ৪৮ মাইল, বর্তমানের হিসেবে ৭৮ কি. মি.। এই পরিমাণ দূরত্বে গন্তব্যের উদ্দেশে যে নিজের এলাকা থেকে বের হবে, সে-ই হবে মুসাফির। নিজের এলাকা থেকে বের হওয়ার পর সফরের বিধান শুরু হবে। এমন মুসাফির ব্যক্তির জন্য ছাড় আছে। তার জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
আল্লাহ আমাদের জন্য কঠিন করতে চান না
অনেক সময় সফর কঠিন হয়ে যায়, তাই আল্লাহ তাআলা এই ছাড় দিয়েছেন। কিন্তু সফর কঠিন হোক আর সহজ, সর্বাবস্থায় এই ছাড় অব্যাহত থাকবে। তবে অন্য কোনো ওযর না থাকলে সফর অবস্থায় রোযা রেখে নেওয়া ভালো। তার পরও কেউ যদি আল্লাহর দেওয়া এ ‘ছাড়’ গ্রহণ করতে চায়, তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই! সে এখন রোযা না রেখে পরে কাযা করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা এই ছাড়টা বান্দাকে দিয়েছেন এবং বলেও রেখেছেন–
یُرِیْدُ اللهُ بِكُمُ الْیُسْرَ وَ لَا یُرِیْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ.
অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি কাঠিন্য চান না। কঠিন কঠিন বিধান দিয়ে তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলা কষ্ট দিতে চান না। তিনি তোমাদেরকে শরীয়ত ও শরীয়তের বিধান দান করেছেন তোমাদেরই কল্যাণ ও উপকারের জন্য। সাথে বিধানগুলো সহজ করে দিয়েছেন আমলগুলো সহজে পালন করার জন্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অনেক সহজ একটি শরীয়ত দান করেছেন। যদিও শয়তান ও নফসের ধোঁকায় এই সহজ শরীয়তটিও অনেকের কাছে কঠিন লাগে! প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক নারী পুরুষের ওপর (উপরিউক্ত দুই ধরনের মানুষদের ছাড়সহ) রমযানের রোযা ফরয।
রমযানের ক্ষেত্রে আরও একটি ছাড় রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন–
وَ عَلَی الَّذِیْنَ یُطِیْقُوْنَهٗ فِدْیَةٌ طَعَامُ مِسْكِیْنٍ.
অর্থাৎ কঠিন অসুস্থতা অথবা বার্ধক্যের কারণে এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, রমযানের পরেও সুস্থ হয়ে রোযা রাখার আশা করা যায় না। তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা ছাড় দিয়েছেন। তারা যেহেতু পরেও কাযা করতে পারবে না, সেজন্য তারা একজন মিসকীনের দুই বেলা খাবার পরিমাণ ফিদ্ইয়া আদায় করবে। একজন মানুষের পেট ভরে দুই বেলা স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়ার জন্য যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, সেই পরিমাণ অর্থ কোনো গরিব মিসকীনকে দান করে দেবে। অথবা নিজের ঘরে ব্যবস্থা করে তাকে খাওয়াবে। সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ অর্থ দিলেও ফিদ্ইয়া আদায় হয়ে যায়। কিন্তু আসলে ওই অর্থ দিয়ে দুই বেলা পেট ভরে স্বাচ্ছন্দে খাওয়া-দাওয়া করা মুশকিল। এজন্য যে মহল্লায় একজন মানুষের এক দিনের খাবারের জন্য যে পরিমাণ অর্থ লাগে, সেই পরিমাণ অর্থই দান করাই উচিত।
আমার রমযান যেভাবে সার্থক হবে
যেভাবে অর্জিত হবে তাকওয়া ও সংযম
মাসআলা-মাসায়েল সবাই আলেমদের থেকে জেনে নেবেন। দ্বীনী বইপত্র পড়ে নেবেন। এই ধরনের সংক্ষিপ্ত মজলিসে বিস্তারিত মাসআলা আলোচনা করা যায় না। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল, আল্লাহ তাআলা তো রমযানের রোযা ফরয করেছেন। যা এই আয়াত থেকে যেমন জানা যায়, তার আগের আয়াত থেকেও জানা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন–
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَیْكُمُ الصِّیَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ.
অর্থাৎ হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে। যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর রোযার বিধান ছিল। রোযা তাদের ওপরও ফরয ছিল, তোমাদের জন্যও রমযান মাসের রোযার বিধান দেওয়া হয়েছে।
শুনতে তো অনেক ভারী মনে হয়! এক মাস! কিন্তু আসলে অল্প কয়দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন–
اَیَّامًا مَّعْدُوْدٰتٍ.
হাতেগোনা অল্প কটা দিন। শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়। সিয়ামের এই ইবাদত যদি পালন করতে পার, ইনশাআল্লাহ, তোমরা মুত্তাকী হতে পারবে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন–
لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ.
যাতে তোমরা মুত্তাকী হয়ে যেতে পার!
আল্লাহ আমাদেরকে যে বিধান দান করবেন তার মধ্যে থাকে অনেক হেকমত তাৎপর্য ও রহস্য। রোযার বিধানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা এখানে একটি হেকমত উল্লেখ করে দিয়েছেন– যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। এজন্য সিয়ামের নগদ ফায়দা ও কল্যাণ তাকওয়া অর্জন।
রমযান সংযমের মাস। আমার ঘরের খাবার-দাবার আমার জন্য হালাল ছিল। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে দিনের বেলা আমি আমার হালাল খাবার থেকে বিরত থাকছি। এগারো মাস দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টাই খেতে পারতাম, রমযান আসার পর রাতে খেতে পারছি। কেবল সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি থেকে বিরত থাকছি। কিছুই খাচ্ছি না। এক লোকমা খাবারও না। এক ফোঁটা পানিও না। আল্লাহ নিষেধ করেছেন, সে নিষেধটি গ্রহণ করেই আমি রমযানে দিনের বেলা আমার হালাল পানাহার থেকে বিরত থাকছি।
এখান থেকে একজন মুমিন স্বাভাবিকভাবেই এই সবক ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে যে, যার হুকুমে আমার হালাল জিনিস রমযানের এই দিনের বেলা আমার জন্য নিষেধ হয়ে গেল, সেটাই আমি মেনে চলছি, বিরত থাকছি, সুতরাং যেসব কথা ও কাজ, যেসব আচার-আচরণ এবং যেসব চিন্তা-ফিকির আল্লাহ তাআলা সব সময়ের জন্য ও সারা বছরের জন্য হারাম ও নিষেধ করে রেখেছেন, সেগুলোতে আমি কীভাবে নিজেকে জড়াব?
সমস্ত গুনাহের কাজ, পাপাচার, অনাচার সবকিছু সারা বছরের জন্য হারাম নয় কি? সকল কবীরা ও সগীরা গুনাহ বারো মাসের দিন-রাতের সব সময়ই হারাম। যে আল্লাহ হুকুম করার কারণে আমি আমার হালাল বিষয়গুলোই ছেড়ে দিলাম, সে আল্লাহর জন্য আমি কি হারামটা ছাড়ব না? ছাড়তে হবে।
এই হল সিয়ামের তাৎপর্য। রোযার প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে ডেকে ডেকে বলে, আরে তুমি তো আল্লাহর হুকুমে এই হালাল খাদ্য এখন গ্রহণ করছ না, পান করছ না, তাহলে আল্লাহ যে গীবত করাকে হারাম করেছেন, তা থেকেও বিরত থাক। হারাম করেছেন চোগলখুরি করাকে, সেটা থেকেও বিরত থাক। জুলুম করাকে হারাম করেছেন, সেটা থেকেও বিরত থাক। সুদ, ঘুষ আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন, মা-বাবার অবাধ্য হওয়াকে হারাম করেছেন, দ্বীন-শরীয়তের নামে মিথ্যা বলা, আল্লাহ ও আল্লাহর নবীর নামে মিথ্যা বলা হারাম করেছেন, দ্বীন-শরীয়তের কোনো বিধান নিয়ে উপহাস করা হারাম করেছেন, এগুলো তো এমন হারাম যে, একেবারে স্পষ্ট কুফর। কুফর শিরক পর্যায়ের যেসব হারাম কাজ রয়েছে, যেগুলোর কারণে একজন মুসলমান ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায় এবং মুসলিম থাকে না, সেসব হারাম থেকেও বেঁচে থাক! সকল হারাম ও কবীরা গুনাহ, সেগুলো থেকেও বিরত থাক! যেসব নাজায়েয কাজ সগীরা গুনাহ, সেগুলো থেকেও বেঁচে থাক! কারণ এগুলো সব সময়ের জন্যই আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন। কেবল রমযানের দিনের বেলায় আল্লাহ তাআলা কিছু হালাল জিনিসকে নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকছ, তাহলে যেগুলো আল্লাহ তাআলা সব সময়ের জন্য হারাম করেছেন, সেগুলো থেকে কেন বেঁচে থাকবে না?
এটা হল সিয়ামের বার্তা। এর নামই তাকওয়া। এটাই সংযম। অর্থাৎ নিজেকে কন্ট্রোল ও নিয়ন্ত্রণ করা। আমার জিহ্বা আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোনো কথা বলবে না। আমার যবান ও চোখকে আমি আল্লাহর নাফরমানীতে ব্যবহার করব না। আমার কানকে আল্লাহর নাফরমানীতে ব্যবহার করব না। আমার হাত-পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনো কিছুকেই আল্লাহর নাফরমানীতে ব্যবহার করব না। যে কথা ও কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন সে কথা ও কাজ আমি করব না। এর নামই তাকওয়া, এর নামই সংযম।
যেভাবে রোযাকে ঢাল বানাব
সিয়ামের আরও অনেক ফায়দা রয়েছে আখেরাতের জীবনে। বরং সেটি কবর জগৎ থেকেই পাওয়া শুরু করব, যদি ঠিকভাবে রোযা রাখি এবং রোযার হক আদায় করি। সেটা হল এই সিয়াম আমার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়াবে– জাহান্নাম থেকে, কবরের আযাব থেকে; যদি সে ঢালকে আমি অক্ষত রাখতে পারি।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
الصيام جنة.
সিয়াম তোমাদের জন্য ঢাল! কবরের আযাব থেকে শুরু করে আখেরাতের কঠিন কঠিন যত পরিস্থিতি আসবে, বিশেষ করে জাহান্নামের আগুন থেকে এই সিয়াম আমার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। এই সিয়ামের মাধ্যমে আমি আগুন থেকে রক্ষা পাব, ইনশাআল্লাহ! শর্ত হল, সিয়ামকে নষ্ট করা যাবে না, বরং অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই ঢাল আবার নষ্ট হয় কীভাবে?
সিয়াম নষ্ট হওয়ার মূল কারণগুলো তো কম-বেশি সবাই জানে; কিন্তু সিয়াম যে ‘জুন্নাহ’ বা ঢাল, সেটা নষ্ট হয় কীভাবে? কী কী অসতর্কতার কারণে সিয়াম আমার জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে না– তা কি সবাই জানে?
সেটা কী? সেটা হল যবানের গুনাহ। গীবত করা, চোগলখুরি করা, পরনিন্দা করা। দুনিয়াতে সবচেয়ে অনর্থক কাজ হল পরনিন্দা। আরেকজনের দোষ নিয়ে আমি ব্যস্ত, আমার নিজের কি দোষের অভাব আছে? নিজের দোষ নিয়ে কেন আমি ফিকির করছি না? আমি যদি আমার অবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে তো তওবা-ইস্তেগফারের মধ্যেই ব্যস্ত থাকতে পারি! আরেকজনের চিন্তা করার বা চর্চা করার সুযোগই তো পাওয়া যাবে না!
গীবত করা কবীরা গুনাহ। গালমন্দ করা কবীরা গুনাহ। রোযাদারের মূল সংযম– পানাহার ও স্ত্রীর কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। এই তিনটা ছাড়া তো রোযা হবেই না। কিন্তু রোযার মধ্যে প্রাণ ও রূহ আসতে হলে অন্যান্য সংযমও থাকতে হবে। পানাহার থেকে যেমন সংযম অবলম্বন করলাম, তেমনি গুনাহের কথা ও কাজ থেকেও সংযম অবলম্বন করতে হবে। যবান ও হাত-পায়ের হেফাযত করতে হবে। রমযানে ইনশাআল্লাহ পাপের কাজ করব না। এটা যদি পারি, ইনশাআল্লাহ, বাকি এগারো মাসও আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করবেন!
এই অনুভূতির কদর করি
রমযানে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ। কারণ কুদরতিভাবে আল্লাহ তাআলা রমযানে ঈমানী একটা পরিবেশ, ঈমানী আবহ সৃষ্টি করে থাকেন। যার ফলে এমনিতেই নেক আমলের দিকে মানুষের মনটা কিছুটা এগিয়ে যায়। অন্তরে গুনাহের প্রতি একটা ঘৃণা ও অনীহা সৃষ্টি হয়। মুমিনের তো সব সময়ই গুনাহের প্রতি ঘৃণা থাকার কথা। কম-বেশি থাকেও। কিন্তু রমযানে সেটা অনেক বেড়ে যায়। আর নেক আমলের প্রতিও তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। রমযানে জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে দেওয়া হয়। একটা দরজাও বন্ধ থাকে না। জাহান্নামের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, একটাও খোলা থাকে না রমযানে। আমরা যদিও নিজেদের কানে শুনতে পাই না, কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আহ্বান হতে থাকে–
يَا بَاغِيَ الخَيْرِ أَقْبِلْ، وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ.
অর্থাৎ যদি তুমি কল্যাণ চাও, নেক আমল করতে চাও, তুমি অগ্রসর হতে থাকো! আর যদি খারাপ কোনো নিয়ত থাকে এবং মন্দ পথে হাঁটতে চাও, খবরদার! তুমি থেমে যাও এবং বিরত থাক! গুনাহ করো না!
এই আহ্বানের একটা প্রভাব আমরা অন্তরে অনুভব করি কি না? মনে হয়– আরে, একটু তিলাওয়াত করি তো! একটু যিকির করি তো! আমার সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে না তো? এমন একটা অনুভূতি ভেতরে কাজ করে। আর অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে তার ভেতর দিয়েই যবানে সুবহানাল্লাহ, আলহামদু লিল্লাহ চলতে থাকে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, দরূদ শরীফ, ইস্তেগফার পড়তে থাকি। এই অনুভূতির কদর করি!
আল্লাহ তাআলা রমযান মাসের পরিচয়ই দিয়েছেন কুরআনের মাস বলে। বলেছেন, আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের এই কিতাব কুরআন অবতীর্ণ করেছেন রমযানে। রমযান মাসেই কুরআন জমিনে নাযিল হওয়া শুরু হয়েছে।
একটি কথা মনে রাখি, তিলাওয়াত করতে হলে আমাকে সর্বপ্রথম তিলাওয়াত শিখতে হবে। সে বিষয়ে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।
‘ইহতিসাব’ অর্থ কী?
আমি হাদীস পড়েছিলাম–
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَه مَا تَقَدّمَ مِنْ ذَنْبِه.
ঈমানের দাবিতে ও সওয়াবের আশায় রমযান মাসে যে রোযা রাখবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮
এই যে বলা হয়েছে ‘ইহতিসাব’। এটা অনেক জরুরি বিষয়। যে কোনো নেক আমল করার সময়ই আমলটা আল্লাহর দরবারে বেশি কবুল হওয়ার জন্য এবং আমলের ফায়দা বেশি পাওয়ার জন্য মুমিনের অন্তরে এই ইহতিসাব ও সওয়াবের আশা থাকতে হবে যে, আমি এর বিনিময় আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে নেব। আমলটি আমি আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্যই করছি। লোক দেখানোর জন্য নয় এবং এর মধ্যে আমার জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য নেই। সম্পূর্ণ আল্লাহকে রাজি-খুশি করাই আমার উদ্দেশ্য। এভাবে একমাত্র আল্লাহর থেকে সওয়াব পাওয়ার জন্য বান্দা যদি কোনো ইবাদত করে, আল্লাহ তাতে অনেক অনেক খুশি হন। ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, দেখ, আমার বান্দা কেবল আমার কাছে পাওয়ার জন্যই ইবাদত করছে! অন্য কারও কাছে কিছুই চাচ্ছে না। ঠিক আছে, আমি তাকে তার বিনিময় বুঝিয়ে দেব।
এই হল ইহতিসাব। অর্থাৎ আমি অবহেলা আর উদাসীনতার সঙ্গে ইাবাদত করছি না। সিয়াম পালন করছি একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য এবং আল্লাহর থেকে তার বিনিময় নেওয়ার উদ্দেশ্যে। তাহলেই আমার ইবাদতের মূল্য বেড়ে যাবে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটিই বলেছেন, যদি আল্লাহ থেকে পাওয়ার জন্য এবং ঈমানের দাবিতে তুমি রোযা রাখ, আল্লাহ তোমার পেছনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন–
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَه مَا تَقَدّمَ مِنْ ذَنْبِه.
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে এবং সওয়াবের আশায় রমযানের রাতগুলোতে জেগে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে, আল্লাহ তাআলা তার পেছনে সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
রমযানের রাতের ইবাদত কী? তারাবীর নামায এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামায। মুমিন রমযানের রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শোনে। ইমাম তিলাওয়াত করেন আর মুক্তাদী তিলাওয়াত শোনে। আর ভোররাতে তাহাজ্জুদ আদায় করে। এগুলো হল ‘কিয়ামু রামাদান’।
তাহলে ‘কিয়ামু রামাদান’-এর জন্য রাতের তারাবী কি কমাব? বিশ রাকাত থেকে দশ রাকাত বা আট রাকাতে চলে আসব? না। এটা করব না।
হারামাইনে তারাবী ২০ রাকাত থেকে ১০ রাকাত করার ইতিহাস জানা থাকা দরকার
আমাদের ইতিহাস জানা থাকা দরকার আছে। এ ইতিহাস মনে রাখুন। মক্কার মসজিদে হারাম ও মদীনার মসজিদে নববী, উভয় মসজিদে ১৪০০ বছর ধরে তারাবীর নামায বিশ রাকাত আদায় করা হত। কয়েক বছর আগে ২০১৯ সালে করোনার সময় বিশ্বব্যাপী একটা আতঙ্ক ছিল, তার প্রভাব এ দুই মসজিদেও পড়েছিল। দীর্ঘ সময় এবং বেশি মানুষ মসজিদে থাকার বিষয়েও একটা পাবন্দি এসেছিল। তখন মক্কা-মদীনার উভয় মসজিদে প্রশাসনের পক্ষ থেকে হোক বা মসজিদের ইমাম সাহেবদের পক্ষ থেকে হোক, তারাবী দশ রাকাত পড়ার একটা তারতীব শুরু হয়েছিল। দশ রাকাতের সূত্রটা এমন ছিল– মসজিদে চটজলদি দশ রাকাত জামাতের সাথে আদায় করে অবশিষ্ট নামায বাসায় গিয়ে পড়বে।
এই যে ঘটনা, এটি ছিল একটি বিশেষ ওযরের কারণে। সেই ওযর পার হয়ে গেছে বহু দিন হল, কিন্তু তারা এখনো সেই দশ রাকাত নিয়েই বসে আছেন! এটা একটা ষড়যন্ত্র। কে করেছে এই ষড়যন্ত্র, আমরা জানি না; কিন্তু আমরা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি, সৌদি দূতাবাস আমাদের এই দাবি হারামাইনের ইমামগণের কাছে এবং সৌদি সরকারের কাছে পৌঁছে দিক যে, ১৪০০ বছর থেকে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবী চলে আসছিল, একটা ওযরের কারণে আপনারা সেখানে মসজিদে দশ রাকাত পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অবশিষ্ট নামায বাসায় গিয়ে পড়ার কথা বলেছিলেন; সেই ওযর বহু আগে পার হয়ে গেছে, তারপরও কেন আপনারা এখনো এই গলত রেওয়াজ নিয়ে পড়ে আছেন?
১৪০০ বছর যাবৎ মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিশ রাকাত তারাবীর নামায হয়ে আসছিল, সেই ঐতিহ্য ও হালত ফিরিয়ে আনতে হবে! সামনের প্রজন্মের কেউ বলতে পারে, আমরা উমরায় গিয়ে তো সেখানে দেখে এসেছি, তারাবীর নামায দশ রাকাত হয়, আমাদের দেশে কেন বেশি হচ্ছে? কারণ আরও কিছুদিন পার হয়ে গেলে সামনের প্রজন্মের হয়তো এই ইতিহাস আর জানা থাকবে না। এজন্য আমাদের ইতিহাস মনেও রাখতে হবে এবং চর্চাও রাখতে হবে। তারা সংশোধন করে নিলে তো আলহামদু লিল্লাহ। আর সংশোধন না করলে এটা বুঝতে হবে যে, তারাবীর নামায বিশ থেকে কমিয়ে দশ রাকাতে নিয়ে আসা অথবা আট রাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা, এটা বিদআত। ৮ রাকাত কিন্তু সৌদি সরকার বা হারামাইন থেকেও আসেনি। এটা এই উপমহাদেশ থেকে শুরু হয়েছে। এই কিছুদিন আগেও যখন মক্কা-মদীনায় ব্যাপকভাবে বিশ রাকাত তারাবী আদায় করা হত, তখনো মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীর আমলের বিরুদ্ধাচরণ করে ওই ভাইয়েরা আট রাকাত তারাবী পড়তেন। এখন এই দেশের বিভিন্ন মসজিদেও আট রাকাত তারাবী হয়। গাইরে মুকাল্লিদ ভাইদের এই তরীকা ইসলামের প্রথম যুগের তরীকা নয়। এটা অনেক পরের আবিষ্কার। কখন কোথায় কোন্ তারিখে আবিষ্কার হয়েছে, সেই ইতিহাসও আমরা জানি। ইতিহাসও আছে আমাদের কাছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই আবিষ্কার থেকে মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববীকে রক্ষা করেছেন। সেখানে যুগ যুগ ধরে বিশ রাকাত তারাবীই হয়ে আসছিল। এই কয়েক বছর আগে করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা দশ রাকাতে এনে এখন সেখান থেকে আর সরছে না। অথচ যে ওযরের কারণে বিশ রাকাত থেকে দশ রাকাতের জামাত চালু করেছে, সেই ওযর বহু আগেই পার হয়ে গিয়েছে। তার পরও এটার ওপর এখনও পড়ে থাকাটা অনেক বড় অন্যায়। আমরা এটি সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি!
প্রসঙ্গ : তারাবীতে দ্রুত তিলাওয়াত
তারাবীর নামাযে এত দ্রুত পড়া উচিত নয় যে, কিছুই বোঝা যায় না। হাফেয সাহেবকে তাড়া দিতে থাকা যে, আরও দ্রুত পড়ুন, আরো দ্রুত পড়ুন; এমন দ্রুত পড়ার চেয়ে ভালো হয় আপনি সূরা তারাবী পড়ুন!
কুরআন কারীমে যেভাবে এসেছে ইতিকাফের আলোচনা
আমরা রমযানের প্রায় শেষের দিকে এসে উপনীত হয়েছি। আজ বিশ রমযান। দুই দশক বিদায় হয়ে গেল। সন্ধ্যা থেকে ইতিকাফ শুরু হবে। ইতিকাফ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরআন কারীমের একাধিক আয়াতে ইতিকাফের আলোচনা আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন–
وَ لَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَ اَنْتُمْ عٰكِفُوْنَ فِی الْمَسٰجِدِ.
আর তাদের সাথে (স্ত্রীদের সাথে) সহবাস করো না, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত থাক। –সূরা বাকারা (০২) : ১৮৭
রোযার আলোচনার মধ্যেই ইতিকাফের কথা এসেছে। কুরআনের শব্দ হল–
عٰكِفُوْنَ.
আর আল্লাহ তাআলা কেবল সর্বশেষ আসমানী শরীয়ত ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তেই এই বিধান দান করেছেন বিষয়টি এমন নয়; বরং আগের শরীয়তেও ছিল। রোযা যেমন আগের উম্মতের ওপর ছিল, ইতিকাফও ছিল। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যখন বাইতুল্লাহর বিষয়ে হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা দান করেছেন, সেখানেও ইতিকাফের প্রসঙ্গ এসেছে।
কুরআনের শব্দ হল–
اَنْ طَهِّرَا بَیْتِیَ لِلطَّآىِٕفِیْنَ وَ الْعٰكِفِیْنَ وَ الرُّكَّعِ السُّجُوْدِ.
তোমরা আমার ঘরকে সেইসকল লোকের জন্য পবিত্র রাখ, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকু ও সিজদা আদায় করবে। –সূরা বাকারা (২) : ১২৫
অর্থাৎ তাদেরকে আল্লাহ তাআলা বাইতুল্লাহ শরীফ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর যেসব বান্দা তাওয়াফ করতে আসবে এবং যারা ইতিকাফ ও অবস্থান করার জন্য আসবে তাদের জন্য। আর রুকু-সেজদাকারীদের জন্য। যেন তারা কষ্ট না পায়।
ইতিকাফ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই আমলও একমাত্র আল্লাহর জন্য হয় এবং এটি আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান করার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
মা-বোনদের ইতিকাফের স্থান ও নামাযের উত্তম স্থান তার ঘর
বলছিলাম, ইতিকাফ করার স্থান হল মসজিদ। আর গত জুমায় আমি বলেছিলাম, মা-বোনদের জন্য ইতিকাফের জায়গা ‘তাদের মসজিদ’। মা-বোনদের ‘মসজিদ’ বা নামাযের স্থান কোন্টি? তার ঘরে একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে। সেটি ছোট্ট কোনো কামরার মতোও হতে পারে। কামরা না হলে পর্দা দিয়ে সেটিকে আলাদা করবে। এমনকি পর্দাও যদি দিতে না পারে, তাহলে নির্দিষ্ট জায়গাকে আলাদা করে রাখবে এবং মনে মনে নিয়ত করবে যে, এটি আমার মসজিদ, এখানে আমি ইতিকাফ করব। সে স্থান পাক-পবিত্র রাখবে। আতর-খুশবু লাগিয়ে জায়গাটিকে পরিপাটি করে রাখবে। তারপর সেখানে নামায পড়বে। তিলাওয়াত যিকির-আযকার, দুআ ইত্যাদি করবে। এই জায়গা তার ইবাদতের জায়গা এবং এটিই তার মসজিদ।
হাঁ, হাদীস শরীফে এমনটিই বলা হয়েছে। আমরা যে মসজিদে নামায পড়তে আসি, সে মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে মহিলাদের জন্য তাদের ঘরের মসজিদে নামায পড়া অনেক বেশি উত্তম। আমরা মসজিদে জামাতে নামায পড়তে এসে পঁচিশ গুণ সাতাশ গুণ বেশি সওয়াব পাই। এটি মেয়েদের জন্য নয়। মেয়েরা যদি জামাতে অংশগ্রহণ করতে আসে, তাদের সওয়াব কমতে থাকবে। এই সওয়াব তাদের পেতে হলে তাদেরকে ঘরের মসজিদেই নামায পড়তে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ.
তাদের ঘর তাদের জন্য উত্তম। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫৪৭১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫৬৭
যাইহোক, বলছিলাম মহিলাদের ইতিকাফ তাদের ঘরের মসজিদে।
শেষ দশকের আমল
শবে কদরের বরকত ও কল্যাণ অর্জন করুন; নিজেকে মাহরূম করবেন না
পুরুষদের জন্য ইতিকাফের জায়গা মসজিদ। মসজিদে সময়টা কাটাতে হবে খুবই ইহতিমামের সঙ্গে। কারণ একদিকে রমযান মাস, আবার শেষ দশক। আবার ইতিকাফের হালত। আমি কোথায় অবস্থান করছি? মসজিদে। এজন্য ইতিকাফকারীকে তার সময়গুলোর গুরুত্ব দিতে হবে খুব বেশি করে।
এমনিতে রমযানের শেষ দশকের প্রতিটা মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। যারা ইতিকাফ করছে তাদের জন্যও, যারা ইতিকাফ করছে না তাদের জন্যও। কাজেই রমযানের এই গুরুত্বপূর্ণ সময় বিশেষ করে শেষ দশকে, আরও বিশেষ করে যারা ইতিকাফ করছেন, তাদের জন্য সময়গুলোকে অবহেলায় কাটানো বা গল্প-গুজবে কাটিয়ে দেওয়া অনেক বড় অন্যায়। এটি কোনোভাবেই উচিত নয়। এ থেকে আমাদের সবাইকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে, ইনশাআল্লাহ। সময়কে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্য দিতে হবে লাইলাতুল কদরের সম্ভাব্য রাতগুলোকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন–
لَیْلَةُ الْقَدْرِ خَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ.
এ লাইলাতুল কদর রমযান মাসে। প্রবল সম্ভাবনা আছে রমযানের শেষ দশকে। বেজোড় রাতগুলোর কোনো এক রাতে হবার সম্ভাবনা আরও বেশি। সেটি ২৭-ও হতে পারে, ২৫-ও হতে পারে, ২১-ও হতে পারে, ২৯-ও হতে পারে, আবার ২৩-ও হতে পারে। লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট কোনো রাতেই হবে এটা জরুরি নয়; বরং এটি ঊর্ধ্ব জগতের একটা বিষয়। লাইলাতুল কদরের যত আয়োজন সবই ঊর্ধ্ব জগৎ থেকে হয়। প্রতি বছরই একই রাতে হয় কি না, তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন। বিভিন্ন আলামত থেকে অনুমান হয় যে এটি পরিবর্তিত হয়। এই রমযানে ২১-এ হলে আরেক রমযানে হয়তো ২৭-এ অথবা ২৫-এ। নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ২৭-এর কথা বলা হয় সর্বোচ্চ প্রবল সম্ভাবনার ভিত্তিতে। কিন্তু একেবারে নিশ্চিত ২৭ বলা মুশকিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শবে কদরের তারিখটি নির্ধারিতভাবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবার ওই ইলম আল্লাহ তাআলা উঠিয়ে নিয়েছেন। কী কারণে উঠিয়ে নিয়েছেন, তাও হাদীসে জানানো হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়েছিল শবে কদরের নির্ধারিত তারিখের বিষয়ে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সেটি জানানোর জন্যও এসেছিলেন। এমন সময় দুইজনকে ঝগড়া করতে দেখেছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ের ইলম আবার উঠিয়ে নিলেন।
এর মাধ্যমে উম্মতকে সতর্ক করা হল যে, ঝগড়া-বিবাদে জড়াবে না কখনো! বিবাদ-বিসংবাদ ভালো কাজ নয়। এর কারণে আল্লাহ তাআলা জমিন থেকে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ইলম পর্যন্ত উঠিয়ে নিলেন। সুতরাং সবারই বোঝা উচিত, বিবাদ-বিসংবাদ ও ঝগড়ার কারণে অনেক বরকত নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে যেমন শাস্তির একটি দিক আছে, তেমনি একটি ভালো দিকও আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হয়তো এর মধ্যেই তোমাদের জন্য রয়েছে খায়ের ও কল্যাণ!’ কারণ এখন আমরা শেষ দশকের প্রতি রাতেই শবে কদরের মতো গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত-বন্দেগী ও আমল করার চেষ্টা করব। সওয়াব ও ফায়দাও বেশি লাভ করা যাবে। কিন্তু কেন যেন আমরা কেবল ২৭ নিয়ে বসে থাকি! এটা ভালো নয়। যদি সুন্নত ইতিকাফ মসজিদে করি, তাহলে তো ইতিকাফের বরকতে শবে কদর পেয়ে যাওয়ার আশা এমনিতে রাখতে পারি, ইনশাআল্লাহ! আর সুন্নত ইতিকাফ না করতে পারলে নফল ইতিকাফে বেশি বেশি সময় লাগানোর চেষ্টা করি! কারণ শবে কদরের কল্যাণ ও বরকত অর্জন করাও একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। এমন নয় যে, শবে কদরের কল্যাণ পেলে পেয়ে গেলাম, না পেলে তেমন কোনো সমস্যা নেই! না, বিষয়টি এমন নয়!
হাদীস শরীফে এসেছে–
مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ.
কোথাও এসেছে–
وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ.
শবে কদরের বরকত ও কল্যাণ যে হারাল, সে আসলেই বঞ্চিত।
এজন্য আমাকে এই রাতে বরকত ও কল্যাণ অর্জন করতে হবে! শবে কদরের বরকত ও কল্যাণ পাওয়ার জন্য সবাই চেষ্টা করব। যারা মসজিদে সুন্নত ইতিকাফ করছি তারাও যত্ন নিব, যারা সুন্নতে ইতিকাফ করতে পারছি না তারাও এর প্রতি যত্ন নিব!
শবে কদরের ন্যূনতম কল্যাণ ও বরকত থেকে যেন আমি মাহরূম ও বঞ্চিত না হই! এজন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করব। বিশেষত মাগরিব, এশা ও ফজরের জামাত যেন আমার ছুটে না যায়! আর অহেতুক অনর্থক কাজ থেকে তো যেকোনো সময় দূরে থাকা উচিত, রমযানে আরও গুরুত্বের সঙ্গে। বিশেষত এই শেষ দশকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গেই বেঁচে থাকা জরুরি। আর গুনাহর কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকবই! তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
আয়েশা রা. বর্ণনা করেন–
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَه، وَأَحْيَا لَيْلَه، وَأَيْقَظَ أَهْلَه.
অর্থাৎ রমযানের শেষ দশক যখন শুরু হয়ে যেত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইবাদত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য) চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের বাইরেও রাতের বেলায় ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন। কিন্তু রমযানে সেটি আরও বেড়ে যেত। রমযানের শেষ দশকে তার পরিমাণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও অনেক অনেক গুণ বেশি বেড়ে যেত। একেবারেই কোমর বেঁধে নামতেন। (দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১১৯)
রমযানের যথাযথ কদর করুন
খোলাসা কথা হল, আমাকে রমযানের হক আদায় করতে হবে। রমযানের যথাযথ কদর করতে হবে। রোযা অবস্থায় দিনে-রাতে গুনাহ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা হল রোযার হক। বাকি এগারো মাসও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আমার দায়িত্ব। কিন্তু এখন রোযার বরকত যেন নষ্ট না হয়, বরং রোযাকে কীভাবে বরকতপূর্ণ করা যায় এবং এর বরকত ধরে রাখা যায়, তার জন্য আমাকে বিশেষভাবে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন।
তেমনিভাবে রমযানের সময় যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। সময় নষ্ট করা সব সময়ই অন্যায়। রমযানের বরকতময় সময় নষ্ট করা আরও বড় অন্যায়। কারণ রমযানের প্রতিটি মুহূর্তই দামি। প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে অনেক মূল্যবান। সারা বছরের সব সময়ই দামি, কিন্তু রমযানের একেকটা মুহূর্ত অমূল্য ধন। এই সময়গুলো যদি আমি মোবাইলে কাটিয়ে দেই, চোখের গুনাহ ও কানের গুনাহে কাটিয়ে দেই, তাহলে এমন ক্ষতিগ্রস্ত হব, যার ক্ষতিপূরণ কঠিন হবে! আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন।
[৬ রমযান ১৪৪৬ হি./৭ মার্চ ২০২৫ ঈ. এবং ২০ রমযান ১৪৪৬ হি./২১ মার্চ ২০২৫ ঈ. জুমাপূর্ব বয়ান থেকে নির্বাচিত অংশ
ঈষৎ পরিমার্জিত
শ্রুতলিখন : মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম]