রমযান ১৪৪৭   ||   মার্চ ২০২৬

কুরআনের মাসে কুরআনের সাথে গড়ি গভীর সম্পর্ক

মাওলানা আবদুর রহমান ইবনে বজলুর রহমান

আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেছেন

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَالْفُرْقَانِ .

রমযান মাস; যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হেদায়েত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। সূরা বাকারা (০২) : ১৮৫

রমযান মাস; সকল মাসের চেয়ে এ মাস শ্রেষ্ঠ, এ মাসের একটি রাত সকল সময়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এই মাস বহু বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এ মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কালাম কুরআন কারীম নাযিল করেছেন। যা কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকলের জন্য কল্যাণের উৎস ও আলোর মশাল, সত্য ও সততার মানদণ্ড এবং সঠিক পথের নির্দেশক। বিশেষভাবে মুমিন বান্দার প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী ও অবলম্বন। মুমিনকে তার জীবনের প্রতিটি কদমেই এ কুরআন পথপ্রদর্শন করে এবং পদস্খলন থেকে রক্ষা করে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন

قَدۡ جَآءَکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ نُوۡرٌ وَّکِتٰبٌ مُّبِیۡنٌ، یَّہۡدِیۡ بِہِ اللّٰہُ مَنِ اتَّبَعَ رِضۡوَانَہٗ سُبُلَ السَّلٰمِ وَیُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ بِاِذۡنِہٖ وَیَہۡدِیۡہِمۡ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ.

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এক জ্যোতি এবং এমন এক কিতাব এসেছে, যা (সত্যকে) সুস্পষ্ট করে। যার মাধ্যমে আল্লাহ যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে, তাদেরকে শান্তির পথ দেখান এবং নিজ ইচ্ছায় তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে সরল পথের দিশা দেন। সূরা মায়েদা (০৫) : ১৫-১৬

যে ব্যক্তি কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, কুরআনের উপদেশ ও এর বিধানাবলি সর্বক্ষেত্রে মেনে চলার চেষ্টা করে, সে হৃদয়ে আল্লাহপ্রদত্ত নিবিড় সুখ ও নির্মল প্রশান্তি অনুভব করে। তার হৃদয়ে বিরাজ করে অনাবিল বসন্ত, ঐশ্বরিক ঔদার্য। কুরআনের সঙ্গলাভের মাধ্যমেই তার অর্জিত হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য।

খাব্বাব ইবনুল আরত রা. বলেছেন

إن اسْتَطَعْتَ أنْ تَقَرَّبَ إلى اللهِ فَإنَّكَ لَا تَقَرَّبُ إلَيْهِ بِشَيْءٍ أَحَبَّ إلَيْهِ مِنْ كَلَامِه.

তুমি যদি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পার; তাহলে তাঁর কালাম (কুরআন)-এর চেয়ে তাঁর কাছে বেশি প্রিয় কোনো কিছু দ্বারা তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারবে না। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩০০৯৮

যে হৃদয় কালামুল্লাহর তিলাওয়াতে প্রশান্তি অনুভব করে না, বিগলিত হয় না, সে হৃদয় নিষ্প্রাণ, নির্জীব ও উদাসীন। তাতে বিরাজ করে বিশাল শূন্যতা ও বেড়ে উঠে অশান্তির বীজ। তা আলো ও গন্তব্যের পথ হারায়। কখনোই সত্যিকার সুখের স্বাদ পায় না। তার জীবন হয়ে যায় সংকুচিত। তার জীবনে দুঃখ-কষ্ট ও বিপর্যয় বাড়তেই থাকে। ধীরে ধীরে তার হৃদয়জগৎ বীভৎস অন্ধকারে ছেয়ে যায়, ফলে জীবনের পদে পদে দিশেহারা হয় এবং গন্তব্যহীন যাযাবরের মতো ঘুরতে থাকে।

অন্যদিকে যার হৃদয় কুরআনী আলোয় আলোকিত, সে তিলাওয়াতেই প্রশান্তি খুঁজে পায়। ফলে সে আরও বেশি তিলাওয়াত করে। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী হয়।

প্রত্যেক মুমিনেরই কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়া দরকার। এ সম্পর্ক মুমিনের নাজাতের পথ এবং উত্তরণ ও সাফল্যের সোপান। কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করার সুবর্ণ সুযোগ হল রমযান মাস। রমযান যেমনিভাবে রোযার মাস, তেমনি কুরআনেরও মাস। এ মাসের বরকতময় কদরের রাতে লাওহে মাহফুয থেকে দুনিয়ার আকাশে সম্পূর্ণ কুরআন নাযিল করা হয়। পরবর্তীতে নবুওতের তেইশ বছর অবধি বিভিন্ন ক্ষেত্র ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অল্প অল্প করে এই কুরআন দুনিয়ার আসমান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ হয়।

এমনই এক পবিত্র মাসে আমরা উপনীত হচ্ছি। কুরআনের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুবর্ণ সুযোগ আমাদের দোরগোড়ায়। এই সুযোগে আমরা কুরআনের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করে তুলব এবং কুরআনের হকগুলো আদায় করার চেষ্টা করব।

কুরআনের দুটি হক

আমাদের ওপর কুরআনের কিছু হক আছে, যা আমাদের অবশ্যই পূরণ করতে হবে।

ক. বেশি বেশি তিলাওয়াত

কুরআনের একটা বড় হক হল, বেশি বেশি তিলাওয়াত করা।

কুরআন তিলাওয়াত অনেক বড় ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক হাদীসেই কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রা. এবং উম্মতের প্রথম সারির নেক বান্দারাও খুব তিলাওয়াত করতেন। অন্য মাসের তুলনায় রমযান মাসে তাদের তিলাওয়াত আরও বহু গুণে বেড়ে যেত।

আকাবির-আসলাফের জীবনীতে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, রমযানে তারা সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান কুরআনেই নিবিষ্ট রাখতেন। কেউ কেউ রমযানে অন্য ইলমী ব্যস্ততা ছেড়ে শুধু কুরআনের প্রতিই মনোনিবেশ করতেন।

আর খোদ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাঁর প্রতি এই কুরআন নাযিল হয়েছে, যিনি সবচেয়ে বড় ছাহেবে কুরআন’, এই মুবারক মাসে তিনি অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তিলাওয়াত করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রমযানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীল আলাইহিস সালাম একে অপরকে পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। সহীহ বুখারী, হাদীস ৬

কুরআনের সাথে যে গভীর সম্পর্ক সাহাবায়ে কেরামের ছিল, তেমন গভীর সম্পর্ক আমাদেরও গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের ঈমান ও ভালবাসা লালন করতে হলে তাঁর কালামের সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে হবে, নতুবা জীবন চলে যাবে, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠবে না এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান ও ভালবাসাও পরিপূর্ণ হবে না।

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, আমার তিলাওয়াত যেন প্রাণহীন না হয়। তাজবীদ ও তারতীল ছাড়া তাড়াহুড়া করে পড়ে যাওয়া কুরআনের সাথে বেয়াদবি। সকল আদব রক্ষা করে তাজবীদ ও তারতীলসহ তিলাওয়াত করতে হবে। অতএব, যার তিলাওয়াত সহীহ-শুদ্ধ নয়, তার প্রথমে সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শিখতে হবে।

খ. কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ

কুরআনের আরেকটি বড় হক হল, কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করা, জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর বিধানাবলি মেনে চলার চেষ্টা করা। এটা কুরআন নাযিলেরও অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেছেন

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ.

(হে রাসূল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াত নিয়ে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা ছ¦দ (৩৮) : ২৯

সুতরাং নিজ পরিমণ্ডলে কুরআনের বিধান বাস্তবায়ন না করলে কুরআনের হক যথাযথভাবে আদায় হবে না।

কুরআন তিলাওয়াত না করা যেমন কুরআনের প্রতি অবহেলা, কুরআনের বিধান মেনে না চলা কুরআনের প্রতি আরও বড় অবহেলা। কিয়ামতের দিন কুরআনের প্রতি অবহেলাকারীরা অনুতাপ-দগ্ধ হবে, কেন দুনিয়াতে কুরআনের প্রতি মনোনিবেশ করল না। সেদিন কুরআনের ধারক-বাহকদের সম্মান মর্যাদা দেখে তাদের এ আফসোস-অনুতাপ আরও বেড়ে যাবে।

কুরআনের ধারক তথা ছাহিবে কুরআনসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

يُقَالُ يَعْنِي لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا.

কিয়ামতের দিন কুরআনের ধারক-বাহককে বলা হবে, পড় আর উপরে উঠতে থাক। দুনিয়াতে যেমন তারতীলের সাথে সুন্দর করে তিলাওয়াত করতে, সেভাবেই সুন্দর করে তিলাওয়াত করতে থাক। তোমার ঠিকানা হবে সেখানে, যেখানে তুমি শেষ আয়াত পাঠ করবে। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯১৪

প্রিয় পাঠক, আসুন! এই রমযান মাসে আমরা অন্তত দুটি প্রতিজ্ঞা করি

এক. সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শিখব এবং এখন থেকে নিয়ে সারা জীবন বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করব।

দুই. সাধ্যমতো কুরআনের ইলম হাসিল করব। কুরআনের বার্তা-বিধান অনুযায়ী জীবন সাজাব এবং প্রতিটি পদক্ষেপে কুরআনের অনুসরণ করব।

আমরা যদি কুরআনের এই মুবারক মাসে এ দুটি প্রতিজ্ঞা নিয়ে অগ্রসর হই, তাহলে কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। কুরআনের আলোয় জীবন আলোকিত হবে। আখেরাতে কুরআন আমাদের সঙ্গ দেবে এবং আমাদের পক্ষে শাফাআত করবে। আর কুরআনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরও নৈকট্য অর্জন করতে পারব ইনশাআল্লাহ।

 

 

advertisement