বিশেষ সম্পাদকীয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‖
আগামী বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণে বড় চ্যালেঞ্জ
চলতি (২০২৬) ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর সাথে একই দিনে একটি গণভোটও হওয়ার কথা। চারটি বিষয়ের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেগুলো হল–
‘(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে–সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’
গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে সাধারণ মানুষ তাদের মতামত জানাবেন।
যদিও আমাদের এই অঞ্চলে নির্বাচন আসে যায়, কিন্তু জনগণের ভাগ্য প্রায় একরকমই থেকে যায় অথবা আরও খারাপের দিকে যায়। নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে পরিবর্তন আসলেও জনগণের সাথে তাদের আচরণ প্রায় একইরকম থাকে। বিগত তিন-চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নামসর্বস্ব ছিল এবং সেগুলো কারচুপিপূর্ণ ও লোক দেখানো হওয়ার বিষয়ে কারও তেমন দ্বিমত নেই। যারা নির্বাচন করিয়েছে, তারাও দায়সারা গোছের করিয়েছে। তাদেরও এরকম একটা ভাব ছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য একটা নির্বাচন দরকার, তাই নির্বাচন করিয়েছে। সে নির্বাচনগুলো বিভিন্ন কুখ্যাত খেতাবও পেয়েছিল। কোনোটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন। তখন ১৫০টি আসনেরও বেশি অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা এমপি হয়ে গিয়েছিল। কোনো নির্বাচন আবার রাতের নির্বাচন খ্যাতি পেয়েছিল। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা –বর্তমানে কারাবন্দি–সে কথা স্বীকারও করেছিলেন যে, রাতে ব্যালট বক্স বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি লোকদের দিয়ে ভরানো হয়েছিল। কোনো নির্বাচন ডামি নির্বাচনেরও খেতাব পেয়েছিল। ২০০৯-এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটিকে যদিও অনেকেই নিরপেক্ষতার পোশাক পরিয়েছেন। কিন্তু সেটিতেও যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল, এর মাধ্যমে বিশেষ একটি দলকে ক্ষমতায় আনার ব্যবস্থা ছিল–সেটাও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে এসে গেছে।
এসব কারণে নির্বাচনের প্রতি এ দেশের মানুষের অনেকটা অনীহা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এবারের নির্বাচন একটু ভিন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার নির্বাচন কারচুপিতে এবং লোক দেখানো নির্বাচনের যারা অতীব দক্ষ ছিল তারা প্রেক্ষাপটের বাইরে। যদিও তাদের প্রধান সহযোগী জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। তারা নির্বাচন করবে বলে শোনা যাচ্ছে। সরকার বা নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী গোষ্ঠীদের দাবি আমলে নেয়নি, যারা বারবার বলে আসছিল, বিগত স্বৈরাচারী গোষ্ঠীর অন্যতম সহযোগী ও দোসর এ দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হোক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা নির্বাচনি মাঠে রয়েছে।
যদি বর্তমান ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে, এখন পর্যন্ত যা বলা হচ্ছে সেই গতি যদি বজায় থাকে, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়ে দেশে আবার আরেকটি নির্বাচিত সরকার আসবে বলে আশা করা যায়। সাথে সাথে মানুষ একটি গণভোটেও তাদের রায় প্রদান করবে বলে আশা করা যায়।
আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে সামনের বাংলাদেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, বিগত সময়ে দেশের সকল সেক্টরকে যে কলুষিত করে ফেলা হয়েছিল সেগুলো থেকে বের করে আনা। সে নিয়ে আজকে আমরা কথা বলছি না। কিন্তু সামনে যে ভোট সেই ভোটে নাগরিকদেরও দায়দায়িত্ব রয়েছে। যদিও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনেক সময়ই জনগণের মতামতের প্রতিফলন সেভাবে হয় না।
অন্য ভাষায় বলতে গেলে, যারা বুঝমান নাগরিক আলাদাভাবে তাদের কোনো গুরুত্ব তৈরি হয় না। বুঝমান বা শিক্ষিত লোকজনের আলাদা কোনো গুরুত্ব ফুটে ওঠে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পেশিশক্তির প্রভাব শেষ মুহূর্তে গিয়ে নির্বাচনি ফলাফলে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। তবুও একজন নাগরিক হিসেবে সাধ্যানুযায়ী দেশের স্বার্থে ভূমিকা রাখাও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
যদিও নির্বাচনের প্রাক্কালে কোনো একটি দলকে সুনির্ধারিত ভোট দেওয়ার কথা বলা এবার আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ বর্তমান সময়ের বিএনপি জিয়া ও খালেদা জিয়ার আদর্শ থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করছেন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন পার করার পর দেশে ফিরে আসা তারেক রহমান কদিন আগেই মাত্র সরাসরি বিএনপির হাল ধরেছেন। ভবিষ্যতে তিনি বিএনপিকে কীভাবে চালাবেন অথবা তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে তিনি কীভাবে দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং ভালো কাজগুলোতে তাঁর বাবা-মা’র পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন কি না–সেটি এখনো মানুষের কাছে পূর্ণ স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আরও কিছু ইসলামী দল ও সাধারণ দল নিয়ে যে জোট করেছে তাদের বিষয়টি আরও অস্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামী যদিও ‘আল্লাহ্র আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগান ধারণ করে থাকে, কিন্তু এবার নির্বাচন তারা আল্লাহ্র আইন বাস্তবায়নের জন্য করছেন বলে নিজেরাই দাবি করছে না; বরং বছরখানেক থেকে তো তাদের বড় নেতারা পরোক্ষভাবে নিজেদেরকে সেক্যুলার প্রমাণেই বেশি ব্যস্ত রয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
এছাড়া এ দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও আদর্শিক নেতা মরহুম মওদুদী সাহেবের আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, বক্তব্য-লিখনী ও রাজনৈতিক দর্শনের বহু কিছুই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী মূলধারার উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে বিতর্কিত ও ভ্রান্ত। সেসব বিতর্কিত বিষয় খণ্ডন করে মওদুদী সাহেবের জীবদ্দশাতেই আলেমগণ এসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন। অনেকে দলীল-প্রমাণসহ কিতাবাদিতে লিখে গেছেন।
সুতরাং এ দলটি ক্ষমতায় এলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, ইসলামী বিধিবিধানের ক্ষেত্রে তারা কি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসরণ করবে, নাকি তাদের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী সাহেবের পদাঙ্কেই চলতে থাকবে–সেটিও তারা স্পষ্ট করেনি। যেহেতু জামায়াতের সকল নেতারই ইসলামী জ্ঞানের মূল ভিত্তি সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী ও তাঁর পরবর্তী নেতাদের বইপত্র এবং তাদের চালচলন, জীবনাচরণ ওই ধাঁচেরই, তাই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সংগত কারণেই শঙ্কা রয়েছে এ দলটির বিষয়ে। তারা ক্ষমতায় এলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, ধর্মীয় বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় কোন্ রীতি অনুসরণ করবে–সেটিও অস্পষ্ট। এসব বিষয়ে মানুষের শঙ্কা আরও বেড়ে যায়, যখন তারা দেখে, এ দলটি ইসলামী নামের হওয়া সত্ত্বেও এবং তারা ইসলামী শাসন ব্যবস্থার দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও তাদের মূল নেতাদের বলতে গেলে তেমন কেউই কুরআন-হাদীসের শিক্ষা মূল উৎস থেকে গ্রহণ করেননি। তাদের প্রায় সকলেই জেনারেল শিক্ষিত। এ নেতারাই যদি ক্ষমতায় যান, তাহলে তারা ধর্মীয় বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় কাদের অনুসরণ করবেন–অনেকে এ প্রশ্নও উত্থাপন করে থাকেন, তাছাড়া বাংলা ও ইংরেজি থেকে ধর্মীয় বিষয়াদি পড়ে সত্যিকারার্থে পরিপূর্ণ ইসলাম বোঝা যায় কি না?
ওই দলটি অবশ্য তাদেরকে ভোট দেওয়ার জন্য ভিন্ন কথা বলেন। তাঁরা দাবি করে থাকেন, অন্য দলগুলোকে তো জনগণের পরীক্ষা করা হয়ে গেছে, কিন্তু জামায়াতকে এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। তাই আমাদেরকেও একবার পরীক্ষা করে দেখুন। কিন্তু অনেকেই বলেন, জামায়াতকে একেবারেই পরীক্ষা করা হয়নি এমন তো নয়। তারা তো জেনারেল এরশাদের আমলেও এমপি হয়েছে। যুগপৎ আন্দোলনের বাইরে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে স্বৈরাচারী এরশাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এরপর ৯০-৯৬ সনের বিএনপি সরকারে সরাসরি তারা অংশীদার না থাকলেও তাদের সমর্থন নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। ২০০১-২০০৬ সনের সরকারের তো তারা ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল। তাদের দলের প্রধান দুই নেতা মরহুম মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। তাই এ দলটির নীতি আদর্শ বা ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে তা জনগণের একেবারেই ধারণা নেই–এমন নয়। যাহোক এসবের মধ্যেও জামায়াত এবার দশটির মতো দল নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের ময়দানে রয়েছে।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারীদের প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত নতুন দল এনসিপি তো নিজেদেরকে গুছিয়েই উঠতে পারেনি। এর মধ্যে আবার তারা জোটেও যোগ দিয়েছে। যার দরুন মানুষ কিছু স্বকীয়তার চিন্তা করলেও তাদের মধ্যে সেটি আর বাকি থাকেনি।
অন্যদিকে আলেম-উলামার রাজনীতি বহুবছর থেকেই বহু দলে বিভক্ত। এর মধ্যে এই জোট, সেই জোটের পেছনে পড়ে এ দলগুলোর মান-মর্যাদা, আকর্ষণ কোনোটিই আর থাকেনি। জোট ও এমপিত্বের রাজনীতি করতে গিয়ে এ দলগুলোর নেতৃবৃন্দ কর্তৃক আদর্শের জলাঞ্জলি দেওয়া সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ একেবারেই পছন্দ করছে না। তাই এখন ভোট কাকে দেব, এ বিষয়টি সহজে ফয়সালা করা যাচ্ছে না। বিষয়টিকে এমনভাবে দেখার উপায় নেই যে, একদিকে ইসলামী দলগুলোর নির্বাচনী সমঝোতা, অপরদিকে সাধারণ রাজনৈতিক দল। কারণ যেমনিভাবে ইসলামের নাম বহনকারীরাও ইসলামী হুকুমত কায়েম করার কথা বলছে না, তেমনি সাধারণ রাজনৈতিক দলটিও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কথা বলছে। তাই এখানে অন্যান্য অনেক বিষয়ই বিবেচনার মতো রয়েছে; যেগুলোর প্রতি কিঞ্চিত ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সুতরাং আমরা মনে করি, জনগণ তাদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়, সেজন্য আল্লাহ্র কাছে দুআ করে, আমানতদার, সমঝদার, বিজ্ঞজনদের সাথে পরামর্শ করে এবং চিন্তাভাবনা করে ভোটের এ আমানত যথাযথ আদায়ে সচেষ্ট হওয়া দরকার। আর যে দলের বা জোটেরই হোক, কোনো প্রার্থী যদি সুস্পষ্ট ও ঘোষিতভাবে ইসলামবিদ্বেষী, আলেম-উলামা বিদ্বেষী হয়, এদেশের ইসলামী শিক্ষার মূল ধারা কওমী মাদরাসাগুলোর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হয় অথবা অতীতের ইতিহাস ও আচরণে কারও মুনাফেকী চরিত্র যদি সুস্পষ্ট থাকে, তাহলে এমন লোক বা লোকদেরও ভোটদানে বিরত থাকা উচিত।
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় ‖
আগামী বিএনপির জন্য কঠিন পরীক্ষা
গত মাসের ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ দীর্ঘ অসুস্থতার পর এভারকেয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা অনেকটা আকস্মিকভাবে হয়েছিল। তিনি গৃহিণী হয়েই ছিলেন। এমনকি তার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পরেও তিনি বের হননি। তখনকার বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ মির্জা গোলাম হাফিজ, সাজিদুর রহমান, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো লোকেরা অনেকটা জোর করেই তাকে বিএনপির হাল ধরার জন্য রাজনীতিতে নামিয়ে আনেন।
এরপর খালেদা জিয়ার পথচলা অধিকাংশ সময় খুব কঠিন ছিল। যদিও এর ভেতরে তিনি দুইবারের পূর্ণ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী এবং একবার সামান্য সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতির বাকি সময়টা খুব মসৃণ ছিল না। কঠিন সময় তিনি পার করেছেন। বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন সাজানো মামলায় তাঁকে সাজাও দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আবার একই আদালত সে সাজা বাতিলও করেছে।
খালেদা জিয়া সরকারেও ছিলেন, বিরোধী দলেও ছিলেন। বিরোধী দলে থেকে তিনি আপসহীন নেত্রীর খেতাবও পেয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে, ডামি নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি অপ্রতিরোধ্য ছিলেন এবং আপসহীন ছিলেন।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঝপথেই আঁতাত করে নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন। বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। সে থেকেই দেশে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ করা গেছে।
স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রথম নিরপেক্ষ নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনামল দোষে-গুণে মিশ্রিত ছিল। অন্য দলগুলোর শাসনামলের সাথে তাঁর শাসনামলকে তুলনা করলে সাধারণ জনগণ হয়তো তাঁর শাসনামলকে জনগণের স্বার্থ, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিক দিয়ে কিছুটা এগিয়ে রাখবে। তবে খালেদা জিয়াকে এই যুগের রাজনীতিকদের সাথে তুলনা করা হলে, বিশেষত বাংলাদেশের রাজনীতিকদের সাথে তুলনা করলে তাঁর কিছু গুণ মানুষ মনে রাখবে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে মাথা নত করেননি। হয়তো তিনি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিলে বাড়তি ক্ষমতায় থাকা, জোর করে ক্ষমতায় থাকার সুযোগও অন্যদের মতো নিতে পারতেন। তিনি সে পথে অগ্রসর হননি। এছাড়া তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের পথ ধরে তিনি ধর্মপ্রাণ শ্রেণির সাথে, উলামায়ে কেরামের সাথে অন্যদের তুলনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো সম্পর্ক রেখেছেন। ক্ষেত্র বিশেষ ব্যতিক্রমও হয়েছে। কখনো কখনো দলীয় সিদ্ধান্তে আলেমদের বিরাগভাজনও হয়েছিলেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি সুসম্পর্ক বা অন্তত কিছুটা ইতিবাচক সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করে গেছেন। এগুলো দেশে তার জনপ্রিয়তার পরিধিকে বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশি সভ্যতা-সংস্কৃতির যত ক্ষতি অন্য শাসকদের আমলে হয়েছে, বিএনপির শাসনামলে কিছুটা হলেও কম হয়েছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এসব কিছু খালেদা জিয়াকে এদেশের বহু মানুষের প্রিয়পাত্র বানিয়েছে। যার প্রমাণ মানুষ খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে তাঁর জানাযায় দিয়েছে। অসংখ্য মানুষ তাতে যোগ দিয়েছে। এটা তাঁর প্রতি মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। একজন মুসলিম হিসেবে আমরাও তাঁর জন্য দুআ করব, আল্লাহ তাআলা যেন তাঁর গুনাহখাতাগুলো মাফ করে দেন। তাঁকে জান্নাত নসীব করেন।
এখানে দুটি কথা বলার আছে। তা হল, সাধারণ ক্ষেত্রে সকল মুসলমানের বিচার বা হিসাব-নিকাশ একরকম বিবেচনা, শাসকদের ক্ষেত্রে ভিন্নরকম বিবেচনা। শাসন ক্ষমতায় যারা থাকে, তারা তো কঠিন ও স্পর্শকাতর জায়গায় থাকে। শাসক যা ভালো করেন, তার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে সওয়াব অনেক বেশি থাকে। যে ক্ষমতাবানরা সুশাসন করেন, জনগণের কাছে ‘সুশাসক’ বলে পরিচিতি পান, আল্লাহ্র দরবারে যাঁরা সুশাসক, যাঁরা ইনসাফের রাজত্ব কায়েম করেন; তাঁরা আল্লাহ্র আরশের ছায়ায় জায়গা পাবেন।
কিন্তু তাঁরা যদি ইচ্ছাকৃত কারও ওপর জুলুম করেন, অন্যায় করেন, কারও হক নষ্ট করেন অথবা দায়িত্বে অবহেলার কারণে নাগরিকগণ অধিকার বঞ্চিত হন, ইসলাম ও মুসলমানের ক্ষতি হয়, তাহলে এসবের দায় তাঁদের ওপর থেকে যায়। তাই শাসকরা একেবারে দোধারী তলোয়ারের মধ্যে বাস করে। যে-কোনো শাসক দুনিয়া থেকে চলে যাওয়া অন্য শাসকদের জন্য বড় পরীক্ষা ও শিক্ষার উপকরণ। তাঁরা শিক্ষা নিতে পারেন, আমাকেও যেতে হবে। আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আমি কারও হক নষ্ট করছি কি না? আমি কারও কোনো ক্ষতি করছি কি না? একজন শাসক চলে গেলে তাঁর জীবন থেকে এটাও পরবর্তীদের জন্য শিক্ষা নেওয়ার বিষয়।
অনেকেই বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় ব্যাপক মানুষের উপস্থিতিকে আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সেটা আসলে সময় বলে দেবে। মানুষের তৎক্ষণাৎ আবেগ বলে একটা বিষয় থাকে। ভোটকে সব সময় এক হিসেবে নিয়ে আসা যায় না। সেখানে মানুষ হয়তো ভোটের সময় আরও বিভিন্ন বিষয় চিন্তা করবে। বিএনপি কাদেরকে নমিনেশন দিচ্ছে? তারা কী করবে? বিএনপি নির্বাচনের পরে কী করবে? সেসব বিষয়ের প্রতিও মানুষের নজর থাকবে। বিশেষত জিয়া এবং খালেদা জিয়া বিহীন বিএনপি তাদের দুই নেতা-নেত্রীর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কি না, এখনো তাদের আদর্শকে ধরে রাখছে কি না–সেসব বিষয়ও নির্বাচনের আগে মানুষকে বারবার ভাবাবে।
সুতরাং খালেদা জিয়ার জানাযায় বহু মানুষের উপস্থিতি, তাঁর প্রতি মানুষের ভালবাসা-শ্রদ্ধা দেখে চোখ বন্ধ করে বলে ফেলার অবকাশ নেই, বিএনপি ক্ষমতায় চলে এসেছে। বরং বিএনপিকে নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে হবে, তারা জিয়া এবং খালেদা জিয়ার যে ভালো আদর্শগুলো জনগণকে তাদের দিকে টেনেছে, সেগুলোকে কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছে, কতটুকু তারা সেটাকে বাস্তবায়ন করবে, সেটার ওপর তারা কতটুকু অটল থাকবে এবং তাদের দুজনের যেসকল ভুল হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তারেক রহমান ও বর্তমানের বিএনপি সংশোধিত হবে কি না–তার ওপরই নির্ভর করবে।