রজব ১৪৪৭   ||   জানুয়ারি ২০২৬

কালিমা তায়্যিবা ও ইলাহ শব্দের অর্থ বিকৃতি : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ

মাওলানা মুহাম্মাদ আনোয়ার হুসাইন

বরাবর,

মাননীয় মুফতী সাহেব

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা

বিষয় : কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ সংক্রান্ত বিভ্রান্তি প্রসঙ্গে

 

জনাব,

যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন পূর্বক নিবেদন এই যে, গত কয়েক সপ্তাহ পূর্বে মাদারীপুরের কোনো এক মসজিদের জনৈক খতীব সাহেব তার বয়ানে বলেন, “কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থআল্লাহ ছাড়া কোনো শাসক নেই’ আপনাদের যেই হুজুররা আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই শিখিয়েছে, তারা আ-পড়া মৌলভি, জীবনেও কোনো গবেষণা করেনি, তাদের গবেষণা ভুল আপনি অভিধান খুলুন” অর্থাৎ অভিধান শাস্ত্রমতেই অর্থ হবে আল্লাহ ছাড়া কোনো শাসক নেই

তিনি দলীল হিসেবে তখন বলেছিলেন, “আল্লাহর ৯৯টি নামের একটি অপরটির অর্থ বহন করে না যদি ইলাহের অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই করি, তবে মা‘বুদ অর্থ কী? যদি বলেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, তবে খালিক অর্থ কী?” অর্থাৎ তার দাবি মতে, ইলাহ ও মা‘বুদ আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নামের অন্তর্ভুক্ত

সাধারণ মুসলমান কর্তৃক এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের কাছে জানতে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তারা এর দালীলিক খণ্ডন করলে তিনি শরহে আকায়েদের এই ইবারত

واعلم أن قوله تعالى: لَوۡ کَانَ فِیۡہِمَاۤ اٰلِہَۃٌ اِلَّا اللّٰہُ لَفَسَدَتَا  حجة إقناعية، والملازمة عادية على ما هو اللائق بالخطابيات، فإن العادة جارية بوجود التمانع والتغالب عند تعدد الحاكم على ما أشير إليه.

দ্বারা দলীল পেশ করেন তার দাবি মতে, এখানে ইলাহের অর্থ হাকেম করা হয়েছে

উলামায়ে কেরাম কর্তৃক বিভিন্নভাবে মজলিসে এ বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের ব্যাপারে সংশোধনী নসীহা করলে উক্ত খতীব সাহেব কোনো এক মজলিসে আরও কিছু দলীল পেশ করেন যার সারকথা হল, “ফিকহের কিতাবে শরীয়তকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে ১. ব্যক্তিগত জীবন ২. সামাজিক জীবন ৩. রাষ্ট্রীয় জীবন এখানে কেবল ব্যক্তিগত জীবনের বিধানকেই ইবাদত বলেছে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানকে ইবাদত বলেনি যার কারণে আমরা শুধু নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতকেই ইবাদত মনে করি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আহকামকে ইবাদত মনে করি না

এখানে তিনি উসূলুশ শাশী গ্রন্থ থেকে দলীল পেশ করেছেন যে, “সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিধানকে ইবাদত মনে করা حقيقت قاصره আর حقيقت قاصره হল مجازতাই ইলাহ অর্থ মা‘বুদ নিলে হাকীকত আদায় হয় না; বরং হাকেম অর্থ নিলে আল্লাহকে হাকীকী মা‘বুদ মানা হয়

এ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “একসময় মিলাদ ও কিয়াম প্রসিদ্ধ ছিল উলামায়ে কেরাম মিলাদ কিয়াম করত কিছু আলেমের বিরোধিতার কারণে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে এখনো কালিমার ভুল অর্থ মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাই আমি এটাকে সংশোধন করার চেষ্টা করছি

আবার তিনিই বলেন, মানুষের মাঝে কালিমার শাব্দিক অর্থ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এর একটা পারিভাষিক অর্থ আসা উচিত আমি সেই পারিভাষিক অর্থই করেছি

তিনি প্রথম বয়ানে যে বলেছিলেন, ‘ইলাহ অর্থ মা‘বুদ; কোনো অভিধানে নেই’ এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম কর্তৃক দালীলিক পর্যালোচনা হলে তিনি আরেক বয়ানে তা রদ করতে গিয়ে একপর্যায়ে বলেন, “অভিধান খুললে এক অর্থ পাবেন কিন্তু সেখানে পারিভাষিক অর্থ পাবেন না আমি করেছি পারিভাষিক অর্থ আর পারিভাষিক অর্থের জন্য যে অভিধান খোলে, সে আস্ত মূর্খ” অর্থাৎ পূর্বে তিনি ইলাহ-এর শাব্দিক অর্থ মা‘বুদ অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তা স্বীকার করে নিয়েছেন তবে তিনি এর একটা পারিভাষিক অর্থ দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন যা আকাবির ও আসলাফের কেউ অনুধাবন করেনি

অতএব, মুফতী সাহেবের কাছে আমাদের জানার বিষয় হল :

(১) আমরা তালীমুল ইসলাম ও বেহেশতি জেওর থেকে শুরু করে সমস্ত কিতাবে যে ইলাহের অর্থ মা‘বুদ পেয়েছি, তা কি ভুল?

(২) ইলাহের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী?

(৩) এমন ব্যক্তির বয়ান কি শোনা যাবে?

আশা করি, এর সঠিক সমাধান দিয়ে অগণিত মানুষের ঈমান হেফাজত করে উলামায়ে কেরামকে চিন্তামুক্ত করবেন আল্লাহ তাআলা উভয় জগতে আপনাদের সফলতা দান করুন আমীন

 

নিবেদন

ইমাম মুয়াজ্জিন সমাজ কল্যাণ পরিষদ

মাদারীপুর

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا ومولانا محمد خاتم النبيين، وعلى آله وصحبه أجمعين.

মূল উত্তরের পূর্বে জরুরি কয়েকটি বিষয় জানা দরকার :

এক. ‘তাহরীফ ফীদ দ্বীন’ বা দ্বীনের কোনো বিষয়ে বিকৃতি ঘটানো হারাম ও ভয়ানক গুনাহের কাজ এ বিকৃতি যদি হয় কুরআন কারীম, হাদীস শরীফ এবং উম্মাহর ইজমা দ্বারা প্রমাণিত ও স্বীকৃত কোনো মাফহুম ও অর্থের বিষয়ে, তার ভয়াবহতা কী পর্যায়ের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না

দুই. কুরআন-সুন্নাহ এবং উম্মাহর নিকট স্বীকৃত কোনো শব্দ, বাক্যের অর্থ ও মাফহুমে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটানো নিঃসন্দেহে দ্বীন ও শরীয়ত বিকৃতি যা চরম পর্যায়ের গোমরাহী এটি দ্বীনে হানীফ থেকে বিচ্যুত ভ্রষ্টাচারীদের কাজ

তিন. কুরআন কারীমের কোনো আয়াতের স্বীকৃত অর্থ ও মাফহুমকে বিকৃত করে মনগড়াভাবে কোনো অর্থ আবিষ্কার করা নিঃসন্দেহে ‘ইলহাদ’ ও ‘যান্দাকা’ যা ভয়ানক পর্যায়ের কুফর ও চরম গোমরাহী কুরআন কারীমে ‘ইলহাদ ফী আয়াতিল্লাহ’-এর পরিণাম জাহান্নাম বলা হয়েছে

চার. তাহকীক বা গবেষণা হয়েই থাকে এমন সব বিষয়ে, যা অস্পষ্ট বা জটিল মুসাল্লামাত ও ইজমায়ী বিষয়, অর্থাৎ শরীয়তের যেসব বিষয় সর্বজন স্বীকৃত ও সর্বসম্মত, সেসব বিষয়ে গবেষণা নিঃসন্দেহে নির্বোধ ও ফেতনা সৃষ্টিকারীদের কাজ কেননা এসব তো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বিষয় সর্বজনস্বীকৃত এসব বিষয়ের প্রতি সন্দেহের চোখে তাকানো বে-দ্বীনী মানসিকতার ফলাফল

পাঁচ. শরীয়তের কোনো মাসআলা বা হুকুম বলার ক্ষেত্রে ধৃষ্টতা প্রদর্শন ভয়ানক রকমের গুনাহ এ ধরনের মানসিকতা ও প্রবণতার বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে

أَجرَؤُكُمْ عَلَى الفُتْيَا أجْرَؤُكُمْ عَلَى النّارِ.

তোমাদের মধ্যে ফতোয়ার ব্যাপারে যে ধৃষ্টতা দেখায়, সে জাহান্নামের ব্যাপারে ধৃষ্টতা দেখায় (সুনানে দারিমী ১/৬৯)

 

এই বুনিয়াদী কথাগুলোর পর এখন মূল উত্তরে আসা যাক

১ ও ২ নং প্রশ্নের উত্তর :

প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে কালেমা তায়্যিবার অর্থ কি ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই’, নাকি ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো শাসক নেই’? এ দুটি অর্থের কোন্টি সঠিক?

প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির গবেষণা মতে, কালেমা তায়্যিবার সঠিক অর্থ হল, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো শাসক নেই’ পক্ষান্তরে যারা কালেমা তায়্যিবার এই অর্থ করে যে, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই’, তার মতে তাদের এই অর্থ করা ভুল

এর উত্তর হল, কালেমা তায়্যিবা لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ -এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই এটি কালেমার সর্বজনবিদিত ও স্বীকৃত অর্থ যা কুরআন কারীমের অসংখ্য আয়াত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত

কুরআন কারীম, হাদীস শরীফ এবং আরবী ভাষায় اِلٰه শব্দটি ‘মা‘বুদ’ অর্থেই এসেছে সাহাবা, তাবেয়ীগণের বক্তব্য থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, اِلٰه অর্থ মা‘বুদ তাফসীর, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রের ইমামগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারাও প্রমাণিত যে, اِلٰه অর্থ মা‘বুদ মোটকথা, اِلٰه শব্দটি ‘মা‘বুদ’ অর্থে হওয়া একটি ইজমায়ী বিষয়

এমনকি ইলাহ যে মা‘বুদকেই বলা হয়, তা আরবের মুশরিকদের কাছেও স্পষ্ট ছিল তারা তাদের বাতিল মা‘বুদ অর্থাৎ দেব-দেবী, প্রতিমাদের ইলাহ বলত কালেমা তায়্যিবাতে তাদের এ বাতিল বিশ্বাসের খণ্ডন করা হয়েছে এবং মা‘বুদ যে একমাত্র আল্লাহ তাআলা, এর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে 

পক্ষান্তরে اِلٰه অর্থ ‘হাকেম’ বা ‘শাসক’ বলা এটা না কুরআনের কোনো আয়াত থেকে প্রমাণিত, না হাদীস থেকে, না সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে, না তাফসীর, হাদীস, ফিকহ শাস্ত্রজ্ঞ থেকে, না আরবী ভাষাবিদদের থেকে তাই اِلٰه অর্থ হাকেম বা শাসক করা এবং কালেমা তায়্যিবার অর্থ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো শাসক নেই’ করা নিঃসন্দেহে ঈমানী কালিমার মর্ম বিকৃতি, কুরআন কারীমের অনেক আয়াত ও হাদীসের মর্ম বিকৃতি, তথা দ্বীন ও শরীয়ত এবং ইসলামী আকীদার বিকৃতি উম্মাহর ইজমা পরিপন্থি চরম পর্যায়ের ভ্রান্তি ও গোমরাহী

কুরআন কারীমে اِلٰه শব্দের অর্থ ও ব্যবহার

কুরআন কারীমে اِلٰه শব্দটি যে মা‘বুদ অর্থে এসেছে, তা তো সন্দেহাতীত বিষয় এখানে সংশ্লিষ্ট সকল আয়াত উল্লেখ না করে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হল

এক.

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

لَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا اِلٰي قَوْمِهٖ فَقَالَ يٰقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ .

আমি নূহকে প্রেরণ করেছি তার সম্প্রদায়ের নিকট অতঃপর তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো মা‘বুদ নেই সূরা আ‘রাফ (০৭) : ৫৯

উক্ত আয়াতে مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ অংশটি কালেমা তায়্যিবার সমার্থক আর এতে اِلٰه শব্দটির অর্থ যে মা‘বুদ, তা আয়াত থেকেই স্পষ্ট কারণ নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় ‘শিরক ফীল উলূহিয়্যাত’-এ লিপ্ত ছিল অর্থাৎ তারা বহু ইলাহের ইবাদত করত তাই তিনি তাদেরকে এই বলে আহ্বান করলেন

اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ.

তোমরা আল্লাহর-ই ইবাদত কর কারণ, مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ তিনি ব্যতীত অন্য কোনো মা‘বুদ নেই

অতএব এখানে ইলাহ অর্থ যে মা‘বুদ তা আয়াত থেকেই স্পষ্ট

এটি আরও স্পষ্ট হয়ে যায় নূহ আলাইহিস সালামের কওমের বক্তব্য থেকে তাদেরকে তিনি যখন বাতিল মা’বুদের পূজা পরিত্যাগ করতে বললেন, তখন তারা বলল

لَا تَذَرُنَّ اٰلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّلَا سُوَاعًا وَّ لَا يَغُوْثَ وَيَعُوْقَ وَنَسْرًا.

তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের ইলাহসমূহকে পরিত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়াউক ও নাস্রকে সূরা নূহ (৭১) : ২৩

আয়াতটিতে  اٰلِهَتَكُمْ -এর অর্থ মা‘বুদ, তা একদমই পরিষ্কার নূহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের মোকাবেলায় তারা সত্য মা‘বুদ রাব্বুল আলামীনের পরিবর্তে যেসব বাতিল মা‘বুদের ইবাদত করত, তাদের একেকজনের নাম উল্লেখ করে বলেছে, তারা এদের ইবাদত ত্যাগ করতে পারবে না জানা কথা, এসব তো মূর্তির নাম কোনো শাসকের নাম নয়

দুই.

اِلٰه অর্থ মা‘বুদ এর আরেকটি প্রমাণ হল সূরা মায়েদার নিম্নোক্ত আয়াত আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَاِذْ قَالَ اللهُ يٰعِيْسَي ابْنَ مَرْيَمَ ءَاَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُوْنِيْ وَاُمِّيَ اِلٰهَيْنِ مِنْ دُوْنِ اللهِ .. مَا قُلْتُ لَهُمْ اِلَّا مَاۤ اَمَرْتَنِيْ بِهٖۤ اَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّيْ وَرَبَّكُمْ.

আর (স্মরণ করুন) যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার মাতাকে মা‘বুদরূপে গ্রহণ কর? সে তখন বলবে,... আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ব্যতীত তাদেরকে কিছুই বলিনি তা এই যে, তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর সূরা মায়িদা, ১১৬-১১৭

এখানে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা আ.-কে জিজ্ঞেস করবেন, তিনি কি মানুষকে বলেছিলেন, তাকে ও তার মাকে যেন তারা ইলাহরূপে গ্রহণ করে?

উত্তরে তিনি বলবেন, আমি কেবল তাদেরকে আপনার ইবাদত করতেই বলেছি সুতরাং বোঝা গেল, ইলাহ বলতে মা‘বুদই উদ্দেশ্য; হাকেম বা শাসক নয় যদি হাকেম উদ্দেশ্য হত, তাহলে ঈসা আ. অবশ্যই উত্তরে সে প্রসঙ্গে কিছু বলতেন কিন্তু সে সম্পর্কে তিনি কিছুই বলেননি

ইমাম তাবারী রাহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন

وأما تأويل الكلام، فإنه: أأنت قلت للناس اتخذوني وأمي إلهين، أي: معبودين تعبدونهما من دون الله.

আয়াতটির অর্থ হল, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আমাকে ও আমার মাতাকে মা‘বুদ সাব্যস্ত করো, আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা ইবাদত করবে?

আরও দ্রষ্টব্য: তাফসীরে সা‘লাবী ১১/৫৬৮

তিন.

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

وَجٰوَزْنَا بِبَنِيْۤ اِسْرَآءِيْلَ الْبَحْرَ فَاَتَوْا عَلٰي قَوْمٍ يَّعْكُفُوْنَ عَلٰۤي اَصْنَامٍ لَّهُمْ  قَالُوْا يٰمُوْسَي اجْعَلْ لَّنَاۤ اِلٰهًا كَمَا لَهُمْ اٰلِهَةٌ قَالَ اِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُوْنَ.

আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম অতঃপর তারা এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছল, যারা তাদের প্রতিমা পূজায় রত ছিল বনী ইসরাঈল বলতে লাগল, হে মূসা! আমাদের জন্যও ঐরূপ একটি ইলাহ নিয়ে আসুন, যেমন তাদের রয়েছে বহু ইলাহ তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমরা মূর্খ লোক সূরা আ‘রাফ (০৭) : ১৩৮

উক্ত আয়াতের অংশ اجْعَلْ لَّنَاۤ اِلٰهًا كَمَا لَهُمْ اٰلِهَةٌ থেকে পরিষ্কার যে, ইলাহ বলাই হয় মা‘বুদকে; হাকেম বা শাসককে নয় কেননা বনী ইসরাঈল উপাসনার জন্যই মূসা আ.-এর নিকট তাদের মতো একটি اِلٰه অর্থাৎ পূজার মূর্তির আবেদন করেছিল

চার.

সামেরীর ঘটনা থেকেও اِلٰه-এর অর্থ মা‘বুদ তা ভালোভাবে প্রমাণিত হয় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

فَاَخْرَجَ لَهُمْ عِجْلًا جَسَدًا لَّهٗ خُوَارٌ فَقَالُوْا هٰذَاۤ اِلٰهُكُمْ وَ اِلٰهُ مُوْسٰي فَنَسِيَ.

তারপর সে (সামেরী) তাদের জন্য বের করে আনল একটা বাছুর, একটি দেহকাঠামো, যার মধ্যে ছিল গরুর আওয়াজ তখন সে বলতে লাগল, এটা তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন সূরা ত্ব-হা (২০) : ৮৮

আয়াতটিতে هٰذَاۤ اِلٰهُكُمْ وَ اِلٰهُ مُوْسٰي فَنَسِيَ   (এটি তোমাদের ইলাহ ও মূসারও ইলাহ) থেকে ইলাহের অর্থ মা‘বুদ হওয়া সুস্পষ্ট কারণ বাছুরের মূর্তিকে হাকেম বা শাসক আখ্যা দেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই

সামিরীর উক্ত শিরকী কর্মকাণ্ডে ক্রোধান্বিত হয়ে মূসা আলাইহিস সালাম এই বলে তাওহীদের ঘোষণা দেন

وَانْظُرْ اِلٰۤي اِلٰهِكَ الَّذِيْ ظَلْتَ عَلَيْهِ عَاكِفًا لَنُحَرِّقَنَّهٗ ثُمَّ لَنَنْسِفَنَّهٗ فِي الْيَمِّ نَسْفًا، اِنَّمَاۤ اِلٰهُكُمُ اللهُ الَّذِيْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ وَسِعَ كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا.

তুমি তোমার এ (অলীক) মা‘বুদকে দেখ, যার কাছে তুমি স্থির বসে থাকতে আমরা একে অবশ্যই জ্বালিয়ে দেব, তারপর একে (ছাইগুলোকে) সাগরে বিক্ষিপ্ত করে দেব তোমাদের মা‘বুদ তো আল্লাহ্ই, যিনি ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই তার জ্ঞান সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে সূরা ত্ব-হা (২০) : ৯৭-৯৮

পাঁচ. 

সূরা সাফফাতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায় সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে

اِذْ قَالَ لِاَبِيْهِ وَ قَوْمِهٖ مَا ذَا تَعْبُدُوْنَ،  اَىِٕفْكًا اٰلِهَةً دُوْنَ اللهِ تُرِيْدُوْنَ.

যখন তিনি তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা কোন্ জিনিসের ইবাদত করছ? তোমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে অলীক উপাস্যদেরকে কামনা করছ? সূরা সাফফাত (৩৭) : ৮৫-৮৬

এখানে পূজার মূর্তিকে ইলাহ বলা হয়েছে শাসকের কোনো প্রসঙ্গই নেই এখানে

আরও লক্ষ করুন, ইবরাহীম আ. ও তাঁর সম্প্রদায় সম্পর্কে সূরা আম্বিয়ার নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ

اِذْ قَالَ لِاَبِيْهِ وَقَوْمِهٖ مَا هٰذِهِ التَّمَاثِيْلُ الَّتِيْۤ اَنْتُمْ لَهَا عٰكِفُوْنَ، قَالُوْا وَجَدْنَاۤ اٰبَآءَنَا لَهَا عٰبِدِيْنَ.

স্মরণ কর সেই সময়কে, যখন সে নিজ পিতা ও সম্প্রদায়কে বলেছিল, এই মূর্তিগুলো কী, যার সামনে তোমরা স্থির বসে থাক?

তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এদেরই ইবাদত করতে পেয়েছি

فَجَعَلَهُمْ جُذٰذًا اِلَّا كَبِيْرًا لَّهُمْ لَعَلَّهُمْ اِلَيْهِ يَرْجِعُوْنَ. قَالُوْا مَنْ فَعَلَ هٰذَا بِاٰلِهَتِنَاۤ اِنَّهٗ لَمِنَ الظّٰلِمِيْنَ.

সুতরাং ইবরাহীম সবগুলো মূর্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলল তাদের বড়টি ছাড়া, যাতে তারা তার কাছে রুজু করতে পারে

তারা বলল, আমাদের ইলাহদের সাথে এরূপ আচরণ কে করল? নিশ্চয়ই সে বড় জালেম সূরা আম্বিয়া (২১) : ৫২-৬২

এখানেও পূজার মূর্তিকে ইলাহ বলা হয়েছে হাকেম বা শাসকের কোনো প্রসঙ্গও এখানে নেই

ছয়.

নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও প্রমাণিত যে, ইলাহ বলা হয় মা‘বুদকে, হাকেমকে নয় আল্লাহ তাআলা বলেন

وَ اِذْ قَالَ اِبْرٰهِيْمُ لِاَبِيْهِ اٰزَرَ اَتَتَّخِذُ اَصْنَامًا اٰلِهَةً اِنِّيْۤ اَرٰىكَ وَ قَوْمَكَ فِيْ ضَلٰلٍ مُّبِيْنٍ.

(স্মরণ কর), যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, আপনি কি মূর্তিদেরকে মা‘বুদ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো দেখছি, আপনি ও আপনার সম্প্রদায় স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছেন সূরা আনআম (০৬) : ৭৪

সাত.

কালেমা তায়্যিবার অর্থ যে ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই’ তা নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও প্রমাণিত

সূরা সাফফাতে আল্লাহ তাআলা বলেন

اِنَّهُمْ كَانُوْۤا اِذَا قِيْلَ لَهُمْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُوْنَ،  وَ يَقُوْلُوْنَ اَىِٕنَّا لَتَارِكُوْۤا اٰلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنٍ.

তাদের অবস্থা এই ছিল, তাদেরকে যখন বলা হত, لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই) তখন তারা অহমিকা প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এমন, এক উন্মাদ কবির কারণে আপন উপাস্যদের পরিত্যাগ করব? সূরা সাফফাত (৩৭) : ৩৫-৩৬

এখানে ইলাহ অর্থ মা‘বুদ, তা স্পষ্ট কারণ আয়াতে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, মুশরিকদেরকে যখন বলা হত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে, তখন তারা নিজেদের বাতিল ইলাহসমূহকে পরিত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানাত বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাদের বাতিল ইলাহ বাতিল মা‘বুদই (পূজার মূর্তি) ছিল; শাসক ছিল না 

হাদীস শরীফে اِلٰه শব্দের অর্থ ও ব্যবহার

ইলাহ অর্থ ‘মা‘বুদ’ এবং কালেমা তায়্যিাবার অর্থ ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই’ তা বহু হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত এখানে উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীস উল্লেখ করা হল

আবু মালেক আশজায়ী রাহ. তার পিতা তারেক আলআশজায়ী রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন

سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلّى الله عَلَيهِ وسلَّمَ يَقُولُ: مَنْ قَالَ لَا إِلهَ إِلَّا الله، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللهِ، حَرُمَ مَالُه وَدَمُه. وَحِسَابُه على الله.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ বলবে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল মা‘বুদকে অস্বীকার করবে, তার সম্পদ এবং রক্ত হারাম আর তার হিসাব আল্লাহর নিকট সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩

বোঝা গেল, ইলাহ অর্থ মা‘বুদ আর কালিমার অর্থ হল, একমাত্র আল্লাহকে মা‘বুদ হিসেবে গ্রহণ করা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল বাতিল মা‘বুদ থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করা এ সম্পর্কিত আরও হাদীস জানার জন্য দেখুন (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯,২০; আলইলালুল কাবীর, তিরমিযী পৃ. ৩৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৮৩)

ইমামগণের বক্তব্যের আলোকে ইলাহ ও কালেমা তায়্যিবার অর্থ

এক.

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রাহ. (৩১০ হি.)  তাফসীরে তাবারী-এلَاۤ اِلٰهَ اِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ -এর ব্যাখ্যায় বলেন

لَا مَعْبُوْدَ فِي السَّمَاوَاتِ والأرض، تصلح العبادة له سواي فاعبدون.

আসমান ও জমিনে আমি (আল্লাহ) ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত অন্য কোনো মা‘বুদ নেই সুতরাং তোমরা শুধু আমার ইবাদত কর তাফসীরে তাবারী ৯/১৬

দুই.

ইমাম আবু মানসূর মাতুরীদী রাহ. (৩৩৩ হি.) সূরা দুখানের আয়াত لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর ব্যাখ্যায় বলেন

لا معبود يستحق العبادة سواه؛ لأن الإله هو المعبود عند العرب.

তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত কোনো মা‘বুদ নেই কেননা আরবদের নিকট মা‘বুদকেই اِلٰه বলা হয় তাবীলাতু আহলিস সুন্নাহ ৯/১৯৮

তিন.

ফকীহ আবুল লাইস সামারকান্দী রাহ. (৩৭৩ হি.) বলেন

لا إله إلا الله، يعني لا معبود في السماء والأرض غيره.

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ আসমান ও জমিনে আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই তাম্বীহুল গাফিলীন, পৃ. ২৮৪

চার.

ইমাম খাত্তাবী রাহ. (৩৮৮ হি.) বলেন

فمعنى الإله: المعبود، وقول الموحدين: لا إله إلا الله، معناه: لا معبود غير الله.

إله অর্থ মা‘বুদ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ-এর অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই শানুদ দুআ, খাত্তাবী, পৃ. ৯৪

পাঁচ.

ইমাম আবু ইসহাক সা‘লাবী রাহ. (৪২৭ হি.) هُوَ الله الَّذِي لَاۤ اِلٰهَ إِلَّا هُوَ-এর ব্যাখ্যায় বলেন

لا معبود في الحقيقة في السموات والأرض إلا هو.

নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো মা‘বুদ নেই তাফসীরে সা‘লাবী ২৬/২৬৪

ছয়.

মাক্কী ইবনে আবী তালিব আলকুরতুবী রাহ. (৪৩৭ হি.) إِنَّنِي أَنَا اللهُ لَاۤ اِلٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِيْ -এর ব্যাখ্যায় বলেন

إني أنا المعبود، لا معبود غيري يستحق العبادة فاعبدني.

নিশ্চয়ই আমিই একমাত্র মা‘বুদ আমি ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত কোনো মা‘বুদ নেই সুতরাং আমার ইবাদত কর আলহিদায়া ইলা বুলূগিন নিহায়া ৫/২৯১৩

সাত.

ইমাম বায়হাকী রাহ. (৪৫৮ হি.) বলেন

فمعنى الإله: المعبود، وقول الموحدين: لا إله إلا الله، معناه لا معبود بحق غير الله.

اِلٰه অর্থ মা‘বুদ আর একত্ববাদে বিশ্বাসীদের কথা لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই আলআসমা ওয়াস সিফাত, বায়হাকী ১/৪৯

আট.

আবুল কাসেম কিওয়ামুস সুন্নাহ রাহ. (৫৩৫ হি.) বলেন

فمعنى الإله المعبود، وقول القائل: لا إله إلا الله، معناه لا معبود غير الله.

إله অর্থ মা‘বুদ আর لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই আলহুজ্জাহ ফী বয়ানিল মাহাজ্জাহ ১/১৩৬

নয়.

ইমাম আবুল মুযাফফার সামআনী রাহ. (৪৮৯ হি.) বলেন

لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ: لَا مَعْبُودَ سِوَاهُ

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর অর্থ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই তাফসীরে সামআনী ১/২৯১

দশ.

ইমাম কুরতুবী রাহ. (৬৭১ হি.) সূরা ফাতিহার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন

ومنه قول الموحدين: لا إله إلا الله، معناه لا معبود غير الله.

একত্ববাদে বিশ্বাসীদের কালেমা لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই তাফসীরে কুরতুবী ১/১০৩

এগারো.

ইমাম ইবনে কাসীর রাহ. (৭৭৪ হি.) বলেন

كان كلمة الإسلام لا إله إلا الله محمد رسول الله أي لا معبود إلا الله، ولا طريق إليه إلا ما جاء به الرسول..

ইসলামের কালেমা لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ-এর অর্থ হল, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত শরীয়তের অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়ার কোনো পথ নেই তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৭২৬

বারো.

ইমাম শামসুদ্দীন কুরতুবী রাহ. (৬৫৬ হি.) বলেন

لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ؛ أي: لَا مَعْبُودَ غَيْرُكَ.

لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ-এর অর্থ হল, আপনি ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই আলমুফহিম, কুরতুবী ২/৩৯৯

তেরো.

ইমাম ইবনু দাকীকিল ঈদ রাহ. (৭০২ হি.) বলেন

لَا إِلٰهَ أَيْ لَا مَعْبُودَ بِجَمِيعِ أَنْوَاعِ الْعِبَادَةِ بِحَقٍّ إِلَّا اللهُ.

 لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থাৎ ইবাদতের যত প্রকার রয়েছে, আল্লাহ ব্যতীত এসবের উপযুক্ত কোনো মা‘বুদ নেই শরহুল আরবাঈন, ইবনু দাকীকিল ঈদ, পৃ. ১৩

চৌদ্দ.

ইমাম রাগেব আলআসফাহানী রাহ. (৫০২ হি.) বলেন

لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ: أن لا معبود سواه.

 لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর অর্থ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই তাফসীরে রাগেব আলআসফাহানী ১/৪১২

পনেরো.

আল্লামা তীবী রাহ. (৭৪৩ হি.) বলেন

عن أبي الهيثم أنه قال: في قوله: لا إله إلا الله، أي: لا معبود إلا الله.

আবুল হাইসাম রাহ. বলেনلَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই ফুতূহুল গায়ব, তীবী ১/৭০২

ষোলো.

আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামী রাহ. (৯৭৪ হি.) বলেন

(أن لا إله) أي: لا معبود بحق في الوجود إلا الله الواحد.

 لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, এক আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই আলফাতহুল মুবীন, ইবনে হাজার হাইতামী, পৃ. ৮২

সতেরো.

মোল্লা আলী কারী রাহ. (১০১৪ হি.) বলেন

لَا إِلهَ إِلَّا الله، أي: لَا مَعْبُودَ بِحَقٍّ فِي الْوُجُودِ إِلَّا اللهُ.

 لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই মিরকাতুল মাফাতীহ ২/৭৩২

আঠারো.

আল্লামা মুনাবী রাহ. (১০৩১ হি.) বলেন

(لَا إِلهَ) أي لا معبود بحق في الوجود (إِلا الله وحده)

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, এক আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই আততাইসীর, মুনাবী ১/৩

উনিশ.

ইবনে আল্লান রাহ. (১০৫৭ হি.) বলেন

(لا إله) أي لا معبود بحق في الوجود (إلا الله وحده).

 لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই দলীলুল ফালিহীন ৩/৩৮৭

বিশ.

আল্লামা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রাহ. (১৩৪৬ হি.) বলেন

(لا إله) أي لا معبود بحق في الوجود (إلا الله).

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বুদ নেই বাযলুল মাজহুদ ৩/২৪৬

এখানে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণ থেকে কেবল বিশটি উদ্ধৃতি পেশ করা হল, যা থেকে ইলাহ ও কালেমা তায়্যিবার অর্থ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট আর তা হল, ইলাহ অর্থ মা‘বুদ এবং কালেমা তায়্যিবার অর্থ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বুদ নেই

পক্ষান্তরে ইলাহ অর্থ হাকেম বা শাসক বলা এবং কালেমা তায়্যিবার অর্থ, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো শাসক নেই’ করা কুরআন-হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয় এ অর্থ করা নিঃসন্দেহে তাহরীফ ও বিকৃতি প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি যদি বাস্তবেই কালেমার অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কোনো শাসক নেই বলে থাকেন, তবে তিনি সুস্পষ্ট ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন এবং ইলাহ ও কালেমার অর্থের সুস্পষ্ট তাহরীফ ও বিকৃতি ঘটিয়েছেন

ইমামুল লুগাহ অর্থাৎ আরবী ভাষাশাস্ত্রের ইমামগণের মতে ইলাহ এর অর্থ

১. লুগাতের প্রাচীনতম গ্রন্থ কিতাবুল ‘আইন-এর গ্রন্থকার ইমাম খলীল আলফারাহীদী রাহ. اِلٰه শব্দের অর্থ প্রসঙ্গে বলেন

ويسمون الأصنام التي يعبدونها آلهة، ويسمون الواحد إلاها.

মুশরিকরা পূজার মূর্তিসমূহকে آلهة বলত আর মূর্তি একটি হলে বলত اِلٰهকিতাবুল আ‘ইন ১/৮২

২. ইমাম আবু হিলাল আসকারী রাহ. (৩৯৫ হি.) বলেন

أن الإله هو الذي يحق له العبادة، فلا إله إلا الله.

ইলাহ হলেন এমন সত্তা, যিনি ইবাদতের উপযুক্ত সুতরাং আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আলফুরুকুল লুগাবীয়্যাহ, পৃ. ১৮৫

৩. ইবনে সীদা রাহ. (৪৫৮ হি.) বলেন

الإله: الله عز وجل، وكل ما اتخذ من دونه معبودا إله عند متخذه، والجمع آلهة.

ইলাহ হলেন, আল্লাহ তাআলা পক্ষান্তরে (ঈমান ও তাওহীদের নিআমত থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে) মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যা কিছুকে মা‘বুদ বানায় তাদের ধারণা অনুযায়ী সেটিও মা‘বুদ তাই সেটিকেও তারা ইলাহ বলে শব্দটির বহু বচন হল آلهةআলমুহকাম ওয়াল মুহীতুল আ‘যাম, ইবনে সীদা ৪/৩৫৮

৪. আবু নাসর আল জাওহারী রাহ. (৩৯৩ হি.) বলেন

ومنه قولنا «الله» وأصله إله.. بمعنى مفعول، لانه مألوه أي معبود.

আর আল্লাহ শব্দের মূল হল, ইলাহ এর অর্থ মা‘বুদ আসসিহাহ, পৃ. ৫১

৫. জামালুদ্দীন ইবনে মানযূর রাহ. (৭১১ হি.) বলেন

الإله: الله عز وجل، وكل ما اتخذ من دونه معبودا إله عند متخذه، والجمع آلهة.

ইলাহ হলেন, আল্লাহ তাআলা পক্ষান্তরে (ঈমান ও তাওহীদের নিআমত থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে) মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যা কিছুকে মা‘বুদ বানায় তাদের ধারণা অনুযায়ী সেটিও মা‘বুদ তাই সেটিকেও তারা ইলাহ বলে শব্দটির বহু বচন হল آلهةলিসানুল আরব ১৩/৪৬৭

৬. মুরতাযা যাবীদী রাহ. (১২০৫ হি.) বলেন

(ومنه لفظ الجلالة وأصله إلاه كفعال بمعنى مألوه)، لأنه مألوه أي معبود.

আর আল্লাহ শব্দের মূল হল, ইলাহ ইলাহ مألوه অর্থাৎ মা‘বুদ এর অর্থে তাজুল আরুস ৩৬/৩২০

এখানে কেবল ছয়টি কিতাবের উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে যাতে খুব স্পষ্ট ভাষায়ই বলা হয়েছে, ইলাহ বলা হয় মা‘বুদকে হাকেম বা শাসককে ইলাহ বলা হয় এমন কোনো কথা সেখানে নেই আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় লুগাতের অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি পেশ করা হয়নি আরও উদ্ধৃতি দেখতে চাইলে (أ- ل-ه أله) শব্দমূলের আলোচনাটি লুগাত ও মাআজিমের অন্যান্য গ্রন্থাবলি থেকে দেখে নেওয়া যেতে পারে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আহকামুল হাকিমীন

মনে রাখতে হবে, এক হল ইলাহের অর্থ মা‘বুদ হওয়া এবং لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর অর্থ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই; তিনিই একমাত্র মা‘বুদ’ আর আরেকটি হল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আহকামুল হাকিমীন হওয়া এটি তো সন্দেহাতীত বিষয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন আহকামুল হাকিমীন হুকুম ও হুকুমত, শাসন ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিকও একমাত্র তিনিই কুরআন কারীমের বহু আয়াত ও অসংখ্য হাদীস দ্বারা তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত অপরদিকে ইলাহের অর্থ যে মা‘বুদ এবং কালেমার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই তাও কুরআন কারীমের বহু আয়াত এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদীস দ্বারা এবং তাবেয়ীন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আরবী ভাষাবিদগণের বক্তব্য দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত অথচ প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি কুরআন হাদীসের কোনো দলীল ছাড়াই সম্পূর্ণ দলীলহীনভাবে ইলাহ শব্দের ওপর হাকেম-এর অর্থ আরোপ করে কালেমার একটি নতুন অর্থ আবিষ্কার করেছেন তিনি এ আবিষ্কারের মাধ্যমে ছোটখাটো কোনো তাহরীফ ও বিকৃতি ঘটাননি; বরং এর মাধ্যমে توحيد العبادة তথা আল্লাহ্ই একমাত্র মা‘বুদ এবং ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই ইসলামী কালেমার এ অকাট্য মর্মকেই তিনি মুছে দিয়েছেন এটি যে কত ভয়াবহ তাহরীফ ও গোমরাহী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না

প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির যুক্তি ও তার খণ্ডন

ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ-এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই এবং اِلٰه অর্থ মা‘বুদ এ বিষয়টি কুরআন কারীমের বহু আয়াত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদীস, সাহাবা, তাবেয়ীনের বাণী, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আরবী ভাষাবিদদের বক্তব্য দ্বারা সুপ্রমাণিত এটি একটি ইজমায়ী ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়

এর বিপরীতে প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির দাবি হল, اِلٰه অর্থ শাসক আর لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো শাসক নেই তার এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো দলীল পেশ করেননি অথচ এ দাবি প্রমাণের জন্য জরুরি হল, তার মতের পক্ষে কুরআন, হাদীস থেকে দলীল পেশ করা এ মর্মে সাহাবা, তাবেয়ীন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আরবী ভাষাবিদদের বক্তব্য উল্লেখ করা কিন্তু তিনি তা করেননি আর তা করা সম্ভবও নয় তা না করে তিনি নিজের মতের পক্ষে কিছু আজগুবি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন

বলার অপেক্ষা রাখে না, কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট দলীলের বিপরীতে এবং সাহাবা তাবেয়ীন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আরবী ভাষাবিদদের ঐকমত্যের বিপরীতে এসব যুক্তির কোনোই মূল্য নেই

যুক্তি-১

তার একটি যুক্তি হল, ইলাহ ও মা‘বুদ উভয়টি যেহেতু আসমায়ে হুসনার অন্তর্ভুক্ত, তাই ইলাহ অর্থ মা‘বুদ হতে পারে না তাই এর অর্থ হবে হাকেম

খণ্ডন

এই যুক্তিতে দলীলের কিছুই নেই, শুধু দাবি আর দাবি প্রথম কথা হল, আসমায়ে হুসনার মধ্যে একই মর্মের দুই নাম নেই এ কথাই ভুল কেননা, একই মর্মের একাধিক নাম আসমায়ে হুসনার মধ্যে রয়েছে যেমন, الغفورالغفار المعبودإله -ও তদ্রƒ

তো এটা কেমন কথা যে, আসমায়ে হুসনায় এক অর্থের একাধিক নাম নেই, সেজন্য জোর জবরদস্তি ইলাহ-এর সঠিক অর্থ মা‘বুদ ছেড়ে তার এমন অর্থ করা হবে, যেটা একেবারে ভুল? কোনো সন্দেহ নেই, এটা ইসলামের শিআর ও ঈমানের কালিমার সাথে স্পষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা যে, যেভাবে চাইবে সেভাবে তাহরীফ করবে

যুক্তি-২

তার আরেকটি যুক্তি হল, শরহে আকায়েদের উদ্ধৃত বক্তব্য তার দাবি, উক্ত বক্তব্যে আল্লামা তাফতাযানী রাহ. ইলাহ অর্থ হাকেম করেছেন

খণ্ডন

আমরা প্রথমে শরহে আকায়েদের ইবারতটি লক্ষ করি

واعلم أن قوله تعالى: لَوۡ کَانَ فِیۡہِمَاۤ اٰلِہَۃٌ اِلَّا اللّٰہُ لَفَسَدَتَا حجة إقناعية، والملازمة عادية على ما هو اللائق بالخطابيات، فإن العادة جارية بوجود التمانع والتغالب عند تعدد الحاكم على ما أشير إليه بقوله تعالى: وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ.

আলেম মাত্রই বুঝবেন, তাফতাযানী রাহ. এ ইবারতটি ইলাহ শব্দের ব্যাখ্যায় বলেননি বরং حجة إقناعية -এর আলোচনা প্রসঙ্গে উক্ত কথাটি বলেছেন আর الحاكم শব্দটি এখানে اتفاقي ভাবে এসেছে সেজন্য একই প্রসঙ্গে অন্যত্র আলোচনা করতে গিয়ে صانع (সৃষ্টিকর্তা) শব্দ ব্যবহার করেছেন বলেছেন, صانع العالم واحدতাহলে কি প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি বলবেন ইলাহ অর্থ صانع? (শরহে আকায়েদ, পৃ. ৩৩৫-৩৩৭)

এছাড়া ইলাহ অর্থ যে মা‘বুদ, এ বিষয়টি খোদ তাফতাযানী রাহ. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন তার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ আততালবীহ-এ

তিনি বলেন

وأما الثاني فلأن قولنا لا إله إلا الله كلمة توحيد إجماعا، فلو لم يكن صدر الكلام نفيا لكل معبود بحق، لما كان إثبات الواحد الحق تعالى توحيدا، وللإشارة إلى هذا التقرير قال: ولكلمة التوحيد دون أن يقول، ولقولنا لا إله إلا الله أو لصحة الاستثناء، فإن قلت: لما فسرت الإله بالمعبود بحق، لزم استثناء الشيء من نفسه، لأن الله تعالى أيضا اسم للمعبود بالحق، على ما صرحوا به. قلت: معناه أنه عَلَم للمعبود بالحق، الموجود الباري للعام الذي هو فرد خاص من مفهوم الإله، لا أنه اسم لهذا المفهوم الكلي كالإله، ثم لا يخفى أن الاستثناء هاهنا بدل من اسم لا على المحل.

আত তালবীহ, পৃ. ১৫৮

তাফতাযানী রাহ. তার এ বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বললেন, কালেমা তাওহীদের অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বুদ নেই সুতরাং প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি শরহে আকায়েদ কিতাবের ওই ইবারতের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা সম্পূর্ণ তার নিজের বানানো তা তিনি অজ্ঞতার কারণে তাফতাযানী রাহ.-এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন

আফসোসের কথা হল, آلهة শব্দের অর্থ গ্রহণের জন্য তিনি শরহে আকায়েদ কিতাবের সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটি ইবারত আঁকড়ে ধরলেন অপরদিকে কুরআন হাদীসের অসংখ্য বাণী এবং সাহাবা, তাবেয়ীন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আরবী ভাষাবিদদের বক্তব্য ও ঐকমত্যকে একদম এড়িয়ে গেলেন তিনি যদি উক্ত আয়াতের মর্ম তাফসীরগ্রন্থসমূহ থেকে দেখে নিতেন তাহলেও হয়তো তিনি এমন একটা ভ্রান্তিতে পড়তেন না

এখানে নমুনাস্বরূপ কয়েকটি তাফসীরগ্রন্থের উদ্ধৃতি পেশ করা হল

এক. ইমাম তাবারী রাহ. বলেন

يقول تعالى ذكره: لو كان في السماوات والأرض آلهة تصلح لهم العبادة سوى الله الذي هو خالق الأشياء.

তাফসীরে তাবারী ৯/১৫

দুই. মাক্কী ইবনে আবী তালিব রাহ. বলেন

ومعنى الآية: لو كان المعبود آلهة أو إلهين لفسد التدبير.

আলহিদায়া ইলা বুলূগিন নিহায়া ৫/২৯৯২

তিন. আবুল হাসান নায়সাবুরী রাহ. বলেন

لَوْ كَانَ فِيهِمَا أي: في السماء والأرض، وجرى ذكرهما قبل.آلِهَةٌ معبودين يستحقون العبادة. إلَّا اللهُ.

আততাফসীরুল বাসীত ১৫/৪৫

চার. কুরতুবী রাহ. বলেন

قوله تعالى: (لو كان فيهما آلهة إلا الله لفسدتا) أي لو كان في السموات والأرضين آلهة غير الله معبودون لفسدتا.

তাফসীরে কুরতুবী ১১/২৭৯

যুক্তি-৩

প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি তার মতের পক্ষে উসূলুশ শাশী কিতাবের উদ্ধৃতিতে বলতে চেয়েছেন, ইলাহ অর্থ মা‘বুদ নিলে হাকীকত ও শব্দের প্রকৃত মর্ম আদায় হয় না; বরং হাকেম অর্থ করলে প্রকৃত মর্ম আদায় হয়

খণ্ডন

এটা সম্পূর্ণ তার বানানো কথা ইতিপূর্বে আমরা কুরআন কারীম, হাদীস শরীফ এবং সকল শাস্ত্রের ইমামগণ ও ভাষাবিদদের বক্তব্যে দেখেছি যে, ইলাহ শব্দটি মা‘বুদ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে অতএব ইলাহ শব্দের একমাত্র অর্থই হল, মা‘বুদ এখানে ভিন্ন কোনো অর্থ করার সুযোগই নেই যে, ‘ইলাহ’ শব্দের বিষয়ে ‘হাকীকত’ ও ‘মাজায’-এর কায়েদা প্রয়োগ করার কোনো অবকাশ আছে

উসূলুশ শাশী কিতাবে হাকীকত ও মাজায-এর আলোচনা তো আছে; কিন্তু ইলাহ শব্দ ও তার অর্থ নিয়ে সেখানে কোনো কথা নেই আলোচিত ব্যক্তি সমস্ত শরয়ী দলীলের বিরোধিতা করে সম্পূর্ণ নিজের পক্ষ থেকে হাকীকত মাজায-এর কায়েদাকে ইলাহ শব্দের ওপর প্রয়োগ করে উসূলে ফিকহ-এর কায়েদার তাহরীফ করলেন এটা বাতিলপন্থিদের তরীকা একদিকে তারা কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল ও উম্মাহর ইজমাকে উপেক্ষা করে, অপরদিকে উসূল ও কাওয়ায়েদের অপব্যাখ্যা করে নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণের অপচেষ্টা করে প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি আলোচ্য ক্ষেত্রে এ কাজটিই করেছেন

 

৩ নং প্রশ্নের উত্তর

উপরের দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত যে, উক্ত ব্যক্তি  ইলাহ ও কালেমা তায়্যিবার মতো সর্বজনস্বীকৃত ও সুস্পষ্ট প্রমাণিত বিষয়ে তাহরীফ ও বিকৃতি ঘটিয়েছেন এবং লোকদেরকে এ তাহরীফ ও গোমরাহীর প্রতি সুস্পষ্ট আহ্বানও জানাচ্ছেন পাশাপাশি তিনি আকাবির উলামার প্রতি সর্বসাধারণকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা ও অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন যার সবই বড় অন্যায় ও গোনাহের কাজ

অতএব প্রশ্নোক্ত লোকটির জন্য জরুরি হল, তওবা-ইস্তিগফার করে এসকল তাহরীফ ও গোমরাহীর পথ থেকে ফিরে আসা কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ-এর মাসলাক অনুসরণ করা এবং সব ধরনের শুযূয তথা বিচ্ছিন্নতা ও গোমরাহী থেকে বিরত থাকা আর এতদিন যে তিনি কালেমার অর্থ বিকৃতি করেছেন, তা থেকে প্রকাশ্যে রুজু করা

তার মধ্যে যদি দ্বীনী বিষয়ে বয়ান করার মৌলিক শর্তগুলো বিদ্যমান থাকে এবং কালেমায়ে তায়্যিবার অর্থ নিয়ে এতদিন যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন, তা থেকে যথাযথভাবে ফিরে আসেন এবং ভবিষ্যতে এরূপ করবেন না বলে আলেমগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তার বয়ান শোনা যাবে কিন্তু তিনি যদি হঠকারিতা থেকে ফিরে না আসেন; বরং পূর্বের অবস্থার ওপরই অটল থাকেন, তাহলে তার জন্য দ্বীনী বিষয়ে বয়ান ও আলোচনা করা এবং লোকদের জন্য তা শোনা জায়েয হবে না

এক্ষেত্রে স্থানীয় আলেম-উলামার কর্তব্য, তার গোমরাহীর বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা যেন তিনি শরীয়তের কোনো বিষয়ে বিকৃতির মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড সমাজে বিস্তার করতে না পারেন

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনে হানীফের ওপর অবিচল রাখুন হেদায়েতের ওপর দৃঢ়পদ রাখুন এবং শরীয়তের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ সকল ক্ষেত্রে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআহর মাসলাক ও আদর্শ অনুসরণের তাওফীক নসীব করুন আমীন

هذا، وصلى الله تعالى على سيدنا محمد خاتم النبيين، وعلى آله وأصحابه أجمعين.

 

 

advertisement