রজব ১৪৪৭   ||   জানুয়ারি ২০২৬

ভিত্তি গড়ে দেওয়া উস্তায

মাওলানা আবরারুয যামান

আজ আমার এক প্রিয় ছাত্র এসেছিল আমার প্রথম জীবনের ছাত্র শিক্ষকতার সূচনার শাগরেদ কিছু স্মৃতিচারণ হল দুআ চাওয়া-চাওয়ির পর সে চলে গেল সে দরজা ছাড়ার পরই মাথায় এল শিরোনামভিত্তি গড়ে দেওয়া উস্তায’ আমি তার উস্তায যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রসঙ্গ অনেক পরে; ভালো লাগে এতটুকু ভাবতে, আমি তার শিক্ষক শিক্ষাজীবনের একটি স্তরের সূচনা তার হয়েছে আমার হাতে ভাবতে আমার ভীষণ ভালো লাগে সে এখন বড় আলেম বড় মাদরাসায় বড় কিতাব পড়ায় পাশের চেয়ারটায় যখন বসেছিল, আমাকে অভিভাবকের মতো লাগছিল আমার ভীষণ ভালো লাগছিল ছোট ছোট কিছু বিষয়ে সে আমার পরামর্শ চাচ্ছিল আমার মনের গভীরে আমি দারুণ স্বস্তি অনুভব করছিলাম আমি আমার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা তাকে শোনাচ্ছিলাম গভীর মনোযোগে সে শুনছিল আমি ভীষণ পুলকিত হচ্ছিলাম

...আর তখনই মনে হল আমার জীবনে আমার মহান শিক্ষকগণের কথা প্রথম জীবনের কারী ছাহেবের কথা পুকুরপাড়ে টিনশেড মক্তবঘরের কথা চকের গুড়ো, ডাস্টারের সুতায় লেগে থাকা সাদা পাউডার, কারী সাহেব হুজুরের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আলিফ-বা-তা-ছা’র সমস্বরে চিৎকার মনে পড়ল এবং মনের গভীরে কিছু একটা ঢেউ খেলে গেল

এখন আমি হাদীসের কিতাব ‘পড়াই’ মসজিদের মিম্বরে আলোচনা ‘পেশ’ করি কিন্তু আমি মনে করি না, মনে করতে চাই না আমার হাদীসের পাঠদান, আমার সুদীর্ঘ সারগর্ভ আলোচনার হরফে হরফে মিশে আছে একটি নাম, ‘কারী সাহেব হুজুর’

এটি আমার দিলের কথা এটি প্রত্যেক শিক্ষকের কথা ছাত্রের ‘সাফল্যে’ হৃদয়ের গভীরে শিহরন অনুভব করা সকল মানুষের কথা আমাদের জীবনের যিনি ‘কারী সাহেব হুজুর’, তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, এ তথ্যটুকু যারা হারাতে বসেছে, তারা যদি একটিবার তাদের বৃদ্ধ কারী সাহেবের কাছে গিয়ে বসত, নিজেকে সত্যিই মক্তবের শিশুটিই মনে হত আড়চোখে তাকালে সে দেখতে পেত, ‘মুহাদ্দিস’ ছাত্রকে চল্লিশ বছর পর কাছে পেয়ে কারী সাহেব হুজুরের চোখদুটি কেমন ঝাপসা হয়ে এসেছে কোথায়, দূর অতীতের কোন্ পাঠশালায় তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন চুলকানোর ভান করে চোখদুটি মুছে নিচ্ছেন

***

পুরোনো কালের কোনো শাগরেদকে কাছে পেলে কেন এমন খুশি লাগে, জানি না জীবনের যত অপ্রাপ্তি, সব কেন এমন বেমালুম ভুলে যাই এ তো শুধু আমার কথা নয়, কোনো ব্যক্তির কথা নয় এ তো সকল যুগের সকল ‘বীজ বুনকে’র কথা তিরতির সবুজে দৃর্ষ্টি আটকে যাওয়া অপেক্ষমান ‘কৃষকে’র হৃদয়ের কথা

এ খুশির অনেক দাম এ দাম যে বোঝে, সফলতার উচ্চ মিনার সে-ই ছুঁতে পারে ছোট্ট জীবনটা নিয়ে সে পাড়ি দিতে পারে দূর বহুদূর

আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, অকৃতজ্ঞ সকল মানুষকে দান করুন কৃতজ্ঞতার মহান সম্পদ আমার জীবনকে যাঁরা শুরু করে দিয়েছেন, জীবনের ভিত্তি যাঁরা গড়ে দিয়েছেন, যাঁরা আমাকে ইলমের পথে, জীবনের পথে এগিয়ে নিয়েছেন, তাঁদেরকে, তাঁদের সকলকে আপনি দান করুন আপনার মতো করে সর্বোত্তম জাযা ও পুরস্কার আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন 

 

 

advertisement